### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৮
### অচেনা অনুভূতির টান
সকালের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে খান বাড়িতে। শাহজাদ নাশতার টেবিলে বসে ফোনে কিছু কাজ দেখছিল। মা রেহানা বেগম ছেলের সামনে খাবার এগিয়ে দিয়ে বললেন,
— কী রে, আজও কি অফিসে তাড়াতাড়ি যাবি?
শাহজাদ ফোনটা নামিয়ে বলল,
— হ্যাঁ মা, কিছু কাজ আছে।
— কাজ তো প্রতিদিনই থাকে। নিজের জন্যও একটু সময় রাখবি।
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল,
— চেষ্টা করি তো।
মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— চেষ্টা করলেই হবে না। মাঝেমধ্যে আমাদের সঙ্গেও সময় কাটাতে হবে।
— আচ্ছা, আজ রাতে তাড়াতাড়ি ফিরব।
রেহানা বেগম সন্তুষ্ট হয়ে হাসলেন।
অন্যদিকে মায়ার সকালটা শুরু হয়েছে মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে গল্প করতে করতে। মা রান্না করছিলেন আর মায়া পাশে দাঁড়িয়ে সবজি কাটতে সাহায্য করছিল।
— মা, আজ বিকেলে একটু বাইরে যাব।
— কোথায় যাবি?
— এখনো ঠিক করিনি। নীলার সঙ্গে দেখা হতে পারে।
মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— ঠিক আছে। তবে বাইরে গেলে আমাকে জানিয়ে যাবি।
— আচ্ছা মা।
মায়া কথা শেষ করে নিজের ঘরে চলে গেল। ফোন হাতে নিয়েই দেখল শাহজাদের কোনো মেসেজ নেই। সে নিজেই মেসেজ লিখল।
মায়া: আজ অফিসে গেছেন?
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
শাহজাদ: জি। আপনি কী করছেন?
মায়া: মায়ের সঙ্গে কাজে সাহায্য করছিলাম।
শাহজাদ: ভালো। মাকে সাহায্য করা উচিত।
মায়া: আপনি বাসায় মাকে সাহায্য করেন?
শাহজাদ: চেষ্টা করি। তবে আপনার মতো এতটা পারি না।
মায়া হেসে ফেলল।
মায়া: তাহলে আপনাকে অনেক কিছু শিখতে হবে।
শাহজাদ: শিক্ষক হিসেবে আপনাকে পাওয়া যাবে?
মায়া উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেল। তারপর লিখল,
মায়া: সেটা আপনার আচরণের ওপর নির্ভর করবে।
শাহজাদ মেসেজটা পড়ে হালকা হাসল। পাশে বসে থাকা রায়হান সেটা লক্ষ করল।
— স্যার, আজকাল আপনাকে বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছে।
শাহজাদ গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
— কাজের দিকে মন দাও, রায়হান।
রায়হান মুচকি হেসে নিজের কাজে ফিরে গেল।
দুপুরের দিকে শাহজাদের মা ফোন করলেন।
— বাবা, আজ সন্ধ্যায় বাসায় আসতে দেরি করিস না।
— কেন মা?
— একজন আত্মীয় আসবেন। সবাই একসঙ্গে বসে খাব।
— ঠিক আছে, মা। চেষ্টা করব।
ফোন রেখে শাহজাদ আবার কাজে মন দিল।
বিকেলে মায়া নীলার সঙ্গে দেখা করতে বের হলো। দুজন একটি দোকানে বসে গল্প করছিল। নীলা হঠাৎ মায়াকে জিজ্ঞেস করল,
— আচ্ছা, শাহজাদ সাহেবের সঙ্গে এখন কতটা কথা হয়?
মায়া পানি পান করতে করতে বলল,
— তেমন বেশি না।
— মিথ্যা বলিস না। তোর মুখ দেখেই বোঝা যায়।
— কী বোঝা যায়?
— কেউ একজন তোর কাছে একটু বিশেষ হয়ে উঠছে।
মায়া লজ্জা পেয়ে বলল,
— তুই না, সব সময় এমন কথা বলিস কেন?
