ফন্ট সাইজ:
থিম:
তবুও তোমার প্রেমে আমি পড়েছি

পর্ব 17

লেখক: অধরা মিনহা

ক্লাসভর্তি স্টুডেন্টের সামনে নৌশিকে থাপ্পড় মেরেছে কলেজের ইকোনমিক স্যার। কিন্তু ঘটনা সেখানেই থেমে থাকেনি। উল্টো নৌশিকে থাপ্পড় মারায় ইকোনমিক স্যারকে মেরে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের করে পুরো কলেজকে স্তব্ধ করে দিয়েছে কলেজেরই ইংরেজি প্রফেসর মেহমেত হোসেন আলভী।

কিছুক্ষণ আগে একাদশ শ্রেণিতে ক্লাস নিতে আসে আলভী। ক্লাসরুমের দরজার সামনে আসতেই তার চোখে পড়ে নৌশিকে। মেয়েটা মাথা নিচু করে কোথাও যাচ্ছে। নৌশিকে দেখে আলভী দাড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কই যাচ্ছো?

নৌশি মাথা না তুলে খুবই ক্ষীণ স্বরে বলে,
— পথ ছাড়ুন স্যার, প্লিজ।

আলভী ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
— আজকেও কলেজ বাঙ্ক দিবে? তা হবে না। চল, ক্লাসরুমে।

কথাটা বলতেই এবার নৌশি মাথা তুলে সরাসরি তাকায় আলভীর চোখের দিকে। নৌশির মুখ দেখেই থমকে যায় আলভী। নৌশির মুখ লাল হয়ে আছে। চোখ দুটো কান্নায় টলমল করছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে, চোখের পানি আটকাতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে মেয়েটা।

আলভীর বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠে নৌশির টলমলে দৃষ্টি দেখে। অস্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
— কী হয়েছে, নৌশি?

কিন্তু নৌশি আর না দাঁড়িয়ে আলভীর পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যেতে ভাঙা গলায় বলে,
— স্যার, প্লিজ সরুন।

আলভী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। নৌশি কাঁদছে? যে মেয়েটাকে সব সময় হাসিখুশি দুষ্টুমিতে দেখেছে, আজ সেই মেয়েটার চোখে পানি? আলভীর বুকের ভেতরের অস্থিরতা আরো বেড়ে যায়। সে পেছন ফিরে নৌশিকে ডাকতে নেয়, কিন্তু ততক্ষণে নৌশি সেখানে নেই। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেছে। নৌশির কথা ভাবতে ভাবতেই ক্লাসরুমে ঢুকে আলভী। ঢুকেই দেখে, সাবা কয়েকটা মেয়ের সাথে ঝগড়া করছে। তাকে দেখামাত্রই সবাই থেমে যায়। এরপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়। কিন্তু অন্যদিনের মতো আলভী সালামের উত্তর দেয় না। তার মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, নৌশির কী হয়েছে?

আলভী সোজা সাবার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,
— নৌশির কী হয়েছে? কাঁদছিল কেন?

সাবারও কান্না পাচ্ছে। নিজেকে সামলে বলে,
— জহির স্যার নৌশিকে থাপ্পড় মেরেছে!

কথাটা শুনতেই আলভীর চেহারার রঙ বদলে যায়। বিস্মিত হয়ে পরমুহূর্তেই রেগে যায়।
— কেন?

সাবা আর দেরী না করে সবটা খুলে বলে,
— স্যার, আমি আর নৌশি কথা বলছিলাম। হঠাৎ করেই জহির স্যার এসে কোনো কথা না বলে নৌশির গালে থাপ্পড় মারে। নৌশিকে অপমান করে!

আলভী অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে বলে,
— জাস্ট ক্লাসে কথা বলার কারণে থাপ্পড় মেরেছে?

সাবা মাথা নেড়ে হ্যা বুঝায়। ব্যাস! আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না আলভী। রাগে তার মাথা গরম হয়ে গেছে। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে নৌশির লাল হয়ে যাওয়া মুখটা, কান্না আটকে রাখা চোখ দুটো আর অসহায় কণ্ঠে বলা কথাগুলো। জহির স্যারের সাহস কীভাবে হয় নৌশির গায়ে হাত তোলার? এই কথাটাই আলভীর সমস্ত সংযম কেড়ে নেয়। একাদশ শ্রেণির ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে আলভী। তারপর সোজা চলে যায় দ্বিতীয় ভবনে, যেখানে দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস নিচ্ছিলেন জহির স্যার।

আলভী ক্লাসরুমে ঢুকেই কোনো কথা বলে জহির স্যারের মুখে এলোপাতাড়ি ঘুষি মারতে থাকে। আচমকা এমন আক্রমণে জহির স্যার কিছু বুঝে ওঠার আগেই আলভীর ঘুষিতে তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে শুরু করে। পরিস্থিতি এতটাই অপ্রস্তুত যে, নিজেকে সামলে আলভীকে পাল্টা আঘাত করার সুযোগটুকুও পান না জহির স্যার। আর আলভীও একের পর এক ঘুসি মেরেই চলেছে। আর তার চোখের সামনে শুধু ভাসছে নৌশির মুখটা। সেই কান্না চেপে রাখা মুখ, সেই অপমানিত চোখ। আর কানে বাজছে সাবার বলা কথাগুলো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্য ক্লাস থেকে ছুটে আসে কয়েকজন স্যার। অনেক কষ্টে তারা আলভীকে ধরে সরিয়ে আনে। কিন্তু আলভী থামতে নারাজ। তার রাগ কিছুতেই কমছে না। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে আবার মারতে এগিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই ছুটে এলেন কলেজের প্রিন্সিপাল স্যার।পরিস্থিতি দেখে এবং স্টুডেন্টের জড়োসড়ো ভিড় দেখে দুজনকেই নিজের কক্ষে ডাকেন।

এখন প্রিন্সিপালের রুমে দাঁড়িয়ে আছে আলভী, জহির স্যার এবং আরো কয়েকজন শিক্ষক। জহির স্যার একটা চেয়ারে বসে টিস্যু দিয়ে নাক চেপে ধরে আছেন। তবু নাক দিয়ে রক্ত পড়া থামছে না। অন্যদিকে আলভী এখনো জহির স্যারের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সুযোগ পেলে এখনো মারবে। প্রিন্সিপাল দুজনের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে অবশেষে আলভীর দিকে ফিরে তাকান। তারপর অসন্তোষ্ট গলায় বলেন,
— এটা কী ধরনের বিহেভিয়ার, আলভী? আপনি আপনার কলিগকে মেরেছেন কেন? এটা কোন ধরনের অভদ্রতা? স্টুডেন্টরা কী শিখবে এসব দেখে?

আলভী চোখ সরায় না জহির স্যারের থেকে। জহির স্যারের দিকে তাকিয়েই দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— একটা মেয়ে মানুষের গায়ে হাত তোলার সাহস কী করে হয়? তাকে থাপ্পড় মেরেছে এতগুলো মানুষের সামনে!

আলভীর কথায় রুমের পরিবেশ ভারী হয়। জহির স্যার টিস্যু দিয়ে নাক চেপে ধরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে উঠেন,
— মেয়েটা বেয়াদব, তাই মেরে....

আলভী গর্জে উঠে,
— নৌশি বেয়াদব না। মুখ ভেঙে ফেলবো তোর!

আলভীর এমন রাগীরূপ দেখে প্রিন্সিপাল স্যারসহ উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে যায়। তবু নিজেকে সামলে প্রিন্সিপাল স্যার বলেন,
— উনি ভুল করে থাকলে আপনি আমাকে জানাতেন।

আলভী সাথে সাথে ঝাঁঝ মিশ্রিত কন্ঠে বলে,
— নৌশি ক্লাসে ভুল করে থাকলে এই শয়তান আপনাকে জানাতো! থাপ্পড় মারল কেন? ওকে যেভাবে ভরা ক্লাসে থাপ্পড় মেরেছে, আমিও সেভাবেই মেরেছি।

প্রিন্সিপাল বিরক্ত হয়ে বলেন,
— আপনি বাচ্চাদের মতো কথা বলছেন!

আলভী জহির স্যারের দিকে তাকিয়ে বলেন,
— স্যার যেমন, কুকুর তেমন মুগুর! ও যেমন, ওর সঙ্গে তেমনই হওয়া উচিত।

প্রিন্সিপাল স্যার বুঝলেন এখন আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তাই গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,
— যা হওয়ার হয়েছে। আগামীতে যেন কোনো টিচার আর স্টুডেন্টের গায়ে হাত না তোলেন। এবং কোনো টিচারে টিচারে যেন ঝামেলা না হয়। আলভী, আপনি এখন যেতে পারেন।

আলভী জহির স্যারের দিকে আগুনের মতো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তারপর প্রিন্সিপালের রুম থেকে বেরিয়ে সোজা চলে আসে টিচার্স রুমে। চেয়ারে বসে চোখ বন্ধ করতেই আবার ভেসে উঠে নৌশির মুখটা। হ্যাঁ, সেই কান্না চেপে রাখা মুখটা! কেমন বাচ্চাদের মতো চোখের পানি আটকে রাখার চেষ্টা করছিল মেয়েটা! আলভী ফট করে চোখ খুলে ফেলে। নৌশিকে যতবার দেখেছে, দুষ্টুমি করতে দেখেছে। কিন্তু আজ মেয়েটার নীরব, কান্নাভেজা মুখ তাকে অস্থির করে তুলেছে। ইচ্ছে করছে, জহির স্যারকে মেরে ফেলতে। কিন্তু হঠাৎই থমকে যায় আলভী।

সে এত রেগে যাচ্ছে কেন? নৌশিকে থাপ্পড় মেরেছে বলে তার এত কষ্ট হচ্ছে কেন? অন্য কোনো স্টুডেন্টের সাথে এমন হলে কি আলভী এভাবেই রেগে যেতো? নিজের কলিগের গায়ে হাত তুলতো? নিজের মন থেকেই উত্তর এল, না! তাহলে নৌশির বেলায় এমন হলো কেন? জহির স্যারের সাথে তো তার কোনো শত্রুতাও নেই। অথচ জহির স্যার নৌশিকে থাপ্পড় মেরেছে শুনেই আলভী রাগে ফেটে পড়েছে। কেন? কেন সে নৌশির চোখের সেই কষ্ট সহ্য করতে পারেনি? অথচ সে নৌশিকে পছন্দ করে না।

বরং নৌশিকে অপছন্দ করে। তাহলে আজ নৌশির সামান্য কষ্টে তার ভেতরটা এভাবে তোলপাড় হচ্ছে কেন? প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আলভী আরো অস্থির হয়ে উঠে।

------

প্রতিদিনের তুলনায় আজ অনেক আগেই বাড়ি ফিরেছে রুদ্রিক। রাত নয়টা বাজতেই হাসপাতালে বাকি পেশেন্টদের দেখা বন্ধ করে এবং সার্জারি ফেলে চলে এসেছে। মাথাটা ভীষণ ধরেছে, তাই আর নিজের ওপর চাপ নেয়নি। রুমের দরজা খুলে ভেতরে তাকাতেই রুদ্রিক অবাক হয়। প্রতিদিনের অশান্ত ঝড়ের মতো অগোছালো রুমটা আজ শান্ত ও পরিষ্কার। মেঝেতে কোথাও চিপস কিংবা চকলেটের প্যাকেট ছড়িয়ে নেই। অথচ প্রতিদিন হাসপাতাল থেকে ফিরে এই দৃশ্যই দেখতে হতো তাকে।কিন্তু আজ রুম একদম পরিষ্কার।

রুদ্রিক রুমে চোখ বুলিয়ে দেখে, নৌশি নেই! রুদ্রিক ভেতরে এসে ওয়াশরুমে উঁকি দেয়। না সেখানেও নেই। ভাবে হয়তো বেলকনিতে আছে। পরনের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতেই বেলকনির দিকে এগিয়ে যায়। বেলকনির চৌকাঠে পৌঁছে রুদ্রিক থেমে যায়। নৌশি দোলনায় বসে আছে। হাত-পা গুটিয়ে একদম জড়সড় হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। রুদ্রিক জীবনে এই প্রথম নৌশিকে এতটা নীরব আর শান্ত দেখে। আর নৌশির এই নীরবতার পেছনে যে মন খারাপ লুকিয়ে আছে, সেটা বুঝতে রুদ্রিকের একটুও সময় লাগে না।

যে মেয়ে সারাক্ষণ দুষ্টুমিতে মেতে থাকে, তার এভাবে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকাটা মোটেও স্বাভাবিক না। কিন্তু মন খারাপের কারণ কি? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই রুদ্রিকের প্রথমেই মনে পড়ে নৌশির বাবা-মায়ের কথা। নৌশি বহুদিন ধরে তাদের কাছ থেকে দূরে আছে। হয়তো আজ বাবা মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। তাই এভাবে চুপ হয়ে গেছে। বাবা মায়ের জন্য মন খারাপ এটা ভেবে আর রুদ্রিক সে বিষয়ে বেশি মাথা ঘামায় না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুদ্রিক সেখান থেকে চলে আসে।

রুমে ফিরে সাইড টেবিলের দিকে তাকাতেই রুদ্রিকের ভ্রু কুঁচকে যায়। সেখানে খাবার রাখা। ভাতের প্লেট, তরকারি, সবকিছু ঢেকে রাখা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, দুপুরের খাবার! রুদ্রিক অবাক হয়! নৌশি দুপুরে খায়নি? এতক্ষণ ধরে না খেয়ে আছে? মাথার যন্ত্রণা ভুলে রুদ্রিক আবার বেলকনির দিকে এগিয়ে যায়। বেলকনির চৌকাঠে দাঁড়িয়ে নরম স্বরে ডাক দেয়,
— নৌশি?

নৌশি তাকায় রুদ্রিকের দিকে। তবে কিছু বলে না। শান্ত দৃষ্টিতে শুধু রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে থাকে। নৌশির এই চুপ থাকা মোটেও শান্ত থাকতে দিচ্ছে না রুদ্রিককে। নৌশির এমন চুপচাপ থাকায় রুদ্রিকের ভেতরটা খচখচ করছে। যে মেয়ে সারাক্ষণ দুষ্টুমি আর ঝগড়ায় মেতে থাকে, সেই মেয়ের এমন নির্লিপ্ত আচরণ রুদ্রিকের মন মানতেই নারাজ। কিছুক্ষণ নৌশির দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,
— এখানে কী করছো?

নৌশি দৃষ্টি সরিয়ে আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বলে,
— এমনিই বসে আছি।

রুদ্রিক এবার দুকদম এগিয়ে এসে বেলকনির ভেতরে পা রাখে। তারপর জিজ্ঞেস করে,
— দুপুরে খাওনি?

নৌশি আকাশের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই উত্তর দেয়,
— ইচ্ছা হয়নি।

রুদ্রিকের কপালে ভাঁজ পড়ে। মেয়েটা এমন করছে কেন? কেন এভাবে চুপ থেকে তার অস্থিরতা বাড়াচ্ছে? তার যে মনে শান্তি লাগছে না নৌশিকে এমন শান্ত দেখে। রুদ্রিক কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ প্রশ্ন করে বসে,
— তুমি এমন চুপ কেন?

প্রশ্ন শুনে নৌশি রুদ্রিকের দিকে তাকায়। নৌশির চোখেমুখে সামান্য বিস্ময়, রুদ্রিক এমন প্রশ্ন করায়। এদিকে প্রশ্নটা করে সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে রুদ্রিক নিজেও। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত বলে উঠে,
— মানে, আজকে তোমার চুপ থাকায় বাসায় অনেক শান্তি। বিয়ের এত দিন পর বাসায় একটু শান্তি পেলাম।

রুদ্রিক ভেবেছিল, কথাটা শুনে নৌশি রেগে যাবে। আগের মতো ঝগড়া শুরু করবে, মুখ বাঁকিয়ে তাকে নানাভাবে ভেঙাবে। কিন্তু নৌশি সেসবের কিছুই করে না। শুধু শান্ত গলায় বলে,
— ভালো তো। এত দিন পর শান্তি পেয়েছেন।

কথাটা বলেই নৌশি আবার আকাশের দিকে তাকায়। ব্যস! আর কোনো কিছুই বলে না। রুদ্রিক কিছুক্ষণের জন্য আবারও চুপ হয়ে যায়। সে এমনটা আশা করেনি! যেখানে নৌশিকে একটু খোঁচা দিলেই, কমপক্ষে দশটা কথা শুনায়, সেখানে আজ এত বড় কথা বলার পরও কোনো রাগ নেই, কোনো ঝগড়া নেই! মেয়েটার হয়েছে কী? রুদ্রিক কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ভাবতে থাকে, কী বললে কিংবা কী করলে নৌশি আবার রেগে যাবে? ঝগড়া করবে? আগের মতো হয়ে উঠবে? অনেক ভেবেচিন্তে কিছু একটা ভেবে নৌশির সামনে দাঁড়ায়। তারপর বলে,
— উঠো এবার দোলনা থেকে, আমি বসব। হাসপাতাল থেকে এসেছি। একটু ফ্রেশ হাওয়া দরকার।

কিন্তু এবারো রুদ্রিকের সমস্ত ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়।নৌশি বিনা বাক্যে দোলনা থেকে উঠে দাঁড়ায়। তারপর কোনো কথা না বলেই সোজা রুমে চলে যায়। রুদ্রিক পুরোপুরি অবাক! অন্য সময় হলে দোলনা ছেড়ে ওঠার কথা বলতেই উল্টো ঝগড়া শুরু করে দিতো নৌশি। মুখ বিকৃত করে তাকে ভেঙাতো, নানা রকম কথা শুনাতো। অথচ আজ একবারও আপত্তি অবধি করলো না! রুদ্রিক কিছুক্ষণ দোলনার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর রুমে ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই হঠাৎ দোলনায় পড়ে থাকা নৌশির ফোনটা বেজে উঠে। রুদ্রিক থেমে যায়। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে, সাবা কল করেছে।

মুহূর্তেই রুদ্রিকের মনে একটু স্বস্তি আসে। মনে মনে ভাবে, যাক, বান্ধবী ফোন করেছে। এবার হয়তো নৌশির মনটা ভালো হবে। কিন্তু ফোনটা হাতে নিতেই কল কেটে যায়। আর তখনি স্ক্রিনে ভেসে উঠে কিছুক্ষণ আগে পাঠানো সাবার মেসেজ।
— দোস্ত, তুই কিন্তু উল্টাপাল্টা কিছু করবি না। আজকে কলেজে যা হয়েছে......

ব্যস, এটুকুই দেখা যায়। নৌশির ফোন লক থাকায় বাকি মেসেজ পড়তে পারে না। রুদ্রিকের ভ্রু কুঁচকে যায়।কলেজে কী হয়েছে? আর সাবাই বা নৌশিকে উল্টাপাল্টা কিছু করতে নিষেধ করছে কেন? তাহলে কি নৌশির মন খারাপ বাবা-মায়ের জন্য না? কলেজে কিছু হয়েছে? সন্দেহটা মাথায় আসতেই রুদ্রিক ফোনে পাসওয়ার্ড টৃরাই করে লক খোলার চেষ্টা করে। একবার, দুইবার কিন্তু লক খুলে না। তখনি আবার সাবার কল আসে। এবার আর দেরি করে না রুদ্রিক। সাথে সাথে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সাবা উদ্বিগ্ন কণ্ঠ বলে উঠে,
— দোস্ত, তুই ফোন ধরছিস না কেন? আমার টেনশন হচ্ছিল! তুই ঠিক আছিস?

সাবাকে এমন উদ্বিগ্ন দেখে রুদ্রিকের সন্দেহ আরো গাঢ় হয়। সরাসরি প্রশ্ন করে,
— কী হয়েছে আজকে কলেজে?

মুহূর্তেই সাবা চুপ হয়ে যায়। তারপর বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠে,
— রুদ্রিক চাচ্চু?

চাচ্চু সম্বোধনটা শুনে সামান্য বিরক্ত হয় রুদ্রিক। বান্ধবীর জামাইকে কেউ চাচ্চু ডাকে নাকি! পরক্ষণেই আবার মনে হলো, কার বান্ধবী সেটা তো দেখতে হবে! তবে এসব নিয়ে আর মাথা ঘামায় না রুদ্রিক। গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠে,
— হ্যাঁ, আমিই। আজকে কলেজে কী হয়েছে? নৌশি এমন চুপচাপ কেন?

সাবা এবার দ্বিধায় পড়ে যায়। কী বলবে আর কী বলবে না এটা ভেবেই চুপ করে থাকে। এবার রুদ্রিক আরেকটু কঠিন স্বরে করে,
— আমি কিছু জানতে চেয়েছি।

সাবা আর কথা লুকাতে পারে না। দ্বিধা নিয়ে বলে,
— আজকে কলেজে নৌশিকে আমাদের ইকোনমিক স্যার থাপ্পড় মেরেছে।

রুদ্রিক অবিশ্বাস্যের স্বরে বেশ জোরেই বলে উঠে,
— কী!

সাবা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কলেজে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাটা খুলে বলে। কথা শুনতে শুনতে রুদ্রিকের চেহারার রঙ বদলে যায়। অবাক হয়ে থাকা চোখমুখ এবার শক্ত হয়ে উঠে। চোয়াল শক্ত করে রুদ্রিক সবটা শুনে, কিন্তু একটা শব্দও বলে না। সাবার কথা শেষ করতেই কোনো উত্তর না দিয়ে কল কেটে দেয় রুদ্রিক। তাহলে এঔ কারণেই নৌশির মন খারাপ। আর রুদ্রিক এতক্ষণ ভাবছিলো, নৌশির হয়তো বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ছে!

