#নিষিদ্ধ_প্রণয় (সিজন ২)
#পর্বঃ১৮
#কলমে_সোনালিকা_আইজা
⛔কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ⛔
******************
সুবিশাল আকাশের বুকে মেঘের ঘনত্ব বেড়েই চলেছে। অল্প স্বল্প দলা পাকানো মেঘের দলগুলো এবার বিশাল কুন্ডলী পাকাতে শুরু করেছে। পেঁজা তুলোর ন্যায়ে রাশি রাশি মেঘপুঞ্জ মুহুর্তেই দখলে নিয়ে নিচ্ছে আকাশের এপার ওপার। ধীর গতিতে দিনের স্বচ্ছতা ঢেকে দিতে গুটিগুটি পায়ে অন্ধকার ছেয়ে আসছে। মনে হয় আজ বৃষ্টি হবে। না না, বৃষ্টি নয়। বরং ঝড় হবে। ধরণী কাঁপিয়ে তোলা ভ'য়া'নক ঝড়। তবে কোন ঝড়ের প্রখরতা বেশি থাকবে? প্রকৃতিতে সৃষ্টি হওয়া ঝড়? নাকি দুটো মানুষের মনোমালিন্য থেকে উৎপত্তি হওয়া ঝড়?
তুবার মন বলছে প্রাকৃতিক ঝড়ের চেয়ে বেশি আজ ব্যাক্তিগত ঝড় যাবে ওর ওপর দিয়ে। ভাবতেই গলা শুকিয়ে এলো। ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে ছুটলো কৌশিক পেছন পেছন। তবে খুব বেশি সুবিধা করতে পারলো না। তার আগেই ধুপধাপ পা ফেলে সিঁড়ি পেরিয়ে নিচে নেমে গেছে কৌশিক। তুবা অসহায় ভঙ্গিতে ছাঁদের ছোট্ট দড়জায় হাত রেখে দাঁড়ালো। এক হাত দুরেই তিন খন্ড হয়ে পড়ে আছে কৌশিকের দামী আইফোনটা। এবং প্রথম সিঁড়িতে পড়ে আছে একটা খসখসে কাগজের প্যাকেট। তুবা ঝুঁকে ফোনের তিন খন্ড এবং প্যাকেটটা হাতে তুলে নিলো। এরপর নিঃশব্দে সিঁড়ি মারিয়ে নিচে নেমে গেলো।
-
-
সেই ঘটনার পর থেকে কৌশিক তুবার সাথে কথা বলছে না। সেই সকাল থেকে বিকেল হতে চলল। এ পর্যন্ত তুবার সাথে একটা কথাও বলেনি কৌশিক। তুবা বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছে কথা বলার কিন্তু কৌশিক ওকে পুরোপুরি ইগনোর করে চলছে। এই যেমন, এই মুহুর্তে কৌশিক বাপ চাচাদের মাঝখানে বসে আছে। দুপুরে খাওয়া দাওয়া করার পর থেকেই এখানে বসে। বাম হাতে কফির কাপ নিয়ে তাতে একটু একটু করে চুমুক দিচ্ছে। আর ডান হাতে ফোন স্ক্রল করছে। কপালের চামড়ায় তিন চারটে ভাজ ফুটে আছে। ধারালো চোয়াল জোড়া বেজায় শক্ত। সে যে বাপ চাচাদের সাথে খোশগল্প করতে এখানে বসে নেই সেটা বেশ বুঝতে পারছে তুবা। মূলত ওর মুখোমুখি না হওয়ার উদ্দেশ্যেই লোকজনের মধ্যে খুঁটির মতো সেঁটে আছে। কিছু না করেও নিরব শাস্তি দিচ্ছে তুবাকে। তুবা সবই বুঝলো। বুঝতেই চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। কান্নারা গলায় দলা পাকিয়ে এলো। নিজের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানোর কোনো সুযোগ পেলো না মেয়েটা।
এমন সময় তুবার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে হাজির হলো রাইমা। হাতে গামলা ভর্তি ডালের বড়া এনে বাড়ির কর্তাদের সামনে রাখলো। বিনয়ের সাথে মিষ্টি সুরে বললো,
"ফুপি নাস্তা পাঠিয়েছে ফুপাজান।"
রাইমার আওয়াজে আলোচনায় ব্যাঘাত ঘটালো তিন ভাইয়ের। জামাল সাহেব এক পলক চোখ তুলে তাকালেন। অতঃপর ফের ভাইদের সাথে খোশগল্পে মশগুল হলেন। রাইমা গামলাটা রেখে ঘরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। ঠিক সেই সময় কৌশিক ফোনে নজর রেখেই গম্ভীর কন্ঠে ডাকলো,
"রাই।"
আচমকা কৌশিকের ডাকে থেমে গেলো রাইমা। শরীরটা কেঁপে উঠলো হঠাৎ। প্রিয় মানুষের মুখে নিজের নামটাও যেনো মধুর বাণী শোনালো। রাইমা এক হাতে বুক খামচে ধরলো। ধীরে সুস্থে পেছন ফিরে বলল,
"কিছু লাগবে আপনার?"
"হুম! কাপটা নিয়ে যাও তো। আর এক কাপ কফি এনে দাও।"
কৌশিকের এহেন আবদারে রাইমার চোখ কপালে উঠলো। সেই দুপুর থেকে কৌশিকের এমন অদ্ভুত ব্যবহার খেয়াল করেছে রাইমা। দুপুরে ঠিক মতো খায়নি। কিন্তু তারপর থেকেই একের পর এক কফি খেয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত ছয় কাপ কফি খেয়ে ফেলেছে। এখন আরও এক কাপ চাইছে। এই বিদঘুটে স্বাদের তেঁতো কফি মানুষ এতো কিভাবে খায়? মনে একরাশ সন্দেহ নিয়ে রাইমা ফের জিজ্ঞেস করলো,
"হ্যা? আরও কফি খাবেন?"
"খেতেই তো চাইলাম। পারলে তুমি বানিয়ে নিয়ে আসো। তোমার হাতের কফি খেয়ে চাই।"
বলতে বলতে রাইমার দিকে চোখ তুলে তাকালো কৌশিক। সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় মাথা নুইয়ে নিলো রাইমা। এই প্রথম কৌশিক আগ বাড়িয়ে কিছু আবদার করলো তার কাছে। অত্যাধিক খুশিতে হাওয়ায় উড়তে লাগলো রাইমা। মনে তো চাচ্ছে সারাজীবন শুধু কফিই বানাতে। রাইমা তড়িঘড়ি করে ছুটলো রান্নাঘরে। মিনিট পাঁচ ছয়েকের মাথায় কফি হাতে হাজিরও হলো। উচ্ছ্বসিত মনে কফির কাপটা এগিয়ে দিলো। কৌশিক ফোনে নজর রেখেই কাপটা হাতে নিলো। ধীরে সুস্থে কাপে ঠোঁট ছোঁয়াল। ফোন স্ক্রল করতে করতেই বলল,
"হুমম! পার্ফেক্ট।"
রাইমার খুশি আর দেখে কে? দুই হাতে ওড়নার কোণা মোচড়াতে মোচড়াতে ছুটে চলে গেলো সেখানে থেকে। যেনো নতুন বিবাহিত বউ তার স্বামীর মুখে নিজের প্রশংসা শুনেছে। রাইমা চলে যাওয়ার পর কৌশিক আবারও কফির কাপে চুমুক দিলো।
দূর থেকে সবকিছু নিজের চোখে অবলোকন করলো তুবা। গায়ে হাত না তুলেও, ধমক না দিয়েও যে এভাবে শাস্তি দেয়া যায় সেটা তুবার জানা ছিলো না। হুট করেই তুবার ভিষণ কান্না পেলো। অবাধ্য কান্নারা কয়েক ফোটা গড়িয়েও পড়লো চোখের গন্ডি পেরিয়ে। তুবা সঙ্গে সঙ্গে মুছে ফেললো। কোনোমতে কান্না আটকে ধুপধাপ পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো।
তুবা চলে গেছে বুঝতে পেরে ফোন থেকে নজর সরালো কৌশিক। আঁড়চোখে তাকালো সিঁড়ির পানে। দেখলো তুবা গুটিগুটি পায়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। পরপরই মুখে জমিয়ে রাখা কফিটুকু পাশে ফেলে দিলো কৌশিক। কাঁচা মাটির উঠোন হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে তরলটুকু শুষে নিলো মাটি। কৌশিক মুখ বিকৃত করে দুবার থু থু ও ফেললো। মনে হচ্ছে জঘন্য কিছু মুখে দিয়েছে। শুধু মাত্র তুবার ওপর জেদ করে এই অখাদ্য মুখে নিতে হলো ওকে। নাহলে রাইমার হাতের পানিও কৌশিক মুখে তুলতো না। মুখের ভাবভঙ্গি বিকৃত করে কৌশিক বিড়বিড় করে আওড়ালো,
