#নিষিদ্ধ_প্রণয় (সিজন ২)
#পর্বঃ৩৯
#কলমে_সোনালিকা_আইজা
⛔কপি করা সম্পুর্ন নিষিদ্ধ। চাইলে শেয়ার দিয়ে পাশে থাকতে পারেন।⛔
****************
খাটের সাথে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে আছে তুবা। চোখে মুখে তার চরম বিস্ময়। চাহনিতে বাঁধ ভাঙা খুশির জোয়ার। ব্যান্ডেজে মোড়ানো হাতটা পেটের ওপর আলতো করে রেখে নতুন অস্তিত্ব অনুভব করছে তুবা। এটা ওর সন্তান। কৌশিকের অস্তিত্ব। ওদের ভালোবাসার একমাত্র চিহ্ন। ভাবতেই অত্যাধিক খুশিতে চোখ জ্বলে উঠছে তুবার। ঠিক সেই মুহুর্তে ঘরে আগমন ঘটলো কৌশিকের। ঘরে ঢুকেই ঠাস করে দড়জা আটকে দিলো। দড়জা আটকানোর বিকট শব্দে ধ্যান ভাঙলো তুবার। চোখের সামনে প্রিয় মানুষকে দেখে আবেগের রেশ তরতরিয়ে কয়েক গুণ বেড়ে গেলো। কৌশিক সময় নিলো না। দৌড়ে গিয়ে এক প্রকার ঝাপিয়ে পড়লো তুবার ওপর। দুই হাতে তুবার মুখটা আগলে ধরে পাগলের মতো চুমু খেলো পুরো মুখ জুড়ে। মন প্রাণ ভরে চুমু খেয়ে কপালে কপাল ঠেকালো কৌশিক। আহত কন্ঠে বললো,
"তখন অজ্ঞান কেনো হয়ে গেলি জান? জানিস, আমি কত ভয় পেয়েছিলাম?"
"আমি মা হবো কৌশিক ভাই? আপনার অস্তিত্ব বেড়ে উঠছে আমার ভেতরে? আমি সত্যিই মা হবো?"
তুবার কন্ঠে সংশয়। কৌশিকের কথা সম্পুর্ন উপেক্ষা করে আপন মনে প্রশ্ন ছুড়লো তুবা। যেনো, এই অনাকাঙ্ক্ষিত সত্যিটা সে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না। তুবার বিভ্রান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আলতো হাসলো কৌশিক। তুবাকে ছেড়ে দিয়ে সামান্য পিছিয়ে বসলো। এরপর দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে ডাকলো,
"বুকে আয়তো জান। তোকে বুকে নিয়ে বাকি কথা বলবো।"
তুবা কোনো বাহানা দেখালো না। বরং কৌশিক ডাকতেই বাধ্য মেয়ের মতো ছুটে গেলো স্বামীর বুকে। কৌশিকের উরুর ওপর বসে দুই পা দিয়ে কোমর পেচিয়ে ধরলো তুবা। বিড়াল ছানার মতো নুইয়ে পড়লো প্রসস্ত বুকে। কৌশিক দুই হাতে আগলে নিলো তুবাকে। মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
"তুই ঠিক আছিস জান?"
এই একটা বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে ছিলো এক আকাশ সমান ভালোবাসা। এক পৃথিবীর দুশ্চিন্তা। প্রিয় মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে হাজারো ব্যাকুলতা। কৌশিকের এই ছোটো-ছোটো কেয়ার গুলো তুবাকে বড্ড বেশি আপ্লুত করে। শীতলায় বুক ভরে ওঠে। ভাবতে ভাবতে ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো তুবা। এক আঙ্গুলে কৌশিকের লোমশ বুকে আঁকিবুঁকি করতে করতে বলল,
"আমি প্রেগনেন্ট। অসুস্থ নই। এখনই এতো চিন্তা?"
"তোর জন্য চিন্তা আমার আজন্মকালের জান। এখন তো আরও একজন সদস্য বাড়লো। এবার থেকে একসাথে দুজনের চিন্তা করতে হবে।"
তুবা কোনো জবাব দিলো না। চুপটি করে পড়ে রইলো প্রসস্ত বুকে। কয়েক সেকেন্ড সময় কাটলো পিনপতন নীরবতায়। নীরবতা ছিন্ন করে হঠাৎ কৌশিক বলে উঠলো,
"ঘটনাটা কিভাবে ঘটলো বলতো জান? সেইফ টাইম ছাড়া বাকি সময়গুলোতে তো আমি যথেষ্ট সতর্ক ছিলাম। তাহলে?"
এমন আবেগঘন মুহুর্তে কৌশিকের এহেন প্রশ্ন শুনে ভড়কে গেলো তুবা। আবেগ অনুভুতি সব ভেঙে গুড়গুড় করে ছড়িয়ে পড়লো। তুবা তৎক্ষনাৎ কৌশিকের বুক থেকে মাথা তুললো। ভ্রুদ্বয় কুঁচকে বলল,
"আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন?"
"তওবা! সন্দেহ কোথায় করলাম? এতো সতর্ক থাকার পরেও ঘটনাটা কিভাবে ঘটলো, শুধু মাত্র এটুকু জানতে চাইলাম।"
"তো ঘটবে না? প্রোটেকশন ছাড়া আদর করতে আসলে ঘটনা তো ঘটবেই। কতবার বলেছি এই কথা। শুনেছেন?"
কৌশিক জিভে কামর দিলো। ভুলটা যে নিজের ছিলো সেটা বুঝতে পেরে নত হলো। হাত দিয়ে পেছন দিকের মাথা চুলকে বলল,
"ইয়ে, না মানে। ওই আর কি।"
তুবা রেগে গেলো। ধাম করে একটা কিল বসিয়ে দিলো কৌশিকের বুকে। কৌশিক ব্যথা পাওয়ার ভঙ্গিতে বুকে হাত রেখে বলল,
"উফ জান পেইন!"
কৌশিকের চোখ মুখের ব্যথাতুর অভিব্যাক্তি দেখে চমকে উঠলো তুবা। তড়িঘড়ি করে বুকের কাছের শার্টের অংশ টেনেটুনে সরাতে লাগলো। অর্থাৎ সে দেখবে আসলেই ব্যথা লেগেছে কি না। কিন্তু দেখার আর সুযোগ পেলো না। সঙ্গে সঙ্গে তুবার ব্যাস্ত হাত দুটো খপ করে ধরে নিলো কৌশিক। তুবার ব্যান্ডেজ করা হাতটা টেনে সামনে এনে আলতো করে চুমু খেলো। এই পর্যায়ে থেমে গেলো তুবা। একদম শান্ত নদীর মতো চুপটি করে বসে রইলো। কৌশিক নরম সুরে প্রশ্ন করলো,
"ব্যথা কি বেশি করছে জান?"
তুবা ডানে বামে মাথা নেড়ে না বোঝালো। কৌশিকের চোখে মুখে অপরাধবোধ ফুটে উঠলো। তখন তুবা জ্ঞান হারানোর পর থেকেই এই অপরাধ বোধ পিষে দিচ্ছে কৌশিকের মন। সবকিছুর জন্য ওর নিজেকে দায়ী মনে হচ্ছে। একরাশ অপরাধ বোধ নিয়ে কৌশিক আহত কন্ঠে বললো,
"আ'ম স্যরি জান।"
"আপনি স্যরি বলছেন কেনো?"
"এই যে, আমার দ্বারা তুই আহত হলি। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়। কিন্তু এর দায়ভার তো আমার।"
বলতে বলতে তুবার ব্যান্ডেজ করা হাতের দিকে ইশারা করলো কৌশিক। তুবা বুঝতে পারলো ছেলেটার অপরাধ বোধের কারণ। খানিকটা এগিয়ে এসে কৌশিকের গলা জড়িয়ে ধরলো তুবা। মাথাটা ঝুঁকিয়ে কৌশিকের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
"এটা একটা এক্সিডেন্ট ছিলো। তাছাড়া, ছুরিটা আমি নিজে গিয়ে চেপে ধরেছিলাম। এখানে আপনার তো কোনো দোষ নেই।"
"তবুও আমি দোষী। আমার দ্বারাই ওই ঘটনার সূত্রপাত। আমার দ্বারা তোর শরীরে আঘাত লেগেছে, এটা ভাবতেই আমার কলিজা ছিড়ে যাচ্ছে।"
"তো ভাববেন না। কেনো ভাবছেন এসব?"
"তুই কষ্ট পেলে আমি যে ঠিক থাকতে পারি না জান।"
কৌশিকের করুন কন্ঠ স্বর বুকের ভেতরটা নাড়িয়ে দিলো তুবার। সে শক্ত করে কৌশিকের গলা জড়িয়ে ধরলো। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি যুক্ত গলার ভাঁজে মুখ গুঁজে বলল,
"এতো কেনো ভালোবাসেন আমাকে, বলুন তো?"
"তোকে ভালো না বেসে যাবো কোথায় বল? তুই যে আমার জান। আমার বেঁচে থাকার কারণ। আমার সুখের এক টুকরো চাঁদের আলো। আমার পুরো পৃথিবী জুড়ে তোর দখলদারি। এখন তো তুই আবার আমার অনাগত সন্তানের মা। তোকে ভালো না বাসলে কাকে ভালো বাসবো আমি?"
তুবা তখন আবেগের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। চোখের কোটর ছাপিয়ে অলরেডি টুপটাপ পানি পড়তে শুরু করেছে। ঠিক সেই মুহুর্তে খটখট শব্দে দড়জায় কেউ টোকা দিলো। আচমকা কারোর আগমনের আভাস পেতেই সচকিত হলো তুবা। আবেগ অনুভুতি একপাশে ফেলে সোজা হয়ে কৌশিকের থেকে দুরত্ব রেখে বসলো। কৌশিক সেই অবস্থাতেই গলা ছেড়ে প্রশ্ন করলো,
"কে?"
"ভাইয়া নিচে আসো। বড়ো চাচ্চু তোমাদের ডাকছে।"
কন্ঠটা রিয়ার ছিলো। একদমে কথাগুলো বলেই চলে গেছে মেয়েটা। কৌশিক একবার ঘড়ির দিকে তাকালো। সকাল আটটা বাজে সবে। নয়টার দিকে মৌমিতার শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা। আজ তো ওই বাড়িতে বউভাতের আয়োজন করা হয়েছে। ভাবতে ভাবতে উঠে দাঁড়ালো কৌশিক। তুবার দিকে একহাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
"আমার সাথে চল।"
তুবা দ্বিমত পোষণ করলো না। বরং বাধ্য মেয়ের মতো নিজের হাতটা কৌশিকের হাতে সপে দিলো। কৌশিক স্বযত্নে আগলে নিলো তুবাকে। সেভাবেই পা বাড়ালো নিচের দিকে। ভাবটা এমন যেনো, এই কয়েকটা সিঁড়ি পার হতেও তুবার বিন্দু মাত্র অসুবিধা না হয়।
-
-
বসার ঘরে পরিবারের সবাই একসাথে বসে আছে। সকলের পড়নে নতুন পোশাক। অর্থাৎ, মৌমিতার শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে একেবারে তৈরি হয়ে এসে বসেছে সবাই। জামাল সাহেবের পাশেই বসে আছেন তাওহীদ সাহেব। দুই ভাই কোনো বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে টুকটাক আলোচনা করছেন। ঠিক সেই মুহুর্তে তুবাকে নিয়ে বসার ঘরে হাজির হলো কৌশিক। ছেলে মেয়ের উপস্থিতি টের পেয়ে কথা বন্ধ করে সামনে তাকালেন জামাল সাহেব। কৌশিককে তুবার হাত ধরে রাখতে দেখে মুহুর্তেই মেজাজটা চটে গেলো ভদ্রলোকের। তিনি গলা ছেড়ে খেঁকিয়ে উঠলেন,
"এ্যাই ছেলে এ্যাই! ওর হাত কেনো ধরেছো তুমি? তুমি কেনো ওর হাত ধরেছো?"
"অধিকার আছে তাই ধরেছি।"
"কিসের অধিকার হ্যা? কোন অধিকার? এখনও ভাই আছো তুমি ওর? যে অধিকার দেখাচ্ছো?"
"তুমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছো বাবা। এজন্য স্মৃতি শক্তি কমে গেছে। আমি ওর ভাই নই জামাই এখন। কথাটা কাগজে বড়ো করে লিখে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখবো?"
বাপ ব্যাটার তর্ক দেখে উপস্থিত সকলে ঠোঁট টিপে হাসছে। তাওহীদ সাহেব হাসি থামাতে মাথা নিচু করে রেখেছেন। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন হাসি আটকানোর। যা কিছুই হয়ে যাক, বড় ভাইয়ের সামনে একদমই হাসা যাবে না। এদিকে ছেলের বেহায়াপনা দেখে রাগে কিড়মিড় করে উঠলেন জামাল সাহেব। ছেলের দিকে আঙ্গুল তাক করে শাসিয়ে বললেন,
"কোথাও কিচ্ছু ঝোলাতে হবে না। চুরি করে বিয়ে করেছো। বুঝেছো? চুরি চুরি। তুমি একটা চোর। আবার বড় বড় কথা বলছো? এ্যাই হাত ছাড়ো ওর। ছাড়ো বলছি ওর হাত। আনুষ্ঠানিক ভাবে তোমাদের বিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত তুমি তুবার থেকে দূরে থাকবে।"
"সম্ভব নয় বাবা। এজনমে আমি ওর হাত ছাড়ছি না। ইনফ্যাক্ট! পরজনমেও ছাড়বো না।"
বলতে বলতে তুবাকে কনকচাঁপা বেগমের কাছে বসিয়ে দিলো কৌশিক। এরপর নিজে গিয়ে তুবার গা ঘেঁষে পাশে বসে পড়লো। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে শুরু থেকেই মাথা নিচু করে রেখেছে তুবা। বাপ চাচাদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। লজ্জা, ভয়ের সংমিশ্রণে খুবই বিশ্রী একটা অনুভুতি হচ্ছে। অথচ এই লোকটাকে দেখো। ভয়ের ভ ও লোকটার ভেতরে নেই। আর লজ্জা কি জিনিস সেটা হয়তো কৌশিক নামক প্রাণীটা জানেই না।
এদিকে ছেলের নির্লজ্জতার কাছে অতিষ্ট হয়ে হাল ছেড়ে দিলেন জামাল সাহেব। ছেলেকে এক প্রকার উপেক্ষা করেই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেন মেয়ের শ্বশুর বাড়ি কি কি নিয়ে যাবেন। আলোচনা শেষে সবাইকে জলদি জলদি গাড়িতে আসতে বলে জামাল সাহেব সবার আগে বাড়ি ছাড়লেন। তুবাও যেতে চেয়েছিল কিন্তু ওর শারীরিক দুর্বলতা এখনও কাটেনি বিধায় ডাক্তার ওকে রেস্টে থাকতে বলেছে। হাত কেটে বেশ খানিকটা রক্ত ঝরে যাওয়ায় কিছুক্ষণ পরপরই মেয়েটার মাথা চক্কর দিয়ে উঠছে। এজন্য আর ওকে নিয়ে যাওয়ার সাহস দেখালেন না জামাল সাহেব। তুবার দেখাশোনা করার জন্য কনকচাঁপা বেগম বাড়িতেই থেকে গেলেন। অনিচ্ছা থাকার স্বত্বেও কৌশিককে যেতে হলো বাপ চাচাদের সাথে। একমাত্র বোনের বউভাত। ভাই হিসেবে ওর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। আর মৌমিতার প্রতি কোনো দায়িত্ব কৌশিক অবহেলা করে না।
তবে যাওয়ার আগে তুবার দায়িত্ব কনকচাঁপা বেগমকে ভালো করে বুঝিয়ে দিয়ে গেলো কৌশিক। মায়ের হাত চেপে ধরে আবদার করে বলল,
"প্লিজ মা। আমি না আসা পর্যন্ত ওর খেয়াল রেখো। হাত কেটে গেছে ওর। ও তো হাত দিয়ে খেতে পারবে না। একটু কষ্ট করে খাইয়ে দিও। মাথা ঘুরলে একটা গ্লুকোজ গুলিয়ে খাইয়ে দিও। আর বেশি টইটই যেনো না করে। তোমার সাথে বসিয়ে টিভি দেখতে লাগিয়ে দিও। ও মুভি পেলে কয়েক ঘন্টা স্থির হয়ে থাকবে। আমি এর মাঝেই চলে আসবো।"
তাড়াহুড়ো করে এটুকু বলেই এক প্রকার দৌড়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো কৌশিক। ছেলের দুরন্ত কদম জোড়ার দিকে নির্মিশেষ তাকিয়ে রইলেন কনকচাঁপা বেগম। কত সাধ করেই না মায়ের কাছে আবদার করলো ছেলেটা। শুধু কি আবদার? উহুম! আবদারের আড়ালে লুকিয়ে ছিলো কত-শত চিন্তা। ছেলেটার বলা এক একটা শব্দের ভাঁজে লুকিয়ে ছিলো আকাশ সমান ভালোবাসা। প্রিয় মানুষের প্রতি ব্যাকুলতা। তাকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখার প্রাণপণ প্রয়াস। ভাবতে ভাবতে কনকচাঁপা বেগম একটা লম্বা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লেন। শুরুতে না বুঝলেও এখন তিনি বুঝতে পারছেন, তার ছেলে তুবার প্রতি ঠিক কতটা আসক্ত। এই আসক্তি যে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে প্রাণ ভিক্ষা চাওয়ার মতো। সেটা বুঝতেও তার আর বাকি নেই।
-
-
বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা পার্কে এসে বসে আছে রাইমা। চেহারাটা বেজায় উদাসীন। দুই চোখে টলমলে অশ্রু। কৌশিকের সাথে তুবার প্রেম ঘটিত সম্পর্ক আছে সেটা রাইমা জানতো। এরপর হঠাৎ করে ওদের গোপন বিয়ের কথাও জেনে যায়। তবুও রাইমা হাল ছাড়েনি। ভেবেছিল, গোপন বিয়েই তো। চিকন সুতোর মতো সম্পর্ক। এক টান দিলেই ছিড়ে যাবে। এতো আহামরি কিছু নয়। কিন্তু ওদের সম্পর্ক যে এতটা ঘনিষ্ট পর্যায়ে চলে গেছে সেটা রাইমার কল্পনাতেও ছিলো না। প্রেম, বিয়ে, দৈহিক মিলন, এমনকি বাচ্চা। বাচ্চায় এসে ঠেকেছে সম্পর্কের রেখা। ভাবতেই বুকটা মুচড়ে উঠলো রাইমার। অবাধ কান্নারা হুড়মুড়িয়ে তীব্র বর্ষনে রুপ নিলো। আবেগ সামলাতে না পেরে দুই হাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে ফেললো রাইমা। কাঁদতে কাঁদতে গলা বসে গেছে মেয়েটার। তবুও কান্না থামছে না।
রাইমা যখন আপন মনে কান্নায় বিভোর ঠিক সেই সময়ে কেউ একজন আলতো করে হাত রাখলো রাইমার কাঁধে। আচমকা কাঁধে কারোর হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে মাথা তুলে চাইলো রাইমা। নিজের পেছনে সিফাতকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিলো। সিফাত চুপচাপ গিয়ে রাইমার পাশে বসলো। পকেট থেকে রুমাল বের করে এগিয়ে দিয়ে বলল,
"নাও! মনে যা আছে সব উগড়ে দিতে পারো। এতে তোমার মনটা হালকা হবে। ভয় নেই। আমি কাউকে কিছু বলবো না। ভরসা রাখতে পারো।"
এটুকু বলেই রুমালটা রাইমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত চোখে তাকালো সিফাত। রাইমা আস্তে ধীরে রুমালটা নিজের হাতে নিলো। পানিতে টইটুম্বুর দুই চোখ মুছে রুমালটা দিয়ে নাক মুছলো। ভদ্রতার খাতিরে রুমাল দিয়ে সেটার এমন অপব্যবহার দেখে গা গুলিয়ে উঠলো সিফাতের। সে নাক সিটকে অন্য দিকে তাকালো। এগুলো দীর্ঘক্ষন দেখলে ছেলেটা পাক্কা এখানে বমি করে দেবে। রাইমা চোখ নাক মুছে ভাঙা গলায় বলতে শুরু করলো,
"ভালোবাসা এতো কঠিন কেনো বলুন তো? কি না করলাম আমি কৌশিক ভাইকে পেতে? নিজের ব্যাক্তিত্ব পর্যন্ত বিসর্জন দিলাম। নিজেকে ছ্যাচরা হওয়ার চরম পর্যায়ে নামিয়ে নিয়ে এসেছি। আত্মসম্মানের কথা ভুলে বারে বারে তার সামনে নত হয়েছি। তবুও মানুষটা আমার মন বুঝলো না। কোনোদিক থেকে পেরে না উঠে মৌ আপুর হলুদের দিন ওদের একান্ত মুহুর্তের কথা রেকর্ড করেছি। সেটা কত কৌশলে ফুপা, ফুপি আর ময়না আন্টিকে শুনিয়েছি। কতটা রিস্ক নিয়ে কাজটা করেছি জানেন?
সফলতার পথেই ছিলাম। ওদের মাঝে প্রেম ঘটিত সম্পর্ক আছে জেনে ফুপা বেঁকে বসেছিলেন। ময়না আন্টি চড় পর্যন্ত মেরেছে তুবাকে। আমার সাথে আমার বাড়িতেও পাঠিয়ে দিয়েছে। ভেবেছিলাম এবার হয়তো আমি সফল হবো। তুবার বিয়ে খুব তাড়াতাড়ি অন্য কোথাও হয়ে যাবে। তখন আমার রাস্তা ফাঁকা। শত লাঞ্ছনা বঞ্চনার পরে আমি আমার কৌশিক ভাইকে নিজের করে পাবো। কিন্তু সেটা আর হলো কোথায়? কিভাবে যেনো কৌশিক ভাই তুবার খবর পেয়ে গেলো। আর সবকিছু শেষ হয়ে গেলো।"
বলতে বলতে আবারও বাঁধ ভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়লো রাইমা। সিফাত শান্ত চোখে তাকিয়ে দেখলো শুধু। কোনো প্রকার শান্ততা দেয়ার চেষ্টা করলো না। এমনকি ওকে থামানোর সামান্য প্রচেষ্টা পর্যন্ত করলো না। কাঁদছে কাঁদুক। এই কান্না ও নিজের হাতে তৈরি করে নিয়েছে। এখানে কারোর হাত নেই। এরই মাঝে রাইমা কাঁদতে কাঁদতে ধরা গলায় বলল,
"শুনেছি মন থেকে চাইলে নাকি সবকিছু পাওয়া যায়। আমিও তো কৌশিক ভাইকে মন থেকে চেয়েছিলাম। তাহলে তাকে কেনো পেলাম না সিফাত ভাই?"
চলবে?