সাবার মুখে পুরো ঘটনা শোনার পর রুদ্রিকের মেজাজ এমন গরম হয়ে যায় যে, রুদ্রিকের মনে হয় এই মুহূর্তে মাথায় ঠান্ডা পানি ঢালা দরকার। নইলে নিজের রাগ সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে। রুমে ফিরে দেখে, নৌশি বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে মুখ ঢেকে। রুদ্রিক নৌশির কাছে না গিয়ে কাভার্ডের কাছে গিয়ে খুলে কাপড় বের করে, তারপর সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। আগে নিজেকে শান্ত করা দরকার। নিজের মাথা গরম হয়ে থাকলে নৌশির মন খারাপ কীভাবে দূর করবে?

অনেকক্ষণ ধরে গোসল করে মাথা ঠান্ডা করে বেরিয়ে আসে রুদ্রিক। বেরিয়েও দেখো, নৌশি আগের মতোই কম্বলের নিচে মুখ ঢেকে শুয়ে আছে। এবার রুদ্রিকের মাথায় নৌশিকে জ্বালানোর দুষ্টুমি খেলে যায়। নিজের দুই হাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে রুদ্রিক। তারপর নৌশির কাছে এগিয়ে গিয়ে ফট করে কম্বল সরিয়ে দিয়ে মুহূর্তেই নিজের বরফশীতল দুই হাত নৌশির দুই গালে চেপে ধরে।ঠান্ডা হাতের স্পর্শে কেঁপে উঠে চমকে বিছানায় বসে পড়ে নৌশি। বলে উঠে,
— আল্লাহ! কী ঠান্ডা হাত! ঠান্ডা হাত কেন লাগাচ্ছেন?

রুদ্রিক হেসে বলে,
— হাতগুলো ঠান্ডা হয়ে আছে অনেক। হিটার ছেড়ে হাত গরম করলে বিল উঠবে, টাকা খরচ হবে। তাই ভাবলাম, প্রতিশোধের বউয়ের গরম গালে হাত রেখে হাতটা গরম করি।

নৌশি বিরক্ত হয়ে বলে,
— জ্বালাবেন না তো!

বলেই বিছানা থেকে উঠতে নেয় নৌশি কিন্তু রুদ্রিক নৌশির হাত ধরে ফেলে। তারপর টান দিয়ে নৌশিকে বিছানায় ফেলে দুই হাত বালিশের ওপর চেপে ধরে নৌশির দিকে ঝুঁকে হাসে।
— তোমাকে তো আমি এখানে জ্বালাতেই এনেছি। ভুলে গেছো, সুইটহার্ট?

নৌশি ভ্রু কুঁচকে সরু চোখে তাকায়।
— আপনি আমাকে টর্চার করতে আসছেন? আমি কিন্তু আমার ফর্মে আসলে খবর করে ফেলব, শয়তান দামড়া ব্যাটা!

রুদ্রিক হেসে বলে,
— তাই নাকি, অশান্তির মা?

— অশান্তির মা কে?

— যে আমার রুম আর লাইফ শান্ত থাকতে দেয় না।

নৌশি বিরক্তি নিয়ে বলে,
— এখন আমি কী করছি? এখন তো আমি চুপই।

রুদ্রিক হেসে বলে,
— এটাই তো! মনে মনে শয়তানি পাকাচ্ছো না তো? তোমাকে তো বিশ্বাস নেই।

নৌশি ভেংচি কেটে বলে,
— রাগাবেন না আমাকে। খবর করে ফেলব আপনার!

— কেন? তুমি কি জার্নালিস্ট? খবর করে ফেলবে?

— যান তো আমার কাছ থেকে!

রুদ্রিক এবার নৌশির ওপর থেকে সরে উঠে বসে পড়ে। তারপর নৌশির হাত ধরে টান মেরে নৌশিকে বসিয়ে দিয়ে বলে,
— যাব, বাট তোমাকে নিয়ে শপিংয়ে।

— আমি যাবো না।

রুদ্রিক বিছানা থেকে নেমে নৌশির হাত ধরে টান দেয়।
— যেতে হবে।

নৌশি বিছানার চাদর শক্ত করে ধরে বসে বলে,
— না বলছি তো!

— আমি কিন্তু জোরে টান দিবো। ব্যথা পাবে।

— দিলে দিন কিন্তু যাব না।

এবার রুদ্রিক একটু আদুরে ভঙ্গিতে নৌশির হাত ধরে টান দিয়ে বলে,
— চল, অশান্তির মা। চকলেট কিনে দিবো।

নৌশি ভার করে বলে,
— লাগবে না।

— সস্তা কিটক্যাট না, ভালো চকলেট কিনে দিবো।

কিটক্যাটকে সস্তা বলায় নৌশির সামান্য রাগ হয়। বলে,
— এই! আপনি কিটক্যাটকে সস্তা বললেন কেন?

রুদ্রিক হাসি চেপে বলে,
— শপিংয়ে চল। ওখানে গেলেই দেখবে কেন সস্তা বলছি।

— যাব না বললাম তো!

— তাহলে কিন্তু এভাবেই টেনে নিয়ে যাব।

নৌশি এবার বিরক্ত হয়ে বিছানা থেকে নামতে নামতে বলে,
— অসহ্য লাগছে আজকে আপনার জ্বালানি!

রুদ্রিক ঠোঁট চেপে হাসি আটকে বলে,
— আর তুমি যখন আমাকে প্রতিদিন জ্বালাও?

নৌশি আলমারির কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। রুদ্রিকের কথা শুনে রুদ্রিকের দিকে ফিরে জিহ্বা বের করে ভেংচি কাটে।
— হাজারবার জ্বালাব! এটা আমার বউগত অধিকার! হুহ্!

বলেই নৌশি ওয়াশরুমে চলে যায় চেঞ্জ করতে। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে আসে। পরনে কালো ফতোয়া টাইপ টপস আর বাদামি স্কার্ট। আয়নার সামনে গিয়ে টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট একজোড়া ঝুমকা হাতে নেয়। এগুলো তার আব্বুর কিনে দেওয়া। মেলা থেকে নিজে পছন্দ করে কিনে এনেছিলো তার আব্বু। শুধু ঝুমকাই না, একমুঠো চুড়িও আছে। চুড়িগুলো কলেজের ব্যাগে রাখা। নৌশি কানের দুল পড়ে কলেজ ব্যাগ থেকে কালো রেশমি চুড়িগুলো বের করে। তারপর হাতে চুড়িগুলো পরতে থাকে। দরজায় হেলান দিয়ে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছে রুদ্রিক। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটিয়ে বলে,
— এতক্ষণ যেতে চাচ্ছিলে না। আর এখন সাজগোজই শেষ হচ্ছে না!

নৌশি হাতে চুড়ি পরতে পরতেই রুদ্রিকের দিকে ফিরে তাকায়। তারপর জিহ্বা বের করে ভেংচি কেটে বলে,
— আপনার জিনিসে সাজছি? নিজের জিনিসে সাজছি! কিছু তো কিনে দেননি! হুহ্!

রুদ্রিক মুচকি হেসে বলে,
— কিনে দিতেই তো নিয়ে যাচ্ছি। এখন চল?

নৌশি বিছানা থেকে স্কার্ফটা তুলে গলায় পেঁচিয়ে রুদ্রিকের সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর জিজ্ঞেস করে,
— কেমন লাগছে দেখতে?

যদিও নৌশিকে দেখতে ভীষণ সুন্দর লাগছে তবুও নৌশিকে রাগাতে রুদ্রিক ঠোঁট উল্টে বলে,
— মানানসই!

নৌশি ভাব নিয়ে বলে,
— মানানসই শব্দটা আপনার সাথে যায়। নৌশিকে সবসময় নজরকাড়া লাগে, মি.কালোয়া।

রুদ্রিক কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,
— আমি সাদা, কালো না, অশান্তির মা।

— কিন্তু আমার কাছে কালোয়াই লাগে আপনাকে মি. কালোয়া।

রুদ্রিক একটা শ্বাস ফেলে বলে,
— আচ্ছা চল।)

রুদ্রিক আগে থেকেই রেডি ছিলো। নৌশিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ঘণ্টাখানেক পর দুজন পৌঁছায় শপিংমলে। গাড়ি থেকে নেমে রুদ্রিক নৌশির পাশের দরজা খুলে নৌশিকে নামতে হেল্প করে। তারপর সামনে পা বাড়িয়ে হাঁটা ধরে বলে,
— চল।

কিন্তু কিছুদূর এগিয়ে নৌশিকে পাশে না দেখে পেছনে ফিরে তাকায় রুদ্রিক। দেখে, নৌশি মুখ ভার করে আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে।

রুদ্রিক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কী হলো? আসো!

নৌশি ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,
— না। আপনি এসে আমাকে নিয়ে যান।

রুদ্রিক কয়েক সেকেন্ড নৌশিকে দেখে তারপর বিরবির করে বলে,
— ঘাড়ত্যাড়া একটা!

বলেই আবার নৌশির কাছে ফিরে গিয়ে বলে,
— চল?

— না।

— আসলাম তো নিতে।

নৌশি এবার কিছু না বলে বাম হাতটা ওপরে তুলে হাত নেড়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। নৌশির কান্ড দেখে রুদ্রিক বুঝে, মহারানি সরাসরি হাত ধরে নিয়ে যেতে বলছেন! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুদ্রিক নৌশির হাত ধরে হাঁটতে শুরু করে। যেতে যেতে বলে,
— বললেই হয়, আমি বাচ্চা মানুষ, হারিয়ে যাবো। হাত ধরে নিয়ে যান!

নৌশি সাথে সাথে বলে,
— হাত ধরে নিয়ে যাওয়াকে কেয়ার বলে। আর আপনি কেয়ারলেস মানুষ, মি.কালোয়া।

রুদ্রিক আর কিছু বলে না। নৌশিকে নিয়ে শপিংমলে ঢুকে পড়ে। প্রথমেই কাপড়ের দোকানে ঢুকে। নৌশির জন্য বেশ কয়েকটা ভারী ও সুন্দর ড্রেস কিনে। সবগুলোই রুদ্রিকের পছন্দ করা। নৌশি শুধু শান্ত হয়ে চুপচাপ দাড়িয়ে। রুদ্রিক বার বার পছন্দ করতে বললেও নৌশিকে পছন্দ করতে না দেখে পরে নিজেই পছন্দ করে নেয়। কাপড় কেনা শেষে দুজন কাপড়ের দোকান থেকে বেরিয়ে জুয়েলারি শপের দিকে এগোয়। রুদ্রিক নৌশির হাত ধরে হাঁটছে হঠাৎ নৌশি থেমে যায়। রুদ্রিক পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে, নৌশি কাচের ওপাশে রাখা একটা পান্ডার কস্টিউমের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।

রুদ্রিক শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,
— পছন্দ হয়েছে?

