#নিষিদ্ধ_প্রণয় (সিজন ২)
#পর্বঃ৩৬
#কলমে_সোনালিকা_আইজা
⛔কপি করা সম্পুর্ন নিষিদ্ধ। চাইলে শেয়ার দিয়ে পাশে থাকতে পারেন।⛔
**************
দীর্ঘ এক কালো রাতের শেষে মিষ্টি সকালের সূচনা। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বিয়ে বিয়ে সুবাস। গতকালের তুলনা ভুঁইয়া মঞ্জিল আজ দ্বিগুণ ঝলমলে রুপে সেজে উঠেছে। হবে না-ই বা কেনো? আজ যে সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত দিন। বাড়ির বড়ো মেয়ে আজ বাঁধা পড়বে অচেনা এক মানুষের সাথে। বদলে যাবে পরিচয়। নতুন একটা পরিবার হবে তার। সবশেষে, বিদায় নেবে চিরপরিচিত এই বাড়ি থেকে। পর হয়ে যাবে আপন, আর আপন হয়ে যাবে পর। দুনিয়ার এই অদ্ভুত নীতির বেড়াজালে অসহায় হয়ে পড়ে বাবা মা। তাই তো, পুরো বাড়ি জুড়ে খুশির আমেজ ছড়িয়ে পড়লেও হাসি নেই কনকচাঁপা বেগম আর জামাল সাহেবের মুখে। মেয়েকে চিরদিনের জন্য বিদায় দিতে হবে আজ। ব্যথাটা কি আর একটু আধটু?
সকালে তুবাদের ছাঁদ বাগান থেকে তাজা গোলাপ নিতে ছাঁদে এসেছে রিমি। মৌমিতার খোঁপায় গোলাপ ফুল দিয়ে সাজানো হবে। রিমি গোলাপ গাছ গুলো থেকে বেছে বেছে মোট চারটে গোলাপ ছিড়ে নিলো। একটা মৌমিতার জন্য। একটা ওর নিজের জন্য। একটা রিয়ার জন্য এবং চার নাম্বারটা তুবার জন্য। যদিও সকাল থেকে তুবার কোনো হদিস নেই। পুরো বাড়ি খুঁজে বের করতে হবে দুরন্ত মেয়েটাকে। ভাবতে ভাবতে ফুলগুলো সব হাতে সাজিয়ে নিলো রিমি। আঙ্গুলে গুনে গুনে হিসাব মিলিয়ে যেই না রিমি পেছন ঘুরেছে, সঙ্গে সঙ্গে শক্ত পোক্ত বুকের ধাক্কায় দুকদম পিছিয়ে গেলো মেয়েটা। মাথা তুলে তাকাতেই দেখতে পেলো নীরব প্যান্টের পকেটে দুই হাত গুঁজে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই সাত সকালে নীরবকে দেখে মেজাজটাই বিগড়ে গেলো রিমির। দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড় করে বলল,
"ওই! তোর সমস্যা কি রে? চোখে দেখিস না? হুটহাট এমন ভুতের মতো উদয় হোস কেনো?"
"আমার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক কবে করবি রিমি?"
রিমির প্রশ্নকে সম্পুর্ণ উপেক্ষা করে নিজের মতো করে প্রশ্ন ছুড়লো নীরব। রিমি এতে বেজায় বিরক্ত হলো। কন্ঠে একরাশ বিরক্তি ঢেলে বলল,
"এভাবে পেছনে কেনো পড়ে আছিস বল তো? আমার থেকে ক্ষমা পেতে এতো কেনো মারিয়া হয়ে উঠেছিস?"
"বিকজ আই লাভ ইউ ড্যাম ইট। ভিষণ ভালোবাসি তোকে। তোর ঘৃণা নিয়ে আমি বাঁচতে পারছি না রিমি। আমি তিলে তিলে মরে যাচ্ছি।"
আকস্মিক দুকদম এগিয়ে এসে রিমির বাহু ধরে ঝাঁকিয়ে কথাগুলো বলল নীরব। আচমকা নীরবের এহেন কথা শুনে থমকে গেলো রিমি। কথা বলার ভাষা হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলো। নীরবের রাগী মুখশ্রীর দিকে হতবাক নয়নে তাকিয়ে রইলো। নীরব ফুঁসে উঠে ফের বলতে লাগলো,
"সেই স্কুল লাইফ থেকে ভালোবেসে আসছি তোকে। আকার ইঙ্গিতে কতভাবে বুঝিয়েছি। কিন্তু তুই সবসময় আমাকে উপেক্ষা করে গেছিস। বুঝেও না বোঝার ভান করেছিস। আমাকে এতো কেনো পোড়াচ্ছিস বলতো? আমার ভালোবাসাটা খাঁটি বলে? অন্য ছেলেদের মতো প্লেবয় নই তাই? এতো কিসের অবহেলা বল?"
শেষের কথাটা ধমকের সাথে বলল নীরব। হতবাক রিমি কি জবাব দেবে বুঝে উঠতে পারলো না। শুধু অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। নীরব যে ওর সাথে আগ বাড়িয়ে মিশতে আসে সেটা রিমি দেখেছে। কিন্তু ওকে ভালোবাসে সে কথা রিমি ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি। নাকি পেয়েছে? শুধু পাত্তা দেয়নি? এদিকে কথা বলতে বলতে গলা ধরে এসেছে নীরবের। পুরুষ মানুষ বিধায় মন খুলে কাঁদতে পারছে না। আবার প্রিয় মানুষের অবহেলাও মেনে নিতে পারছে না। সব মিলিয়ে একটা অদৃশ্য হাত ছেলেটার গলা চেপে ধরে রেখেছে। টিনএজ বয়সের আবেগ খুবই মারাত্মক। এই সময় আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ টানা কঠিন। এই যেমন নীরবও পারছে। আবেগ গুলো বারে বারে হৃদয় উগড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। শেষে নীরব কন্ঠে জোর দিয়ে ধরা গলায় বলল,
"তোর প্রেমে আমি পাগল হয়ে গেছি রিমি। নিজেকেই নিজে হারিয়ে ফেলেছি। তার ওপর তুই আমাকে যেভাবে পোড়াচ্ছিস। একদিন দেখবি, তোর দহন সইতে না পেরে প্রাণ পাখিটা উড়াল দিয়ে শূন্যে মিলিয়ে গেছে। সেদিন আর তোর হাতে কিছু থাকবে না রিমি। শুধু আফসোস ব্যাতিত তোর প্রাপ্তির খাতা হবে শূন্য। সময় থাকতে বুঝতে শেখ। হারিয়ে গেলে আর কোনোদিন ফিরে পাবি না।"
একদমে কথাগুলো বলেই লম্বা লম্বা কদম ফেলে ছাঁদ থেকে চলে গেলো নীরব। মলিন চেহারাটা দুনিয়া থেকে লুকানোর প্রচেষ্টা চালালো। পুরুষ মানুষের চোখে কান্না বেমানান। কেউ দেখে ফেললে ওকে যে কাপুরুষ ভাববে। পুরুষেরা আবার কাঁদে নাকি? ধুর!
-
-
গুটিগুটি পায়ে কাঙ্ক্ষিত লগ্ন এসে হাজির হলো। সকল জল্পনা কল্পনা একপাশে ফেলে মৌমিতা এবং রাতুলের বিয়ের কার্য সম্পন্ন হলো। বাড়ির কর্তারা সবাই অতিথি আপ্যায়নে ব্যাস্ত। সেই সাথে বাড়ির দুই ছেলে ব্যাস্ত বোনের বিদায়ের বন্দবস্ততে। সারাদিন কাজের চাপে এক দন্দ বসার ফুরসত পায়নি কৌশিক। কাজের অত্যাধিক চাপে নাজেহাল দেহ। ব্যাস্ততার মাঝেই চাতক পাখির মতো খুঁজে চলেছে তুবাকে। কিন্তু হায়! আজ সারাদিন মেয়েটার এক ঝলক দেখাও পায়নি কৌশিক। গতকাল রাতে কনকচাঁপা বেগমের হুশিয়ারি মনে খানিকটা ভয় ধরিয়ে দিয়েছে কৌশিকের। চোখ দুটো ব্যাকুল হয়ে আছে প্রাণ প্রিয়াকে এক নজর দেখার জন্য। কিন্তু মেয়েটা আজ সামনেই আসছে না। যেনো অদৃশ্য হয়ে বাতাসের সাথে মিশে বেড়াচ্ছে। ভাবতে ভাবতে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো কৌশিক। নাহ্, এভাবে আর পারা যাচ্ছে না। মৌমিতার বিদায়ের পর আগামীকালই বাড়িতে নিজের আর তুবার বিয়ের কথা জানিয়ে দেবে কৌশিক। এই লুকোচুরির সম্পর্ক বয়ে নিয়ে যাওয়া বড্ড কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অবাধ্য মনটাও আজকাল বেহায়ার মতো আচরণ করে। বারে বারে মেয়েটাকে কাছে পেতে মন চায়। হুট হাট বুক কেঁপে ওঠে। অবচেতন মন হারিয়ে ফেলার চিন্তায় তটস্থ হয়ে থাকে। চঞ্চল মেয়েটাকে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে।
কৌশিকের ভাবনার মাঝেই সেখানে আগমন ঘটলো রিয়ার। পড়নের লেহেঙ্গা দুই হাতে উঁচু করে সিঁড়ির দিকে যাচ্ছিল। ঠিক এমন সময় কৌশিক ক্লান্ত কন্ঠে ডেকে উঠলো,
"রিয়া শোন।"
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেলো। খানিকটা এগিয়ে এসে বলল,
"কিছু লাগবে ভাইয়া?"
"হ্যা। এক গ্লাস পানি লাগবে। তুবাকে পানি নিয়ে আমার ঘরে আসতে বলতো।"
রিয়া হ্যা সূচক মাথা নেড়ে সিঁড়ি মারিয়ে দোতলায় চলে গেলো। কৌশিকও লম্বা লম্বা কদম ফেলে চলে গেলো নিজের ঘরে। পানি খাওয়ার বাহানায় তুবাকে এক ঝলক দেখার উদ্দেশ্যে চুপচাপ বসে রইলো বিছানায়। তবে কৌশিককে হতাশ করে দিয়ে মিনিট পাঁচেক পর পানির গ্লাস হাতে কনকচাঁপা বেগম হাজির হলেন। পানির গ্লাস হাতে তুবার পরিবর্তে নিজের মা'কে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো কৌশিক। হতাশ সুরে বললো,
"তুমি কেনো কষ্ট করতে গেলে মা? বাড়িতে আরও মানুষ আছে।"
কনকচাঁপা বেগম কোনো জবাব দিলেন না। বরং কৌশিকের কথা সম্পুর্ন উপেক্ষা করে নিজ উদ্যোগে বললেন,
"তাড়াতাড়ি নিচে আয়। মৌমিতার চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।"
কৌশিক আর কথা বাড়ানোর সুযোগ পেলো না। কনকচাঁপা বেগম সঙ্গে সঙ্গে নিচে চলে গেলেন। নিরুপায় হয়ে হতাশার নিঃশ্বাস ছাড়লো কৌশিক। অগত্যাই আবারও পা বাড়ালো বিয়ের স্টেজের দিকে।
-
-
হাসিখুশি বাড়িটাতে মুহুর্তেই শোকের ছায়া নামলো যেনো। পরিবারের চাপা কান্না আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠলো পরিবেশ। সারাদিন শেষে এই মাত্র তুবার দেখা মিললো এবার। মৌমিতাকে রাতুল তখন গাড়িতে ওঠাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহুর্তে কোথা থেকে যেনো ছুটে এলো তুবা। অদৃশ্য এক ঝড়ের বেগে আছড়ে পড়লো মৌমিতার বুকে। সেকেন্ডের ব্যবধানে বাঁধ ভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়লো মেয়েটা। সে কি করুন তার কান্নার চাপা আর্তনাদ। মৌমিতা সবে মাত্র চোখের পানি মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করেছিল। ঠিক এমন সময় তুবাকে এমন করুন সুরে কাঁদতে দেখে আবারও চোখ দুটো ভিজে উঠলো। মৌমিতা তুবার মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
"কাঁদিস না বোন। আমি তো আবার আসবো। কালকেই তো চলে আসবো আবার।"
"তুমি যেও না আপু। আগে সব ঠিক করে দাও। নাহলে আমি মরে যাবো।"
পাগলের মতো মাথা ঝাকাতে ঝাকাতে বললো তুবা। বিনিময়ে মৌমিতা ব্যাথাতুর হাসলো। বুক থেকে টেনে তুবার মুখটা তুলে দুই হাতে আগলে ধরলো। বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
"সব তো ঠিকই আছে।"
"নাহ্! কিচ্ছু ঠিক নেই। সব এলোমেলো হচ্ছে। আমাকে বাঁচাও আপু। আমি মরে যাবো। বিশ্বাস করো, আমি মরে যাবো। আজই মরে যাবো। আমাকে আর খুঁজে পাবে না।"
তুবার এমন উদ্ভট কথা শুনে বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠলো মৌমিতার। সাজানো গেইটের রঙবেরঙের আলোয় তুবার বাম হাতে চার আঙ্গুলের স্পষ্ট দাগ দেখতে পেলো। দেখে মনে হচ্ছে কেউ শরীরের সম্পুর্ন শক্তি দিয়ে কষে চড় মেরেছে মেয়েটার গালে। আচমকা এহেন দৃশ্য দেখে ভ্রুদ্বয় কুঁচকে গেলো মৌমিতার। কৌতুহল নিয়ে কিছু বলবে তার আগেই সেখানে উপস্থিত হলেন ময়না বেগম। মেয়ের হাতটা টেনে ধরে মৌমিতার থেকে ছাড়িয়ে নিলেন। মেকি হেঁসে বললেন,
"আর রাত করিস না মৌ। কাল আমরা সকাল সকাল তোর শ্বশুর বাড়ি চলে যাবো।"
ময়না বেগমের উপস্থিতি সবকিছু ঘেঁটে দিলো যেনো। কথা আগানোর আর সুযোগ পেলো না মৌমিতা। এক পলক তাকালো তুবার দিকে। কেমন অসহায়ের মতো ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে। ওর চোখ দুটো যেনো কিছু বলতে চাইছে। তবে ময়না বেগমের উপস্থিতি মেয়েটার জবানে লাগাম টেনেছে। কথা বলার উপায় না পেয়ে গাড়িতে বসে পড়লো মৌমিতা। যেটাই হোক, কালতো সে আবার এবাড়ি আসছেই। তখন নাহয় দেখে নেবে বিষয়টা।
-
-
রাত তখন খুব বেশি হয়নি। এই বড়জোর দশটা। আত্নীয় স্বজন বাড়ি থেকে বিদায় নিয়েছে বেশ কিছুক্ষন আগে। আপাতত ভুঁইয়া মঞ্জিল নিস্তব্ধ, কোলাহল বিহীন। সারাদিনের ব্যাস্ততা শেষে বাড়ির তিন কর্তা মাত্রই বসার ঘরের সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছেন। এমন সময় লুৎফর সাহেব আগ বাড়িয়ে কথা তুললেন,
"এবার কি করবে ভাইয়া?"
"বড়ো হিসেবে যেটা করা আমার কর্তব্য, সেটাই করবো।"
ভদ্রলোকের রাশভারি কন্ঠে থেমে গেলেন লুৎফর সাহেব। আঁড়চোখে একবার তাকালেন নিজের ছোটো ভাইয়ের দিকে। তাওহীদ সাহেব অপর পাশের সোফায় মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। চোখ মুখ জুড়ে ছড়িয়ে আছে লজ্জার আভাস। ঠিক তেমন জামাল সাহেবের চেহারাও ভিষণ অপ্রস্তুত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে তিনি ফের বলে উঠলেন,
"একবার ছেলে মেয়ের সাথে কথা বলে বিষয়টা হ্যান্ডেল করলে ভালো হতো না? দু'জনেই তো ছোটো। ভুল করে ফেলেছে।"
"একদম প্রশ্রয় দেবে না ওদের। অন্তত এই বিষয়ে তো কোনো প্রশ্রয় নয়।"
আকস্মিক গর্জে উঠলেন জামাল সাহেব। রাগে চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে ভদ্রলোকের। বড়ো ভাইয়ের এমন তর্জন গর্জনে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললেন লুৎফর সাহেব। ঠিক এমন সময় সেখানে ক্লান্ত শরীরে উপস্থিত হলো কৌশিক। বাড়ির আবহাওয়া না বুঝেই তাওহীদ সাহেবের পাশে ধপ করে বসে পড়লো। ক্লান্ত দেহটা সোফায় ছেড়ে দিয়ে পুরো বাড়িতে একবার নজর বুলালো। কিন্তু আশ্চর্য! এখনও পর্যন্ত তুবার দেখা নেই। ছেলের উপস্থিতি এক প্রকার উপেক্ষা করেই জামাল সাহেব বললেন,
"লুৎফর! পরশু ওনাদের আসতে বল। কথাবার্তা সব যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সারতে চাই। আমি আর দেরি করবো না।"
আচমকা বাবার কন্ঠ শুনে ভ্রুদ্বয় কুঁচকে গেলো কৌশিকের। এই মুহুর্তে বাড়িতে ঠিক কি নিয়ে কথা হচ্ছে সে বুঝতে পারছে না। কৌতুহল দমাতে না পেরে কৌশিক প্রশ্ন করেই বসলো,
"কি বিষয়ে কথা হচ্ছে?"
"তুবার বিয়ের বিষয়ে। খুব ভালো একটা সম্বন্ধ এসেছে। ভাবছি, খুব তাড়াতাড়ি তুবার বিয়েটা দিয়ে দেবো।"
জামাল সাহেবের জবাব শুনে সহসাই চমকে উঠলো কৌশিক। হৃদপিণ্ডটা আচমকাই কেঁপে উঠলো যেনো। বুকের ভেতরে কিছু একটা স্ব জোরে কামড়ে ধরলো। কৌশিক গলা উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠলো,
"হোয়াট! বিয়ে মানে? কিসের বিয়ে? এ আবার কি নতুন নাটক?"
"কোনো নাটক নয়। বাড়ির বড় কর্তা হিসেবে সুপাত্রে নিজের কণ্যা দান করা আমার দায়িত্ব। আমি নিজের দায়িত্ব পালন করছি।"
কৌশিক থমকালো। চেহারায় যেনো আমাবস্যার আধার নামলো। ওর আর বুঝতে বাকি নেই কাহিনি কি। বাড়ির সবাই নিশ্চয়ই ওদের সম্পর্কের বিষয়ে জেনে গেছে। আর সেজন্যই এমন অদ্ভুত বিহেব করছে। কৌশিক রক্ত লাল চোখে তাকালো নিজের মায়ের দিকে। যিনি এই মুহুর্তে ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাচ্ছেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আঁড়চোখে এদিকটাও পর্যবেক্ষন করছেন। পরিবারের সদস্যদের এমন গা ছাড়া ভাব দেখে রাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালো কৌশিক। মৃদু গর্জন তুলে বলল,
"কোনো বিয়ে হবে না। তুবার বিয়ে তো কোনো মতেই হবে না। অন্তত আমি বেঁচে থাকতে হতে দেবো না।"
"কেনো দেবে না? ছেলে ভালো। তুবার জন্য একদম যোগ্য একজন পাত্র।"
"আর তোমার ছেলে কোনদিক থেকে অযোগ্য বাবা?"
"তুমি ওর বড়ো ভাই। এটাই তোমার অযোগ্যতা।"
"চাচাতো ভাই। বাক্যটা সম্পুর্ন করো।"
বাপ ছেলের তর্ক বির্তকে ভারি হয়ে উঠলো বসার ঘরের পরিবেশ। একটা চাপা গুমোট ভাব ছড়িয়ে পড়লো ঘরের আনাচে কানাচে। বাড়ির প্রতিটি সদস্য হতভম্ব নজরে তাকিয়ে দেখে গেলো শুধু। জামাল সাহেব বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন তৎক্ষনাৎ। ছেলের দিকে আঙ্গুল তাক করে শাসিয়ে বললেন,
"অসভ্যতামির সব সীমা ছাড়িয়ে গেছো তুমি। এখন কি না বাবার মুখে মুখে তর্ক করছো?"
"স্যরি বাবা। কিন্তু তুমি আমার সামনে দ্বিতীয় কোনো রাস্তা খোলা রাখোনি। তোমরা আমারই চোখের সামনে আমারই বউকে অন্য কারোর হাতে তুলে দেবে। সেটা কি আমি মেনে নেবো? কখনোই না। কোনোদিন মানবো না। বরং আগুন লাগিয়ে দেবো এই বাড়িতে। সবকিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেবো।"
কথাগুলো শেষ হতেই আচমকা জোরেশোরে থাপ্পড় পড়লো কৌশিকের গালে। থাপ্পড় খেয়ে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো কৌশিক। তবে জায়গা থেকে এক চুলও নড়লো না। বাড়ির সকলে হতবাক। এদিকে একটা থাপ্পড়েও রাগ কমেনি জামাল সাহেবের। তিনি ফের গলা ছেড়ে চিৎকার করে উঠলেন,
"কোন সাহসে ওকে নিজের বউ দাবি করো তুমি? এতো সাহস কে দিলো তোমাকে?"
"আজ থেকে দেড় বছর আগেই বিয়ে করে নিয়েছি ওকে। তাহলে বউ দাবি করলে ক্ষতি কি?"
"আমি মানি না এই বিয়ে। এসব ঠুনকো সম্পর্ক আমাকে একদম দেখাতে আসবে না। বাপ, মা, পরিবারের থেকে লুকিয়ে চোরের মতো বিয়ে করেছো। এটাকে চুরি করা বলে। বিয়ে বলে না।"
"তুমি না মানলেও এটাই সত্যি বাবা।"
"এই ঠুনকো সত্যির কোনো অস্তিত্ব নেই কৌশিক।"
কৌশিক ধৈর্যের সীমা হারিয়ে ফেললো। চিৎকার করে বলে উঠলো,
"আমার ভালোবাসার অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার আমি কাউকে দেইনি। ভালোবেসেছি। বিয়েও করেছি। পুরোটাই দুজনের মর্জিতে হয়েছে।"
এটুকু বলেই ঘুরে তাকালো কৌশিক। সিঁড়ির কাছে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"তুবাকে ডাক তো রিয়া। আজ কথা সামনাসামনি হোক। ওর সম্মতি বিহীন ওর বিয়ে কিভাবে ঠিক করা হয়? সেটারও বিচার করা হোক।"
তবে রিয়া সেখান থেকে এক চুলও নড়লো না। বরং অপরাধীর ন্যায়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। রিয়াকে পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কৌশিক ধমকে উঠলো,
"কি রে যা! ডেকে আন ওকে।"
"তুবা বাড়িতে নেই।"
আকস্মিক জামাল সাহেবের থমথমে আওয়াজে কৌশিকের মাথায় বজ্রপাত ঘটলো যেনো। চমকে পেছন ফিরে নিজের বাবার দিকে চাইলো। বুকটা কেঁপে উঠলো কৌশিকের। তুবা বাড়িতে নেই মানে? কোথায় গেছে? কেনো গেছে? তবে কি এই ঝামেলার জের ধরে তুবাকে বাড়ি থেকে সরিয়ে দিয়েছে সবাই? দূরে পাঠিয়ে দিয়েছে কৌশিকের থেকে? ভাবতেই বুকের ভেতর মুচড়ে উঠলো কৌশিকের। দম বন্ধ হয়ে এলো। একটা অদৃশ্য হাত যেনো ছেলেটার গলা চেপে ধরলো। শ্বাস কষ্ট রোগীর মতো জোরে জোরে শ্বাস টানতে টানতে বলল,
"বাড়িতে নেই মানে? কোথায় পাঠিয়ে দিয়েছো ওকে?"
"সেটা তোমাকে বলতে আমি আগ্রহী নই।"
ব্যাস! কৌশিকের ধরে রাখা ধৈর্যের লাগাম এবার পুরোপুরি বাঁধন হারা হলো। সামনে রাখা ছোটো খাটো কাঁচের টি-টেবিলে স্ব জোরে লাথি মারলো কৌশিক। মুহুর্তেই টেবিলটা উল্টে পড়ে ভেঙে খান খান হয়ে ছড়িয়ে পড়লো পায়ের নিচে। কাঁচের কিছু টুকরো ছিটকে এসে গেঁথে গেলো কৌশিকের পায়ে। গলগলিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করলো পা থেকে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে কৌশিক গর্জন তুলে বলল,
"আমার তুবাকে চাই বাবা। যে কোনো মূল্যে চাই। আর যদি ওকে আমি না পাই, আই সোয়্যার! সবকিছু ধ্বংস করে দেবো আমি। কিচ্ছু বাঁচবে না আমার ক্রোধ থেকে। তোমরাও না।"
গর্জন তুলে কথাগুলো বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে।
চলবে?