### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ২৮
### পুরোনো পরিচিত
সকালের দিকে শাহজাদ হোটেলের ঘর থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আজ তার অফিসের কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। রায়হান আগেই ফোন করে জানিয়েছে, মিটিংয়ের সব ব্যবস্থা সম্পন্ন।
শাহজাদ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
— রায়হান, গাড়ি প্রস্তুত আছে?
— জি স্যার। নিচে অপেক্ষা করছে।
— ঠিক আছে। আমি আসছি।
হোটেলের নিচে নেমে গাড়িতে উঠল শাহজাদ। গাড়ি চলতে শুরু করতেই সে ফোন বের করল। মায়ার কোনো মেসেজ এসেছে কি না দেখল। না, এখনো কিছু আসেনি।
সে নিজেই মেসেজ পাঠাল,
“সুপ্রভাত। ঘুম থেকে উঠেছেন?”
কিছুক্ষণ পর মায়ার উত্তর এল,
“জি, উঠেছি। আপনার সকাল কেমন কাটছে?”
“ভালো। আজ একটু বেশি ব্যস্ত থাকব।”
“তাহলে কাজের দিকে মন দিন। সময় পেলে কথা হবে।”
শাহজাদ মৃদু হেসে ফোনটা রেখে দিল।
মায়া তখন নিজের ঘরে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল। মেসেজের উত্তর দিয়ে সে নিচে নেমে এল। মা রান্নাঘরে নাশতা তৈরি করছিলেন।
— মা, কিছু সাহায্য করব?
— হ্যাঁ, টেবিলে প্লেটগুলো সাজিয়ে দে।
মায়া প্লেট সাজাতে সাজাতে বলল,
— মা, শাহজাদ আজ খুব ব্যস্ত থাকবে।
মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।
— তুই তো তার কাজের খবরও রাখিস দেখি।
— মা, উনি নিজেই বলেছেন।
— আচ্ছা, বুঝলাম।
মায়া আর কথা বাড়াল না।
অন্যদিকে শাহজাদ অফিসের নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছে মিটিংয়ে যোগ দিল। কয়েকজন কর্মকর্তা আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন। সবাই নিজেদের পরিচয় দিয়ে আলোচনায় বসে পড়লেন।
মিটিংয়ের মাঝামাঝি সময়ে একজন নারী কর্মকর্তা ঘরে প্রবেশ করলেন। তিনি শাহজাদকে দেখে কিছুটা অবাক হয়ে বললেন,
— আরে, শাহজাদ! তুমি এখানে?
শাহজাদ তাকিয়ে চিনতে পারল।
— তানিয়া! অনেক দিন পর।
তানিয়া হাসিমুখে বলল,
— সত্যিই অনেক দিন পর দেখা। কেমন আছ?
— ভালো। তুমি কেমন আছ?
— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।
রায়হান পাশ থেকে সব দেখছিল। তানিয়া একসময় শাহজাদের সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। কয়েক বছর আগে চাকরি পরিবর্তন করে অন্য জায়গায় চলে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে পেশাগত পরিচয় ও বন্ধুত্ব ছিল।
মিটিং শেষে তানিয়া শাহজাদের কাছে এসে বললেন,
— তোমার সঙ্গে কিছু কাজের বিষয়েও কথা ছিল। সময় পেলে বসতে পারি?
— অবশ্যই। কাজের বিষয় হলে কথা বলা যাবে।
তারা পাশের একটি কক্ষে গিয়ে বসে প্রয়োজনীয় বিষয় আলোচনা করতে লাগলেন।
এদিকে মায়া দুপুরের দিকে ফোন হাতে বসেছিল। সকাল থেকে শাহজাদের কোনো নতুন মেসেজ আসেনি। সে নিজেকে বোঝাল, আজ ব্যস্ত থাকবে বলেছে। তাই অযথা চিন্তা করা ঠিক হবে না।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর নীলার ফোন এল।
— কী করছিস?
— কিছু না। বসে আছি।
— তোর গলা শুনে মনে হচ্ছে মন খারাপ।
— না, তেমন কিছু না।
— শাহজাদের সঙ্গে কথা হয়েছে?
— সকালে হয়েছে। আজ কাজের চাপ বেশি।
নীলা বলল,
— তাহলে তো চিন্তার কিছু নেই। নিজের কাজ কর। সব সময় ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকলে সময় কাটবে না।
মায়া হেসে বলল,
— আচ্ছা, ম্যাডাম।
দুপুরের পর শাহজাদ কাজের জায়গা থেকে বের হওয়ার সময় তানিয়া আবার তার সঙ্গে দেখা করলেন।
— শাহজাদ, আজ তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল।
— আমারও। ভালো থেকো।
— আবার দেখা হবে আশা করি।
— অবশ্যই।
শাহজাদ গাড়িতে উঠে ফোন হাতে নিল। মায়াকে ফোন করার আগেই একটি মেসেজ এল। মায়া লিখেছে,
“কাজ কেমন হলো?”
শাহজাদ উত্তর দিল,
“ভালো হয়েছে। আজ একজন পুরোনো সহকর্মীর সঙ্গেও দেখা হলো।”
মায়া সঙ্গে সঙ্গে লিখল,
“ওহ! কে?”
“তানিয়া। আগে একসঙ্গে কাজ করতাম।”
মায়া কিছুক্ষণ ভেবে লিখল,
“আপনার বন্ধু?”
শাহজাদ উত্তর দিল,
“সহকর্মী ছিল। ভালো পরিচয় আছে।”
মায়া আর কিছু লিখল না।
শাহজাদ বুঝতে পারল, হয়তো মায়ার মনে কিছু প্রশ্ন এসেছে। তাই সে নিজেই ফোন করল।
— হ্যালো, কী করছেন?
— কিছু না।
— আপনার গলাটা এমন লাগছে কেন?
— কেমন?
— মনে হচ্ছে কিছু একটা ভাবছেন।
মায়া একটু ইতস্তত করে বলল,
— ওই যে বললেন, একজন পুরোনো সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হয়েছে। উনি কি আপনার খুব কাছের মানুষ ছিলেন?
শাহজাদ শান্ত গলায় বলল,
— না, তেমন কিছু নয়। আমরা একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম। কাজের সূত্রে পরিচয় হয়েছিল। অনেক দিন পর দেখা হলো, তাই কথা বলেছি।
মায়া বলল,
— আচ্ছা।
শাহজাদ হেসে বলল,
— শুধু আচ্ছা?
— আর কী বলব?
— যা মনে হচ্ছে, সেটাই বলুন।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আসলে আপনার জীবনে আগে অনেক মানুষ ছিল, অনেক পরিচয় ছিল। সেগুলো নিয়ে আমার প্রশ্ন করা উচিত কি না, বুঝতে পারি না।
শাহজাদ এবার একটু গম্ভীর হলো।
— মায়া, আমার অতীতের পরিচিত মানুষ থাকতেই পারে। আপনারও আছে। কিন্তু কাউকে নিয়ে অস্বস্তি হলে সেটা জিজ্ঞেস করা ভুল নয়। আমি আপনাকে কিছু লুকাতে চাই না।
মায়ার কণ্ঠ নরম হয়ে এল।
— আমি আপনাকে সন্দেহ করছি না।
— আমি জানি। তবু আপনার মনে কোনো প্রশ্ন থাকলে সরাসরি করবেন। আমি উত্তর দেব।
মায়া মৃদু হেসে বলল,
— ঠিক আছে। আর আপনি নিজের কাজ শেষ করুন। অনেকক্ষণ কথা বললেন।
— আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য আলাদা সময় বের করা যায়।
— সব সময় এমন কথা বলেন কেন?
— কারণ কথাগুলো সত্যি।
মায়া হেসে ফেলল।
সন্ধ্যায় শাহজাদ হোটেলে ফিরে মাকে ফোন করল। রেহানা বেগম ছেলের কণ্ঠ শুনে বললেন,
— কেমন আছ বাবা?
— ভালো মা। কাজ প্রায় শেষ।
— খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো করছ তো?
— জি।
— মায়ার সঙ্গে কথা হয়েছে?
— হয়েছে।
রেহানা বেগম মৃদু হেসে বললেন,
— মেয়েটা আজ আমার কাছেও ফোন করেছিল। তোমার খবর জানতে চেয়েছে।
শাহজাদের মুখে হাসি ফুটল।
— তাই নাকি?
— হ্যাঁ। তবে তোমাকে বলছি, কাজ শেষ করে বিশ্রাম নেবে। শুধু ফোন নিয়ে বসে থাকবে না।
— আচ্ছা মা।
রাতে মায়া নিজের ঘরে বসে ছিল। শাহজাদের মেসেজ এল,
“আজকের দিনটা কেমন কাটল?”
মায়া লিখল,
“ভালো। আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল।”
শাহজাদ উত্তর দিল,
“আমারও। আর একটা কথা, আজকের বিষয়টা নিয়ে আর ভাববেন না। তানিয়া আমার পুরোনো সহকর্মী। এর বেশি কিছু নয়।”
মায়া লিখল,
“আমি বুঝেছি। আপনাকে বিশ্বাস করি।”
শাহজাদ কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে উত্তর দিল,
“বিশ্বাসটা যেন কখনো নষ্ট না হয়, সেই চেষ্টা করব।”
মায়া মেসেজটি পড়ে শান্ত মনে ফোনটা পাশে রাখল।
সে বুঝতে পারল, কাউকে বিশ্বাস করার অর্থ এই নয় যে তার জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর আগে থেকেই জানা থাকবে। বরং বিশ্বাস মানে হলো, প্রশ্ন করার সুযোগ থাকা এবং উত্তর শোনার মতো মন রাখা।
আর শাহজাদও বুঝল, মায়ার সঙ্গে প্রতিটি কথা খোলাখুলি বললে তাদের মধ্যকার বোঝাপড়াটা আরও দৃঢ় হবে।
কিন্তু পরদিন সকালে শাহজাদের ফেরার কথা থাকলেও অফিস থেকে নতুন একটি দায়িত্ব দেওয়া হলো। ফলে তার বাড়ি ফেরার সময় একদিন পিছিয়ে যেতে পারে।
এই খবর মায়াকে জানালে সে কীভাবে নেবে, সেটাই ভাবতে লাগল শাহজাদ।
চলবে... ❤️