এতক্ষণ চুপচাপ থাকা নৌশির ঠোঁটে এবার মিষ্টি একটা হাসি ফুটে উঠে। সেই হাসিই বলে দেয়, হ্যাঁ! রুদ্রিকও বিপরীতে হেসে বলে,
— আচ্ছা, চল ভেতরে।

দুজন দোকানে ঢুকতেই নৌশির চোখ চকচক করে উঠে। চারদিকে পান্ডা, ভুত সহ বিভিন্ন প্রাণীর কস্টিউম সাজানো। এত রকমের কস্টিউম দেখে নৌশির আনন্দের সীমা থাকে না। রুদ্রিক দোকানের স্টাফকে পান্ডার কস্টিউমটা প্যাক করে দিতে বলছিল তখনি রুদ্রিকের শার্টে টান পড়ে। রুদ্রিক ফিরে তাকিয়ে দেখে, নৌশি শার্ট ধরে টানছে।

রুদ্রিক ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করে,
— কী?

নৌশি আরেকটা পান্ডার কস্টিউম দেখিয়ে মিনমিনে স্বরে বলে,
— ওটাও নিবো।

রুদ্রিক কস্টিউমটার দিকে তাকিয়ে তারপর হালকা হাসি দিয়ে স্বরে নৌশিকে বলে,
— আচ্ছা।

তারপর স্টাফকে বলে,
— ওটাও প্যাক করেন।

নৌশি ভেবেছিল, রুদ্রিক কিছুতেই রাজি হবে না। কারণ, প্রতিটা কস্টিউমের দামই পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা! কিন্তু রুদ্রিককে অনায়াসে রাজি হতে দেখে নৌশির আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যায়। মুখে ফুটে উঠে খুশির ঝলমলে হাসি।স্টাফ কস্টিউমগুলো প্যাক করে দিলে রুদ্রিক বিল পে করে ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে আসে দুজন। নৌশি খুশিমনে রুদ্রিকের হাত ধরে হাঁটতে থাকে। কলেজের অপমান, থাপ্পড় আর এতক্ষণ ধরে বুকের মধ্যে জমে থাকা মন খারাপ, সব মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায়। পান্ডার কস্টিউম দেখেই নৌশির মন ভালো হয়ে গেছে।

রুদ্রিক নৌশিকে নিয়ে জুয়েলারি শপের দিকে এগোচ্ছিল তখনি পেছন থেকে ভেসে এল একটা পরিচিত কণ্ঠ,
— ভাইয়া?

রুদ্রিকের পা জোড়া মুহূর্তেই থেমে যায়। থেমে যায় নৌশিও। নৌশি ঘুরে পেছনে তাকায়। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে রুমাইরা। তার পাশেই নুহান। রুদ্রিক চোখে বিস্ময় নিয়ে ধীরে ধীরে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় সেদিকে। রুমাইরা রুদ্রিককে দেখামাত্র ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে,
— ভাইয়া, কেমন আছো? কতদিন পর তোমাকে দেখেছি! কতদিন ধরে তোমাদের...

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রুদ্রিক ঝটকা দিয়ে রুমাইরাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দেয়। রুদ্রিকের চোখমুখ শক্ত হয়ে আছে। রাগে কপালের রগ ফুলে উঠেছে ইতোমধ্যে। চোখেমুখে জমে উঠেছে তীব্র ঘৃণা আর ক্ষোভ। চোয়াল শক্ত করে সংযত কন্ঠে বলে,
— কেন এসেছিস আমার সামনে? আমার শর্ত মানিসনি, তাই আজীবনের জন্য তুই আমাদের কাছ থেকে মৃত। জানিস না এটা? তারপরও আমার কাছে আসার সাহস করলি কীভাবে?

রুদ্রিকের কথায় চারপাশের মুহূর্ত থমকে যায়। আর নৌশি বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকে রুদ্রিকের দিকে। রুমাইরা কাঁদতে কাঁদতে আবারো এগিয়ে আসতে চাইল। কাঁপা গলায় বলে,
— ভাইয়া, ভুল করেছি, মানছি। আমাকে ক্ষমা করে দাও না। তোমরা তো আমাকে অনেক ভালোবাসো!

রুদ্রিক রুমাইরাকে শুধরে দিয়ে জোর গলায় বলে,
— বাসতাম! যখন তুই আমাদের বাড়ির সম্মান পায়ে পিষে চলে গেছিস, একবারও ভাবিসনি সমাজে আমাদের কী সম্মান থাকবে! সেই দিন থেকেই তোকে আমরা ঘৃণা করি। তুই মরে গেলেও তোর মুখ দেখতে চাইবো না আমরা।

রুমাইরা স্তব্ধ হয়ে যায়। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা, তার ভাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতো। নয়নের মনি ছিলো অথচ সেই ভাইয়ের চোখেই নাকি তার লাশ টুকুরও জায়গা নেই?! রুমাইরার কান্না দেখে নৌশির চোখেও জল এসে জমে। দূরে তার চাচ্চু দাঁড়িয়ে আছে। অথচ চাইলেও সে ছুটে গিয়ে চাচ্চুকে জড়িয়ে ধরতে পারছে না। নিজের চাচ্চুকে চোখের সামনে দেখেও কাছে যেতে না পারার কষ্টে নৌশির বুকটাও দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে, সব বাধা উপেক্ষা করে ছুটে যেতে নুহানের কাছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে রুদ্রিকের সেই হুমকির কথা।

রুমাইরা নিজেকে সামলে, কান্নাভেজা গলায় হাত জোড় করে আবারো
— একটাবার শুনো আমার কথা? এবারের ভুলটা ক্ষমা করে দাও না। আমি কত দিন তোমাদের ভালোবাসা পাই না.......

রুদ্রিক আঙুল তুলে রুমাইরাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
— পাবিও না।

তারপর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নুহানের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
— যার ভালোবাসার জন্য আমাদের ছেড়ে গেছিলি, তার ভালোবাসাই রাখ। আর ফারদার রাস্তায় সিনক্রিয়েট করবি না। তোর হয়তো থার্ডক্লাস শ্বশুরবাড়িতে মানসম্মান নেই, তাই রাস্তায় ছোটলোকদের মতো এসব করছিস। বাট আমার সম্মান আছে। রুদ্রিক রওনক মির্জা রাস্তায় এসব ছোটলোকি করে না।

এতক্ষণ দ্বিধা দ্বন্দ্বের সাথে লড়াই করে অবশেষে মনকে শক্ত করেছিলো নৌশি নুহানের কাছে যাওয়ার কিন্তু তার আগেই রুদ্রিক প্রচন্ড শক্ত হাতে নৌশির হাত চেপে ধরে। তারপর প্রায় টান দিয়ে নৌশিকে সেখান থেকে নিয়ে যেতে থাকে। নৌশি পেছন ফিরে বারবার তার চাচুর দিকে তাকাচ্ছিল। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নুহানের বুকটাও কষ্টে জর্জরিত। ইচ্ছে করছে, ছুটে গিয়ে রুদ্রিকের হাত থেকে নিজের ভাতিজিকে ছিনিয়ে নিয়ে আসতে। কিন্তু চাইলেও কিছু করার উপায় নেই।

রুদ্রিক নৌশিকে নিয়ে চলে যেতেই রুমাইরা কান্নায় ভেঙে পড়ে। শপিংমলের লোকজনও থেমে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ ধরে চলা ঘটনাগুলো দেখছিল। নুহান এগিয়ে এসে রুমাইরার কাঁধে হাত রেখে শান্ত করার চেষ্টা করে,
— নিজেকে সামলাও, রুমু।

রুমাইরা অশ্রুসিক্ত চোখে নুহানের দিকে তাকায়,
— ভালোবাসা অন্যায়? পাপ?

নুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
— আমার মতো টাকা-পয়সাহীন মানুষকে ভালোবাসা অন্যায়।

রুমাইরা অসহায় স্বরে বলে,
— টাকা-পয়সা দেখে যদি ভালোবাসি, তাহলে আর আমি মানুষটাকে ভালোবাসলাম কোথায়? টাকাকেই তো ভালোবাসলাম!

— আচ্ছা, শান্ত হও।

কিন্তু রুমাইরার বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট কি এত সহজে শান্ত হওয়ার? কেঁদে উঠে,
— ভাইয়া বলে গেছে, আমি মরলে আমার মরা মুখটাও নাকি দেখবে না। আমি তাদের এত পর হয়ে গেছি, নুহান?

নুহান একটা শ্বাস ফেলে বলে,
— রেগে আছে। তাজা ক্ষত। ক্ষত সারুক, টেনে নেবে আবার তোমাকে!

রুমাইরা বিস্ময় চোখে তাকিয়ে বলে,
— আমার তো মনে হয় না এমন হবে। আমি আজীবনের জন্য আমার পরিবারের কাছে মৃত।

এবার নুহানও আর কিছু বলতে পারে না। কারণ সে নিজেও জানে, কথাগুলো কেবল সান্ত্বনা। মিথ্যে সান্ত্বনা ছাড়া এই মুহূর্তে রুমাইরাকে দেওয়ার মতো আর কিছুই তার কাছে নেই।

রুদ্রিক রাগে থরথর করে কাঁপছে। নৌশিকে গাড়ির কাছে এনে দরজা খুলে প্রায় ধাক্কা দিয়েই ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। হঠাৎ ধাক্কায় নৌশি সামনের দিকে হেলে পড়ে স্টিয়ারিংয়ে আঘাত পায়। মুহূর্তেই তার হাতের চুড়িগুলো ঝনঝন শব্দে ভেঙে গাড়ির ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। নিজের বাবার দেওয়া চুড়িগুলো এভাবে ভেঙে যেতে দেখে নৌশি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। তারপর রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে,
— আপনি আমার আব্বুর চুড়িগুলো ভেঙে দিলেন? এগুলো আমার আব্বু মেলা থেকে দিয়েছিল! পরিবারের সাথে যোগাযোগ তো বন্ধ করে দিলেনই, এখন এই চুড়িগুলোও! আপনি আমাকে আর কত কষ্ট দিবেন?! এভাবে তিলে তিলে না মেরে একেবারে মেরে ফেলুন না। আপনি আসলেই অনেক খারাপ।

এতক্ষণ রাগে ফুঁসতে থাকা রুদ্রিক এবার থমকে যায়। নৌশির ভাঙা চুড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে, রাগের মাথায় ধাক্কা দেওয়ার সময় সে খেয়ালই করেনি নৌশি আঘাত পাবে, চুড়িগুলোও ভেঙে যাবে। ইচ্ছে করে সে এমনটা করেনি। কিন্তু তার বিস্ময়ের শেষ রইল না, যখন জানতে পারে, চুড়িগুলো নৌশির বাবা দিয়েছে। সামান্য কয়েকটা চুড়ি, দাম বড়জোর ৬০ টাকা। অথচ নৌশির কাছে সেগুলো অমূল্য রত্ন। হবে নাই বা কেন? বাবার ভালোবাসার স্মৃতি! আর সেই স্মৃতিগুলোই নৌশির চোখের সামনে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে! নৌশি কেঁদেই চলেছে। আর রুদ্রিক থমকে দাঁড়িয়ে অপরাধবোধে।

চলবে?

#তবুও_তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি
#লেখনীতে:_অধরা_মিনহা
#পর্ব_১৫

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 17 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন