কলেজের যে প্রফেসর নৌশিকে দুচোখে সহ্য করতে পারে না, নৌশিকে দেখলেই দাঁত কিড়মিড় করে, সেই প্রফেসর আলভীই কিনা আজ ভরা ক্যাম্পাসে হাজার হাজার স্টুডেন্টের সামনে গিটার হাতে দাঁড়িয়ে একমাত্র নৌশির জন্য গান গাইছে! শুনতে অবিশ্বাস্য কিংবা হাস্যকর মনে হলেও আজ ঠিক এমনটাই ঘটেছে।
কলেজে এসে নৌশি আজ একটুও দুষ্টুমি করেনি। গতপরশু ভরা ক্লাসে তাকে থাপ্পড় মারার ঘটনাটা এখনো ভুলতে পারেনি নৌশি। তাই আজ ক্লাসে তার সর্বক্ষণের চিরচেনা চঞ্চলতাটাও নেই। সাবা অনেক চেষ্টা করেও নৌশিকে আগের মতো দুষ্টুমি করাতে পারেনি। এমন না যে নৌশি মুখ ভার করে বসে আছে। নৌশি হাসছে, কথা শুনছে। সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে করছে। শুধু সেই হাসিতে নেই আগের মতো প্রাণের ছোঁয়া। এভাবেই নৌশি তিনটা ক্লাস করে। এরপর এলো আলভীর ক্লাস।
ক্লাসে ঢুকেই নৌশিকে এমন শান্ত দেখে আলভীর মনের খচখচানিটা আরো বেড়ে যায়। এমনিতেই নৌশির টলমলে চোখ দেখে পুরো দু'দিন শান্তি পায়নি। যে মেয়ের মুখে সারাক্ষণ কথার খই ফুটতো যার দুষ্টুমি আর চঞ্চলতায় পুরো ক্লাস সরগরম থাকতো সেই মেয়েই এখন কেমন চুপ! ক্লাসে বসে নৌশি একবারের জন্যও দুষ্টুমি করে না। কোনো কথাও বলে না। পুরো মনোযোগ পড়ায় দেয়। অন্যদিন যেখানে আলভীর ক্লাসে নৌশির চঞ্চলতা চোখে পড়ার মতো আজ সেখানে নৌশির নীরবতা পুরোপুরি স্পষ্ট।
আলভীর সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি হচ্ছে নৌশি একবারো তার দিকে তাকাচ্ছে না! চোখ তুলে একবার দেখার প্রয়োজন বোধও করছে না মেয়েটা। কিন্তু কেন? নৌশি কেন তার দিকে তাকাচ্ছে না? হাসছে না? সে তো কিছু করেনি! তাহলে নৌশি কেন তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে? এসব প্রশ্নই বারবার আলভীর মনের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। কোনো রকমে অস্থির মন নিয়েই ক্লাস শেষ করে আলভী। ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেলেও মনটা ভেতরেই পড়ে আছে নৌশির কাছে। আলভী দরজার পাশের জানালায় দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে আবারো তাকায় নৌশির দিকে।
দেখে, সাবা একাই কথা বলে যাচ্ছে আর নৌশি চুপচাপ বসে সেসব শুনছে। আলভী কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নৌশির দিকে। আজ প্রথমবারের মতো আলভী উপলব্ধি করলো, নৌশির আসল সৌন্দর্য তার চেহারায় না বরং চঞ্চলতায়, দুষ্টুমিতে। নৌশিকে সবার থেকে আলাদা করে তার এই প্রাণবন্ত স্বভাব। শুধু তাই না, নৌশির মধ্যে এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে, যা দিয়ে সে চাইলে চারপাশের পুরো পরিবেশ বিষাদে ভরিয়ে দিতে পারে। এই যে নৌশি আজ এতটা শান্ত, চুপ, তাতেই আলভীর কাছে মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবী থমকে গেছে। চারপাশে বিষণ্নতা ছেয়ে আছে।
কেন এমন লাগছে, আলভী নিজেও জানে না। গত দু'দিন ধরে কেবল এই একটা বিষয় নিয়েই ভেবেছে আলভী। কিন্তু কোনো উত্তর খুঁজে পায়নি। কেন নৌশির জন্য তার এত অস্থিরতা? কেন মেয়েটার একটু হাসির জন্য তার মন ছটফট করছে? যত বেশি ভেবেছে, অশান্তি ততই বেড়েছে। আলভী শুধু এটুকু বুঝতে পেরেছে, নৌশি যদি আবার না হাসে, নৌশির চেনা সেই চঞ্চলতা যদি ফিরে না আসে, তাহলে আলভীর পক্ষে স্বাভাবিক থাকা অসম্ভব।আর কিছু না ভেবেই জানালা থেকে সরে হাঁটতে শুরু করে আলভী।
বর্তমান।
তিনতলার করিডোরের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে নৌশি। আর নিচে সবার সামনে গিটার হাতে দাঁড়িয়ে গান গাইছে আলভী। আলভীর কণ্ঠ ভেসে আসছে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে,
— তুই তো আমার সব রে পাগল, তুই তো আমার সব। তুই তো আমার বেঁচে থাকার বড় অনুভব।
নৌশির পাশে দাঁড়িয়ে আছে সাবা। একবার নৌশির দিকে আরেকবার নিচে গান গাইতে থাকা আলভীর দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে সাবা। কিন্তু নৌশির মুখের হাসির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। মেয়েটার মুখ অন্ধকার হয়ে গেছে। এতক্ষণ নৌশির মধ্যে চঞ্চলতা না থাকলেও শান্ত স্বাভাবিক ছিলো কিন্তু এখন নৌশির মুখ জুড়ে বিরক্তি, অস্বস্তি আর চাপা রাগ। ভেতরে ভেতরে কেমন অস্থির লাগছে নৌশির। আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না নৌশি। দ্রুত পায়ে করিডোর ছেড়ে ক্লাসরুমে ফিরে এসে নিজের জায়গায় বসে।
নৌশিকে এভাবে চলে যেতে দেখে অবাক হয় সাবা। নৌশির পেছন পেছন ক্লাসরুমে এসে নৌশির পাশে বসে জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে নৌশি? তুই চলে এসেছিস কেন?
নৌশি রাগ আর বিরক্তি মেশানো কণ্ঠে বলে,
— তো কি করবো? দাঁড়িয়ে গান শুনবো?
সাবা হেসে বলে,
— রাগ করছিস কেন? তোর জন্যই তো গাইছে!
নৌশি অবাক হয়ে বলে,
— আশ্চর্য! উনি আমার জন্য কেন গান গাইবেন?
সাবা শান্ত গলায় বলে,
— অবশ্যই তুই স্পেশাল ওনার কাছে। তাই তোর রাগ অভিমান, মনখারাপ দূর করতে গান গাইছে।
নৌশি রাগ এবং বিরক্তি নিয়ে বলে,
— ওনাকে আমার সহ্য হচ্ছে না। আর না কোনো প্রয়োজন আছে ওনার আমার রাগ অভিমান ভাঙানোর।
সাবা কয়েক সেকেন্ড নৌশির দিকে তাকিয়ে থাকে। সাবা বুঝতে পারে, নৌশিকে বিষয়টা ভেঙে বুঝিয়ে বলতে হবে। তাই সাবা একটু সিরিয়াস হয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
— নৌশি, রুদ্রিক চাচ্চু তোকে জোর করে বিয়ে করেছে শুধু প্রতিশোধের জন্য। ওনার সাথে থাকলে তোর জীবন বরবাদ হবে......
সাবার কথা শেষ হওয়ার আগেই নৌশি ঝাঁঝালো গলায় অকপটে বলে উঠে,
— আমার কাছে তো একদমই লাগছে না আমার জীবন বরবাদ হচ্ছে!
নৌশির এমন উত্তর শুনে থমকে যায় সাবা। কথাগুলো সাবার বিশ্বাস হলো না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সন্দিহান দৃষ্টিতে নৌশির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— মানে কি? তুমি কি রুদ্রিক চাচ্চুকে ভালোবেসে ফেলেছিস?
নৌশি মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়। কণ্ঠে জেদ মিশিয়ে স্পষ্ট গলায় বলে,
— আমি ওনার সাথে থাকতে চাই।
সাবা এবার আরো বেশি অবাক হয়। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
— রুদ্রিক চাচ্চু কিন্তু ওনার বোনের পালিয়ে যাওয়ার শোধ নিতে তোকে বিয়ে করেছে! এটা ভুলে যাচ্ছিস? আর রুদ্রিক চাচ্চু থেকে তোকে আলভী স্যারই মুক্ত করতে পারবে!
