### 🖤 BLOOD BOUND
A Novel by Samira ᥫ᭡
### অধ্যায় ৭ — The Witness Returns
কিছু মানুষ অতীতকে ভুলে সামনে এগিয়ে যায়। আবার কিছু মানুষ অতীতের এমন একটি সত্য বুকে নিয়ে বেঁচে থাকে, যা প্রকাশ পেলে অনেকগুলো জীবন বদলে যায়।
সিকদার পরিবারের দরজায় আজ এমন একজন মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে, যার কাছে রয়েছে ২০০৮ সালের সেই রাতের সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য।
### রাত ১০টা ১৫ মিনিট — সিকদার বাড়ি
ড্রয়িংরুমে সবাই চুপচাপ বসে আছে।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যবয়সী নারীটির হাতে একটি পুরোনো ফাইল।
কামরুল সিকদার তাঁকে দেখে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না।
— আপনি!
নারীটি শান্তভাবে বললেন,
— হ্যাঁ, কামরুল সাহেব। এত বছর পরেও আমাকে চিনতে পেরেছেন দেখে ভালো লাগল।
নওরীন সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
— শিউলি আপা!
নারীটি নওরীনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— কেমন আছ, নওরীন?
নওরীনের চোখে পানি জমল।
— আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?
— যেখানে থাকলে এই পরিবারের মিথ্যাগুলো থেকে দূরে থাকা যায়।
মেহরীন কিছুই বুঝতে পারছিল না।
সে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,
— চাচা, উনি কে?
আরমান উত্তর দিলেন,
— উনি শিউলি। তোমার জন্মের সময় হাসপাতালের একজন নার্স ছিলেন।
শিউলি ফাইলটি টেবিলের ওপর রাখলেন।
— আজ আমি এসেছি তোমার জন্মের রাতের সত্যটা বলতে।
### রাত ১০টা ৩০ মিনিট — প্রথম সাক্ষ্য
শিউলি ধীরে ধীরে ফাইল খুললেন।
ভেতরে কয়েকটি পুরোনো কাগজ, হাসপাতালের রেজিস্টারের অনুলিপি এবং দুটি শিশুর ছবি।
তিনি বললেন,
— ২০০৮ সালের ১৪ আগস্ট রাতে নওরীনের দুটি সন্তান জন্মেছিল। দুটি শিশুই সুস্থ ছিল।
মেহরীন অবাক হয়ে বলল,
— তাহলে আমাদের আলাদা করা হয়েছিল কেন?
শিউলি কামরুলের দিকে তাকালেন।
— কারণ ওই রাতে একজন মানুষ হাসপাতালের কাগজপত্র পরিবর্তন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কামরুল কঠিন গলায় বললেন,
— এসব ভিত্তিহীন কথা বন্ধ করুন!
শিউলি শান্তভাবে উত্তর দিলেন,
— আমি যা দেখেছি, সেটাই বলছি।
রায়ান সামনে এগিয়ে এল।
— সেই মানুষটি কে ছিলেন?
শিউলি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— সেই রাতে হাসপাতালের একটি কক্ষে কামরুল সিকদারকে দেখেছিলাম।
ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
মেহরীন বাবার দিকে তাকাল।
— বাবা?
কামরুল কোনো উত্তর দিলেন না।
### রাত ১১টা — নওরীনের স্বীকারোক্তি
নওরীন ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়লেন।
— আমি জানতাম একদিন এই দিন আসবে।
মেহরীন মায়ের সামনে এসে দাঁড়াল।
— তাহলে আপনিও সব জানেন?
নওরীন মাথা নিচু করলেন।
— সবটা নয়, মা। কিন্তু কিছু ঘটনা আমি নিজের চোখে দেখেছি।
— আমাকে আর রায়ানকে আলাদা করা হয়েছিল কেন?
নওরীন চোখ মুছে বললেন,
— তোমাদের জন্মের কয়েক ঘণ্টা পর আমাকে জানানো হয়েছিল, একজন শিশুর শারীরিক অবস্থার কারণে তাকে অন্য হাসপাতালে নিতে হবে। আমি তখন অসুস্থ ছিলাম। তোমাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে কিছু জানানো হয়নি।
মেহরীনের গলা ভারী হয়ে এল।
— আপনি আমাকে খুঁজলেন না?
— খুঁজেছি মা। অনেক খুঁজেছি। কিন্তু আমাকে বলা হয়েছিল, তুমি নিরাপদে আছ। তোমার কাছে গেলে তোমার ক্ষতি হতে পারে।
রায়ান এবার বলল,
— তাহলে আমার জন্মের সত্যটা কী?
নওরীন তার দিকে তাকালেন।
— তুমিও আমার সন্তান, বাবা। তোমাদের দুজনকেই আমি জন্ম দিয়েছি।
রায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মায়ের হাত ধরে বলল,
— তাহলে এতদিন আমরা সবাই মিথ্যার মধ্যে বেঁচেছি!
### পরদিন সকাল ৯টা — নতুন প্রশ্ন
সকালে মেহরীন ঘুম থেকে উঠে দেখে তার দরজার সামনে একটা খাম রাখা।
খামের ভেতরে একটি চিঠি।
"মেহরীন,
তুমি যাকে এতদিন বাবা বলে জেনে এসেছ, তার কাছেও পুরো সত্য নেই। তোমার জন্মের রাতের ঘটনা শুধু দুটি শিশুকে আলাদা করার ঘটনা ছিল না। ওই রাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিলও হারিয়ে গিয়েছিল।
দলিলটি খুঁজে বের করো।
তাহলেই বুঝতে পারবে, সিকদার পরিবারের সম্পত্তি ও পরিচয়ের রহস্য কোথায় লুকিয়ে আছে।
— একজন শুভাকাঙ্ক্ষী"
মেহরীন চিঠিটা কয়েকবার পড়ল।
তারপর ফোন হাতে নিয়ে রায়ানকে কল করল।
— তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
— কী হয়েছে?
— নতুন একটা সূত্র পেয়েছি।
### সকাল ১১টা — পুরোনো স্টোররুম
মেহরীন ও রায়ান বাড়ির পুরোনো স্টোররুমে প্রবেশ করল।
আরমান চাচা তাদের একটি পুরোনো আলমারির কথা বলেছিলেন।
আলমারির ভেতরে অনেক কাগজপত্র।
রায়ান একের পর এক ফাইল দেখতে লাগল।
হঠাৎ মেহরীন একটা লাল রঙের ডায়েরি খুঁজে পেল।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
"সিকদার পরিবারের উত্তরাধিকার — গোপন নথি"
মেহরীন ডায়েরিটা খুলল।
ভেতরে একটা পাতায় লেখা ছিল—
"যদি কখনো আমার দুই সন্তান আলাদা হয়ে যায়, তাহলে এই দলিলই তাদের প্রকৃত পরিচয়ের প্রমাণ হবে।"
নিচে স্বাক্ষর—
নওরীন সিকদার।
মেহরীন রায়ানের দিকে তাকাল।
— এই দলিলটা কোথায়?
রায়ান বলল,
— হয়তো বাবা জানেন।
ঠিক তখনই স্টোররুমের দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে গেল।
মেহরীন চমকে উঠল।
— কে দরজা বন্ধ করল?
বাইরে থেকে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
তারপর একটি পরিচিত কণ্ঠ—
— তোমাদের আর সত্য খোঁজার প্রয়োজন নেই।
রায়ান দরজার কাছে গিয়ে বলল,
— বাবা! দরজা খুলুন!
কিন্তু বাইরে থেকে কোনো উত্তর এল না।
### দুপুর ১২টা — অপ্রত্যাশিত সাহায্য
কিছুক্ষণ পর দরজার বাইরে আরেকজনের কণ্ঠ শোনা গেল।
— মেহরীন আপু!
এটা নীলার কণ্ঠ।
নীলা দ্রুত দরজা খুলে দিল।
— আপু, তোমরা এখানে কী করছ?
মেহরীন বাইরে বেরিয়ে বলল,
— কেউ আমাদের আটকে রেখেছিল।
নীলা অবাক হয়ে বলল,
— কে?
রায়ান বলল,
— সেটা পরে বলব। আগে এই ডায়েরিটা নিরাপদে রাখতে হবে।
নীলা ডায়েরির দিকে তাকিয়ে বলল,
— এটা কি সেই পুরোনো ডায়েরি?
মেহরীন অবাক হয়ে তাকাল।
— তুই এটা সম্পর্কে জানিস?
নীলা একটু ইতস্তত করে বলল,
— কয়েক দিন আগে বাবাকে এই ডায়েরিটা লুকিয়ে রাখতে দেখেছিলাম।
মেহরীন বুঝতে পারল, নীলাও হয়তো এমন কিছু জানে যা এখনো বলেনি।
### বিকেল ৪টা — শিউলির শেষ কথা
শিউলি হাসপাতালের পুরোনো নথিগুলো নিয়ে আরমানের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
— আরমান সাহেব, একটা কথা এতদিন আপনাকে বলিনি।
— কী কথা?
— ওই রাতে শুধু কামরুল সাহেবই হাসপাতালে ছিলেন না। আরও একজন এসেছিলেন।
আরমান অবাক হয়ে বললেন,
— কে?
শিউলি নিচু গলায় বললেন,
— আপনার বাবা।
আরমান স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
— বাবা তো তখন অসুস্থ ছিলেন!
— জানি। কিন্তু আমি তাঁকে নিজের চোখে দেখেছি।
— তিনি কী করেছিলেন?
শিউলি উত্তর দিলেন,
— তিনি একটা খাম কামরুল সাহেবের হাতে দিয়েছিলেন। সেই খামের ভেতরেই ছিল আসল জন্মের নথি।
আরমান দ্রুত জিজ্ঞেস করলেন,
— সেই খাম এখন কোথায়?
শিউলি মাথা নাড়লেন।
— জানি না। তবে একটা কথা মনে আছে। খামের ওপর লেখা ছিল একটি নাম।
— কোন নাম?
শিউলি কিছুক্ষণ থেমে বললেন,
"জারিন সিকদার।"
### সন্ধ্যা ৭টা — রায়ানের গোপন ফোন
রায়ান নিজের ঘরে বসে ছিল।
হঠাৎ ফোনে একটা কল এল।
— হ্যালো?
অপর পাশ থেকে একজন পুরুষ বলল,
— তুমি কি দলিলটা পেয়েছ?
— না।
— মেহরীন কি কিছু জেনেছে?
— হ্যাঁ। অনেক কিছু।
— তাহলে সাবধান হও। দলিলটা যদি তার হাতে পড়ে, সব শেষ হয়ে যাবে।
রায়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
— আপনি এত ভয় পাচ্ছেন কেন?
লোকটি উত্তর দিল,
— কারণ ওই দলিলে শুধু তোমাদের জন্মের পরিচয় নেই। এমন একজনের নাম আছে, যার বেঁচে থাকার কথা কেউ জানে না।
রায়ান চমকে উঠল।
— আপনি কার কথা বলছেন?
কিন্তু লোকটি ফোন কেটে দিল।
### রাত ১০টা — শেষ রহস্য
মেহরীন নিজের ঘরে বসে নওরীনের দেওয়া পুরোনো ছবিগুলো দেখছিল।
হঠাৎ একটি ছবির পেছনে কিছু লেখা দেখতে পেল।
ছবিতে নওরীন, কামরুল, আরমান এবং একজন অচেনা নারী দাঁড়িয়ে আছেন।
ছবির পেছনে লেখা—
"১৯৯৯ — আমাদের পরিবারের শেষ আনন্দের দিন। জারিন, তুমি ফিরে এসো।"
মেহরীন নামটা পড়ে থমকে গেল।
জারিন!
এই নামটাই তো শিউলি আপা বলেছিলেন।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
মেহরীন দরজা খুলতেই দেখল, সামনে নীলা দাঁড়িয়ে।
নীলা ধীরে বলল,
— আপু, তোমাকে একটা কথা বলার আছে।
— কী কথা?
নীলা চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— আমি জানি জারিন কে।
মেহরীন অবাক হয়ে গেল।
— তুই কীভাবে জানিস?
নীলা কাঁপা গলায় বলল,
— কারণ তিনি আমাদের বাড়িতেই আছেন।
মেহরীন হতবাক।
— কী বলছিস?
নীলা চোখের পানি মুছে বলল,
— আমাদের বাড়ির পুরোনো উত্তর দিকের ঘরে যে ছবিটা ঝুলানো আছে, সেই ছবির নারীই জারিন সিকদার।
মেহরীন ধীরে ধীরে পেছনে সরে গেল।
এতদিনের রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন একজন মানুষ, যার নাম সে আগে কখনো শোনেনি।
ঠিক তখনই নিচতলা থেকে একটা নারীকণ্ঠ ভেসে এল—
— মেহরীন! আমার সঙ্গে দেখা করতে চাও?
মেহরীন সিঁড়ির দিকে তাকাল।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন একজন অচেনা নারী।
নারীটি মৃদু হেসে বললেন,
— অনেক দেরি হয়ে গেছে, মা। এবার তোমাকে সব বলতে হবে।
### অধ্যায়ের শেষ রহস্য 🖤
জারিন সিকদার কে?
তিনি কি সত্যিই এত বছর ধরে এই বাড়িতেই ছিলেন?
কামরুল কেন তাঁর নাম লুকিয়ে রেখেছেন?
আর নওরীনের জন্ম দেওয়া দুই সন্তানের পরিচয়ের সঙ্গে জারিনের সম্পর্ক কী?
চলবে...