ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ রাতের চন্দ্রিমা

পর্ব 1

লেখক: ঐশানি পোলিনা

#শেষ_রাতের_চন্দ্রিমা
#পর্ব_১
#ঐশানী_পোলিনা
[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ❌ ]

`প্লিজ, আমাকে মারবেন না! আমি আপনার কী ক্ষতি করেছি? কেন এখানে আটকে রেখেছেন আমাকে? আমি তো এর আগে আপনাকে কখনো দেখিনি! আপনি কে? কেনই বা আমাকে মারতে চাচ্ছেন?`

মেয়েটির এমন আকুল আকুতি শুনে অন্ধকার ঘরের কোণ থেকে হঠাৎ এক যুবক উচ্চস্বরে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো দয়া ছিল না। যুবকটি ঠান্ডা গলায় বলল, "আমি তোকে খুন করতেই এখানে এনেছি।" এই বলেই সে চকচকে একটা ছুরি হাতে নিয়ে মেয়েটির দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।

ভয়ে-আতঙ্কে মেয়েটি ডুকরে কেঁদে উঠল। যুবকের পায়ে পড়ার উপক্রম করে বলল, "দোহাই আপনার, আমাকে ছেড়ে দিন! প্লিজ, মারবেন না আমাকে!"

কিন্তু ছেলেটি তার কোনো কথাই কানে তুলল না। সে নির্মমভাবে মেয়েটির পেটে ছুরিটা বসিয়ে দিল!"বাঁচাও আমাকে!"— তীব্র এক চিৎকার করে

`বাঁচাও আমাকে!`— তীব্র এক চিৎকার করে ধড়ফড়িয়ে বিছানায় উঠে বসল সুমাইরা। তার সারা শরীর তখন ঘামে ভিজে গেছে, বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে।

উপরতলার ঘর থেকে সুমাইরার এমন বুকফাটা চিৎকারের আওয়াজ শুনে নিচতলা থেকে বাসার সবাই এক ছুটে তার রুমে চলে এলো। সুমাইরার মা সবার আগে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। মেয়ের ফ্যাকাশে মুখ দেখে ব্যাকুল হয়ে বললেন, `কী হয়েছে মা তোর? অমন চিৎকার করলি কেন?`

সুমাইরা তখনো আতঙ্কের ঘোর থেকে বের হতে পারেনি। সে মাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। এবার সুমাইরার বাবা এগিয়ে এলেন। তিনি সুমাইরার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন, "কী হয়েছে মা, আমাদের বলো। এত ভয় পাচ্ছ কেন?"

সুমাইরা কোনোমতে কান্না চেপে বলল, "একটা ছেলে... একটা অচেনা ছেলে আমাকে ছুরি দিয়ে মেরে ফেলছিল!"

মেয়ের কথা শুনে সুমাইরার বাবা মৃদু হাসলেন। তিনি বুঝতে পারলেন আসল ঘটনা। তিনি সুমাইরার কপালে হাত রেখে নরম গলায় বললেন, "আরে ধুর পাগলি! কেউ তোমাকে মারেনি। তুমি আসলে একটা খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছ। শান্ত হও, ওটা জাস্ট একটা স্বপ্ন ছিল।"

বাবার কথায় সুমাইরা আশ্বস্ত হলো। সে চারপাশের পরিচিত ঘরটার দিকে তাকাল এবং বুঝতে পারল সে নিজের বিছানাতেই নিরাপদে আছে। সে একটু বড় করে শ্বাস নিয়ে, মাথা ওপর-নিচ করে বোঝাল যে হ্যাঁ—সে আসলেই একটা ভীষণ খারাপ স্বপ্ন দেখছিল।

এই গল্পের মূল চালিকাশক্তি, অর্থাৎ আমাদের নায়িকা হলেন সুমাইরা আসিফা চৌধুরী। নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের চঞ্চল এক মেয়ে। চৌধুরী বাড়ির মেজো ছেলে হাসনাত চৌধুরী এবং তাঁর রূপবতী স্ত্রী লিপি চৌধুরীর ছোট মেয়ে সে। হাসনাত-লিপি দম্পতির ঘর আলো করে আছে তিন সন্তান। সুমাইরার মাথার ওপর বটবৃক্ষের মতো আগলে রাখে তার বড় ভাই সিহাব ইসরাক চৌধুরী এবং বড় বোন সুহানা আফিয়া চৌধুরী। তিন ভাই-বোনের খুনসুটি আর ভালোবাসায় মুখর থাকে তাদের দোতলার ঘরগুলো।

তবে চৌধুরী বাড়ির গল্প শুধু এই পাঁচজনকে নিয়ে নয়। হাসনাত চৌধুরীরা আসলে তিন ভাই আর এক বোন। তাঁরা সবাই একই সুতোয় বাঁধা।

বাড়ির বড় কর্তা হলেন হাসনাত চৌধুরীর বড় ভাই রফিক চৌধুরী। গম্ভীর কিন্তু অত্যন্ত দায়িত্ববান একজন মানুষ। তাঁর সহধর্মিণী সুফিয়া চৌধুরী যেন পুরো বাড়ির লক্ষ্মীপূজারিণী। এই বড় চাচার সংসারে রয়েছে তিন সন্তান। বড় ছেলে আহনাফ অধির চৌধুরী এবং মেজো ছেলে আসিফ রাহান চৌধুরীর যেমন রাজকীয় চালচলন, তেমনি তাঁদের ছোট বোন কিয়ারা রিদি চৌধুরী যেন এক টুকরো রোদ্দুর।

কিয়ারা আর সুমাইরা শুধু চাচাতো বোনই নয়, তারা একদম সমবয়সী। দুজন একই সাথে নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে। একই স্কুল, একই ক্লাস আর একই পড়ার টেবিল হওয়ায় তাদের বন্ধুত্বটা অন্য সবার চেয়ে আলাদা। একজনের হাঁচি হলে যেন অন্যজনের কাশি হয়—এমনই গভীর তাদের সখ্যতা।

এদিকে বাড়ির আবহকে আরও আনন্দময় করে তুলতে আছেন হাসনাত চৌধুরীর ছোট ভাই হাসেম চৌধুরী। তাঁর মিষ্টি স্বভাবের স্ত্রী রুবাইয়া চৌধুরীকে নিয়ে তাঁদের এই মিষ্টি সংসার। এই ছোট চাচার দুই সন্তান—ছেলে রিহান চৌধুরী আর মেয়ে রাইসা চৌধুরী। ছোটদের দুষ্টুমি আর হাসিতে সারাদিন বাড়িটি ম ম করে।

আর আছেন হাসনাত চৌধুরীদের একমাত্র আদরের বোন, যিনি এই বিশাল চৌধুরী পরিবারের ফুফু।

সুমাইরা যেন কিছুতেই থমকে দাঁড়াতে পারছে না। ভোররাতের সেই কাল্পনিক ছুরির আঘাত তার মনে এমন এক বাস্তব আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে যে, গত দুই ঘণ্টা ধরে সে অনবরত কেঁদেই যাচ্ছে। মা লিপি বেগম, বাবা হাসনাত চৌধুরী থেকে শুরু করে ঘরের সবাই তাকে কত বোঝাল, পরম স্নেহে বুকে টেনে নিল, কিন্তু সুমাইরার কান্না থামার কোনো লক্ষণই নেই। তার শরীরটা এখনো ভয়ে কাঁপছে।

মেয়ের এই অবস্থা দেখে উপায়ান্তর না পেয়ে একপর্যায়ে লিপি চৌধুরী ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। সিঁড়ি বেয়ে তিনি হনহন করে উঠে গেলেন তিন তলার করিডোরের একদম শেষ প্রান্তের ঘরটার দিকে। এই ঘরটা পুরো বাড়ির অন্য সব ঘর থেকে একটু আলাদা, একটু বেশিই শান্ত।

রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে লিপি চৌধুরী হালকা করে টোকা দিলেন। দ্বিতীয়বার টোকা দেওয়ার আগেই খট করে দরজাটা খুলে গেল। ভেতর থেকে এক জোড়া তীক্ষ্ণ চোখ আর গম্ভীর এক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "কী হয়েছে মেজো মা? কোনো দরকার?"

লিপি চৌধুরী কিছুটা অসহায় কণ্ঠে বললেন, "সুমাইরা একটা খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছে বাবা। সেই থেকে গত দুই ঘণ্টা ধরে ও শুধু কেঁদেই যাচ্ছে। কেউ ওকে থামাতে পারছে না। তুই একটু চল তো বাবা আমার সাথে! তুই তো জানিস, এই বাড়িতে সুমাইরা একমাত্র তোকেই যা একটু ভয় পায় আর সমীহ করে চলে। আমার মনে হয় তুই বললে ও অন্তত কান্নাটা থামাবে।"

দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটি আর কেউ নয়—সে এই চৌধুরী পরিবারের বড় ছেলে, রফিক চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র আহনাফ অধীর চৌধুরী। অল্প বয়সেই যে নিজের মেধা আর কঠোর পরিশ্রমে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের একজন হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়িক মহলে তার গম্ভীর স্বভাব আর নিখুঁত সিদ্ধান্তের জন্য সবাই তাকে একনামে চেনে। বাড়িতেও তার ব্যক্তিত্বের একটা আলাদা প্রভাব আছে।

লিপি চৌধুরীর কথা শুনে অধীরের গম্ভীর মুখে ক্ষণিকের জন্য একটু চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। সে নরম কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, "আচ্ছা ঠিক আছে, চলো।"

এই বলে অধীর তার ঘর থেকে বেরিয়ে মেজো মায়ের সাথে নিচে সুমাইরার রুমের দিকে রওনা হলো।

অধীরের সেই গাম্ভীর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অসামান্য পুরুষালী সৌন্দর্য। ৬ ফুট ১ ইঞ্চির দীর্ঘ সুঠাম গড়ন, গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা—যা তার ব্যক্তিত্বে এক রাজকীয় ভাব এনে দিয়েছে। মাথার সিল্কি চুলগুলো যখন হালকা বাতাসে কপালে আর চোখের সামনে এসে পড়ে, তখন তাকে দেখতে আরও বেশি আকর্ষণীয় লাগে। যেকোনো নারী প্রথম দর্শনেই তার প্রেমে পড়তে বাধ্য। রূপ আর গুণের এই কম্বিনেশনের কারণে বাইরের দুনিয়ায় মেয়েরা তো তার জন্য একপ্রকার পাগলপ্রায়।

বয়স ত্রিশের কোঠা পেরিয়েছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই বাড়িতে তার বিয়ের জন্য চাপ বাড়ছে। কিন্তু চৌধুরী বাড়িতে ‘অধীরের বিয়ে’ শব্দটা একরকম নিষিদ্ধ। বিয়ের কথা তুললেই সে রেগে আগুন হয়ে যায়। তার সাফ কথা—বিয়ে নিয়ে ভাবার মতো সময় এখন তার নেই, সময় হলে সে নিজেই জানাবে।

সেই গম্ভীর আর ড্যাশিং অধীর যখন মেজো মা লিপি বেগমের সাথে সুমাইরার রুমে পা রাখল, ঘরের থমথমে ভাবটা যেন আরও একটু ভারী হয়ে উঠল। কান্নারত সুমাইরা টের পেল তার চেনা সেই চাদরটার মতো ভয় আর সমীহর মিশ্রণ ঘরে প্রবেশ করেছে।

অধীর ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় সুমাইরার পাশে বসল। তার উপস্থিতিতেই ঘরের বাকি সবাই কিছুটা শান্ত হয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল।

অধীর তার স্বভাবসুলভ গম্ভীর কিন্তু ভেতরের স্নেহে ভরা গলায় সুমাইরাকে উদ্দেশ্য করে বলল, "কী হয়েছে তোর? কান্না করছিস কেন?"

তার এই একটিমাত্র প্রশ্নেই সুমাইরার কান্নার বেগটা যেন হঠাৎ থমকে গেল

অধীরের গলার গম্ভীর আওয়াজ কানে আসতেই সুমাইরা তার কান্নার কথা এক নিমেষে ভুলে গেল। এতক্ষণ যে মেয়ে বুকফাটা কান্নায় পুরো বাড়ি মাথায় তুলছিল, সে এখন একদম চুপ, যেন পাথরের মূর্তি!

আসলে সুমাইরা অধীরকে বাঘের মতো ভয় পায়, আবার ঠিক ততটাই সমীহ করে। অধীরের কথার ওপর কথা বলার সাধ্য এই বাড়ির কারও নেই, সুমাইরার তো দূর কি বাত! পরিস্থিতিটা এমন যে—সুমাইরা যদি বাইরে ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে ঘরে ফেরে, আর অধীর যদি তার দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলে, "তুই বৃষ্টিতে ভিজিসনি, তুই আগুনে ভিজেছিস!" তবে সুমাইরা এক বাক্যে সেটাই মেনে নেবে। অধীর যদি তাকে নিশ্বাস বন্ধ করে বসে থাকতে বলে, সে চুপ করে থাকবে; আর যদি বলে এখন দুষ্টুমি কর, তবেই সে দুষ্টুমি করার সাহস পাবে। সহজ কথায়, অধীর যা বলবে, সুমাইরার কাছে সেটাই শেষ কথা।

সুমাইরাকে এভাবে পুতুলের মতো চুপচাপ বসে থাকতে দেখে অধির ভ্রু কুঁচকে ফের গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে? এতক্ষণ ধরে কান্না করছিস কেন?"

অধীরের দ্বিতীয় দফার প্রশ্নে সুমাইরা এবার ভীষণ থতমত খেয়ে গেল। সে স্বপ্নের কথা বলে অধীরের সামনে আর কোনো নাটক বাড়াতে চাইল না। সে রুমে উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল, "আমার... আমার কিছু হয়নি। তোমরা সবাই প্লিজ যার যার রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।"

অধীরের উপস্থিতিতে সুমাইরা যেহেতু শান্ত হয়েছে, তাই বাকিরা আর কথা বাড়াল না। গভীর রাতে আর ঝামেলা না করে সবাই একে একে যার যার ঘরের দিকে পা বাড়াল। লিপি চৌধুরীও মেয়ের শান্ত রূপ দেখে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে নিজের ঘরে গেলেন।

সবাই চলে যাওয়ার পর অধীর বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। সুমাইরার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "তুই একা ঘুমাতে পারবি? নাকি কিয়ারার রুমে গিয়ে ঘুমাবি?"

সুমাইরা চটপট মাথা নেড়ে বলল, "না ভাইয়া, আমি একা ঘুমাতে পারব।"

অধীর আর একটি কথাও বলল না। সে তার স্বভাবসুলভ শান্ত আর গম্ভীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের তিন তলার রুমের দিকে চলে গেল। সুমাইরা এতক্ষণে একটা বড় করে শ্বাস নিল, তবে তার মনের ভেতর স্বপ্নের সেই অদ্ভুত ভয়টা আর অধীরের প্রতি সমীহ—দুটোই যেন কেমন জট পাকিয়ে রইল।

•
#চলবে.......

— `প্রিয় পাঠক, গল্পটি কেমন লাগছে আপনাদের মূল্যবান মতামত কমেন্টে আশা করছি। নতুন লেখিকা হিসেবে কোনো ভুল হলে অনুগ্রহ করে ক্ষমার চোখে দেখবেন। পরবর্তী পর্বের আপডেট পেতে পেজটি ফলো করে রাখুন এবং কমেন্ট করে আপনার আগ্রহের কথা জানান। ধন্যবাদ!`

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন