### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৭
### অভিমানের আড়ালে যত্ন
সকালের নরম রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতরে এসে পড়েছে। মায়া বিছানায় বসে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। গত রাতের শাহজাদের পাঠানো শেষ মেসেজটা এখনো তার চোখের সামনে ভাসছে।
“মন খারাপ হলে আমাকে জানাবেন। সব কথা নিজের মধ্যে জমিয়ে রাখবেন না।”
মেসেজটা পড়ার পর থেকে মায়ার মনটা কেমন যেন হয়ে আছে। মানুষটা খুব বেশি কথা বলে না, অথচ তার ছোট ছোট কথার মধ্যেই কেমন একটা যত্ন লুকিয়ে থাকে। মায়া নিজেও বুঝতে পারছে না, কেন শাহজাদের একটা মেসেজের অপেক্ষায় তার সকালটা শুরু হয়।
ঠিক তখনই মায়ের ডাক শোনা গেল।
— মায়া! আর কতক্ষণ ঘরে বসে থাকবি? নাশতা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
মায়া তাড়াতাড়ি ফোনটা পাশে রেখে বলল,
— আসছি মা!
নাশতার টেবিলে বসে মায়া চুপচাপ খাবার খাচ্ছিল। তার মা কয়েকবার মেয়ের দিকে তাকালেন।
— কী হয়েছে তোর? আজ এত চুপচাপ কেন?
— কিছু হয়নি তো!
— কিছু না হলে মুখটা এমন করে রেখেছিস কেন?
মায়া মৃদু হেসে বলল,
— মা, সব সময় কি কথা বলতে হবে?
মা হেসে মাথা নাড়লেন।
— তা বলতে হবে না। তবে তোর মুখ দেখেই বুঝতে পারি, তোর মনে কিছু একটা চলছে।
মায়া আর কথা বাড়াল না। মনে মনে ভাবল, মায়েরা সত্যিই অনেক কিছু বুঝে ফেলেন।
অন্যদিকে শাহজাদ নিজের ঘরে তৈরি হচ্ছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘড়ি পরতে পরতে ফোনটা হাতে নিল। মায়ার কোনো নতুন মেসেজ নেই। গত রাতে কথা শেষ হওয়ার পর থেকে সে আর মেসেজ দেয়নি।
শাহজাদ কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে ফোনটা পকেটে রাখল।
নিচে নেমে আসতেই মা বললেন,
— নাশতা করে যা বাবা।
— আজ অফিসে একটু তাড়া আছে, মা।
— প্রতিদিনই তো তাড়া থাকে। নিজের শরীরের দিকেও একটু খেয়াল রাখবি।
শাহজাদ মায়ের পাশে বসে পড়ল।
— আচ্ছা, খাব।
মা ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— আজকাল তোকে একটু অন্যরকম লাগছে।
শাহজাদ ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কেমন অন্যরকম?
— আগে বাসায় ফিরেও ফোন নিয়ে এত ব্যস্ত থাকতিস না। এখন মাঝেমধ্যে দেখছি ফোনের দিকে তাকিয়ে হাসিস।
শাহজাদ পানি পান করতে গিয়ে থেমে গেল।
— তুমি ভুল দেখেছ।
— হতে পারে। তবে তোর হাসিটা কিন্তু বেশ সুন্দর লাগে।
শাহজাদ আর কোনো উত্তর দিল না। শুধু মাথা নিচু করে নাশতা শেষ করল।
অফিসে পৌঁছে শাহজাদ নিজের কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরপরই তার মনে হচ্ছিল, মায়াকে একটা মেসেজ দেওয়া উচিত। শেষ পর্যন্ত সে ফোন হাতে নিল।
শাহজাদ: ঘুম থেকে উঠেছেন?
কয়েক মিনিট পর উত্তর এল।
মায়া: জি। অনেক আগেই।
শাহজাদ: নাশতা করেছেন?
মায়া: হ্যাঁ। আপনি?
শাহজাদ: আমিও করেছি। আজ কী করছেন?
মায়া: বিশেষ কিছু না। বাসায় আছি।
শাহজাদ: তাহলে আজ বিকেলে একটু দেখা করা যায়?
মায়া মেসেজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। দেখা করার কথা শুনে তার বুকের ভেতর কেমন যেন আনন্দ হলো। কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
শাহজাদ আবার ফোনের দিকে তাকাল। কোনো উত্তর না পেয়ে কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করল।
এদিকে মায়া নীলাকে ফোন করল।
— নীলা, একটা কথা বলব?
— বল, কী হয়েছে?
— উনি আজ দেখা করতে বলেছেন।
— উনি মানে শাহজাদ সাহেব?
— হ্যাঁ।
নীলা হেসে বলল,
— বাহ! তাহলে তো ভালোই। তুই কী বলেছিস?
— এখনো কিছু বলিনি।
— কেন? দেখা করতে ইচ্ছা করছে না?
মায়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
— ইচ্ছা করছে। কিন্তু কীভাবে বলব বুঝতে পারছি না।
— আরে, সোজা করে বলবি যে দেখা করতে পারবি। এত ভাবার কী আছে?
মায়া হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর সে শাহজাদকে উত্তর দিল।
মায়া: বিকেলে সময় হলে দেখা করতে পারি।
উত্তরটা পেয়েই শাহজাদের মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
শাহজাদ: তাহলে বিকেল পাঁচটায় পার্কের সামনে থাকবেন।
মায়া: আচ্ছা।
বিকেল গড়িয়ে এল। মায়া হালকা রঙের একটি পোশাক পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল। চুলগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে নিল। তারপর নিজেকেই প্রশ্ন করল, এত প্রস্তুতি নেওয়ার কী আছে? সে তো শুধু দেখা করতেই যাচ্ছে!
ঠিক তখন মা ঘরে ঢুকলেন।
— কোথাও যাবি?
— একটু বাইরে যাব মা। নীলার সঙ্গে দেখা করার কথা আছে।
মা মেয়ের সাজগোজ দেখে মুচকি হাসলেন।
— বেশ তো! সাবধানে যাবি। আর সময়মতো ফিরে আসবি।
— আচ্ছা মা।
মায়া বাইরে বেরিয়ে নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছাল। শাহজাদ তখন রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। মায়াকে দেখেই সে এগিয়ে এল।
— অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে?
— না, এই তো এলাম।
— চলুন, ওদিকে বসি।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। নীরবতাটা অস্বস্তিকর ছিল না, বরং দুজনেই যেন নিজের মতো করে মুহূর্তটা উপভোগ করছিল।
একটা বেঞ্চে বসে শাহজাদ বলল,
— আজ আপনাকে একটু চুপচাপ লাগছে।
মায়া মুখ ঘুরিয়ে বলল,
— আমি কি সব সময় অনেক কথা বলি?
— তা বলি না। তবে আজ আপনার কথাগুলো একটু কম।
— হয়তো আপনার সঙ্গে কথা বলার মতো বিষয় খুঁজে পাচ্ছি না।
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল,
— তাহলে আমি একটা বিষয় দিচ্ছি। আজ আপনার দিনটা কেমন কেটেছে?
মায়া হেসে ফেলল।
— এই প্রশ্নটা তো সকালে করেছেন!
— সকালে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তখনকার দিনটা কেমন ছিল। এখন জানতে চাই, আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর কেমন লাগছে।
মায়া এবার লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।
— আপনি সব কথার উত্তর এমনভাবে চান কেন?
— কারণ আপনার উত্তর শুনতে ভালো লাগে।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— ভালো লাগছে।
শাহজাদ তার দিকে তাকাল। কথাটা খুব ছোট, কিন্তু তার কাছে অনেক বড় মনে হলো।
হঠাৎ মায়ার ফোন বেজে উঠল। মা ফোন করেছেন। মায়া ফোন ধরে জানাল যে সে ভালো আছে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ি ফিরবে।
ফোন রেখে সে বলল,
— আমাকে এবার যেতে হবে।
শাহজাদ মাথা নাড়ল।
— ঠিক আছে। আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করি?
— না, আমি চলে যেতে পারব।
— তবু রাস্তা পর্যন্ত সঙ্গে যাই।
মায়া আর আপত্তি করল না। দুজন একসঙ্গে রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল।
বিদায়ের আগে শাহজাদ বলল,
— আজ সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
মায়া মৃদু হেসে বলল,
— ধন্যবাদ দেওয়ার কী আছে?
— আছে। আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারাটাও আমার দিনের ভালো একটা অংশ।
মায়া কিছু বলল না। শুধু একবার তাকিয়ে হেসে বিদায় নিল।
বাড়ি ফিরে মায়া নিজের ঘরে এসে ফোন হাতে নিল। কিছুক্ষণ পর শাহজাদের মেসেজ এল।
শাহজাদ: ঠিকমতো বাসায় পৌঁছেছেন?
মায়া: জি, পৌঁছেছি।
শাহজাদ: ভালো। বিশ্রাম নিন।
মায়া উত্তর দিল,
মায়া: আপনিও নিজের যত্ন নেবেন।
শাহজাদ মেসেজটা পড়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর লিখল,
শাহজাদ: আপনার কথাটা রাখার চেষ্টা করব।
সেদিন রাতে দুজনের আর বেশি কথা হলো না। কিন্তু ঘুমানোর আগে দুজনের মনেই একই অনুভূতি ঘুরপাক খেতে লাগল—কিছু মানুষ খুব অল্প সময়েই মনের মধ্যে আলাদা একটা জায়গা করে নেয়।
আর সেই জায়গাটা একবার তৈরি হয়ে গেলে, দিনের ব্যস্ততার মাঝেও মানুষটার কথা মনে পড়ে।
শাহজাদ জানত না সামনে কী অপেক্ষা করছে। মায়াও জানত না এই পরিচয় কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। তবে দুজনের কেউই আর আগের মতো উদাসীন থাকতে পারছিল না।
চলবে... ❤️