#দাহরেখা
#পর্ব_০২
#পূর্ণতা_আহমেদ
বিয়ের পর্ব শুরু হতে না হতেই ভেঙে গেল।প্রথাগত রীতি অনুযায়ী পাত্রীপক্ষকে অপমান করেই বাড়ি ছাড়ার কথা।তাই হয়েছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে,এই বাড়ির বাইরে বিশাল বাগান সেখানে এক কোণে বসে আছেন জামশাদ। নিজ হাতে লাগানো শখের গাছগুলোকে দেখে নিজেকে শান্ত করা বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
এর মধ্যে সেখানে পানের থালা আর চা নিয়ে হাজির হলো লুৎফুন্নেসা বেগম। জামশাদের বড় ভাইয়ের স্ত্রী। ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার ছেলে আর স্ত্রীকে নিজের দায়িত্বে আগলে রেখেছেন এতগুলো বছর। লুৎফুন্নেসার বয়স পঞ্চাশোর্ধ,সম্পর্কে জামশাদের বড় ভাবী হলেও বয়সে প্রায় কাছাকাছি।পেটের চর্বি দিনকে দিন বেড়েই চলেছে,চুলেও পাক ধরেছে কিন্তু নিজেকে তিনি এখনো অষ্টাদশী কিশোরী মনে করেন। পরনে সব সময়কার মত চাকচিক্যময় জামদানি শাড়ি। শাড়ি ছাড়া ওনাকে দেখা যেতে পারে কিন্তু গলা,হাত ভর্তি স্বর্ণের গহনা ছাড়া কখনো ওনার দেখা পাওয়া সম্ভব না। জামশাদের পাশে বসে বিষাক্ত মুখে বললেন,
"পাত্রপক্ষ মুখে থুথু দিয়ে চলে গেল। কত খোঁজ করে এমন পাত্র জোগাড় করেছিলাম আর তোমার আদরের দুলালী কি সর্বনাশ করল! আর জীবনে মুখ দেখাতে পারব আমরা?" বলেই বিলাপ করতে শুরু করলেন।
জামশাদ চুপচাপ। মেয়ের কোনো বিপদ হলো কিনা তা ভেবে তার দুশ্চিন্তার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ গোলাপ গাছের আড়াল থেকে মেয়েকে আসতে দেখে তড়িঘড়ি করে ছুটে এলেন,খুশী হবেন না রাগ হবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। নিষ্পলক চেয়ে থেকে নিস্তেজ গলায় কিছুটা জোর এনে ঠান্ডা সুরে মাহিবকে জিজ্ঞেস করলেন,
"কোথায় ছিল?"
"পাশের জঙ্গলে শিকারে গিয়েছিলো সেখানেই চৈতন্য হারিয়ে প...."
কথা শেষ হওয়ার আগেই মেহেরের শান্ত অথচ ধারালো কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
"আমি আফতাব নগর গিয়েছিলাম বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দিতে।"
মাহিব ও জামশেদ দুজনেই চেয়ে রইলো অবিশ্বাস্য চোখে।মেহেরের চোখের এই তেজ যেন জামশেদকে অতীতের সেই যন্ত্রণার ছোবল দিল। সেই বিষাক্ত ছোবলে চোখে যে জলেরা ভিড় করলো তা লক্ষ্য করে মেহের কিছুটা নরম হলো। তবু্ও মাথা নিচু করলো না। নিম্নস্বরে বললো,
"আমি কি অপরাধ করেছি আব্বা? সভায় ই তো দেখতে গিয়েছিলাম।
"আমাদের মুখে চুনকালি মেখে সভা দেখতে গিয়েছো?"
"বারদোলি তে জোরজবরদস্তিতে অসহায় মানুষদের নীল চাষ করানো হচ্ছে। তারা এর মধ্যে যতটুকু সময় পায় তা দিয়ে খাওয়ার মতো কোনো রকম ফসল ফলায় তাও ব্রিটিশরা কেড়ে নিয়ে যায় আর তোমরা চুপ করে তা সহ্য করে যাচ্ছো? সবাই যেখানে প্রতিবাদ করছে সেখানে আমি আরাম আয়েশ করতে পারবো না।আর তুমি আমার বিয়ের আয়োজন করছো।
এত নিষ্ঠুর তুমি কিভাবে হলে আব্বা?"
"কখনো কখনো নিষ্ঠুর হতে হয়।"
"এতোটা?"
"নিজের জন্য না হলেও সন্তানদের জন্য হতে হয়।"
"সন্তানদের তবে নিষ্টুরতা শিখাচ্ছো?"
"যেদিন তোমার সন্তান হবে সেদিন বুঝবে।"
এই বলে বাকিদের আদেশ দিলেন জামশাদ এখন থেকে মেহের এই বাড়ির ত্রিসীমানার বাইরে বের হতে পারবে না। তারপর এক পলক মেহেরের দিকে তাকিয়ে ভিতরের চলে গেলেন।
মেহের চেঁচিয়ে উঠে বললো,"কখনোই আমাকে আটকে রাখতে পারবে না।আমি কখনোই এসব মেনে নিবোনা।"
"দেখো মেয়ের কান্ড! এত বড় ঘটনা ঘটিয়ে এখনো গলাবাজি করছে। মা না থাকলে যা হয়!" বলেই ভেতরে চলে গেলেন রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেলেন লুৎফুন্নেসা আর মনে মনে ভাবতে থাকলেন এই আপদ এখন কিভাবে বিদায় করা যায়!
—————
রাতের আধারে জোনাকিদের মেলা বসেছে।সেই মেলায় হাসনাহেনার সুবাস পাওয়া যাচ্ছে যা জামশাদের অস্থির মনকে শান্ত করার চেষ্টা করছে কিন্তু পুরোপুরি পারছে না। তার অন্যতম কারণ পাশেই বড় ছেলে শাহরিয়ার রাগে ফুঁসছে।মেহেরকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে না পারার ব্যর্থতা যেন তাকে উন্মাদ করে তুলছে,একটু পর পর বাবাকে আর মাহিবকে দোষারপ করে যাচ্ছে অতি আদরে তাকে বিগড়ে দাওয়ার অপরাধে।
মাহিব তাকে শান্ত করার চেষ্টায় এর মাঝেই হাজির হলো মেহেরকে উদ্ধার করা সেই অচেনা লোক। উদ্ধারকারীর নাম শায়ের।মাহিবের ছোটবেলার বন্ধুই বলা চলে। জামশেদের সাথে ব্যবসার কাজে আফতাব নগর গিয়েছিলো ছোটবেলায় সেখান থেকেই শায়েরের সাথে পরিচয় কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ব্যস্ততার ভারে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে।
শুধু ব্যস্ততাও নয় মাহিব নিজে থেকেই দূরত্বের সেতু তৈরী করেছিলো যেদিন জানতে পেরেছিলো তার বন্ধু ছদ্মবেশে এক পত্রিকার সম্পাদনা করছে এবং সেখানে নিয়মিত ব্রিটিশ বিরোধী অক্ষর ছাপাচ্ছে।এই অক্ষরের দায়ভার যাতে তার উপর না আসে সেজন্য নিজেকে গুটিয়ে নিয়ছিল বহু আগেই আর আজ সেই বন্ধুর কাছেই সাহায্য চাইতে হলো ভেবে তার ভিতর কিছুটা অপরাধবোধ দেখা দিল।
সেই পুরোনো ভাবনার ঘোর কাটল শায়েরের কথায়,"আমাকে এখন ফিরতে হবে।"
"কি বলিস কোথায় যাবি?"
"কোথায় আর? আফতাব নগর।"
"কি বলিস! সেটা এখন আর আছে নাকি! ব্রিটিশদের দখলে সব।আজ কতজন মরেছে হিসাব জানিস?"
"মরেনি।ধরে নিয়ে গেছে।"
"ওই একই।ধরে নাওয়ার নাম করে এতক্ষনে কতজন জবাই হয়েছে তার হিসাব নেই।সেসব ছাড় যা হয়েছে হয়েছে।তুই এখানেই থেকে যা।" মাহিবের কন্ঠে তীব্র আবেদন।
সেই সুরে সুর মিলিয়ে জামশাদ ও বললেন,"এখানেই থেকে যাও বাবা।আমার মেয়ের জীবন বাঁচিয়েছো,আমাদের কে এত বড় বিপদ থেকে বাঁচিয়েছো।আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো।"
"না চাচা। কারো সাহায্য করে সেই ফলাফল ভোগ করতে চাই না এতে সেই উপকারের মান ও নিজের সম্মান দুটোই নষ্ট হবে।"
অবশেষে রাতের এই নিস্তব্ধতার ভীড়েই নদীতে নৌকা চলতে শুরু করলো আফতাব নগরের উদ্দেশ্যে। নৌকায় বসে শায়ের নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যাচ্ছে। এই রাতের আধার যেন তাকে অন্য এক আধারে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সূক্ষ্মভাবে।
সকালের মিষ্টি রোদ মেহেরের মুখে বিরক্তির রেখা এঁকে দিল। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানো ছাড়া এই রোদের বিশেষ কোনো কাজ নেই বলে মনে করে মেহের।এছাড়াও এ বাড়িতে তার আর কাজ কি।বন্দিদশায় ঘুমই সবচেয়ে বড় সঙ্গী।আজ প্রায় অষ্টম দিন হতে চললো সে চার দেয়ালে বন্দি।
ইতোমধ্যে জাহারাকে অনেক বার খবর পাঠানো হয়েছে তার একাকিত্ব কাটাতে কিন্তু তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।এবার বোধহয় সত্যিই জাহারা মুখ দর্শন না দাওয়ার পণ করেছে।এতোদিন তার সকল অপরাধের সঙ্গ দিতে জাহারাকে রাজি করানো গিয়েছিলো অতি সহজেই ,কারণ তার ভাই মাহিবের উপর জাহারার বিশেষ দূর্বলতা ছোট থেকেই। কিন্তু মাহিবের চোখে জাহারা যেন বিশেষ কেউ নয় তাই বিশেষ কেউ হতে সাহায্য করবে এই লোভ দেখিয়ে তাকে এতোদিন আয়ত্তে রাখা গেলেও এই কয়দিনে সে ব্যর্থ দেখে বেশ অবাক হচ্ছে।অবশেষে তবে জাহারার বোধগম্য হয়েছে যে জীবন বাঁচলে এমন সুদর্শন মাহিব অনেক পাওয়া যাবে।
এই বন্দিদশায় মেহের কখনো সুউচ্চ ছাদ দেখে বা কখনো দেয়ালের নকশা কিংবা রাতে জানালার পাশে বসে আকাশের তারাদের গুনে সময় পার করে যাচ্ছিল কিন্তু আর কত? আচমকা দরজার বাইরে মাহিবের কন্ঠের সাথে আরেকটি কন্ঠ শোনা গেল।কিন্তু চিনেও সে কন্ঠের মালিককে যেন মেহের চিনতে পারল না।
চলবে.....