#বৃষ্টি_ভেজা_এক_সন্ধ্যায়
#নাবিলা_সৈয়দ
পর্ব নং:-০২
“ডিভোর্স কবে নিবে? আজ নাকি আগামীকাল?
বাসর রাতে স্বামীর বলা এই কথা শোনে আমার মাথায় যতটুকু বজ্রপাত হওয়ার কথা ছিল তার এক বিন্দু হলো না। আমি শুধু মুচকি মুচকি হেসে আমার প্রিয়তম স্বামীর মাথাটা গরম করে দিলাম। লোকটা রাগী। রেগে যেতে বেশি সময় লাগল না। খ্যাপাটে নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ। উজবুক লোকটা উল্টাপাল্টা কিছু বলার আগেই অতীত নিয়ে একটু ভেবে ফেলাই ভালো। এখন একটু অতীত ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছে।
সামনে দাঁড়ানো লোকটা আমার অপরিচিত না, আবার খুব পরিচিত না। একটা লোককে পিটে বারি মারতে গিয়ে মাথায় বারি মেরে বসেছিলাম আমি। এজন্য পুলিশ কেস হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির মানুষ আমাকে নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত হলো না। আমি গেলে যা না গেলেও তা। একমাত্র দাদাজান উত্তেজিত হলেন। তিনি দৌড়ালেন উকিলের কাছে। বাংলাদেশের অবস্থা তো জানি আমরা। টাকা ছাড়া কেউই চলে না। টাকা কড়ি অনেক ঢালার পর উকিল ব্যাটা বলল ফেইক রিপোর্ট বের করার জন্য। আমার মাথায় সমস্যা আছে এমন টাইপ কিছু। দাদাজান ফেইক মেডিকেল রিপোর্ট বের করলেন। সেখানে আমি মানুসিক ভারসাম্যহীন। অনেক সময় রাগের মাথায় অনেককে আঘাত করে বসি। এতে সাক্ষ্য হিসেবে আশপাশ থেকে মানুষ জোগাড় ও করলেন। তারাও আমার হয়ে সাক্ষ্য দিল। কোর্ট থেকে রায় আসলো আমাকে রিহ্যাবে রাখার জন্য। আমি নাকি হার্মফুল মানুষের জন্য। দাদাজান শুনলেন কথা, আমাকে রিহ্যাবে নিয়ে রেখে আসলেন। আসার সময় একা তিনি কেঁদে কেটে ভাসালেন। অন্যরা যেন স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেললেন আমাকে সেখানে রেখে এসে।
রিহ্যাবে আমার শান্তিপূর্ণ দিন কাটছিল। কেউই আমাকে জ্বালানোর নেই। আমার এই শান্তশিষ্ট ব্যবহার দেখে অনেকেই ভাবত আমি ঠান্ডা মেজাজের কোনো ঘাতক। তাই আমার থেকে দূরত্ব বজায় রাখত। এটা আমার জন্য ভালোই ছিল। নিজের রুমে থাকতাম, ক্লাসের সময় ক্লাস করতাম, অবসরে গুণগুণ করে গান গাইতাম৷
আমার রুমের পাশে যে ছেলেটা থাকত অনেক সময় যেচে পড়ে এসে আমার সাথে কথা বলত। আমিও বলতাম। ওর সঙ্গ আলাদাই ভালো লাগত আমার। খারাপ কোনো কিছু ভাববেন না। বন্ধু হিসেবেই ভালো লাগত। ও ওর স্ত্রীর বিষয়ে গল্প করত,আমি মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। ওহ এটা বলিনি আমার তিন মাস রিহ্যাবে থাকাকালীন ও আমার কাছের একজন বন্ধু হয়ে উঠেছিল। শেষ দিন আসার সময় জানতে পারলাম ও মুসলিম। এটা জানার পর আমার হৃদয় ব্যথিত হয়েছিল সামান্য। ভেবেছিলাম ও আমাদের মতোই খ্রিস্টান। কী সুন্দর ছেলেটা! স্নিগ্ধ ছিল ও। মুসলিমরা এমনই স্নিগ্ধ হয় আমি ব্যাপারটা খেয়াল করে দেখেছি। যাই হোক, বন্ধুর সাথে আমার আড্ডা খুব ভালোই চলত৷ সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত। একদিন সন্ধ্যা বেলা আমার বন্ধু আসলো না আমার সাথে দেখা করতে। আমি তাই ওর খুঁজে বের হলাম। প্রতিদিন ও আসে আজ না হয় আমি গেলাম এটা ভেবে। না দেখা করলে খারাপ দেখায়। হেঁটেই যাচ্ছিলাম ওর রুমের দিকে প্রতিমধ্যে একজন আমাকে থামিয়ে দিল। জিজ্ঞেস করল,”ওদিকে যাচ্ছো কেন?
আমার মতোই পোশাক পরা মেয়েটার। আমি উত্তর করলাম ধীরে সুস্থিরে,”আমার এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাচ্ছি।
মেয়েটা চোখটা ছলছল করে উঠল। কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,”ওদিকে যেয়ো না, একটা পাগল একটা রোগীকে মেরে আধমরা করে দিয়েছে। তুমি গেলে তোমাকেও মারবে।
মেয়েটার কান্নায় আমার বুকে সূক্ষ্ম ব্যথা হলো। ওকে বললাম,”চিন্তা করো না।
যেতে নিতে গেলেই মেয়েটা শুধাল,”তুমি যাচ্ছো?
আমি মাথা দোলালাম। মেয়েটা আমাকে কিছু বলতে চাইলেও আমি শুনলাম না হেঁটে এগোলাম সামনে। পেছন থেকে যে তৃষ্ণাত চোখে মেয়েটা চেয়েছিল তা আমি উপলব্ধি করতে পারলাম, তবুও ফিরে তাকালাম না।
ফুড কোর্টে মানুষের ভীর ছিল। গিজগিজ করছিল মানুষেরা। এত মানুষের ভীরে আমার বন্ধু থাকতে পারে ভেবেই এসেছিলাম, কিন্তু আশপাশে চোখ বুলিয়ে কোথাও দেখতে পেলাম না। তাই ফিরে যেতে নিলাম, তখনই গুঙিয়ে উঠে আমাকে কেউ ডেকে উঠল,”বেলা, আমাকে বাঁচাও।
তড়াক করে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালাম। ও কীভাবে আমাকে দেখেছে আমি জানি না, তবুও ওর গলার স্বর শুনে আমি ছুটে গেলাম। ভীর ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখলাম একটা লোক ওকে পিটছে। বুকের উপর পা দিয়ে পাড়া দিয়ে ধরে রেখেছে। পেছন থেকে দেখেই বুঝলাম রেগে রীতিমতো হাঁপাচ্ছে। আমি লোকটার দিকে তাকানোর মতো সু্যোগ পেলাম না, আমার বন্ধুর মুখ নাক বেয়ে গড়িয়ে পরা রক্ত দেখেই আমার হুঁশ উড়ে গেল। ছুটে গিয়ে ওকে বাঁচাতে চাইলাম, কিন্তু খালি হাতে ওকে বাঁচানো সম্ভব না আমি জানি। তাই পাশে থাকা একটা ফ্লাওয়ার ভাস উচিয়েই লোকটার ঘাড়ে বসালাম। লোকটা ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে চাইল, হয়তো শরীর স্বায় দিয়ে উঠল না। আমি জানি না কীভাবে কী হলো, লোকটা ঢলে পড়ল মেঝেতে। তার পা সরে গেল আমার বন্ধুর বুকের কাছ থেকে। হুঁশ হারানোর আগে ওই উজবুক লোকটা হিসহিসালো,”তোকে আমি দেখে নিব।
বর্তমানে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার অতি প্রিয়তম রাগী স্বামী চ্যাঁচিয়ে উঠলেন,”তোমাকে কী বলেছি, শোনোনি? কবে ডিভোর্স নিবে? আজ নাকি আগামীকাল?
আমি কানে হাত দিলাম। মুখে ফুটে উঠল বিরক্তি। বললাম,”আহ্, চ্যাঁচাচ্ছেন কেন? চাচা বয়সী মানুষ চ্যাঁচালে মানুষ কী বলবে?
রাগে কেরাসিন ঢালার ন্যায় কাজ করল কথাটা“হোয়াট ডু ইউ মিন বায় চাচা বয়সী?
গা ছাড়া ভাবেই উত্তর করলাম,“চাচা বয়সী মিন চাচা বয়সী।
আমার দিকে আঙুল তুলে আসতেই আমার ছুরিটা বের করলাম। চোখের ইশারায় সাবধান করে দিলাম কাছে না আসার জন্য। ব্যাটা ভয় পেল না বিন্দুমাত্র, তবুও দাঁড়িয়ে গেল। শাসিয়ে বলল,”একদম মুখে মুখে তর্ক করবে না। আই হেইট আর্গুমেন্ট।
আমি ভদ্র মেয়ের মতো মাথা নোয়ালাম,’'জি আচ্চা” বলে। এটা রাগে পেট্রোল ঢালার মতো কাজ করল। ছ্যাত ছ্যাত করে উঠলেন আড্রিয়ান। বললেন,”একদম ভদ্র হওয়ার চেষ্টা করবে না।
আমি আচ্চা বলতে গিয়ে থেমে গেলাম। আমার উনি রাগ কমাতে গিয়েও কমাতে পারলেন না। খ্যাকখ্যাক করে উঠে বললেন,”তোমার মতো একটা পাগল মেয়ের আমার মতো একটা লোকের সাথে বিয়ে হয়েছে এটা তোমার সাত জন্মের ভাগ্য। তোমার কী যোগ্যতা আছে আমার স্ত্রী হওয়ার? কোনো যোগ্যতা-ই নেই।
আমি কিছু বলতে নিলাম উনি ঠোঁটে আঙুল তুলে চুপ দেখালেন। বললেন,”কী ভেবেছ আমাকে বিয়ে করলে আমার স্ত্রী হয়ে যাবে, কখনো না। আমি আড্রিয়ান কখনো তোমাকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নিব না। আমার স্ত্রী হওয়ার সম্মান কখনো পাবে না। তুমি একটা নোংরা কীট নোংরাই থাকবে।
প্রথম কথাগুলো মেনে নেওয়ার মতো থাকলেও শেষের কথা শোনে আমার মেজাজ একশো আশি ডিগ্রীতে ঘুরে গেল। আঙুল তুলে উঠে দাঁড়ালাম। আমাকে কেউ অপমান করে কখনো যেতে পারেনি জবাব ছাড়া, তাই কঠোর স্বরেই বললাম,”আমাকে জিজ্ঞেস করছ আমার কী যোগ্যতা আছে তোমার স্ত্রী হওয়ার, হু? আমার সব যোগ্যতা আছে তোমার স্ত্রী হওয়ার, তোমার কোনো যোগ্যতা নেই আমার স্বামী হওয়ার।।
চোখ বড় বড় করে আমার স্বামী আড্রিয়ান চৌধুরী বললেন,’তুমি আমাকে অপমান করছ?
কথা বলতে বলতে উনি প্রায় আমার গায়ের উপরে উঠে আসলেন। আমি উনার গা ঠেলে দূরে সরিয়ে দিয়ে বললাম,”আপনার মান থাকলে না অপমান করব।
কথাটা শোনার পর উনি যেভাবে তাকালেন তা আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে ভয়ংকর দৃষ্টি ছিল। আমার বুকটা কেঁপে উঠল ধপ করে। তবুও আমি সেই দৃষ্টির পরোয়া করলাম না। কারণ আমি ইসাবেলা।
চলবে...