### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৩০
### ফিরে আসার আনন্দ
সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘ কয়েক দিনের কাজ শেষে অবশেষে নিজের শহরে ফিরছে শাহজাদ। গাড়ির জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে সে। রাস্তার দুপাশের পরিচিত দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে তার মনে অদ্ভুত এক প্রশান্তি কাজ করছে। কয়েক দিন ধরে ব্যস্ততার কারণে নিজের বাড়ি, মা আর ছোট বোনের কাছ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে তাকে।
তবে এই কয়েক দিনের মধ্যে এমন একজনের সঙ্গেও কথা হয়েছে, যার সঙ্গে কথা না বললে দিনটা যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সে হলো মায়া।
মোবাইলের স্ক্রিনে মায়ার নামটা ভেসে উঠতেই শাহজাদের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে কল রিসিভ করল।
—হ্যালো।
ওপাশ থেকে মায়ার শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল।
—আপনি কি রওনা দিয়েছেন?
—হ্যাঁ, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ি পৌঁছে যাব।
—ভালোভাবে যাবেন। রাস্তায় তাড়াহুড়ো করবেন না।
—আপনি কি এখনো আমার জন্য চিন্তা করছেন?
—চিন্তা তো করতেই পারি। আপনি এত দূর থেকে ফিরছেন।
শাহজাদ একটু হেসে বলল,
—তাহলে বাড়ি পৌঁছে আপনাকে জানাব।
—ঠিক আছে। আর হ্যাঁ, বাড়িতে গিয়ে আগে বিশ্রাম নেবেন। সারাক্ষণ কাজ করেছেন।
—আপনার কথা মেনে চলার চেষ্টা করব।
—চেষ্টা নয়, ঠিকমতো বিশ্রাম নেবেন।
মায়ার কথায় শাহজাদ হেসে ফেলল।
—আচ্ছা, ম্যাডাম। আপনার নির্দেশ পালন করা হবে।
—আপনি না একদম!
—কী করেছি আবার?
—কিছু না। আপনি বাড়ি যান।
—ঠিক আছে। পরে কথা হবে।
কল শেষ করে শাহজাদ মোবাইলটা পাশে রাখল। তার মনটা বেশ ভালো হয়ে গেল। দূরে থাকলেও মায়ার ছোট ছোট কথাগুলো তাকে অদ্ভুতভাবে আনন্দ দেয়।
অন্যদিকে মায়া ফোনটা রেখে জানালার পাশে দাঁড়াল। আজ সকাল থেকেই তার মনে একটা অপেক্ষা কাজ করছিল। শাহজাদ ফিরছে, এটাই তার ভালো লাগার কারণ। সে নিজেও বুঝতে পারছে, মানুষটার প্রতি তার যত্ন ধীরে ধীরে বেড়ে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর শাহজাদের গাড়ি খান বাড়ির সামনে এসে থামল।
গাড়ির শব্দ শুনেই বাড়ির ছোট বোন দৌড়ে দরজার কাছে চলে এল।
—ভাইয়া এসেছে! মা, ভাইয়া এসেছে!
রেহানা বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। শাহজাদ গাড়ি থেকে নেমে ব্যাগটা হাতে নিতেই ছোট বোন এগিয়ে এসে বলল,
—এত দিন কোথায় ছিলেন? আমাদের কথা একবারও মনে পড়েনি?
শাহজাদ মুচকি হেসে বলল,
—মনে পড়েছে বলেই তো ফিরে এসেছি।
—মিথ্যা কথা! ফোনও ঠিকমতো করেননি।
—আচ্ছা, এবার থেকে প্রতিদিন ফোন করব। খুশি?
—অনেক!
রেহানা বেগম ছেলের কাছে এসে দাঁড়ালেন।
—কেমন আছিস বাবা? শরীর ঠিক আছে তো?
—আলহামদুলিল্লাহ, মা। তুমি কেমন আছ?
—আমি ভালো আছি। আগে ঘরে আয়। তোর জন্য কত কিছু রান্না করেছি!
শাহজাদ মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসল।
—এত আয়োজনের কী দরকার ছিল, মা?
—ছেলে বাড়ি ফিরেছে, আর মা একটু আয়োজন করবে না?
শাহজাদ আর কিছু বলল না। মায়ের মুখের আনন্দ দেখে তার বুকটা ভরে উঠল।
ঘরে ঢুকতেই সে অবাক হয়ে দেখল, বসার ঘরটা সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। টেবিলের ওপর তার পছন্দের খাবার রাখা। ছোট বোন আবারও গর্ব করে বলল,
—সব আমার পরিকল্পনা!
শাহজাদ ভ্রু উঁচু করল।
—তাই নাকি? তাহলে খাবারগুলোও তুমি রান্না করেছ?
ছোট বোন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
—না, রান্না মা করেছে। কিন্তু সাজানোর আইডিয়া আমার!
সবাই হেসে উঠল।
রাতের খাবারের সময় শাহজাদ মায়ের পাশে বসে গল্প করছিল। ছোট বোনও একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছিল।
—ভাইয়া, তুমি বাইরে গিয়ে আমাদের জন্য কী এনেছ?
—তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি।
কথাটা শুনে মেয়েটির চোখ চকচক করে উঠল।
—সত্যি? কোথায়?
শাহজাদ ব্যাগ থেকে একটি ছোট প্যাকেট বের করে তার হাতে দিল। প্যাকেট খুলে সে নিজের পছন্দের একটি উপহার দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
—ইয়েই! আমার খুব পছন্দ হয়েছে!
রেহানা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—নিজের জন্য কিছু এনেছিস?
—হ্যাঁ, এনেছি। তবে তোমাদের জন্য আনতেই বেশি ভালো লাগে।
খাওয়া শেষে শাহজাদ নিজের ঘরে চলে গেল। গোসল করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর মোবাইল হাতে নিল। মায়াকে দেওয়া কথা তার মনে আছে।
সে একটি বার্তা পাঠাল—
শাহজাদ: বাড়ি পৌঁছে গেছি। আলহামদুলিল্লাহ, ভালোভাবে এসেছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মায়ার উত্তর এল।
মায়া: আলহামদুলিল্লাহ। এখন নিশ্চিন্ত হলাম।
শাহজাদ: এতক্ষণ কি আমার খবরের অপেক্ষায় ছিলেন?
মায়া: একটু।
শাহজাদ: শুধু একটু?
মায়া: বেশি প্রশ্ন করবেন না। আগে বিশ্রাম নিন।
শাহজাদ: আচ্ছা, বিশ্রাম নেব। তবে একটা কথা বলি?
মায়া: বলুন।
শাহজাদ: বাড়ি ফিরে আজ সবকিছু আগের মতো লাগছে। মা, বোন, পরিচিত পরিবেশ—সবকিছু। কিন্তু কয়েক দিন ধরে আপনার সঙ্গে কথা বলার অভ্যাস হয়ে গেছে। তাই বাড়ি ফিরেও আপনার সঙ্গে কথা না বলে দিনটা শেষ করতে ইচ্ছে করছে না।
মায়া বার্তাটি পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। সে উত্তর দিল,
মায়া: আমারও আপনার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে। তবে নিজের পরিবারের জন্যও সময় রাখবেন।
শাহজাদ: অবশ্যই। আপনি যেমন আপনার পরিবারের জন্য সময় রাখবেন, আমিও রাখব।
মায়া: এটাই ভালো।
ঠিক তখনই রেহানা বেগম ছেলের ঘরে এলেন।
—কী রে, কার সঙ্গে কথা বলছিস?
শাহজাদ মোবাইলটা নামিয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
—মায়ার সঙ্গে।
মায়ের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
—ও কেমন আছে?
—ভালো আছে। আমার বাড়ি পৌঁছানোর খবর নিচ্ছিল।
—মেয়েটা বেশ যত্নশীল। আজ দুপুরেও ফোন করে তোর খবর জানতে চেয়েছিল।
শাহজাদ অবাক হয়ে বলল,
—সত্যি?
—হ্যাঁ। আমি বলেছি, তুই ফিরলেই তোকে জানাব।
শাহজাদ মৃদু হেসে মাথা নিচু করল।
রেহানা বেগম ছেলের পাশে বসে বললেন,
—বাবা, একটা কথা বলি?
—বলো মা।
—মানুষের জীবনে ভালো লাগা আসতেই পারে। কিন্তু সেই ভালো লাগাকে সুন্দর রাখতে হলে একে অপরকে সম্মান করতে হয়। কারও ওপর কোনো চাপ দেওয়া যাবে না। সময় নিয়ে সবকিছু বুঝে এগোতে হয়।
শাহজাদ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি জানি, মা। মায়ার মতামত আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাই না, সে কখনো আমার কারণে অস্বস্তিতে পড়ুক।
রেহানা বেগম ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—এই কথাটাই মনে রাখিস।
মা চলে যাওয়ার পর শাহজাদ আবার মোবাইল হাতে নিল। মায়ার কাছে একটি ছোট বার্তা পাঠাল।
শাহজাদ: আজ বাড়ি ফিরে মায়ের কাছ থেকে আপনার প্রশংসা শুনলাম।
মায়া: কী প্রশংসা?
শাহজাদ: সেটা এখন বলব না।
মায়া: কেন?
শাহজাদ: সামনাসামনি বলব। যদি কখনো দেখা হয়।
মায়া উত্তর দিল,
মায়া: দেখা হলে শুনব।
শাহজাদ মোবাইলটা পাশে রেখে জানালার বাইরে তাকাল। রাতের আকাশে কয়েকটি তারা জ্বলছে। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি আজ যেন অনেকটাই কমে গেছে।
অন্যদিকে মায়াও নিজের ঘরে বসে মৃদু হাসছিল। তাদের সম্পর্কের কোনো নাম এখনো ঠিক হয়নি, কোনো প্রতিশ্রুতির কথাও হয়নি। তবুও দুজনের মধ্যে তৈরি হচ্ছে এক সুন্দর বোঝাপড়া।
আর এই বোঝাপড়ার মাঝেই হয়তো একদিন জন্ম নেবে আরও গভীর কোনো অনুভূতি।
চলবে... ❤️