সাবার কথা শুনেও নৌশির চেহারার জেদ কমে না। নৌশি সাবার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে জেদি স্বরে বলে,
— ভুলে যেহেতু যাচ্ছি, তুইও ভুলে যা। আর তোর আলভী স্যারকে তুই-ই রাখ। আমার জন্য আমার ভাতার রুদ্রিক চাচ্চু আছে।
নৌশির এমন কথা শুনে সাবা থ হয়ে তাকিয়ে রইল। সামনে বসে থাকা মেয়েটা সত্যিই নৌশি? যে কিনা রুদ্রিকের সাথে বিয়ে হওয়ার পর কি কান্নাটাই না করেছে আর এখন সেই মেয়েই কী অবলীলায় এমন কথা বলছে!কিছুক্ষণ নৌশির দিকে তাকিয়ে থেকে সাবা আবার বলে,
— আর তোর ফ্যামিলি? বাবা-মা? সারাজীবন রুদ্রিক চাচ্চুর সাথে থাকলে বাবা-মাকে পাবি কোথায়?
কথাটা শুনে নৌশির ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠে।এমনিতেই আলভীর কান্ড তার একদম ভালো লাগছে না। কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না, আলভী কেন তাকে নিয়ে সবার সামনে গান গাইবে! কেনই বা তাকে নিয়ে এতো আগ্রহ দেখাবে? প্রচন্ড রাগ জমেছে আলভীর ওপর নৌশির। আবার কেন জানি রুদ্রিকের কথা মনে পড়তেই বুকটা পুড়ে যাচ্ছে। মানুষটার জন্য ভেতর থেকে কেমন মায়া হচ্ছে। একদিকে আলভীর এমন কাজ অন্যদিকে সাবার বলা কথাগুলো! সব মিলিয়ে নৌশির ভেতরে জমে থাকা অনুভূতিগুলো একসাথে বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো।
হঠাৎ করেই কান্না করে উঠে নৌশি,
— চুপ কর তুই!
নৌশির এমন অবস্থা দেখে সাবা বিচলিত হয়ে নৌশির হাত ধরে বলে,
— দোস্ত, কাঁদছিস কেন?
নৌশি ঠোঁট উল্টে আরো বেশি কেঁদে বলে,
— আমি ওনার কাছে যাবো। আমি আমার জামাইয়ের কাছে যাবো!
সাবা আর কিছু বলে না। নৌশির এমন অবস্থা দেখে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
— আচ্ছা দোস্ত, কান্না থামা। আমি আর কিছু বলবো না।
নৌশি নিজের চোখ মুছে নেয়। তারপর গাল ফুলিয়ে কলেজ ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে। তা দেখে সাবা জিজ্ঞেস করে,
— কি করবি?
— ওনাকে কল দিবো আমাকে নিয়ে যেতে। ভালো লাগছে না আমার।
সাবা আর কোনো কথা বলে না। নৌশি রুদ্রিকের নাম্বারে কল করতেই রুদ্রিক কল রিসিভ করে। ফোনের ওপাশ থেকে রুদ্রিকের কণ্ঠ ভেসে আসতেই নৌশি কান্নাভেজা গলায় জিজ্ঞেস করে,
— কোথায় আপনি?
নৌশির কণ্ঠস্বর শুনেই রুদ্রিক বুঝে ফেলে নৌশি কাঁদছে। মুহূর্তেই উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
— কাঁদছো কেন?
নৌশি কান্না সামলানোর চেষ্টা করে বলে,
— আমাকে নিয়ে যান!
— কোথায়?
— আপনার কাছে!
— হসপিটালে?
— আপনি যেখানে, সেখানেই।
— তো এসে পড়ো রিকশায় উঠে।
নৌশি গাল ফুলিয়ে বলে,
— পারবো না। আপনি এসেই নিয়ে যেতে হবে!
— ২০ মিনিট লাগবে।
— কেন?
— বিশ মিনিটের রাস্তা।
নৌশি অভিমানী কণ্ঠে বলে উঠে,
— সেদিন কল করেছিলাম, পরে তো ১০ মিনিটে এসেছিলেন।
নৌশির কথা শুনে রুদ্রিকের মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা। যেদিন নৌশি ফোন করে বলেছিল, একটা ছেলে তাকে বাজে কথা বলেছে। সেদিন রাগে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি নিয়ে ছুটে এসেছিল রুদ্রিক। ঘুমসে হাই স্পিডে গাড়ি চালিয়ে কত দ্রুত পৌঁছে গিয়েছিল তা নিজেও খেয়াল করেনি।
রুদ্রিক শান্ত গলায় বলে,
— সেদিন ইম্পর্ট্যান্ট ছিলো!
নৌশি অভিমানী গলায় প্রশ্ন করে,
— আমার মন খারাপ, কাঁদছি আমি, এটা ইম্পর্ট্যান্ট না আপনার কাছে?
রুদ্রিক ওপাশে চুপ করে রইল। এই প্রশ্নের কি উত্তর দেবে সে? কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীর কণ্ঠে বলে,
— আসছি আমি, কেঁদো না।
— আচ্ছা।
বলেই কল কেটে মোবাইলটা ব্যাগে রেখে দেয় নৌশি। সাবা এতক্ষণ ধরে নৌশির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে৷ দেখছে তার বান্ধবীকে কি আহ্লাদ করছে রুদ্রিকের সাথে। নৌশি সাবার এমন তাকিয়ে থাকা দেখে বলে,
— কি হয়েছে, তাকিয়ে আছিস কেন?
সাবা জিজ্ঞেস করে,
— নিতে আসছে?
— হ্যাঁ।
সাবার মনে অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারছে না। যদি আবার নৌশি কেঁদে দেয়!অথচ ক্লাস ফাইভ থেকে তাদের বন্ধুত্ব। এত বছরের বন্ধুত্বে কখনো নৌশিকে এমন ছোট কারণে কেঁদে আহ্লাদী হতে দেখেনি সাবা। সে অনেকটাই আন্দাজ করতে পারছে, নৌশির মনের ভেতর কি চলছে। কিন্তু সেই সাথে সাবার দুশ্চিন্তাও বাড়ছে। রুদ্রিক কি নৌশির এই অনুভূতিগুলো বুঝবে? সেগুলোর মূল্য দেবে? নাকি একসময় এই অনুভূতির কারণেই নৌশিকে কষ্ট পেতে হবে?
তবে নিজের মনের এসব চিন্তা নৌশিকে বুঝতে দেয় না সাবা। এমনিতেই মেয়েটার মন খারাপ, একটু আগেই কান্না করেছে। তাই আর এসব প্রসঙ্গ না তুলে অন্য কথা বলে নৌশিকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করে। এভাবেই কেটে যায় আরো দশ মিনিট। হঠাৎ বুটজুতার শব্দ তুলে ক্লাসরুমে প্রবেশ করে রুদ্রিক। ক্লাসরুমে এখন কেবল নৌশি আর সাবা-ই। রুদ্রিককে দেখামাত্রই এতক্ষণ মনমরা হয়ে বসে থাকা নৌশির মুখে মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে আসে। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে প্রশস্ত মিষ্টি হাসি। এতক্ষণ ধরে জমে থাকা সব মন খারাপ এক নিমেষেই উধাও হয়ে যায়।
নৌশি বসা থেকে এক লাফে উঠে দ্রুত পায়ে রুদ্রিকের দিকে এগিয়ে যায়। সাবা উল্টো দিকে ফিরে বসেছিল। হঠাৎ বুটজুতার শব্দ আর নৌশিকে এভাবে উঠে যেতে দেখে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় এবং রুদ্রিককে দেখতে পেয়ে সাবা সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়। নৌশি রুদ্রিকের সামনে গিয়ে সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে হাসিমুখে দাঁড়ায়।মানুষটার আসার জন্য কতটা অপেক্ষা করেছে নৌশি, তা নৌশির মুখের হাসিতেই স্পষ্ট। নৌশি নিজের হাতটা বাড়িয়ে দেয় রুদ্রিকের দিকে হাতটা ধরার জন্য।
রুদ্রিকও এক মুহূর্ত দেরি করে না। সাথে সাথেই নৌশির বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা শক্ত করে ধরে সামান্য টান দিয়ে নৌশিকে নিজের কাছে নিয়ে আসে। আগের তুলনায় দুজনের দূরত্ব কমে এলেও মাঝখানে এখনো যথেষ্ট দূরত্ব আছে।
রুদ্রিক নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে,
— কাঁদছিলে কেন? কেউ কিছু বলেছে?
নৌশির মুখ থেকে হাসি সরছেই না। একটু আগে যে মেয়েটা কান্না করছিল, রুদ্রিককে সামনে পেয়ে সেই মেয়েই কান্নার কথা ভুলে গেছে। রুদ্রিককে দেখামাত্রই নৌশির ভেতরের সব অস্থিরতা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
নৌশি মিষ্টি হেসে বলে,
— না। কেউ কিছু বলেনি। আমার ক্লাস করতে ভালো লাগছে না।
রুদ্রিক একবার পুরো ক্লাসরুমের দিকে চোখ বুলিয়ে নেয়।তারপর ভ্রু কুঁচকে নৌশির দিকে তাকিয়ে বলে,
— ক্লাস কোথায় হচ্ছে? সব স্টুডেন্ট, বিশেষ করে মেয়েরা নিচে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে টিচারের ফিল্মি স্টাইলে দাঁড়িয়ে গাওয়া গান শুনছে।
রুদ্রিকের কথা শুনতেই নৌশির মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। রুদ্রিক সামান্য তিরস্কারের সুরে বলে
— বাই দ্য ওয়ে, এটা কলেজ? নাকি আশিকি থ্রি এর সিরিজ চলছে? টিচার গান গাইছে, সিরিয়াসলি?!
নৌশি চুপ করে থাকে। মনে মনে ভাবে, আলভী স্যার যে গানটা তার জন্যই গাইছে অর্থাৎ পুরো আশিকি সিরিজটাই যে তাকে ঘিরে চলছে, সেটা যদি কোনোভাবে রুদ্রিক জানতে পারে, তাহলে তো আলভী স্যারকে ক্ষেপা ষাঁড়ের মতো কোপাবে! এমনিতেই প্রথম দিন নৌশির মুখে আলভী স্যারের নাম শুনেই রুদ্রিকের মেজাজ সপ্তমে উঠেছিল। তাই আর কোনো ঝুঁকি না নিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলে নৌশি বলে,
— যা ইচ্ছা তাই হোক। আপনি আমাকে নিয়ে যান। আমার ভালো লাগছে না।
রুদ্রিক আর কথা বাড়ায় না।
— চল?
নৌশি এবার সাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
— তুই যাবি না?
সাবা বলে,
— না আর একটা ক্লাসই আছে। ওটা করেই যাবো। তুই চলে যা।
নৌশি আর কিছু বলে না। রুদ্রিকের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য বলে,
— হাতটা ছাড়ুন। ব্যাগটা নিয়ে আসি।
রুদ্রিক হাত ছেড়ে দেয়। নৌশি ব্যাগটা নিয়ে আসতেই রুদ্রিক নিজেই নৌশির হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিজের কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে নৌশির হাত ধরে বলে,
— আসো।
নৌশি যেতে যেতে পেছন ফিরে সাবাকে হাত নেড়ে টাটা দিয়ে রুদ্রিকের সাথে সামনে এগিয়ে যায়। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে নৌশি বলে,
— প্রিন্সিপাল স্যারকে বলে যেতে হবে।
রুদ্রিক স্বাভাবিক গলায় বলে,
— কল করে জানিয়ে দিবো!
নৌশি আর কিছু বলে না। রুদ্রিকের হাত ধরে নিচে নেমে আসে। নিচে নামতেই দেখে পুরো ক্যাম্পাসে পা ফেলার জায়গাটুকুও নেই। স্টুডেন্টদের ভিড়ে চারপাশ গিজগিজ করছে। আলভীর গান শোনার জন্যই এত মানুষের সমাগম। যদিও এখন গান থেমে গেছে তবুও ভিড় কমার কোনো লক্ষণ নেই। রুদ্রিক খুব সাবধানে নৌশিকে নিয়ে ভিড়ের মধ্য দিয়ে এগোতে থাকে। দুইহাত দিয়ে নৌশিকে ঘিরে রেখেছে যাতে ভিড়ের মধ্যে কেউ নৌশির শরীরে ধাক্কা দিতে না পারে।
অনেক কষ্টে সেই ভিড় পেরিয়ে কলেজের বাইরে বের হয় দুজন। এরপর নৌশিকে গাড়িতে বসিয়ে নিজেও ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দেয়। গাড়ি চলতে শুরু করে। নৌশি চুপচাপ রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে থাকে। নৌশির চোখেমুখে খুশির ছাপ। মনে মনে ভাবছে সকালের কথা। সকালে কলেজে এসেই সাবার কাছ থেকে জানতে পারে, রুদ্রিক নাকি গতকাল কলেজে এসে সেই টিচারকে মেরে অজ্ঞান করে দিয়েছে, যে তাকে থাপ্পড় মেরেছিলো।
শুধু তাই না, সাবার কাছ থেকে আরো জানতে পেরেছে, রুদ্রিক এই কলেজের স্পন্সর! এটা নৌশি জানতো না। তাই এখন বুঝতে পারছে, প্রিন্সিপাল স্যার কেন রুদ্রিকের সামনে এতটা সমীহ করে কথা বলেন। কেন রুদ্রিকের প্রতিটা কথায় জি হুজুর জি হুকুম করেন! তবে এসব নৌশির কাছে বড় ব্যাপার না। তার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, রুদ্রিক তার গায়ে হাত তোলার অপরাধে কলেজের ইকোনমিকসের স্যারকে মেরেছে! ব্যাপারটা ভাবতেই নৌশির অন্যরকম খুশি হচ্ছে।
রুদ্রিক তাকে নিয়ে এতটা কনসার্ন, সেটা ভেবেই মনের ভেতর অন্য রকম অনুভূতি হচ্ছে নৌশির। নিজেকে ভীষণ স্পেশাল মনে হচ্ছে। তার জন্যই রুদ্রিক কলেজের টিচারকে শাস্তি দিয়েছে! এদিকে গাড়ি চালাতে চালাতে রুদ্রিক খেয়াল করে, নৌশি তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে।
রুদ্রিক গাড়ি চালাতে চালাতেই ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে? হাসছো কেন?
নৌশি সরাসরি প্রশ্ন করে বসে,
— আপনি কালকে আমার কলেজে গিয়ে ইকোনমিকস স্যারকে মেরেছিলেন?
রুদ্রিক জানতো, নৌশির কাছ থেকে এমন একটা প্রশ্ন পাবেই। কলেজে গিয়ে টিচারকে মারার ঘটনাটা গোপন থাকার কথা না। আর সে নিজেও চায়নি বিষয়টা গোপন থাকুক। চাইলেই রুদ্রিক ঘটনাটা আড়াল করতে পারতো। কিন্তু ইচ্ছা করেই তা করেনি। কারণ, সে চায়নি ভবিষ্যতে আর কেউ নৌশির সাথে খারাপ আচরণ করার সাহস পাক। কলেজের সব স্টুডেন্ট আর টিচারদের মনে আতঙ্ক তৈরি করতেই রুদ্রিক বিষয়টা প্রকাশ্যে রেখেছে।
রুদ্রিক একদম স্বাভাবিকভাবে সামনের দিকে তাকিয়ে বলে,
— অফকোর্স! মির্জা বাড়ির বড় বউ অ্যান্ড রুদ্রিক রওনক মির্জার বউয়ের গায়ে হাত তোলার সাহসের পরিণাম পাবে না?
কথাটা বলেই নৌশির দিকে তাকিয়ে বলে,
— তোমাকে আমি প্রতিশোধের জন্য বিয়ে করেছি, এটা ভেতরের খবর। বাইরে তো তুমি আমার বউই।
রুদ্রিকের কথা শুনে নৌশির মনটা আরো ফুরফুরে হয়ে উঠে। তার বিন্দু পরিমাণ বিশ্বাস হলো না যে রুদ্রিক শুধু মির্জা পরিবারের সম্মানের কথা ভেবেই এসব করেছে। নৌশি বেশ ভালো করেই বুঝতে পেরেছে, রুদ্রিকের মনে তার জন্য স্ফট কর্ণার আছে। তার প্রতি অনুভূতি আছে, মায়া আছে। শুধু মানুষটা সেটা স্বীকার করতে চায় না।
তাই নৌশি মুখে মিষ্টি একটা হাসি ফুটিয়ে বলে,
— একদম ঠিক বলেছেন!
