ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোর আসক্ত আমি

পর্ব 37

লেখক: নুসরাত জাহান রাফা

### তোর আসক্ত আমি

লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা

পর্ব সংখ্যা: ৩৭

### খান বাড়িতে প্রথম আমন্ত্রণ

সকালের নরম রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুকেছে। মায়া বিছানায় বসে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। গত রাতের শাহজাদের পাঠানো শেষ মেসেজটা এখনো তার চোখের সামনে।

শাহজাদ: ঘুমিয়ে পড়েছেন?

মায়া: না, আপনার মেসেজের অপেক্ষায় ছিলাম।

শাহজাদ: তাহলে তো আমার দায়িত্ব বেড়ে গেল। এখন থেকে আপনাকে অপেক্ষা করিয়ে রাখা যাবে না।

মেসেজটা মনে পড়তেই মায়ার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। ঠিক তখনই তার মা ঘরে ঢুকলেন।

— কী রে, সকাল সকাল ফোন দেখে হাসছিস কেন?

মায়া একটু লজ্জা পেয়ে ফোনটা পাশে রাখল।

— এমনিই মা।

— এমনিই বুঝি এত হাসি আসে?

মায়া মায়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।

— মা, শাহজাদের ছোট বোন নাকি আমাকে খান বাড়িতে যেতে বলেছে।

— তাই নাকি? তাহলে তো যাওয়া উচিত। ওদের বাসা থেকে দাওয়াত এসেছে, আমরা একদিন সবাই মিলে যাব।

মায়ার মুখে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।

— সত্যি যাবে?

— অবশ্যই। তবে তুই এত খুশি হচ্ছিস কেন, সেটাও কিন্তু বুঝতে পারছি।

— মা!

মায়ের হাসিতে ঘরটা ভরে উঠল।

অন্যদিকে খান বাড়িতে সকাল থেকেই ব্যস্ততা। শাহজাদের ছোট বোন বারবার মাকে জিজ্ঞেস করছে, মায়া কবে আসবে।

— মা, মায়া আপু আজ আসবে না?

রেহানা বেগম হেসে বললেন,

— ওরাও তো পরিবারের সঙ্গে কথা বলে আসবে। সবকিছুর জন্য একটু সময় দিতে হয়।

শাহজাদ সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কথাটা শুনল।

— কী নিয়ে এত আলোচনা?

ছোট বোন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,

— ভাইয়া, মায়া আপু আসবে কবে? তুমি কি তাকে আসতে বলেছ?

শাহজাদ মুচকি হেসে বলল,

— বলেছি। তবে আসবে কি না, সেটা ওর সিদ্ধান্ত।

— তুমি সব সময় এত ভদ্র সাজো কেন?

— কারণ তোমার মতো দুষ্টু হলে চলবে না।

ছোট বোন মুখ ফুলিয়ে অন্যদিকে চলে গেল। রেহানা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

— মেয়েটাকে খুব পছন্দ হয়েছে তোমার?

শাহজাদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— মা, ওর সঙ্গে কথা বললে আমার মনটা ভালো হয়ে যায়। ওর ছোট ছোট কথাগুলোও আমার মনে থাকে।

— তাহলে সেই ভালো লাগাটাকে সম্মান করতে শেখো। শুধু নিজের অনুভূতি নয়, ওর অনুভূতিকেও গুরুত্ব দেবে।

— জানি মা। আমি কখনো ওকে তাড়াহুড়ো করতে বলব না।

দুপুরের দিকে মায়ার ফোনে শাহজাদের কল এল।

— আসসালামু আলাইকুম।

— ওয়ালাইকুম আসসালাম। কী করছেন?

— আপনার মেসেজের অপেক্ষা করছিলাম।

শাহজাদ হেসে ফেলল।

— তাহলে তো আজ আমার ভাগ্য ভালো। আমি নিজেই ফোন করে ফেলেছি।

— এত আত্মবিশ্বাস ভালো না।

— আপনার সামনে একটু আত্মবিশ্বাস দেখাতে ইচ্ছে করে।

মায়া হেসে বলল,

— আপনার বোন কিন্তু আমাকে খান বাড়িতে যাওয়ার জন্য খুব জোর করছে।

— ওর কথা শুনে ভয় পেয়ে গেলেন নাকি?

— ভয় পাইনি। তবে আপনার বাড়ির সবাইকে একসঙ্গে সামলাতে পারব কি না, সেটাই ভাবছি।

— সবাইকে সামলানোর দায়িত্ব আপনার নয়। আর আমি তো থাকবই।

— আপনি থাকলেই কি সব সহজ হয়ে যাবে?

শাহজাদ একটু থেমে বলল,

— আমার কাছে তো তাই মনে হয়।

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নরম গলায় বলল,

— মা বলেছে, আমরা একদিন সবাই মিলে যাব।

— সত্যি?

— হ্যাঁ।

শাহজাদের কণ্ঠে আনন্দ স্পষ্ট হয়ে উঠল।

— তাহলে দিনটা আমার জন্য বিশেষ হতে যাচ্ছে।

— কেন?

— কারণ সেদিন আপনাকে শুধু ফোনের ওপাশে নয়, সামনাসামনি দেখতে পাব।

মায়া লজ্জা পেয়ে বলল,

— আপনি না, একদমই বদলাবেন না!

— বদলাতে চাইও না। আপনার সঙ্গে কথা বলার সময় এমনই থাকতে ভালো লাগে।

সেদিন বিকেলে শাহজাদ তার ছোট বোনকে নিয়ে বাজারে গেল। ছোট বোন মায়ার জন্য কিছু কিনতে চায়। অনেক কিছু দেখার পর সে একটি সুন্দর ছোট্ট ফুলের টব পছন্দ করল।

— ভাইয়া, এটা মায়া আপুকে দেব।

শাহজাদ টবটা হাতে নিয়ে বলল,

— সুন্দর তো। কিন্তু ও পছন্দ করবে তো?

— করবে! আপু তো ফুল ভালোবাসে।

শাহজাদ আর কিছু বলল না। টবটা কিনে নিল।

এদিকে মায়া নিজের ঘরে বসে আলমারি গোছাচ্ছিল। তার মা এসে বললেন,

— শোন, শুক্রবার আমরা খান বাড়িতে যাব। তুই প্রস্তুত থাকিস।

মায়া অবাক হয়ে তাকাল।

— শুক্রবার?

— হ্যাঁ। ওদের বাসা থেকেও কথা হয়েছে।

মায়ার বুকের ভেতর অদ্ভুত আনন্দ অনুভূত হলো। সে জানত, শাহজাদকে দেখবে। কিন্তু এবার তার বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সঙ্গে আরও কিছুটা সময় কাটাবে।

শুক্রবার বিকেলে মায়ারা খান বাড়িতে পৌঁছাল। দরজায় রেহানা বেগম নিজেই তাদের অভ্যর্থনা জানালেন।

— আসুন, আসুন। আপনাদের জন্যই তো অপেক্ষা করছিলাম।

মায়ার মা হাসিমুখে বললেন,

— আপনাদেরও অনেক কষ্ট হলো।

— আরে না, আপনাদের আসায় আমাদের বাড়িটাই যেন পূর্ণ হলো।

মায়া সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকল। ঠিক তখনই শাহজাদের ছোট বোন দৌড়ে এসে বলল,

— মায়া আপু! আপনি এসেছেন!

মায়া হেসে তার মাথায় হাত রাখল।

— তোমার কথা না শুনে কি আর থাকা যায়?

ছোট বোন তাকে নিয়ে বসার ঘরের এক পাশে চলে গেল। শাহজাদ তখন সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। মায়াকে দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

— আসসালামু আলাইকুম। ভালো আছেন?

— ওয়ালাইকুম আসসালাম। জি, ভালো। আপনি?

— এখন আরও ভালো।

মায়া চোখ নামিয়ে ফেলল। শাহজাদ মৃদু হেসে পাশে দাঁড়াল।

কিছুক্ষণ পর ছোট বোন ফুলের টবটা এনে মায়ার হাতে দিল।

— আপু, এটা আপনার জন্য। ভাইয়া কিনেছে, কিন্তু বলেছে আমি দিয়েছি।

মায়া অবাক হয়ে শাহজাদের দিকে তাকাল।

— আপনি কিনেছেন?

শাহজাদ মুচকি হেসে বলল,

— আমার হয়ে উপহার দেওয়ার কাজটা ওকে করতে দিয়েছি।

মায়া ফুলের টবটা হাতে নিয়ে বলল,

— অনেক সুন্দর হয়েছে। ধন্যবাদ।

— আপনার পছন্দ হয়েছে, এটাই যথেষ্ট।

সন্ধ্যার দিকে সবাই একসঙ্গে বসে গল্প করছিল। মায়ার হাসি আর শাহজাদের ছোট বোনের দুষ্টুমিতে সময়টা বেশ আনন্দেই কাটছিল।

একসময় মায়া বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। একটু পর শাহজাদও সেখানে এল। তবে যথেষ্ট দূরত্ব রেখে দাঁড়াল।

— বাড়িটা কেমন লাগল?

— খুব সুন্দর। আপনার মা অনেক ভালো।

— আপনাকে পছন্দ করেছেন।

— আপনি কীভাবে বুঝলেন?

— মা যখন কাউকে পছন্দ করেন, তখন তার সঙ্গে এতক্ষণ গল্প করেন। আজ তো আপনার সঙ্গে গল্প করতে করতে সময়ের কথাই ভুলে গেছেন।

মায়া হেসে বলল,

— আপনার ছোট বোনও খুব মিষ্টি।

— শুধু মিষ্টি? দুষ্টু বলবেন না?

— সেটাও।

দুজনেই হেসে উঠল।

শাহজাদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— আজ আপনাকে এখানে দেখে সত্যিই ভালো লাগছে।

মায়া তার দিকে তাকাল।

— আমারও ভালো লেগেছে। আপনার পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে বুঝলাম, আপনি কেন এত পরিবারকে ভালোবাসেন।

— আর আপনাকে দেখে আমার মনে হলো, আমার পছন্দটা ভুল হয়নি।

মায়া লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিল।

— আবার শুরু করলেন!

— কী করব বলুন? কিছু কথা না বললে মনটা ভারী হয়ে থাকে।

মায়া মৃদু হেসে বলল,

— তাহলে আজকের মতো কিছু কথা নিজের কাছেই রাখুন।

শাহজাদ হেসে মাথা নেড়ে বলল,

— ঠিক আছে। তবে একটা কথা বলবই।

— কী?

— আজকের দিনটা আমার মনে থাকবে।

মায়া উত্তর দিল না। শুধু হাতে থাকা ফুলের টবটার দিকে তাকিয়ে হাসল।

বাড়ি ফেরার সময় শাহজাদ দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল। বিদায়ের আগে ছোট বোন আবার বলে উঠল,

— মায়া আপু, আবার আসবেন কিন্তু!

মায়া হেসে বলল,

— আসব ইনশাআল্লাহ।

গাড়িতে বসার পর মায়ার ফোনে একটি মেসেজ এল।

শাহজাদ: বাসায় পৌঁছে জানাবেন। আর ফুলের টবটা ঠিকমতো রেখেছেন তো?

মায়া: জি, খুব যত্ন করে রাখব।

শাহজাদ: ফুলের টবটার যত্ন নেবেন, আর নিজেরও। আজ আপনাকে অনেক হাসতে দেখেছি। হাসিটা যেন এমনই থাকে।

মায়া মেসেজটা পড়ে মৃদু হাসল।

মায়া: আপনিও ভালো থাকবেন। আর আজকের দিনটা আমারও মনে থাকবে।

শাহজাদ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হাসল। তার মনে হলো, কিছু সম্পর্কের সৌন্দর্য তাড়াহুড়োয় নয়, বরং ধীরে ধীরে একে অপরের জীবনের অংশ হয়ে ওঠার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

চলবে... ❤️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 37 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন