### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৩
### ভালো লাগার শুরু
সকালের নরম রোদ জানালার কাচ ভেদ করে মায়ার ঘরে এসে পড়েছে। মায়া বিছানায় শুয়ে ফোন দেখছিল। হঠাৎ মায়ের ডাক শুনে ফোনটা পাশে রেখে উঠে বসল।
— মায়া! নিচে আয় মা। নাশতা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
— আসছি মা!
মায়া দ্রুত চুলগুলো বেঁধে নিচে চলে এল। নাশতার টেবিলে বসে দেখল, বাবা পত্রিকা পড়ছেন আর মা খাবার সাজাচ্ছেন।
মায়া বাবার পাশে বসে বলল,
— বাবা, আজ আপনি অফিসে যাবেন?
বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন,
— কেন মা? কিছু লাগবে?
— না, এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।
— তাহলে আজ তোমাকে নিয়ে একটু বাইরে ঘুরতে যাব।
মায়া খুশি হয়ে বলল,
— সত্যি বাবা?
— হ্যাঁ, তবে তোমার মাকে সঙ্গে নিতে হবে।
মায়া মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— মা, আপনিও যাবেন কিন্তু!
মা হেসে বললেন,
— আচ্ছা, যাব।
তিনজনের হাসিতে সকালের পরিবেশটা আনন্দময় হয়ে উঠল।
অন্যদিকে খান বাড়িতে...
শাহজাদ নাশতার টেবিলে বসে আছে। তার মা রেহানা বেগম ছেলের প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বললেন,
— বাবা, আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরবে?
— চেষ্টা করব মা।
— তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।
শাহজাদ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— কী কথা?
— আগে বাসায় আসো। তারপর বলব।
শাহজাদ আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। নাশতা শেষ করে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
অফিসে পৌঁছে নিজের কেবিনে বসে কাজ শুরু করল সে। কিছুক্ষণ পর রায়হান প্রয়োজনীয় ফাইল নিয়ে প্রবেশ করল।
— স্যার, এই ফাইলগুলোতে আপনার সই লাগবে।
শাহজাদ ফাইলগুলো হাতে নিয়ে বলল,
— ঠিক আছে, রেখে যাও।
রায়হান ফাইল রেখে বেরিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ শাহজাদ ডাকল,
— রায়হান!
— জি স্যার?
— একটা কথা জিজ্ঞেস করব।
— বলুন স্যার।
— কারও সঙ্গে কয়েকবার দেখা হলে তাকে বারবার মনে পড়ার কারণ কী হতে পারে?
রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মুচকি হাসল।
— স্যার, মনে হয় মানুষটাকে আপনার ভালো লেগেছে।
শাহজাদ ভ্রু কুঁচকে বলল,
— তোমার কাজ করো।
রায়হান হেসে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
শাহজাদ আবার কাজে মন দিলেও কথাটা তার মাথায় ঘুরতে থাকল।
বিকেলে মায়া তার বাবা-মায়ের সঙ্গে একটি রেস্টুরেন্টে এসেছে। সবাই মিলে খাবার অর্ডার করল।
মায়া জানালার পাশের চেয়ারে বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল রেস্টুরেন্টের দরজার দিকে।
শাহজাদ!
সে একা আসেনি। সঙ্গে তার মা ও বোন।
মায়া মনে মনে বলল,
— আবার এই মানুষটা!
ঠিক তখনই শাহজাদের চোখও মায়ার দিকে পড়ল।
সে একটু অবাক হলো। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— মা, আমি একটু আসছি।
শাহজাদ এগিয়ে গিয়ে মায়ার সামনে দাঁড়াল।
— কেমন আছেন?
মায়া মুচকি হেসে বলল,
— ভালো আছি। আপনি?
— ভালো। এখানে কী করছেন?
— বাবা-মায়ের সঙ্গে এসেছি।
শাহজাদ মাথা নেড়ে বলল,
— ওহ, ভালো।
ঠিক তখন মায়ার বাবা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
— মা, কে এসেছে?
মায়া বলল,
— বাবা, উনি শাহজাদ খান।
শাহজাদ ভদ্রভাবে সালাম দিয়ে বলল,
— আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।
— ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছো বাবা?
— জি, ভালো আছি।
মায়ার বাবা হাসিমুখে বললেন,
— বসো বাবা।
শাহজাদ একটু ইতস্তত করে বলল,
— জি, আমার মা ওখানে বসে আছেন। তবে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল।
মায়ার বাবা বললেন,
— ঠিক আছে বাবা। তোমার মাকে আমাদের সালাম দেবে।
— অবশ্যই।
শাহজাদ চলে গেল।
মায়া তার দিকে তাকিয়ে ছিল। মা বিষয়টি লক্ষ করে মৃদু হেসে বললেন,
— কী রে, কী দেখছিস?
মায়া তাড়াতাড়ি বলল,
— কিছু না মা!
মা মুচকি হেসে খাবারের দিকে মন দিলেন।
অন্যদিকে শাহজাদ নিজের পরিবারের টেবিলে ফিরে গেল।
তার বোন ফিসফিস করে বলল,
— ভাইয়া, ওই মেয়েটা এখানে!
শাহজাদ স্বাভাবিক গলায় বলল,
— দেখেছি।
— আপনি কি আবার কথা বলতে গিয়েছিলেন?
— হ্যাঁ, পরিচিত মানুষ। কথা বলতেই পারি।
বোন হেসে বলল,
— আচ্ছা, বুঝেছি!
শাহজাদ বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— খাওয়ার দিকে মন দাও।
রাতের দিকে মায়া বাড়িতে ফিরে নিজের ঘরে চলে গেল। পোশাক পরিবর্তন করে বিছানায় বসতেই ফোনে নীলার কল এল।
— হ্যালো, মায়া!
— বল।
— আজ কী করেছিস?
— বাবা-মায়ের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম।
— তারপর?
মায়া হেসে বলল,
— তারপর আবার শাহজাদ খানের সঙ্গে দেখা!
নীলা চিৎকার করে উঠল,
— কী! আবার!
— আস্তে কথা বল। মা শুনে ফেলবে।
— আচ্ছা, এবার সত্যি করে বল তো, ছেলেটাকে তোর কেমন লাগে?
মায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— জানি না রে। মানুষটা খুব গম্ভীর। তবে খারাপ মনে হয়নি।
নীলা হাসতে হাসতে বলল,
— তাহলে তো কিছু একটা শুরু হচ্ছে!
— ধুর! তুই না!
কথা শেষ করে মায়া ফোন রেখে দিল।
এদিকে শাহজাদ নিজের ঘরে বসে ছিল। তার মা ঘরে এসে বললেন,
— বাবা, আজ একটা মেয়েকে তোমার সঙ্গে কথা বলতে দেখলাম। কে মেয়েটা?
শাহজাদ একটু হেসে বলল,
— পরিচিত হয়েছে মা। নাম মায়া।
রেহানা বেগম ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।
— নামটা সুন্দর।
শাহজাদ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— হ্যাঁ মা, নামটা সত্যিই সুন্দর।
সেদিন রাতে দুজনেই ঘুমাতে যাওয়ার আগে অজান্তেই একে অপরের কথা ভাবল।
মায়া ভাবল, ছেলেটা এত গম্ভীর হয়েও সবার সঙ্গে এত সুন্দর ব্যবহার করে কীভাবে!
আর শাহজাদ ভাবল, মেয়েটার হাসিটা কেন যেন বারবার মনে পড়ছে।
কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলার সাহস পেল না।
হয়তো এভাবেই অচেনা মানুষের প্রতি একটু একটু করে ভালো লাগা জন্ম নেয়।
পরদিন সকালে মায়া ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় এল। হাতে এক কাপ চা। হঠাৎ ফোনে অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসল।
মায়া ফোন রিসিভ করে বলল,
— হ্যালো, কে বলছেন?
ওপাশ থেকে পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,
— আমি শাহজাদ খান বলছি।
মায়া অবাক হয়ে বলল,
— আপনি আমার নম্বর পেলেন কোথায়?
শাহজাদ হেসে বলল,
— সেটা না হয় পরে বলব। আসলে আপনার বাবার সঙ্গে একটা বিষয়ে কথা ছিল।
— ওহ, আচ্ছা। বাবা এখন বাসায় নেই।
— ঠিক আছে। তাহলে পরে কথা হবে।
ফোন রাখার আগে শাহজাদ আবার বলল,
— ভালো থাকবেন, মায়া।
মায়া মৃদু হেসে উত্তর দিল,
— আপনিও ভালো থাকবেন।
ফোন রেখে মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই মা ঘরে এসে মেয়েকে হাসতে দেখে বললেন,
— কী ব্যাপার? আজকাল তোকে বেশ হাসিখুশি দেখছি!
মায়া লজ্জা পেয়ে বলল,
— কিছু না মা!
মা মুচকি হেসে বললেন,
— আচ্ছা, কিছু না হলে তো ভালোই।
মায়া আবার জানালার বাইরে তাকাল। তার অজান্তেই জীবনের গল্পে নতুন একটি অধ্যায় যোগ হতে শুরু করেছে।
চলবে... ❤️