### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৪৩
### একটু যত্ন, একটু অভিমান ❤️
সকালের নরম রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে মায়ার ঘরে এসে পড়েছে। ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিতেই শাহজাদের একটি মেসেজ চোখে পড়ল।
শাহজাদ: সুপ্রভাত। ঘুম ভেঙেছে, নাকি এখনো স্বপ্নের দেশে আছেন?
মায়া মেসেজটি পড়ে মুচকি হাসল। তারপর উত্তর দিল—
মায়া: ঘুম ভেঙেছে। আপনি কি প্রতিদিন সকালে এমন বিরক্ত করার দায়িত্ব নিয়েছেন?
শাহজাদ: বিরক্ত করার দায়িত্ব না, আপনার সকালটা একটু সুন্দর করার চেষ্টা করছি।
মায়া: বাহ! কথার ফুলঝুরি বেশ ভালোই ফুটছে দেখছি।
শাহজাদ: ফুলঝুরি নয়, সত্যি কথা। আপনার সঙ্গে কথা না বলে সকালটা ঠিক জমে না।
মায়া উত্তর লেখার আগে কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর লিখল—
মায়া: আচ্ছা, এত কথা না বলে নাশতা করেছেন?
শাহজাদ: না। আপনার জিজ্ঞেস করার অপেক্ষায় ছিলাম।
মায়া: মিথ্যা কথা! নিজের যত্ন নিতে পারেন না কেন?
শাহজাদ: পারি। কিন্তু কেউ যখন যত্ন করে জিজ্ঞেস করে, তখন উত্তর দিতে আরও ভালো লাগে।
মায়া আর উত্তর দিল না। শুধু একটি হাসির ইমোজি পাঠিয়ে ফোনটা পাশে রাখল।
নাশতার টেবিলে বসে মায়া মাকে বলল, “মা, আজ বিকেলে নীলার সঙ্গে একটু দেখা করতে যাব।”
মা বললেন, “যেতে পারো। তবে সন্ধ্যার আগে ফিরে এসো।”
“আচ্ছা।”
খাওয়া শেষ করে মায়া নিজের ঘরে গিয়ে বই পড়তে বসল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ফোনে শাহজাদের কল এল।
“হ্যালো,” মায়া ফোন ধরতেই বলল।
“কী করছেন?”
“বই পড়ছি।”
“কোন বই?”
“একটা গল্পের বই। আপনি তো বই পড়েন না, তাই নাম বলে লাভ নেই।”
শাহজাদ হেসে বলল, “কে বলেছে পড়ি না? আপনার পছন্দের জিনিস সম্পর্কে জানতে আমার আপত্তি নেই।”
“তাহলে একদিন আপনাকে বই পড়তে দেব।”
“আপনি পাশে বসে থাকলে পড়তে রাজি আছি।”
মায়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল, “আপনি সব কথার মধ্যে এমন কিছু বলেন কেন?”
“কী বলি?”
“যা শুনলে উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না।”
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল, “তাহলে উত্তর খুঁজতে হবে না। শুধু বুঝে নেবেন, কথাগুলো আপনার জন্যই।”
মায়া চুপ করে গেল। ফোনের ওপাশে শাহজাদও কিছুক্ষণ নীরব রইল।
এরপর শাহজাদ বলল, “আজ অফিসে একটু গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। দুপুরের পর হয়তো ব্যস্ত থাকব। তাই আগে থেকেই জানিয়ে দিলাম।”
মায়া বলল, “ঠিক আছে। কাজ মন দিয়ে করবেন। তবে দুপুরে খেতে ভুলবেন না।”
“আপনি মনে করিয়ে দিলে ভুলব কীভাবে?”
“আমি সব সময় মনে করিয়ে দিতে পারব না কিন্তু।”
“তাহলে নিজেই অভ্যাস করে নেব।”
দুজনের কথোপকথন শেষ হলে মায়া আবার বইয়ের পাতায় মন দিল।
অন্যদিকে শাহজাদ অফিসে পৌঁছে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সকাল থেকে কয়েকটি মিটিং, তারপর গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রজেক্টের হিসাব নিয়ে আলোচনা। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। তবু কাজ শেষ হলো না।
মাঝে একবার ফোন হাতে নিয়ে মায়ার মেসেজ দেখল সে। মায়া লিখেছে—
মায়া: দুপুরে খেয়েছেন তো?
শাহজাদ দ্রুত উত্তর দিল—
শাহজাদ: খেয়েছি। আপনি?
মায়া: আমিও খেয়েছি। কাজ শেষ হলে জানাবেন।
শাহজাদ উত্তর দিল—
শাহজাদ: অবশ্যই। নিজের খেয়াল রাখবেন।
এরপর আবার কাজে ফিরে গেল।
বিকেলে মায়া নীলার সঙ্গে দেখা করতে গেল। দুজন একসঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করল, বইয়ের দোকানেও ঢুঁ মারল। নীলা মায়ার মুখের হাসি দেখে বলল, “কী ব্যাপার, আজকাল তোকে বেশ হাসিখুশি লাগে!”
মায়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “এমন কিছু না।”
নীলা মুচকি হেসে বলল, “আমি তো কিছু বলিনি। তুই নিজেই লজ্জা পাচ্ছিস কেন?”
“নীলা!”
“আচ্ছা, আচ্ছা! আর বলব না।”
সন্ধ্যার আগেই মায়া বাসায় ফিরে এল। কিন্তু শাহজাদের কোনো নতুন মেসেজ নেই। সে ভাবল, নিশ্চয়ই কাজে ব্যস্ত। তবু একবার ফোনের স্ক্রিন দেখে নিল।
রাত আটটার দিকে শাহজাদের কল এল।
“হ্যালো, মায়া।”
“জি, বলুন।”
“কণ্ঠটা এমন গম্ভীর কেন?”
“এমনিই।”
“আমার ওপর রাগ করেছেন?”
মায়া একটু থেমে বলল, “না। তবে আপনি কাজের কথা বলে একেবারে হারিয়ে যান।”
শাহজাদ শান্ত স্বরে বলল, “আজ সত্যিই কাজটা অনেক বেশি ছিল। কিন্তু আপনার মেসেজ দেখেছি। উত্তর দিতে দেরি হয়েছে, এজন্য দুঃখিত।”
“আমি জানি আপনি ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু একটা ছোট্ট মেসেজ দিতে তো বেশি সময় লাগে না।”
“আপনি ঠিক বলেছেন। ব্যস্ততার মধ্যেও অন্তত জানিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। চেষ্টা করব যেন এমন না হয়।”
মায়ার অভিমান একটু কমল। সে বলল, “আচ্ছা, এবার বলুন আপনার কাজ শেষ হয়েছে?”
“হ্যাঁ, প্রায় শেষ। আর একটা কথা আছে।”
“কী কথা?”
“আগামী শুক্রবার আমাদের বাসায় ছোট্ট একটা পারিবারিক আয়োজন আছে। মা বলেছেন, আপনারা সময় পেলে আসবেন। তবে কোনো চাপ নেই। আপনি আর আপনার পরিবার যেদিন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন, সেদিনই আসবেন।”
মায়া বলল, “আমি মাকে জিজ্ঞেস করে জানাব।”
“ঠিক আছে। আর আপনি আসুন বা না আসুন, আপনার সিদ্ধান্তটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”
মায়া মৃদু হেসে বলল, “আপনি মাঝে মাঝে খুব ভালো কথা বলেন।”
“মাঝে মাঝে?”
“সব সময় বললে আপনার মাথায় উঠে বসবেন।”
শাহজাদ হেসে উঠল। “আপনি চাইলে মাথায় না উঠে পাশে হাঁটতে পারি।”
মায়া এবার হেসে ফেলল। “আপনার কথা শেষ হয় না?”
“আপনার সঙ্গে কথা বললে শেষ করতে ইচ্ছে করে না।”
কথাটা শুনে মায়ার মুখে আবার লাজুক হাসি ফুটে উঠল।
কিছুক্ষণ পর শাহজাদ বলল, “আজ একটা কথা বলব?”
“বলুন।”
“আপনার সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকে ছোট ছোট বিষয়গুলোও আমার কাছে সুন্দর মনে হয়। সকালে আপনার একটা মেসেজ, আপনার রাগ করে থাকা, আবার একটু পরেই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া—সবকিছুই ভালো লাগে। তবে আমি চাই না আমার কারণে কখনো আপনার মন খারাপ হোক।”
মায়া ধীরে বলল, “আমিও চাই না আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি জমে থাকুক। কোনো কিছু খারাপ লাগলে আমরা যেন সরাসরি কথা বলি।”
“কথা দিলাম।”
“আমিও।”
ফোন রাখার আগে শাহজাদ বলল, “একটা কথা মনে রাখবেন, নিজের যত্ন নেবেন। সময়মতো খাবেন, আর বেশি রাত জাগবেন না।”
মায়া মজা করে বলল, “আপনি কি আমার অভিভাবক?”
“না। তবে আপনার ভালো থাকাটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”
মায়া আর কিছু বলল না। শুধু আস্তে করে বলল, “আপনিও নিজের যত্ন নেবেন।”
ফোন কেটে যাওয়ার পর শাহজাদ কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মায়ের ঘরে গেল।
রেহানা বেগম ছেলের মুখ দেখে বললেন, “কী রে, আজ বেশ হাসিখুশি লাগছে!”
শাহজাদ বলল, “এমনিই মা।”
“এমনিই তোকে এত হাসতে দেখি না। মায়ার সঙ্গে কথা হয়েছে?”
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল, “হয়েছে।”
মা স্নেহের সঙ্গে বললেন, “মনে রাখিস, কাউকে ভালো লাগা মানে শুধু তার সঙ্গে সুন্দর কথা বলা নয়। তার মনটাকেও বুঝতে হয়।”
“জানি মা। আমি চেষ্টা করছি।”
রেহানা বেগম ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন, “সেই চেষ্টাটাই ধরে রাখিস।”
অন্যদিকে মায়া নিজের ঘরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। ফোনে আবার একটি মেসেজ এল।
শাহজাদ: আজকের অভিমানটা কি পুরোপুরি শেষ হয়েছে?
মায়া লিখল—
মায়া: একটু বাকি আছে।
শাহজাদ: কী করলে শেষ হবে?
মায়া: কাল সকালে আগে আপনাকেই মেসেজ দিতে হবে।
শাহজাদ: শুধু কাল সকালে?
মায়া: আপাতত তাই।
শাহজাদ: তাহলে কালকের সকালটা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল।
মায়া হাসতে হাসতে ফোনটা বালিশের পাশে রাখল।
তারপর মনে মনে ভাবল, মানুষটা ধীরে ধীরে তার প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসের অংশ হয়ে যাচ্ছে। তবে সে চায়, এই সম্পর্কটা সুন্দর থাকুক—যেখানে ভালো লাগার পাশাপাশি থাকবে সম্মান, বিশ্বাস আর একে অপরকে বোঝার চেষ্টা।
আর শাহজাদও মনে মনে ঠিক করল, মায়াকে শুধু কথায় নয়, নিজের আচরণেও বুঝিয়ে দেবে—তার অনুভূতিগুলো তার কাছে কতটা মূল্যবান।
কিন্তু পরদিন সকালে শাহজাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এমন একটি খবর, যা তার পুরো দিনের পরিকল্পনা বদলে দিতে পারে...
চলবে... ❤️