"পো'ড়া'র দহন কেমন হয় এবার বুঝতে পারছিস তো? আমিও দিনরাত এই দহনেই পুড়ি। তোকে একটা শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন ছিলো জান। আ'ম স্যরি ফর দ্যাট। বাট ট্রাস্ট মি! আর কষ্ট দেবো না।"
-
-
আকাশ জুড়ে বসেছে তুমুল মেঘের মেলা। রাশি রাশি মেঘপুঞ্জ দাপটের সাথে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সকাল থেকে মেঘরাশি ভাসতে ভাসতে ভরসন্ধ্যায় এসে একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। সেই সংঘর্ষের ফলাফল স্বরুপ, আকাশ কাপিয়ে বর্ষন হানা দিলো ধরণীতে। ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে ঝুম বৃষ্টি। তুমুল বাতাসে গাছের ডালপালা বেসামাল গতিতে দুলছে। মেঘের কারণে এই ভর সন্ধায় মনে হচ্ছে রাত নেমে এসেছে। এই মুহুর্তে সবাই যায় যায় ঘরে আছে। ঝড়বৃষ্টি না থামলে উঠোনে নামার কায়দা নেই।
সারাদিন শেষে মাত্রই কৌশিক নিজের ঘরে ফিরেছে। সেই সকাল থেকে উঠোনে সটান হয়ে বসে ছিলো। পিঠ মাজা ধরে গেছে একদম। বিছানায় গা এলিয়ে না দিলে শান্তি পাচ্ছে না। ভাবনা মোতাবেক ক্লান্ত দেহটা ছেড়ে দিলো বিছানায়। উপুড় হয়ে শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো। মিনিট দশকে হবে হয়তো তার ঘরে আসার। ঠিক সেই মুহুর্তে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো মৌমিতা। পেছন পেছন রিয়াও এসেছে। ঘরে পা রেখেই মৌমিতা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
"তুবা এসেছে ভাই?"
আচমকা মৌমিতার কন্ঠ শুনে বন্ধ চোখের পাতা খুলল কৌশিক। তড়িৎ শোয়া থেকে উঠে বসে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো মৌমিতার দিকে। নিজের বোনকে এমন হাঁপাতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
"তুবা আসেনি আমার ঘরে। তুই এমন হাঁপাচ্ছিস কেনো?"
"তুবাকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। পুরো বাড়ির কোথাও নেই।"
মৌমিতার কথাগুলো যেনো বজ্রপাত ঘটালো কৌশিকের মাথায়। আচমকা মুচড়ে উঠলো বুকটা। হৃদপিণ্ডে কেউ যেনো খচ করে ধারালো ছুরি বিঁধিয়ে দিলো। কৌশিক হুট করে ঘাড় ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকালো। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। মিনিটে মিনিটে আকাশ কাঁপিয়ে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে মেয়েটা কোথায় যাবে? কৌশিক তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো। অস্থির কন্ঠে শুধালো,
"বাড়িতে নেই মানে? এই ভর সন্ধায় বৃষ্টির মধ্যে কোথায় যাবে?"
"জানি না। সবাই মিলে খুঁজছে। কিন্তু কোনো ঘরে তুবা নেই।"
"ছাঁদে দেখেছিস?"
"দেখেছি। ছাঁদেও নেই।
দুশ্চিন্তায় কৌশিকের মাথা হ্যাং হয়ে গেলো। মাথার দুই পাশের রগ দপদপ করে লাফাতে লাগলো। মাথায় চুলগুলো একহাতে খামচে ধরে কিছু ভাবতে লাগলো। এরপর হুট করেই উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে।
কৌশিকের চলন্ত কদম জোড়া থামলো নিচতলার শেষ দিকের সিফাতের ঘরে। যেখানে বাড়ির সবাই তুবাকে খোঁজা খুঁজি করতে ব্যাস্ত। অথচ সিফাত সেখানে নিজের ঘরে ঘাপটি মেরে বসে আছে। কৌশিক অনুমতি বিহীন হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়লো সিফাতের ঘরে। ছেলেটা খাটের সাথে হেলান দিয়ে বই পড়ছিল। এমন সময় ঝড়ের গতিতে কৌশিক এসে ওর কলার চেপে ধরলো। রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
" তুবা কোথায়? বল! কোথায় তুবা?"
আচমকা আক্রমনে ভড়কে গেলো সিফাত। কৌশিকের কথার কোনো আগা মাথা বুঝলো না। অবুঝ স্বরে প্রশ্ন করলো,
"হ্যা? মানে?"
"একদম ভংচং দেখাবি না সিফাত। সত্যি করে বল। আমার তুবা কোথায়?"
"আমি জানি না ভাই। আমি সত্যিই কিছু জানি না।"
বোকার মতো ডানে বামে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল কথাটা। কৌশিক তখনও দাঁত কিড়মিড় করছে। ধীরে ধীরে স্বচ্ছ চোখ দুটো র'ক্তিম বর্ণ ধারণ করছে। কৌশিকের চেহারার রঙ পরিবর্তন দেখে ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলল সিফাত। কিছু না করেও ছেলেটা আবারও ফেঁসে গেছে।
কৌশিকের পিছু নিতে নিতে সিফাতের ঘর পর্যন্ত চলে এসেছে নীরব। কৌশিককে সিফাতের কলার চেপে ধরে শাসাতে দেখে দৌড়ে গিয়ে ছাড়িয়ে নিলো। অতিষ্ট ভঙ্গিতে বলল,
"ও কিছু জানে না ভাই। ছেলেটা ভালো করে হাঁটতেও পারছে না। ওকে ছেড়ে দাও প্লিজ।"
"তাহলে কোথায় গেছে তুবা?"
বাঘের মতো গর্জে উঠে প্রশ্ন করলো কৌশিক। নীরব ওকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল,
"জানলে কি আর খোঁজা খুঁজি করি? আগে তুমি শান্ত হও। ঠান্ডা মাথায় ভাবো। তোমাদের কি ঝগড়া হয়েছে? আমি বিকালে তুবাকে কাঁদতে দেখেছি।"
নীরবের শেষোক্ত কথাটা শুনে বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো কৌশিকের। অসহ্য যন্ত্রণায় বুকটা জ্ব'লে উঠলো। দম আটকে হাসফাস করতে লাগলো। তুবা কেঁদেছে কথাটা মস্তিষ্কের প্রতিটা নিউরনে নিউরনে সুচ ফুটিয়ে দিলো যেনো। বুকের ভেতর আ'গু'নের মতো জ্ব'লে উঠলো। বুকের জ্বা'লা কমাতে এক হাতে বুক ডললো কৌশিক। তবে কাজ হলো না। ভিষণ অস্থির অস্থির লাগছে। গলাটাও শুকিয়ে আসছে। দুই হাতে চুল খামচে ধরে কিছু একটা ভাবলো কৌশিক। এর পরপরই উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে।
এই ভর সন্ধ্যায় দিকদিগন্ত ভুলে এলোমেলো পায়ে আঁকাবাকা কাঁচা রাস্তা ধরে ছুটে চলেছে কৌশিক। ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে পুরো শরীর সাদা হয়ে গেছে। অথচ ছেলেটার সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। চোখের চাহনিতে ভয়। চেহারা বদ্ধ উম্মাদের মতো বেহাল। চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রুও ঝরে পড়লো যেনো। তবে সেটা চোখের সীমানা পার করতেই বৃষ্টির পানির সাথে মিশে অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেলো। কৌশিক ছুটতে ছুটতে চিৎকার করে ডাকলো,
"তুবা! কোথায় তুই? প্লিজ জান ফিরে আয়। আমার দম আটকে যাচ্ছে। আমি শ্বাস নিতে পারছি না। আমার বুক কাঁপছে জান। কোথায় তুই? ফিরে আয় আমার বুকে। তুবা....!"
চলবে?