নৌশির কথায় রুদ্রিক মনে মনে আশ্বস্ত হয়, যাক মেয়েটা তার কথা বিশ্বাস করেছে। তাই রুদ্রিকও মৃদু হেসে আবার সামনের দিকে তাকায়। কিন্তু পরমুহূর্তেই নৌশি বলে উঠে,
— ভেতরের ব্যাপার তো আমরা জানি। আমি কষ্ট পেলে আপনি কেঁদে দেন। আমি রাগ করলে আপনি এসে আমার রাগ ভাঙান। আমাকে কান্না করতে দেখে আপনি অস্থির হয়ে যান। এসব তো বাইরের মানুষ জানে না। বাইরের মানুষ তো দূর, আপনার ঘরের মানুষ, আপনার বাবা-মাই তো জানে না।
ব্যাস! রুদ্রিকের সেই স্বস্তির হাসি থমকে যায়। কথাগুলো বলার সময় নৌশির ঠোঁটে বিজয়ীর হাসি। নৌশির এমন কথা শুনে রুদ্রিকের হাত আপনাআপনিই গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে থেমে যায়। মুহূর্তেই চোখ ঘুরিয়ে তাকায় নৌশির দিকে। নৌশির মুখে দুষ্টুমিমাখা হাসি।
নৌশি ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করে,
— কি?
রুদ্রিকের চেহারা দেখে নৌশির ইচ্ছা করছে জোরে গলা ফাটিয়ে হাসতে। বেচারা এমন মুখ করে আছে, যেন চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে! এদিকে রুদ্রিক নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে। মুখে গাম্ভীর্য ফুটিয়ে এমন একটা ভাব ধরে, যেন নৌশির কথায় তার বিন্দুমাত্র কিছু যায় আসে না। আবারো গাড়ি চালানোয় মনোযোগ দিয়ে বলে,
— অহেতুক আশা রেখে লাভ নেই! আমার তোমার প্রতি ছিটেফোঁটা আগ্রহও নেই।
রুদ্রিকের কথায় নৌশির কোনো ভাবান্তর হলো না। নৌশি প্রসঙ্গ বদলে জিজ্ঞেস করে,
— কোথায় যাচ্ছি এখন?
— বাসায়।
— আপনি আজ আর কাজে যাবেন না?
— তোমাকে বাসায় দিয়ে যাবো।
নৌশির মুখটা বিরক্তিতে ছেয়ে যায়। বলে,
— না! আপনার আজ আর হসপিটালে যাওয়া লাগবে না। বাসায় থাকবেন আমার সাথে!
রুদ্রিক সোজাসাপটা উত্তর দেয়,
— সম্ভব না। কাজ আছে আমার।
— একদিন কাজ না করলে কিছু হবে না!
— অনেককিছু হবে!
— কি এমন ক্ষতি হবে?
রুদ্রিক একটু ভেবে বলে,
— ছয় সাত লাখ টাকার ক্ষতি হবে! দিবে তুমি? দিলে আর হসপিটালে যাবো না।
নৌশি একটু থেমে হতভম্ব হয়ে রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
— আমার কাছে টাকা আছে যে আমি দিবো?
রুদ্রিক এগার সামান্য হেসে বলে,
— তাহলে বাসায় যাও তুমি। আমি হসপিটালে যাবো।
কথাটা শুনে নৌশির মনটা ভেঙে যায়। হঠাৎ করেই ভীষণ অভিমান জমে উঠে বুকের ভেতর। বিষন্ন এবং আবেগমাখা কণ্ঠে বলে উঠে,
— আপনি যদি আমাকে বাসায় দিয়ে আবার কাজে চলে যান তাহলে আমার যেদিক দিয়ে চোখ যায় সেদিক দিয়ে চলে যাবো। আর আসবো না আপনার কাছে!
ব্যাস! নৌশির এই এক কথাতেই রুদ্রিকের সব গাম্ভীর্য মুহূর্তে উধাও হয়ে যায়। নৌশি কথাটা দুষ্টুমি করে কিংবা রাগের মাথায় বলেনি। ভীষণ অবুঝ আর অভিমানী হয়ে কথাটা বলেছে। আর নৌশির সেই অবুঝ অভিমানই রুদ্রিকের মনটাকে দুর্বল করে দেয় প্রতিবার। রুদ্রিক কোমল চোখে নৌশির দিকে তাকিয়ে ধীরস্বরে বলে,
— আচ্ছা, যাবো না। থাকবো তোমার কাছেই। তোমার কাছেই।
মাত্র দুই সেকেন্ড আগেও যে মনটা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম, রুদ্রিকের কথা শুনে সেই মনেই আবার আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। নৌশির ঠোঁটে ফুটে উঠে প্রশস্ত, মিষ্টি হাসি। বিষয়টা নৌশির ভীষণ ভালো লাগে। রুদ্রিক অন্য সময় যতই শক্ত, কঠোর আর গম্ভীর থাকুক না কেন, নৌশির অভিমান কিংবা মন খারাপের সময় মানুষটা একেবারে বদলে যায়। তখন রুদ্রিকের চোখেমুখে নেমে আসে অদ্ভুত কোমলতা।
নৌশির মনে হয়, সে যেন একটা ছোট্ট বাচ্চা আর রুদ্রিক তাকে বেবি ট্রিটমেন্ট দিচ্ছে। বাচ্চাদের যেমন আদর করে বুঝিয়ে শান্ত করা হয়, রুদ্রিকও ঠিক তেমন করেই তাকে সামলায়। আর নৌশির আহ্লাদও তখন বেড়ে যায় কয়েক গুণ। বাড়বে নাই বা কেন? এমন করে আহ্লাদ পালন করার মতো একজন মানুষ পাশে থাকলে নৌশি আহ্লাদী না হয়ে থাকতেই বা পারে কিভাবে!
সামনে পড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল। গাড়ি থামায় রুদ্রিক। গাড়ি থামতেই নৌশি আশপাশে চোখ বুলাতে থাকে। হঠাৎই রাস্তার ওপাশে নৌশির চোখ আটকে যায়। এক লোক ভ্যানে করে আতাফল বিক্রি করছে। নিজের পছন্দের ফলটা দেখতে পেয়ে নৌশি একদৃষ্টিতে ভ্যানটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এরই মধ্যে কখন যে সিগন্যাল বদলে গেছে, সেদিকে নৌশির কোনো খেয়ালই নেই। রুদ্রিক মাত্রই গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে, এমন সময় নৌশি হঠাৎ চিৎকার করে উঠে,
— আল্লাহ! গাড়ি থামান! যাবেন না। যাবেন না একদম!
নৌশির এমন আকস্মিক চিৎকারে রুদ্রিক রীতিমতো ভয় পেয়ে যায়। তাড়াতাড়ি মাঝরাস্তায় গাড়ি থামিয়ে নৌশির দিকে ঝুঁকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে? এমন করছো কেন?
নৌশি আঙুল দিয়ে রাস্তার ওপাশটা দেখিয়ে বলে,
— ওই যে আতাফল। আমি খাবো। আমার পছন্দের।
রুদ্রিক হতভম্ব হয়ে যায়। একবার নৌশির দেখানো আতাফলের ভ্যানের দিকে তাকায় তারপর আবার নৌশির মুখের দিকে তাকায়। এরই মধ্যে পেছনের গাড়িগুলো একের পর এক হর্ন বাজাতে শুরু করে। মাঝরাস্তায় গাড়ি থামিয়ে রাখায় পেছনে জ্যাম লেগে যাওয়ার উপক্রম।রুদ্রিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার গাড়ি স্টার্ট দেয়। তারপর রাস্তার এক পাশে গাড়ি সাইড করে থামায়। গাড়ি থামিয়ে কয়েক সেকেন্ড সরু চোখে নৌশির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর ঠান্ডা গলায় বলে উঠে,
— আল্লাহ মেয়েদের এত স্বল্প ব্রেইন দিলেন কেন?
রুদ্রিকের এমন কথায় নৌশি রাগে না। মেকি হাসি দিয়ে বলে,
— মেয়েরা এই সল্প ব্রেইন দিয়েই তো পুরো পুরুষ জাতিকে নাচিয়ে রাখে! বেশি দিয়ে আর পুরুষ জাতির ওপর নির্যাতন করেননি আলাহ!
নৌশির কথা শুনে রুদ্রিক কিছুক্ষণ চুপ করে নৌশির দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটার মুখে আস্ত ঝাঁঝ! মাঝে মাঝে এমন সব জবাব দেয় যে, চাইলেও সামনের ব্যক্তি পাল্টা কিছু বলতে পারে না। মাঝে মাঝে দশটা কথার মধ্যে একটা জবাবই এমনভাবে দেয়, যাকে এককথায় মুখভাঙা উত্তর বলা চলে। রুদ্রিককে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে নৌশি মুখ একটু এগিয়ে মেকি হাসিটা রেখেই বলে,
— আমাকে দেখার এত ইচ্ছা থাকলে সুন্দর করে সেজে আমার সামনে বসবো নে। যত খুশি দেখবেন। এখন আতাফলটা এনে দিন?
নৌশির এমন কথা শুনে রুদ্রিক সাথে সাথে চোখ সরিয়ে সিটবেল্ট খুলতে খুলতে ঠান্ডা গলায় বলে,
— আমার চোখের এত অবনতি হয়নি, সুইটহার্ট, যে তোমাকে দেখার ইচ্ছা থাকবে!
কথা বলতে বলতেই রুদ্রিক গাড়ির দরজা খুলছিল কিন্তু তার আগেই নৌশি মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠে,
— অস্ট্রেলিয়ার গাইয়ের চোখ থেকে কি আর ভালো কিছু আশা করা যায়?!
নৌশির কথা কানে যেতেই রুদ্রিক আবার গাড়ির দরজা লাগিয়ে দেয়। তারপর গম্ভীর গলায় বলে,
— যাচ্ছিলাম আতাফল আনতে। কিন্তু এখন আর যাবো না।
নৌশি অবাক হয়ে তাকায়।
— কেন?
— পোলাইটলি, রেসপেক্টফুলি সরি বলো। তবেই যাবো আতাফল আনতে।
কথাটা শুনে নৌশি কপালে ভাঁজ ফেলে। মনে মনে নিজেকেই একগাদা গালি দিল।
— কি দরকার ছিলো এখন এই কালোয়াকে অস্ট্রেলিয়ান গাই বলার? এখন নিজের ইগোর আত্মার মাগফেরাত কামনা করতে হবে। নয়ত পছন্দের আতাফলটা আর কপালে জুটবে না।
নৌশি একবার ভ্যানের ওপর সাজানো আতাফলগুলোর দিকে তাকায় তারপর আবার রুদ্রিকের দিকে। রুদ্রিক একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে আছে। এমন ভাব যেন তার কোনো তাড়া নেই, কোনো চিন্তা নেই।
নৌশি এবার নিজের তর্জনী দিয়ে রুদ্রিকের বাঁ বাহুতে খোঁচা দিতে দিতে মিষ্টি সুরে বলে,
— শ্রদ্ধেয় স্বামীরূপী চাচ্চু, পিলিজ এনে দিন না।
নৌশির এমন সম্বোধন শুনে রুদ্রিক সরু, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নৌশির দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটার মতো ফাজিল দুইটা নেই। বিপদে পড়বে ঠিকই কিন্তু জেদ আর বেয়াদবি কোনোভাবেই কমবে না! কিরকম নির্লজ্জ হলে স্বামীকে এসব বলে!
রুদ্রিক গমগমে গলায় বলে,
— এখন তো আরো যাব না। কানে ধরে সরি বলো।
নৌশি বুঝে যায়, এবার ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। নইলে নিজের সম্মান নিলামে তুলে সত্যি সত্যিই কানে ধরে সরি বলতে হবে। তার চেয়ে বরং একটু অভিনয় করা যাক! মুহূর্তেই মুখটা মলিন করে ফেলে নৌশি। তারপর অভিমানী কণ্ঠে বলে,
— আচ্ছা, থাক। লাগবে না। খাবো না আমি। আপনি বাসায় চলুন।
রুদ্রিক এবার চুপ হয়ে যায়। আড়চোখে নৌশির মুখের দিকে তাকিয়ে মেয়েটাকে ভালো করে দেখে। সত্যিই মন খারাপ করে ফেলেছে? সে কি একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে? কিন্তু সে তো একটু মজা করছিল!
রুদ্রিক আর দেরি না করে গাড়ির দরজা খুলে নামতে নামতে বলে,
— বসো। গাড়ি থেকে নেমো না। আমি আনছি।
নৌশি অভিমানের অভিনয় চালিয়ে গিয়ে বলে,
— না, থাক। লাগবে না।
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*অধরা মিনহা – Odhora Minha*
রুদ্রিক আর কোনো কথা না বাড়িয়ে গাড়ির দরজা বন্ধ করে চলে যায়। রুদ্রিক চলে যেতেই নৌশির মুখজুড়ে ফুটে উঠে একগাল চওড়া হাসি। তার প্ল্যান সাকসেস! রুদ্রিককে গালিও দেওয়া হলো, সরিও বলতে হলো না, আবার নিজের কথাটাও ঠিকই আদায় করে নেওয়া হয়ে গেছে! নৌশি গাড়ির জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে থাকে, দূরে রুদ্রিক আতাফলের ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সাথে কথা বলছে। হঠাৎ নৌশির মনে হলো, রুদ্রিক ঠিকঠাক পাকা আতাফল চিনে কিনতে পারবে তো? কাঁচা ফল নিয়ে এলে তো আর খাওয়া যাবে না!
এটা ভেবেই নৌশি তড়িঘড়ি গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। কয়েক কদম এগোতেই কানে আসে দুজন মানুষের কথোপকথন।
— ওটা ওই বউউন্মাদ লোকটা না? যে কিনা সেদিন তোমাকে মারতে নিয়েছিল?
নৌশি থমকে দাঁড়ায়। পাশে তাকিয়ে দেখে, দুজন ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের একজন আঙুল তুলে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রিককে দেখিয়ে কথাটা বলেছে। পাশে থাকা অন্য পুলিশটাও রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
— হ্যাঁ, ওটাই।
কথাটা শুনে নৌশির কৌতূহল বেড়ে যায়। রুদ্রিককে বউপাগল বলার কারণটা কি? এমন কি করেছে রুদ্রিক? নৌশি আর কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে পুলিশ দুজনের কাছে এগিয়ে যায়। তারপর রুদ্রিককে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কী করেছে উনি?
পুলিশদের একজন এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
— আর বলবেন না! আস্ত একটা বউউন্মাদ লোক! জীবনে অনেক বউপাগল দেখেছি, কিন্তু এই লোকের মতো বউউন্মাদ আর একটাও দেখিনি। মাসখানেক আগে এক রাতে উনি আমাকে রাস্তা ক্লিয়ার করে দেওয়ার জন্য বলেন। ওনার বউ অসুস্থ, হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। আমি বললাম, সেটা সম্ভব না। রাস্তায় তখন প্রচন্ড জ্যাম ছিল। ব্যাস, এই কথা শুনেই উনি আমাকে মারতে এলেন! পরে অবশ্য আর মারেননি। উল্টো পকেট থেকে অনেকগুলো টাকা বের করে দিয়ে বলেন, বউ অসুস্থ বলে ঝামেলা করছেন না, নইলে নিজের পাওয়ার দেখাতেন! মানে তখন আপনি ওনার পাগলামি দেখতেন! বউ অসুস্থ হলে মানুষ এমন করে নাকি?
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*অধরা মিনহা – Odhora Minha*
পুরো ঘটনাটা শুনে নৌশির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে। তার দৃষ্টি চলে যায় দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রিকের দিকে। কড়া, তীব্র রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে মানুষটা। আর ভ্যানওয়ালা আতাফল প্যাক করছে। নৌশির এবার ভীষণ হাসি পাচ্ছে। আর সামনে এগোনোর প্রয়োজন বোধ করে না নৌশি। পা ঘুরিয়ে ফিরে আসে গাড়ির কাছে। চুপচাপ নিজের জায়গায় বসে মিটিমিটি হাসতে থাকে। রুদ্রিককে কিনা ট্রাফিক পুলিশ বউউন্মাদ বলছে! আর সেই বউটা কে? সে নিজে! ভাবতেই নৌশি লজ্জায় দুহাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলে।
রুদ্রিক তাকে নিয়ে এতটাই পাগলামি করেছে যে শেষ পর্যন্ত ট্রাফিক পুলিশের কাছেও বউউন্মাদ উপাধি পেয়ে বসেছে! নৌশির ঠোঁটের কোণে জমে থাকা হাসিটা সরছেই না। কিছুক্ষণ পর আতাফল নিয়ে রুদ্রিক গাড়িতে ফিরে আসে। নিজের জায়গায় বসে আতাফলগুলো নৌশির হাতে দিয়ে সিটবেল্ট বাঁধতে শুরু করে।
নৌশি ঠোঁট চেপে হাসি আটকে রাখতে রাখতে বলে,
— আপনাকে উন্মাদ বলেছে।
রুদ্রিকের হাত মাঝপথেই থেমে যায়। সিটবেল্ট বাঁধা বন্ধ করে ভ্রু কুঁচকে নৌশির দিকে তাকায়। তারপর বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
— কেন?
