— আপনার বউ নৌশিকে আমরা কিডন্যাপ করেছি। খবরদার, পুলিশকে কল করার ভুল করবেন না! তাহলে আপনার বউকে প্রাণে মেরে ফেলবো। আমাদের পঞ্চাশ লাখ টাকা লাগবে। টাকা দিলে আপনার বউকে ছেড়ে দিবো।
সার্জারিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল রুদ্রিক। তখনি টেবিলে ফোনটা বেজে উঠে। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে অপরিচিত এক ব্যক্তি কথাগুলো বলে। রুদ্রিক চোখ তুলে দেয়ালঘড়ির দিকে তাকায়। দুপুর দেড়টা বাজে। নৌশি তো এই সময়ে কলেজে থাকার কথা!
রুদ্রিক কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করে,
— নৌশি কোথায়?
ওপাশের লোকটা বলে উঠে,
— আমার সঙ্গেই আছে। কথা বলাচ্ছি।
পরমুহূর্তেই নৌশির কণ্ঠ শোনা যায়।
— ওরা আমাকে এখানে তুলে নিয়ে এসেছে! আমাকে বাঁচান!
কথা শেষ হওয়ার আগেই নৌশির কাছ থেকে ফোনটা সরিয়ে নেওয়া হলো। এবার লোকটা আবার বলে,
— শুনেছেন, বউয়ের আওয়াজ? একদম সুস্থ আছে, ভালো আছে। কিন্তু আপনি টাকা না দিলে আর ভালো থাকবে না। মেরে নদীতে ফেলে দিবো। এখন বউকে বাঁচাতে চাইলে পঞ্চাশ লাখ টাকা দিয়ে ফিরিয়ে নিন।
লোকটার সব শুনে রুদ্রিক গিয়ে চেয়ারে বসে। তারপর ভ্রু কুঁচকে স্বাভাবিক গলায় বলে,
— আমি পাগল না যে ওকে আবার ফেরত আনবো! ওকে জানে মারার আগে দুই ঘণ্টা ইচ্ছেমতো মারবেন। আমার কলিজাটা পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। এক মাসের সংসারে আমার জীবনটাই শেষ করে দিয়েছে!
রুদ্রিকের এমন নির্লিপ্ত কথা শুনে ওপাশের লোকটা রীতিমতো অবাক। লোকটার বিস্মশ তা কণ্ঠস্বরেই স্পষ্ট। বলে,
— মানে কী? আপনার বউ, আপনি বাঁচাবেন না?
রুদ্রিক নির্বিকার গলায় বলে,
— না, আমার গার্লফ্রেন্ড আছে। এমনিতেও আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ড মিলে চাচ্ছিলাম, ওকে আমার জীবন থেকে সরাতে। কিন্তু কেসে জড়িয়ে যাবো বলে পারছিলাম না।
লোকটা হতভম্ব হয়ে যায়। আকাশ থেকে পড়েছে এমন অবস্থা। তবু শান্ত গলায় রুদ্রিককে বুঝাতে থাকে,
— ভাই, বুঝেন! আপনার বউ হয়। একটু তো মায়া আছে ওর প্রতি!
— কোনো মায়া নাই, ভাই! ও আমার জীবনটা জ্বালিয়ে তেজপাতা করে দিয়েছে। আর শুধু আমি না, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, এতক্ষণে আপনাদেরও জ্বালিয়েছে!
রুদ্রিকের কথা শুনে লোকটা চুপ হয়ে যায়। রুদ্রিক ভুল বলেনি! নৌশিকে কিডন্যাপ করে এখানে আনার পর আধা ঘণ্টার মতো হয়েছে। আর গাড়িতে থাকতে হয়েছে আধা ঘণ্টা। এই এক ঘন্টা সময়েই নৌশির বকবকানি আর ফ্যাঁকফ্যাঁকানিতে ওদের কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। বিরক্ত হয়ে মুখে কস্টেপ লাগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাতেও শান্তি নেই! নৌশি ইশারায় কথা বলা শুরু করে। আর তার সেই ইশারা বুঝতে ওদের জান বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড়।শেষমেশ বাধ্য হয়ে আবার মুখের কস্টেপ খুলে দিতে হয়েছে।
তারপর থেকে নৌশি একটানা কথা বলেই যাচ্ছে। মাত্র এক ঘণ্টায় তাদের অবস্থা যদি এমন করুণ হয়, তাহলে এক মাস ধরে রুদ্রিক কিভাবে নৌশির সাথে সংসার করেছে, তা ভেবেই রুদ্রিকের প্রতি সহানুভূতি আসে লোকটার। একই সাথে এটাও বুঝতে পারে নৌশিকে কিডন্যাপ করে ওরাই বিপদে পড়ে গেছে!
কাজকর্ম না থাকায় বেকার চার বন্ধু মিলে স্বল্প বিনিয়োগে এই কিডন্যাপিংয়ের ব্যবসা শুরু করেছে। ভেবেছিল, দুই চারটা কিডন্যাপ করেই মোটা অঙ্কের টাকা কামিয়ে ফেলবে। কিন্তু প্রথম কিডন্যাপিংয়েই এমন এক মেয়েকে তুলে এনেছে, যার স্বামী বউকে ফেরত নেওয়ার বদলে উল্টো বউয়ের থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে!
লোকটা হতাশ গলায় আবার বলে,
— আচ্ছা, আপনার পঞ্চাশ লাখ লাগবে না। পাঁচ লাখ টাকাই দেন!
রুদ্রিক অনীহা কন্ঠে বলে,
— না, ভাই! আমি কি পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে আবার ঝামেলাটা ফেরত আনবো! আপনি ওরে মেরে দেন। আমার জীবনটা মুক্ত করার জন্য আপনার জন্য দোয়া করবো! বাকি কেস পুলিশ আপনি সামলে নিয়েন।
লোকটা এবার অসহায় গলায় বলে,
— ভাই, বিশ হাজার টাকাই দেন? এত কষ্ট করে তুলে আনছি!
রুদ্রিক পায়ের উপর পা তুলে চেয়ারে হেলান দেয়। তারপর নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে,
— না ভাই, সম্ভব না। আমি ফোন রাখলাম।
বলেই টুস করে কল কেটে দেয়। কিডন্যাপার কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর নৌশির দিকে ফিরে। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে নৌশি। মুখে কস্টেপ লাগানো। রাগে নৌশি বোম হয়ে আছে। রুদ্রিকের এমন নির্লিপ্ততা আর কথা শুনেই মেজাজ গরম নৌশির।
লোকটা তার আরেকজন সঙ্গীকে বলে,
— এর মুখের কস্টেপ খোল।
আরেকজন লোক নৌশির মুখের কস্টেপ টা খুলে। কস্টেপ খুলে দিতেই নৌশি রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
— আমার সন্দেহ একদম ঠিক ছিল! কুত্তাটা আরেকটা মেয়ের সঙ্গে ইটিশপিটিশ করছে!
এবার প্রথম লোকটার ধৈর্যের বাধ ভেঙে যায়। নৌশিকে ধমক মেরে বলে উঠে,
— তুই না বলেছিলি, তোর জামাই তোকে কিডন্যাপ করেছে শুনলে স্ট্রোক করে ফেলবে? তোর জামাই তো শুকরিয়া আদায় করছে, তুই ওর জীবন থেকে যাচ্ছিস বলে!
কথাটা শুনে নৌশি চুপ হয়ে যায়। মুখটা চোরের মতো হয়ে যায়। এতক্ষণ যে মুখে কথার খই ফুটছিল, এখন তাতে তালা পড়ে গেছে। রুদ্রিকের এমন ভয়ংকর অপমানের কারণে কিডন্যাপারদের সামনে ইজ্জতের বারোটা বেজে গেছে! দুই টাকারও সম্মান আর রইল না! এটা ভেবেই নৌশি মনে মনে আফসোস করছে। রুদ্রিক তাকে এভাবে বেইজ্জতি করল? অথচ সে ভেবেছিল, তাকে কিডন্যাপ করার খবর শুনেই রুদ্রিক অজ্ঞান হয়ে যাবে! কান্না করে হাতজোড় করবে কিডন্যাপারদের কাছে। কিন্তু রুদ্রিক তা না করে উল্টো আরো বললো তাকে ২ ঘন্টা মারতে? নাহ্! এই অপমান কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। এখান থেকে একবার বেঁচে ফিরুক, তারপর রুদ্রিকের খবর আছে!
আরেকজন কিডন্যাপার বিরক্ত মুখে বলে উঠে,
— কিরে, এই কুফাটাকে এখন কি করব? এর জামাই তো এক টাকাও দিবে না। যেভাবে জামাইয়ের কলিজা পুড়ছে, ওই ব্যাটা নির্ঘাত এই খবর শুনে খুশিতে নামাজ পড়ে দোয়া করছে!
প্রথম লোকটা এবার দাঁতে দাঁত চেপে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নৌশিকে বলে,
— লাইফে ফার্স্ট টাইম কিডন্যাপ করতে নামছিলাম। আর তুই কুফা কোথাকার সামনে পড়ে সব ভেস্তে দিলি!
নৌশি চুপসে থাকা মুখে বলে,
— তো আমি কি বলছি আমাকে তুলে আনতে!
লোকটা এই কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে।
— তোকে তো দেখতাম গাড়ি দিয়ে যাওয়া আসা করতে। ভাবছিলাম, বড়লোকের মেয়ে! কিন্তু আমরা কি জানতাম, তুই নিজের জামাইয়ের কলিজা পুড়িয়ে ছারখার করে দিছিস? জামাইয়ের সাথে আজকে একটু ভালো সম্পর্ক রাখলে আমাদের এই লসটা হতো না!
নৌশি আর কোনো বলে। চোখ ঘুরিয়ে এদিকসেদিক তাকাতে থাকে, যেন সে কিছু শুনতেই পাচ্ছে না। লোকটার বিরক্তি আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছে। গজগজ করতে করতে বলে,
— প্রথম কিডন্যাপটাই আনসাকসেসফুল হলো এই কুফার কারণে!
দলের আরেকজন বলে উঠে
— একে এখন কী করব?
লোকটা বিরক্ত হয়ে হাত নেড়ে বলে,
— কী করবি আবার? একে বাড়ি পাঠা! একে এখানে রেখে আর খরচ বাড়াবো না।
লোকটার কথামতো আরেকজন এগিয়ে এসে নৌশির হাত আর পায়ের দড়ি খুলে দেয়। ছাড়া পেয়েই নৌশি উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু নৌশির মধ্যে সেখান থেকে যাওয়ার কোনো তাড়া দেখা যায় না। বরং দিব্যি ওদের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকে। নৌশিকে ঠাঁই দাড়িয়ে থাকতে দেখে লোকটার বিরক্তি শেষ সীমায় পৌঁছে যায়। ধমক মেরে বলে,
— দাঁড়িয়ে আছোস কেন? যা মা, তুই যা! আর প্যারা দিস না!
নৌশি স্বাভাবিক গলায় বলে,
— গাড়িভাড়া দেন? আমার কাছে তো টাকা নাই।
কথাটা শুনে লোকটা প্রথমে হতভম্ব হয়ে যায়। পরে
দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
— আমরা স্টুডেন্ট মানুষ! তোকে যে পেট্রোল খরচ করে গাড়ি দিয়ে তুলে আনলাম, ওই পেট্রোলের টাকাটাই জলে গেছে! আবার পঞ্চাশ টাকা খরচ করে মোবাইলে কথা বলছি, ওই টাকাটাও লস! যা, হেঁটে যা!
নৌশি বিরক্ত হয়ে বলে,
— আমার কাছে টাকা নাই। আর আমি হেঁটে যেতে পারবো না। পায়ে ব্যথা করবে!
লোকটা চিৎকার করে বলে,
— জমিদারের নাতনি! এখন কি তোরে নিজের পকেটের টাকা দিয়ে বাড়ি পাঠাবো?
নৌশি কোনো উত্তর দেয় না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। নৌশির নীরবতা সম্মতির লক্ষণ। লোকটা অবাক হয়ে মনে মনে ভাবতে থাকে, জীবনে এমন দিনও দেখতে হবে? কিডন্যাপ করতে এসে উল্টো নিজের পকেটের টাকা খরচ করে অপহরণ করা মেয়েকে বাড়ি পাঠাতে হবে!
লোকটা এবার রাগে গজগজ করতে করতে পকেট থেকে একশো টাকার নোট বের করে নৌশির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— নে, কুফার ঘরের কুফা! তোরে যে তুলে আনছি, এইটাই আমার জুতার বাড়ি! একশো টাকা ধর আর এখান থেকে গিয়ে দৌড় দিয়ে কলাগাছে ফাঁসি লটকা! তোর মতো কুফা জীবনে দেখি নাই।
নৌশি কথাটা ইগনোর করে দিব্যি টাকাটা নিয়ে নিজের কলেজব্যাগ হাতে তুলে নেয়। তারপর দলেরই একজন লোক নৌশিকে এগিয়ে দিতে বেরিয়ে পড়ে। ওরা নৌশিকে তার কলেজ থেকে প্রায় আধা ঘণ্টার পথ দূরে, নির্জন গাছপালায় ঘেরা জঙ্গলের মতো একটা জায়গার ছোট্ট ঘরে আটকে রেখেছিল। সেখান থেকে বের করে দেওয়ার পর নৌশি কিছুটা পথ হেঁটে মেইন রোডে পৌঁছায়। তারপর একটা রিকশায় উঠে রিকশাওয়ালা মামাকে রুদ্রিকের হাসপাতালের ঠিকানা দেয়। হাসপাতালে পৌঁছেই রুদ্রিকের বারোটা বাজাবে।
এখান থেকে হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় বিশ মিনিটের। বিশ মিনিট পর নৌশি রুদ্রিকের হাসপাতালে পৌঁছায়।রিকশাওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে সোজা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে। তারপর সরাসরি লিফটে উঠে তিনতলায় গিয়ে রুদ্রিকের কেবিনের সামনে আসে। পরমুহূর্তেই ধুম করে ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলে নৌশি।
রুদ্রিক চেয়ারে মাথা এলিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে মাথা তুলে তাকাতেই নৌশিকে দেখে।মুহূর্তেই রুদ্রিকের মুখে হাসি ফুটে উঠে। কিন্তু তারপরই নৌশির চেহারার রাগটা খেয়াল করে। নৌশির রেগেবোম হয়ে থাকা চেহারা দেখে রুদ্রিক ঠোঁট চেপে হাসি সামলানোর চেষ্টা করে। নৌশির রাগের কারণ সে জানে। রুদ্রিক যে কিডন্যাপারকে ওসব বলেছে সেজন্যই রেগে আছে! রুদ্রিকের কথাগুলো আবার মনে পড়তেই অনেক জোরে হাসি আসে। রুদ্রিক ঠোঁট চেপে হাসি আটকায়।
নৌশি রাগে ধুম করে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে নিজের ব্যাগটা ছুড়ে সোফার ওপর ফেলে রুদ্রিকের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,
— আপনাকে আমি মেরে ফেলব, রাক্ষস ডাক্তার!
নৌশি রুদ্রিকের কাছে এসে ডান হাঁটুটা রুদ্রিকের হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে রুদ্রিকের দিকে ঝুকে বুকের কাছের শার্ট খামচে ধরে কটমট চোখে তাকিয়ে বলে,
— আপনি কিডন্যাপারদের কি বলছিলেন? আমাকে মেরে দেওয়ার আগে দুই ঘণ্টা ইচ্ছেমতো মারতে?!
রুদ্রিক ঠোঁট চেপে হাসতে হাসতেই কিছু মনে করার ভান করে বলে,
— এটা বলেছি? মনে নেই আমার!
নৌশি অবিশ্বাসে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলে,
— আপনি হাসছেন? ওরা যদি আমাকে মেরে দিত?
রুদ্রিকের হাসি থামে না।
— মারত না। জানতাম না।
নৌশি রাগে রুদ্রিকের বুকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলে,
— কেমনে জানতেন?
রুদ্রিক হাসি দিয়েই নির্বিকার গলায় বলে,
— জানতাম আরকি!
নৌশির রাগ আরো বেড়ে যায়। ঘুরে টেবিলের ওপর থেকে পেপারওয়েটটা তুলে নিয়ে রুদ্রিকের মাথায় বাড়ি মারতে উদ্যত হয়ে বলে,
— আমি আপনার মাথা ফাটিয়ে দিব!
রুদ্রিক দ্রুত নৌশির হাতটা ধরে ফেলে। তারপর হাসতে হাসতেই বলে,
— ব্যথা পাব তো!
নৌশি দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
— আপনার কারণে আমি কত বেইজ্জতি হয়েছি, জানেন?
রুদ্রিক ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করে,
— কেন, কী হয়েছে?
এবার নৌশির রুদ্রিকের পায়ের ওপর বসে কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে,
— ওরা আমাকে কুফা বলেছে! বলেছে, দৌড় দিয়ে গিয়ে যেন কলাগাছে ফাঁসি দিই!
কথাটা শুনে রুদ্রিকের আর হাসি থামে না। শরীর দুলিয়ে হাসতে থাকে। নৌশি কটমট করে রুদ্রিকের দিকে তাকায়। অথচ রুদ্রিকের সেদিকে খেয়ালই নেই। হেসে চলেছে সে নৌশির কথা শুনে। একই সাথে দুজন অন্য একটা ব্যাপারেও অজ্ঞ। দুজন যে এই মুহূর্তে কতটা কাছাকাছি বসে আছে, সেই বোধটুকু দুজনের কারোর মাথায় নেই।
রুদ্রিক হাসতে হাসতেই বলে উঠে,
— কী বলেছে? আবার বল তো!
নৌশি রাগে গাল ফুলিয়ে বলে,
— রাক্ষস ব্যাটা! আবার হাসছে! আপনার জন্য ওরা আমাকে অপমান করেছে!
রুদ্রিক কোনোমতে হাসি সামলে জিজ্ঞেস করে,
— আর কিছু বলেছে?
নৌশি মুখ ফুলিয়ে বলে,
— হুম........
কথাটা বলেই হঠাৎ নৌশির মাথায় আরেকটা বিষয় খেলে যায়। নৌশি চোখ সরু করে রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
— আচ্ছা, আপনি ফোনে কী বলছিলেন? আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে!
রুদ্রিক ভাব নিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে বলে,
— থাকতেই পারে! হ্যান্ডসাম, এস্টাবলিশড আমি!
নৌশি ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্য করে বলে,
— হুহ! যেই না চেহারা, কুত্তায় দেয় পাহারা!
রুদ্রিকের মুখের হাসি থেমে যায়।
— এই! কী বললে তুমি?
নৌশি নির্বিকার হয়ে বলে,
— যেটা শুনছেন, সেটাই!
রুদ্রিক চোখ সরু করে নৌশির দিকে তাকিয়ে থাকে। নৌশি মুখ বাঁকিয়ে বলে,
— তাকিয়ে আছেন কেন?
রুদ্রিক এবার প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করে,
— আচ্ছা, তোমাকে কিডন্যাপাররা পেল কোথায়? তুমি তো এখন কলেজে থাকার কথা!
ব্যস! এবার নৌশি ধরা পড়ে যায়। নৌশির চেহারা দেখেই রুদ্রিক সব বুঝে ফেলে। বলে উঠে,
— চোর মেয়ে! তুমি আবার কলেজ বাঙ্ক দিয়েছিলে! ভালোই হয়েছিল কিডন্যাপ করেছিল। দুটো বেতের বাড়ি দিলে বেশ হতো!
— শয়তান লোক! আজকে সাবা কলেজ আসেনি। আমি একা কলেজে কি করবো? আর আপনি রাক্ষস ডাক্তার! নিজে এত বড় একটা কাজ করেছেন, আবার আমাকেই বকছেন!
কথাটা বলেই নৌশি চুপ হয়ে যায়। তারপর কিছুক্ষণ রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে থেকে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে,
— সত্যিই আপনার আমার জন্য চিন্তা হচ্ছিল না? ওরা যদি সত্যিই আমাকে মেরে.....
বাকি কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রুদ্রিক নৌশির ঠোঁটে আঙুল রেখে নৌশিকে থামিয়ে দেয়। তারপর আলতো করে নৌশির গালে হাত রেখে নরম স্বরে বলে,
— কিছু হতো না তোমার। আমি জানতাম, কিছু হতো না তোমার!
— কীভাবে জানতেন? আপনি তো ওদের আরো বলেছিলেন আমাকে মারতে!
রুদ্রিক শান্ত গলায় বলে,
— ওদের কাছে যদি আমি আমার দুর্বলতা প্রকাশ করতাম, তাহলে ওরা সেই দুর্বলতাকে চেপে ধরতো।
নৌশি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— দুর্বলতা? কী দুর্বলতা?
রুদ্রিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
— ওরা যদি বুঝে যেতো, আমার জীবনে তোমার মূল্য কতটা, আমি তোমাকে কতটা চাই, তাহলে তোমাকে ফিরিয়ে দিতে? উল্টো তোমাকে হাতিয়ার বানাত!
কথাটা শুনে নৌশি কিছুটা শান্ত হয়। কিন্তু আবার পরমুহূর্তেই মুখ ফিরিয়ে অভিমানী স্বরে বলে,
— যাই বলেন! আপনার কারণে ওরা আমাকে কুফা বলেছে! এই অপমান আমি ভুলব না!
রুদ্রিক এবার হালকা হাসে। কিন্তু কিছু বলে না। চুপচাপ নৌশির দিকে তাকিয়ে থাকে। রুদ্রিকের চোখে স্পষ্ট কোমলতা, দৃষ্টিতে মায়া। আর তখনি রুদ্রিক খেয়াল করে, নৌশি এতক্ষণ ধরে তার কোলের ওপর বসে আছে! দুজন এতটা কাছাকাছি।
চলবে?
#তবুও_তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি
#লেখনীতেঃ_অধরা_মিনহা
#পর্ব_১৪