### 🖤 BLOOD BOUND
A Novel by Samira ᥫ᭡
### অধ্যায় ৩
কিছু সত্য মানুষকে কাঁদায়, কিছু সত্য সম্পর্ক ভেঙে দেয়। আর কিছু সত্য মানুষের নিজের পরিচয়কেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
### সকাল ৯টা — সিকদার বাড়ি
সকাল থেকেই মেহরীনের মনটা অস্থির।
গত রাতের ঘটনাগুলো কিছুতেই মাথা থেকে সরাতে পারছে না। বিশেষ করে সেই পুরোনো ছবি আর রেকর্ডিংয়ের কথা।
আরমান সিকদার নামের মানুষটি কে? কেন তাঁর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এত বছর ধরে গোপন রাখা হয়েছে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তার জন্মের সঙ্গে এসবের সম্পর্ক কী?
মেহরীন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল। এমন সময় ফোনে একটা মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
"যে সত্যি খুঁজছ, তার উত্তর তোমার ঘরের আলমারিতেই আছে।"
মেহরীন দ্রুত আলমারির দিকে তাকাল।
— এবার আবার কী!
সে আলমারির সব কাপড় সরিয়ে দেখতে লাগল। একসময় পেছনের দিকে ছোট একটা কাঠের বাক্স দেখতে পেল।
বাক্সটা বের করে খুলতেই কয়েকটা পুরোনো চিঠি আর একটা ছবি পাওয়া গেল।
ছবিতে তার মা, বাবা এবং আরেকজন অচেনা নারী।
ছবির পেছনে লেখা—
"আমাদের শেষ দেখা, ১৪ আগস্ট ২০০৮।"
মেহরীন ছবিটা হাতে নিয়ে ভাবতে লাগল।
এই অচেনা নারী কে?
### সকাল ১১টা — লাইব্রেরি
মেহরীন পুরোনো চিঠিগুলো নিয়ে লাইব্রেরিতে গেল।
সেখানে রায়ান বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল।
মেহরীন ঢুকতেই রায়ান চোখ তুলে তাকাল।
— আবার কী খুঁজতে এসেছ?
— আপনাকে না, একটা উত্তর খুঁজতে এসেছি।
— কী উত্তর?
মেহরীন ছবিটা তার সামনে রাখল।
— এই নারী কে?
রায়ান ছবিটা হাতে নিতেই থমকে গেল।
তার চোখে মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল।
— এই ছবি তুমি কোথায় পেয়েছ?
— আমার আলমারিতে।
— কে রেখেছে?
— সেটা জানি না। তবে আপনি নিশ্চয়ই জানেন, উনি কে?
রায়ান ছবিটা টেবিলে রেখে বলল,
— সব ছবি মানুষের পরিচয় বলে না।
মেহরীন বিরক্ত হয়ে বলল,
— আপনার সঙ্গে কথা বলাই বৃথা!
সে চলে যেতে উদ্যত হতেই রায়ান বলল,
— মেহরীন, দাঁড়াও।
মেহরীন থেমে গেল।
— কী?
— ছবির মেয়েটির নাম ছিল নওরীন।
— তিনি কে ছিলেন?
রায়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আরমান চাচার খুব কাছের একজন মানুষ।
মেহরীন অবাক হলো।
— তাহলে তিনি এখন কোথায়?
রায়ান নিচু গলায় বলল,
— সেটাই কেউ জানে না।
### দুপুর ২টা — পারিবারিক খাবারের টেবিল
আজ সবাই একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেতে বসেছে।
মেহরীন খেতে খেতে হঠাৎ প্রশ্ন করল,
— বাবা, নওরীন নামে কাউকে চেনো?
কামরুল সিকদারের হাত থেমে গেল।
নাসরিন বেগমও মেয়ের দিকে তাকালেন।
— এই নাম কোথায় শুনেছ? বাবা জিজ্ঞেস করলেন।
— একটা ছবিতে পেয়েছি।
কামরুল সিকদার গম্ভীর হয়ে বললেন,
— ওই নাম নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন করবে না।
মেহরীন এবার চুপ করে রইল না।
— কেন বাবা? উনি কে ছিলেন?
— আমি বলেছি, প্রশ্ন করবে না!
মেহরীনের চোখে পানি চলে এল।
— তোমরা সবাই আমার কাছ থেকে কী লুকাচ্ছ? আমি কি এই পরিবারের মেয়ে নই?
কথাটা শুনে রওশন আরা বেগমের চোখ ভিজে উঠল।
তিনি মেহরীনের হাত ধরে বললেন,
— এমন কথা বলিস না মা। তুই আমাদের সবার আদরের মেয়ে।
মেহরীন দাদির হাত ধরে বলল,
— তাহলে আমাকে সত্যিটা জানতে দাও।
কেউ আর কোনো কথা বলল না।
### বিকেল ৪টা — ছাদের ওপর
মেহরীন ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল।
আকাশে মেঘ জমেছে। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ।
হঠাৎ রায়ান এসে পাশে দাঁড়াল।
— মন খারাপ?
— আপনার কি মনে হয় না?
— তোমার প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া সহজ হবে না।
মেহরীন তিক্ত হাসল।
— আমি উত্তর চাই, সান্ত্বনা নয়।
রায়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— ছোটবেলায় তুই আর আমি অনেক ঝগড়া করতাম, মনে আছে?
— হ্যাঁ। আপনি সবসময় আমার খেলনা লুকিয়ে রাখতেন।
রায়ানের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।
— আর তুই আমার বইয়ের ভেতরে ফুল রেখে দিতি।
মেহরীনও একটু হাসল।
কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
— রায়ান ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— বল।
— আপনি কি আমাকে কিছু বলতে ভয় পান?
রায়ান তার দিকে তাকাল।
— ভয় পাই না। শুধু চাই না, তুই কষ্ট পাস।
— সত্যি জানলে কষ্ট হলেও আমি মেনে নেব।
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— তাহলে একটা কথা শোন। এই পরিবারের সবাই যা জানে, তার সবটাই সত্যি নয়।
মেহরীন কিছু বলার আগেই রায়ানের ফোন বেজে উঠল।
ফোনের অপর পাশ থেকে কী বলা হলো, তা শুনে রায়ানের মুখের ভাব বদলে গেল।
— কী বলছেন? আবার?
সে দ্রুত ছাদ থেকে নেমে গেল।
মেহরীন বুঝতে পারল, নতুন কিছু ঘটেছে।
### সন্ধ্যা ৬টা — পুরোনো চিঠি
মেহরীন নিজের ঘরে ফিরে চিঠিগুলো খুলে পড়তে শুরু করল।
প্রথম চিঠিতে লেখা—
"কামরুল, আমি জানি তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না। কিন্তু আমার চলে যাওয়ার পেছনে এমন একটা কারণ আছে, যা তুমি জানো না। মেহরীনের জন্মের আগে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেটা আমি ভুলিনি।"
চিঠির নিচে স্বাক্ষর—
আরমান।
মেহরীন অবাক হয়ে গেল।
আরমান চাচা কেন তার বাবাকে চিঠি লিখেছিলেন?
পরের চিঠিটা খুলতেই আরও অদ্ভুত কিছু লেখা দেখতে পেল।
"যদি কখনো মেহরীন এই চিঠিগুলো খুঁজে পায়, তাহলে তাকে বলবে, তার জন্মের রাতের ঘটনাটা দুর্ঘটনা ছিল না।"
মেহরীনের বুক ধক করে উঠল।
জন্মের রাতের ঘটনা?
কী হয়েছিল সেদিন?
ঠিক তখনই দরজা খুলে নাসরিন বেগম ঘরে প্রবেশ করলেন।
মেয়ের হাতে চিঠি দেখে তিনি থমকে গেলেন।
— এগুলো কোথায় পেয়েছিস?
— আলমারিতে।
— মেহরীন, এগুলো তোর পড়ার কথা নয়।
— কেন মা? আমার জন্মের রাতের কথা এখানে লেখা আছে!
নাসরিন বেগমের চোখে পানি চলে এল।
— মা, আমাকে একটু সময় দে।
— আর কত সময় দেব? সবাই শুধু সময় চায়, কেউ সত্যি বলে না!
নাসরিন বেগম মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন।
— আমি তোকে হারাতে চাই না, মা।
মেহরীন অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
— আমাকে হারানোর ভয় কেন তোমার?
নাসরিন বেগম কোনো উত্তর দিলেন না।
### রাত ৯টা — অচেনা ফোনকল
রায়ান নিজের ঘরে বসে ছিল।
হঠাৎ ফোনে একটা কল এল।
নম্বরটা পরিচিত নয়।
— হ্যালো?
অপর পাশ থেকে একটি পুরুষ কণ্ঠ বলল,
— রায়ান, সময় শেষ হয়ে আসছে।
— আপনি কে?
— আমাকে চিনতে পারছ না?
রায়ান চুপ করে গেল।
কণ্ঠটি আবার বলল,
— তোমার পরিবারের যে সত্যিটা এতদিন লুকিয়ে রেখেছ, সেটা এবার মেহরীনের জানার সময় হয়েছে।
রায়ান দাঁত চেপে বলল,
— মেহরীনের কাছ থেকে দূরে থাকুন।
— কেন? ও কি সত্যিটা জানার অধিকার রাখে না?
— আমি বলছি, ওর কাছে আসবেন না!
অপর পাশের মানুষটি হেসে বলল,
— খুব শিগগিরই দেখা হবে, রায়ান।
ফোন কেটে গেল।
রায়ান কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ড্রয়ার থেকে একটা পুরোনো ছবি বের করল।
ছবিতে ছোট্ট রায়ানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি ছেলে।
ছবির পেছনে লেখা—
"দুই ভাই, এক পরিবার, কিন্তু ভাগ্য আলাদা।"
### রাত ১১টা ৪০ মিনিট — শেষ চিঠি
মেহরীন আবার আলমারির কাছে গেল।
বাক্সের ভেতর শেষ একটা খাম পড়ে আছে।
খামটা খুলতেই একটা চিঠি বেরিয়ে এল।
লেখা—
"প্রিয় মেহরীন,
যদি কখনো এই চিঠি তোর হাতে আসে, তাহলে বুঝবি, আমাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে।
তুই যাদের আপন ভাবিস, তাদের মধ্যেই কেউ একজন তোর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছে।
কিন্তু কাউকে দোষ দেওয়ার আগে মনে রাখবি, সব ভুলের পেছনে একটা গল্প থাকে।
আর সেই গল্পের শুরু হয়েছিল তোর জন্মের আগের রাতে।
ইতি, একজন শুভাকাঙ্ক্ষী।"
মেহরীন চিঠিটা বুকের কাছে ধরে বসে রইল।
তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
হঠাৎ ফোনে আবার মেসেজ এল।
"আগামীকাল বিকেল পাঁচটায় বাড়ির গেটে অপেক্ষা করো। তোমার অতীত তোমার সামনে দাঁড়াবে।"
মেহরীন জানালার বাইরে তাকাল।
বাড়ির গেটের সামনে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
গাড়ির ভেতরে বসে থাকা মানুষটি তার ঘরের জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।
লোকটির হাতে সেই একই ছবি।
যে ছবিতে মেহরীনের মা, বাবা এবং নওরীন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।
লোকটি ধীরে ধীরে বলল—
— এবার আর কেউ আমাকে থামাতে পারবে না।
চলবে...