ফন্ট সাইজ:
থিম:
দাহরেখা

পর্ব 5

লেখক: পূর্ণতা আহমেদ

#দাহরেখা
#পর্ব_০৫
#পূর্ণতা_আহমেদ

"লুকিয়ে আমার লেখা পড়ছিলেন ? এই না কাল কত তাচ্ছিল্য করলেন।"

"আপনার লেখা কেন পড়তে যাব? এসবে আমার কোনো আগ্রহ নেই।"

"তাই নাকি? আমি কিন্তু ভালো কবিতা লিখতে পারি কিন্তু পাঠকের খুব অভাব।"

"অভাব হতে যাবে কেন? আপনার তো পত্রিকা আছেই।"

"সেখানে তো আর প্রেমের কবিতা ছাপাই না।এ দুঃসময়ে বিদ্রোহের কবিতা না ছাপিয়ে প্রেমের কবিতা ছাপালে স্বদেশীরা আমাকে ফাঁসিতে ঝুলাবে।"

"তাহলে ইংরেজদের আপনার কবিতা শোনাবেন ফাঁসিতে ঝুলতে হবে না। এখন তো ওদের হাতেই ক্ষমতা।"

এই কথায় শায়ের সশব্দে হেসে ফেলল। সে হাসিতে মেহের থমকালো। শায়েরের গালের দুই পাশে দুটো গাঢ় খাঁজ যেন এই সুন্দর হাসির মূল কারিগর।যে কাউকেই মুগ্ধ করতে বাধ্য। এভাবে এক পলক চেয়ে থাকতে দেখে শায়ের মেহেরের ধ্যান কাটতে তুরি বাজিয়ে বলল,

"অন্যের হবু বউ যদি এভাবে চেয়ে থাকে তাহলে আমার পাপ হবে।"

কথাটি শোনা মাত্রই পাথরের মতো কঠিন মেহের আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলো না।নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করল।যেন নিজের ভার আর নিজে নিতে পারছে না। শায়ের তার এমন দূর্বল রুপ দেখে হোচট খেল।মনে বেশ খানিকটা কৌতূহল জাগলো তাই আগ পিছ না ভেবেই বলল,

"কি হলো মেহের? আমার কোনো কথায় কি আঘাত পেলেন? সত্যিই দুঃখিত বলছি। আপনাকে কষ্ট দাওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু বলিনি বিশ্বাস করুন।"

মেহেরের থেকে কোনো উত্তর এলো না শুধু চোখেল জল গড়িয়ে পড়ছে একের পর এক। আচ্ছা ,যদি প্রশ্ন করা হয় অচেনা কোনো মানুষের সামনে কোনো মানুষ কি হুট করেই কাঁদতে পারে? হয়তো পারে। মেয়েরা আর কিছু পারুক আর না পারুক কাঁদতে বেশ ভালোই পারে,তবে মেহেরের মত কঠোর ভাষার মেয়েদের সচরাচর কাঁদতে দেখা যায় না। অথচ সে শায়েরের সামনে দিব্যি কাঁদছে,বিষয়টা বেশ উপভোগ্যই লাগছে শায়েরের কাছে ,সুন্দর মেয়েদের কাঁদতে দেখার মধ্যেও একটা ব্যাপার আছে,দেখতে ভীষণ ভালো লাগে।বিশেষ করে চোখ-মুখ ফুলে যখন টমেটোর মতো লাল টুকটকে হয়,তখন আরও বেশি ভালো লাগে।তবে শায়ের অপেক্ষা করছে মেহেরের বিব্রত মুখটা দেখার,যখন তার হুশ ফিরবে তখন সে কি করবে? হুট করেই কিছু না বলে আর দশটা মেয়ের মতো পালিয়ে যাবে? নাকি শায়ের কে এর ব্যাখা দিবে? নাকি হুট করেই শামুকের খোলসে ঢুকে পড়বে? কোনটা? শায়েরের মাথায় আপাদত এসব ভাবনা ই আসছে।

