### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৩৯
### তোমাকে ঘিরে ছোট্ট স্বপ্ন
সকালের মিষ্টি রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে মায়ার ঘরে এসে পড়েছে। জানালার পাশে রাখা ফুলের টবটিতে নতুন একটি ফুল ফুটেছে। মায়া ঘুম থেকে উঠেই ফুলটির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। ফুলটি দেখে তার মনে পড়ে গেল শাহজাদের দেওয়া ছোট্ট চুলের ক্লিপটির কথা। কয়েক দিন আগেই সে উপহারটি পেয়েছে। আজ সেটি পরার ইচ্ছা হলো তার।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো ঠিক করে ক্লিপটি লাগিয়ে নিল মায়া। তারপর ফোন হাতে নিতেই শাহজাদের মেসেজ চোখে পড়ল।
শাহজাদ: সুপ্রভাত। ঘুম থেকে উঠেছেন?
মায়া: জি, এই তো উঠলাম। আপনি?
শাহজাদ: অনেক আগেই। তবে আপনার মেসেজের অপেক্ষায় ছিলাম।
মায়া: প্রতিদিন কি আমার মেসেজের অপেক্ষায় থাকেন?
শাহজাদ: প্রতিদিন না, প্রায় প্রতিদিনই।
মায়া: বাহ! কথার জাদু বেশ ভালোই শিখেছেন।
শাহজাদ: জাদু জানি না, তবে আপনাকে হাসাতে চাই।
মায়া মেসেজটি পড়ে হেসে ফেলল। ঠিক তখনই তার মা ঘরে ঢুকে বললেন,
— কী ব্যাপার? সকাল সকাল এত হাসি কিসের?
মায়া ফোনটা পাশে রেখে বলল,
— কিছু না মা।
মা তার চুলের ক্লিপটির দিকে তাকিয়ে বললেন,
— ক্লিপটা তো সুন্দর। নতুন কিনেছিস?
— না মা, শাহজাদ দিয়েছিল।
— ওর দেওয়া জিনিসটা বেশ যত্ন করে রাখিস দেখছি।
মায়া লজ্জা পেয়ে বলল,
— সুন্দর তো, তাই পরেছি।
মা মৃদু হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
অন্যদিকে শাহজাদ খান বাড়িতে নাস্তার টেবিলে বসে ছিল। তার ছোট বোন এসে পাশে বসে বলল,
— ভাইয়া, আজ বিকেলে কোথাও যাবে?
— কেন?
— মায়া আপুর সঙ্গে দেখা করতে যাবে না?
শাহজাদ হেসে বলল,
— তুমি কি আমার ব্যক্তিগত সহকারী হয়ে গেছ?
— না, আমি তোমার ছোট বোন। আমার দায়িত্ব তোমাকে মনে করিয়ে দেওয়া।
শাহজাদ হেসে ফেলল।
— আচ্ছা, আজ বিকেলে সময় পেলে দেখা করব।
ছোট বোন খুশি হয়ে মায়ের কাছে চলে গেল। রেহানা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— মায়ার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে ওদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে নিও।
— অবশ্যই মা। ওর সুবিধা আর পরিবারের মতামত আগে।
দুপুরে শাহজাদ মায়াকে ফোন করল।
— আজ বিকেলে একটু সময় হবে?
— কেন, কোনো বিশেষ কথা আছে?
— বিশেষ কথা না থাকলে কি দেখা করা যায় না?
— যায়। তবে আপনি এত গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করছেন কেন?
— কারণ আপনার সঙ্গে একটা সুন্দর জায়গায় যেতে ইচ্ছে করছে।
— কোথায়?
— সেটা গেলে দেখবেন।
মায়া একটু ভেবে বলল,
— আমি মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর মায়া জানাল, তার মা রাজি হয়েছেন। বিকেলে দুই পরিবারের সম্মতিতে তারা একটি সুন্দর বাগানে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিল।
বিকেল পাঁচটার দিকে মায়া তার মায়ের সঙ্গে বাগানে পৌঁছাল। শাহজাদও কিছুক্ষণ পর তার মাকে নিয়ে এল। সবাই একসঙ্গে বসে গল্প করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর রেহানা বেগম মায়ার মাকে নিয়ে বাগানের অন্য পাশে হাঁটতে গেলেন। মায়ার মা যাওয়ার আগে মেয়েকে বললেন,
— এখানেই থাকিস। আমরা একটু ঘুরে আসছি।
মায়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
শাহজাদ পাশে বসে মুচকি হেসে বলল,
— আজ আপনাকে বেশ সুন্দর লাগছে।
মায়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— প্রতিদিন কি সুন্দর লাগে না?
শাহজাদ একটু থেমে হেসে বলল,
— প্রতিদিনই লাগে। আজ শুধু কথাটা বলতে ইচ্ছে করল।
— আপনি না, একদমই বদলাবেন না।
— বদলানোর প্রয়োজন আছে?
— সেটা আমি জানি না।
শাহজাদ হেসে বলল,
— তাহলে আপনি যেমন পছন্দ করেন, তেমনই থাকার চেষ্টা করব।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— আচ্ছা, আপনি আমাকে এখানে কেন এনেছেন?
শাহজাদ চারপাশের সবুজ গাছের দিকে তাকিয়ে বলল,
— সেদিন আপনি বলেছিলেন, সবুজ জায়গায় বসলে আপনার মন ভালো হয়ে যায়। তাই ভাবলাম, আজ একটু সময় এখানে কাটাই।
মায়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
— আপনি সত্যিই আমার কথাগুলো মনে রাখেন?
— সব কথা মনে রাখা সম্ভব হয়তো নয়। কিন্তু আপনার ভালো লাগার বিষয়গুলো মনে রাখতে ইচ্ছে করে।
মায়ার ঠোঁটে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
— জানেন, আমার একটা ছোট্ট স্বপ্ন আছে।
— কী স্বপ্ন?
— একদিন এমন একটা বাড়ি হবে, যেখানে ছোট্ট একটা বাগান থাকবে। অনেক ফুল থাকবে। সকালে ঘুম থেকে উঠে গাছগুলোতে পানি দেব। বিকেলে সবাই মিলে বসে গল্প করব।
শাহজাদ মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনছিল।
— সুন্দর স্বপ্ন।
— আপনার কোনো স্বপ্ন নেই?
শাহজাদ একটু ভেবে বলল,
— আছে। এমন একটা জীবন চাই, যেখানে কাজের ব্যস্ততা থাকবে, কিন্তু পরিবারের জন্য সময়ও থাকবে। বাড়ি ফিরলে আপন মানুষগুলোর হাসিমুখ দেখতে পাব। আর পাশে এমন কেউ থাকবে, যার সঙ্গে সারাদিনের ছোট ছোট গল্প ভাগ করে নিতে পারব।
মায়া মৃদু হেসে বলল,
— আপনার স্বপ্নটাও সুন্দর।
— তাহলে দেখুন, আমাদের স্বপ্নের মধ্যে কিছুটা মিল আছে।
— শুধু বাগান থাকলেই কিন্তু হবে না। গাছের যত্নও নিতে হবে।
— সেটা শিখে নেব।
— আর ফুল শুকিয়ে গেলে নতুন ফুল লাগাতে হবে।
— আপনার কাছ থেকেই শিখব।
মায়া হেসে ফেলল। শাহজাদও তার হাসি দেখে হাসল।
কিছুক্ষণ পর শাহজাদ বলল,
— একটা কথা বলব? আপনার সঙ্গে এমন ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে কথা বলতে আমার খুব ভালো লাগে।
— আমারও। কারণ আপনার সঙ্গে কথা বললে মনে হয়, নিজের মনের কথাগুলো নির্ভয়ে বলা যায়।
শাহজাদ মৃদু গলায় বলল,
— এই বিশ্বাসটা কখনো নষ্ট করতে চাই না।
মায়া তার কথায় কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— বিশ্বাস একদিনে তৈরি হয় না। সময়ের সঙ্গে তৈরি হয়।
— জানি। তাই তো সময় নিয়ে এগোতে চাই।
সন্ধ্যার দিকে সবাই আবার একসঙ্গে হলো। ফেরার আগে শাহজাদের ছোট বোন ফোন করে জানাল, সে মায়ার সঙ্গে কথা বলতে চায়। শাহজাদ ফোনটি মায়ার হাতে দিল।
— আপু, আপনি আবার আমাদের বাড়িতে আসবেন কিন্তু! আপনার সঙ্গে অনেক গল্প করব।
মায়া হেসে বলল,
— অবশ্যই আসব। তুমি আগে তোমার পড়াশোনা শেষ করো।
— পড়াশোনা করব, কিন্তু আপনাকেও আসতে হবে!
সবাই হেসে উঠল।
বাড়ি ফেরার পথে মায়া জানালার পাশে বসে ছিল। তার মা বললেন,
— আজ ভালো সময় কাটল?
মায়া মাথা নেড়ে বলল,
— হ্যাঁ মা, খুব ভালো।
— শাহজাদ ছেলেটা তোমার কথা মন দিয়ে শোনে, তাই না?
মায়া একটু হেসে বলল,
— হ্যাঁ। আমার ছোট ছোট কথাও মনে রাখে।
মা মেয়ের মুখের হাসি দেখে আর কিছু বললেন না।
রাতে মায়া ঘরে এসে ফোন হাতে নিল। শাহজাদের মেসেজ এসেছে।
শাহজাদ: বাসায় পৌঁছেছেন?
মায়া: জি, অনেক আগেই। আপনি?
শাহজাদ: আমিও। আজ আপনার বাগানের স্বপ্নটা আমার খুব ভালো লেগেছে।
মায়া: সত্যি?
শাহজাদ: হ্যাঁ। জানেন, আজ মনে হলো আপনার স্বপ্নের গল্প শুনতে শুনতেই অনেকটা সময় পার করে দিতে পারব।
মায়া: তাহলে একদিন আমার স্বপ্নের বাগানটা আপনাকে ঘুরিয়ে দেখাব।
শাহজাদ: সেই দিনের অপেক্ষায় থাকলাম।
মায়া: এত অপেক্ষা করতে পারবেন?
শাহজাদ: আপনার সুন্দর স্বপ্নের জন্য অপেক্ষা করতে আপত্তি নেই।
মায়া ফোনটা পাশে রেখে জানালার বাইরে তাকাল। তার ছোট্ট ফুলের টবটিতে নতুন ফুলটি বাতাসে দুলছে।
তার মনে হলো, জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো হয়তো এভাবেই তৈরি হয়। একটু যত্ন, কিছু মিষ্টি কথা, একটুখানি অভিমান আর অনেকখানি বিশ্বাস দিয়ে।
অন্যদিকে শাহজাদও নিজের ঘরে বসে মায়ার কথাগুলো ভাবছিল। মেয়েটির ছোট্ট স্বপ্নগুলো তার কাছে অদ্ভুত সুন্দর মনে হচ্ছিল। সে মনে মনে ঠিক করল, মায়ার প্রতিটি স্বপ্নকে সম্মান করবে। কারণ কাউকে ভালো লাগা মানে শুধু তার হাসি পছন্দ করা নয়, তার স্বপ্নগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া।
চলবে... ❤️