ফন্ট সাইজ:
থিম:
ম্যারিড লাইফ

৩১তম পর্ব

লেখক: রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎#ম্যারিড_লাইফ্

‎#পর্ব_৩১

‎#রঙ্গনা_মৈত্র_ঊর্মি

‎

‎ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি জাগেনি। জানালার কাঁচ বেয়ে নেমে আসা ফ্যাকাশে আলো ঘরের মেঝেতে সরু সরু রেখা টেনে দিয়েছে। বাইরে কোথাও একটা কাক ডাকছে, দূরে মসজিদ থেকে এক সুরেলা স্বর। সৃষ্টিকর্তার নামে।

‎ঘরজুড়ে এক বৈরী নীরবতা। যেন রাতের সব কোলাহল ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, আর সকাল এসে পা টিপে টিপে হাঁটছে।

‎খাটের ঠিক মাঝখানে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে সাদা চাদরটা। বালিশের একপাশে মুগ্ধার খোঁপা খুলে যাওয়া চুলগুলো মেঘের মতো ছড়িয়ে আছে। আর তার মাথাটা?

‎ইখতিয়ারের উদাম বুকের ওপর। বুকের পশমাবৃত শক্ত পাঁজরটা এখন মুগ্ধার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ বালিশ। ইখতিয়ার ঘুমিয়ে আছে। গভীর, শান্ত ঘুম। নিঃশ্বাসের সাথে তার বুকটা ওঠানামা করছে, আর সেই ওঠানামার তালে তালে মুগ্ধারও হৃদপিণ্ড দুলছে। মুগ্ধার চোখে ঘুম নেই। একদম নেই।

‎সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মানুষটার দিকে।

‎

‎ঘুমন্ত ইখতিয়ারকে এমন কাছ থেকে এমন উ'ন্মাদ রুপে এই প্রথম দেখেছে সে। কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা চুল, লম্বা পাপড়ির ছায়া গালে পড়েছে, শক্ত চোয়ালটা এখন নরম। সারাদিনের গম্ভীর, দায়িত্ববান মানুষটা ঘুমের মধ্যে কেমন বাচ্চা হয়ে গেছে। মুগ্ধার বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল। লজ্জা, ভালোবাসা, আর একরাশ অস্বস্তি মিলে গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে গেল। তারপর আবার নীল। বারংবার মনে পড়ছে গতরাতের কথা। বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। ইখতিয়ারের বুকের ওপর নিজের হাতটা দেখে আবারও কেঁপে উঠল।

‎"ছিঃ মুগ্ধা" বিড়বিড় করে নিজেকেই বকল সে।

‎ইখতিয়ারের নিঃশ্বাস গরম হয়ে তার কপালে এসে লাগছে। প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে বুকের ভেতর শিরশির করে উঠছে। মানুষটা কত কাছে! অথচ কত অচেনা লাগছে।

‎আর ভাবতে পারল না মুগ্ধা। লজ্জায় তার কান পর্যন্ত গরম হয়ে গেছে। আস্তে করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। এক ইঞ্চি নড়তেই ইখতিয়ার ঘুমের মধ্যে ভ্রু কুঁচকাল। মুগ্ধার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। যদি জেগে যায়?

‎কয়েক সেকেন্ড পর মানুষটা আবার শান্ত হলো। একটা হাত অসাবধানে মুগ্ধার কোমরটা আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, তারপর আবার ঢলে পড়ল। মুগ্ধা চোখ বন্ধ করে ফেলল। এই মুহূর্তে মাটি ফাঁক হলে ভালো হতো।

‎

‎ধীরে ধীরে, খুব সাবধানে সে উঠে বসল। চাদরটা টেনে নিজের গায়ে জড়াল। পা দুটো মেঝেতে রাখতেই শরীর কেঁপে উঠল। শরীরে-মস্তিষ্কে তার নানান অনুভূতি। ক্লান্তি আছে, লজ্জা আছে, আছে এক অদ্ভুত মিষ্টি ব্যথা। ওয়াশরুমের দরজাটা সে শব্দহীন ভাবে বন্ধ করল। কল ছেড়ে মুখে পানি দিল তিনবার। তবুও গালের লালচে ভাব যাচ্ছে না।

‎আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজেকে দেখে আবারও থমকে গেল।

‎চুলগুলো এলোমেলো। ঠোঁট দুটো ঈষৎ ফোলা। চোখের নিচে রাত জাগার ছাপ। আর গলার কাছে... মুগ্ধা হাত দিয়ে দ্রুত ওড়না টেনে দিল। আয়নার দিকে তাকাতে লজ্জা করছে।

‎"এটা আমি?" নিজেকেই প্রশ্ন করল।

‎আয়নার মেয়েটা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। কালকের মুগ্ধা আর আজকের মুগ্ধার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ যেন। কালকের মেয়েটা স্বাধীন ছিল, আজকের মেয়েটা কারও নামে পুরোপুরি হয়ে গেছে।

‎ ঠান্ডা পানি আবারও ছিটালো মুখে। তবুও বুকের ভেতরের ধুকপুকানি থামছে না। মনে পড়ছে ইখতিয়ারের ঘুমন্ত মুখটা। নিষ্পাপ, শান্ত। ?

‎"আল্লাহ" বিড়বিড় করে দুই হাতে মুখ ঢাকল মুগ্ধা।

‎বাইরে থেকে হালকা বাতাস এসে পর্দা নাড়িয়ে দিল। পাখিরা ডাকছে। নতুন একটা দিন শুরু হয়েছে। আর এই নতুন দিনের শুরুতেই মুগ্ধা নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করল। সে আর আগের মুগ্ধা নেই।

‎ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার আগে একবার শেষবারের মতো আয়নায় তাকাল। ঠোঁটে এক চিলতে লাজুক হাসি। তারপর দ্রুত পায়ে ঘরের দিকে পা বাড়াল। খাটের দিকে তাকাতেই বুক কেঁপে উঠল। ইখতিয়ার এখনও ঘুমিয়ে। আগের মতোই উদাম বুক, আগের মতোই নিশ্চিন্ত ঘুম।

‎মুগ্ধা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আরও একবার দেখল। তারপর লজ্জা মিশ্রিত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দিল। আজকের সকালটা অন্যরকম। কারণ আজ তার মনে নানান রঙের প্রজাপতির উড়ন্ত ছায়া ঘুরছে যে।

‎

‎

‎

‎

‎ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি পেকে ওঠেনি। আকাশের গায়ে হালকা নীলচে আভা, যেন কোনো চিত্রশিল্পী জলরঙে শেষ টান দিচ্ছে। শেখবাড়ির উঠোনে জমে থাকা শিশির বিন্দুগুলো রোদের ছোঁয়া পেয়ে হীরের মতো ঝিকমিক করছে। আমগাছের পাতার ফাঁক গলে আসা আলো মেঝেতে লতাপাতার নকশা এঁকে দিয়েছে। বাতাসে বেলি, শিউলি আর ভিজে মাটির গন্ধ মিলে একটা নরম, শান্ত সকাল।

‎

‎সিঁড়ি বেয়ে পা টিপে টিপে নিচে নামল মুগ্ধা।

‎গায়ে মেরুন পাড়ের সুতি শাড়ি। কুচিগুলো ঠিকঠাক করে নিয়েছে, কিন্তু আঁচলটা বারবার বাতাসে উড়ে যাচ্ছে। সে এক হাতে আঁচলটা বুকের কাছে টেনে ধরল। যেন ভোরের প্রথম আলোয় নিজের কোনো পূর্ণতার ঝলকানি, কোনো এলোমেলোতা কারো চোখে না পড়ে। চুলগুলো খোঁপা করে বাঁধা। কানের পাশে দুটো অবাধ্য চুল গাল ছুঁয়ে আছে।

‎

‎ড্রইংরুমটা নিস্তব্ধ। পাখাটা মৃদু শব্দে ঘুরছে। সোফার একপাশে পা মেলে বসে আছেন রহিমা বেগম। পরনে ধবধবে সাদা থান। মাথার সাদা চুলগুলো খোঁপায় আটকানো। বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়া শরীর, কিন্তু চোখ দুটো এখনও তীক্ষ্ণ। পায়ের গোড়ালি দুটো ফেটে সাদা হয়ে আছে।

‎

‎আর তার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে আছেন ইন্তিয়া বেগম। একটা কাঁসার বাটিতে সরিষার তেল। হাতের তালুতে তেল নিয়ে তিনি যত্ন করে শাশুড়ির পায়ে মালিশ করে দিচ্ছেন। প্রতিটা স্পর্শে বছরের পর বছর জমে থাকা মায়া, অভিমান, দায়িত্ব মিশে আছে।

‎ঘরে আর কেউ নেই। ইসরাফিল আর ইসরায়েল সাহেব ভোরের হাঁটতে বেরিয়েছেন। রাফেয়া বেগমও সকাল সকাল বাগানের দিকে গেছেন।

‎ইন্তিয়া নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "ব্যথাটা কি কমেছে ?"

