ফন্ট সাইজ:
থিম:
BLOOD BOUND

পর্ব 4

লেখক: Samira appi

### 🖤 BLOOD BOUND

A Novel by Samira ᥫ᭡

### অধ্যায় ৪

কিছু মানুষ হারিয়ে যায় না, শুধু সময়ের অপেক্ষায় থাকে। আর ফিরে আসার দিন তারা সঙ্গে নিয়ে আসে এমন কিছু সত্য, যা একটি পরিবারের ভিত্তি পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিতে পারে।

### সকাল ৮টা — সিকদার বাড়ি

সকালবেলার মিষ্টি রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে প্রবেশ করছে। মেহরীন বিছানায় বসে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে।

গত রাতের সেই অচেনা মেসেজটা এখনও তার মাথায় ঘুরছে।

"আগামীকাল বিকেল পাঁচটায় বাড়ির গেটে অপেক্ষা করো। তোমার অতীত তোমার সামনে দাঁড়াবে।"

কে সেই মানুষ? তার অতীতের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?

মেহরীন ফোনটা পাশে রেখে উঠে দাঁড়াল।

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।

— আপু, নিচে আসবেন? সবাই নাশতার টেবিলে বসেছে।

— আসছি, পাখি।

মেহরীন দ্রুত তৈরি হয়ে নিচে নেমে গেল।

### সকাল ৯টা — ডাইনিং রুম

ডাইনিং টেবিলে সবাই উপস্থিত। কামরুল সিকদার চুপচাপ পত্রিকা পড়ছেন। নাসরিন বেগম খাবার পরিবেশন করছেন।

মেহরীন এসে বাবার পাশে বসল।

— বাবা, তোমাকে একটা কথা বলব।

— বলো।

— আরমান চাচা কি সত্যিই নিখোঁজ হয়েছিলেন?

কামরুল সিকদার পত্রিকা নামিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন।

— হঠাৎ আবার এই প্রশ্ন কেন?

— কারণ আমি তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পেরেছি।

— কে বলেছে তোকে এসব?

— সেটা বড় কথা নয়। আমি জানতে চাই, উনি কোথায় ছিলেন এত বছর?

কামরুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

— কিছু মানুষ নিজের ইচ্ছায় পরিবার থেকে দূরে চলে যায়।

মেহরীন শান্ত গলায় বলল,

— আর কিছু মানুষকে পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়।

কামরুল সিকদারের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

— মেহরীন!

— আমি ভুল বলেছি, বাবা?

কেউ কোনো উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই রায়ান এসে টেবিলে বসল।

— সকাল সকাল আবার কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে?

মেহরীন বলল,

— তোমার প্রিয় বিষয় নিয়ে। পারিবারিক রহস্য!

রায়ান চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল,

— তোমার রহস্য নিয়ে আগ্রহ একটু কমানো উচিত।

— আপনার পরামর্শ নিজের কাছে রাখুন।

নীলা পাশ থেকে হেসে ফেলল।

— আপু, তোমরা দুজন কি কোনোদিন ঝগড়া ছাড়া কথা বলতে পারবে না?

মেহরীন নীলার দিকে তাকিয়ে বলল,

— ওনার সঙ্গে কথা বললেই ঝগড়া হয়ে যায়।

রায়ান হালকা হেসে বলল,

— তাহলে কথা বলা বন্ধ করে দাও।

— ইচ্ছেটা আমারও আছে।

ডাইনিং টেবিলে কয়েক মুহূর্তের জন্য হাসির পরিবেশ তৈরি হলো।

কিন্তু কামরুল সিকদারের মুখে কোনো হাসি নেই।

### দুপুর ১২টা — পুরোনো লাইব্রেরি

মেহরীন লাইব্রেরিতে বসে পুরোনো ডায়েরি পড়ছিল।

হঠাৎ একটা পাতা চোখে পড়ল।

সেখানে লেখা—

"২০০৮ সালের ১৪ আগস্ট। আজ নওরীন আমাদের বাড়িতে এসেছিল। তার সঙ্গে আরমানের কিছু কথা কাটাকাটি হয়। তারপর রাতে এমন একটা ঘটনা ঘটে, যার পর থেকে আমাদের পরিবার আর আগের মতো নেই।"

মেহরীন লেখাটা বারবার পড়ল।

তারপর নিচের অংশে চোখ গেল।

"নওরীন চলে যাওয়ার আগে বলেছিল, একদিন সত্যি সবাই জানতে পারবে। সেদিন কেউ কাউকে ক্ষমা করতে পারবে না।"

মেহরীন ডায়েরিটা বন্ধ করল।

ঠিক তখনই লাইব্রেরির দরজায় নীলা এসে দাঁড়াল।

— আপু, তুমি এখানে?

— হ্যাঁ। কিছু খুঁজছি।

নীলা কাছে এসে বলল,

— আপু, একটা কথা বলব?

— বল।

— কাল রাতে আমি একটা অদ্ভুত ঘটনা দেখেছি।

মেহরীন আগ্রহ নিয়ে তাকাল।

— কী ঘটনা?

— রাত প্রায় বারোটার দিকে বাড়ির পেছনের গেট দিয়ে একজন লোক ঢুকেছিল।

— কে?

— চিনতে পারিনি। কিন্তু লোকটা সরাসরি উত্তর দিকের করিডোরে গিয়েছিল।

মেহরীন অবাক হলো।

— কাউকে বলেছিস?

— না। ভয় পেয়েছিলাম।

মেহরীন নীলার হাত ধরে বলল,

— আর কাউকে বলিস না। আগে আমাকে জানতে দে লোকটা কে।

### বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিট — বাড়ির গেট

মেহরীন বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে।

পাঁচটা বাজতে আর মাত্র পনেরো মিনিট বাকি।

সে গেটের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে।

হঠাৎ দূর থেকে একটা কালো গাড়ি এগিয়ে আসতে দেখা গেল।

গাড়িটা গেটের সামনে এসে থামল।

প্রথমে গাড়ির দরজা খুলল।

তারপর একজন মধ্যবয়সী পুরুষ বাইরে নামলেন।

পরনে কালো পাঞ্জাবি, চোখে কালো চশমা।

লোকটি বাড়িটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— কত বছর পর!

মেহরীন কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।

লোকটি তার দিকে এগিয়ে এসে বললেন,

— তুমি কি মেহরীন?

— জি। আপনি কে?

লোকটি মৃদু হাসলেন।

— আমি এমন একজন, যার নাম এই বাড়িতে উচ্চারণ করাও একসময় নিষেধ ছিল।

মেহরীন অবাক হয়ে বলল,

— আপনি কি আরমান চাচা?

লোকটি মাথা নাড়লেন।

— হ্যাঁ মা। আমি আরমান সিকদার।

মেহরীন কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

— আপনি এত বছর কোথায় ছিলেন?

আরমানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

— সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে এসেছি মা। তবে সব উত্তর একদিনে দেওয়া সম্ভব নয়।

### বিকেল ৫টা ১৫ মিনিট — ড্রয়িংরুম

আরমান বাড়িতে প্রবেশ করতেই রওশন আরা বেগম তাঁকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন।

— আরমান!

আরমান মায়ের সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলেন।

— মা, কেমন আছ?

রওশন আরা বেগম ছেলের মাথায় হাত রেখে কাঁদতে লাগলেন।

— এত বছর পর মনে পড়ল মায়ের কথা?

— ভুলিনি মা। একদিনের জন্যও ভুলিনি।

— তাহলে ফিরে আসিসনি কেন?

আরমান মায়ের হাত ধরে বললেন,

— কিছু বাধা ছিল মা। এমন কিছু বাধা, যেগুলো অতিক্রম করার সাহস আমার ছিল না।

কামরুল সিকদার এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

এবার তিনি সামনে এগিয়ে এলেন।

— নাটক শেষ হয়েছে?

আরমান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

— ভাই, আপনার সঙ্গে অনেক কথা আছে।

— আমার সঙ্গে তোমার আর কোনো কথা নেই।

— কিন্তু আমার আছে।

— এত বছর কোথায় ছিলে, সেটা বলার প্রয়োজন নেই। এই বাড়িতে কেন ফিরে এসেছ, সেটা বলো।

আরমান কিছুক্ষণ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

— আমার পরিবারের কাছে ফিরে এসেছি।

কামরুল তিক্ত হাসলেন।

— পরিবার? তুমি কি এখনও এই পরিবারের অংশ?

আরমান শান্ত গলায় বললেন,

— রক্তের সম্পর্ককে অস্বীকার করলেই কি সেটা শেষ হয়ে যায়?

ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল।

### সন্ধ্যা ৭টা — মেহরীনের প্রশ্ন

মেহরীন নিজের ঘরে বসে ছিল।

হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।

— আসতে পারি?

আরমান চাচা।

— আসুন।

আরমান ঘরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসলেন।

— তোমার সঙ্গে কিছু কথা ছিল, মা।

— বলুন চাচা।

— তুমি কি নওরীনকে চেনো?

মেহরীন মাথা নাড়ল।

— না। তবে তাঁর একটা ছবি পেয়েছি।

আরমানের চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল।

— কোথায় পেয়েছ?

— আমার আলমারিতে। ছবিতে মা-বাবার সঙ্গে তাঁকে দেখেছি।

আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

— নওরীন খুব ভালো মেয়ে ছিল। কিন্তু তার জীবনে অনেক অন্যায় হয়েছিল।

— কী অন্যায়?

— সেটা তোমার বাবা ভালো বলতে পারবেন।

মেহরীন বিরক্ত হয়ে বলল,

— সবাই কেন বাবার কাছে পাঠিয়ে দেন? কেউ কি আমাকে সরাসরি সত্যিটা বলতে পারেন না?

আরমান মৃদু হাসলেন।

— পারি মা। কিন্তু তার জন্য তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে।

তিনি পকেট থেকে একটি ছোট্ট বাক্স বের করলেন।

— এটা তোমার জন্য।

মেহরীন বাক্সটা খুলে দেখল, ভেতরে একটা রুপার লকেট।

লকেটের ওপর ছোট করে লেখা—

M & N

মেহরীন অবাক হয়ে বলল,

— এই অক্ষর দুটো কীসের?

আরমান উত্তর দিলেন না।

শুধু বললেন,

— এটা যত্ন করে রেখো। একদিন বুঝতে পারবে।

### রাত ৯টা — রায়ানের ঘর

রায়ান নিজের ঘরে বসে ছিল।

হঠাৎ দরজা খুলে কামরুল সিকদার প্রবেশ করলেন।

— তোমার সঙ্গে কথা আছে।

— বলুন।

— আরমান ফিরে এসেছে। এখন থেকে মেহরীনের দিকে খেয়াল রাখবে।

রায়ান অবাক হলো।

— কেন?

— কারণ সে যতটা জানে, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু জানার চেষ্টা করছে।

— আপনি কি মনে করেন, চাচা মেহরীনকে সব বলে দেবেন?

কামরুল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— আমি জানি না। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত, নওরীন ফিরে এলে এই পরিবারের আর কিছুই আগের মতো থাকবে না।

রায়ান উঠে দাঁড়াল।

— নওরীন কি সত্যিই বেঁচে আছেন?

কামরুল কোনো উত্তর দিলেন না।

শুধু ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

রায়ান জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

তার মাথায় একটাই প্রশ্ন—

নওরীন যদি সত্যিই ফিরে আসে, তাহলে মেহরীন কীভাবে সবকিছু সামলাবে?

### রাত ১১টা ৫০ মিনিট — অচেনা অতিথি

সিকদার বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।

শুধু আরমান সিকদারের ঘরে আলো জ্বলছে।

তিনি একটা পুরোনো ছবির দিকে তাকিয়ে আছেন।

ছবিতে নওরীন দাঁড়িয়ে আছে।

আরমান ধীরে ধীরে ছবিটা হাতে নিয়ে বললেন,

— নওরীন, আর কতদিন পালিয়ে থাকবে? আমাদের মেয়েটা বড় হয়ে গেছে।

ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।

আরমান ফোন ধরলেন।

— হ্যালো?

অপর পাশ থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে এল।

— তুমি ফিরে এসেছ?

আরমান চমকে উঠলেন।

— নওরীন! তুমি কোথায়?

নারীটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— মেহরীন কেমন আছে?

— ভালো আছে। কিন্তু সে অনেক কিছু জানতে চাইছে।

— ওকে কিছু বলবে না।

— কেন? আর কতদিন ওকে অন্ধকারে রাখব?

নারীটি কাঁপা গলায় বলল,

— কারণ সত্যিটা জানলে ও আমাকে কখনো ক্ষমা করবে না।

আরমান বললেন,

— নওরীন, এবার আর পালিয়ে থেকো না। তোমার মেয়ের সঙ্গে দেখা করো।

ফোনের অপর পাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।

তারপর কল কেটে গেল।

আরমান ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

কিছুক্ষণ পর আবার ফোনে একটা মেসেজ এল।

"আমি ফিরব। তবে তার আগে আমাকে একটা কাজ শেষ করতে হবে।"

আরমান জানালার বাইরে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন,

— তাহলে এবার সত্যিই সবকিছুর শেষ হবে।

### অধ্যায়ের শেষ রহস্য 🖤

সিকদার বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে একজন নারী।

পরনে কালো শাড়ি, খোলা চুল। হাতে একটা পুরোনো ছবি।

ছবিতে ছোট্ট মেহরীনকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।

নারীটি বাড়ির দিকে তাকিয়ে চোখের পানি মুছে বললেন,

— মা, তোমার কাছে ফিরতে আমার অনেক দেরি হয়ে গেল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একজন পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল—

— এত বছর পর ফিরে এসে কী লাভ হবে, নওরীন?

নারীটি ঘুরে তাকালেন।

তার চোখে এবার ভয় নয়, দৃঢ়তা।

— এবার আমি আমার মেয়েকে নিয়ে যাব। কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 4 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন