#শেষ_রাতের_চন্দ্রিমা
#পর্ব_২
#ঐশানী_পোলিনা
[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ❌ ]
স্নিগ্ধ ভোরের মিষ্টি আলো আর পাখির কলকাকলিতে ঘুম ভাঙল সুমাইরার। ঘুম জড়ানো চোখে সে কিছুক্ষণ বিছানায় বসে রইল, চারপাশের শান্ত পরিবেশটা যেন তার ঘুম ভাঙার ঘোরটা আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিল। এরপর বিছানা ছেড়ে উঠে সোজা ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল দিনের সতেজ শুরুটা করতে।
কিছুক্ষণ পর সতেজ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো সুমাইরা। এসে দাঁড়াল নিজের ড্রেসিং টেবিলের সামনে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সে। সুমাইরার রূপ যেন কোনো এক নিখুঁত শিল্পের মতো; একবার তার দিকে চোখ পড়লে আর যেন ফেরানো যায় না।
তার দুধে-আলতা গায়ের রং এতটাই উজ্জ্বল আর মোলায়েম যে, কেউ ছুঁয়ে দেখলেই মনে হবে বুঝি রক্ত ঝরে পড়বে। তার টানা চোখের মণি দুটি উজ্জ্বল হালকা নীল এবং সবুজের এক অপূর্ব মিশ্রণ। কোমর ছাড়িয়ে হাঁটুর নিচ অবধি নেমে যাওয়া তার চুলগুলো হালকা ব্রাউন রঙের ও রেশমের মতো সিল্কি। আর তার ঠোঁট দুটো যেন ঠিক সদ্য প্রস্ফুটিত লাল গোলাপের পাপড়ি। আয়নায় নিজের এই মোহময়ী রূপ দেখে সে নিজেও যেন এক মুহূর্তের জন্য ঘোরলাগা বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে রইল।
"সুমাইরা... ওরে সুমাইরা!" নিচ থেকে কিয়ারার এমন তারস্বরে চিৎকার শুনে সুমাইরার ঘোর কাটল। মুহূর্তেই তার মনে পড়ে গেল আজ যে স্কুল আছে! তাড়াহুড়ো করে সে স্কুলের ইউনিফর্ম পরে তৈরি হতে লাগল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুমাইরা ভুলেই গিয়েছিল যে সময়ের কাঁটা কতটা দ্রুত ছুটে চলেছে।
দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে সুমাইরা দেখল বাড়ির সবাই ইতিমধ্যে ডাইনিং টেবিলে উপস্থিত। সকালের নাস্তার পর্ব চলছে। সে আর দেরি না করে কিয়ারার পাশের খালি চেয়ারটা টেনে ধপাস করে বসে পড়ল।
সুমাইরা বসতেই কিয়ারা চোখ বড় বড় করে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল, "কিরে সুমু! এত দেরি হলো কেন তোর? আজকে যে স্কুলে যাওয়ার তাড়া আছে, খেয়াল আছে?"
খানিকটা লজ্জিত হেসে সুমাইরা উত্তর দিল, "সরি রে, আজকে ঘুম থেকে উঠতে একটু বেশিই দেরি হয়ে গিয়েছে।"
ওদের এই খুনসুটির মাঝেই রাহান গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলে উঠল, "তোরা দুজন এত বকবক না করে চুপচাপ খাবারটা শেষ কর তো! নাহলে স্কুলের স্যারেরা দাঁড় করাক বা না করাক, আমি তোদের এখানেই কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখব।"
রাহানের কথা শুনে কিয়ারা মুখটা বাঁকিয়ে হেসে বলল, "বাহ ভাইয়া! তুমি আমাদের কথা বলতে বারণ করছ, অথচ নিজেই তো এত বড় বড় কথা বলে যাচ্ছ!"
রাহান এবার সত্যি সত্যি একটা রাম ধমক দিয়ে বলল, "কিয়ারা! তুই কিন্তু বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করছিস। এবার একদম মার খাবি আমার হাতে!"
ছেলের রাগ দেখে সুফিয়া বেগম মাঝখান থেকে সামাল দিয়ে বললেন, "তোরা কেউ আর একটা কথাও না বলে চুপচাপ খাবারটা শেষ কর তো! নাহলে অধীর নিচে নামলে তোদের সবাইকে ধরে আচ্ছা করে পিটুনি দেবে। ও কিন্তু ব্রেকফাস্ট করতে এখনই নিচে আসছে।"
'অধীর' নামটা শোনামাত্রই টেবিলে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। যেন জাদুমন্ত্রের মতোই কাজ হলো সুফিয়া বেগমের কথায়। কিয়ারা আর রাহান আর কোনো কথা না বাড়িয়ে একদম লক্ষ্মী বাচ্চাদের মতো বাধ্য হয়ে নাস্তা খেতে লাগল।
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে রেডি হয়ে নিচে নেমে এলো অধীর। তার পরনে নেভি ব্লু কালারের চমৎকার একটি শার্ট আর ফিটিং ব্ল্যাক প্যান্ট। চোখে ডার্ক সানগ্লাস, কবজিতে চকচক করছে নামী ব্র্যান্ডের ঘড়ি, আর পায়ে ব্র্যান্ডের সু। তার পুরো অবয়ব থেকে এক ধরনের অভিজাত ব্যক্তিত্ব ঠিকরে বেরোচ্ছে।
ডাইনিং টেবিলে বসে সুমাইরা একদৃষ্টিতে অধীরের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে সে নিজেকে আর সামলাতে পারল না, বিড়বিড় করে উঠল—"বুইড়া দেখতে তো মাশাআল্লাহ বেশ হ্যান্ডসাম! কিন্তু এই খাঁড়াশ শয়তানটা এখনো বিয়েটা করে না কেন কে জানে?"
হঠাৎ করেই কিয়ারার কনুইয়ের ধাক্কায় সুমাইরার ভাবনার ঘোর কাটল। কিয়ারা ফিসফিস করে বলল, "কিরে সুমু, তোর খাওয়া শেষ হয়েছে? এবার তো চল, নাহলে আজকে আর ক্লাসে ঢুকতেই হবে না।"
সুমাইরা চটজলদি প্লেট সরিয়ে রেখে বলল, "হ্যাঁ, হ্যাঁ, চল। আমার খাওয়া শেষ।"
ওরা যখন ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দরজার দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই পিছন থেকে সুফিয়া বেগম অধীরকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, "অধীর বাবা, তুইও তো ওই রাস্তা দিয়েই অফিসে যাবি। বলছিলাম কি, ওদের দুজনকে একটু স্কুলে নামিয়ে দিয়ে যা না বাবা। আজ ড্রাইভার ছুটি নিয়েছে, আসতে পারবে না। এই রোদে ওরা একা একা যাবেই বা কী করে?"
অধীর তার হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল, "ওদেরকে তাড়াতাড়ি গাড়িতে আসতে বলো। আমার অফিসের জন্য লেট হয়ে যাচ্ছে।"
সুমাইরা আর কিয়ারা ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো। সুমাইরা একটু মিষ্টি হেসে বলল, "অধীর ভাইয়া, আমরা একদম রেডি। চলো"
ওরা তিনজন গিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। অধীর ড্রাইভিং সিটে, আর সুমাইরা ও কিয়ারা পেছনের সিটে। গাড়ি স্টার্ট হতেই সুমাইরা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে আলতো করে কিয়ারার কাঁধে ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আচ্ছা রে কিয়ারা, তোর বড় ভাইটা এত গম্ভীর কেন রে? সারাক্ষণ একদম প্যাঁচার মতো মুখটা বানিয়ে রাখে। একটু হাসলে কি উনার রূপ কমে যাবে?"
কিয়ারা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে সুমাইরার হাতটা চেপে ধরল। পেছনের লুকিং গ্লাসের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে উত্তর দিল, "সুমু, দোহাই তোর, একদম চুপ কর! ভাইয়া যদি কোনোভাবে তোর এই কথা শুনতে পায়, তাহলে কিন্তু একটা মারও মাটিতে পড়বে না। একদম জ্যান্ত কবর দিয়ে দেবে!"
কিয়ারার ভয় দেখে সুমাইরা আর কথা বাড়াল না, চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে স্কুলের সামনে থামল। ওরা দুজন নেমে যেতেই অধীর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে অফিসের দিকে গাড়ি ছুটিয়ে দিল।
স্কুলে এসে যেন দম ফেলার ফুসরত নেই। একের পর এক একটানা ক্লাস করতে করতে সুমাইরা আর কিয়ারা দুজনেই একদম ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়ল। শেষ ক্লাসের ঘণ্টা পড়তেই ওরা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। ক্ষিধায় পেট চোঁ চোঁ করছে, তাই দুজনে মিলে সোজা চলে গেল স্কুলের ক্যান্টিনে।
ক্যান্টিনের একটা ফাঁকা টেবিলে বসে ওরা কেবল খাবারের অর্ডার দেবে, ঠিক তখনই এক চেনা অবয়ব ওদের টেবিলের দিকে হেঁটে আসতে লাগল। ছেলেটি আর কেউ নয়—ওদের ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড সাগর। ওরা তিনজন একই ক্লাসে পড়ে, তাই ওদের বন্ধুত্বটাও বেশ গাঢ়।
সাগরকে দেখেই কিয়ারা চোখ রাঙিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, "কিরে শয়তান! তুই এতক্ষণ কোথায় ছিলি শুনি? সকাল থেকে ক্লাসে তোর কোনো পাত্তাই নেই!"
সাগর চেয়ার টেনে ওদের মুখোমুখি বসতে বসতে মাথা চুলকে বলল, "আরে বলিস না তোরা! আজকে সকাল সকাল ঘুম থেকেই উঠতে লেট হয়ে গিয়েছে। যখন ঘুম ভাঙল, তখন দেখি অর্ধেক ক্লাস শেষ। তাই ভাবলাম এই ক্লান্ত শরীরে আর ক্লাসে গিয়ে কী হবে, তার চেয়ে ক্যান্টিনেই আড্ডা জমাই!"
স্কুল শেষে ক্যান্টিনের আড্ডা জমিয়ে ওরা তিনজন যার যার বাড়ি ফিরে গেল। ক্লান্ত থাকায় সুমাইরা দুপুরে খেয়েই বিছানায় একটু চোখ বুজেছিল। বিকেলের দিকে যখন সে বেশ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই কিয়ারা তার ঘরে হুটোপুটি করে ঢুকে ওকে ধাক্কা দিয়ে জাগাতে লাগল, "সুমু, এই সুমু উঠ! তোর জন্য একটা ফাটাফাটি গুড নিউজ আছে!"
কাঁচা ঘুমটা ভেঙে যাওয়ায় সুমাইরা বেশ বিরক্ত হলো। সে বালিশটা টেনে মুখের ওপর চেপে ধরে কিছুটা তেজ দেখিয়ে বলল, "রাখ তোর গুড নিউজ! এত সুন্দর একটা ঘুম তুই এক নিমেষে হারাম করে দিলি কিয়ারা? এখন এখান থেকে যা তো!"
কিয়ারা সুমাইরার গা থেকে জোর করে বালিশটা কেড়ে নিয়ে বলল, "আরে জানু আমার, রাগ করছিস কেন? আগে নিউজটা তো শোন, তারপর না হয় রাগ দেখাস।"
সুমাইরা বিছানায় উঠে বসে চুলগুলো ঠিক করতে করতে আবার মুখ কুঁচকে বলল, "যা বলার তাড়াতাড়ি বলে এখান থেকে বিদায় হ দেখি, আমার এখনো ঘোর কাটেনি।"
কিয়ারা এবার রহস্যময় এক চিলতে হাসি হেসে বলল, "কাল নাকি দিহান ভাইয়া লন্ডন থেকে দেশে ফিরছে!"
দিহান ভাইয়া' নামটা শোনামাত্রই সুমাইরার চোখের সমস্ত ঘুম কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে খুশিতে বিছানা থেকে একপ্রকার লাফিয়ে উঠল এবং কিয়ারাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, "কী বলছিস তুই! সত্যি? দিহান ভাইয়া কালকেই আসছে?"
কিয়ারা এবার নকল রাগ দেখিয়ে প্যাঁচার মতো মুখ করে বলল, "বাহ রে! এতক্ষণ তোর ঘুম ভেঙেছি বলে কত কথা শুনিয়েছিস, আর এখন স্বার্থের টানে আসছিস জড়িয়ে ধরতে? হুহ, আমি তোর সাথে নেই!"
সুমাইরা হেসে কুটি কুটি হয়ে কিয়ারার দুটো নরম গাল টেনে দিয়ে আহ্লাদী সুরে বলল, "আরে সরি বেবি! রাগ করে না। তুই আমার লক্ষ্মী বোন না?"
বলে রাখা ভালো, দিহান হচ্ছে ওদের আপন ফুফাতো ভাই। পরিবারের ব্যবসায়িক একটা জরুরি কাজে এক মাসের জন্য সে লন্ডনে গিয়েছিল। দিহান যেমন বুদ্ধিমান, তেমনই পরিবারের সবার ভীষণ প্রিয়। বিশেষ করে সুমাইরা আর কিয়ারার সাথে তার সম্পর্কটা একদম বন্ধুর মতো। দিহানের আসার খবরে সুমাইরার পুরো বিকেলটাই যেন এক নিমেষে ফুরফুরে আর আনন্দে ভরে উঠল।
কিয়ারা সুমাইরার চোখের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলল, "দিহান ভাইয়া কিন্তু তোর জন্য স্পেশাল কিছু একটা নিয়ে আসবেই আসবে! যা সে প্রত্যেকবার শুধু তোর জন্যই আনে। সুমু, তুই মুখে যাই বলিস না কেন, আমি একদম হান্ড্রেড পার্সেন্ট সিওর যে দিহান ভাইয়া তোকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে।"
কিয়ারার এই হঠাৎ মন্তব্যে সুমাইরা কেমন যেন একটু থমকে গেল। সে কিছু না বলে শুধু একটা মৃদু মিষ্টি হাসি দিল, যার গভীরে লুকিয়ে রইল এক না বলা নীরবতা।
ঠিক তখনই দরজার পর্দা ঠেলে সুমাইরার রুমে ঢুকল সুহানা। ওদের দুজনকে একসাথে দেখে সে ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল, "কিরে তোদের তো আজকাল খুঁজেই পাওয়া যায় না! রুমে দরজা বন্ধ করে কী করিস তোরা দুজন?"
কিয়ারা চটপট উত্তর দিল, "আমরা তো সারাক্ষণ বাসাতেই থাকি সুহানা আপু। তুমি নিজেই তো দিন-দুনিয়া ভুলে নিখোঁজ হয়ে যাও, আমাদের আর দোষ কী!"
সুহানা হেসে ফেলে বলল, "আচ্ছা হয়েছে, আর ওকালতি করতে হবে না। চল, আজকে আমরা সবাই মিলে বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসি। অনেক দিন হলো একসাথে কোথাও যাওয়া হয় না।"
সুমাইরা বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে অলস সুরে বলল, "তোমরা যাও আপু, আমার কেন যেন আজকে বাইরে যেতে একদম ইচ্ছা করছে না।"
কিয়ারা সুমাইরার হাত ধরে টান দিয়ে বলল, "আরে তুই না গেলে আমাদের একটুও ভালো লাগবে না। চল না প্লিজ!"
সুমাইরা এবার একটু ক্লান্ত গলায় বলল, "সত্যি বলছি রে, আমার শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে। ভালো লাগছে না। তোরা ঘুরে আয়।"
সুহানা কিছুটা চিন্তিত মুখে বলল, "কিন্তু বাসায় তো এখন কেউ নেই রে সুমু। বড় মা, ছোট মা, আম্মু—তারা সবাই মিলে শপিং মলে গিয়েছে কেনাকাটা করতে। তুই একা একা থাকবি কী করে?"
সুমাইরা হেসে আশ্বস্ত করে বলল, "আরে কোনো সমস্যা নেই আপু। আমি তো আর ছোট বাচ্চা নই, একা থাকতে পারব। তোরা একদম চিন্তা না করে ঘুরে আয়।"
সুহানা আর জোর না করে বলল, "আচ্ছা ঠিক আছে, আমরা তাহলে বের হচ্ছি। কোনো প্রবলেম হলে বা শরীর বেশি খারাপ লাগলে সাথে সাথে আমাদের ফোনে জানাবি, ঠিক আছে?"
সুমাইরা মাথা নেড়ে সায় দিল। সুহানা আর কিয়ারা রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই পুরো ঘরটায় এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সুমাইরা একা ঘরে জানালার বাইরে তাকিয়ে আবার কোনো গভীর ভাবনায় ডুব দিল।
চারপাশে তখন সন্ধ্যার অন্ধকার জেঁকে বসেছে। সুমাইরা নিজের ঘরে পড়ার টেবিলে বসে বইয়ের পাতায় মন দেওয়ার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ করেই তার কান খাড়া হয়ে উঠল—নিচ তলা থেকে কেমন যেন একটা অদ্ভুত, খসখসে আওয়াজ ভেসে আসছে। আওয়াজটা পেতেই সুমাইরার বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল; তার মনে পড়ে গেল গত রাতের সেই ভয়ঙ্কর স্বপ্নটার কথা। পুরো বাড়িতে কেউ নেই, এই একাকীত্ব আর নীরবতা তার ভয়টাকে আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে দিল।
কী করবে বুঝতে না পেরে সে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বিছানার চাদরটা শক্ত করে চেপে ধরল। কিন্তু কৌতুহল আর ভয় মেশানো এক অনুভূতিতে সে আর ঘরে স্থির থাকতে পারল না। এক পা, দু পা করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে নামতে লাগল সে। চারদিকের আবছা অন্ধকারে তার নিজের হৃদপিণ্ডের ধকধক আওয়াজটাই যেন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। সিঁড়ির শেষ মাথায় এসে সে কাঁপা কাঁপা, জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করল, "কে... কে ওখানে?"
ঠিক তখনই অন্ধকারের মাঝ থেকে একটা চেনা অবয়ব সামনে এগিয়ে এলো। গম্ভীর অথচ কিছুটা ক্লান্ত গলায় সেই ব্যক্তি বলে উঠল, "আমি অধীর। তুই এখানে এই অন্ধকারে কী করছিস পিচ্চি? সুহানাদের সাথে বাইরে যাসনি?"
অধীরের চেনা কণ্ঠস্বর আর অবয়বটা দেখামাত্রই সুমাইরা যেন এক মস্ত বড় ফাঁড়া থেকে বেঁচে গেল। সে লম্বা একটা শ্বাস ফেলে বুক থেকে ভয়ের পাথরটা নামাল। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে ধীর, শান্ত কণ্ঠে বলল, "আসলে আমার শরীরটা আজ দুপুরের পর থেকেই তেমন ভালো লাগছিল না অধীর ভাইয়া, তাই ওদের সাথে যাইনি।"
অধীর তার কথা শুনল কি শুনল না, তা ঠিক বোঝা গেল না। সে কোনো উত্তর না দিয়ে সোফায় এসে বসল। কিন্তু অধীরের হাবভাব কেন যেন আজ স্বাভাবিক লাগছিল না। তার চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে এবং সে কেমন যেন একটা অস্বস্তি আর ছটফটে ভাব নিয়ে ছটফট করছে। তার এই ছটফটানি দেখে সুমাইরার মনে আবার নতুন করে ভয় দানা বাঁধতে লাগল। সে কিছুটা ইতস্তত করে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে অধীর ভাইয়া? আপনি এমন করছেন কেন? আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?"
অধীর এবারও কোনো কথা বলল না, শুধু চোখ দুটো বুজে সোফার পিঠে মাথাটা এলিয়ে দিল। তার এমন অবস্থা দেখে সুমাইরা নিজের সমস্ত জড়তা ঝেড়ে ফেলে তার দিকে এগিয়ে গেল। নিজের কাঁপা কাঁপা নরম হাতটি বাড়িয়ে সে আলতো করে অধীরের চওড়া কপালে রাখল।
হাতটা ছোঁয়াতেই সুমাইরা চমকে উঠে হাতটা সরিয়ে নিল। তীব্র উত্তাপে তার হাত যেন পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো! সে আঁতকে উঠে বলল, "একি অধীর ভাইয়া! আপনার গায়ে তো প্রচণ্ড জ্বর! গা তো একদম পুড়ে যাচ্ছে!"
গা পুড়ে যাওয়া জ্বরে অধীরকে এভাবে ছটফট করতে দেখে সুমাইরা এক মুহূর্তের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। পুরো বাড়িতে কেউ নেই, এই অবস্থায় তাকেই কিছু একটা করতে হবে। সে আর দ্বিধা না করে অধীরের একটা শক্ত, চওড়া হাত নিজের কাঁধের ওপর টেনে নিল। কিন্তু অধীরের মতো বিশাল দেহী, হাতির মতো ওজনের এক বলিষ্ঠ পুরুষকে টেনে তোলা এই ছিপছিপে গড়নের সুমাইরার পক্ষে প্রায় অসম্ভব এক যুদ্ধ! প্রথম ধাক্কাতেই সে টাল সামলাতে পারল না। তবুও সুমাইরা দমে গেল না; নিজের ভেতরের সমস্ত শক্তি এক করে, ভীষণ কষ্ট আর ধস্তাধস্তি করে সে অধীরকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে তার ঘরে নিয়ে আসতে সক্ষম হলো।
নিজের রুমে এনে সুমাইরা অত্যন্ত সাবধানে অধীরকে বিছানার ওপর বসাল। তারপর নিচু হয়ে তার পা থেকে ব্র্যান্ডের জুতো জোড়া খুলে একপাশে রাখল এবং তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। অধীর বিছানায় পিঠ ঠেকানো মাত্রই ক্লান্তিতে চোখ বুজে ফেলল।
অধীরের কপালে জলপট্টি দেওয়া দরকার, তাই সুমাইরা নিচ থেকে এক বাটি পানি আর সুতি কাপড় আনার জন্য যেই না ঘুরে দাঁড়াতে যাবে—ঠিক তখনই এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটল! তপ্ত আগুনের মতো গরম এক জোড়া হাত বাড়িয়ে অধীর খপ করে সুমাইয়ার নরম হাতটা চেপে ধরল। জ্বরের ঘোরে সে অবচেতন মনে মাথা নাড়ছে আর ঠোঁট কামড়ে কী যেন বিড়বিড় করছে।
অধীর ঠিক কী বলতে চাইছে তা বুঝতে না পেরে সুমাইরা কিছুটা ঝুঁকে তার মুখের একদম কাছে নিজের কানটি নিয়ে গেল। তখনই অধীরের তপ্ত নিঃশ্বাস সুমাইরার গালে এসে আছড়ে পড়ল। অত্যন্ত অস্পষ্ট, ভাঙা এবং মায়াবী স্বরে অধীর বলে উঠল, "তুই... তুই কবে বড় হবি, হানি? তুই বড় হতে হতে তো আমি সত্যিই বুড়ো হয়ে যাব..."
অধীরের মুখ থেকে নিজের ডাকনাম 'হানি' এবং এই কথা শুনে সুমাইরার বুকের ভেতরটা যেন ওলটপালট হয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে রইল। অধীর থামল না, জ্বরের ঘোরেই আরও গভীর এক আকুতি ঝরে পড়ল তার কণ্ঠে, "তুই কেন আমাকে ভালোবাসিস না, হানি? ওই দিহানের মধ্যে এমন কী পেয়েছিস তুই... যা আমার মধ্যে নেই? যাক, কোনো সমস্যা নেই... আমি একদিন তোকে ঠিকই নিজের করে নেব। তুই শুধু আমার..."
কথাগুলো শেষ করেই অধীর সুমাইরার হাতটা আরও শক্ত করে নিজের বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। আর সুমাইরা পাথরের মতো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যে অধীরকে সে সবসময় কড়া মেজাজের, গম্ভীর এক 'বুইড়া' ভেবে এসেছে, তার মনের গভীরে যে সুমাইরার জন্য এতটা তীব্র, এতখানি অধিকারবোধ আর ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল—তা সুমাইরা কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। দিহানকে নিয়ে অধীরের এই ঈর্ষা এবং তাকে নিজের করে পাওয়ার এই আকুলতা সুমাইরার চেনা দুনিয়াটাকে এক মুহূর্তে বদলে দিল।
অধীরের অস্পষ্ট কথাগুলো সুমাইরার কান অবধি পৌঁছালেও, জ্বরের ঘোরের বিড়বিড়ানি ভেবে সে সেদিকে আর তেমন মনোযোগ দিল না। প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত মানুষটাকে সুস্থ করাই তখন তার একমাত্র লক্ষ্য। সে কোনোমতে অধীরের শক্ত মুঠো থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে গেল। পানি আর কাপড়ের বাটি নিয়ে এসে সে একটানা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে অধীরের মাথায় জলপট্টি দিয়ে যেতে লাগল। এর মাঝেই সে ফোনের মাধ্যমে বাড়ির বড়দের জানিয়ে দিল যে অধীরের খুব চড়া জ্বর এসেছে।
সময় গড়ানোর সাথে সাথে চারপাশের পরিবেশ আরও গম্ভীর হতে শুরু করল। চারিদিকের শুনশান নীরবতা ভেদ করে রাত এখন ভীষণ গভীর। নিশ্ছিদ্র কালো অন্ধকারে ঘেরা বাইরের পৃথিবীটা থেকে অনেক দূরে দু-একটা কুকুরের কান্নার মতো ডাক ভেসে আসছে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা থাকায় কোথাও একবিন্দু আলোর দেখাও মিলছে না। পুরো পরিবেশটা কেমন যেন এক ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। বাড়ির বাকি সবাই ততক্ষণে ফিরে এসে যার যার ঘরে গভীর নিদ্রায় মগ্ন।
ঠিক এমন এক গা ছমছমে আবহে নিজের অন্ধকার ঘর থেকে হঠাৎ সুমাইরা বেরিয়ে এলো। চারপাশের নিস্তব্ধতায় তার নিজের বুকের ধড়ফড়ানি যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেল। ভয়ার্ত চোখে চারপাশে চকিত দৃষ্টি বুলিয়ে সে এক মুহূর্তও দেরি না করে সোজা করিডোরের শেষ মাথার একটি রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
ভয়ে সুমাইরার বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপছিল। সেই রুমের দরজাটা পুরোপুরি লক করা ছিল না, হালকা ভেজানো ছিল। সে আর তর সইলো না, ভয়ের চোটে হুড়মুড় করে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। ভেতরে ঢুকে একটু হাঁপ ছেড়ে সে যখন ঘরের চারপাশে সচেতন দৃষ্টিতে তাকাল, তখনই তার চোখ গিয়ে আটকাল বিছানার ওপর।
সেখানে কেবল একটা ট্রাউজার পরা অবস্থায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে এক বলিষ্ঠ যুবক। চাঁদের আবছা আলো জানালা দিয়ে এসে পড়েছে তার পিঠের ওপর। সেই চেনা অথচ এই রাতের অন্ধকারে অচেনা লাগা অবয়বটির দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই সুমাইরার চলার গতি আর চোখের দৃষ্টি যেন এক জায়গায় থমকে গেল।
সুমাইরা বেশ অনেকটা সময় মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা সেই অবয়বটির দিকে। ঘুমের ঘোরে কী নিষ্পাপ আর মায়ায় ভরা দেখাচ্ছে তার মুখখানি! এই দৃশ্য দেখে কে বলবে যে এই ছেলেটাই সারাক্ষণ একটা গম্ভীর ভাব নিয়ে থাকে আর সবাইকে সারাদিন শাসনে রাখে? সুমাইরা অত্যন্ত সাবধানে, যেন তার পায়ের পাতার আওয়াজটুকুও না হয়, সেভাবে এগিয়ে গেল বিছানার পাশে। তারপর তার আলতো নরম হাতটি অধীরের চওড়া কপালে রাখল।
কপালে হাত দিতেই সুমাইরা স্বস্তির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যাক, জ্বরটা এখন অনেকটাই ছেড়ে এসেছে, গা আর আগের মতো আগুনের মতো পুড়ছে না। আসলে অধীরের হঠাৎ অমন চড়া জ্বর আসায় সুমাইরা মনে মনে ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। দুশ্চিন্তায় নিজের ঘরে বিছানায় শুয়েও সে কিছুতেই চোখ দুটো এক করতে পারছিল না। মনের ভেতর ছটফটানি বাড়ছিল বলেই সে এই মাঝরাতে অধীরের ঘরে ছুটে এসেছিল জ্বর কমেছে কিনা তা নিজের চোখে দেখতে।
জ্বর কমেছে নিশ্চিত হয়ে সুমাইরা যখনই অধীরের রুম ত্যাগ করে নিজের রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়াতে যাবে—ঠিক তখনই ঘটল সেই কাণ্ড! অন্ধকারের বুক চিরে একটা শক্ত, বলিষ্ঠ হাত খপ করে সুমাইরার কবজি চেপে ধরল। আকস্মিক এই ঘটনায় সুমাইরা চমকে উঠতেই অধীর চোখ না খুলেই আধো-ঘুমন্ত, অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠল, "তুই এত রাতে এখানে কী করিস, হানি?"
অধীরের এমন অতর্কিত প্রশ্নে সুমাইরার কলিজা যেন মুখের কাছে চলে এলো। ভয়ে আর অপমানে তার হাত-পা কাঁপতে লাগল। এই মাঝরাতে একটা ছেলের ঘরে ধরা পড়ে যাওয়ার যে লজ্জা, তাকে গ্রাস করে নিল। সে নিজের কাঁপতে থাকা হাতটা ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে অত্যন্ত কম্পিত স্বরে বলল, "আ... আসলে, আপনার জ্বরটা কমেছে কিনা... জাস্ট সেটাই দেখতে এসেছিলাম।"
অধীর সুমাইরার হাতটা ঝটকা দিয়ে ছেড়ে দিয়ে চরম রাগী আর কর্কশ গলায় বলল, "একটা যুবতী মেয়ে হয়ে এই গভীর রাতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ঘরে আসতে তোর একটুও ভয় করল না? যদি এখানে উল্টোপাল্টা কিছু হয়ে যেত, তখন তো সবাই দোষের সবটুকু দায় আমার ওপরই চাপিয়ে দিত! এখুনি বেরিয়ে যা আমার রুম থেকে। আর কখনো যেন তোকে ভুল করেও আমার ঘরের আশেপাশে না দেখি!"
সুমাইরা এই অপমানে একদম নিশ্চুপ হয়ে, অপরাধীর মতো মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটো কান্নায় ভরে এলো। তাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অধীর আবারও তর্জন-গর্জন করে ধমকের সুরে বলে উঠল, "কিরে! কথা কি তোর কানে যায় না? গেট লস্ট ফ্রম হেয়ার!"
অধীরের সেই বাঘের মতো গর্জন আর ধমক শুনে সুমাইরার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে সময় নষ্ট করার সাহস পেল না; চোখের পানি মুছতে মুছতে একপ্রকার ছুটেই বেরিয়ে গেল অধীরের রুম থেকে।
নিজের রুমে ঢুকেই সুমাইরা ধড়ফড় করে দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল। অপমানে এবং ভয়ে তার হাত-পা এখনো থরথর করে কাঁপছে। বিছানায় ধপাস করে বসে সে রাগে-ক্ষোভে বিড়বিড় করে বলে উঠল, "এই জন্যই বলে, কারো কখনো ভালো করতে নেই! স্বার্থপর, অকৃতজ্ঞ লোক একটা! সারা সন্ধ্যা অত বড় হাতির মতো ওজনের শরীরটাকে টেনে তুললাম, এক ঘণ্টা ধরে মাথায় জলপট্টি দিয়ে সেবা করলাম—আর এখন একটু সুস্থ হতেই আমাকেই এভাবে বকে দিল? খবিশ লোক একটা!"
সে নিজের বালিশটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে আরও বলল, "আমার বয়েই গেছে আপনার রুমে যেতে! এরপর থেকে আপনি যদি অসুস্থ হয়ে মরেও যান, তবুও ওমুখো আমি আর জীবনেও হব না, হুহ!" বলে অন্ধকারের মাঝেই অধীরের রুমের দিকে উদ্দেশ্য করে একটা মস্ত বড় মুখ ভেংচি কাটল সুমাইরা। রাগ আর অভিমানে চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লেও, সুমাইরার মন জুড়ে তখন কেবলই সেই নিষ্ঠুর 'বুইড়া'র প্রতি তীব্র ক্ষোভ।
"এখন এইসব খবিশ লোকের কথা ভেবে ভেবে নিজের রাতের ঘুম হারাম করার কোনো মানেই হয় না। অনেক রাত হলো, এবার ঘুমোতে হবে। কাল সকালে আবার সময়মতো স্কুলে যেতে হবে।"—মনে মনে নিজেকে এই প্রবোধ দিয়ে সুমাইরা চাদরটা গায়ে টেনে শুয়ে পড়ল।
পরদিন সকাল ঠিক আটটা...।
"এই সুমু! ওরে সুমুর বাচ্চা, উঠবি নাকি আজ আর সূর্য উঠবে না? আটটা বেজে গেছে! আর কত ঘুমোবি শুনি? আমাদের স্কুলে যেতে হবে না?"—কিয়ারা সুমাইরার গায়ের কাঁথাটা এক ঝটকায় টেনে ধরে চেঁচাতে লাগল।
সুমাইরা চোখ দুটো টেনেটুনে খোলার চেষ্টা করে, শরীরটা আড়মোড়া দিয়ে মোচড়াতে মোচড়াতে আধো-ঘুমন্ত গলায় বলল, "আহা রে কিয়ারা, আর একটুখানি ঘুমোতে দে না প্লিজ! ভোরে উঠে ফজরের নামাজ পড়েছি, তারপর এই কেবল চোখটা লেগে এলো। রাতেও তো ঘুমাতে বড্ড লেট হয়ে গিয়েছিল।"
কিয়ারা এবার কোমরে হাত দিয়ে আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠে বলল, "তোর ওই লেট হওয়ার গল্প তুই নিজের কাছে রাখ! তুই তাহলে পড়ে পড়ে ঘুমা, আমি একাই স্কুলে চললাম। পরে আবার স্যারদের কানপড়া খেতে পারব না।"
'একা স্কুলে যাওয়া'র কথা শুনে সুমাইরার চোখের সমস্ত ঘুম এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। সে বিছানার ওপর ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে বলল, "এই না না! দোহাই তোর, আমাকে একা রেখে একদম যাবি না। আমি এই এখনই উঠছি, জাস্ট পাঁচটা মিনিট সময় দে আমাকে!"
সুমাইরার এমন ছটফটানি দেখে কিয়ারা মুখে হাত দিয়ে হেসেই কূল পাচ্ছিল না ।
•
#চলবে.......