#দাহরেখা
#পর্ব_০১
#পূর্ণতা_আহমেদ
প্রায় সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে চললো তবুও মজুমদার বাড়িতে এখনো পর্যন্ত কোনো আমেজ তৈরি হলো না।কিসের আমেজ আবার? বিয়ের আমেজ।প্রস্তুতি সব কালকেই নেওয়া শেষ। পাত্রপক্ষ ও এসে গেছে।পাত্র বিয়ে করতে এক পায়ে প্রস্তত। তবে দুঃখের ব্যাপার হলো,কাল মধ্যরাতে বিয়ের কন্যা সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বের হয়েছে এখনো পর্যন্ত তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে বিশাল দোতলা বাড়িতে তোড়জোড় পড়েছে।
পলায়িত কন্যার পিতা জামশাদ মজুমদার।এ বাড়ির কর্তা। বয়সের ছাপ যা না পরার কথা ছিলো তার চেয়েও বেশি পড়েছে এই অবাধ্য মেয়ের চিন্তায়। মেহেরুন্নেসা মেহের নামটি খুব শখ করে রেখেছিলেন জামশাদ মজুমদার।অতি আদর মিশিয়ে ডাকেন মেহের যার অর্থ সূর্য। চেয়েছিলেন নামের মতোই প্রিয় কন্যা জ্বলে উঠুক তবে ক্ষুদ্র বিষয়ে অকারণে জ্বলবে তা তিনি মোটেও চাননি।
এই অস্থিরতার ভেতর রাশিয়া থেকে আনা দামি ফুলদানি মেঝেতে ভেঙে পড়লো। ভাঙা টুকরোর কারিগর জামশাদের বড় পুত্র শাহরিয়ার মজুমদার। স্বভাবে খুব বদমেজাজী,অল্পতেই মেজাজ হারায় তবে দায়িত্বশীল ও বটে। সকাল সকাল দুই ভাইয়ের উপর বোনকে খুঁজে আনার বিশাল ভার চাপিয়ে দাওয়া হয়েছে।হোক সেটা সমুদ্রের তলদেশ থেকেই। বিয়ের আসর ছেড়ে পালনোর এমন স্পর্ধা আর খুঁজে আনার দায়িত্বে শাহরিয়ারের মেজাজ হারানোর ই কথা।সেই রাগ ফুলদানিতে মেটানো হয়েছে।পরক্ষণেই সে বেড়িয়েছে নদীর পাড়ে খোঁজ করতে I
অন্যদিকে মেজো পুত্র মাহিবের দায়িত্ব পড়েছে উত্তরের জঙ্গলের দিকে খোঁজ করার আর এই দুই ভাইয়ের মধ্যে সবচাইতে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো মাহিবের সাথেই মেহেরের। যখন কোথাও তাকে পাওয়া গেল না সবশেষ ক্লান্ত হয়ে মাহিব তার মনকে স্থির করে ভাবতে বসলো। অযথা এখানে সেখানে খোঁজ করা অর্থহীন! ইতোমধ্যে আশে পাশের গ্রামে খোঁজ লাগানো হয়েছে,কিন্তু বিয়ের আসর ফেলে সে কোথায় যেতে পারে?
——————
আফতাব নগরের হাট অন্যান্য দিনের চাইতে আজ বেশ জমজমাট মনে হচ্ছে। এ বছর অনাবৃষ্টিতে ফসল ফলেনি তার উপর ত্রিশ শতাংশ কর বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে আশে পাশের গ্রাম থেকে কৃষকরা সভায় এসেছে।আজ গ্রামের মানুষদের ভেতর ও এক অদ্ভুত উত্তেজনার ঢেউ বইছে।খবর পাওয়া গেছে আজ যেকোনো সময় ব্রিটিশদের হানা পড়বে এ গ্রামে। তবে তারাও অপ্রস্তুত নয় ,আর কত অত্যাচার সহ্য করা যায়? এমনিও অনেকে মরেছে না খেয়ে ব্রিটিশদের কর পরিশোধের ভারে,অনেকে মরেছে প্রতিবাদ করতে যেয়ে। এমন তিলে তিলে মরার চাইতে একবারে সিংহের মত লড়াই করে মরে যাওয়াই যেন উত্তম। ধীরে ধীরে সভা জমতে শুরু করছে এত মানুষের ভিড়ে হঠাৎ ই পায়ে পাড়া খেয়ে চেঁচিয়ে উঠলো মেহের,
"আহহহ!! আমার পা টা.....পা দিয়ে পিষে ফেলবি নাকি!"
মেহেরের চিৎকারে জাহারা যেন আরও জোরে পায়ে পাড়া দিয়ে বসলো।আর রাগ সংবরণ করতে না পেরে বলে উঠল,
"বেশ করেছি! তুই বিয়ের আসর ফেলে এই রঙ্গলীলা দেখতে এখানে এসেছিস! আমাকে না বললি অন্যকথা! চাচা আর তোর ভাইয়েরা যদি জানে এ খবর! না জানি আমার কি হাল করবে! তুই বাড়ি ফিরবি নাকি আমি তোকে ফেলেই চলে যাব?"
"আমি কোথাও যাচ্ছি না। আমার যা হওয়ার হোক।তুই ও মরলে আমার সাথেই মরবি! একা কেন মরতে যাবো?"
"হায় খোদা! এবারের মত আমার উপর রহম করে আমায় এখান থেকে উদ্ধার করো! একবার খালি বেঁচে ফিরি মেহের! এই জীবনে আর কখনো তোর সামনে পড়বো না।"
"আহ বেশি কথা বলিস! বলছি তো কিছুই হবে না মুখ ঢেকে রেখেছি কেউ চিনবেও না। অনেক সাধনার পর আজকে সুযোগ করতে পেরেছি।আজ তো এই সভা নিজ চোখে দেখেই তবে যাব।"
"তুই থাক তোর সভা নিয়ে।আমি গেলাম।"
"যাওয়ার আগে ওদের চোখের আগুন দেখে যা ! মনে হচ্ছে ইংরেজদের যাওয়ার সময় দ্রুতই চলে এসেছে।"
"চলে এসেছে!! চলে এসেছে! সত্যি চলে এসেছে!"
"তা এসেছে। কিন্তু তুই এমন মহিষের মতো চেঁচাচ্ছিস কেন?"
"আরে মেহের!! সত্যিই ব্রিটিশরা চলে এসেছে গ্রামে! ওই দেখ দূরে জাহাজ আসছে ব্রিটিশদের।আজ এই গ্রাম থেকে একজন ও বেঁচে ফিরবে না।জলদি এখান থেকে পালা!"
মেহের পিছনে তাকানোর সুযোগটুকুও পেল না তার আগেই সভার ভিড়ে সবার হট্টগোল শুরু হয়ে গেল।সকলেই তাদের হাতে যে যে অস্ত্র তৈরি রেখেছিল তা প্রস্তুত করছিল কেউ বা মনে সাময়িক সঞ্চয় করা সাহস ভুলে নিজের জীবন বাঁচাতে এদিক সেদিক ছুটতে শুরু করলো।
ব্রিটিশদের ভারী বুটে জড়ানো পা একের পর এক পড়তে থাকল আফতাব নগরের মাটিতে। এর মধ্যে একজনের হুংকার শোনা গেল,"No one move ! Stay where you are!”
মূহুর্তেই সে ইংরেজ কন্ঠের ওপর বর্ষিত হলো বারুদের বৃষ্টি। দূরে একটা পুরোনো বাড়ি দেখা যায় সেখান থেকেই ছোঁড়া হচ্ছে বারুদ।কালোধোঁয়ার মাঝে মেহের জাহারার হাত ধরে এক দৌড়ে বাজারের পাশে একটা ফলের দোকানে ঢুকল। জাহারা একটা কাঠের টেবিল খুঁজে মেহেরকে নিয়ে সেটার নীচে আশ্রয় নিল।
"How dare they ! Flush out all the terrorist!”
“Sir an urgent news ! Sir George has been attacked! He is in serious condition! what can we do next? “
“Take him for urgent treatment but we are not moving from here until arresting them one by one! “
“Okay Sir! Then we are taking our final step !”
পরপর আরও বারুদ ছোঁড়া হলো তবে এবার ব্রিটিশ পক্ষ থেকে। তীব্র আওয়াজে মেহের এবার মাথা তুলে বাইরে তাকাল,দোকানের সব ফল-মূল উল্টে পড়ে আছে।বাইরে কালো ধোঁয়া ছাড়া কিছু দেখা যায় না। ধোঁয়ায় দম আটকে আসার উপক্রম।
"জাহারা চল এখান থেকে।ধোঁয়ায় এমনি মরে যাব।"
জাহারার থেকে কোনো উত্তর আসল না। মেহের আবার ডাকল ,"জাহারা?.... জাহারা?....এখন তোর ঘুমানোর সময় হলো ? "
বিরক্ত হয়ে এবার টেবিলের নিচে ঘাপটি মেরে দুই হাত দিয়ে কান চেপে শুয়ে থাকা জাহারার পিঠে জোরে ধাক্কা দিল মেহের। তাও কোনো সাড়া নেই। জাহারা তীব্র ভয়ে জ্ঞান হারানোর মত অবস্থায়।শরীর থরথর করে কাঁপছে আর অস্পষ্ট কিছু একটা বলছে বিড়বিড় করে। হঠাৎ জাহারা মেহেরের ধাক্কায় ক্ষেপা বাঘিনীর মত গর্জাল," আমার মৃত্যুর জন্য তুই দায়ী থাকবি। তোর জন্য আজ আমি মরব!"
"ঝগড়া পরে করতে পারবি।এখন আপাদত এখান থেকে চল বের হই।"
মেহের পাল্টা উত্তরের আশায় না থেকে জাহারার হাত শক্ত করে ধরে বেরিতে পড়ল বাইরে। ধোঁয়ার আবরনের মাঝে এক ঝলক দেখতে পেল একজন ব্রিটিশ সৈন্য এক তরুন ছেলের মাথায় সজোরে পাথর দিয়ে আঘাত করে তাকে মাটিতে ফেলে দিয়েছে।আর পাশে কয়েকজন কে ধরে বেধে নাওয়া হচ্ছে। মেহের উল্টো হয়ে ছুটলো একটা ফাঁকা দোতলা বাড়ির দিকে।দেয়ালের শ্যাওলা জানান দিচ্ছে এ বাড়ি বহু পুরোনো। দুই-এক না ভেবে সোজা সিড়ি বেয়ে চলে গেল ছাদের দিকে। দুজনেরই বুক অনবরত কাঁপছে। ছাদে এসেই কয়েকজন ছেলে-মেয়ের একটা দল দেখতে পেল। বয়স তেরো কি চৌদ্দ হবে।তারা এখান থেকেই বারুদ ছুড়ছে,সাথে তিনজন প্রাপ্ত বয়স্ক লোক ও রয়েছে।মেহের সেদিকে পা বাড়াতে নিলে জাহারা মেহেরকে একটানে আবার নীচের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। যখন তারা দোতলায় তখনই নিচ থেকে ভারী বুটের শব্দ ভেসে আসল,মেহের বুঝে যায় উপরে ব্রিটিশরা আসছে।আজকে আর তাদের নিস্তার নেই!
জাহারা ভয়ে কেঁদে ফেলে,মেহের জাহারার মুখ চেপে ধরে পাশের দরজা ঠেলে ভেতর ঢুকে দরজা আটকে দেয়। কিছুক্ষণ বাদে দরজার বাইরে দিয়ে শোনা যায় সেই ছেলে মেয়েদের চিৎকার আর ইংরেজদের গর্জন। দুইজনের বুক হাপড়ের মত ওঠা-নামা করছে।শরীর ঘামে ভিজে একাকার। ক্ষণ বাদেই দরজায় তীব্র ধাক্কা পড়তে শুরু করে।মেহের জাহারা আতকে ওঠে।
"Open the door! Open the door !”
মেহের দ্রুত ঘরের ভেতরে যেয়ে কিছু একটা খুঁজতে শুরু করে,হয়তো জীবন বাঁচানোর পথ। পরিস্থিতি হলো মানুষকে বাস্তবতা উপলব্ধি করানোর একমাত্র পথ। তখন খুব কম বিপ্লবীদেরই সাহস রয়ে যায়। যদিও তারা জানে ও মানে এই অত্যাচারিত জীবন থেকে বীরের মত লড়াই করে মৃত্যু বরণ করাই শ্রেয়।কিন্তু পরিস্থিতি যেন তাদের বুঝিয়ে দেয় তোমাদের মধ্যে এখনো বেঁচে থাকার লোভ অবশিষ্ট রয়েই গেছে,হোক সেটা এক মূহুর্ত বাঁচার। মেহের ও বোধহয় সেই দলেই পরে গেছে নয়তো বা জাহারার জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
এত কিছু ভাবার সময় কই? এদিকে ব্রিটিশ দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে পড়েছে। আর কিছু না ভেবেই দুজন সোজা লাফ দিল দোতলার খোলা বারান্দা থেকে। ভাগ্য ভালো থাকায় দুজনে সোজা গিয়ে পড়ল বাড়ির পাশের শ্যাওলা জমা পুকুরে। পুকুরের ওপর পদ্ম ফুলের রঙিন সমাহার।এটা এখন তাদের লুকিয়ে থাকার ভালো আশ্রয় হয়ে উঠেছে।একটু পর পর মাথা হালকা বের করে নিশ্বাস নিয়ে দ্রুত আবার পানিতে ডুব দেয় দুজন।যখন ব্রিটিশরা একে একে সবাইকে ধরে নিয়ে সেই স্থান ত্যাগ করল, তখন ধীরে ধীরে উপরে উঠে এলো দুই সই। সাবধানতা রক্ষা করতে নিরবতা বেছে নাওয়া হয়েছে তবুও জাহারা অনবরত চোখ দিয়ে হুমকি দিয়েই যাচ্ছে মেহেরকে।মেহের সেদিকে পাত্তা না দিয়ে ধোঁয়ার দিকে পা বাড়াল। এই সোজা পথটা কোনো ভাবে পার করতে পারলেই সামনে নদী পড়বে। মেহের তার শাড়ির ভেজা আঁচল ছিড়ে মুখ বেধে ফেলল যাতে তাকে সনাক্ত না করা যায়।এরপর সামনের দিকে পা বাড়াল দুই ভেজা বেড়াল।ধীরে ধীরে কালো ধোঁয়া ও তাদের সে পথ আটকে দিতে শুরু করল।
"How dare you attacked me ! you cheap bengal dog! from today on, lets see how much breath you can hold !”
"ছাড়েন আমার ভাইকে! ছাড়েন ! ছাড়েন !...ভাইই.....!ভাইইইই...!!"
মেহের আর জাহারা শুধু দুই ভাই বোনের আহাজারি দেখছে দূর থেকে। মেহের এমন নিষ্ঠুরতা আর সহ্য করতে পারছে না। সে কিছু না ভেবেই পায়ের কাছে পরে থাকা একটা পাথর নিয়ে সেই ইংরেজের গায়ে ঢিল ছুড়ল।মেহেরের এমন কর্মকাণ্ড দেখে জাহারার জ্ঞান হারানোর উপক্রম। মেহের ঢিল ছুড়েই ডান দিকে ছুটতে শুরু করল,সাথে থাকা জাহারার গর্জন বাতাসের বেগে ধাক্কা খেয়ে ভেসে আসল মেহেরের কানে। পেছনে তাকানোর আর সময় নেই এক দৌড়ে নদীর কিনারায় পৌঁছানোই মূল উদ্দেশ্য। দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ মেহের আবারও সেই ফলের দোকানের সামনে এসে হোঁচট খেয়ে পড়ল। আশে পাশে ছড়িয়ে থাকা বাতাবি লেবু আর পেয়েরায় পা লেগেই হোঁচট খেয়েছে।
কোনো রকমে জাহারা মেহেরের হাত টেনে তুলল কিন্তু কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই কোনো এক অচেনা হাত আচমকা এক টানে মেহেরকে নিয়ে সামনের দিকে ছুটতে শুরু করল, সামনে মানুষের সমাগম পড়লে সেই ভীড় ঠেলে বের হতে শুরু করলো সামনের দিকে।মেহের আরেক হাতে শক্ত করে ধরলো জাহারার হাত।চোখ বন্ধ করে সেই অজানা হাতের মালিকের সাথে ছুটতে শুরু করলো।এরই মাঝে বোধহয় কেউ একজন মুখের কাপড় টেনে তার এই সুশ্রী মুখ পরিদর্শন করে ফেলেছে।কিন্তু কে সে তা দেখার এখন আর সময় নেই। ভীড় ঠেলে দৌড়াতে দৌড়াতে যখনই নদীর শীতল বাতাস চোখ-মুখ স্পর্শ করলো তখনই তার চেতনা ফিরল,পা স্থির হলো।চোখ খুলে দেখল সে নদীর পাড়ে চলে এসেছে,পাশেই একটি ছোট নৌকা। দূরে ব্রিটিশদের জাহাজ গুলো ঢেকে যাচ্ছে বারুদের কালো ধোঁয়ায়।আচমকা তার পাশে থাকা পুরুষটি তাকে নৌকায় টেনে নিয়ে যেতে শুরু করেছে।মেহের অবাক হয়ে সেই মুখ পরিদর্শনের চেষ্টা করল,সেই মুখ সাদা চামড়ার নয়! পোশাক ও বলছে না সে ব্রিটিশ তবে তাকে এতো ধস্তাধস্তি করে কোথায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা? অবাক চাহনি তে একবার সেই পুরুষটিকে দেখছে তো একবার জাহারার কান্নাভেজা মুখ! মস্তিষ্ক কিছুটা সচল হতেই সে বলে উঠলো,
"কে আপনি!! কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাদের!!"
"আমি ব্রিটিশ। আপনাদের ধরে ব্রিটেন নিয়ে যাচ্ছি সেখানে আপনাদের দাসী করে রাখা হবে।"
"মানে?"
"দেখেছিস মেহের! বলেছিলাম তোকে আমার কথা শুনলি না।ব্রিটিশদের দাসী হয়ে থাকতে হবে আজীবন! এর চাইতে তো ওই টাক মাথার বুড়োকে বিয়ে করলেই ভালো থাকতি! হায় খোদা! এখন কি হবে?"
জাহারার কথায় কোনো প্রকার পাত্তা না দিয়েই মেহের বলল,"কিন্তু আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে না আপনি ব্রিটিশ! গায়ের রং তো ময়লা।তাহলে এদেশে জন্মে গাদ্দারি করছেন! ছিঃ!"
"হু! ব্রিটিশদের গায়ের রং খুব পরিষ্কার তাই গাদ্দারি করাটা অপরাধ মনে হচ্ছে না।"এই বলে লোকটা নৌকার মাঝিকে ইশারা করল নৌকা ছাড়তে।
পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার সেই হাটের হট্টগোলের দিকে তাকাল। হাটে বারুদের শব্দ ও কালো ধোঁয়া মিলে একাকার হয়ে যাচ্ছে।মনে হচ্ছে সেখানে রক্ত ঝড়বে আজ অনেক নিরপরাধের।শেষবারের মতো স্থির পলকে চেয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সেই দীর্ঘশ্বাস ঝড়ো বাতাসে মিশে উধাও হয়ে গেল মূহুর্তেই।সেই বাতাসের বেগেই নৌকা প্রায় গন্তব্যে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
ইতোমধ্যে বহুবার মেহের অচেনা লোকটিকে হুমকি দিয়েছে সে পানিতে ঝাপ দিবে তবুও ব্রিটিশদের দাসী হয়ে থাকবে না।লোকটিও তাকে প্রতিবার সে কাজে শতভাগ সম্মতি দিয়ে সাধুবাদ জানিয়েছে কিন্তু মেহের এখনো পর্যন্ত লাফ দেয়নি।তার এই অবস্থা দেখে লোকটি ঠাট্টা করে বললো,"এই সাহস নিয়ে তাহলে সভায় যোগ দিতে গিয়েছিলেন,বাহ!"
"আপনি মশকরা করছেন! আমি এতোটাও ভীতু নই। মরার সাহস আমার আছে কিন্তু নদীতে ঝাপ দিয়ে মরার কোনো শখ নেই।"
লোকটি তার দিকে তাচ্ছিল্যের চোখে তাকাল কিন্তু কিছু বললো না।কোনো অজানা দুশ্চিন্তা যেন লোকটিকে বার বার ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দোটানায়। যখন নৌকা ঘাটে এসে ধাক্কা খেল তখন মেহের ও জাহারাকে নামতে বলা হলো।
তাদের দুজনের কাছে এই ঘাট যেন খুবই পরিচিত লাগছে। মূহুর্তেই বুঝে গেল তারা তাদের গ্রাম বারদোলি ঘাটে। দূরেই দাড়িয়ে আছে মাহিব।চোখ মুখে উজ্জ্বলতা মিশ্রিত রাগ।মনে হয় তাদের দেখেই রাগ ও দুশ্চিন্তা মাত্রই কিছুটা উবেছে।
মেহের ও জাহারার কাছে যেন কোনো কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না।তাদের তো এতক্ষণে ব্রিটিশদের জুতা পরিষ্কার করার কথা ছিল তবে এখানে কিভাবে আসলো!
ভাইয়ের চেহারা দেখে মূহুর্তেই সব সূত্রের সমাধান খূঁজে পেল মেহের। চোখের জলকে আড়ালে রেখে ভাইয়ের সামনে দাঁড়ালো। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার আনন্দে বোধহয় ভাইকে জড়িয়ে ধরার সুপ্ত ইচ্ছা জেগেছিল কিন্তু তা চাপা দিয়ে ভাইয়ের উত্তরের আশায় চেয়েই রইলো।সে যে কোনো অপরাধী নয় তা বুঝাতে মাথা নত করলো না বরং চোখের দিকেই নিষ্পলক চেয়ে রইলো।
মাহিব কিছু বলল না এই কারণে নয় যে সে খুব শান্ত প্রকৃতির, কারণ এই যে সে তার বোনের কার্যকলাপে অতি শোকে পাথর হয়ে গেছে তাই দুটো মাত্র শব্দ উচ্চারণ করলো,
"বাড়ি চল।"
এই ধারালো দু্টি শব্দের উপর আর কোনো কথা বাড়ানোর সাহস হলো না মেহেরের তাই নিঃশব্দে বাড়ির দিকে যাত্রা শুরু করল।