নৌশি এবার কোনো উত্তর দেয় না। শুধু ঠোঁট চেপে রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে। নৌশির হাসি দেখে রুদ্রিকের কপালের ভাঁজ আরো গভীর হয়। সিটবেল্ট বাঁধার কথা ভুলে নৌশির দিকে ঘুরে বসে বিরক্ত কণ্ঠে বলে,
— হোয়াটএভার! যেই কারণেই বলুক! নাম বলো তার? মুখ ভেঙে আসবো!
নৌশি হাসতে হাসতে বলে,
— আপনাকে বউউন্মাদ বলছে ওই ট্রাফিক পুলিশ। আপনি নাকি বলছিলেন আপনার বউ অসুস্থ। ট্রাফিক পুলিশ রোড ক্লিয়ার করে দিতে পারবে না বলায় মারতে নিয়েছিলেন। পরে নাকি আবার টাকা দিয়ে বলেন, বউ অসুস্থ, নয়তো নিজের পাওয়ার দেখাতেন। এখন সবাই আপনাকে বউউন্মাদ হিসেবে চিনে।
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*অধরা মিনহা – Odhora Minha*
নৌশির কথা শুনে রুদ্রিক একেবারে তাজ্জব বনে যায়। সামনে তাকায় সেই পুলিশটার দিকে। আর তখনি চিনতে পারে লোকটাকে। এটা তো সেই পুলিশ, যাকে সেদিন রাতে রাগের মাথায় মারতে গিয়েছিল রুদ্রিক। নৌশির সামনে নিজের এমন কাণ্ড ফাঁস হয়ে যাওয়ায় রুদ্রিক বেশ বিব্রত বোধ করে। কিন্তু সেটা প্রকাশ করলে চলবে না। যেভাবেই হোক, পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। তাই যথাসম্ভব নির্লিপ্ত থাকার চেষ্টা করে বলে,
— তোমার অক্সিজেন রেট খুব কম ছিল! ইমিডিয়েটলি হসপিটালে নিয়ে যেতে হতো। তাই তখন মেজাজ হারিয়ে ফেলেছিলাম।
নৌশি এবার বেশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— এতটা ভয় পেয়েছিলেন আমাকে হারানোর?
রুদ্রিক কি উত্তর দেবে, বুঝে উঠতে পারে না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে শান্ত গলায় বলে,
— তোমাকে হারানোর ভয় পাবো কেন? সেদিন তোমার অবস্থা খারাপ ছিল। কিছু একটা হয়ে গেলে সুযোগ পেতো তোমার চাচা। আর আমি তোমার চাচাকে কোনো সুযোগ দিতে চাই না।
রুদ্রিকের এমন উত্তর শুনেও নৌশির হাসি থামে না। এবার রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— তুমি কি মজা নেওয়ার চেষ্টা করছো?
নৌশি মিষ্টি হেসে বলে,
— বলছি, রাস্তাঘাটে একটু বউ নিয়ে উন্মাদগিরি কম করেন, জামাই! নয়তো আজ ট্রাফিক পুলিশরা বলছে, কাল পুরো দুনিয়া বলবে। তখন কিন্তু আমার ভীষণ রকমের লজ্জা লাগবে।
রুদ্রিক সামান্য রাগ নিয়ে বলে উঠে,
— আমি কোনো বউ পাগল না। আমি একজন সুস্থ মানুষ।
নৌশি এবার জানালার বাইরে তাকিয়ে সুর টেনে আফসোসের ভঙ্গিতে বলে,
— ইশশ! বেচারাটা প্রতিশোধ নিতে বিয়ে করে এখন আমার ওপর শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে। তা হবে নাই বা কেন?
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*অধরা মিনহা – Odhora Minha*
কথাটা বলেই নিজের চুলগুলো ঠিক করতে করতে নিজের প্রশংসা করে বলে উঠে,
— মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ! আমি এতটাই সুন্দর যে মূর্তিও আমার প্রেমে পড়ে যাবে। জীবনে কত যে প্রেমের প্রপোজাল পেয়েছি এই সুন্দর চেহারাটার জন্য!
রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— কয়টা পেয়েছো?
নৌশি একটু ভেবে বলে,
— কমপক্ষে ৫০-৬০টা তো হবেই।
— কয়টাকে হ্যাঁ বলেছো?
নৌশি লজ্জা পাওয়ার ভান করে নখ কামড়াতে কামড়াতে বলে,
— আমি কাউকে না বলতে পারি না।
রুদ্রিক নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না। অবাক হয়ে বলে,
— সবগুলোকে হ্যাঁ বলেছো?
নৌশি লজ্জা পাওয়ার ভান করে আস্তে করে বলে,
— হুম।
ব্যাস! এতেই রুদ্রিকের মেজাজ বিগড়ে যায়। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সিটবেল্ট বাঁধে। তারপর জোরে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চোখমুখ শক্ত করে গাড়ি চালাতে থাকে। রুদ্রিকের এমন রাগ দেখে নৌশির আরো মজা লাগছে। রুদ্রিককে আরেকটু জ্বালানোর জন্য বলে,
— এমন রাগ দেখাচ্ছেন কেন বয়ফ্রেন্ডের মতো?
রুদ্রিক কটমট করে নৌশির দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলে,
— আমি তোমার হাসবেন্ড আর তুমি আমার সামনে বসে দাঁতের পাটি দেখিয়ে বলছো তুমি এতগুলো প্রেম করেছো?
— তো কি হয়েছে? আপনি তো আমাকে ভালোবেসে বিয়ে করেননি। প্রতিশোধের বিয়ে প্রতিশোধ পর্যন্তই থাকতে দিন। বয়ফ্রেন্ড হতে যাবেন না।
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*অধরা মিনহা – Odhora Minha*
রুদ্রিক চোখ রাঙিয়ে বলে,
— আমি বয়ফ্রেন্ড হতেও চাই না। আমি তোমার হাসবেন্ড, কথাটা মাথায় রাখবে।
নৌশি হেসে দিয়ে বলে,
— বাসায় গিয়ে আপনার নাম্বারটা আমার বউউন্মাদ জামাই সেভ করবো।
রুদ্রিক বিরক্তি আর রাগ মেশানো কণ্ঠে বলে উঠে,
— যা ইচ্ছা করো! তোমার মাথায় সমস্যা আছে!
এরপর পুরো রাস্তায় আর দুজনের মধ্যে কোনো কথা হয় না। যদিও নৌশি বউউন্মাদ কথাটা নিয়ে রুদ্রিককে প্রচুর টিজ করেছে কিন্তু রুদ্রিক ধৈর্য ধরে সব শুনে গেছে। এছাড়া তার আর কিই বা করার আছে? বেচারা যে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে! এখন এসব নিয়ে নৌশিকে কিছু বলতে গেলে মেয়েটা আরো বেশি করে জ্বালাবে। নৌশি এমনই। তাই মুখ বুজে সব সহ্য করা ছাড়া রুদ্রিকের আর কোনো উপায় থাকে না।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ওরা বাড়িতে পৌঁছায়। গাড়ি থেকে নেমেই নৌশি আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। তার পেছনে রুদ্রিক নৌশির কলেজ ব্যাগটা কাঁধে করে আসছে। বাড়ির দরজা দিয়ে ঢুকতেই পথেই ফাহমিদা আইরিনের মুখোমুখি হয় নৌশি। নৌশির মুখে এমন উচ্ছ্বাস আর হাসি দেখে বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করেন,
— কি হয়েছে? এত খুশি কেন? মনে হচ্ছে পুরো দুনিয়া পেয়ে গেছো!
নৌশি বিজয়ীর হাসি দিয়ে বলে,
— আপনার ছেলেকে ট্রাফিক পুলিশ উন্মাদ বলেছে!
ফাহমিদা আইরিনের চোখ কপালে ওঠার উপক্রম! পরমুহূর্তেই রেগে গিয়ে বলেন,
— কি?! কোন পুলিশ? রুদ্রিক, তুমি চুপ করে শুনে এসেছো? নাম বলো! একটা কল দিবো, এক্ষুনি চাকরি চলে যাবে ওর!
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*অধরা মিনহা – Odhora Minha*
রুদ্রিক এবার থতমত খেয়ে যায়। মনে মনে চিন্তায় পড়ে যায়, আম্মুকে এখন কি উত্তর দিবে? বলবে যে তাকে বউ উন্মাদ বলেছে আর সেই কথা শুনে সে চুপচাপ চলে এসেছে? ফাহমিদা আইরিন নৌশিকে আবারো হাসতে দেখে বিরক্ত হয়ে বলেন,
— তোমার স্বামীকে উন্মাদ বলেছে আর তুমি হাসছো? লজ্জা করছে না?
নৌশি হাসিমুখে রুদ্রিকের দিকে তাকায়। রুদ্রিক চোখ রাঙিয়ে ইশারায় তাকে চুপ থাকতে বলছে। কিন্তু নৌশি সেসবের তোয়াক্কা না করে আবার ফাহমিদা আইরিনের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলে,
— ওমা, লজ্জা করবে না কেন? লজ্জা এবং হাসি দুটোই আসছে। ওনাকে ট্রাফিক পুলিশ বউউন্মাদ লোক বলেছে! একজন দুজন না, সবাই-ই ওনাকে বউউন্মাদ লোক হিসেবে চিনে!
ফাহমিদা আইরিন বিস্মিত হয়ে বলেন,
— রুদ্রিক কি বলছে ও?
রুদ্রিক নৌশির দিকে দাঁত কিড়মিড় করে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলে,
— ওর মাথায় সমস্যা।
নৌশি সাথে সাথে রুদ্রিককে ভেংচি কেটে বলে,
— আমার মাথায় সমস্যা না, আপনার মনে সমস্যা। আমার প্রেমে পাগল হয়ে গেছেন আপনি। রিয়ালিটি মাইনা নেন, প্লিজ!
বলেই নৌশি হাসতে হাসতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়। এদিকে ফাহমিদা আইরিন এখনো বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে। নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না! কি শুনছেন এসব! যে ছেলে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বিয়ে করেছে, সেই ছেলেই কি না বাইরে বউউন্মাদ উপাধি পাচ্ছে? তাহলে কি সত্যিই ওনার ছেলে বউয়ের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে? সন্দেহভরা দৃষ্টিতে তিনি রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মায়ের এমন দৃষ্টি বুঝতে পেরে রুদ্রিক তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করে,
— তুমি এখন বাসায় কেন?
ফাহমিদা আইরিন সন্দেহ সরে না। বলেন,
— সন্ধ্যায় আমার ফ্রেন্ডরা আসছে। আর রাতে তোমার ফুপি আসছে সবাইকে নিয়ে। বাসায় অনেক কাজ, তাই হাফ টাইমে এসে পড়েছি।
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*অধরা মিনহা – Odhora Minha*
— কয়টার ফ্লাইটে আসছে? কখন বলেছে তোমাকে?
— লন্ডন টু ঢাকার ফ্লাইট তো আজ একটাই। একটু পরেই ফ্লাইট।
— আচ্ছা।
কিছুক্ষণ থেমে ফাহমিদা সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন,
— কিন্তু তুমি এখন বাসায়?
রুদ্রিক মনে মনে ভাবে, এখন যদি বলে নৌশির আবদারে কাজ ফেলে বাসায় চলে এসেছে, তাহলে আম্মুর সন্দেহ আরো বেড়ে যাবে। ভুলভাল কিছু বুঝে বসবে। তাই নিজের কপালে আঙুল দিয়ে ঘসতে ঘসতে বলে,
— মাথা ব্যথা করছে। তাই চলে এসেছি।
কথাটা বলেই রুদ্রিক চলে যেতে উদ্যত হয় কিন্তু কয়েক কদম এগোতেই পেছন থেকে ফাহমিদা আইরিনের কণ্ঠ ভেসে আসে,
— মাথা ব্যথা নিয়েই ওই মেয়ের কুলিগিরি করছো?
রুদ্রিক থেমে পেছনে ফিরে তাকায়। বুঝতে বাকি রইল না, তার কাঁধে ঝোলানো নৌশির কলেজ ব্যাগটাকেই ইঙ্গিত করে কথাটা বলেছে তার আম্মি।
রুদ্রিক বেশ স্বাভাবিক গলায় উত্তর দেয়,
— মাথা ব্যথা হলেও বউয়ের জন্য এই কুলিগিরি করতে আমার কষ্ট হচ্ছে না, মাম্মি। তাই রিলাক্স থাকো।
বলেই আর দাঁড়ায় না রুদ্রিক। সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়। ফাহমিদা আইরিন সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন। ছেলের আচরণে ওনার সন্দেহ আরো গভীর হয়। রুদ্রিককে দেখে কোনোভাবেই মনে হচ্ছে না সে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বিয়ে করেছে। বরং তার চালচলন আর যেভাবে বউয়ের ফাইফরমাশ খাটছে, তাতে তো লাভ ম্যারেজ করা স্বামীরাও হার মানবে! তিনি মনে মনে হতাশ হলেন। প্রথম থেকেই এই বিয়েতে ওনার খুব একটা সম্মতি ছিল না।
প্রতিশোধের জন্য হলেও এমন বংশের কিংবা গরিব পরিবারের মেয়েকে তিনি ছেলের বউ হিসেবে চাননি। কিন্তু রুদ্রিকের বাবা এই বিয়েতে রাজি ছিলেন। বাবা ছেলে দুজনই তখন প্রতিশোধের আগুনে এমনভাবে জ্বলছিল যে, ফাহমিদা চাইলেও কিছু বলতে পারেননি। কিন্তু এখন ছেলের আচরণ দেখে বোঝার উপায় নেই যে সে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বিয়ে করেছে! এদিকে রুদ্রিক রুমে ফিরে এসে দেখে, নৌশি কলেজের জুতা দুটো দুদিকে ছড়িয়ে রেখে কলেজের ড্রেস পরেই বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে আছে। রুদ্রিক ভেতরে এসে নৌশির সামনে দাঁড়িয়ে বিরক্তি নিয়ে বলে,
— তোমার এই কথাটা আম্মির সামনে বলা খুব প্রয়োজন ছিল?
নৌশি ফট করে উঠে বসে। তারপর একেবারে নির্দোষ মুখ করে বলে,
— ওনিই তো জানতে চাইলো।
রুদ্রিক সরু, তীক্ষ্ণ চোখে নৌশির দিকে তাকিয়ে বলে,
— তোমার মাথায় কি সিরিয়াসলি সমস্যা? নাকি ইচ্ছে করেই মানুষকে এমন অকওয়ার্ড সিচুয়েশনে ফেলো?
নৌশি এবার একটা নির্ভেজাল হাসি দিয়ে বলে,
— মাথায় সমস্যা না, ইচ্ছে করেই এমন করি। মজা লাগে আমার কাছে।
রুদ্রিক বিরক্তিতে মুখ শক্ত করে বলে,
— নির্লজ্জ বেয়াদব, আবার হাসছে! যাও, ড্রেস চেঞ্জ করো।
— আগে বলুন আমার আতাফল কই?
রুদ্রিক কাঁধ থেকে কলেজ ব্যাগটা নামিয়ে নৌশির দিকে বাড়িয়ে দেয়
।
— এটার মধ্যে।
নৌশি ব্যাগ নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই রুদ্রিক আবার দ্রুত ব্যাগটা সরিয়ে নেয়। তারপর বলে,
— আগে চেঞ্জ করো!
— দেখুন, কলেজ থেকে এসেছি। একটু রেস্ট নিয়ে নেই আগে!
রুদ্রিক শান্ত গলায় বলে,
— আমিও এটাই বলছি। আগে চেঞ্জ করে ফ্রেশ হও। তারপর রেস্ট নিয়ে খেলে আরো বেশি ভালো লাগবে।
নৌশি রাগে গজগজ করতে করতে কাপড় নেওয়ার জন্য আলমারির দিকে এগিয়ে যায়। যেতে যেতেই বিরক্ত কণ্ঠে বলে,
— আপনার মতো শয়তান দুইটা নাই।
— তোমার থেকে কমই, ডিয়ার!
নৌশি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। রুদ্রিক কলেজ ব্যাগটা একপাশে রেখে সেখান থেকে আতাফলগুলো বের করে। তারপর রুম থেকে বেরিয়ে একজন হেল্পিং হ্যান্ডকে ডেকে লবণপানি নিয়ে আসতে বলে। আতাফলগুলো কিছুক্ষণ লবণপানিতে ভিজিয়ে রাখবে, যাতে ফলের গায়ে থাকা ফরমালিনের অবশিষ্টাংশ কমানো যায়। এরই মধ্যে নৌশির ড্রেস চেঞ্জ ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে। পরনে কালো কামিজ আর প্লাজো। ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই সোজা রুদ্রিকের সামনে হাজির। হাত বাড়িয়ে আবদারের সুরে বলে,
— দিন এখন আতাফল।
রুদ্রিক ফলগুলোর দিকে ইশারা করে বলে,
— বসো। লবণপানি আনুক। এগুলো ১০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে তারপর খাবে!
নৌশি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— কেন?
— ফরমালিন দেওয়া থাকে। তাই লবণপানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখলে উঠে যায়।
নৌশি মুখ বাঁকিয়ে বলে,
— আমি ফরমালিন নিয়েই খাবো। আমার সমস্যা নাই।
রুদ্রিক কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তখনি দরজায় নক হয়। মেইড লবণপানি নিয়ে এসেছে। রুদ্রিক বাটিটা হাতে নিয়ে তাতে আতাফলগুলো ঢেলে দেয়। তা দেখে নৌশির মুখটা মলিন হয়ে যায়। কান্নাকান্না মুখ করে বলে,
— একটা দিন না খাই?
নৌশির এমন মুখ দেখে রুদ্রিকের মনে মায়া হয়। সে আলতো করে নৌশির মাথায় হাত বুলিয়ে কোমল স্বরে বলে,
— সবগুলোই তোমার জন্য। কিন্তু ১০ মিনিট ভিজিয়ে রাখি, তাহলে ফরমালিনটা উঠুক।
নৌশি এবার নিজের পেটের দিকে ইশারা করে অভিমানী গলায় বলে,
— তাহলে এখন যে ক্ষিদা লাগছে?
রুদ্রিক মৃদু হেসে নৌশির হাত ধরে নৌশিকে বিছানার কাছে নিয়ে গিয়ে বসায়।
— বসো।
এরপর কাবার্ডের কাছে গিয়ে কাবার্ড খুলে একটা রাফায়েলো চকলেটের বক্স বের করে। সেটা এনে নৌশির হাতে দিয়ে বলে,
— নাও, চকলেট খাও।
নৌশি বক্সটার দিকে একবার তাকিয়ে ফিরিয়ে দিয়ে বলে,
— না, কিটক্যাট।
রুদ্রিক এবার নৌশির পাশে বসে শান্ত গলায় বলে,
— খেয়ে দেখো, এটা অনেক মজা।
— না। আমি কিটক্যাট খাবো। আপনি কিটক্যাট আনেননি কেন?
রুদ্রিক এবার একটা রাফায়েলো চকলেট খুলে চকলেটটা নৌশির মুখের সামনে ধরে বলে,
— হা করো। যদি মজা না লাগে, তাহলে যেটা বলবে সেটাই করবো।
নৌশি একবার রুদ্রিককে দেখে তারপর চকলেটটা মুখে নিয়ে চিবাতে শুরু করে। প্রথম চিবানি দিতেই মুখের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে ক্রিমি টেস্ট। ভেতরের নরম পুর আর বাইরের মিষ্টি ক্রাঞ্চি আবরণ মিলিয়ে চকলেটটা নৌশির কাছে ভীষণ মজার লাগে। কিন্তু পাশেই রুদ্রিককে অধীর আগ্রহে তার মতামত জানার অপেক্ষায় দেখে নৌশি সুর ঘুরিয়ে মুখ গম্ভীর করে বলে,
— না, মজা না। এখন আমার কথা শুনুন।
রুদ্রিক বুঝতে পারে নৌশির চাল। তাই বলে,
— মজা না? আচ্ছা, ঠিক আছে।
বলেই চকলেটের বক্সটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় রুদ্রিক। বলে,
— বাকিটা আমি একা খাবো।
রুদ্রিক যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই নৌশি তড়িঘড়ি করে রুদ্রিকের হাত ধরে ফেলে।
— না না! আমি খাবো।
রুদ্রিক ভ্রু উঁচিয়ে নৌশির দিকে তাকায়।
— তুমি খাবে মানে? তোমার কাছে তো মজা লাগেনি!
নৌশি মুখ বাঁকিয়ে বলে,
— মজা লাগছে অনেক। দিন, পুরোটা আমি খাবো।
নৌশির কথা শুনে রুদ্রিকের মুখে হাসি ফুটে উঠে। নৌশির পাশে বসে। আর নৌশি সুযোগ বুঝে বক্সটা নিজের কাছে নিয়ে নেয়। রুদ্রিক মুচকি হেসে বলে,
— সেদিন এই চকলেটটার কথাই বলছিলাম। কিটক্যাট থেকে মজা না?
নৌশি এবার উপর নিচ মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
— হুমমম। আমি আগে কখনো খাইনি। আজকেই প্রথম খেয়েছি। আপনি প্রতিদিন আনবেন তো আমার জন্য এটা?
রুদ্রিক হেসে বলো,
— আচ্ছা, আনবো।
নৌশি খুশি হয়ে বলে,
— আচ্ছা, এখন আমি এই চকলেটটা খাই। তারপর আতাফল খাবো।
এই ছবিটার লেখাটাও টাইপ করে দিলাম:
*অধরা মিনহা – Odhora Minha*
রুদ্রিক আচ্ছা বলে চেঞ্জ করতে চলে যায়। নৌশি বিছানার ওপর আরাম করে বসে চকলেট খেতে থাকে। কিছুক্ষণ পর রুদ্রিক ড্রেস চেঞ্জ করে ল্যাপটপ নিয়ে এসে বিছানায় বসে। যেহেতু হসপিটাল থেকে আগেভাগেই বাসায় চলে এসেছে, তাই অযথা সময় নষ্ট না করে ল্যাপটপে নিজের রিসার্চের কাজে মনোযোগ দেয়। পাশেই বসে নৌশি একের পর এক চকলেট খাচ্ছে। খেতে খেতেই হঠাৎ রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
— আপনি আসলে দিনদিন ভালো জামাই হচ্ছেন। খুব পছন্দ হচ্ছে ব্যাপারটা আমার।
রুদ্রিক কাজে মনোযোগী থাকায় কোনো উত্তর দেয় না। নৌশি চকলেট খেতে খেতে আবার বলে,
— আমাদের এই সুন্দর মোমেন্টটাকে মানুষের সাথে শেয়ার করা উচিত।
কথাটা শুনে রুদ্রিক একবার নৌশির দিকে তাকায়। তারপর আবার ল্যাপটপে মনোযোগ দেয়। নৌশি নিজের ফোন বের করে সেলফি স্টাইলে ধরে এক হাতে রুদ্রিককে দেখিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে বলে,
— হেই গাইজ! এই দামড়াটা আমার হাসবেন্ড। একে রাস্তাঘাটে অন্য কোনো মেয়ের সাথে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে দুজনকেই জুতোপেটা করে বেঁধে আমাকে কল দিবেন। আল্লাহ হাফেজ, গাইজ। আমি আমার স্বামীকে অনেক ভালোবাসি।
হঠাৎ রুদ্রিক চমকে পাশ ফিরে তাকাতেই দেখে, নৌশি ফোন হাতে নিয়ে ফেসবুকে লাইভে আছে! মুহূর্তেই রুদ্রিকের চোখ কপালে ওঠার উপক্রম। নিজের কপালে হাত ঠেকিয়ে হতাশ কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলে উঠে,
— আল্লাহ, তুমি আমার ওপর রহম করো!
চলবে?
#তবুও_তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি
#লেখনীতেঃ_অধরা_মিনহা
#পর্ব_১৭
[ ৬ হাজারের বেশি শব্দের বিশাল পর্ব। এই পর্বে কাল রাত ৮টার মধ্যে ৬ হাজার লাইক করে দিবেন। ধন্যবাদ। 💜 ]