‎রহিমা বেগম চোখ বন্ধ করে শুধু মাথা নাড়লেন। কোনো উত্তর দিলেন না। তার নীরবতাটাই যেন সবচেয়ে বড় সম্মতি। ঠিক সেই নিস্তব্ধতাটুকু ভেঙে দিল একটা ছুটে আসা শব্দ।

‎দৌড়ে এলো মুগ্ধা। বাচ্চা মেয়ের মতো, লজ্জা আর উচ্ছ্বাস মিশে। পেছন থেকে ঝপ করে জড়িয়ে ধরল ইন্তিয়াকে।

‎"আম্মুউ"

‎

‎ইন্তিয়া চমকে উঠলেন। হাতের তেলের বাটিটা কেঁপে উঠল। পেছন ফিরে মুগ্ধাকে দেখে তার মুখে ফুটে উঠল সকালের রোদের মতো হাসি।

‎"ওমা! কখন উঠলি রে ?"

‎"এই তো। তোমার গলার শব্দ না শুনলে ঘুমই ভাঙে না আমার।"

‎মুগ্ধা ইন্তিয়ার কাঁধে থুতনি রেখে বলল। তার গলায় আবদার, চোখে ঘুমের রেশ। সোফার কোণে বসে থাকা রহিমা বেগম ধীরে ধীরে চোখ মেললেন। সরু চোখে তাকালেন। কিছু বললেন না। একটা শব্দও না। শুধু দেখলেন।

‎দেখলেন কীভাবে একটা মেয়ে আরেকটা মেয়েকে মা ডাকছে। দেখলেন কীভাবে শাশুড়ি-বউমার সম্পর্কটা রক্তের সম্পর্ককেও হার মানাচ্ছে। তার ঠোঁটের কোণে একটা অস্পষ্ট রেখা ফুটে উঠে আবার মিলিয়ে গেল। তিনি নীরব দর্শক। এই বাড়ির সবচেয়ে পুরোনো দেয়ালের মতো, যে সব দেখে, সব বোঝে, কিন্তু কিছু বলে না।

‎ইন্তিয়া মুগ্ধার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

‎"ফ্রেশ হয়েছিস?"

‎মুগ্ধা মাথা নাড়ল।

‎"হ্যাঁ।"

‎"কালরাতে খাসনি, চল নুডলস্ করে দিচ্ছি, নাস্তা হতে দেরী হবে আজ"

‎"নুডলস, ইয়েএএ আমার প্রিয়?"

‎নেচে উঠলো মুগ্ধা। ইন্তিয়া হাসলেন,

‎"হু"

‎মুগ্ধা দুষ্টু হাসল। ইন্তিয়া উঠে দাঁড়ালেন।

‎ "চল তাহলে। আজকে তুই আমার সাথে রান্নাঘরে থাকবি।"

‎

‎মুগ্ধা যাওয়ার আগে একবার রহিমা বেগমের দিকে তাকাল। রহিমা বেগম তখনও চুপ। শুধু চোখ দিয়ে ইশারা করলেন, "যা"

‎সেই চাহনিতে বকা নেই, আদেশ নেই। আছে শুধু এক সমুদ্রের মতো গভীর পর্যবেক্ষণ।

‎

‎রান্নাঘরে ঢুকতেই জল গরমের ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দ। ইন্তিয়া নুডলস্ বসালেন। মুগ্ধা পাশে বসে পেঁয়াজ কুচি করছে। চোখে পানি এসে যাচ্ছে, তবুও ঠোঁটে হাসি।

‎"আম্মু"

‎ মুগ্ধা ফিসফিস করে ডাকল।

‎"বল"

‎"আমাদের বাড়িটা না... এখন আর খাঁ খাঁ করে না। তাই না?"

‎ইন্তিয়া হাত থামিয়ে মেয়েটার দিকে তাকালেন। সকালের আলো এসে পড়েছে মুগ্ধার মুখে। সেই আলোয় মেয়েটাকে নতুন বউ না, বাড়ির মেয়ে লাগছে।

‎"তুই আসার পর থেকেই তো বাড়িটা প্রাণ ফিরে পাইছে রে মা।"

‎ইন্তিয়া মুগ্ধার গালে হাত রাখলেন। তার হাতে লেগে থাকা আটার ছোপ মুগ্ধার গালে লেগে গেল। দুজনেই হেসে উঠল। মুগ্ধা তো এটাই শুনতে চেয়েছিল।

‎

‎চুলায় চায়ের কেটলি শিস দিয়ে উঠল। জানালা দিয়ে ভেসে আসা বাতাসে পর্দা উড়ছে। বাইরে থেকে ভেসে আসছে পাখির ডাক। এদিকে ড্রইংরুমে রহিমা বেগম তখনও একা বসে আছেন। তার সামনে খালি তেলের বাটি। তিনি পা দুটো গুটিয়ে নিলেন। চোখ বন্ধ করলেন। কানে ভাসছে রান্নাঘর থেকে আসা মা-মেয়ের খুনসুটির শব্দ।

‎তিনি কিছু বললেন না। একটা কথাও না।

‎শুধু ভাবলেন, সংসার আসলে এমনই হয়। একটা ঝড় আসে, সব তছনছ করে দেয়। তারপর আবার নতুন কেউ এসে টুকরো টুকরো করে সব জোড়া লাগায়।

‎তার নীরবতাটাই আজকের সকালের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। সেই নীরবতায় মিশে আছে সন্তুষ্টি, স্বস্তি আর আগামীর জন্য একরাশ দোয়া।

‎

‎রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা গরম খাবারের গন্ধে পুরো বাড়িটা মমতায় ভরে উঠল। আর শেখবাড়ির পুরোনো দেয়ালগুলো সেই গন্ধটুকু গায়ে মেখে নিয়ে ফিসফিস শব্দেরা

‎

‎

‎

‎

‎রান্নাঘরের জানালা গলে আসা সকালের রোদ তখন তাওয়ার গায়ে সোনা মাখিয়ে দিচ্ছে। কড়াইয়ে তেল গরম, পেঁয়াজ-মরিচের খুনসুটি আর তার মাঝে কাঁচের বাটিতে ধোঁয়া ওঠা নুডলস্। বাতাসে ভাজা পেঁয়াজ আর শিউলির গন্ধ মিলে একটা ঘরোয়া উৎসব।

‎

‎ইন্তিয়া বেগম চামচ দিয়ে নুডলস্ নাড়তে নাড়তে বললেন,

‎ "মুগ্ধা মা, এই বাটিটা একটু ইশতিয়াকের ঘরে দিয়ে আয় তো। ছেলেটা সেই সক্কাল থেকে বারান্দায় বসে আছে দেখলাম। নিশ্চয়ই পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে।"

‎

‎মুগ্ধা হাত মুছে বাটিটা নিল। গরম ভাপটা আঙুল ছুঁয়ে বুক পর্যন্ত নেমে গেল। বুকের ভেতর কেমন যেন অস্থিরতা।

‎"আচ্ছা আম্মু।"

‎

‎সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে মুগ্ধার মনে হচ্ছিল সে কোনো পরীক্ষার হলে যাচ্ছে। ইশতিয়াক মানে? ইশতিয়াক মানেই একটা চলমান ভূমিকম্প। আর সেই ভূমিকম্পের কেন্দ্রে সে নিজে। ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড, এখন দেবর। এই দুই পরিচয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে মুগ্ধা প্রায়ই দিশেহারা হয়ে যায়।ইশতিয়াকের ঘরের দরজা হালকা ভেজানো। ভেতর থেকে গানের মৃদু শব্দ। মুগ্ধা প্রথমে টোকা দিল। নরম করে। কোনো উত্তর নেই।

‎সে এবার গলার ভলিউম বাড়াল। একদম বেস্ট ফ্রেন্ড মোড অন।

‎"এই ষাঁড়! উঠছিস? নাকি ঘুমের মধ্যে আবার ট্রাকের সাথে ঠুকে গেছিস?"

‎

‎ভেতর থেকে এবারও সাড়া নেই। মুগ্ধা ঠোঁট টিপে হাসল। দরজায় আরেকটা জোরে ধাক্কা।

‎"কিরে? মরে টরে গেলি? মরলে বলে যা। নুডলস্ ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আমার দোষ দিবি পরে।"

‎

‎ক্যাঁচ করে দরজা খুলে গেল। দরজায় ইশতিয়াক। চোখে ঘুমের নেশা। চুলগুলো এলোমেলো, যেন ঝড়ে পড়া তালপাতা। সাদা টি-শার্ট আর ট্রাউজার। পায়ের ব্যান্ডেজটা এখন আগের চেয়ে পাতলা। সে এক হাতে চোখ কচলাচ্ছে, অন্য হাতে দরজার চৌকাঠ ধরে আছে। সকালের আলো এসে পড়েছে তার মুখে। মুগ্ধাকে দেখে সে হাই তুলল।

‎ "সকাল সকাল কাকের মতো কা কা করিস কেন?"

‎"তুই যে কুম্ভকর্ণ তাই।"

‎মুগ্ধা বাটিটা সামনে ধরল।

‎ "নে ধর। আম্মু পাঠাইছে। তোর প্রিয় নুডলস্।"

‎

‎ইশতিয়াক বাটিটা নিয়ে নাকের কাছে ধরল। লম্বা করে শ্বাস নিল।

‎"উম। আম্মুর হাতের জাদু।"

‎তারপর খাটের একপাশে বসে চামচ দিয়ে খুঁচাতে লাগল। মুগ্ধা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল। "খেয়ে নে। আমি গেলাম।"

‎"এত তাড়া কিসের?"

‎ ইশতিয়াক মুখে নুডলস্ দিল।

‎"বস। দুইটা গল্প করি।"

‎"তোর সাথে গল্প? আমার কি খেয়েদেয়ে কাজ নেই?"

‎"আছে তো। ভাইয়ার খবর রাখা।"

‎ইশতিয়াক চোখ টিপল।

‎ "ভাইয়া কই? উঠছে?"

‎

‎প্রশ্নটা কানে লাগতেই মুগ্ধার গাল দুটোতে আগুন ধরে গেল। এক মুহূর্তে সারা মুখ লাল। কান থেকে গলা পর্যন্ত গরম স্রোত বয়ে গেল। সে দ্রুত ওড়নার আঁচল টেনে বুকের কাছে জড়ো করল। চোখ নামিয়ে ফেলল মেঝেতে।

‎"জা... জানি না।"

‎গলার স্বরটা পাখির মতো কেঁপে গেল।

‎

‎"জানবি না কেন? তুই না তার বউ। সকালের ডিউটি তো তোর। ভাইয়া কোথায় সেটাও জানিস না?"

‎ইশতিয়াক নুডলস্ চিবোতে চিবোতে সরু চোখে তাকাল। মুগ্ধা কোনো উত্তর দিল না। জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। আমগাছের পাতাগুলো বাতাসে নাচছে। তার বুকের ভেতর হাজারটা প্রজাপতি উড়ছে। লজ্জা। অস্বস্তি। আর একটুখানি ধরা পড়ার ভয়।

‎

‎ভ্রু উচালো ইশতিয়াক। আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল মুগ্ধার। চোখ কুঁচকে বলল,

‎"কীরে? লজ্জাবতী লতার মতো এমন নুয়ে পড়তেছিস কেন? বিচুটি পাতা লাগছে শরীরে?"

‎মুগ্ধার এতক্ষনের সব লজ্জা যেন মুহুর্তেই উবে গেল। চোখ কটমট করল সে।

‎"চুপ থাক বান্দর"

‎ইশতিয়াক খাওয়া থামাল। তার চোখ আটকে গেল এক জায়গায়। মুগ্ধার গলা। ওড়নাটা একটু সরে গেছে। আর ঠিক সেখানেই... হালকা একটা চিহ্ন।

‎ইশতিয়াকের ভ্রু দুটো কুঁচকে গেল। তারপর ধীরে ধীরে কুঁচকানো ভ্রু জোড়া শয়তানি হাসিতে পরিণত হলো। সে দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরল। হাসি আটকানোর বৃথা চেষ্টা। চোখ দুটো নেচে উঠল।

‎"কী? এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?"

‎

‎ইশতিয়াক চামচটা বাটিতে রাখল। ঝুঁকে বসল। "কিছু না রে ভাবি। শুধু ভাবছিলাম..."

‎"কী ভাবছিলি?"

‎"ভাবছিলাম, সকালের রোদটা বড্ড বেশি ধারালো আজকে।"

‎সে আঙুল দিয়ে জানালার রোদ দেখাল। "এই রোদে না... অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে যায়। যেমন শিশির শুকিয়ে যায়। আবার কিছু দাগ... রোদ পেলে আরও গাঢ় হয়।"

‎আজগুবি বলল ইশতিয়াক। মুগ্ধার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ। গালের লাল আভা আরও গাঢ় হলো।

‎ " বলতে কি চাস?"

‎"আমি? আমি তো কিছুই বলিনি।"

‎ ইশতিয়াক দুই হাত তুলল।

‎ "আমি শুধু আমার বেস্ট ফ্রেন্ডকে বলছি... ছোটবেলা থেকে তোর সব লুকানো জিনিস আমিই প্রথম ধরতাম। ক্লাসে চুপচাপ চিরকুট চালাচালি, টিচারের চোখ ফাঁকি দিয়ে চকলেট খাওয়া। এখন দেবর হয়েছি, দায়িত্বটা একটু বেড়েছে আরকি।"

‎

‎মুগ্ধা রেগে গেল। কিন্তু রাগের মধ্যেও লজ্জা মিশে আছে।

‎"ইশতিয়াক! ফাজলামো করবি না একদম।"

‎

‎"আরে রাগিস কেন?শোন না"

‎ইশতিয়াক হাসতে হাসতে বলল।

‎"আমি তো শুধু অঙ্কের কথা বলছি। ছোটবেলায় অঙ্কে আমরা দুইজনই কাঁচা ছিলাম। মনে আছে? স্যার বলত দুইয়ে দুইয়ে চার হয়। আর আমরা বলতাম পাঁচ হয়। কারণ আমাদের হিসাবে মিল থাকত।"

‎

‎সে থেমে আবার নুডলস্ মুখে দিল। চিবোতে চিবোতে বলল, "আজকালও দেখছি দুইয়ে দুইয়ে পাঁচই হচ্ছে। হিসাবটা দারুণ মিলছে। ভাইয়া কই জিজ্ঞেস করতেই কারো গাল টমেটো হয়ে যাচ্ছে।আবার..."

‎

‎সর টানল ইশতিয়াক। মুগ্ধা আর সহ্য করতে পারল না। লজ্জা, রাগ আর অস্বস্তি মিলে কান গরম হয়ে গেছে। সে পা দিয়ে মেঝে খুঁড়ছে।

‎"তোর সাথে কথা বলাই ভুল। আমি গেলাম।"

‎

‎সে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই...

‎পাশেল ঘর থেকে ভেসে এলো সেই কণ্ঠ। গম্ভীর, শান্ত, অথচ আদেশের মতো। সকালের শান্ত বাতাস চিরে আসা তীরের মতো।

‎"মুগ্ধা!"

‎

‎ইখতিয়ার। নামটা শুনেই মুগ্ধার পা দুটো মেঝের সাথে আটকে গেল। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেন গলা পর্যন্ত উঠে এসেছে।

‎"আ... আসছি।"

‎গলা দিয়ে স্বর বের হলো না প্রায়। ফিসফিস করে।

‎পেছন থেকে ইশতিয়াকের চাপা হাসি।

‎"যাও যাও। বড় ভাই ডাকছে। দেরি করলে আবার সোয়ামি বকবে। গোসসা করবে"

‎সে বাটিটা পাশে রেখে হেলান দিল।

‎ "আর শোনো ভাবি... সকালে রোদে বেশি ঘোরাঘুরি করো না। দাগগুলো পুড়ে যেতে পারে। আর হ্যাঁ... পরেরবার ভাইয়ারে বলবি, না থাক আমি আবার ছোট মানুষ"

‎

‎মুগ্ধা আর পেছন ফিরে তাকাল না। ওড়না খামচে ধরে প্রায় দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামল। বুকের ভেতর হাজারটা ড্রাম বাজছে। গাল দুটো এখনও আগুনের মতো জ্বলছে।

‎আর ইশতিয়াক? সে তখনও হাসছে। জানালা দিয়ে বাইরের রোদ দেখছে। আর মনে নানান দুষ্টামি।

‎শেখবাড়ির সকালটা আবার স্বাভাবিক নিয়মে ফিরল। শুধু মুগ্ধার গালের লাল আভাটা আর ইশতিয়াকের ঠোঁটের কোণের দুষ্টু হাসিটা থেকে গেল। সাক্ষী হয়ে। দেয়ালের পুরনো ঘড়িটা টিকটিক করে জানিয়ে দিল, দিন শুরু হয়েছে। ইশতিয়াক ঠোঁট টিপে বসে আছে। তার আত্মা যেন চেঁচিয়ে বলছে,

‎" খোদাআআআআআ, মেরি জিন্দেগি মে এ্যাসি মর্নিং কাভ আয়েগি? কাভভভভভ?"

‎

‎#চলবে___?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন