### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ২৪
### একসঙ্গে কাটানো বিকেল
সকালের নরম রোদ জানালার কাচ ভেদ করে মায়ার ঘরে এসে পড়েছে। মায়া বিছানায় বসে চুল বাঁধছিল। আজ তার মনটা বেশ ভালো। কারণ গতকাল রাতে শাহজাদের মায়ের সঙ্গে তার মায়ের কথা হয়েছে। দুই পরিবার একদিন একসঙ্গে বসবে—এই খবরটা শুনে মায়ার মা বেশ খুশি হয়েছেন।
মায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল ঠিক করতে করতে ভাবছিল, শাহজাদের পরিবারে সবাই কেমন হবে? যদিও রেহানা বেগমের সঙ্গে তার আগেই কয়েকবার দেখা হয়েছে, তবু পুরো পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানো হবে প্রথমবার।
এমন সময় মা ঘরে এসে বললেন,
— মায়া, আজ বিকেলে আমাদের একটু বাইরে যেতে হবে।
মায়া ঘুরে তাকাল।
— কোথায় মা?
— রেহানা আপা ফোন করেছিলেন। উনারা বিকেলে একটা পারিবারিক জায়গায় যাবেন। আমাদেরও যেতে বলেছেন।
মায়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
— শাহজাদও যাবে?
মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।
— সেটাই তো জানার জন্য এত আগ্রহ!
— ধুর মা!
মা হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
অন্যদিকে খানবাড়িতে সকাল থেকেই ব্যস্ততা। রেহানা বেগম ছোট মেয়েকে তৈরি হতে বলছেন। শাহজাদ নিচে বসে নাশতা করছিল। তার ছোট বোন দৌড়ে এসে বলল,
— ভাইয়া, আজ কিন্তু আপনি আমাদের সঙ্গে যাবেন।
শাহজাদ অবাক হয়ে তাকাল।
— কোথায়?
— মা তো বলেছে, সবাই মিলে বাইরে যাব। আপনি আবার অফিসের কথা বলে পালিয়ে যাবেন না।
শাহজাদ হেসে বলল,
— আজ ছুটির দিন। অফিসে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।
রেহানা বেগম পাশে এসে বললেন,
— আর শোনো, মায়ারাও আসবে।
শাহজাদ চায়ের কাপ নামিয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
— ভালো তো। অনেক দিন পর সবাই একসঙ্গে সময় কাটাতে পারব।
মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।
— শুধু সবাইকে দেখার জন্যই এত খুশি?
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল,
— মা, তুমি না!
রেহানা বেগম আর কিছু বললেন না। ছেলের মুখের হাসিটুকু দেখেই তিনি বুঝতে পারলেন, মায়ার উপস্থিতি তার কাছে কতটা আনন্দের।
বিকেল চারটার দিকে দুই পরিবার নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছাল। জায়গাটি ছিল শহরের বাইরে একটি সুন্দর পারিবারিক অবকাশকেন্দ্র। চারপাশে সবুজ গাছপালা, ছোট ছোট ফুলের বাগান আর বসার জন্য সুন্দর জায়গা। পরিবেশটা বেশ শান্ত।
মায়া গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে তাকাল।
— জায়গাটা অনেক সুন্দর!
পেছন থেকে শাহজাদের কণ্ঠ ভেসে এল,
— আপনার পছন্দ হয়েছে?
মায়া ঘুরে তাকিয়ে একটু অবাক হলো।
— আপনি কখন এলেন?
— আপনি যখন জায়গাটা দেখছিলেন, তখনই।
— আমাকে ভয় পাইয়ে দিলেন!
শাহজাদ হেসে বলল,
— ভয় পাওয়ার মতো কিছু বলেছি নাকি?
— না, কিন্তু হঠাৎ কথা বললে একটু চমকে যাই।
— তাহলে পরেরবার আগে থেকেই জানিয়ে দেব।
মায়া হেসে ফেলল।
এদিকে দুই পরিবারের বড়রা এক জায়গায় বসে গল্প শুরু করেছেন। রেহানা বেগম মায়ার মায়ের পাশে বসে বললেন,
— মায়াকে আজ খুব সুন্দর লাগছে।
মায়ার মা হাসিমুখে বললেন,
— আপনার মেয়েকেও খুব সুন্দর লাগছে। দুজনকে একসঙ্গে দেখলে ভালো লাগে।
রেহানা বেগম বললেন,
— আমাদের ছেলেমেয়েরা যেন সব সময় হাসিখুশি থাকে, এটাই চাই।
দুই মা গল্পে মেতে উঠলেন।
শাহজাদের ছোট বোন মায়ার কাছে এসে বলল,
— আপু, আপনি আমার সঙ্গে একটু ঘুরবেন?
মায়া হাসিমুখে বলল,
— অবশ্যই। কোথায় যাবি?
— ওই ফুলের বাগানে। তবে ভাইয়াকেও নিতে হবে।
শাহজাদ পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
— আমাকে আবার কেন?
ছোট বোন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
— কারণ আপনি থাকলে আপু একা একা ঘুরতে পারবে না!
মায়া হেসে মাথা নিচু করল। শাহজাদ বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোমার কথা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে।
তিনজন ফুলের বাগানের দিকে হাঁটতে লাগল। ছোট মেয়েটি সামনে সামনে দৌড়াচ্ছিল। মায়া একটি সাদা ফুলের গাছের সামনে দাঁড়িয়ে ফুলগুলো দেখতে লাগল।
শাহজাদ পাশে এসে দাঁড়াল।
— ফুল পছন্দ করেন?
— অনেক। বিশেষ করে সাদা ফুল।
— কেন?
— জানি না। সাদা রঙের মধ্যে একটা শান্তি আছে।
শাহজাদ ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনার পছন্দের বিষয়গুলো মনে রাখা কঠিন নয়।
মায়া তার দিকে তাকাল।
— কেন?
— কারণ আপনি যখন কোনো কিছু পছন্দ করেন, তখন আপনার চোখেমুখে সেটা বোঝা যায়।
মায়া একটু লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে তাকাল।
— আপনি সব সময় এমন কথা বলেন কেন?
— কেমন কথা?
— এমন কথা, যার উত্তর দিতে গেলে আমার লজ্জা লাগে।
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল,
— তাহলে উত্তর দেওয়ার দরকার নেই। শুধু হাসলেই হবে।
মায়া এবার হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর ছোট বোনটি দৌড়ে এসে বলল,
— ভাইয়া, আপু, চলুন! মা ডাকছে।
তারা সবাই মিলে বসার জায়গায় ফিরে এল। সেখানে খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খেতে লাগল। মায়ার মা শাহজাদকে খাবার এগিয়ে দিয়ে বললেন,
— বাবা, আরেকটু নাও।
শাহজাদ ভদ্রভাবে বলল,
— ধন্যবাদ আন্টি। আমার হয়ে গেছে।
মায়া পাশে বসে চুপচাপ সব দেখছিল। শাহজাদ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনি কিছু খাচ্ছেন না কেন?
— খাচ্ছি তো।
— আপনার প্লেটে তো প্রায় সবই পড়ে আছে।
মায়া একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
— আপনি নিজের খাবার খান।
শাহজাদ হেসে বলল,
— ঠিক আছে, আর বলব না।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর সে মায়ার পছন্দের খাবারটি তার দিকে এগিয়ে দিল।
— এটা আপনার ভালো লাগবে ভেবেছি।
মায়া খাবারটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— ধন্যবাদ।
খাওয়া শেষে সবাই কিছুক্ষণ গল্প করল। মায়ার বাবা ও শাহজাদের বাবা আগের পরিচয়ের সূত্র ধরে সাধারণ কথাবার্তা বললেন। তাদের মধ্যে কোনো ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও আজকের পরিবেশে কথাবার্তা বেশ স্বাভাবিক ছিল।
বিকেলের শেষ আলোয় সবাই বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিল। গাড়িতে ওঠার আগে শাহজাদ মায়ার কাছে এসে বলল,
— আজকের দিনটা কেমন লাগল?
মায়া হাসিমুখে উত্তর দিল,
— অনেক ভালো। আপনার পরিবারের সবাই খুব সুন্দর মনের মানুষ।
— আপনিও তাদের ভালো লেগেছেন।
— আপনি কীভাবে জানলেন?
— মা আপনাকে নিয়ে গাড়িতে ফেরার সময়ও কথা বলছিলেন।
মায়া হেসে বলল,
— কী বলছিলেন?
— সেটা মায়ের কাছ থেকেই শুনবেন।
মায়া একটু অভিমানী গলায় বলল,
— আপনি কিছুই বলেন না।
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল,
— সব কথা একদিনে বলে দিলে পরের দিন কী বলব?
মায়া হেসে ফেলল।
বাড়ি ফেরার পর মায়া নিজের ঘরে গিয়ে ফোন হাতে নিল। কিছুক্ষণ পর শাহজাদের মেসেজ এল।
“বাড়ি পৌঁছেছেন?”
মায়া উত্তর দিল,
“হ্যাঁ, আপনি?”
“আমিও। আজকের বিকেলটা সুন্দর ছিল।”
মায়া লিখল,
“আমারও খুব ভালো লেগেছে। আপনার ছোট বোনটা অনেক মিষ্টি।”
শাহজাদ উত্তর দিল,
“ও আপনাকে খুব পছন্দ করেছে। বাড়ি ফিরেও আপনার কথা বলছে।”
মায়া অবাক হয়ে লিখল,
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। বলেছে, আবার যেন আপনার সঙ্গে দেখা হয়।”
মায়া মেসেজটি পড়ে মুচকি হাসল।
তারপর লিখল,
“ইনশাআল্লাহ, আবার দেখা হবে।”
শাহজাদ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, আজকের দিনটি শুধু একটি পারিবারিক ঘোরাঘুরি ছিল না; বরং দুই পরিবারের মধ্যে সুন্দর বোঝাপড়ার আরেকটি ছোট পদক্ষেপ।
রাত বাড়তে লাগল। দুজনেই নিজেদের ঘরে ফিরে গেল, কিন্তু বিকেলের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো তাদের মনে রয়ে গেল।
শাহজাদ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। তার মনে একটাই কথা ঘুরছিল—কিছু মানুষ জীবনে এলে সাধারণ দিনগুলোও অসাধারণ হয়ে ওঠে।
আর মায়া বিছানায় শুয়ে ভাবছিল, শাহজাদের পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়টা তার কাছে এত ভালো লাগল কেন?
হয়তো উত্তরটা সে নিজেও জানে।
তবে সেই উত্তর মুখে প্রকাশ করার সময় এখনো আসেনি।
চলবে... ❤️