#রইলো_প্রেমের_নিমন্ত্রণ
#পর্ব_৩৮
#ইয়ুশরা_রিমু
[কপি করা নি'ষিদ্ধ]
নিজের ঘরে ফিরে এসেও মমতাজ বেগমের মন থেকে বেলা ও সায়রের সাজেক যাওয়ার প্রসঙ্গটি কিছুতেই সরে যাচ্ছিলো না। সন্ধ্যার সেই সামান্য কথোপকথনই তাঁর মনে অদ্ভুত এক অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সায়র যেভাবে বেলাকে নিয়ে কয়েক দিনের জন্য দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে, সেটিই তাঁর বিরক্তির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে তিনি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইলেন, তারপর যেন হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে মোবাইলটি হাতে তুলে রুপসার নম্বরে যোগাযোগ করলেন।
কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে রুপসার কণ্ঠ ভেসে এলো,
---হ্যালো আন্টি, এত রাতে ফোন করেছেন যে? সব ঠিকঠাক আছে তো?
মমতাজ বেগম চারপাশে একবার সতর্ক দৃষ্টিতে দেখে স্বর আরও নিচু করে বললেন,
---রুপসা, তোকে একটা খবর দেওয়ার আছে। তবে কথাটা যেন আর কারও কানে না যায়।
রুপসার কণ্ঠে সঙ্গে সঙ্গে কৌতূহলের সুর স্পষ্ট হয়ে উঠলো,
--- কী হয়েছে আন্টি? এমন গোপনীয়ভাবে কথা বলছেন কেন?
মমতাজ বেগম কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীরস্বরে জানালেন,
--- সায়র আর বেলা কয়েকদিন পর সাজেক ভ্যালি ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে। কলেজে নাকি কয়েক দিনের ছুটি আছে। ইরা আর বিহানও তাদের সঙ্গে যাবে।
খবরটি শুনে ওপাশে কয়েক মুহূর্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল না। যেন কথাগুলো রুপসার মনে কোনো পুরোনো হিসাবের দরজা খুলে দিয়েছে। তারপর তার কণ্ঠে চাপা বিস্ময় মিশ্রিত এক অদ্ভুত হাসি শোনা গেলো,
--- সত্যি আন্টি? সায়র আর বেলা একসঙ্গে সাজেক যাচ্ছে?
---হ্যাঁ। আজই সব ঠিকঠাক হয়েছে। বেলাও শুনে তো মহাখুশি। এখন আবার শপিংয়ের পরিকল্পনা করছে, নতুন নতুন পোশাক কিনবে, সেখানে গিয়ে ছবি তুলবে কত কী!ডং যতসব।
রুপসার কণ্ঠে এবার ঈর্ষার আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠলো,
---- তাই নাকি? বেশ তো! বেলা বুঝি ভাবছে, সাজেকে গিয়ে নিজের মতো করে আনন্দ করবে আর সবাইকে দেখিয়ে বেড়াবে?
মমতাজ বেগমের ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের রেখা ফুটে উঠলো,
--- তাই তো বলছি। মেয়েটা যেন দিন দিন নিজের সীমা ভুলে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর রুপসা ধীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করলো,
--- আন্টি, আমিও সাজেক যাবো।
মমতাজ বেগম খানিকটা বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলেন,
--- তুই? ওদের সঙ্গেই যাবি?
--- না, একসঙ্গে নয়। ওরা যেভাবে যাবে, আমি সেভাবে যাব না। এমনভাবে পরিকল্পনা করবো, যাতে সেখানে গিয়ে হঠাৎ আমার সঙ্গে তাদের দেখা হয়ে যায়। সায়র যেন কিছুই আগে থেকে বুঝতে না পারে।
মমতাজ বেগম কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে জানতে চাইলেন,
--- কিন্তু সেখানে গিয়ে তুই করবি কী?
