#নিষিদ্ধ_প্রণয় (সিজন ২)
#পর্বঃ১৩
#কলমে_সোনালিকা_আইজা
সময়টা প্রায় মধ্যরাত। নিকষ কালো অন্ধকারে ঘাপটি মেরে ঝিঝি পোকা ডেকে চলেছে। মাঝে মাঝে দূর থেকে বেওয়ারিশ কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। দূরের কোনো ঝোপঝাড়ে বুনো শেয়ালও তাল মিলিয়ে সুর ধরেছে। শুনশান নীরবতা ছিন্ন করে রাতের পাখিও হালকা সুরে ডাকছে। গ্রাম গঞ্জে এগুলো নিত্যদিনের ছবি। হুট করে শহর থেকে আগত কেউ মাঝরাতে বাইরে বের হলে পাক্কা ভয়ে জ্ঞান হারাবে। এই যেমন তুবা ভয়ে মৃদুমন্দ কাঁপছে। দোতলা থেকে নেমে বড়ো উঠোনটাও যেনো পার হতে পারছে না। কৌশিকের একটা বাহু শক্ত করে জাপ্টে ধরে আছে। কৌশিক যেনো বুঝে গেলো। চলতে চলতে কদম থামিয়ে দিলো। আচমকা চলন্ত কদম থামিয়ে দেয়ায় হকচকিয়ে গেলো তুবা। মাথা তুলে কৌশিকের দিকে তাকালো। মুহুর্তেই কোনো ভাবনা চিন্তা ছাড়াই এক হাতে তুবাকে জড়িয়ে ধরলো কৌশিক। শান্ত চোখে তাকালো তুবার ভয়ার্ত মুখে। মৃদু হেঁসে বললো,
"ভয় নেই জান। আমি আছি তো।"
তুবা ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো। কৌশিকের বলা এই দু'টো বাক্য তুবার বুকে সাহসের পাহাড় গড়ে তুললো। সত্যিই তো। তুবার কিসের ভয়। তার কৌশিক ভাই পাশে থাকতে তাকে কেউ ছুঁতে পারবে নাকি? কৌশিক কি তার হাত দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে দেবে না? একবুক সাহস নিয়ে তুবা কদম মেলালো কৌশিকের সাথে। সোজা রান্নাঘরে এসে হাতের বাঁধন আলগা করলো কৌশিক। তুবাকে ছেড়ে দিয়ে রান্নাঘরের লাইট জ্বালালো। এরপর সুক্ষ্ম নজরে খোঁজাখুঁজি করে দেখলো খাওয়ার কি আছে।
আপাতত রান্না করা কোনো খাবার নেই। কনকচাঁপা বেগমের পুরনো অভ্যাস, খাওয়া শেষে অবশিষ্ট খাবার আশেপাশের অভাবি মানুষদের দিয়ে দেন। আজও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। কৌশিক ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ ভাবলো। ভাবতে ভাবতে তুবার দিকে তাকালো। তুবা বেশ আগ্রহ নিয়ে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই আগ্রহ ভরা চোখ দুটো দেখে কৌশিকের বুক চিরে এক দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে এলো। এখন তাকে ঝটপট কিছু রান্না করতে হবে। তার পাশে দাঁড়ানো বলদ তো রান্না করতে পারে না। শুধু খেতে পারে। কি করা যায় ভাবতে ভাবতে কৌশিক বয়াম হাতড়ে পাউরুটির প্যাকেট বের করলো। বয়ামে এক প্যাকেট নুডলসও ছিলো। কৌশিকের মুখে এই পর্যায়ে হাসি ফুটে উঠলো। ঘাড় ঘুরিয়ে তুবার দিকে তাকালো। দুষ্টুমির ছলে বলল,
"কি খাবি বল? বাংলার বার্গার? বিদেশি নুডলস? নাকি এই হ্যান্ডসাম, ড্যাশিং ছেলে। তুই যেটা চাস সেটাই পাবি।"
কথাগুলো বলেই কিটকিটিয়ে হাসালো কৌশিক। তুবা লজ্জায় নজর সরিয়ে নিলো। এই মাঝরাতে এমন লাগাম ছাড়া কথার কোনো মানে আছে? হাসফাস করে উঠলো তুবা। নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে মিনমিন করে বলল,
"আপাতত পেটে কিছু একটা চালান করা ফরজ। হ্যান্ডসাম ছেলেটার বিষয়ে না হয় পরে ভাববো।"
"ইন্টারেস্টিং কিছু মিস করলি।"
এক রহস্যজনক হাসি দিয়ে বাক্যটা আওড়াল কৌশিক। এরপর সোজা হয়ে দাঁড়ালো। সিলিন্ডারে চাবি লাগিয়ে গ্যাসের চুলা অন করলো। আগুন জ্বলতেই সবার প্রথম দুইটা ডিম ভাজলো। এরপর চুলায় নুডলসের জন্য গরম পানি বসিয়ে ফ্রিজ থেকে টমেটো আর শশা নিয়ে কাটতে লাগলো। কাঁটার ফাঁকে ফাঁকে নুডলস রান্নার কার্যক্রম অব্যাহত রাখলো। তুবা উঁকি দিয়ে দেখলো একবার। সালাদ কাটা শেষ হতেই কৌশিক পাউরুটির একটা টুকরো নিয়ে তার ওপর টমেটোর স্লাইড দিলো। এরপর শশা দিলো। তার ওপর ডিম ভাজা দিলো। ডিমের ওপর খানিকটা সস ছড়িয়ে দিয়ে আরও একটা পাউরুটির টুকরো দিয়ে চেপে ধরলো। একটা বার্গার রেডি। এরপর একই পদ্ধতিতে দ্বিতীয় বার্গারও বানালো। ততক্ষণে নুডলস রান্না হয়ে গেছে। একটা হাফ প্লেটে নুডলস ঢেলে গ্যাস অফ করে দিলো। এরপর বার্গার এবং নুডলসের প্লেট দুটো তুবার দিকে এগিয়ে দিলো কৌশিক।
তুবা এগিয়ে এলো। খাবার না ছুঁয়ে কৌশিকের ডান হাতটা খপ করে ধরে টেনে সামনে আনলো। হাতের উল্টো পিঠ নেড়ে চেড়ে দেখলো। এখনও চামড়া লালচে হয়ে আছে। তুবা আলতো করে সেখানে হাত ছোঁয়াল। নিচু স্বরে বললো,
"খুব ব্যথা করছে তাই না? আপনি এমন পাগলামি কেনো করেন?"
কৌশিকের হাসি খুশি মুখে হুট করেই আমাবস্যার আধার নামলো যেনো। চোখে মুখে আবারও উদাসীনতা ছড়িয়ে পড়লো। উদাস কন্ঠে বললো,
"আমার এসব আঘাতে ব্যথা লাগে না তুবা। ব্যথা কখন লাগে জানিস? যখন তোর আশেপাশে অন্য ছেলেদের দেখি, তখন। বুকটা জ্বলে যায়। হৃদপিণ্ড কামড়ে ধরে। অসহ্য ব্যথায় তখন দম আটকে আসে। সবচেয়ে বেশি কষ্ট আমি তখন পাই।"
"আপনি কি জেলাস?"
"তোর কি মনে হয়?"
"মনে হয় আপনি সিফাত ভাইয়াকে হিংসে করেন।"
তুবার কথা শেষ হতেই আচমকা তুবাকে একটানে কাছে নিয়ে এলো কৌশিক। এক হাতে তুবার চিকন কোমর পেচিয়ে ধরে অন্য হাতে তুবার গাল চেপে ধরলো। হিংস্র কন্ঠে গর্জে উঠলো,
"একদম সিফাতের নাম নিবি না। এই মুখে কৌশিক ছাড়া অন্য ছেলেদের নাম নেয়া নিষিদ্ধ। আর আমার নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করলে তুই কঠিন শাস্তি পাবি তুবা।"
কৌশিকের শক্ত কন্ঠে গর্জন শুনে বুকটা কেঁপে উঠলো তুবার। এদিকে রাগের বেশ গালটাও বেশ শক্ত করেই চেপে ধরেছে কৌশিক। তুবার মনে হচ্ছে চাপ খেয়ে দাঁতগুলো সব একটা একটা করে খুলে মুখের ভেতর জমা হচ্ছে। কৌশিকের হঠাৎ রাগ থেকে বাঁচতে তুবা হুট করেই জড়িয়ে ধরলো কৌশিককে। একদম শক্ত করে দৃঢ় ভাবে। কৌশিকের বুকের সাথে মাথা রাখতেই তুবার কানে ভেসে এলো প্রচন্ড শব্দে হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি। বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটাচ্ছে কৌশিকের। তুবা বুঝতে পারলো এই মুহুর্তে কৌশিক ভালো নেই। সিফাতকে নিয়ে মনে মনে নিজের সাথেই দন্দে ভুগছে। তুবা আর ঘাটলো না। মাথাটা সামান্য তুলে কৌশিকের বুকে থুতনি ঠেকালো। রাজ্যের সমস্ত সরলতা মুখে ঢেলে মৃদু কন্ঠে বললো,
"স্যরি! আর আপনার অবাধ্য হবো না। একদম ওই হ্যাবলাকান্তর সাথে কথা বলবো না। প্লিজ রাগ করে থাকবেন না।"
তুবার ইনোসেন্ট চেহারা দেখে কৌশিকের মন গলে গেলো। চোখ দুটো বন্ধ করে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। ডান হাতের দুই আঙ্গুলে নিজের চোখ চেপে ধরলো। এই মেয়েটার ওপর কৌশিক এমনিতেও বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারে না। তার ওপর এমন ইনোসেন্ট লুক দিলে কেমন লাগে? শরীরে কি কাঁপুনি ধরে না? গভীর ভাবে ছুঁতে মন চায় না? বলদটা তো আর সেদিকে পা বাড়াবে না। কৌশিক দুই আঙ্গুলে চোখ ডলতে ডলতে বলল,
"তুবা ছাড় আমাকে। আমি কন্ট্রোল হারাচ্ছি।"
সঙ্গে সঙ্গে সরে দাঁড়ালো তুবা। পেছন ফিরে একদফা মুখ ভেঙচালো। বিড়বিড় করে বলল,
"পেট পাতলা কন্ট্রোল একটা। যখন তখন পেটখারাপ হয়।"
বিড়বিড় করে খাবারের প্লেট টেনে নিলো। নিচে একটা মাদুর পেতে সেখানে বসলো তুবা। হাতের ইশারায় কৌশিককে বসতে বললো। কৌশিক বিনা বাক্য ব্যায় করে চুপচাপ তুবার মুখোমুখি হয়ে বসলো। তুবা চামচে করে নুডলস তুলে কৌশিকের দিকে এগিয়ে ধরলো। আদেশ সুরে বললো,
"হা করুন। রাতে আপনিও খাবার প্লেটে রেখেই উঠে গেছিলেন। আমি দেখেছি। এখন আমার সাথে আপনিও খাবেন।"
তুবার শাসন বাণী শুনে কৌশিকের বুকের ভেতর এক মুঠো শীতল হাওয়া বয়ে গেলো। ওর প্রতি তুবার এতো খেয়াল কৌশিকের মনটা ঠান্ডা করে দিলো। কোনো দ্বিধা দন্দ ছাড়াই তুবার সামনে আত্নসমর্পণ করলো। খাবারটা দুজনে মিলে ভাগাভাগি করে খেলো। এতে পেট না ভরলেও মন প্রাণ দুটোই ভরে গেছে।
খাওয়া শেষে তুবাকে ঘরের দড়জা পর্যন্ত এগিয়ে দিলো কৌশিক। ইতিমধ্যে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। রাতটাও খুব গভীর। কৌশিক পকেট থেকে ফোন বের করে সময় দেখে নিলো। রাত প্রায় দুইটা ছুঁই ছুঁই। কৌশিক সতর্ক চোখে একবার চারিদিকে নজর বুলালো। ধীর কন্ঠে বললো,
"ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়। বাইরে বের হওয়ার প্রয়োজন হলে আমাকে ফোন করবি। কেমন?"
তুবা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা দোলালো। ঘরে যাওয়ার জন্য উল্টো ঘুরে পা বাড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে কৌশিক আবারও ডেকে উঠলো,
"তুবা।"
তুবার চলন্ত পা থেমে গেলো। ভ্রু কুঁচকে পেছনে ঘুরলো। সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের গতিতে কৌশিক এগিয়ে এলো। তুবা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুম করে ঠোঁটে শক্ত করে চুমু খেলো। চুমুর স্থায়িত্ব ছিলো কয়েক সেকেন্ড। সঙ্গে সঙ্গে কৌশিক সরে দাঁড়ালো। সামান্য ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,
"আমার পেট খালি ছিলো জান। এবার পেট ভরেছে। যা ঘরে যা।"
বলেই কয়েক কদম পিছিয়ে গেলো কৌশিক। কিন্তু সেখান থেকে একচুলও নড়লো না। বারান্দাতেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। অথাৎ তুবা ঘরে না যাওয়া পর্যন্ত সে এখান থেকে যাবে না। তুবা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে দৌড়ে ঘরে ঢুকে ঠাস করে দড়জা আটকে দিলো। এই পর্যায়ে কৌশিক যেনো স্বস্তি পেলো। একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো।
-
-
সাত সকালে ঘটলো আরেক বিপত্তি। বাড়িতে হুট করেই হাজির হয়েছে অপরিচিত চারজন মানুষ। এদের মধ্যে দুজন মহিলা আর দুজন পুরুষ। তবে চিন্তার মূল কারণ হলো, তারা নিছক কোনো মেহমান নন। তারা এসেছে মেয়ে দেখতে। এই কথা শোনা মাত্রই বাড়ির তিন মেয়ের গলা শুকিয়ে গেলো। বাড়ির উঠোনে বসানো হয়েছে মেহমান দের। তাদের সাথে টুকটাক আলাপ ও খোশগল্প করছেন বাড়ির তিন কর্তা। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে এই ভয়ানক দৃশ্য পর্যবেক্ষন করে চলেছে তিন বোন।
ঠিক সেই মুহুর্তে ঘুমঘুম চোখে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো কৌশিক। রাতে দেরিতে ঘুমানোর ফলে চোখে মুখে ঘুমের রেশ এখনও রয়েছে। গলায় তোয়ালে ঝুলিয়ে হাতে ব্রাশ নিয়ে বের হয়েছে। এমন সময় বাড়ির তিন আদরের দুলালিকে বারান্দায় সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে গেলো কৌশিকের। হাই তুলতে তুলতে পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো ওদের কাছে। তিন বোনের নজর অনুসরণ করে কৌশিকও দোতলা থেকে নিচে তাকালো। নিচে বাপ চাচাদের সাথে আরও অপরিচিত চারজন লোককে দেখে কৌশিকের কোঁচকানো ভ্রুদ্বয় দ্বিগুণ কুঁচকে গেলো। কন্ঠে কৌতুহল,
"এরা কারা? সকাল সকাল এই বাড়িতে কি করছে? চেহারা কোনো আত্মীয়র সাথেও তো মেলে না।"
প্রশ্ন করেই উত্তরের আশায় দুই বোন ও এক বৌয়ের দিকে চাইলো কৌশিক। কিন্তু হায়! তার বোন আর বউতো ভুত দেখার মতো চমকে আছে। সময় নিয়ে জবাব দিলো রিয়া। ভিতু কন্ঠে বললো,
"ভাইয়া! এরা কোনো আত্মীয় নয়। ওইযে পাঞ্জাবি পড়া বয়স্ক লোককে দেখছো না? উনি ঘটক। মেয়ে দেখাতে পাত্রপক্ষ নিয়ে হাজির হয়েছে।"
রিয়ার জবাব শুনে বিরক্তি নিয়ে তাকালো কৌশিক। এই ঘটক ফটক তার একটুও পছন্দ নয়। অবিবাহিত মেয়েদের জন্য ঘটক হলো একটা আতঙ্ক। আর গোপনে বিয়ে করা ছেলেদের জন্য ঘটক হলো একটা প্যারা।
এরই মাঝে সকলের আতঙ্ক বাড়িয়ে দিতে তাওহীদ সাহেব গলা ছেড়ে ডাকলেন,
"তুবা! আম্মু! একটু নিচে আসো তো।"
ব্যাস! এই ডাক টুকুই যথেষ্ট ছিলো পরিস্থিতি ঘেঁটে দিতে। তাওহীদ সাহেবের ডাক শুনে বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠলো কৌশিকের। দুই কানে সজোরে বজ্রপাত ঘটলো। শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করলো। দাঁতে দাঁত চেপে তাকালো তুবার দিকে। ওর অবস্থা আরও কাহিল। বেচারি কেমন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ঠকঠকিয়ে কাঁপছে। যে কোনো মুহুর্তে জ্ঞান হারাবে যেনো। আতঙ্কিত চোখে ঘাড় ঘোরাতেই কৌশিকের লাল হয়ে যাওয়া চোখের সাথে চোখ মিলল তুবার। কৌশিক শান্ত অথচ গা হিম করা কন্ঠে বললো,
"এখান থেকে এক পাও নড়বি না তুবা। যদি ভুল করেও নিচে যাস, আই সোয়্যার। সবকটাকে জানে মেরে ফেলবো।"
চলবে?