### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৪২
### তোমার একটু অভিমান, আমার অনেকটা ভালোবাসা
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই মায়া ফোন হাতে নিল। গত রাতের শাহজাদের মেসেজের উত্তর দেওয়ার পর আর কোনো কথা হয়নি। সে ভেবেছিল সকালে হয়তো শাহজাদ নিজেই মেসেজ পাঠাবে। কিন্তু ফোনের স্ক্রিনে কোনো নতুন মেসেজ নেই।
মায়া কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নিজেই লিখল।
মায়া: সুপ্রভাত। ঘুম থেকে উঠেছেন?
প্রায় দশ মিনিট পর উত্তর এল।
শাহজাদ: সুপ্রভাত। জি, উঠেছি। আপনি কেমন আছেন?
মায়া: ভালো। আজ কি অফিসে যাবেন?
শাহজাদ: হ্যাঁ। আজ একটু বেশি কাজ আছে।
মায়া: আচ্ছা, তাহলে কাজ করুন।
শাহজাদ মেসেজটি পড়ে বুঝতে পারল, মায়া হয়তো আরও কিছু কথা বলতে চাইছিল। কিন্তু সে তখন অফিসের একটি জরুরি মিটিংয়ে ঢুকে গেল।
অন্যদিকে মায়া ফোনটা রেখে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার মনটা একটু খারাপ লাগছিল। সে জানে শাহজাদ ব্যস্ত থাকে, তবুও মাঝে মাঝে তার ইচ্ছে করে শাহজাদ নিজে থেকে একটু বেশি কথা বলুক।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। শাহজাদের কোনো ফোন এল না। মায়া কয়েকবার ফোনের দিকে তাকাল। শেষে নিজের ওপরই বিরক্ত হলো।
— ধুর! আমি কেন এত অপেক্ষা করছি?
ঠিক তখনই নীলা ফোন করল।
— কী রে, কী করছিস?
— কিছু না। ঘরে বসে আছি।
— তোর গলা এমন শোনাচ্ছে কেন? মন খারাপ?
মায়া একটু ইতস্তত করে বলল,
— না, তেমন কিছু না।
নীলা হেসে বলল,
— বুঝেছি। কারও ফোনের অপেক্ষা করছিস!
— নীলা!
— আচ্ছা, আর বলব না। তবে একটা কথা, মন খারাপ হলে সরাসরি বলবি। চুপ করে থাকলে কেউ বুঝবে না।
মায়া বন্ধুর কথায় হেসে ফেলল।
সন্ধ্যার দিকে শাহজাদ অফিস থেকে বের হলো। গাড়িতে বসেই মায়াকে ফোন করল।
— আসসালামু আলাইকুম।
— ওয়ালাইকুম আসসালাম।
— কী করছেন?
— বসে আছি।
— আজ আপনার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলতে পারিনি। রাগ করেছেন?
মায়া একটু গম্ভীর গলায় বলল,
— রাগ করিনি।
— আপনার এই ছোট্ট উত্তরটা শুনে কিন্তু মনে হচ্ছে রাগ করেছেন।
— আপনি তো ব্যস্ত ছিলেন। আমি আর বিরক্ত করিনি।
শাহজাদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— মায়া, একটা কথা বলি?
— বলুন।
— আমার ব্যস্ততা থাকতে পারে, কিন্তু আপনাকে অবহেলা করার ইচ্ছা কখনো নেই। আজ সত্যিই কাজের চাপ ছিল। তবে সকালে আপনাকে বলেছিলাম কাজ বেশি, তারপরও মাঝখানে একটা খবর নেওয়া উচিত ছিল।
মায়া নরম গলায় বলল,
— আমি জানি আপনি ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু মাঝে মাঝে আপনার একটা ছোট্ট মেসেজও আমার মন ভালো করে দেয়।
— তাহলে আজ থেকে চেষ্টা করব, যত ব্যস্ততাই থাকুক, অন্তত একবার আপনার খোঁজ নিতে।
— শুধু কথা দিলে হবে না।
শাহজাদ হেসে বলল,
— বুঝেছি। এবার কাজে প্রমাণ দিতে হবে।
মায়াও হেসে ফেলল।
— ঠিক আছে।
— এবার বলুন, আজ কী করেছেন?
মায়া সারাদিনের ছোট ছোট ঘটনা বলতে শুরু করল। কী রান্না হয়েছে, নীলার সঙ্গে কী কথা হয়েছে, আর জানালার পাশের ফুলের গাছটিতে নতুন পাতা এসেছে—সবকিছু।
শাহজাদ মন দিয়ে শুনছিল।
— জানেন, আপনার এই ছোট ছোট গল্পগুলো আমার ভালো লাগে।
— কেন?
— কারণ আপনার দিনের অংশ হতে পারি। আপনি কী করছেন, কী নিয়ে খুশি হচ্ছেন, কী নিয়ে মন খারাপ করছেন—এসব জানতে ইচ্ছে করে।
মায়া মৃদু হেসে বলল,
— তাহলে কাল থেকে আরও বেশি গল্প করব।
— আমি শুনতে প্রস্তুত।
পরদিন সকালে শাহজাদ সত্যিই নিজের কথা রাখল। ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই মায়াকে মেসেজ পাঠাল।
শাহজাদ: সুপ্রভাত। আজ আপনার মন ভালো তো?
মায়া: জি, আজ খুব ভালো।
শাহজাদ: আমার জন্য একটু ভালো থাকার সুযোগ আছে?
মায়া: সেটা আবার কীভাবে?
শাহজাদ: আপনার হাসির কারণ হতে পারলে আমার দিনটাও সুন্দর হয়ে যায়।
মায়া হাসতে হাসতে ফোনটা পাশে রাখল।
দুপুরে রেহানা বেগম ছেলেকে ফোন করে জানালেন, ছোট বোনের স্কুলে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। সে চায় মায়াও সেখানে উপস্থিত থাকুক।
শাহজাদ মাকে বলল,
— মা, ওদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে নিও। মায়ার সুবিধা হলে অবশ্যই আসবে।
বিকেলে রেহানা বেগম মায়ার মাকে ফোন করলেন। দুই পরিবারের সম্মতিতে অনুষ্ঠানে যাওয়ার পরিকল্পনা ঠিক হলো।
সন্ধ্যায় শাহজাদ মায়াকে খবরটা দিল।
— আপনার জন্য একটা খবর আছে।
— কী খবর?
— আমার ছোট বোনের স্কুলে অনুষ্ঠান। ও আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
— সত্যি? ও কি আমাকে মনে রেখেছে?
— আপনাকে ভুলে যাওয়ার মতো মেয়ে ও নয়। সারাক্ষণ আপনার কথা বলে।
মায়া হেসে বলল,
— তাহলে অবশ্যই যাব। ওকে বলবেন, আমি ওর জন্য শুভকামনা জানাচ্ছি।
— শুধু শুভকামনা? ও কিন্তু আপনাকে সামনে থেকে দেখতে চায়।
— আচ্ছা, দেখা হবে।
শাহজাদ একটু মজা করে বলল,
— আমার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা নেই?
মায়া সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
— আপনি তো সব সময়ই নিজের কথা মাঝখানে নিয়ে আসেন!
— কারণ আমিও তো আপনাকে দেখতে চাই।
মায়া চুপ করে গেল। তার গাল লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।
— কী হলো? কথা বলছেন না কেন?
— আপনি একটু বেশি কথা বলেন।
— আপনার সামনে এসে আরও বেশি বলব।
— দেখি, কতটা পারেন!
দুজনেই হেসে উঠল।
অনুষ্ঠানের দিন মায়া পরিবারের সঙ্গে স্কুলে পৌঁছাল। শাহজাদের ছোট বোন মঞ্চে ওঠার আগে মায়াকে দেখে ছুটে এল।
— আপু! আপনি এসেছেন!
মায়া তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলল,
— তোমার অনুষ্ঠান ভালো হোক। মন দিয়ে অংশ নেবে।
শাহজাদ পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
— আজ তো ওর চেয়ে তুমি বেশি খুশি।
ছোট বোন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— অবশ্যই! মায়া আপু এসেছে তো!
অনুষ্ঠান শুরু হলে সবাই মনোযোগ দিয়ে বসে পড়ল। শাহজাদের ছোট বোন সুন্দরভাবে নিজের পরিবেশনা শেষ করল। মায়া হাততালি দিয়ে তাকে উৎসাহ দিল।
অনুষ্ঠান শেষে ছোট বোন মায়ার কাছে এসে বলল,
— আপু, আমি কেমন করেছি?
— অসাধারণ! তোমার জন্য আমি খুব খুশি।
শাহজাদ পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
— আমার বোনকে এত প্রশংসা করলে তো ও আর মাটিতে পা রাখবে না।
মায়া হেসে বলল,
— প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য হলে প্রশংসা করতেই হয়।
শাহজাদ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তাহলে আমারও কি একটু প্রশংসা পাওয়ার সুযোগ আছে?
মায়া ভান করে ভাবতে লাগল।
— সেটা পরে বিবেচনা করব।
— এত কঠিন বিচার!
— অবশ্যই।
শাহজাদ হেসে বলল,
— ঠিক আছে, অপেক্ষায় থাকলাম।
বাড়ি ফেরার আগে ছোট বোন মায়ার হাতে একটি ছোট্ট ফুল দিল।
— আপু, আপনার জন্য।
মায়া ফুলটি হাতে নিয়ে বলল,
— অনেক সুন্দর হয়েছে। ধন্যবাদ।
শাহজাদ মুচকি হেসে বলল,
— মনে হচ্ছে আজ আমার চেয়ে ওর কাছ থেকেই বেশি উপহার পেলেন।
— উপহার তো উপহারই। ছোট-বড় দিয়ে বিচার করি না।
শাহজাদ মাথা নেড়ে বলল,
— এই কথাটাই আপনার মধ্যে আমার সবচেয়ে ভালো লাগে।
রাতে বাড়ি ফিরে মায়া ফুলটি তার পড়ার টেবিলের ওপর রেখে দিল। তারপর শাহজাদকে মেসেজ পাঠাল।
মায়া: আজকের অনুষ্ঠান খুব ভালো হয়েছে। আপনার বোনকে আমার পক্ষ থেকে আবারও অভিনন্দন জানাবেন।
শাহজাদ: জানাব। আর আপনার জন্য একটা ধন্যবাদ আছে।
মায়া: কিসের?
শাহজাদ: আজ আমাদের আনন্দের দিনে উপস্থিত থাকার জন্য।
মায়া: ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। আমারও ভালো লেগেছে।
শাহজাদ: আর একটা কথা।
মায়া: বলুন।
শাহজাদ: আজ আপনাকে দেখে মনে হচ্ছিল, আপনার হাসিটা যেন পুরো অনুষ্ঠানটাকে আরও সুন্দর করে দিয়েছে।
মায়া উত্তর দিতে একটু সময় নিল।
মায়া: আপনার প্রশংসা করার অভ্যাসটা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।
শাহজাদ: কী করব? আপনার প্রশংসা করার মতো অনেক কিছু আছে।
মায়া এবার লিখল,
মায়া: আচ্ছা, আজকের জন্য আপনাকে একটা প্রশংসা করলাম।
শাহজাদ: কী সেটা?
মায়া: আপনি আপনার বোনের খুব ভালো ভাই। ওকে অনেক যত্ন করেন।
শাহজাদ মেসেজটি পড়ে মুচকি হাসল।
শাহজাদ: আপনার কাছ থেকে প্রশংসা পেয়ে আজকের দিনটা সত্যিই সুন্দর হয়ে গেল।
মায়া ফোনটা রেখে ফুলটির দিকে তাকাল। ছোট্ট ফুলটি যেমন যত্ন পেলে সুন্দর থাকে, তেমনি মানুষের অনুভূতিও যত্ন পেলে আরও সুন্দর হয়ে ওঠে।
আর শাহজাদ মনে মনে ভাবল, মায়ার অভিমানগুলোকে বুঝতে শেখাটাও তার ভালোবাসারই একটি অংশ।
চলবে... ❤️