রুপসার কণ্ঠে তখন এক ধরনের কঠোরতা জমাট বেঁধেছে।
--- বেলাকে এবার বুঝিয়ে দিতে হবে, সবকিছু তার ইচ্ছেমতো হয় না। আমার ভালোবাসা ও কেড়ে নিয়েছে তার একটা জবাব ওকে দিতেই হবে। তবে তাড়াহুড়ো করে কিছু করবো না। সময় বুঝে এমন পরিস্থিতি তৈরি করবো, যাতে ওর সাজেক ভ্রমণের আনন্দটাই মাটি হয়ে যায়।
মমতাজ বেগম সতর্ক করে দিলেন,
---কিন্তু সাবধানে। এমন কোনো কাজ করিস না, যার কারণে সায়রের সন্দেহ হয়।
রুপসা মৃদু হাসির সঙ্গে উত্তর দিলো,
--- সায়র আমাকে বহু বছর ধরে চিনে,আন্টি। আমার ওপর সন্দেহ করার মতো কোনো কারণই আমি তাকে দেব না। বরং এমনভাবে সবকিছু সাজাব, যেন ঘটনাগুলো একেবারেই কাকতালীয় মনে হয়।
মমতাজ বেগমের মনে তখন এক ধরনের অদ্ভুত সন্তুষ্টি জন্ম নিল। তিনি নিচু কণ্ঠে বললেন,
----তাহলে সবকিছু বুঝে-শুনে করিস। বেলার সামনে যেন আগে থেকে কিছু প্রকাশ না পায়।
--- নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষায় আছি।
ফোনের ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা বিরাজ করলো। তারপর রুপসা আবার ধীরস্বরে যোগ করলো,
--- বেলা ভাবছে সাজেকে গিয়ে পাহাড়, মেঘ আর প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করবে। কিন্তু সেটা আমি থাকতে হতে দিচ্ছি না।
মমতাজ বেগমের মুখে তখন রহস্যময় এক অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। তিনি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেন।
________________________________________________________
সারাদিনের ব্যস্ততার পর খান বাড়ির পরিবেশেও যেন কিছুটা স্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছে। সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা মাথায় আসার পর থেকেই বেলার ভেতরে নতুন এক ধরনের উৎসাহ কাজ করছে। পাহাড়, মেঘ আর প্রকৃতির সৌন্দর্যের কথা ভাবলেই তার চোখেমুখে আনন্দের ছাপ ফুটে উঠছে। তার ওপর নতুন পোশাক পরে সেখানে ছবি তোলার পরিকল্পনাটা যেন সেই আনন্দকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সায়র এসে গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে বেলার দিকে তাকিয়ে বললো,
----তৈরি হয়েছিস?
বেলা নিজের ব্যাগটা হাতে নিয়ে দ্রুত এগিয়ে এলো,
--- একদম তৈরি। তবে আজ কিন্তু আমাকে তাড়া দিতে পারবেন না।
সায়র ভ্রু তুলে বলল,
---কেন?
--- কারণ আজ অনেক কিছু কিনবো।
সায়রের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
---বুঝেছি। আজ তাহলে আমার পকেট ফাঁকা করার ধান্দা।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলো,
---আপনি তো বলেছিলেন, আমার যা দরকার কিনতে পারি।
--- বলেছি তো।
বেলা খুশি হয়ে বললো,
---তাহলে চলুন।
দুজন গাড়িতে উঠে বসার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি খান বাড়ির সীমানা পেরিয়ে ব্যস্ত শহরের রাস্তায় প্রবেশ করলো। সন্ধ্যার আগের সময় হওয়ায় রাস্তায় মানুষের ব্যস্ততা ক্রমশ বাড়ছে। কোথাও দোকানের ঝলমলে আলো জ্বলে উঠছে, কোথাও ফুটপাতে ক্রেতাদের ভিড়, আবার কোথাও যানবাহনের দীর্ঘ সারি সব মিলিয়ে শহর যেন নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে।
গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বেলা একের পর এক দোকানের সাইনবোর্ড দেখছিলো। হঠাৎ কোনো একটি দোকান চোখে পড়লেই তার চোখে কৌতূহলের ঝিলিক ফুটে উঠছিল।
সায়র আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো,
--- এত কিছু দেখছিস কেন?
---আগে থেকেই দেখে রাখছি কোথায় কী আছে। আজ কিন্তু আমাকে থামাতে পারবেন না।
--- থামানোর ইচ্ছাই নেই।
বেলা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো,
---সত্যি?
--- হ্যাঁ। সাজেকের জন্য যা যা দরকার, পছন্দ করে কিনে নে।
এই কথাটুকু শুনেই বেলার মুখে প্রশান্তির হাসি ছড়িয়ে পড়লো।
কিছুক্ষণ পর তারা একটি বড় মার্কেটের সামনে এসে পৌঁছালো। সায়র গাড়িটি পার্কিংয়ের নির্দিষ্ট স্থানে রেখে বেলার সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করলো। মার্কেটের ভেতরে তখন মানুষের বেশ ভিড়। চারপাশে নানা ধরনের পোশাক, জুতা, ব্যাগ ও আনুষঙ্গিক জিনিসের দোকান সাজানো। এত কিছু একসঙ্গে দেখে বেলার উৎসাহ যেন আরও বেড়ে যায়।
প্রথম দোকানেই ঢুকে সে একের পর এক পোশাক দেখতে শুরু করে। কোনোটি হাতে নিয়ে আয়নার সামনে ধরে দেখছে, কোনোটি পছন্দ না হওয়ায় আবার আগের জায়গায় রেখে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে সায়রের দিকে ফিরে মতামতও জানতে চাইছে।
---এটা কেমন?
সায়র পোশাকটির দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে উত্তর দিলো,
---ভালো।
--শুধু ভালো?
--বেশ ভালো।
---এইটা?
--- এটাও ভালো।
বেলা একটু বিরক্ত হয়ে বললো,
---আপনি সবকিছুকেই ভালো বলেন। কোনটা সত্যিই সুন্দর, সেটা বুঝব কীভাবে?
সায়র হেসে বললো,
---তুই যেটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে হাসিস, সেটাই সুন্দর।
বেলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে মুখে মৃদু হাসি লুকিয়ে ফেললো।
এরপর একে একে আরও কয়েকটি পোশাক পছন্দ করলো সে। সাজেকের পাহাড়ি পরিবেশের কথা মাথায় রেখে আরামদায়ক পোশাকের পাশাপাশি কয়েকটি সুন্দর ড্রেসও নিলো। সঙ্গে জুতা, ছোট ব্যাগ, কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে তার কেনাকাটার তালিকা বেশ বড় হয়ে উঠে।
অবাক করার বিষয়, সায়রের মুখে বিরক্তির সামান্য ছাপও দেখা গেল না। বরং বেলার উচ্ছ্বাস দেখে তার নিজের মনেও এক ধরনের আনন্দ হয়। বেলা কোনো কিছু পছন্দ করে শিশুর মতো আনন্দিত হয়ে উঠলে সায়রের কাছে সেই মুহূর্তগুলোই যেন সবচেয়ে মূল্যবান মনে হয়।
এক পর্যায়ে বেলা বেশ কয়েকটি ব্যাগ হাতে নিয়ে সায়রের সামনে এসে দাঁড়ালো।
---আর একটা জিনিস কিনবো।
সায়র ব্যাগগুলোর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো,
--- এই “আর একটা” কথাটার ওপর আমার কোনো বিশ্বাস নেই। কখন থেকে আর একটা জিনিস কিনবো বলে পুরো মার্কেট ঘুরাচ্ছিস।
বেলা হেসে বললো,
---সত্যিই এবার আর একটা।
---ঠিক আছে। চল।
এরপর সায়রও নিজের প্রয়োজনীয় কিছু ব্যক্তিগত সামগ্রী কিনে নিলো। বেলা এবার সায়রের জন্য একটি শার্ট পছন্দ করে তার হাতে তুলে দিয়ে বললো,
---এটা নিন। সাজেকে পরবেন।
সায়র অবাক হয়ে তাকালো।
--- আমার জন্যও কিনছিস?
---হ্যাঁ। একসঙ্গে ঘুরতে যাব, আর আপনি পুরোনো পোশাক পরে ছবি তুলবেন, সেটা তো হতে পারে না।
সায়রের চোখে মৃদু হাসির আভা ফুটে উঠলো,
---তাহলে ম্যাডাম এখন আমার পোশাকের দায়িত্বও নিয়ে নিয়েছে?
---অবশ্যই।
---বেশ। তাহলে তুই যা পছন্দ করিস, সেটাই নেবো।
কেনাকাটা শেষ হতে হতে রাত অনেকটা হয়ে এসেছে। বেলার হাতে তখন বেশ কয়েকটি ব্যাগ, আর সায়রের হাতেও নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের প্যাকেট। মার্কেট থেকে বের হওয়ার সময় বেলা ক্লান্ত হলেও মুখের আনন্দ একটুও কমেনি।
গাড়ির কাছে এসে সায়র ব্যাগগুলো গুছিয়ে রেখে বেলার দিকে তাকিয়ে বললো,
---এখন কোথায় যাবি?
বেলা একটু ভেবে উত্তর দিলো,
---এতক্ষণ ধরে ঘুরেছি, এখন খুব ক্ষুধা পেয়েছে।
সায়র হেসে বললো,
--- তাহলে খাবার খাওয়াটাই আগে দরকার।
---রেস্টুরেন্টে যাব?
---হ্যাঁ। তোর পছন্দের কোনো ভালো জায়গায় যাই।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে খুশি হয়ে গাড়িতে উঠে বসলো,
---আজকে কিন্তু আপনার ওপর আমার রাগ নেই।
সায়র গাড়ি স্টার্ট করতে করতে মৃদু হাসলো,
---বুঝেছি। শপিং আর খাবার এই দুই জিনিস থাকলে তোর রাগ বেশিক্ষণ টেকে না।
বেলা জানালার বাইরে তাকিয়ে হাসল।
--- বেশি কথা বলবেন না। আজকে আমি খুব ভালো মুডে আছি।
সায়র কোনো উত্তর না দিয়ে গাড়ি রেস্টুরেন্টের উদ্দেশে এগিয়ে নিলো।
★
রেস্টুরেন্টে পৌঁছানোর পর বেলা যেন একেবারেই অন্য মানুষ হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ আগেও শপিংয়ের ক্লান্তিতে যে মেয়েটার চোখেমুখে অবসাদের ছাপ ছিলো, খাবারের মেনু হাতে পাওয়ার পর সেই ক্লান্তির কোনো চিহ্নই আর অবশিষ্ট রইলো না। টেবিলে বসেই সে একের পর এক খাবারের নাম পড়তে শুরু করলো, আর সায়র তার উৎসাহ দেখে মৃদু হাসিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
--- এত কিছু খাবি?
বেলা গম্ভীর মুখে মেনুর পাতা উল্টাতে উল্টাতে উত্তর দিলো,
--- আজকে কিন্তু আপনি আমাকে কিছু বলবেন না। এতক্ষণ ধরে শপিং করিয়েছেন, এখন খাবার খাওয়ানো আপনার দায়িত্ব।
--- তুই আজ অর্ধেক মার্কেট কিনে ফেলেছিস।কম করে অর্ডার দে। টাকায় না হলে পড়ে রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ আমাকে তাদের থালা বাসন মাঝিয়ে ছাড়বে।
বেলা ফিক করে হেসে উঠলো,
--- এসব হিসাব এখন করবেন না। আগে অর্ডার দিন।
সায়র ওয়েটারের দিকে তাকিয়ে কয়েকটি খাবারের অর্ডার দিলো। বেলা মাঝখান থেকে আরও দু-একটি আইটেম যোগ করে দিলো।
খাবার আসার পর দুজনের মধ্যে শুরু হলো নানা ধরনের হাসি-ঠাট্টা। বেলা কোনো একটি খাবার নিয়ে সায়রকে খোঁচা দিচ্ছে, আবার সায়রও সুযোগ পেলেই তার অতিরিক্ত আবদারের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। একসময় বেলা এমন একটি কথা বলে বসল যে সায়রের হাসি আর থামতেই চাইছিল না।
--- আপনি জানেন, আপনার একটা সমস্যা আছে?
--- কী সমস্যা?
---আপনি নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ভাবেন।
সায়র ভুরু তুলে বলল,
--- আর তুই?
--- আমি তো বুদ্ধিমতী।
--- তার প্রমাণ?
বেলা কয়েক মুহূর্ত ভেবে গম্ভীর মুখে উত্তর দিলো,
--- আপনার মতো একজন মানুষকে সামলাচ্ছি এটাই যথেষ্ট প্রমাণ।
কথাটা শুনে সায়র ভ্রু কুঁচকে বললো,
--- তার মানে তুই আমাকে গাধা বলতে চাইছিস?
--- ঠিক ধরেছেন।
--- আচ্ছা সমস্যা নেই। তোর পার্সোনাল গাধা হতে আমি সবসময় রাজি আছি।
সায়রের দুষ্টুমি মার্কা কথা শুনে বেলা হাসতে লাগে।
খাওয়ার মাঝামাঝি সময়ে বেলা হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
--- আমি একটু ওয়াশরুমে যাচ্ছি।
সায়র স্বাভাবিকভাবেই মাথা নাড়লো,
--- ঠিক আছে। সাবধানে যাস। নাকি আমি আসবো?
বেলা সঙ্গে সঙ্গে না করলো,
--- না।লেডিস ওয়াশ রুম। আপনি যেতে পারবেন না।
বেলা মুখে নিরীহ অভিব্যক্তি নিয়ে সরে গেলেও তার মাথায় তখন অন্য পরিকল্পনা। একটু দূরে গিয়ে সে নিজের ফোনটি বের করলো এবং সেই পুরোনো ফেক আইডিতে প্রবেশ করলো, যেটি দিয়ে মাঝে মাঝেই সায়রকে অদ্ভুত সব বার্তা পাঠিয়ে বিরক্ত করতে তার বেশ আনন্দ হয়।
কিছুক্ষণ পর সায়রের ফোনে একটি মেসেজের নোটিফিকেশন ভেসে উঠলো।
---বজ্জাত সায়র সাহেব, এতদিনে নিজের বউকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে আসার সময় হয়েছে? অথচ আমাকে কখনো নিয়ে আসেননি!
সায়র মেসেজটি পড়ে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। কয়েক মুহূর্ত ভেবে উত্তর লিখল,
---আপনি কে, সেটা আগে পরিচয় দিন। তারপর অভিযোগের উত্তর দেওয়া যাবে।
সঙ্গে সঙ্গেই নতুন মেসেজ এলো,
---পরিচয় জানলে তো আপনার ঘুম হারাম হয়ে যাবে।
সায়রের মুখে এবার কৌতূহলী হাসি ফুটে উঠলো,
--এত আত্মবিশ্বাস কোথা থেকে আসে আপনার?
ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
---আপনাকে আমি যতটা চিনি, আপনি নিজেকেও ততটা চেনেন না।
সায়র কিছুক্ষণ মেসেজটির দিকে তাকিয়ে থেকে লিখলো,
---বাহ, আজকাল দেখি অজ্ঞাতপরিচয় মানুষজনও আমার জীবনের বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছে!
এরপর আরও কয়েকটি উল্টাপাল্টা মেসেজ আসতে লাগল। বেলা আড়াল থেকে নিজের হাসি সামলাতে সামলাতে সবকিছু পড়ছিলো, আর সায়র বারবার অনুমান করার চেষ্টা করছিল এই রহস্যময় নারীটি আসলে কে।
শেষে সায়র লিখলো,
---যেই হন, একদিন না একদিন পরিচয় বের করেই ফেলবো।
বেলা মনে মনে হেসে উত্তর পাঠালো,
--স্বপ্ন দেখতে থাকুন, সায়র সাহেব। রহস্যের সমাধান এত সহজ নয়।
সায়র ফোনের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিলো। তার একটুও ধারণা ছিলো না, কয়েক হাত দূরেই দাঁড়িয়ে থাকা বেলাই নিজের কাণ্ড দেখে হাসি চাপার প্রাণপণ চেষ্টা করছে।
____________________________________________________________
রাত তখন অনেকটাই গভীর। শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে এসেছে, রাস্তার দুপাশের অধিকাংশ দোকানের ঝলমলে আলোও একে একে নিভে গেছে। দীর্ঘ সময় মার্কেটে ঘোরাঘুরি, কেনাকাটা আর রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়ার পর সায়র ও বেলা অবশেষে বাড়ির সামনে এসে পৌঁছায়। গাড়ির শব্দে বাড়ির নিস্তব্ধতা সামান্য কেঁপে উঠলেও খান বাড়ির প্রায় সবাই তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
দুজন নিঃশব্দে ভেতরে প্রবেশ করলো। তার প্রচণ্ড তৃষ্ণা পেয়েছে। সায়রকে নিচু স্বরে জানিয়ে সে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলো, আর সায়র ব্যাগগুলো কে নিয়ে নিজের ঘরের উদ্দেশে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়।
বেলা নিচতলায় পৌঁছে রান্নাঘরের দিকে এগোতেই আচমকা সামনাসামনি হয়ে গেল মমতাজ বেগমের সঙ্গে। মনে হলো তিনিও পানি নেওয়ার জন্য নিজের ঘর থেকে বের হয়েছেন।মমতাজ বেগম বেলার দিকে একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাকিয়ে নিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,
--- বেশ তো! রাত-বিরাতে আমার ছেলেকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর বেশ ভালো ব্যবস্থা করেছিস দেখছি।
বেলা গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে ভ্রু উঁচু করে তাকিয়ে বলে,
---কেন চাচি? আপনার ছেলেকে নিয়ে একটু বাইরে গেলেই কি এত বড় অপরাধ হয়ে যায়? মনে রাখবেন এখন আপনার ছেলে আমার স্বামী। আমার স্বামীকে নিয়ে কি করবো না করবো সেটা আমার পার্সোনাল ব্যাপার।
মমতাজ বেগম বিরক্ত স্বরে বললেন,
--- অপরাধ কি না সেটা তুই বুঝবি না। তবে একটা কথা মানতেই হবে, আমার ছেলেটাকে বেশ ভালোই হাত করেছিস।
বেলা গ্লাস ঠোঁটের কাছে নিয়ে থেমে গেলো। তারপর মুখে দুষ্টুমি মেশানো হাসি ফুটিয়ে বললো,
-- তাই নাকি? আপনি বুঝে ফেলেছেন?
--কী বুঝেছি?
---কী আর! আপনার ছেলেকে বশ করার গোপন রহস্য।
মমতাজ বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
---আবার কী নতুন নাটক শুরু করলি?
বেলা চারপাশে একবার তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো,
--- আপনাকে তো বলা যাবে না, খুব গোপন বিষয়।
--- কি???
বেলা মুচকি হেসে চোখ টিপে বললো,
--- আপনার ছেলেকে মধু খাইয়ে বশ করেছি!
কথাটা শুনে মমতাজ বেগম কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে বেলার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বিরক্তিতে মুখ ঘুরিয়ে বললেন,
--- অসভ্য মেয়ে!
বেলা এবার হাসি সামলাতে না পেরে বলল,
--- আরে চাচি, আপনি নিজেই তো জিজ্ঞেস করলেন কী জাদু করেছি!
--- জাদু-টাদু কিছু করিসনি। আমার ছেলে ছোটবেলা থেকেই একটু সরল, তাই ওকে ভুলিয়ে বালিয়ে নিজের কথায় নাচাচ্ছিস।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল,
---- সরল? আপনার ছেলে? আপনি কি সত্যিই নিজের ছেলেকে চেনেন? উনি তো একেবারে হিটলার!
মমতাজ বেগম তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন,
--- হিটলার যদি হয়? তাহলে আমার ছেলেটাকে ফুঁসলিয়ে বিয়ে করেছিলি কেন? এখন আবার রাত বিরেতে ঘুরা ঘুরি করিস।
---আমি ঘুরি? উনিই তো আমাকে নিয়ে ঘোরেন!
---বাহ! এই দোষটাও আবার আমার ছেলের!
বেলা গম্ভীর মুখ করে বললো,
---অবশ্যই। আমি তো নিরীহ মানুষ।
মমতাজ বেগম চোখ কপালে তুলে বললেন,
--- তুই নিরীহ? এই বাড়িতে তোর চেয়ে বেশি অসভ্য মেয়ে আর দ্বিতীয়টি আছে নাকি?
বেলা হেসে উত্তর দিল,
--- আছে তো।
--- কে??
--- থাক এখন আর কথা বাড়াই না।
মমতাজ বেগম কিছু বলার আগেই বেলা গ্লাসটা হাতে নিয়ে দ্রুত এক ঢোক পানি পান করলো। তারপর দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে বললো,
--- যাই আম্মু, অনেক রাত হয়েছে। আপনার ছেলে আবার আমাকে খুঁজতে শুরু করবে।
মমতাজ বেগম বিরক্ত মুখে বললেন,
---- যা, যা! সারাদিন শুধু আমার মাথা গরম করিস।
বেলা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে পেছন ফিরে মুচকি হেসে বলল,
---- আপনার ছেলেকে কিন্তু দুদিন পর আপনার আশেপাশেও দেখবেন না।মধুর ডোজ একটু বেশি হয়ে গেছে! আমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতেই পারে না।
---বেলা!
মমতাজ বেগমের ধমক শুনে বেলা খিলখিল করে হেসে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলো। নিচে দাঁড়িয়ে মমতাজ বেগম বিরক্ত মুখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের ঘরের দিকে ফিরে গেলেন।
★
আর ওপরে,সায়র তখন দ্বিতীয় তলার করিডরের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। নিচতলা থেকে ভেসে আসা বেলা আর মমতাজ বেগমের কথোপকথনের প্রায় পুরোটাই তার কানে পৌঁছেছে। বিশেষ করে বেলার সেই দুষ্টুমি মেশানো “মধু খাইয়ে বশ করেছি” কথাটা শুনে নিজের অজান্তেই তার মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠলো। তবে বেলা যেন বুঝতে না পারে যে সে সব শুনেছে, সেই জন্য দ্রুত নিজের ঘরে ফিরে এসে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বিছানার পাশে বসে রইলো।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে বেলা ঘরে প্রবেশ করতেই সায়র নির্বিকার মুখে তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
--- এত দেরি হলো কেন?
বেলা কোনো কিছু আঁচ করতে না পেরে ব্যাগটা একপাশে রেখে ক্লান্ত গলায় বললো,
---এমনি। পানি খেতে গিয়েছিলাম।
সায়র কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হাসলো।
--- আজ তোকে এত শপিং করে দিলাম, তারপর রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাওয়ালাম। আমার কিন্তু তোর কাছে একটা আবদার আছে।
বেলা ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানার দিকে এগোতে এগোতে ভ্রু কুঁচকে বললো,
--- রাত করে আবার কিসের আবদার?
সায়র গম্ভীর হওয়ার ভান করে বললো,
---বউয়ের কাছে তো সব স্বামী রাতেই আবদার করে।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে থেমে তার দিকে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
--- আপনার এসব বাজে কথা বাদ দিন। আমি ভীষণ টায়ার্ড। সারাদিন এত ঘোরাঘুরি করেছি যে এখন শুধু ঘুমাতে ইচ্ছে করছে।
সায়র হাসি চেপে বললো,
--- আরে, আমাকে মধু খাইয়ে তারপর তো ঘুমাতেই পারিস!
বেলার চোখ মুহূর্তেই বড় হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড সে নির্বাক হয়ে সায়রের দিকে তাকিয়ে রইল।
---আপনি... আপনি সব শুনেছেন?
সায়র এবার আর হাসি আটকে রাখতে পারল না।
--- দ্বিতীয় তলার করিডোর থেকে অনেক কিছুই কানে এসেছে, ম্যাডাম। আজ রাতে মধু না খেয়ে আমি ছাড়ছি না।
বলে এক পা এগিয়ে আসতে লাগে। বেলার ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে। আজ মনে হয় না এই হিটলার বেটার কাছ থেকে রেহাই পাবে।
চলবে.........