নীলা হেসে বলল,
— কারণ তোর মুখে এই হাসিটা আগে এত দেখিনি।
মায়া আর উত্তর দিল না। তার ফোনে তখন শাহজাদের মেসেজ এল।
শাহজাদ: আপনি কি বাইরে?
মায়া: জি, নীলার সঙ্গে।
শাহজাদ: ভালো। সময়মতো বাড়ি ফিরবেন।
মায়া মেসেজটা নীলাকে দেখাল।
নীলা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— দেখেছিস! কত খেয়াল রাখে!
মায়া মৃদু হেসে ফোনটা রেখে দিল।
সন্ধ্যার কিছু আগে মায়া বাড়ি ফিরল। বাড়িতে ঢুকেই দেখল বাবা বসার ঘরে বসে খবর দেখছেন।
— বাবা, তুমি কখন এলে?
— এই তো মা, কিছুক্ষণ আগে। কোথায় গিয়েছিলে?
— নীলার সঙ্গে দেখা করতে।
বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— ঠিক আছে। হাত-মুখ ধুয়ে নে। তারপর একসঙ্গে চা খাব।
মায়া ঘরে চলে গেল।
সেদিন রাতের খাবারের টেবিলে শাহজাদও পরিবারের সঙ্গে বসেছিল। মা ছেলের পছন্দের খাবার রান্না করেছিলেন। খাওয়া শেষে শাহজাদ মায়ের পাশে বসে গল্প করতে লাগল।
রেহানা বেগম বললেন,
— মনে আছে, কিছুদিন আগে বাজারে একটা মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল?
শাহজাদ তাকাল।
— কোন মেয়ের কথা বলছ?
— মায়া। খুব মিষ্টি ব্যবহার। তার মায়ের সঙ্গেও একদিন দেখা করার ইচ্ছা আছে।
শাহজাদ একটু থেমে বলল,
— দেখা হলে ভালোই হবে।
মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— তুই মেয়েটাকে আগে থেকেই চিনিস নাকি?
শাহজাদ এবার একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
— হ্যাঁ, কয়েকবার দেখা হয়েছে।
— তাই বুঝি!
— মা, তুমি আবার শুরু করলে!
রেহানা বেগম হেসে বললেন,
— আচ্ছা বাবা, আর কিছু বললাম না।
রাত বাড়তে লাগল। নিজের ঘরে ফিরে শাহজাদ ফোন হাতে নিল। মায়ার কোনো মেসেজ নেই। সে নিজেই লিখল,
শাহজাদ: ঘুমিয়ে পড়েছেন?
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
মায়া: না। আপনি?
শাহজাদ: আজ মায়ের সঙ্গে আপনার কথা হয়েছে।
মায়া অবাক হলো।
মায়া: আমার কথা? কী বলেছেন?
শাহজাদ: বলেছেন, আপনাকে তাঁর ভালো লেগেছে। আপনার মায়ের সঙ্গেও দেখা করতে চান।
মায়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
মায়া: আন্টিকে আমার সালাম জানাবেন।
শাহজাদ: অবশ্যই জানাব।
কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে নীরবতা রইল। তারপর মায়া লিখল,
মায়া: আপনার মা খুব ভালো মানুষ মনে হয়।
শাহজাদ: তিনি সত্যিই খুব ভালো। আমার জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষদের একজন।
মায়া: আল্লাহ তাঁকে ভালো রাখুন।
শাহজাদ: আমিন। আপনার বাবা-মাকেও ভালো রাখুন।
মায়া মেসেজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর লিখল,
মায়া: আমিন।
সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে শাহজাদের মনে হলো, মায়ার সঙ্গে কথা বললে তার দিনের ক্লান্তি অনেকটাই কমে যায়। আর মায়ারও মনে হলো, শাহজাদের ছোট ছোট যত্নগুলো তার কাছে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তবে দুজনের সম্পর্ক এখনো নামহীন। কেউ কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। শুধু দুজনেই অজান্তে একে অপরের অপেক্ষা করতে শিখছে।
কিন্তু সামনে এমন কিছু মুহূর্ত আসতে চলেছে, যেখানে ছোট্ট একটি অভিমানও তাদের দুজনকে ভাবিয়ে তুলবে।
চলবে... ❤️