মোমবাতির আলো যখন নিভে যাওয়ার উপক্রম তখন মেহেরের কান্না থামে। শায়েরের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে যেন প্রচন্ড অস্বস্তি অনুভব করল,এতক্ষণের জন্য বোধহয় সে পুরোপুরি অন্য জগতে চলে গিয়েছিলো,শায়ের ও এতক্ষণ গভীর চোখে তাকে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিলো।গাঢ় সবুজ শাড়ি জড়ানো মেয়েটির ফরসা চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। মায়া হরিণী চোখ দুটোতে শিশির জমে চিকচিক করছে,খোপা করা ঢেউ খেলানো চুলের গোছা খুলে কোমর ছাড়িয়ে পরেছে।শাড়ির আঁচল কিছুটা এলোমেলো সেদিকে হয়তো মেহেরের খেয়াল নেই। কিছুটা যন্ত্রণা কমতেই সে নিজের জগতে ফিরে আসে।

শায়ের তার ভাবগতি বুঝতে পেরেছে,কিন্ত মেহের অস্বস্তিতে পালিয়ে যাক তা সে আপাদত চাইছে না,এখন একজন সময় কাটানোর মানুষ পেলে ভালোই হবে তাই মেহেরকে অস্বস্তি থেকে মুক্তি দিতে বলল,

"প্রয়োজন নেই আমি ঠিক আছি।"

"নদীর পাড়ে যাবেন? খোলা বাতাসে হাটলে ভালো লাগবে।"

"নিয়ে যাবেন?"

শায়ের ঠোঁটে হালকা হাসি এনে বলল,
"আমি বাড়ির বাইরে আছি আপনি এই ফাঁকে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পরবেন। সাবধান কেউ যেন টের না পায়।"

পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় নদীর পাড়ে উচু পাথরের উপর বসে থাকা দুটি ছায়ামূর্তি স্পষ্ট দেখা যায়। তাদের মধ্যে বিরাজ করছে কঠিন নিরবতা। প্রয়োজনীয় কোনো কথা ছাড়া আর তেমন কিছু আদান প্রদান হয়নি। হয়তো এমন পরিবেশে নিঃশব্দতাই তাদের ভালো মানাচ্ছে। মেহের এই ঠান্ডা বাতাসে নিজেকে সর্বোচ্চ সঁপে দিচ্ছে হয়তো এই নদীর পাড়ে তার আর আসা হবেনা।বিয়ের পর বহু দূরে তাকে নিয়ে যাওয়া হবে। এই পরিচিত পরিবেশ যেখানে তার বেড়ে উঠা সেখান থেকে দূর বহুদূরে। তার চোখের জল,তেজ,স্বপ্ন,স্বাধীনতা সব ধীরে ধীরে বিসর্জন দিয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে নদীর ঢেউয়ে। সেসব এখন মূল্যহীন।

এদিকে মোমবাতির নিভি নিভি আলোতে খাটের উপর বসে আরামে হুক্কা টানছেন লুৎফুন্নেসা। দুই পায়ের কাছে দুই দাসী আর মাথার কাছে আরেকজন। এই তিনজনের কাজই তার মাথা আর পা টিপে দাওয়া।এখনো সেই কাজ ই করছে। এই আরামের মধ্যেই ঘরে ঢুকলো আসমা জরুরি খবর নিয়ে। আসমা লুৎফুন্নেসার বিশ্বস্ত দাসী। বয়স চৌদ্দ কি পনেরো হবে। স্বভাবে চঞ্চল হলেও মাথা একবারেই কাচা।তার প্রধান কাজ লুৎফুন্নেসার সেবা করা নয় বরং ভিতরে বাইরের যত খবর তার কানে পৌঁছে দাওয়া।বিশেষ করে মেহেরের। আসমাকে দেখে লুৎফুন্নেসা চটে গিয়ে বলল,

"এতক্ষণে তোর আসার সময় হলো? সেই কখন চা করতে পাঠিয়েছিলাম।মাথা থেকে কি বের হয়ে গেছিলো?"

"বেগমা আমি এই মাত্রই আপনের মাথা খারাপ করার মতো সংবাদ নিয়া আইছি।"

লুৎফুন্নেসা উঠে বসলেন,আতঙ্কে তার চোখ মুখ শুকিয়ে গেল।
"আল্লাহ! আল্লাহ! আবার কোন অঘটন ঘটল!"

"মেহের আপা একটু আগেই ওই নতুন মেহমানের সাথে একা বের হইছে।"

"উহহ হতচ্ছাড়ি। আমার আত্নাটা বেরিয়ে যেত আরেকটু তেই।বের হয়েছে তো কি হয়েছে ওর হবু স্বামীর সাথে বের হবে না তো কি তোর সাথে হবে? এতো সুখবর!
বেশ অবাক হয়ে মনে মনে আওড়ালেন,
"আজাদের জাদু কাজ করলো কিভাবে ওর উপর!"

" না বেগম ছোট কর্তার যে বন্ধু আইছে তার সাথে গেছে।"

এ কথায় লুৎফুন্নেসার চোখ জোড়া বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। দাঁতে দাঁত চেপে কোনো মতে রাগ সংবরণ করে আসমাকে নিয়ে বের হলো মেহেরের ঘরের দিকে। বিয়ে দিয়ে বিদায় করাই আসল কথা পাত্র গুরুত্বপূর্ণ নয় কিন্তু সে পাত্র শায়ের হলে আপদ বিদায় তো দূর সাথে আরেক আপদ নিয়ে জুটবে।

শায়ের নিজেই এখন আশ্রয়দাতা তার উপর যদি মেহের প্রেমে পরে ,জামশাদ এক কথায় শায়েরকে ঘর জামাই করে রাখবেন। বহু কষ্টে তিনি বিলাতফেরত পাত্র ধরে এনেছেন যাতে বিয়ে দিয়ে আপদ একেবারে বিলেত পাঠাতে পারেন। তবেই এতদিনে পোষণ করা নিজের সুপ্ত বাসনা পূরণ করতে পারবেন।

অবশেষে নিঃশব্দতা ভেঙে শায়ের বলল,

"একটা চুরুট ধরানোর অনুমতি পাবো?"

মেহের মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালো।তারপর আবার নদীর ঢেউয়ে দৃষ্টিপাত করলো। কিন্তু শায়েরের চোখ মেহের থেকে সরলো না। সে রসিকতা করে বলল,
"আপনার হবু বর যদি জানতে পারে আমাকে মেরে টেরে ফেলবে না তো?"

"কিসের হবু বর! আমি এখনো বিয়েতে মত দেইনি।"

"কি বলছেন! এদিকে তো আপনার চাচি পুরো গ্রাম দাওয়াত দিয়ে ফেলছে।"

মেহের কিছুটা হতাশা আর রাগ নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
"আমাকে বিদায় করতে পারলেই সে বাঁচে।"

শায়ের চুরুটে হালকা টান দিয়ে বলল, "চাচির কথা বাদ দিন, আমার তো ওই বিলেতফেরত ব্যারিস্টার সাহেবের জন্য করুণা হচ্ছে! বেচারা বিলেত থেকে আইনের মোটা মোটা বই গিলে এসে ভেবেছিল কোনো শান্ত সুবোধ জমিদার কন্যাকে বিয়ে করবে। বিয়ের পর যখন দেখবে ঘরে বউ নয়, আস্ত একখানা ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী বসে আছে তখন তার ব্যারিস্টারি বুদ্ধি যে কোন নদী পার হয়ে পালাবে, সেটাই ভাবছি!"

কথা শেষ হতেই উচ্চস্বরে হাসির শব্দ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এই প্রথম মেহেরকে হাসতে দেখে শায়ের বেশ চমকালো।অতি মুগ্ধতা নিয়ে সেই হাসি উপভোগ ও করলো।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 5 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন