### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ২৭
### অপেক্ষার ছোট্ট অনুভূতি
পরদিন সকাল সাতটা।
শাহজাদ ঘুম থেকে উঠে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আরেকবার দেখে নিল। আজ তাকে ঢাকার বাইরে যেতে হবে। অফিসের গাড়ি নিচে অপেক্ষা করছে। রেহানা বেগম ছেলের ব্যাগের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,
— সবকিছু নিয়েছ তো বাবা?
— জি মা। আর কিছু বাকি নেই।
— ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করবে। কাজের ব্যস্ততায় খাবার বাদ দেবে না।
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল,
— তুমি চিন্তা কোরো না। নিজের খেয়াল রাখব।
ছোট বোন দৌড়ে এসে ভাইয়ের হাত ধরে বলল,
— ভাইয়া, আমার জন্য কী আনবেন?
— তুমি কী চাও?
— একটা সুন্দর পুতুল।
— ঠিক আছে। তবে পড়াশোনায় মন দিতে হবে।
— আমি তো মন দিয়েই পড়ি!
রেহানা বেগম হেসে বললেন,
— তোমার পড়াশোনার খবর আমি জানি।
সবাই হেসে উঠল।
শাহজাদ মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠল। গাড়ি চলতে শুরু করতেই সে ফোন বের করে মায়াকে মেসেজ পাঠাল।
“রওনা দিলাম। দোয়া করবেন।”
মায়া তখন নাশতার টেবিলে বসে ছিল। মেসেজ দেখে দ্রুত উত্তর দিল,
“আল্লাহ আপনার যাত্রা নিরাপদ করুন। পৌঁছে জানাবেন।”
শাহজাদ মেসেজটি পড়ে লিখল,
“অবশ্যই। আপনিও ভালো থাকবেন।”
মায়া ফোনটা পাশে রেখে নাশতা শেষ করল। কিন্তু তার মন বারবার ফোনের দিকে চলে যাচ্ছিল।
মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— কী রে, আজ এত চুপচাপ কেন?
— কিছু না মা।
— শাহজাদ চলে গেছে বলে মন খারাপ?
মায়া একটু থেমে বলল,
— কয়েক দিন তো থাকবেই না।
মা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— মানুষের কাজ থাকে, দায়িত্ব থাকে। দূরে থাকলেই যে কেউ ভুলে যায়, তা তো নয়।
মায়া মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— জানি মা।
অন্যদিকে শাহজাদ গাড়িতে বসে অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। রায়হান তার পাশে বসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখছিল।
— স্যার, দুপুরের মধ্যে আমাদের পৌঁছে যাওয়ার কথা।
— ঠিক আছে। পৌঁছে আগে হোটেলে যাব। তারপর সরাসরি মিটিংয়ের প্রস্তুতি নেব।
রায়হান মাথা নাড়ল।
কিছুক্ষণ পর শাহজাদ জানালার বাইরে তাকাল। রাস্তার দুই পাশে সবুজ গাছপালা, ছোট ছোট দোকান আর ব্যস্ত মানুষ। হঠাৎ তার মনে পড়ল, মায়া এমন সবুজ পরিবেশ খুব পছন্দ করে।
সে ফোন বের করে একটা ছবি তুলল। তারপর মায়াকে পাঠিয়ে লিখল,
“আপনার পছন্দের মতো সবুজ জায়গা।”
মায়া ছবিটা দেখে খুশি হয়ে গেল।
“সুন্দর! কোথায় এটা?”
“রাস্তার পাশের একটা জায়গা। গাড়ি থেকে তুললাম।”
“আপনি কি ছবি তুলতে শিখে গেছেন?”
শাহজাদ হেসে উত্তর দিল,
“আপনার পছন্দের জিনিসগুলো খেয়াল করতে করতে কিছুটা শিখেছি।”
মায়া উত্তর লিখতে গিয়ে কয়েকবার মুছে ফেলল। শেষে লিখল,
“ভালো হয়েছে। সাবধানে গাড়িতে বসবেন।”
শাহজাদ মেসেজটি পড়ে ফোনটা রেখে দিল।
দুপুরের দিকে তারা গন্তব্যে পৌঁছাল। হোটেলে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে শাহজাদ মিটিংয়ের প্রস্তুতি শুরু করল। কাজের চাপ বেশ বেশি। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
এদিকে মায়া নিজের কাজে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করছিল। সে ঘর গুছাল, মায়ের সঙ্গে রান্না করল, ছোট ভাইয়ের পড়া দেখল। তবুও মাঝেমধ্যে ফোনের স্ক্রিনে চোখ চলে যাচ্ছিল।
বিকেল চারটার দিকে শাহজাদ ফোন করল।
— কেমন আছেন?
মায়া হাসিমুখে বলল,
— ভালো। আপনি পৌঁছেছেন কখন?
— দুপুরের দিকে। এখন একটু সময় পেয়েছি।
— কাজ কেমন চলছে?
— ভালোই। তবে বেশ ব্যস্ততা আছে।
মায়া বলল,
— তাহলে বেশি কথা বলার দরকার নেই। আপনি কাজ করুন।
শাহজাদ একটু হেসে বলল,
— আপনি কি সত্যিই চান আমি ফোন রেখে দিই?
মায়া মৃদু হেসে বলল,
— না, তবে আপনার কাজের ক্ষতি হোক, সেটাও চাই না।
— আপনার সঙ্গে কথা বললে কাজের ক্ষতি হয় না। বরং মনটা ভালো থাকে।
মায়া চুপ করে গেল।
শাহজাদ আবার বলল,
— আজ দুপুরে খেয়েছেন তো?
— হ্যাঁ। আপনি?
— আমিও খেয়েছি।
— ঠিকমতো?
— জি, ঠিকমতো।
মায়া সন্তুষ্ট হয়ে বলল,
— তাহলে ভালো।
কিছুক্ষণ তারা সাধারণ গল্প করল। মায়া তার ছোট ভাইয়ের একটি মজার কাণ্ডের কথা বলল। শাহজাদ মন দিয়ে শুনল। গল্পের শেষে দুজনেই হেসে উঠল।
ফোন রাখার আগে শাহজাদ বলল,
— আজ রাতে হয়তো একটু দেরি হবে। কাজ শেষ করে আপনাকে মেসেজ দেব।
— ঠিক আছে। দেরি হলে চিন্তা করব না।
— ধন্যবাদ।
— আবার ধন্যবাদ কেন?
— আমাকে বোঝার চেষ্টা করেন বলে।
মায়া মৃদু স্বরে বলল,
— আপনিও তো আমাকে বোঝার চেষ্টা করেন।
ফোন কেটে যাওয়ার পর মায়ার মনটা ভালো হয়ে গেল।
সন্ধ্যায় রেহানা বেগম মায়ার মাকে ফোন করলেন। দুজনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো। এরপর রেহানা বেগম মায়ার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন।
মায়া ফোন হাতে নিয়ে বলল,
— আসসালামু আলাইকুম আন্টি।
— ওয়ালাইকুম আসসালাম মা। কেমন আছ?
— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
— ভালো আছি। শাহজাদ তো বাইরে গেছে। ওর সঙ্গে কথা হয়েছে?
— জি আন্টি, একটু আগে কথা হয়েছে।
— ও কাজের মধ্যে থাকলে নিজের খেয়াল রাখতে ভুলে যায়। তুমি যদি কখনো কথা বলো, ওকে মনে করিয়ে দিও।
মায়া হেসে বলল,
— অবশ্যই মনে করিয়ে দেব।
রেহানা বেগমও হেসে বললেন,
— তোমার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল মা। সময় পেলে আবার কথা হবে।
— জি আন্টি। আল্লাহ হাফেজ।
রাতে শাহজাদের কাজ শেষ হতে বেশ দেরি হলো। হোটেলের ঘরে ফিরে সে প্রথমেই মায়াকে মেসেজ পাঠাল।
“আজকের কাজ শেষ। আপনি ঘুমিয়ে পড়েছেন?”
মায়া তখন বই পড়ছিল। মেসেজ দেখে উত্তর দিল,
“না, এখনো জেগে আছি। আপনার কাজ শেষ হয়েছে?”
“হ্যাঁ। আজ অনেক ব্যস্ত ছিলাম।”
“এখন বিশ্রাম নিন। কাল আবার কাজ আছে।”
শাহজাদ লিখল,
“আপনি কি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন?”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দিল,
“একটু।”
শাহজাদের মুখে হাসি ফুটল।
“তাহলে আর অপেক্ষা করাব না। এবার ঘুমিয়ে পড়ুন।”
মায়া লিখল,
“আপনিও ঘুমাবেন। নিজের যত্ন নেবেন।”
“অবশ্যই। শুভরাত্রি।”
“শুভরাত্রি।”
ফোন রেখে শাহজাদ বিছানায় শুয়ে পড়ল। দূরে থেকেও মায়ার ছোট্ট কয়েকটি কথায় তার ক্লান্তি অনেকটা কমে গেল।
মায়াও জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারছিল, কারও জন্য অপেক্ষা করা মানেই সব সময় মন খারাপ করা নয়। কখনো সেই অপেক্ষার মধ্যেও এক ধরনের ভালো লাগা থাকে।
তবে পরদিন সকালে এমন একটি ঘটনা ঘটতে চলেছে, যা মায়ার মনে নতুন করে কিছু প্রশ্ন তৈরি করবে।
শাহজাদের কাজের জায়গায় হঠাৎ একজন পুরোনো পরিচিত মানুষের আগমন ঘটবে। আর সেই মানুষটির সঙ্গে শাহজাদের সম্পর্কের কথা শুনে মায়া কিছুটা অবাক হবে।
চলবে... ❤️