### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ২৫
### মনের অজান্তে যত্ন
পরদিন সকাল।
মায়া ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে দিল। বাইরে সুন্দর রোদ উঠেছে। গতকালের বিকেলটা তার মনে এখনো স্পষ্ট। খানবাড়ির সবাইকে নিয়ে কাটানো সময়টা তার বেশ ভালো লেগেছে। বিশেষ করে শাহজাদের ছোট বোনের দুষ্টুমিগুলো মনে পড়তেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
মায়া ফোন হাতে নিয়ে দেখল, শাহজাদের কোনো মেসেজ আসেনি। সে কয়েক মুহূর্ত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে ফোনটা রেখে দিল।
নিজেকে বোঝাল, সব সময় ফোনের অপেক্ষা করলে চলবে না।
নাশতার টেবিলে মা মেয়েকে দেখে বললেন,
— কী রে, কালকের দিনটা কেমন কাটল?
মায়া হাসল।
— অনেক ভালো মা।
— রেহানা আপা তোকে খুব পছন্দ করেন মনে হলো।
মায়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
— উনিও খুব ভালো।
মা মুচকি হেসে বললেন,
— শুধু উনিই ভালো, নাকি উনার ছেলেও ভালো?
— মা!
মায়ের হাসি আরও বেড়ে গেল।
— আচ্ছা, আর বলব না। আগে নাশতা শেষ কর।
মায়া মাথা নিচু করে খেতে লাগল।
অন্যদিকে শাহজাদ সকালে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তার ছোট বোন দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
— ভাইয়া, একটা কথা বলব?
— বলো।
— কালকে মায়া আপুকে আবার কবে নিয়ে আসবেন?
শাহজাদ হেসে বলল,
— আমি কি কাউকে ধরে নিয়ে আসব নাকি?
— না, কিন্তু আপু এলে আমার ভালো লাগে।
— তাহলে মায়ের সঙ্গে কথা বলো। সবাই মিলে আবার দেখা করা যাবে।
ছোট বোন খুশি হয়ে বলল,
— কথা দিলেন?
— আচ্ছা, কথা দিলাম।
শাহজাদ অফিসে চলে গেল।
দুপুরের দিকে মায়া রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করছিল। হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে শাহজাদের নাম দেখে সে একটু অবাক হলো।
— আসসালামু আলাইকুম।
— ওয়ালাইকুম আসসালাম। কী করছেন?
— মাকে সাহায্য করছি। আপনি?
— অফিসে আছি। দুপুরে খেয়েছেন?
মায়া হেসে বলল,
— আপনি কি এখন সবার খাবারের খবর নেন?
— সবার না। আপনারটা নিচ্ছি।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— এখনো খাইনি। একটু পরে খাব।
শাহজাদের কণ্ঠে হালকা গাম্ভীর্য এল।
— কাজ করতে গিয়ে খাবার বাদ দেবেন না। আগে খেয়ে নেবেন।
— আচ্ছা, আপনি খেয়েছেন?
— হ্যাঁ, কিছুক্ষণ আগে।
— তাহলে ঠিক আছে।
শাহজাদ একটু হেসে বলল,
— আপনি কি শুধু আমার প্রশ্নের উত্তর দেবেন, নাকি নিজেও কিছু জিজ্ঞেস করবেন?
মায়া মজা করে বলল,
— আপনার কাজ কেমন চলছে?
— ভালো। এখন মনে হচ্ছে আরও ভালো চলবে।
— কেন?
— আপনার সঙ্গে কথা হলো বলে।
মায়া এবার আর কথা খুঁজে পেল না। শুধু মৃদু হেসে বলল,
— আপনি কাজ করুন। পরে কথা হবে।
— ঠিক আছে। ভালো থাকবেন।
ফোন রেখে মায়া রান্নাঘরে ফিরে গেল। মা মেয়ের মুখের হাসি দেখে বললেন,
— কার ফোন ছিল?
— একজনের।
— একজনটা কে?
— মা, তুমি সব জানো, তারপরও জিজ্ঞেস করো কেন?
মা হেসে বললেন,
— মেয়ের মুখে শুনতে ভালো লাগে।
বিকেলে মায়া নিজের ঘরে বসে বই পড়ছিল। এমন সময় নীলার ফোন এল।
— কী খবর? গতকালের ঘোরাঘুরি কেমন হলো?
মায়া হেসে বলল,
— ভালো। শাহজাদের ছোট বোনটা খুব মিষ্টি।
— আর শাহজাদ?
— সেও ভালো।
— শুধু ভালো?
— নীলা, তুই না!
নীলা হাসতে হাসতে বলল,
— আচ্ছা, আর বিরক্ত করব না। তবে একটা কথা বলি, নিজের মনকে বুঝতে সময় দিস। তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার নেই।
মায়া শান্ত গলায় বলল,
— আমিও সেটাই চাই। আমি চাই সবকিছু সুন্দরভাবে হোক।
সন্ধ্যায় শাহজাদ বাড়ি ফিরে দেখল, মা বসার ঘরে অপেক্ষা করছেন।
— বাবা, একটু বসবে?
শাহজাদ মায়ের পাশে বসল।
রেহানা বেগম বললেন,
— আজ মায়ার মায়ের সঙ্গে কথা হলো। উনি বলছিলেন, মায়া কালকে বাড়ি ফিরে তোমাদের পরিবারের কথা অনেক প্রশংসা করেছে।
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল,
— ওদেরও আমাদের ভালো লেগেছে, এটা ভালো খবর।
— হ্যাঁ। তবে একটা কথা মনে রেখো, বাবা। কারও প্রতি যত্নশীল হওয়া ভালো, কিন্তু সেই যত্ন যেন কখনো তার ওপর চাপ হয়ে না দাঁড়ায়।
শাহজাদ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আমি বুঝেছি মা। আমি চাই মায়া নিজের ইচ্ছায় আমার সঙ্গে কথা বলুক, নিজের ইচ্ছায় দেখা করুক। কোনো কিছুতেই ওকে অস্বস্তিতে ফেলতে চাই না।
রেহানা বেগম সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়লেন।
— তোমার এই কথাটাই আমার ভালো লাগল।
ঠিক তখনই ছোট বোন দৌড়ে এসে বলল,
— ভাইয়া, আপনার ফোনে মায়া আপুর নাম উঠেছে!
শাহজাদ অবাক হয়ে ফোনের দিকে তাকাল। সত্যিই মায়ার মেসেজ এসেছে।
“আজ আপনার ছোট বোনের কথা মনে পড়ছিল। ওকে বলবেন, আবার দেখা হলে একসঙ্গে গল্প করব।”
শাহজাদ উত্তর দিল,
“ও তো আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছে। আজও আমাকে কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছে।”
মায়া লিখল,
“তাহলে ওকে বলবেন, আমি আবার দেখা করব ইনশাআল্লাহ।”
শাহজাদ মেসেজটি পড়ে বোনের দিকে তাকাল।
— এই নাও, তোমার জন্য খবর আছে।
বোন আনন্দে বলল,
— কী খবর?
— মায়া বলেছে, আবার দেখা হলে তোমার সঙ্গে গল্প করবে।
ছোট বোন খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল।
রাতের দিকে মায়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে। ফোনে শাহজাদের মেসেজ এল।
“আজ সারাদিন কেমন কাটল?”
মায়া উত্তর দিল,
“ভালো। আপনার?”
“ভালো। তবে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“বলুন।”
“আপনি কি আমাদের পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?”
মায়া কিছুক্ষণ ভেবে লিখল,
“হ্যাঁ। আপনাদের সবাই খুব আন্তরিক। আমার কোনো অস্বস্তি হয়নি।”
শাহজাদ উত্তর দিল,
“এটা জেনে ভালো লাগল। আমি চাই আপনি সব সময় স্বাচ্ছন্দ্যে থাকুন।”
মায়া লিখল,
“আপনিও নিজের যত্ন নেবেন। শুধু অন্যের খেয়াল রাখলেই হবে না।”
শাহজাদ মেসেজটি পড়ে মৃদু হাসল।
“আপনার কথাটা মনে রাখব।”
মায়া ফোনটা পাশে রেখে দিল। তার মনে হলো, মানুষের প্রতি যত্ন সব সময় বড় কোনো কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হয় না। কখনো একটি ছোট প্রশ্ন, কখনো সময়মতো খোঁজ নেওয়া, আবার কখনো কারও কথা মন দিয়ে শোনাও অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়।
সেদিন রাতে দুজনের আর বেশি কথা হয়নি। তবু দুজনের মনেই এক ধরনের শান্তি ছিল।
কিন্তু পরদিন সকালে শাহজাদের জন্য একটি নতুন ব্যস্ততা অপেক্ষা করছিল। অফিসের জরুরি একটি কাজের কারণে তাকে কয়েক দিনের জন্য শহরের বাইরে যেতে হতে পারে।
এই খবরটি মায়াকে কীভাবে জানাবে, সেটাই ভাবছিল সে।
কারণ সে জানে, মায়া হয়তো কিছুটা মন খারাপ করবে।
চলবে... ❤️