🌸আমার শখের পিচ্চি বউ 🌸
লেখিকা: ইসমত জাহান জেনিফা
পৰ্ব—৪
রাতের খাওয়া শেষ করে জিনিয়া পরিবারের সবার সঙ্গে বসে গল্প করতে লাগল। সবাই মিলে হাসি-আড্ডায় মেতে উঠলেও জিনিয়ার মনটা ভালো ছিল না। সে সবার সঙ্গে কথা বলছিল, হাসার চেষ্টা করছিল, কিন্তু আগের ঘটনার কষ্টটা তখনো তার মন থেকে মুছে যায়নি।
সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও একজনের চোখ এড়াল না—রাহাত খান। জিনিয়ার মুখের দিকে তাকিয়েই সে বুঝতে পারল, মেয়েটার মন খারাপ। তবে সবার সামনে কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর জিনিয়া উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
—আচ্ছা, আমি এবার ঘুমাতে যাই। আমার অনেক ঘুম পাচ্ছে। কালকে আবার স্কুলে যেতে হবে, তাই তাড়াতাড়ি ঘুমাতে হবে। তোমরা সবাই কথা বলো।
এরপর সবার উদ্দেশে মৃদু হেসে বলল,
—গুড নাইট, সবাই।
কথাটা বলেই জিনিয়া নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
ঘরে গিয়ে ঘুমানোর আগে সে এশার নামাজ আদায় করার জন্য প্রস্তুতি নিল। দেখতে দেখতে রাত বারোটা বেজে গেল। অবশেষে সে এশার নামাজ পড়তে দাঁড়াল। নামাজ শেষে তার মনে তখনো আগের ঘটনার কষ্ট রয়ে গেল।
জিনিয়া চলে যাওয়ার পরও কেউ তার মনের অবস্থা বুঝতে পারল না। কিন্তু রাহাত ঠিকই বুঝতে পেরেছিল।
রাহাত মনে মনে ভাবল,
—মেয়েটার মন এখনো অনেক খারাপ। সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে কষ্ট পাচ্ছে, সেটা ওর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কী হয়েছে ওর? এমন চুপচাপ হয়ে আছে কেন?
রাহাত আর কিছু ভাবল না। তবে জিনিয়ার মন খারাপের বিষয়টা তার মাথায় থেকে গেল।
অন্যদিকে, জিনিয়ার ঘরে—
নামাজ শেষ করে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল সে। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই আগের সেই কষ্টের মুহূর্তগুলো বারবার তার মনে ভেসে উঠছিল। যতই ভুলে থাকার চেষ্টা করছিল, ততই যেন ঘটনাগুলো তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
একসময় বিছানা থেকে উঠে বারান্দায় চলে গেল জিনিয়া।
খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। তারপর বারান্দার এক পাশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল,
—আমি কি আজকে খুব বেশি ভুল করে ফেলেছি? কখনো এভাবে কেউ আমাকে বলেনি। অবশ্য অনেকেই অনেক খারাপ কথা বলে। কিন্তু সেগুলোও তো আমি সারাজীবন মনে রেখে দিই। চাইলেও ভুলতে পারি না। কিন্তু আজকের কথাগুলো কেন জানি একটু বেশিই কষ্ট দিচ্ছে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার ভাবল,
—কিন্তু উনি যেটা করেছেন, সেটাও আমার কাছে একটু ভালো লাগেনি। হ্যাঁ, থাক! আর কী করব? উনি তো আমার স্যার। উনি আমাকে বকবেন, এটাই স্বাভাবিক। তাহলে আমার এত কষ্ট লাগছে কেন?
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে জিনিয়া নিজেকেই বকতে লাগল।
—আমি আসলেই একটা পাগল! একটা কথাকে নিয়ে এত ভাবছি কেন? বাদ দে, জিনিয়া। ঘুমা গিয়ে।
নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে আবার বিছানায় চলে গেল সে।
কিন্তু ঘুম যেন তার চোখ থেকে পালিয়ে গেছে!
একবার এপাশ ফিরে, আবার ওপাশ ফিরে শুয়েও কোনো লাভ হলো না। মাথার মধ্যে শুধু সেই কথাগুলোই ঘুরছিল।
এভাবে ছটফট করতে করতে অবশেষে রাত তিনটার দিকে ঘুমিয়ে পড়ল জিনিয়া।
কিন্তু তার ঘুম বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ফজরের আজান শুনে ঘুম ভেঙে গেল। সে উঠে অজু করে ফজরের নামাজ আদায় করল। নামাজ শেষে আবার কিছুক্ষণের জন্য বিছানায় শুয়ে পড়ল।
সকাল আটটা।
ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিল জিনিয়া। তারপর কিছুক্ষণ মোবাইল ঘাঁটতে লাগল। হঠাৎ ফারিয়ার কথা মনে পড়তেই তাকে একটা মেসেজ দিল।
জিনিয়া মেসেজ দিয়ে বলল,
—এই, সময়মতো চলে আসিস। আমি রেডি থাকব। আজকে কিন্তু দেরি করব না!
মেসেজ পাঠিয়ে ফোনটা পাশে রেখে দিল সে।
কিছুক্ষণ পর নিচ থেকে মায়ের ডাক ভেসে এল,
—জিনিয়া, নাশতা করতে আয়!
জিনিয়া উত্তর দিল,
—হ্যাঁ, আসছি!
তারপর মোবাইলটা রেখে নিচে চলে গেল।
ডাইনিং টেবিলে তখন সবাই উপস্থিত। বাবা, মা, চাচা, জ্যাঠি, চাচি, কাজিন—সবাই মিলে সকালের নাশতা করছিল।
জিনিয়াও চুপচাপ বসে খেতে শুরু করল। একবার সবার দিকে তাকাল সে। নিজের পরিবারটাকে একসঙ্গে দেখে তার মনটা একটু ভালো হয়ে গেল।
মনে মনে ভাবল,
—আমার পরিবারটা কত সুন্দর! সবাই কত ভালো। অথচ কেউ আমার মনের ভেতরটা বুঝতে পারে না। আমি কষ্টে আছি কি না, সেটা কেউ বুঝতে পারে না। এটাই আমার সবসময়ের আফসোস।
ভাবনাটা মনে আসতেই তার বুকের ভেতরটা আবার কেমন যেন করে উঠল।
তবুও সে মুখে কিছু প্রকাশ করল না। সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলতে লাগল।
নাশতা শেষ করে কিছুক্ষণ সোফায় বসে রইল জিনিয়া। বড় বোন সায়রার সঙ্গে গল্প করল, তারপর চাচাতো ভাইদের সঙ্গেও কিছুক্ষণ কথা বলল।
কিন্তু তার মাথায় একটা কথাই ঘুরছিল—আজ ফারিয়ার সঙ্গে স্কুলে যেতে হবে।
তাই আর দেরি না করে নিজের ঘরে চলে গেল রেডি হতে।
সকাল সাড়ে দশটার দিকে ফারিয়া আসবে।
জিনিয়া জানত, আজ তাকে সময়মতো বের হতে হবে। তাই আলমারি থেকে স্কুলের পোশাক বের করে গোছাতে লাগল।
রেডি হওয়ার সময় তার একটা অভ্যাস আছে—গান শোনা। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। মোবাইলে গান চালিয়ে নিজের মতো করে তৈরি হতে লাগল সে।
তবে মনের ভেতরের কষ্টটা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। তবুও সে ঠিক করেছিল, কাউকে কিছু বুঝতে দেবে না। সবার সামনে তাকে স্বাভাবিক থাকতেই হবে।
এমন সময় দরজার কাছে ফারিয়াকে দেখা গেল।
ফারিয়া ঘরে ঢুকেই বলল,
—কিরে, রেডি হইছিস?
জিনিয়া উত্তর দিল,
—আর একটু বাকি আছে।
ফারিয়া অবাক হয়ে বলল,
—আজকে তো তুই অনেক তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে গেছিস! সাধারণত তোকে রেডি করতেই কত সময় লাগে!
জিনিয়া মৃদু হেসে বলল,
—হুম। রাতে ভালোভাবে ঘুম হয় নাই।
কথাটা শুনে ফারিয়া একটু অবাক হলো।
—কেন? কী হইছে তোর?
জিনিয়া তাড়াতাড়ি উত্তর দিল,
—কিছু না রে! এমনিই ঘুম আসে নাই।
ফারিয়া আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। কিন্তু জিনিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, মেয়েটার কিছু একটা হয়েছে কি না।
এদিকে জিনিয়ার রেডি হওয়া প্রায় শেষ।
সে ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে ফারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—ঠিক আছে, চল। আমি রেডি!
ফারিয়া হেসে বলল,
—অবশেষে! চল, এবার স্কুলে যাওয়া যাক।
তারপর দুজন একসঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
______
অন্যদিকে, ইমন চৌধুরীর বাড়িতে—
রাতের কাজ শেষ করে খাতাগুলো দেখে ইমন ঘুমিয়ে পড়েছিল। ভোরে ফজরের নামাজের জন্য ঘুম থেকে উঠে পড়ল সে। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নামাজের জন্য প্রস্তুত হলো। এরপর কালো রঙের একটি টি-শার্ট ও অ্যাশ কালারের ট্রাউজার পরে মসজিদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
মসজিদে গিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করল ইমন। নামাজ শেষে আর বাড়িতে ফিরে ঘুমানোর কথা ভাবল না। বরং সোজা চলে গেল জিমে।
জিম করা ইমনের ভীষণ পছন্দের একটি অভ্যাস। ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন সে জিম করার জন্য সময় বের করে নেয়। শরীরচর্চা করার সময়টুকু তার কাছে অন্যরকম শান্তির। কাজের চাপ কিংবা মনের ভেতরের নানা চিন্তা—সবকিছু থেকে কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে মুক্ত মনে হয় তার।
জিমে পৌঁছে কালো টি-শার্টটি খুলে নিজের ব্যাগ থেকে একটি স্লিভলেস জিম টপ বের করে পরে নিল সে। এরপর শুরু করল শরীরচর্চা।
একটার পর একটা ব্যায়াম করতে করতে কখন যে সময় পেরিয়ে গেল, সে খেয়ালই করল না। জিম শেষ করতে করতে সকাল আটটা বেজে গেল।
ব্যায়াম শেষ করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো ইমন।
বাড়িতে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে নিল সে। এরই মধ্যে পরিবারের অন্য সদস্যরাও ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন।
গোসল ও অন্যান্য কাজ শেষ করে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে লাগল ইমন। আজ তার পরনে একটি ব্রাউন কালারের ফরমাল শার্ট ও ব্ল্যাক কালারের ফরমাল প্যান্ট। শার্ট-প্যান্ট পরার পর চোখে চশমাটা লাগিয়ে নিল। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে নিল সে।
তাকে দেখতে বেশ সুদর্শন লাগছিল।
সবশেষে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচে নেমে এল ইমন।
নিচে এসে পরিবারের সবার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলল সে। এরই মধ্যে সবাই নাশতা করতে বসেছেন। ইমনও সবার সঙ্গে নাশতা করতে বসে গেল।
নাশতা করতে করতে পরিবারের সবার সঙ্গে গল্প করছিল সে। গল্পের একপর্যায়ে ইমনের বাবা মিজানুর রহমান চৌধুরী বললেন,
—ইমন, আজকে তোমার দাদি আসবেন।
ইমন স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিল,
—হুম, ভালো তো!
পরিবারের অন্য সদস্যরাও খুশি হলেন। দাদি আসবেন, এটা নিয়ে সবার মধ্যেই আনন্দ দেখা গেল। তবে কথার মাঝেই বিয়ের প্রসঙ্গ উঠে এল।
ইমনের বাবা বললেন,
—তোমার দাদি কিন্তু চান, এবার তুমি বিয়েটা করে নাও।
কথাটা শুনে ইমন একটু থেমে গেল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
—বাবা, আমি এখন বিয়ে করতে চাই না। মাত্র তো স্কুলে কাজ শুরু করেছি। নিজের কাজের দিকে মনোযোগ দিতে শুরু করেছি শুধু। আমাকে আরও কিছুদিন সময় দাও। কয়েক বছর পর এসব নিয়ে ভাবব। এখনো বিয়ে নিয়ে কিছুই ভাবিনি।
ইমনের কথা শুনে পরিবারের সদস্যরা আর বেশি কিছু বললেন না।
ইমনও বিষয়টা নিয়ে আর কথা বাড়াল না। নাশতা শেষ করে নিজের ঘরে চলে গেল।
ঘরে গিয়ে স্কুলের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র, খাতা ও অন্যান্য দরকারি জিনিস গুছিয়ে নিল সে। এরপর কিছুক্ষণ বিছানায় বসে মোবাইল ঘাঁটল।
সময় গড়িয়ে সকাল সাড়ে দশটা বেজে গেল।
এবার আর দেরি না করে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এল ইমন। তার নিজের একটি বাইক আছে। বাইকটি নিয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হলো সে।
স্কুলে পৌঁছে নিজের টেবিলের কাছে গিয়ে বসল ইমন। কিছু জরুরি কাজ বাকি ছিল, তাই সেগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ কাজ করার পরই স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠল।
ক্লাস শুরু হওয়ার ঘণ্টা!
ইমন ক্লাস এইটের দিকে রওনা হলো। যেহেতু সে ক্লাস এইটের ক্লাস টিচার, তাই প্রথমেই নিজের ক্লাসে গেল।
অন্যদিকে, জিনিয়া আর ফারিয়াও অনেক আগেই স্কুলে পৌঁছে গিয়েছিল।
ইমন ক্লাসে ঢুকতেই শিক্ষার্থীরা নিজেদের জায়গায় বসে পড়ল। ইমন সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আসসালামু আলাইকুম। গুড মর্নিং, এভরিওয়ান!
সবাই একসঙ্গে উত্তর দিল,
—ওয়ালাইকুমুস সালাম, স্যার। গুড মর্নিং!
ইমন সবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—তো, তোমরা সবাই কেমন আছো?
সবাই একসঙ্গে উত্তর দিল,
—জি, স্যার! আমরা ভালো আছি।
ইমন মৃদু হেসে বলল,
—বেশ! তাহলে চলো, এবার ক্লাস শুরু করা যাক। তোমরা সবাই বাড়ির কাজ করে এনেছ তো?
শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে উত্তর দিল,
—জি, স্যার! করেছি।
ইমন বলল,
—যারা বাড়ির কাজ করে আনোনি, তারা দাঁড়িয়ে যাও।
কথাটা বলেই সে পুরো ক্লাসের দিকে তাকাল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল জিনিয়ার দিকে। আগের দিনের ঘটনাটা মনে পড়তেই কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল সে।
জিনিয়াকে দেখে তার মনে হলো, মেয়েটার মন আজও ভালো নেই। মুখে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও কোথাও যেন একটা বিষণ্নতা লুকিয়ে আছে।
ইমন কিছুক্ষণ জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আর কিছু না বলে ক্লাসের দিকে মনোযোগ দিল।
এরপর গতকাল শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া খাতাগুলো বের করল সে। খাতাগুলো ক্লাস ক্যাপ্টেন রাহার হাতে দিয়ে বলল,
—রাহা, খাতাগুলো সবাইকে দিয়ে দাও।
রাহা দেখতে বেশ সুন্দরী। তবে নতুন স্যারকে ঘিরে তার আগ্রহটা যেন একটু বেশিই ছিল। স্যারের সামনে বারবার কথা বলার চেষ্টা করছিল সে, আর সুযোগ পেলেই স্যারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিল।
রাহার এমন আচরণ দেখে জিনিয়া ফারিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—দেখ, দেখ! নতুন স্যারকে দেখেই এই মেয়ের ঢং শুরু হয়ে গেছে!
ফারিয়া মুখ চেপে হেসে বলল,
—হ্যাঁ রে ভাই! একদম ঠিক বলছিস। এই মেয়ে যাকে দেখে, তার সাথেই এমন শুরু করে। কী একটা অবস্থা! লজ্জাও লাগে না নাকি?
কথাটা শুনে জিনিয়া আর ফারিয়া দুজনেই মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। তবে তারা এমনভাবে হাসছিল, যাতে ক্লাসের অন্য কেউ বিষয়টা বুঝতে না পারে।
এদিকে রাহা একে একে সবার হাতে খাতা পৌঁছে দিতে লাগল।
সবার খাতা দেওয়া শেষ হলে সে নিজের জায়গায় ফিরে আসছিল। ঠিক তখনই ইংরেজির খাতায় জিনিয়ার নম্বর দেখে তার মুখে কেমন একটা হাসি ফুটে উঠল।
জিনিয়া ইংরেজিতে বরাবরই একটু দুর্বল। তাই অন্যদের তুলনায় তার নম্বরও কম এসেছিল। কিন্তু বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার বদলে রাহা যেন সুযোগ পেয়ে গেল।
সে ইচ্ছা করেই উচ্চস্বরে বলে উঠল,
—জিনিয়া! তোর ইংরেজিতে এত কম নম্বর এসেছে!
কথাটা শুনে পুরো ক্লাসের কয়েকজন শিক্ষার্থী জিনিয়ার দিকে তাকাল।
মুহূর্তেই জিনিয়ার মুখটা মলিন হয়ে গেল। সবার সামনে এমনভাবে কথাটা বলায় সে ভীষণ লজ্জা পেল। ভেতরে ভেতরে রাগও হচ্ছিল তার। কিন্তু সবার সামনে কিছু বলতে পারল না।
বিষয়টা ইমনের চোখ এড়াল না।
সে বুঝতে পারল, রাহা ইচ্ছা করেই জিনিয়াকে সবার সামনে ছোট করার চেষ্টা করছে। ইমন গম্ভীর হয়ে রাহার দিকে তাকাল।
ইমন বলল,
—রাহা, এটা সবার সামনে এত জোরে বলার মতো কোনো বিষয় নয়। তোমার এভাবে বলা একদমই উচিত হয়নি।
রাহা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
ইমন আবার বলল,
—কারও পড়াশোনায় দুর্বলতা থাকতেই পারে। তাই বলে তাকে সবার সামনে অপমান করার কোনো অধিকার তোমার নেই। তুমি একটা বিষয়ে ভালো হলেই যে সবাই সেই বিষয়ে ভালো হবে, এমন তো নয়। তুমি যে বিষয়ে ভালো, সে বিষয়ে অন্য কেউ দুর্বল হতে পারে। আবার তুমি যে বিষয়ে দুর্বল, অন্য কেউ হয়তো সেই বিষয়েই অনেক ভালো। তাই বলে কি তাকে তোমাকে ছোট করা উচিত? নিশ্চয়ই না!
ইমনের কথাগুলো শুনে রাহা চুপ করে গেল। তার মুখটা কালো হয়ে এল।
মনে মনে সে বিরক্ত হয়ে ভাবল,
—দ্বিতীয় দিন এসেই এত কথা শোনাচ্ছে কেন? এমনভাবে কথা বলছে, যেন আমি খুব বড় একটা অপরাধ করে ফেলেছি!
অন্যদিকে, জিনিয়াও চুপচাপ বসে ছিল। ইমনের কথাগুলো শুনে তার মনে আগের দিনের ঘটনাটা আবার ভেসে উঠল।
মনে মনে সে ভাবল,
—বাহ! আগের দিন আমাকে অপমান করার সময় তো এসব মনে ছিল না। আর আজকে সবার সামনে এত বড় বড় কথা বলছেন! থাক, স্যার। আপনাকে আর কিছু বলব না আমি। কোনো প্রশ্নের উত্তর জানলেও দেব না। পারলেও দেব না!
কথাগুলো মনে মনে ভেবেই জিনিয়া মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার মন খারাপের সঙ্গে এবার একটু অভিমানও যোগ হলো।
চলবে...🌸
“কিন্তু জিনিয়া কি জানত, এরপর কী অপেক্ষা করছে তার জন্য…?”