ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ প্রণয়ে (সিজন-2)

৩৪তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া জাওদা

#নিষিদ্ধ_প্রণয় (সিজন ২)

#পর্বঃ৩৪

#কলমে_সোনালিকা_আইজা

⛔কপি করা সম্পুর্ন নিষিদ্ধ। চাইলে শেয়ার দিয়ে পাশে থাকতে পারেন।⛔

****************

কৌশিকের হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়ে গেছে বহুগুণ। তুবার হাতের ক্ষত যেনো জ্বালিয়ে দিচ্ছে হৃদপিণ্ড। ব্যাথিত নয়নে তুবার মুখের দিকে তাকালো কৌশিক। হাতটা টেনে ঠোঁটের কাছে নিয়ে আলতো করে চুমু খেলো। আহত কন্ঠে বললো,

"কিভাবে হলো এটা?"

"সালাদ কাটতে গিয়ে।"

মিনমিন করে জবাব দিলো তুবা। কৌশিকের খানিকটা রাগ হলো। রান্না করতে গিয়ে মেয়েটা নিজের দেহে আঘাত পেয়েছে, বিষয়টা মানতে কষ্ট হলো কৌশিকের। তবে এই মুহুর্তে রাগঝাগ করারও সাহস হলো না। তাই অগত্যাই রাগটাকে গিলে নিয়ে শান্ত কন্ঠে বললো,

"রান্না করতে গেছিস কেনো জান? এতো পাকনামি কে করতে বলেছে?"

"এখানে পাকনামির কি আছে? রান্না কি শেখা লাগবে না?"

"কেনো শেখা লাগবে? তোর রান্না শেখার প্রয়োজনটা কি সেটা আমাকে বল?"

তুবা অবাক হলো ভিষণ। হতভম্ব সুরে বলল,

"রান্না না শিখলে আপনাকে রেঁধে খাওয়াবো কিভাবে? ভবিষ্যতে আমাকেও তো গুছিয়ে সংসার করতে হবে।"

"প্রয়োজন নেই। রান্নার জন্য মা চাচিরা আছে।"

"তারা কি সারাজীবন থাকবে নাকি? এক সময় না এক সময় সংসারের হাল তো আমাকেই ধরতে হবে।"

"তখন দরকার পড়লে আমি তোকে রান্না করে খাওয়াবো। কিন্তু এরপর থেকে তুই আর কোনোদিন রান্নাঘরে পা রাখবি না।"

তুবা যেনো তর্কে হারতে নারাজা। একপ্রকার গো ধরে বসে রইলো। জেদি কন্ঠে বললো,

"আমি রান্না শিখতে চাই। আমি একজন আদর্শ বউ হতে চাই। আমি মন থেকে আপনার সেবা করতে চাই।"

"জান জেদ করিস না।"

"কেনো করবো না? রাইমা আপু খুব ভালো রান্না পারে। আর আমি বুঝি, বড়মা এজন্যই তাকে এতো পছন্দ করে। আমি যদি রান্না বান্না সংসারের কাজ না করি তাহলে কি সে আমাকে পছন্দ করবে? ছেলের বউ হিসেবে মানবে? বলুন?"

তুবার যুক্তি তর্ক শুনে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো কৌশিক। বুঝে গেলো, এই পাগলের সাথে কথা বলে লাভ নেই। ও যখন জেদ ধরেছে রান্না শিখবে। মানে শিখবেই। হাজার মানা করলেও শুনবে না। বরং মানা করলে উল্টো আরও ভাঙা রেডিওর মতো একই সুর বারবার রিপিট করবে। তাই অগত্যাই তর্ক বির্তকের ইচ্ছেটাকে দমিয়ে নিলো কৌশিক। নিচ থেকে তুবাকে পাঁজা কোলে তুলে আবারও ইজিচেয়ারে বসলো। তুবাকে নিজের উল্টোদিক করে উরুর উপর বসালো। চিকন বাঁকানো পিঠ গিয়ে ঠেকলো কৌশিকের শক্ত বুকে। কৌশিক আলতো করে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো তুবাকে। ঘাড়ের সাথে সরু নাকটা ঘষে বলল,

"আদর্শ বউ হতে চাস তাই তো? আমি যদি পুরোপুরি স্বামীর রুপ ধারণ করি? পারবি তো সহ্য করতে?"

"খুব পারবো।"

কৌশিকের ছোঁড়া প্রশ্নের বিপরীতে কিছু না বুঝেই হুট করে জবাব দিলো তুবা। পরপরই কৌশিকের ঠোঁটের কোণে খেলে গেলো দুষ্টু হাসি। নিজের পুরুষালী হাত জোড়াকে এবার কাজে লাগিয়ে দিলো সে। আচমকা উদরে ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে কেঁপে উঠলো তুবা। শরীর জমে বরফ হয়ে গেলো। শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো। কৌশিক তুবার পিঠের সাথে সমানে নাক ঘষছে। সেই সাথে লতানো দেহের প্রতিটি বাঁকে সমান তালে চলছে দুই হাতের বিচরণ। প্রথমে উদর। তারপর উদর থেকে একটু উপরে। এরপর সোজা বক্ষযুগলে। হঠাৎ অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে কান গরম হয়ে গেলো তুবার। আবেশে চোখ মুদে এলো। অত্যাধিক লজ্জায় দম আটকে হাসফাস করে উঠলো। এই অসহ্য অনুভূতি থেকে বাঁচার তাগিদে হুড়মুড়িয়ে উঠে যেতে চাইলো। তবে ওঠার আর শক্তি পেলো না। মৃদু চাপে দেহের শক্তি খুইয়ে বসলো। সহসাই দেহের ভার ছেড়ে দিলো কৌশিকের বুকে। ঘনঘন শ্বাস প্রশ্বাসে ভারি হয়ে উঠলো পরিবেশ। শোনা গেলো কৌশিকের মোহনীয় কন্ঠের ফিসফিস আওয়াজ,

"আমায় এতো পাগল কেনো করিস জান? তুই আশেপাশে আসলে আমার মাথায় নেশা চড়ে যায়। নিজেকেই যেনো হারিয়ে ফেলি। দুনিয়াদারীর চিন্তা, ভাবনা, অনুভুতি সব ফিকে লাগে। তোর মাঝে ডুবে যেতে মন চায়। অনুভুতির ওপর লাগাম টানতে পারি না আমি।"

কথার সাথে সাথে সমানতালে চলছে দুই হাতের বিচরণ। পরিস্থিতিটা মুহুর্তেই ভারি হয়ে উঠলো। তুবার গলার কাছে কথা আটকে গেলো। সে কোনো মতে কন্ঠে জোর খাটিয়ে বলল,

"আপনার অনুভুতির পেট খারাপ। হুটহাট লাগাম ছুটে যায়। ডাক্তার দেখান।"

"আমার ডাক্তার তো তুই। আমার সব রোগের মহৌষধ। তুই ছাড়া কার সাধ্যি আছে আমাকে সুস্থ করার? চল তোকেই বরং দেখাই।"

তুবা হাসফাস করে উঠলো। কৌশিকের চলন্ত দুই হাতের চাপ বাড়তেই খপ করে ধরে বলল,

"থামবেন আপনি?"

"কেনো থামবো?"

"আমি বলেছি তাই।"

"তুই তো আদর্শ বউ হতে চাইছিস। সূচনাটা নাহয় আমাকে দিয়েই হোক।"

"সকালে কলেজ আছে আমার। আপনারও অফিস আছে।"

"সবকিছু জাহান্নামে যাক। সবার আগে বউ।"

তুবা হার মেনে নিলো। বাধ্য মেয়ের মতো আত্নসমর্পণ করলো নিজের স্বামী নামক প্রেমিক পুরুষের কাছে। বাহানা করে কি লাভ? সে তো সুখই দেবো। সেটাও খুবই আদর, আহ্লাদ এবং যত্ন সহকারে।

-

-

সময়ের স্রোত ঢেউ খেলে এগিয়ে গেলো আরও কিছুদিন। ঘনিয়ে এলো মৌমিতা এবং রাতুলের বিয়ের সেই কাঙ্ক্ষিত প্রহর। বহু প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে হাজির হলো হলুদের লগ্ন। আজ মৌমিতা এবং রাতুলের গায়ে হলুদ। বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে সকাল থেকেই ভুঁইয়া মঞ্জিল সেজে উঠেছে বাহারি সাজে। আত্মীয় স্বজনে থৈথৈ করছে বাড়ির প্রতিটা কোণা। ছোটো ছোটো বাচ্চাদের ছোটাছুটিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো বাড়ি।

বাড়ির কর্তারা সকাল থেকে ব্যাস্ত। দৌড় ঝাপ করে বিয়ের আয়োজনে মশগুল। এই দায়িত্ব থেকে নিস্তার পায়নি বাড়ির দুই ছেলেও। বরং সবচেয়ে বেশি ধকল যাচ্ছে কৌশিকের ওপর দিয়ে। একমাত্র বোনের বিয়ে। তার ওপরে সে বাড়ির বড়ো ছেলে। দায়িত্বটা দ্বিগুণ। সে বোনের বিয়েতে বিন্দুমাত্র ত্রুটি রাখতে আগ্রহী নয়। সেই রেশ ধরেই সকাল থেকে ছুটে বেড়াচ্ছে এদিক সেদিক। সাথে ইচ্ছে মতো খাটিয়ে নিচ্ছে নীরবকে। ছেলেটার ছোটোখাটো দেহ কাহিল প্রায়। স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে নীরব কৌশিকের চাইতে যথেষ্ট দুর্বল। কৌশিকের দেহে পূর্নাঙ্ক পুরুষের যে গড়ন, সেটা নীরবের মধ্যে এখনও গড়ে ওঠেনি। হয়তো বয়স কম তাই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেও একসময় পূর্ণাঙ্গ পুরুষ হয়ে উঠবে। তবে এই মুহুর্তে তার শরীরটা এতো ধকল নিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। তাই দেহের ক্লান্তি কমাতে কাজের ফাঁকে একবার ছুটে এলো বাড়ির ভেতরে। উদ্দেশ্য, ঠান্ডা ঠান্ডা এক গ্লাস শরবত খাবে। এতে যদি একটু ভালো লাগে। ভাবনা মোতাবেক নীরব বসার ঘরের সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে গলা ছেড়ে ডেকে উঠলো,

"মা! এক গ্লাস শরবত দাও তো। বেশি করে বরফ দিও।"

ক্লান্ত কন্ঠে এটুকু বলেই সোফার সাথে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো নীরব। মিনিট দুইয়েকের ব্যবধানে নাকে ভেসে এলো লেবুর শরবতের টক মিষ্টি সুবাস। বন্ধ রাখা চোখ জোড়া হুট করেই খুলল নীরব। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ে হা হয়ে গেলো। ওর মায়ের পরিবর্তে শরবতের গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে আছে রিমি। পড়নে একটা কলাপাতা রঙের সালোয়ার কামিজ। চুলগুলো খুলে রাখার দরুন পুরো পিঠময় ছড়িয়ে আছে। জর্জেট ওড়নাটা গলার সাথে এক প্যাচ দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা। মুখে কোনো প্রসাধনী নেই। হয়তো এখন সাজতে লাগবে তাই। নীরব যখন সম্মোহনী নজরে রিমিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল ঠিক সেই মুহুর্তে রিমি খানিকটা ঝাঁঝাল সুরে বলে উঠলো,

"হাঁদারাম! শরবত ধর। আজীবন গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে থাকবো নাকি?"

নীরব তখনও নিরুত্তর। চোখে কেমন যেনো ঘোর লেগে গেছে। ভালো লাগার অনুভুতি গুলো প্রজাপতির মতো ডানা ঝাপটাতে শুরু করেছে। বুকের ভেতর সুর তুলে আওয়াজ হচ্ছে, ধকধক! ধকধক! ধকধক!

এদিকে নীরবকে কোনো জবাব দিতে না দেখে গ্লাসটা টেবিলের ওপর রাখলো রিমি। আপন মনে বলতে লাগলো,

"তোর পেছনে নষ্ট করার মতো সময় নেই আমার। কাকিরা সবাই যার যার ঘরে তৈরি হচ্ছে। আপাতত এখানে কেউ নেই। তোকে ক্লান্ত লাগছিল তাই সাহায্য করলাম। তাই বলে কি আজীবন এখানে দাঁড়িয়ে থাকবো নাকি? আমি উপরে যাচ্ছি।"

বলেই যেই না চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াবে সঙ্গে সঙ্গে ওর হাতটা খপ করে ধরে নিলো নীরব। আচমকা নীরবের ছোঁয়ায় বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠলো রিমির। দেড় বছর আগের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আবারও স্মৃতিপটে ভেসে উঠলো। ঘৃণায় গা গুলিয়ে উঠলো রিমির। সঙ্গে সঙ্গে ঝারি মেরে হাত ছাড়িয়ে নিলো। হিংস্র বাঘিনীর মতো গর্জন তুলে বলল,

"আমার হাত ধরেছিস কোন সাহসে?"

"তুই আমার ওপর এখনও রেগে আছিস রিমি?"

নীরবের কৌতুহলী প্রশ্ন। বিপরীতে রিমি অকপটে জবাব দিলো,

"রাগ নয়, ঘৃণা করি আমি তোকে। তুই আমার সাথে যা করেছিস তার জন্য কোনোদিন তোকে ক্ষমা করবো না নীরব। একদম কাছে আসবি না আমার। দূরে থেকে কথা বল।"

এক ব্যাথাতুর আহত শ্বাস ছাড়লো নীরব। সেদিন রাগের মাথায় লাইব্রেরিতে রিমির ইচ্ছার বিরুদ্ধে ওকে ছোঁয়া ছিলো নীরবের মস্ত বড় ভুল। সেই ভুলের মাশুল নীরব বিগত দেড় বছর ধরে দিচ্ছে। গত দেড় বছর ধরে রিমি নীরবের সাথে কথা বলে না। সবসময় এড়িয়ে যায়। এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে নিয়েছে দুজনের মধ্যে। এই দেয়াল ভেদ করে রিমির কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে উঠতে পারেনি নীরব। তবে আজ এতোগুলা দিন পর সুযোগের একটা ঝলক যেনো হাতে পেয়েছে। তাই সুযোগটাকে হাতছাড়া না করে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো ব্যবহার করার। নীরব দুকদম এগিয়ে এসে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

"দেখ রিমি। ভুল হয়ে গেছে আমার। সেদিন রাগের মাথায় বিশাল বড় ভুল করেছি। সেই ভুলের জন্য কতবার ক্ষমা চেয়েছি তোর কাছে। আর কি করতে হবে বল? তোর ক্ষমা পেতে আমি সব করতে রাজি।"

"তোকে ক্ষমা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।"

"বেশ! তাহলে চল দুজন বিয়ে করে নেই। আমাকে ঘৃণা করিস তাই না? তাহলে বিয়ে করে ক্ষমার অযোগ্য শাস্তিটা দিয়ে দে। এরচেয়ে বড় শাস্তি আর কি হতে পারে?"

নীরব কথাটা ঝোঁকের বশেই বলল? নাকি ভেবে চিন্তে বললো? সেটা বুঝে আসলো না রিমির। তবে এই মুহুর্তে নীরবের কথাগুলো রিমির কাছে পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই মনে হলো না। রিমি দাঁতে দাঁত চেপে রাগী কন্ঠে বললো,

"গরমে মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর। শরবতটা খেয়ে মাথা ঠান্ডা কর। মানবতার খাতিরে এইটুকু সাহায্য করতেই পারি। তবে ভুলেও ভাবিস না তোকে ক্ষমা করে দিয়েছি আমি। এজীবনে তুই আমার ক্ষমা কোনোদিন পাবি না।"

ঝাঁঝালো কণ্ঠে কথাগুলো বলেই হনহন করে মৌমিতার ঘরের দিকে চলে গেলো রিমি। নীরব আহত চোখে তাকিয়ে রইলো শুধু। এই চোখের আর্তনাদ সে কাউকে বোঝাতে পারে না।

-

-

স্টেজ সাজানো শেষে ফ্রেশ হতে নিজের ঘরে এসেছে কৌশিক। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাতুলের বাড়ি থেকে লোকজন হলুদ নিয়ে চলে আসবে। হলুদের অনুষ্ঠান এরপরেই শুরু হবে। তাই এই সুযোগে ঝটপট গোসল সেরে তৈরি হতে লেগে পড়েছে সবাই। কৌশিক মাত্রই গোসল সেরে গায়ে একটা কালো রঙের পাঞ্জাবি জড়িয়েছে। এরপর ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে পারফিউম লাগাচ্ছে। ঠিক এমন সময় গুটিগুটি পায়ে সেখানে হাজির হলো তুবা। পেছন থেকে রিনরিনে সুরে বললো,

"আমাকে কেমন লাগছে কৌশিক ভাই?"

আচমকা পরিচিত কন্ঠে পেছন ফিরে তাকালো কৌশিক। সঙ্গে সঙ্গে নজর জোড়া থমকে গেলো। বিস্ময়ে দুই ঠোঁট আপনাআপনি ফাঁকা হয়ে গেলো। হাতে ধরে রাখা পারফিউমটাও শব্দ করে ফ্লোরে পড়ে গেলো অবলীলায়। থমকে যাওয়া চোখ জোড়া আটকে গেলো হলুদ শাড়ি পরিহিত তুবার পানে। চিকন লতানো দেহে বাঙালি স্টাইলে শাড়ি জড়িয়েছে তুবা। সেই সাথে আর্টিফিশিয়াল ফুলের গহনায় সেজেছে। ফর্সা দেহে হলুদ রঙ বারেবারে জ্বলে উঠছে যেনো। মুক্তঝরা হাসিতে এ যেনো এক অপরুপ পরী।

হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়ে গেলো কৌশিকের। বুকের ভেতর দামামা বাজতে লাগলো। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। শুকনো গলা ভেজানোর উদ্দেশ্যে একটা শুকনো ঢোক গিলল কৌশিক। তবে সেই প্রচেষ্টাও বৃথা গেলো। গলা তো ভিজলোই না, উল্টে আরও বেশি তৃষ্ণা বাড়লো। কৌশিককে এমন পাথরের মতো জমে যেতে দেখে কয়েক কদম এগিয়ে এলো তুবা। ভ্রু কুঁচকে বলল,

"এভাবে কি দেখছেন?"

"এতো সেজেছিস কেনো?"

এই পর্যায়ে মুখ খুললো কৌশিক। কণ্ঠস্বর বেজায় কাঁপছে। তুবা সেই কন্ঠকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে নিজেকে একবার আয়নায় পর্যবেক্ষন করে নিলো। এরপর ঠোঁট উল্টে বলল,

"কেনো? ভালো লাগছে না? সাজ সুন্দর হয়নি?"

হঠাৎ কৌশিকের গলার স্বর পরিবর্তন হয়ে গেলো। অত্যান্ত ঠান্ডা শীতল কণ্ঠে আওড়ালো,

"চোখ ঝলসানো সুন্দরী তুই জান। তোর সৌন্দর্যের কোনো তুলনা নেই। আমার বেপরোয়া হার্টবিট থমকে দিতে তোর মুখের এক ঝলক দর্শনই যথেষ্ট। তাহলে এতো সাজার কি প্রয়োজন? বারে বারে রুপের আগুনে ঘায়েল কেনো করিস? মেরে ফেলতে চাস আমাকে?"

তুবা লজ্জায় আড়ষ্ট হলো। লাজুক হেঁসে মাথা নুইয়ে নিলো। তার এই এতো এতো সাজের উদ্দেশ্যই তো ছিলো একটা। কৌশিকের মুখে নিজের প্রশংসা শোনা। যদিও এতো গভীর প্রশংসা আশা করেনি তুবা। সে তো শুধু চেয়েছিলো কৌশিক বলুক, "তোকে সুন্দর লাগছে"। ব্যাস তুবার চাহিদা এতটুকুই। তবে ওর সামনে দাঁড়ানো ব্যাক্তি তো কৌশিক। সে তো আর পাঁচজন পুরুষের মতো সাধারণ প্রেমিক নয়। সে তো পাগল প্রেমিক। না চাইতেই দুহাত ভরে ভালোবাসা ঢেলে দেয় তুবার পায়ে। আর যদি তুবা মুখ ফুটে কিছু চায়ও। চাওয়ার চাইতে তিনগুণ বেশি দেয়। সেটা হোক কোনো জিনিস, ভালোবাসা, বা প্রশসংসা। ভাগ্যের জোরে পাওয়া এই মারাত্মক প্রেমিক পুরুষকে নিয়ে ভাবতে গিয়ে মনটা শীতল হয়ে ওঠে তুবার। অনুভুতির জোয়ারে ভাসতে ভাসতে হারিয়ে যায় অজানায়। ঠোঁটের কোণে মুক্ত ঝরা প্রানোচ্ছল হাসি।

ঠিক এমন সময় দড়জার বাইরে থেকে আসা একটা বাক্য কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই, তুবার হাসিখুশি মুখটা মুহুর্তেই চুপসে গেলো। বারান্দার কোনো এক প্রান্ত থেকে কনকচাঁপা বেগম উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলছেন,

"এই তো। আমার রাইমা এসে গেছে। এতো দেরি কেনো করলি আম্মা? বোনের বিয়েতে একটু আগে আগে আসবি না?"

এর পরের কথাগুলো অস্পষ্ট। হয়তো রাইমাকে নিয়ে কনকচাঁপা বেগম মৌমিতার ঘরের দিকে চলে গেছেন। আনন্দের মুহুর্তে রাইমার উপস্থিতি তুবার হাসিখুশি মনটাকে দুম করে ভেঙে দিলো। কৌশিকের আশেপাশে তুবা কোনো মেয়েকে সহ্য করতে পারে না। আর এই রাইমাকে তো আরও সহ্য হয় না। অথচ এই অপছন্দের মেয়েটা দুটো দিন এই বাড়িতেই থাকবে। নিশ্চিত, এই সুযোগে বড় মাকে আরও বেশি নিজের প্রতি আকৃষ্ট করে নেবে। ভাবতেই বুকটা ভার হয়ে উঠলো তুবার। নিজেদের সম্পর্কের সমীকরণ যেনো দিন দিন আরও বেশি জটিল হয়ে যাচ্ছে। সব ঝড় ঝাপ্টা পাড়ি দিয়ে শেষ রক্ষা হবে তো? এই উটকো মেয়েটা অযাচিত ঝামেলা কেনো টেনে আনে? তুবা একবার বিরক্তি নিয়ে তাকালো কৌশিকের দিকে। রাগে দুঃখে কোনো কথা না বলে হনহন করে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে।

চলবে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন