বউয়ের গালে থাপ্পড় মারার অপরাধে কলেজের ইকোনমিকসের জহির স্যারকে বেল্ট দিয়ে বেধরোক পেটাচ্ছে রুদ্রিক। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন প্রিন্সিপালসহ কলেজের সব টিচার কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবাই ভয়ে একেবারে চুপসে গেছে। রুদ্রিকের চোখে আগুনের ফুলকি। ফর্সা মুখটাও রাগে লাল হয়ে গেছে। রাগে কপালের রগও ফুলে উঠেছে। হাতে থাকা বেল্টটা এক সেকেন্ডের জন্যও থামছে না। একের পর এক বেল্টের আঘাতে পুরো রুম কাঁপিয়ে জহির স্যারের চিৎকার ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
একটু আগের ঘটনা। প্রিন্সিপাল স্যার নিজের রুমে বসে মনোযোগ দিয়ে কিছু কাগজপত্র পড়ছিলেন। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ে। প্রিন্সিপাল ভেতরে আসার অনুমতি দেন,
— ভেতরে আসুন।
অনুমতি পেয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে রুদ্রিক। পায়ে কালো বুট জুতা, পরনে সাদা শার্ট, কালো ওয়েস্টকোট আর কালো প্যান্ট। রুদ্রিকের ব্যক্তিত্বে এমনিতেই গাম্ভীর্য রয়েছে তবে আজ চেহারার কঠোরতা দেখে প্রিন্সিপাল স্যার কিছুটা অবাক হলেন।
প্রিন্সিপাল দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বলেন,
— কেমন আছেন?
রুদ্রিক কোনো উত্তর দেয় না। গম্ভীর চোখে তাকিয়ে সোজা এগিয়ে যায়। রুদ্রিকের এমন নীরবতা আর কঠিন মুখ দেখে প্রিন্সিপাল স্যার কিছুটা বিব্রত হলেন। একই সাথে বুঝতে পারেন, নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে।পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে প্রিন্সিপাল হালকা হাসেন। তারপর নিজের চেয়ার ছেড়ে বেরিয়ে এসে সামনের চেয়ারটা টেনে রুদ্রিককে বসতে বলেন,
— বসুন।
রুদ্রিক একবার প্রিন্সিপালের দিকে তাকিয়ে চেয়ারে বসে। রুদ্রিককে বসতে দেখে প্রিন্সিপালও নিজের চেয়ারে ফিরে যান। এরপর হাসিমুখে জিজ্ঞেস করেন,
— সবকিছু ঠিকঠাক চলছে তো?
রুদ্রিক শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর দেয়,
— সবকিছু ঠিকঠাক নেই বলেই তো আমার এখানে আসতে হয়েছে!
প্রিন্সিপাল স্যার অপ্রস্তুত হয়ে যান। তবুও নিজেকে সামলে শুকনো হাসি দিয়ে বলেন,
— কী হয়েছে?
রুদ্রিকের গম্ভীর মুখ আরো কঠিন হয়ে উঠে,
— আমি কি এই কলেজে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালছি এই জন্য যে, আমার বউকে থাপ্পড় মারা হবে?
কথাটা শুনে প্রিন্সিপাল স্যার যেন আকাশ থেকে পড়েন। বিস্মিত হয়ে বলেন,
— সরি, বুঝতে পারিনি! আপনি কার কথা বলছেন? কাকে মেরেছে?
রুদ্রিকের চোখেমুখে স্পষ্ট রাগ ফুটে উঠে।
— আপনার কলেজের ইকোনমিকস টিচার আমার বউকে কালকে ভরা ক্লাসরুমে থাপ্পড় মেরেছে!
কথাটা শুনেই প্রিন্সিপাল স্যার থমকে যান কিছুক্ষণের জন্য। তার মানে, গতকাল যে মেয়েটাকে থাপ্পড় মারা হয়েছিল, সে রুদ্রিকের বউ! ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই প্রিন্সিপালের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। রুদ্রিকের বউকে থাপ্পড় মারা হয়েছে! এখন কী হবে? রুদ্রিক তো তাদের কলেজের স্পন্সর। আরএম হসপিটাল থেকে প্রতি মাসে এই কলেজ মোটা অঙ্কের ডোনেশন পায়। সেই স্পন্সরের বউয়ের গায়েই হাত তুলেছে কলেজের একজন টিচার!
প্রিন্সিপাল স্যার ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলেন,
— আমি সত্যিই জানতাম না, কালকে যে মেয়েটাকে......
রুদ্রিকের কড়া দৃষ্টি পড়তেই প্রিন্সিপাল তড়িঘড়ি নিজের কথা শুধরে নেন।
— মিসেস মির্জা! আই মিন, কালকে মিসেস মির্জাকে থাপ্পড় মারা হয়েছে, এটা আমি জানতাম না। তবে কালকে জহির স্যারকেও মারা হয়েছে। আমাদের কলেজের আরেকজন প্রফেসর ওনাকে মেরে রক্তাক্ত করেছে।
রুদ্রিক ভ্রু উঁচিয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে,
— সো হোয়াট? আই'ম নট স্যাটিসফাইড।
প্রিন্সিপাল স্যার এবার পুরোপুরি ঘাবড়ে যান।
— আপনি কিভাবে সন্তুষ্ট হবেন? বলুন? আমি সেটাই করবো। আপনি বললে আমি ওই স্যারকে এক্ষুনি বের করে দিচ্ছি।
রুদ্রিক ঠান্ডা গলায় বলে,
— ওকে সামনে আনুন আমার।
— জি, এক্ষুনি পাঠাচ্ছি।
— সাথে সব টিচার উপস্থিত চাই।
— আচ্ছা।
প্রিন্সিপাল স্যার সাথে সাথে পিয়নকে ডেকে জহির স্যারকে নিয়ে আসতে বলেন। একই সাথে কলেজের বাকি সব টিচারদেরও ডেকে পাঠান। কিছুক্ষণের মধ্যেই একে একে সব টিচার এসে হাজির হয়। শুধু আলভী আর জহির স্যার এখনো অনুপস্থিত। আলভী আজ কলেজে আসেনি। গতকাল সেই ঝামেলা করার পর আজ ছুটি নিয়ে নিয়েছে আলভী। এদিকে হঠাৎ সবাইকে প্রিন্সিপালের রুমে ডেকে পাঠানোর কারণ বুঝতে পারছে না কোনো টিচারই। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা ঘটেছে, সেটা বুঝতেও কারো অসুবিধা হচ্ছে না। কলেজের স্পন্সর উপস্থিত, নিশ্চয়ই কোনো জরুরি বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
সেখানে উপস্থিত প্রায় ৪০-৫০ জন টিচার। এরই মধ্যে রুমে এসে উপস্থিত হন জহির স্যার। ভেতরে ঢুকে সবাইকে একসাথে দেখে তিনি একটু অবাক হন। তবে সবচেয়ে বেশি অবাক হন রুদ্রিককে দেখে। প্রিন্সিপাল স্যার জহির স্যারকে দেখিয়ে বলেন,
— উনিই ইকোনমিক স্যার।
রুদ্রিক ঘাড় ফিরে তাকায় জহির স্যারের দিকে। তারপর উঠে দাঁড়ায়। পকেটে দুই হাত গুঁজে গম্ভীর ভঙ্গিতে এগিয়ে যায় জহির স্যারের দিকে। রুদ্রিকের চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, মুখে কঠোরতা। জহির স্যার বুঝতে পারছেন না, কলেজের স্পন্সর ওনাকে এভাবে কেন দেখছেন। তবু কিছুটা ইতস্তত করে রুদ্রিককে জিজ্ঞেস করেন,
— কিছু বলবেন, স্যা...
জহির স্যারের কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ঠাস করে সজোরে একটা থাপ্পড় এসে পড়ে ওনার গালে। আকস্মিক ঘটনায় পুরো প্রিন্সিপাল রুম মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে যায়। উপস্থিত প্রত্যেকের চোখেমুখে বিস্ময়। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছেন না, রুদ্রিক জহির স্যারকে থাপ্পড় মেরেছে। জহির স্যার গালে হাত দিয়ে হতভম্ব হয়ে মাথা তুলে তাকান। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রিকের চোখে আগুন জ্বলছে।
রুদ্রিক দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠে,
— How dare you hit my wife?
কথাটা শুনে জহির স্যার যেন দ্বিতীয়বারের মতো আকাশ থেকে পড়েন। শুধু তিনি না, বাকি টিচারও বিস্ময়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে শুরু করেন। ওয়াইফ?জহির স্যার কখন কলেজের স্পন্সরের বউকে মেরেছে?
জহির স্যার কিছু বুঝতে না পেরে কাঁপা কণ্ঠে বলেন,
— স্যার, আমি কখন আপনার বউকে মারলাম?
রুদ্রিক চোয়াল শক্ত করে কঠোর কণ্ঠে বলে,
— একাদশ শ্রেণির স্টুডেন্ট নাবিহা আরা আমার বউ।
মুহূর্তেই পুরো রুম আবার নীরব হয়ে গেলো। সকলেই হতভম্ব। তার মানে কালকে জহির স্যার যাকে থাপ্পড় মেরেছে সে রুদ্রিকের বউ? রুদ্রিকের কথা শুনে জহির স্যারের বুক কেঁপে উঠে। নিজের চাকরি থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ, সবকিছু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। ঢোক গিলে ভয়ে ভয়ে বলেন,
— আমি জানতাম না নৌশি আপনার ওয়াইফ.....
রুদ্রিক এবার জহির স্যারের কলার চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
— তুই জানিস কি জানিস না, এটা আমার কাছে ম্যাটার করে না। কিন্তু তুই আমার বউয়ের গায়ে হাত তুলেছিস! এটা আমার বুকে হিট করেছে।
ভয়ে জহির স্যারের গলা শুকিয়ে যায়। বলে উঠেন,
— আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি প্রয়োজনে সবার সামনে নৌশির কাছে ক্ষমা চাইব!
কিন্তু ওনার কথায় রুদ্রিকের রাগ কমে না। উল্টো সজোরে ধাক্কা দিয়ে জহির স্যারকে মেঝেতে ফেলে দেয় রুদ্রিক। তারপর হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— নৌশি না। মিসেস মির্জা বল! আমার বউকে ডিসরিসপেক্ট করার রাইটস কারোর নেই।
কথাটা বলেই রুদ্রিক নিজের পরনের বেল্ট খুলতে থাকে। রুদ্রিকের চোখে প্রচন্ড ক্ষোভ, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। উপস্থিত টিচারদের ভয়ে নিঃশ্বাস আটকে যাওয়ার মতো।
রুদ্রিক দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— আর কেউ যখন স্পর্ধা করে আমার ওয়াইফকে অসম্মান করে, তাকে তার সম্মান আমি ভেঙে চুরমার করবো।
পরমুহূর্তেই বেল্ট দিয়ে একের পর এক বারি করতে শুরু করে রুদ্রিক। প্রতিটা আঘাতে ছটফট করতে থাকেন জহির স্যার। যন্ত্রণায় কাঁদতে কাঁদতে বারবার ক্ষমা চাইতে থাকেন,
— স্যার, মাফ করে দিন! আমি আপনার বউয়ের পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইবো, তবুও মাফ করে দিন!
কিন্তু রুদ্রিকের হাত থামে না। উল্টো বেল্ট মারতে মারতে বলে,
— আমার বউয়ের চোখ দিয়ে যত ফোঁটা পানি পড়েছে, তার চেয়ে তিন গুণ বেল্টের বাড়ি তুই পাবি!
এভাবেই টানা বিশ মিনিট ধরে জহির স্যারকে মারতে থাকে রুদ্রিক। ততক্ষণে বেল্টের বারি সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে জহির স্যার। অথচ রুদ্রিকের থামার নাম নেই। অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা শরীরেও আঘাত করতে যাচ্ছে। অবশেষে যখন নিজের রাগ কিছুটা প্রশমিত হয়, তখন বেল্ট মারা বন্ধ করে রুদ্রিক। কয়েক সেকেন্ড মেঝেতে অচেতন হয়ে পড়ে থাকা জহির স্যারের দিকে তাকিয়ে রইল থাকে রুদ্রিক। তারপর মুখ ঘুরিয়ে প্রিন্সিপাল স্যারের দিকে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলে,
— একে আমার হসপিটালে পাঠিয়ে দিয়েন। ফ্রি চিকিৎসা দিয়ে দিবো।
প্রিন্সিপাল স্যার ভয়ে শুধু মাথা নাড়েন। মুখ দিয়ে কোনো কথা বের করার সাহস হলো না ওনার। রুদ্রিক বেল্টটা আবার পরতে পরতে কড়া হুশিয়ারি দিয়ে বলে,
— একে যেন আর নেক্সট টাইম এই কলেজে না দেখি। দেখলে এর পরিণাম এই কলেজ ভুগবে......
প্রিন্সিপাল স্যার তড়িঘড়ি বলে উঠেন,
— না, না! একে আজকেই বের করে দিবো।
বেল্ট পরা শেষ করে রুদ্রিক এবার উপস্থিত সব টিচারদের দিকে তাকায়। রুদ্রিকের চোখের কঠোর দৃষ্টি দেখে সবাই আরো সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
রুদ্রিক গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
— আশা করি, এরপর আর কেউ সাহস পাবে না আমার বউকে অসম্মান করার?
সব শিক্ষক একসাথে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। অর্থাৎ, না। আর কেউ এমন সাহস করবে না।
এবার রুদ্রিকের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে প্রিন্সিপালের ওপর। কঠোর গলায় বলে,
— You must ensure that my wife is treated with respect. কেউ যেন আমার বউয়ের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস না করে। নেক্সট টাইম আমার বউকে নিয়ে সামান্য অসম্মানজনক কথা বলা হলেও এই কলেজের অস্তিত্ব মুছে দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো।
প্রিন্সিপাল স্যার কোনো রকম আপত্তি করেন না। করার সাহসও ওনার নেই। মনে মনে হিসাব কষেন, একজন টিচার চলে গেলে কলেজের ক্ষতি হবে না কিন্তু রুদ্রিকের সাথে শত্রুতা করে স্পন্সর হারালে যে ক্ষতি হবে, তা সামলানো অসম্ভব! তাই টিচারের চাকরি যাক, তবুও স্পন্সর যেন শান্ত থাকেন। কারণ রুদ্রিক মির্জার সাথে লাগার পরিণতি যে তাদের পুরো কলেজকে ভোগ করতে হবে!
রাত তখন নয়টা। সবেমাত্র বাড়ি ফিরেছে রুদ্রিক। রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই তার চোখে পড়ে নীরবতা। অথচ এই রুমটা সারাক্ষণ নৌশির চঞ্চলতা আর দুষ্টুমিতে জমজমাট হয়ে থাকতো! মেয়েটার হাসি, বকবকানি আর ছোটাছুটিতে চারপাশ মুখরিত থাকতো। কিন্তু আজ সবকিছু কেমন নিস্তব্ধ! নিস্তব্ধ থাকারই কথা। রুমের সেই চঞ্চল মেয়েটা আজ অভিমানে চুপ হয়ে আছে। গতকাল শপিং থেকে ফেরার পর রুদ্রিকের সাথে একটা টুঁ শব্দও করেনি নৌশি। সারারাত কেঁদেছে মেয়েটা।
রুমে ঢুকেই সোফার ওপর পড়ে থাকা শপিং ব্যাগগুলোর দিকে চোখ যায় রুদ্রিকের। গতকাল এত শখ করে কেনা ড্রেস আর পান্ডা কস্টিউমগুলো অনাদরে পড়ে আছে। একবার ছুঁয়েও দেখেনি নৌশি। যে মেয়েটা এগুলো কেনার সময় আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলো, সেই মেয়েটাই আজ সেগুলোর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। সব রাগ তার ওপর। রুদ্রিকের ওপর! বাবার দেওয়া চুড়িগুলো ভেঙে ফেলার যে অপরাধটা রুদ্রিক করেছে, সেটার আদৌও ক্ষমা পাবে? নৌশির কাছে চুড়িগুলো নিছক কিছু অলংকার ছিল না, ছিল বাবার ভালোবাসা আর অসংখ্য আবেগের স্মৃতি।
রুদ্রিক একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নেয়। রুম খালি। নৌশি নিশ্চয়ই বেলকনিতে বসে আছে! ধীর পায়ে বেলকনির দিকে এগিয়ে যায় রুদ্রিক। দরজার চৌকাঠে দাঁড়াতেই কানে ভেসে আসে নৌশির মিষ্টি কণ্ঠের গান,
— পাব কি পাব না জানি না। তোমাকে তো বুঝি না।
বেলকনির দোলনায় বসে সামনের বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে আপনমনে গান গাইছিলো নৌশি। রুদ্রিক চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নৌশির গানের বাকি সুরটুকু টেনে নিয়ে নিজেই গেয়ে উঠে,
— #তবুও_তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি। বেঁচে থেকেও যেন মরেছি। তোমার নামে বাজি ধরেছি, ধরেছি।
হঠাৎ নিজের গানের সাথে পুরুষকণ্ঠ শুনে চমকে উঠে নৌশি। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখে, বেলকনির চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গান গাইছে রুদ্রিক। নৌশির ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে যায়। কেমন যেন একটা পরিচিত অনুভূতি হলো। ঝাপসা ঝাপসা কিছু স্মৃতি মনের মধ্যে ভেসে উঠতে লাগল। বছর তিনেক আগের একটা ঘটনার সাথে এই মুহূর্তটা মিলে যাচ্ছে। ঘটনাটা ছিল আশ্চর্য রকমের, তাইতো নবম শ্রেণিতে পড়া নৌশির মনে ব্যাপারটা বেশ ভালোভাবেই গেঁথে গিয়েছিল। প্রথম পনেরো-বিশ দিন তো ঘটনাটা তার মাথা থেকে যাচ্ছিলই না। তারপর সময়ের সাথে সাথে স্মৃতিটা ঝাপসা হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু আজ একই রকম একটা ঘটনা ঘটতেই পুরোনো স্মৃতিটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। নৌশি আরো কিছু ভাবার আগেই গত রাতের কথা মনে পড়ে যায়। রুদ্রিকের করা জঘন্য কাজ! মুহূর্তেই অভিমান এসে নৌশির বুকটা ভারী করে দেয়। ততক্ষণে রুদ্রিকের গানও শেষ হয়ে গেছে। নৌশি সাথে সাথে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আবারো সামনের আকাশের দিকে দৃষ্টি স্থির করে। কিন্তু মনের ভেতরটা কেমন খচখচ করতে থাকে। পুরোনো কিছু স্মৃতি আর রুদ্রিকের উপস্থিতি—দুটো মিলিয়ে মনটা হঠাৎ অশান্ত হয়ে উঠে।
রুদ্রিক নৌশির মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দেখেও কিছু বলে না। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে নৌশির পাশে দাঁড়ায়। প্রায় এক মিনিট দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু নৌশির কোনো হেলদোল নেই। মেয়েটা তাকে দেখেও দেখছে না! অবশেষে রুদ্রিক সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে নরম স্বরে ডাকে,
— নাবিহা?
কোনো উত্তর দেয় না নৌশি। শুনেও না শোনার ভান করে সামনের দিকেই তাকিয়ে থাকে। রুদ্রিক এবার আরো কোমল স্বরে বলে,
— কথা বলবে না আমার সাথে?
নৌশি এবার মুখ ঘুরিয়ে রুদ্রিকের দিকে তাকায়। চোখেমুখে জমে থাকা অভিমানটুকু স্পষ্ট করে দিয়ে কাঠকাঠ গলায় বলে,
— কথা? আমার তো আপনার চেহারাটাও দেখার ইচ্ছা নাই। চলে যান।
রুদ্রিক নৌশির কথায় রাগ করে না। বরং হাতে থাকা একটা বক্স নৌশির কোলের ওপর রেখে বলে,
— এটা খুলে দেখো। কথা বলার ইচ্ছা হতে পারে।
বক্সটা দেখেই নৌশির মেজাজ আরো খারাপ হয়। তার বাবার দেওয়া চুড়িগুলো ভেঙে দিয়ে এখন হয়তো দামি কিছু কিনে এনেছে লোকটা! কিন্তু তাতে তার কী? পৃথিবীর যত দামি জিনিসই হোক না কেন, বাবার দেওয়া চুড়িগুলোর চেয়ে দামি কিছু তার কাছে নেই। রাগে বক্সটা তুলে ছুড়ে মারতে গিয়ে বলে,
— খুলবো না আর না......
কথা শেষ হওয়ার আগেই রুদ্রিক নৌশির হাত ধরে ফেলে,
— এটা ভাঙলে পস্তাবে!
নৌশি ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
— কেন পস্তাবো? খুব দামি কিছু?
রুদ্রিক নৌশির দিকে সামান্য ঝুঁকে নৌশির চোখে চোখ রাখে। তারপর কোমল কণ্ঠে বলে,
— খুব দামি, তোমার জন্য।
কথাটা শুনে নৌশির রাগ আরো বেড়ে যায়। লোকটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আবারো তাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে সে গরিব! তার কাছে দামি জিনিসের কোনো মূল্য নেই, যদি সেখানে বাবার ভালোবাসা না থাকে। নৌশি দিগুণ রেগে গিয়ে বলে,
— আপনার এই দামি জিনিস আমার কাছে এক পয়সারও দাম না। থু দিবো এটার ওপর!
রুদ্রিক এবার শান্ত গলায় প্রশ্ন করে,
— নিজের বাবার জিনিসের ওপর থু দিতে পারবে?
কথাটা শুনেই থমকে যায় নৌশি। অবাক চোখে তাকিয়ে বলে,
— মানে? বাবার জিনিস?
রুদ্রিক ধীরে মাথা নাড়ে।
— হুম, খুলে দেখো।
কথাটা বলে নৌশির কাছ থেকে একটু সরে দাঁড়ায় রুদ্রিক। নৌশি একবার রুদ্রিকের দিকে তাকায় তারপর হাতের বক্সটার দিকে চোখ নামায়। মনের ভেতর অজানা কৌতূহল জেগে উঠে। ধীরে ধীরে বক্সটা খুলতেই বিস্ময়ে নৌশির চোখ বড় হয়ে যায়। ভেতরে রাখা রেজিন দিয়ে তৈরি একজোড়া চুড়ি আর কানের দুল। আর সেগুলো তৈরি তার বাবার দেওয়া সেই ভাঙা চুড়িগুলো দিয়ে! কী অপূর্ব সুন্দর দেখতে! ভাঙা চুড়িগুলোকে এমনভাবে নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে যে চোখ ফেরানো দায়। পুরোনো স্মৃতিগুলো নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
নৌশি বিস্মিত চোখে রুদ্রিকের দিকে তাকায়। ঠোঁট কাঁপিয়ে বলে,
— ভাঙা চুড়িগুলো.....
রুদ্রিক মৃদু স্বরে বলে,
— তোমার বাবার দেওয়া চুড়িগুলো! যেগুলো কাল আমি ভেঙেছিলাম। ওগুলো তো আমি জোড়া লাগাতে পারবো না। তবে ভাঙা চুড়িগুলো দিয়ে নতুন রূপে, নতুনভাবে দিলাম। আই উইশ, তোমার এটা ভালো.....
— ভীষণ ভালো লেগেছে!
নৌশি সাথে সাথে বলে উঠে। রুদ্রিক একটু অবাক হয়ে তাকায়।
— হুম?
নৌশি দোলনা থেকে উঠে দাঁড়ায়। নৌশির চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। কিছুক্ষণ আগেও যে মেয়েটার মুখ অভিমানে ভারী হয়ে ছিল, সেই মেয়েটাই এখন খুশিতে ঝলমল করছে।
— এটা অনেক সুন্দর! আমি কত কষ্ট পাচ্ছিলাম আমার বাবার দেওয়া চুড়িগুলোর জন্য। চুড়িগুলো আমার ইমোশন ছিল। ওগুলো ভেঙে গিয়েছিল। আর পড়তে পারব না ভেবে... কিন্তু....
কথা শেষ না করেই নৌশি রেজিনের চুড়িগুলো হাতে পরে নেয়। তারপর হাত দুটো রুদ্রিকের সামনে মেলে ধরে খুশিতে বলে,
— কিন্তু এখন আমি পড়তে পারছি!
এরপর বক্স থেকে কানের দুলগুলো বের করে কানে পরতে পরতে বলে,
— আমার বাবার স্মৃতি নষ্ট হয়নি। উল্টো আমার কাছে আছে নতুন রূপে।
নৌশির মুখে সেই প্রাণখোলা হাসিটা ফিরে আসতেই রুদ্রিকের ঠোঁটের কোণেও মৃদু হাসি ফুটে উঠে। গত রাত থেকে যে মেয়েটা কাঁদছিল, অভিমানে মুখ ভার করে ছিল, আজ সেই মেয়েটাই হাসছে। রুদ্রিক চুপচাপ তাকিয়ে রইল নৌশির দিকে। নৌশি চুড়িগুলোর দিকে কিছুক্ষণ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ কী মনে করে যেন হাত থেকে চুড়িগুলো খুলে যত্ন করে বক্সের ভেতর রেখে দেয়। তারপর কানের দুলগুলোও খুলতে শুরু করে।
নৌশির এমন কাণ্ড দেখে রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে অবাক গলায় জিজ্ঞেস করে,
— খুলে ফেলছো কেন?
নৌশি কানের দুলগুলো বক্সে রেখে ঢাকনাটা বন্ধ করে। তারপর রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
— এগুলো সাবধানে রেখে দিচ্ছি। আপনার ওপর তো কোনো ভরসা নেই। বলা নেই, কওয়া নেই, হুট করে রাগ উঠে যাবে। তারপর আবার আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে চুড়িগুলো ভেঙে ফেলবেন। কিন্তু এবার চুড়িগুলো ভাঙলে আপনার হাড়গোড় ভাঙবো আমি!
শেষের কথাটা নৌশি রুদ্রিককে ভেংচি কেটে বলে। তারপর বক্সটা নিয়ে রাখতে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই রুদ্রিক নৌশির হাত ধরে আটকে দেয়। নৌশি থেমে যায়। ঘুরে তাকায় রুদ্রিকের দিকে। রুদ্রিক একদম শান্ত। চোখেমুখে সেই চিরচেনা কাঠিন্য নেই। দৃষ্টিতে এক ধরনের ক্লান্ত বিষণ্নতা যেন এই মুহূর্তে নৌশির কাছে নিজের সমস্ত জেদ নিয়ে হেরে বসে আছে। রুদ্রিকের চোখের গভীরতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, বুকের ভেতর জমে থাকা অনুভূতিগুলো আর আগের মতো করে সামলে রাখতে পারছে না।
রুদ্রিক ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করে,
— খুব বেশি লেগেছিল?
নৌশিও চুপ হয়ে যায়। রুদ্রিকের এমন নরম, কোমল কণ্ঠস্বর শুনে মুহূর্তেই তার সব দুষ্টুমি থমকে যায়। অবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শুধু বলে,
— হুমম?
রুদ্রিক নৌশির হাতটা আলতো করে ওপরে তুলে ধরে। রুদ্রিকের দৃষ্টি স্থির হলো নৌশির হাতের ওপর।
— কেটে গেছে?
নৌশি শান্ত চোখে রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
— না, কাটেনি।
রুদ্রিক হাতটার দিকে তাকিয়েই নিচু স্বরে বলে,
— সরি, নাবু।
কথাটা শুনে নৌশি কয়েক মুহূর্ত রুদ্রিকের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। রুদ্রিকের এমন নরম হয়ে যাওয়া, এমন শান্ত থাকা নৌশির কাছে বেশ অদ্ভুত লাগছে। তারপরই হঠাৎ নৌশির মাথায় একটা শয়তানি বুদ্ধি খেলে যায়। রুদ্রিককে একটু জ্বালানোর লোভ সামলাতে না পেরে দুষ্টু হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বলে,
— কি বললেন? শুনিনি। আরেকবার বলবেন?
রুদ্রিক নিজেও বুঝতে পারেনি, ঠিক কোন গভীর আবেগের টানে সে এতটা নরম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নৌশির এমন প্রশ্ন শুনে চোখ তুলে তাকাতেই যখন নৌশির মুখে দুষ্টুমি দেখে, তখনি সমস্ত কোমলতা মুহূর্তে উধাও যায়। ফট করে নৌশির হাত ছেড়ে দিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
— কিছু না। যাও, রুমে যাও।
নৌশি সাথে সাথে বলে,
— ওটা আমি যাচ্ছিলামই। আপনিই হাত ধরে আটকালেন!
কথাটা বলেই জয়ের হাসি মুখে নিয়ে রুমের ভেতর চল যায় নৌশি। রুদ্রিকও আর কিছু না বলে নৌশির পেছন পেছন রুমে ঢুকে। নৌশি চুড়ির বক্সটা সযত্নে কাভার্ড খুলে ড্রয়ারের ভেতর রাখে। তারপর কাভার্ড বন্ধ করে এগিয়ে গিয়ে সোফার ওপর রাখা গতকালের শপিং ব্যাগগুলো তুলে বিছানায় এনে রাখে। বিছানার ঠিক মাঝখানে বসে একে একে ব্যাগ খুলতে শুরু করে। প্রতিটা ব্যাগ খোলার সময় নৌশির চোখেমুখে উপচে পড়ছে আনন্দ। ঠোঁটে লেগে আছে মিষ্টি হাসি আর বাচ্চামো।
রুদ্রিক সোফায় বসে নৌশির কান্ড কারখানা দেখছে। মেয়েটার মধ্যে চঞ্চলতা ফিরেছে দেখে রুদ্রিকের নিজের বুকটাও হালকা হয়। এতক্ষণ যে ভারটা বুকের ওপর পাথরের মতো চেপে বসেছিল, তা এখন সরে গেছে নৌশিকে হাসতে দেখে। অজান্তেই রুদ্রিকের ঠোঁটের কোণেও ফুটে উঠে মৃদু হাসি। নৌশি ব্যাগ থেকে ড্রেসগুলো বের করে একপাশে রাখতে রাখতে হঠাৎ রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বলে,
— আপনি তো আমাকে সাজুনির জিনিস কিনে দেন নাই!
রুদ্রিকের ঠোঁটে সামান্য হাসি ফুটে।
— আচ্ছা, দিবো সাজুনির জিনিস কিনে। আগে পান্ডাগুলো খুলে দেখো? কালকে আনার পর তো ছুঁয়েও দেখোনি।
নৌশি হেসে ফেলে।
— পান্ডাগুলো অনেক মিস করছিলাম। ভেতরটা যে কি ছটফট করছিল এগুলো খুলে দেখার!
রুদ্রিক ভ্রু তুলে প্রশ্ন করে,
— তো খুলে দেখলে না কেন?
নৌশি ঠোঁট উল্টে বলে,
— ওমা! আমি রাগ করেছিলাম না?
— এখন রাগ ভাঙছে?
নৌশি দুষ্টু চোখে তাকিয়ে বলে,
— না ভাঙছে বললে কি আরো কিছু দিবেন?
রুদ্রিক ঠোঁটের কোণে হাসি ধরে রেখে বলে,
— চাইতে পারো, দিতেও পারি।
নৌশির চোখেমুখে মুহূর্তেই আনন্দের ঝিলিক খেলে যায়।
— আচ্ছা, আমি রাতে লিস্ট করে দিবো।
রুদ্রিক একটু অবাক হয়ে তাকায়।
— লিস্ট?
— হুমমমম। অনেকগুলো না? ভুলে যাবেন তো!
নৌশির এমন নির্লজ্জ স্বীকারোক্তি শুনে রুদ্রিক অন্যদিকে ঘাড় ফিরিয়ে ঠোঁট চেপে হাসি সামলায়। মেয়েটা এমন কেন? সারাক্ষণ দুষ্টুমি আবার মনের সব কথা একেবারে মুখের ওপর বলে দেওয়া! মেয়েটাকে বোঝা সত্যিই মুশকিল। এই মেয়েটা যে একেবারেই অন্যরকম!
চলবে?
#তবুও_তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি
#লেখনীতেঃ_অধরা_মিনহা
#পর্ব_১৬ [ শেষাংশ ]
[