#দাহরেখা
#পর্ব_০৪
#পূর্ণতা_আহমেদ
"নাম বলে দিলে আর ছদ্মবেশী থাকলাম কই?"
" ঠিক আছে নাম বলতে হবে না। তবে এই পত্রিকা দিয়ে বিশেষ কোনো উপকার করতে পেরেছেন কি? যখন আপনাকে তাদের দরকার ছিল তখন আমাকে জোরপূর্বক তুলে এনে সে সুযোগে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। এই সাহসীকতা কি তাহলে শুধু অক্ষরেই সীমিত? বাস্তবে এর কোনো সফলতা আদো আছে কি?"
"বোধহয় তেমন নেই। আর নাহয় আমার লেখায় জোর নেই আপনি চাইলে একটু চেষ্টা করে দেখতে পারেন।"
"আমি কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাসী।পত্রিকায় বড় বড় প্রতিবাদী অক্ষর লিখে বাস্তবে তা ফলাতে না পারলে তার দাম থাকলো কি?"
" একবার শুনেছিলাম অনেক ক্ষেত্রে কলম অস্ত্রের মতো কাজ করে।"
"আপনার গ্রামে কি কেউ এখনো বেঁচে আছে?"
"আছে কিছু মাটির পুতুল হয়ে।"
"আর আপনি?"
মেহেরের প্রশ্নে কিছুটা বিচলিত হলেও তা আড়াল করতে শায়ের পাল্টা প্রশ্ন করলো,
"চুরুট ধরালে আপনার অসুবিধে হবে?"
" না। আমি অভ্যস্ত।"
"আপনারও অভ্যাস আছে নাকি?"
"রসিকতা ছাড়ুন।" বলেই পিছনে ফিরে ছাদের রেলিং ঘেঁষে বাইরের প্রকৃতিতে চোখ মেলল মেহের।যতদূর চোখ যায় ততদূর চেয়ে রইলো। এরই মাঝে দূরে নদীর চরে কয়েকজন কৃষকদের মশাল হাতে দেখা গেল। এই রাতেও তারা ফসল চাষের তদারকি করছে,বেকার কষ্ট যাকে বলে।এই কষ্টের ফলস্বরূপ অনাহার আর অত্যাচার ছাড়া তাদের ভাগ্যে কিছুই জুটবে না এ ভেবে মূহুর্তেই মেহেরের চোখজোড়া চট জ্বলে উঠলো,হাতের মুঠো শক্ত হলো।মশালের নিভি নিভি আলোতে সে সুন্দর চোখে জলের আভাস টের পেয়ে শায়ের বলল,
"কাজল চোখে জল জমলে তার সৌন্দর্য ঘেঁটে যাবে।"
মেহের থমকে পেছনে ফিরে,তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শায়েরের দিকে এই প্রথম গভীর দৃষ্টিতে তাকালো। প্রথমেই লক্ষ্য করলো শায়েরের চোখজোড়াতে কিছু একটা লুকোচুরি চলছে। সাধারণ বাঙালি পুরুষদের মতো তামাটে গায়ের রং তার উপর সবুজ পাঞ্জাবি আর মোটা কালো চাদর জড়ানো। চুলগুলো উসকো খুসকো হয়ে বাতাসে উড়ছে। তবে কবি কবি একটা ভাব আছে,আজকাল কবিদের গায়ে চাদর জড়ানো বোধহয় ফ্যাশন হয়েছে। মেহের কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে চোখ সরিয়ে ফেললো।
"হঠাৎ কথা হারিয়ে ফেললেন যে? চুরুটের ধোঁয়ায় সমস্যা, না কি আমার চেহারায় কোনো গণ্ডগোল পেলেন?"
"চেহারায় নয়, চরিত্রে। এত ভারী চাদরে গা ঢেকে রাখা পুরুষগুলো ভেতর থেকে একেবারে ফাঁপা হয়।"
"সব শূন্যতা কিন্তু ফাঁপা নয় মেহের।"
"আপনি...... সেদিন আমাকে দেখে চিনলেন কিভাবে?"
"সহজ হিসাব! যারা সে সংগঠনের তারা লুকোনোর জায়গা জানে,তারা কখনো খোলা ময়দানে ছুটবে না।" বলে স্মিত হাসল শায়ের।
" কিন্তু আপনি.....মেহেরের কথা শেষ হওয়ার আগেই পেছন থেকে মাহিবের কন্ঠ শোনা গেল।
"কিরে তোরা এখানে? একটু আসতে দেরি হলো বলে আমাকে ফেলেই আসর জমানো শুরু করে দিয়েছিস?"
"তোর বোন কি আর আসর জমানোর মতো মানুষ?"
"তোমরাই আসর জমাও।" বলে মেহের ভেংচি কেটে এক প্রকার পালিয়েই এলো।পেছনে ফেলে এলো দুইজনের হাসি ঠাট্টার শব্দ। শায়েরের কথায় যে অদ্ভুত অস্বস্তি আর টান তৈরি হচ্ছিল তা থেকে পালাতেই ঘরে এসে পড়লো কিন্তু মন থেকে সে অস্থিরতা কিছুতেই গেল না।
সকাল সকাল চেঁচামেচিতে জামশাদের ঘুম ভাঙল। সকালে এত হট্টগোল কিসের তা দেখতেই বাইরে বেরিয়ে এলেন। অন্দরমহলের বিশাল উঠোনের একপাশে লুৎফুন্নেসা বেগম বাড়ির সব কাজের লোকদের একের পর এক ফরমায়েস জানাচ্ছেন। তার ভাষ্যমতে বাড়ির কাজের লোকেরা এক একজন অকর্মার ঢেঁকি ছাড়া আর কিছু নয়।
বাড়ির শান্তি বিনষ্টকারী এই ভদ্রমহিলাকে জামশাদ অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে।তার মতে, ছেলেকে বিলেত পাঠানোর পর একাকিত্বে বোধহয় লুৎফুন্নেসার মাথা আরও খারাপ হয়েছে। বলে রাখা ভালো এ বাড়িতে তার সবচেয়ে বড় চোখের বিষ মেহের ছাড়া আর কেউ নয়।মেহেরের অবাধ চালচলনে ভাটা ফেলতে ও নিজের চোখের সামনে থেকে দূরে ঠেলতেই দুদিন পর পর তার বিয়ের ঘটকালির দায়িত্ব পালনে দূর দূর দেশে পাড়ি জমান লুৎফুন্নেসা।এ পর্যন্ত শতাধিক পাত্র ধরে এনেছেন কিন্তু কাউকেই মেহেরের উপযুক্ত বলে মনে হয়নি জামশাদের।বড় ভাবীকে অনেক বুঝিয়েও এই ঘটকালির কোনো অবসান করতে পারেননি।শেষবার, লুৎফুন্নেসা মেহেরের চেয়ে বয়সে দ্বিগুণ বড় এক ডাক্তার ধরে নিয়ে এসেছিলেন,সব ঠিক হলেও পাত্রের মাথার চুল প্রায় সব ঝরে গেছে,জামশাদের অমত থাকলেও ভাবীর জোরাজোরিতে অবশেষে রাজি হয়েছিলেন,কিন্তু সে বিয়েও ভেস্তে গেল।
এই নিয়ে গত সপ্তাহে লুৎফুন্নেসার সাথে মেহেরের সংঘাত বাধলে তিনি বাপের বাড়ি চলে যান এবং পণ করেন এবার মেহেরকে বিয়ে দিয়ে বিদায় করেই তবে ছাড়বেন।তাই দশ গ্রাম খুঁজে এবার এক সুপাত্র ধরে নিয়ে এসেছেন।
জামশেদকে দেখে মুখের রাগ যেন মূহুর্তেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল লুৎফুন্নেসার।কাছে এসে বললেন,
"এই দেখো জামশাদ।এবার আমাদের মেহুর জন্য একেবারে উপযুক্ত পাত্র ধরে নিয়ে আসছি।এবার তোমার মেয়ে কোনোভাবেই আপত্তি করতে পারবে না।” বলে পাত্রের দিকে ইশারা করলেন।
এই সুপাত্রের নাম আজাদ হালদার।সদ্য বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাশ করে ফিরেছে।বাকি বর্ণনা পরে শুনবেন বলে জামশাদ লুৎফুন্নেসাকে থামতে বললেন আর অতিথিকে অতিথিশালায় বিশ্রাম করতে পাঠালেন।আজাদের উপর জামশাদের এমন অতিথিয়তায় লুৎফুন্নেসা বেশ খুশি হলেন।অবশেষে বোধহয় পাত্র তাদের পছন্দ হবে ভেবে তড়িঘড়ি করে দুপুরের আয়োজন করতে গেলেন।
বিশাল রান্নার আয়োজন হয়েছে আজ দুপুরে। বিশেষ পদ হিসেবে রাখা জাফরানি পোলাও,খাসির আস্তো পায়া,নদীর বড় কাতল ও রুই মাছে ঝোল,কাজুবাদামের সালাদসহ সবকিছু নিজে থেকে তদারকি করেছেন লুৎফুন্নেসা। আপদ বিদায়ের খুশিতেই বুঝি এতো আয়োজন। সকলেই একে একে গদিতে বসলো। এত অপচয় কারোই তেমন পছন্দ হলো না।কিন্তু জামশাদ বড় ভাবীর মুখের উপর কিছু বলতে পারেন না তাই চুপ বনে গেলেন।
সবার শেষে মেহের নীচে নেমে আসল।যেখানে গ্রামের মানুষ অভাব অনাহারে ভুগছে সেখানে এমন রাজকীয় ভোজ যেন মূহুর্তেই তার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো কিন্তু অদ্ভুত কোনো কারণে সে নিশ্চুপ থেকে মাহিবের পাশে বসলো।ইশারায় জানতে চাইল কিসের এত আয়োজন। মাহিব ইশারায় বোঝালো সে নিজেও জানেনা।
মেহেরকে দেখেই লুৎফুন্নেসা অতি আদরে ভিতর থেকে আজাদকে ডাকলেন।
বাইরে বেরিয়ে আসতেই সকলের চোখ পড়লো তার দিকে। দেখতে বেশ লম্বা,উজ্জ্বল ফরসা হলেও সবার প্রথমে তার চোখের মোটা ফ্রেমের চশমাটাই নজর কাড়বে। চুল গুলো একপাশে আচড়ে রাখা যেন বোঝাচ্ছে এই লোক নিঃসন্দেহে ভদ্রলোক। পরনে সুতি বাদামি ফতুয়া আর সাদা পাজামা।
তার ঢুকতে দেরি কিন্তু লুৎফুন্নেসার বলতে দেরি নেই।আজাদ মুখ খোলার আগেই লুৎফুন্নেসা অতি উৎসাহে বলে উঠলো,
"ও আমার গ্রামের ছেলে। এ কদিন আগেই বিলেত থেকে লেখাপড়া শেষ করে ফিরল।আমাদের মেহুর মনের মতো পাত্র একেবারে ধরে নিয়ে আসছি এবার। দেখতে কি সুন্দর দেখেছো!মেহুর রুপ ও ওর সামনে সামান্য লাগবে।আর দেরি না করে কালকেই বিয়েটা সেরে ফেলো জামশাদ।ওর যে বয়স এই বুড়ি বয়সে এমন ছেলে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে এই তো সাত কপাল তাছাড়া ওর মতো মেয়ে......
"আহ থামো চাচি।একটু দম নাও এবার।আগে অতিথিকে বসতে দাও। আর আমাদের মেহের কি ফেলনা নাকি যে ওকে এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছো?"
"তুই চুপ কর মাহিব। এসব বলে ওকে আর মাথায় তুলিস না।" বলতে বলতেই হটাৎ তার চোখ পড়লো শায়েরের উপর। এতক্ষণ নিজের কথার তালে শায়েরকে চোখেই পড়েনি লুৎফুন্নেসার।
"তোর পাশে ও কে মাহিব? আগে তো দেখি।"
"ও আমার বন্ধু শায়ের।এখানে কিছুদিন থাকবে।পাশের গ্রামেই থাকে আফতাব নগর।"
সে কথার কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়েই লুৎফুন্নেসা জামশাদ কে আবার বলতে শুরু করলেন,"কি জামশাদ এবার কিন্তু তুমি আজাদকে অপছন্দ না করে থাকতে পারবে না। অনেক খুঁজে এমন সুপাত্র পাওয়া গেছে।এবার না মানলে আমার খুব সম্মানে লাগবে বলে দিলাম।"
লুৎফুন্নেসার অতিরিক্ত প্রশংসায় আজাদ বার বার নববধূর মতো মুখ রুমাল দিয়ে ঢেকে নিজের লজ্জা আড়াল করছে। তা দেখে বহুকষ্টে শায়ের নিজের হাসি নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে। বোধহয় তার কাছে একটি রুমাল থাকলে তারও হাসি লুকাতে সুবিধা হতো।
জামশেদ উত্তরে বললেন,"মেহেরের পছন্দ হলেই কথা আগানো হবে।"
সবাইকে অবাক করে দিয়ে মেহের এবার কোনো তামাশা করলো না।উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করলো না।শুধু এক কথায় বলল,"আমার কিছুদিন সময় লাগবে।"
সকলের মাথায় এবার যেন আকাশ ফেটে পড়লো।এই একগুয়ে মেয়ে এত সহজে রাজি হবে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবুও লুৎফুন্নেসা তাচ্ছিল্য করে বলল,
"আর কত সময় নিবি? এখনই চেহারায় বয়সের ছাপ পরে গেছে।আর আমাদের সময় কি আর এত রং ঢং ছিলো বাপ মা যার ঘাড়ে দিয়েছে তার ঘাড়েই ঝুলে গেছি। এত মুখ ফুটে কথা বলার সাহস করিনি।"
মেহের কথার বিপরীতে কথা বাড়ালো না। এই মহিলার সাথে কথা বাড়ানো মানেই সময় নষ্ট।তাই খাওয়া আধা শেষ করেই হাত ধুয়ে উঠে নিজ ঘরে চলে গেল।
জামশেদ হালকা কেশে নিজের দিকে সকলের মনোযোগ টেনে নিয়ে বললেন,"যেহেতু ও রাজি হয়েছে ওকে আর না চাপানোই ভালো হবে।আজাদ কিছুদিন এখানে থাকুক।ওদের চেনা পরিচয় হোক তারপর এ নিয়ে কথা আগানো হবে।"
লুৎফুন্নেসার মুখে অসন্তুষ্ট দেখা দিলেও বাকিরা এ বিষয় নিয়ে আর বেশি ঘাটল না।খাওয়া শেষে মাহিব আজাদকে নিজের ঘরে নিয়ে খোশ গল্প শুরু করলো,সাথে ছিলো শায়ের ও।
মাহিবের ঘরের পাশের ঘরটা তে শায়েরকে থাকতে দাওয়া হয়েছে। সন্ধ্যার দিকে মেহের ভাইয়ের ঘরের কাছে আসলে ভেতরে তাদের হাসি তামাসার শব্দে আর বিরক্ত করতে চাইলো না।পাশে শায়েরের ঘর দেখে কিছু একটা ভেবে সেই ঘরে ঢুকলো।দেখলো ঘরটা ফাঁকা।
টেবিলের উপর কিছু সাদা কাগজ ছোট মার্বেল পাথরের নিচে আটকা পরে বাকি অংশগুলো বেলকুনি থেকে আসা বাতাসে উড়ছে। কিছুক্ষন সে পাথরে চাপা পড়া পৃষ্ঠাগুলোর ছটফটানি দেখে স্থির হয়ে চেয়ে রইলো হঠাৎ অজান্তেই ইচ্ছে করলো পাতাগুলোকে মুক্ত করে দিতে।যখন ই পৃষ্ঠায় হাত দিতে গেল পেছন থেকে একটা হাত জাপটে ধরলো মেহেরের হাত। ঠান্ডা সে হাতের স্পর্শ পেয়ে আচমকা ধ্যান ফিরলো মেহেরের।