ফন্ট সাইজ:
থিম:
বৃষ্টি ভেজা এক সন্ধ্যায়

পর্ব 1

লেখক: নাবিলা সৈয়দ

#বৃষ্টি_ভেজা_এক_সন্ধ্যায়
-নাবিলা সৈয়দ
সূচনা পর্ব ১

আমি ইসাবেলা। তিন মাস পূর্বে রিহ্যাব থেকে ছাড়া পেয়েছি। আশ্চর্যজনক ব্যাপার কী জানেন? আমার যার সাথে বিয়ে হয়েছে সে ও গতকাল রিহ্যাব থেকে ছাড়া পেয়েছে। ব্যাপারটা আমার মন পুলকিত করছে। আমি খুবই আনন্দিত। আমাদের এত মিল দেখে আমার খুশিতে নাচতে মন চাইছে, কিন্তু এই মুহুর্তে আমি বিছানায় বসে আছি চুপটি করে। লাফালাফি ঝাপাঝাপি একদম করা যাবে না। আম্মু বারবার বলে দিয়েছে শ্বশুর বাড়ি গিয়ে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি করবে না। এজন্য ভদ্র মেয়ের মতো আছি। সামনে দাঁড়ানো আমার স্বামী ধুমধাম লাফাচ্ছে। যা বলছে তা শোনার বিন্দুমাত্র আমার ইচ্ছে নেই এই মুহুর্তে। তাই পুরোনো স্মৃতি একটু ভাবার কথা ভাবছি।

আমার নাম ইসাবেলা রেখেছেন আমার দাদা। একটু বিদেশি ভাইব আছে না? উনার পছন্দের হলিউড হিরো জোনাস এর স্ত্রীর নাম ছিল ইসাবেলা। মহিলা ছিলেন স্বর্ণকেশী। চোখগুলো ছিল সবুজ। আর গ্রীক দেবতাদের মতো সৌন্দর্য্যের অধিকারী। সৌন্দর্য্যে আবীর্ভূত চেহারাটার গালে ছিল ফ্রেকেলসের ভীর। জোনাসের স্ত্রীকে দেখার পর আমার দাদাজান জোনাসকে দেখাই বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন। এত পছন্দের হিরো হয়ে উঠেছিল উনার চোখের বিষ। ওকে দেখতেই পারতেন না। ওর বউয়ের সাথে কোথাও দেখলেই বলতেন,’ইসাবেলার সাথে আমাকে একমাত্র বেশি মানাত, এই গোরুটাকে মানায় না।’

প্রেমিকার সাথে বিচ্ছেদ হয়ে গেলে যেমন প্রেমিকার নাম নিজের সন্তানের নামে রাখে প্রেমিকরা তেমনি আমার দাদাজান নাতনীদের নাম রাখার অনেক চেষ্টা করেছিলেন,কিন্তু সেই সময় কোনো কাজিনের নাম রাখা যায়নি। সবাই স্কুল কলেজে পৌঁছে গিয়েছে। সমস্যা হতে পারে ভেবে বাপ চাচারা কেউ এটা নিয়ে গা করেনি। নাম রাখতে না পারায় দাদাজানের সারাদিন কাটত বিষন্নভাবে। তিনি ইসাবেলা নাম না রাখতে পারার দুঃখ কীভাবে সারাবেন বুঝতে পারলেন না। ঈশ্বর হয়তো উনার প্রতি একসময় সদয় হলেন,তাই উনার মুখে হাসি ফুটাতে আমার আগমনী বার্তার গুঞ্জন উঠল পুরো বাড়িতে।

মা বাবার শেষ বয়সের সন্তান আমি। সকলের আদরের হওয়ার কথা থাকলেও সবাই কেমন বাঁকা চোখে তাকাত, একমাত্র দাদাজান ছাড়া আর কেউই আমাকে ভালোবাসত না। আমার জন্মের দিন উনি ভীষণ উৎফুল্ল ছিলেন। চিৎকার দিয়ে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছিলেন। হাঁটছিলেন আর বলছিলেন,'আমার ইসাবেলা, আমার ইসাবেলা আসতে চলেছে।

দাদাজানের খুশিতে জল ঢেলেছি কিনা জানি না, কিন্তু আমি কোনো স্বর্ণকেশী হয়ে জন্ম নেইনি, না আমার চোখ সবুজ, না গ্রীক দেবতাদের মতো আমি সৌন্দর্য্যের অধিকারী। আমি সাধারণ এক বাঙালী নারী। যার চেহারা হলুদ আভা আছে, মুখে সামান্য কোমলত্ব আছে, আর মায়ের গোলাটে চেহারা পেয়েছি।

মা বাবার আদরের সন্তান না হওয়ায় আমার কোনো আফসোস ছিল না। আমি দাদাজানের সাথে সারাদিন থাকতাম। আমাদের সব গল্প থাকত হলিউডের নায়িকা নায়ক বা সাহিত্যের প্রেমিক প্রেমিকা যুগল নিয়ে। কাহিনি বিন্যাস কেমন হলে ভালো হতো, এভাবে না হলে হতে পারত এগুলো নিয়ে। একসময় দাদাজান একটা উপন্যাস লিখে ফেললেন। অইটা পড়ে আমি ভীষণ উৎসাহিত করতাম উনাকে। কাহিনি কিন্তু অতো ভালো ছিল না। ছাড়া ছাড়া টাইপ বলা যায়। প্রেমিক ছিল ছন্নছাড়া, তাই তাকে ছেড়ে প্রেমিকা অন্য এক লোককে বিয়ে করে নেয়। সাধারণ কাহিনি। এটার কাহিনি পরে একদিন বলব। তো দাদাজানের ব্যাপারে বলি। তিনি ছিলেন ভীষণ বই পড়াকু মানুষ। শব্দের ভাঁজের মহত্ব তিনি সেকেন্ডের ভেতর খুঁজে বের করতে পারতেন। উনার এই স্বভাবটা আমি নিংড়ে নিয়ে আসছি। এত বই পড়েছি যে এখন আমার সাহিত্যিকদের মতো কথা বলতে ইচ্ছে হয়। ধরুন আম্মু এসে বললেন,'আয় খাবার খাবি।' আমি বললাম,'তুমি যাহা থেকে আহিয়াছিলে তাহাই হেন্দাইতে হেন্দাইতে চইলা যাও। এখনি আমি খাবার খামু না।

এখানে কী ভুল ছিল? কোনো ভুল নেই, তবুও আমাকে জুতোর বারি খেতে হয়েছে। এত মার খেয়েও আমি আমার সাধু চলিত ভাষার মিক্সিং ছাড়তে পারিনি।

আরো কিছু ভাবতে চাইছিলাম, কিন্তু এই মুহুর্তে আমি ভাবতে পারছি না। সামনে দাঁড়ানো উজবুকটা রীতিমতো আমাকে ঘুরছে।৷

উজবুকটার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে কীভাবে আপনাদের প্রশ্ন থাকতেই পারে তাই না? আসলে আমার বাবার বন্ধুর ছেলে এই পাগল লোক। কাকে নাকি পিটিয়ে কোমায় পাঠিয়ে দিয়েছে। অতিরিক্ত রাগের জন্য সে ছিল পাঁচ মাস ওখানে। আমি ছিলাম তিন মাস, আমার থেকে দু-মাস বেশি থেকেছে এই লোক।

বিয়ের কাহিনি বলি। রিহ্যাবে তিন মাস থাকার পর আমি বাড়ি ফিরি। বাড়িতে আসার তিন মাস চলছিল আমার। দাদাজান ছাড়া আমাকে একটু ভয় পায় সবাই, আমি বুঝতে পারি। আড়ে আড়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে সবসময়। তিন মাস পূর্ণ হয়ে দু-দিন হয়েছিল। সেদিনই বাবা প্রস্তাবের কথা জানালেন।

রাতের খাবার সবাই খাওয়ার পর আমি আর দাদাজান খাই। সেদিন রাতের খাবারের সময় আমাদের ডাকা হলেও আমি আর দাদাজান কোনো প্রকার টু শব্দটি করিনি। যখনই দাদাজানকে আর আমাকে খাবারের জন্য ডাকা হয়েছে তখনই আমাদের কোনো না কোনো ব্যাপারে ফাঁসানো হয়েছে। এবার আমরা নড়িনি। ওরা ডেকে টেকে হয়রান হয়ে চলে যাওয়ার দু-ঘন্টা পর বের হলাম। ড্রয়িং রুম নিস্তব্ধ নীরব তখনো। আমি আর দাদাজান টেবিলে সাজানো খাবার দেখে চুপচাপ বসলাম। চেয়ার এমনভাবে টানলাম যেন কাকপক্ষী ও না টের পায়। খাবার টেবিলে বসে প্রথম লোকমা মুখে তোলার পরই আমার মুখের সামনে উদয় হলেন আব্বু। আমাদের একটা স্বভাব বা নীতি আছে৷ খাবার টেবিলে একবার বসে গেলে খাবার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কখনো উঠা যাবে না। আমাদের সাধ্য থাকলে দু-জনেই ছুটে যেতাম অই সময়। একে একে আমার চাচা, চাচি, চাচাতো ভাই, আম্মু চিপা থেকে বেরিয়ে এসে বসলেন আমাদের ঘিরে। দাদাজানকে কিছু বলতে নিবেন তিনি বললেন,’খাবার সময় কথা বলা আমি ডিসলাইক করি। তাই ফরগেট করো নিজের কথা।

দাদাজান কথার মধ্যে ইংরেজি বলতে ভালোবাসেন অনেক। তাই এমন টুকটাক ইংরেজি বলেন। আব্বু তবু্ও অটল রইলেন। আমাকে কিছু বলতে নিলেন, আমি বললাম,”দাদাজান যাহা বলিয়াছেন, তাহাতেই আমি সহমত পোষণ করি। যখনই আপনারা আমাকে রিহ্যাবে পাঠাইয়া ছিলেন তখনই আমি আপনাদের পর হইয়া গিয়েছিলাম। তাই আমাকে নিয়ে কোনো কথা এই ঘরে চলিবে না।

আব্বু কানেই তুললেন না আমার কথা। উনার কথা তুললেন খুব ধীরে ধীরে। আমি আর দাদাজান ভেবেছিলাম টাকা পয়সা চাইবেন, কিন্তু তা চাইলেন না।।আমাদের ভাবনাতীত কথাই বললেন।

“বেলার বিয়ের প্রস্তাব এসেছে।

দাদাজান চমকালেন। চমকালে উনার ভ্রু উচিয়ে যায়। তবুও নিজেকে স্বাভাবিক রেখে, ঠাঁটপূর্ণ কন্ঠে বললেন,” তো?

আব্বু নিরুদ্বেগ থাকতে চাইলেন, হলো না৷ কন্ঠে উত্তেজক ভাব আছে,”তো কী? বিয়ে দিব না ওর? আপনি গা ছাড়া কীভাবে হচ্ছেন বাবা?

দাদাজান বললেন,”গা ছাড়া কোথায়, বিয়ে যখন হওয়ার তখন হয়ে যাবে। চিন্তার কী আছে?

আব্বু মানতে পারলেন না ব্যাপারটা। বললেন,”ছেলে ভালো।

“ছেলে কোনটা? অই রেগে মানুষ মেরে যেটা পাগলা গারদে গিয়েছে? পাগলটা?

আমি কথাটা বলেই খাবার তুললাম মুখে।এমনভাব করলাম, যেন কিছুই হয়নি।হাত বাবা চ্যাঁচিয়ে উঠলেন,”বেলায়ায়া, বড়দের কথায় কথা বলবে না। আর পাগল কী? সামান্য রাগ বেশি, যা সবারই থাকে।

আমি আর কথা বলিনি। কিন্তু একটা ব্যাপারে হাসি পেল। সামান্য রাগ। ওই রাগ সামান্য না, ওটা জঞ্জলীদের মতো রাগ। দাদাজানের কথায় আমি তাকালাম, তিনি বললেন,” ভুল কিছু বলেনি তো, যে মানুষ মেরে কোমায় পাঠিয়ে দিতে পারে, সে তো রাগে উঠলেই আমার নাতনীকে ও কোমায় পাঠিয়ে দিবে।

আব্বু বললেন,"আপনার কী মনে হয় বাবা, ইসাবেলাকে আড্রিয়ান আঘাত করলে সে ছেড়ে দিবে? আড্রিয়ান একটা আঘাত করলে, বেলা দশগুন বেশি আঘাত করবে।

এই নিয়ে দাদাজান আর আব্বুর কথা কাটাকাটি হলো অনেক। দাদাজান মেনে নিবেন না তার নাতনী আঘাত করতে পারে কাউকে।

ঝগড়া এমন পর্যায়ে পৌঁছুল দাদাজান তেড়ে গেলেন বাবার দিকে। আমি তখনো নির্লিপ্ত। আম্মু চাচি ব্যস্ত তাদের থামানোতে। আরেক লোকমা খাবার মুখে তুলে আরাম করে বসে বললাম,’আমি বিয়ে করব।’ তারপর একটা লম্বা ঢেঁকুর তুললাম। আহ কী মজার তরকারি ছিল সেদিন, আর ঝগড়াটা খাবারে আরো স্পাইস বাড়িয়ে দিয়েছিল। ব্যাপারটা আবার দেখতে পারলে ভালো হতো। আমার ভাবনা আরো ঘন্টা খানেক চলমান থাকত, কিন্তু আমার সামনে দাঁড়ানো উজবুকটা বর্তমানে আমার দিকে যে নজরে তাকিয়ে আছে সে নজরে তাকানোর মানে আমি জানি। এক্ষুনি আমাকে তুলে আছাড় দিতে ব্যাটার মন চাচ্ছে। এবং ব্যাটা উজবুক এটা করেই ছাড়বে। তাই ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে এইদিকে। আমার কাছে এগিয়ে এসে কিছু বলতে নিবে আমি আমার কাছে রাখা ছুরিটা বের করলাম শাড়ির নিচ থেকে আলগোছে। ব্যাটা তখনো খেয়াল করেনি। আরেকটু এগিয়ে এসে যেই আমার গলা ধরতে যাবে, আমি ছুরি তাক করে বলতে নিলাম,”আগেরবার একজনকে মেরে রিহ্যাবে গিয়েছিলাম, এবার মনে হচ্ছে আপনাকে মেরে হাজতে যেতে হবে। আয় ব্যাটা.. দেখি কী করতে পারিস তুই?

কিন্তু ব্যাটা এগোল না। দূরত্ব বজায় রেখেই শুধাল,"ডিভোর্স কবে নিবে? আজ নাকি আগামীকাল?

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন