#নিষিদ্ধ_প্রণয় (সিজন ২)
#অন্তিম_পর্ব
#কলমে_সোনালিকা_আইজা
সময়ের স্রোত আপন গতিতে এগিয়ে গেলো আরও কিছু দূর। তুবার প্রেগনেন্সির শেষ সময় চলছে। নয় মাসের ভরা পেট। ছোটোখাটো দেহটা উঁচু পেটের ভারে নুইয়ে পড়েছে যেনো। বর্তমানে মেয়েটার চলাফেরা করা খুব কঠিন। অবশ্য কৌশিক ওকে একা কখনোই চলাফেরা করতে দেয় না। যতক্ষণ সময় ছেলেটা বাড়িতে থাকে, সবসময় তুবার সাথে ছায়ার মতো লেগে থাকে। অফিসে গেলে দায়িত্ব পরিবারের হাতে দিয়ে যায়। এই যেমন, আজকেও নিজের বউ বাচ্চার দায়িত্ব মায়ের কাঁধে তুলে দিয়ে অফিসে গেছে কৌশিক।
রাত তখন প্রায় নয়টা ছুঁই ছুঁই। বসার ঘরের সোফায় বসে টিভি দেখছিল তুবা। সবাই খাওয়া দাওয়া সেরে যার যার ঘরে চলে গেছে। একমাত্র তুবাই এখানে বসে আছে কৌশিকের আশায়। তুবার অপেক্ষার অবসান ঘটলো আরও বেশ কিছুক্ষণ পর। কৌশিক বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে তখন রাত প্রায় সাড়ে নয়টা। ক্লান্ত দেহটা টেনে নিয়ে বসার ঘরে আসতেই সবার আগে নজরে পড়লো তুবার মুখ। বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে টিভির দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে। ভাবটা এমন, যেনো পৃথিবী উল্টে গেলেও এই মুহুর্তে তার টিভি থেকে চোখ সরানো যাবে না। কৌশিক ছোট্ট করে দম নিয়ে এগিয়ে এলো। এক হাতে তার ল্যাপটপের ব্যাগ। আর অন্য হাতে ফুটকা। সন্ধ্যায় তুবা ফোন করে ফুচকা আনার কথা বলেছিল। এটা আনতে গিয়েই কৌশিকের আধাঘন্টা দেরি।
পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে দুই হাতের জিনিসপত্র টেবিলের ওপর রাখলো কৌশিক । এরপর ধপ করে শুয়ে পড়লো তুবার কোলে। সেকেন্ডের ব্যবধানে ঠোঁট ছোঁয়ালো উঁচু পেটে। এই পর্যায়ে টিভি থেকে দৃষ্টি সরালো তুবা। স্বামীর পাগলামো দেখে একবার মুচকি হাসলো। ধীর কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
"আজ এতো দেরি কেনো?"
"তোর জন্য ফুচকা আনতে গেছিলাম। তোর পছন্দের ফুচকাওয়ালার দোকান তো আমার অফিস থেকে উল্টো পথে। তাই কিছুটা দেরি।"
তুবা আর কথা বাড়ালো না। কৌশিকের একটা হাত টেনে ধরে বলল,
"আচ্ছা বেশ। এবার চলুন খেয়ে নেবেন। আমিও আপনার সাথে খাবো।"
কৌশিক সময় নষ্ট করলো না। সঙ্গে সঙ্গে উঠে, এক হাতে তুবাকে আগলে নিলো। এরপর একটা চেয়ার টেনে তুবাকে বসিয়ে দিয়ে নিজে তুবার মুখোমুখি হয়ে বসলো। খাবার আগে থেকেই বেড়ে রাখা ছিলো। সোজা হাত ধুয়ে তুবাকে খাইয়ে দিতে লাগলো। খাওয়ার এক পর্যায়ে তুবা মিনমিন করে প্রশ্ন করলো,
"একটা প্রশ্ন করি?"
"হুম বল।"
" আমি না থাকলে আপনি কি অন্য কাউকে এভাবে নিজের হাতে খাইয়ে দেবেন?"
"মানে?"
কৌশিকের কন্ঠে প্রশ্ন। ইতিমধ্যে সমতল কপালে দুই তিনটা ভাজ পড়েছে। মুখের এক্সপ্রেশনে এটা স্পষ্ট যে, তুবার কথা কৌশিকের চতুর মস্তিষ্ক ঠিক ধরতে পারেনি। তুবা একটা ঢোক গিলে মিনমিন স্বরে বললো,
"না মানে, আমার ডেলিভারির সময় তো এগিয়ে এসেছে। আর ডেলিভারির ওই মুহুর্তটা প্রতিটা মেয়ের জীবনে খুবই ক্রিটিক্যাল সময়। জীবন মরনের মাঝামাঝি অবস্থায় থাকে মায়ের জীবন। তখন যদি আমি প্রকৃতির নিয়মের কাছে হেরে যাই? তখন আপনি কি করবেন? আপনি কি আমার শূন্যস্থান পূরণ করতে আবার বিয়ে করবেন? তাকে.............."
তুবা নিজের কথা শেষ করতে পারলো না। কথার মাঝেই আচমকা প্লেট ভাঙার ঝনঝন শব্দে দৃশ্যমান রুপে কেঁপে উঠলো। চকিত নজরে পাশে তাকাতেই দেখতে পেলো ভাত সহ প্লেটটা কয়েকশত টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে ফ্লোরে। তুবা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো কৌশিকের দিকে। সঙ্গে বিদ্যুৎ গতিতে একটা শক্ত পোক্ত থাপ্পড় পড়লো তুবার গালে। থাপ্পড় খেয়ে হতভম্ব তুবা ছলছল নয়নে চাইলো কৌশিকের দিকে।
কৌশিকের চোখ দিয়ে যেনো আগুন ঝরছে। ধারালো চোয়াল জোড়া লোহার মতো শক্ত হয়ে গেছে। হুট করেই তুবার নরম গাল শক্ত করে চেপে ধরলো কৌশিক। অত্যাধিক রাগে চিৎকার করে উঠলো,
"হাউ ডেয়ার ইউ তুবা? তোর সাহস কি করে হলো মরার কথা বলার? তুই আমার সামনে এতো নিঃসংকোচে মরার কথা কিভাবে বললি? হাউ?"
চিৎকার করে কথাগুলো বলতে বলতে হাতের থাবায় কাচের গ্লাসটাও ফেলে দিলো কৌশিক। ফের কাচ ভাঙার ঝনঝন শব্দে কেঁপে উঠলো তুবা। ভয়ে বুক কামড়ে ধরেছে মেয়েটার। কৌশিকের থেকে সে সবসময় আদর আর যত্নই পেয়ে এসেছে। আজ হঠাৎ ওর এই কঠিন রুপ তুবা ঠিক মেনে নিতে পারছে না। ভয়ে হৃদপিণ্ড লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে আসবে যেনো। ইতিমধ্যে ভাঙচুর এবং কৌশিকের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে বাড়ির সবাই নিজেদের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। ঘটনা বুঝতে সকলে উৎসুক নজরে চাইলো ছেলে মেয়ের দিকে। সকলকে উপেক্ষা করে কৌশিক ফের তুবার বাহু চেপে ধরে গর্জে উঠলো,
"মরার খুব সখ তোর তাই না? আমাকে একা করতে চাস? একবার এটা ভেবেছিস, তোকে ছাড়া আমি বাঁচবো কিভাবে? আমার দেহে তো অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যাবে। বেঁচে থাকতে পারবো আমি? বিয়ে তো বহু দূরের কথা।"
চিৎকার করে এটুকু বলেই থেমে গেলো কৌশিক। শক্ত ব্যাক্তিত্বের ছেলেটার বুকটাও কেঁপে কেঁপে উঠছে। একটা অদৃশ্য ভয় হৃদপিণ্ড কামড়ে ধরছে। মুহুর্তেই কৌশিকের কন্ঠ স্বর নরম হয়ে এলো। কম্পিত গলায় আওড়ালো,
"একটা কথা মাথায় ভালো করে ঢুকিয়ে নে। তুবা ছাড়া এই পৃথিবীতে কৌশিকের কোনো অস্তিত্ব নেই। আমার বেঁচে থাকার মাধ্যম তুই। আমার সমাপ্তির কারণও তুই। তুই বিহীন আমি বাঁচতে চাই না জান। তুই ছাড়া আমার আর কিচ্ছু চাই না। কিচ্ছু না। আমার বাচ্চা লাগবে না। শুধু তুই আমার বুকে থাকলে, আমি বাচ্চা বিহীন এক জীবন অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারবো। তোর জীবনের সমাপ্তি ঘটলে আমার নিঃশ্বাসও থমকে যাবে। হসপিটাল থেকে একটা নয়, দুটো লা***শ এই বাড়িতে আসবে। তোর লা**শ বহন করার মতো শক্তি আমার নেই জান। আমি এতোটাও শক্ত নই।"
কৌশিকের গলার কম্পন বেড়ে গেলো। চোখ দুটো স্বচ্ছ পানিতে চিকচিক করছে। তীব্র কান্নায় গলা ধরে এসেছে। কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে। রাগে, জিদে বুকটা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। যে ভয় নয়টা মাস ধরে ধুঁকে ধুঁকে পুড়িয়ে মারছে কৌশিককে। সেই ভয়ের কথা কেমন অনায়াসে বলে দিলো মেয়েটা। একবারও ভাবলো না, এতে কৌশিকের মনে আতঙ্ক বেড়ে যাবে? রাগে দুঃখে হুট করে উঠে দাঁড়ালো কৌশিক। এই মুহুর্তে নিজের আশেপাশে কাউকে সহ্য হচ্ছে না। মনের ব্যাকুলতা কমাতে হনহন করে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে।
এতোক্ষণ ধরে তুবা নিজেকে সামলে রাখলেও এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। কৌশিক বাড়ি থেকে প্রস্থান নিতেই দুই হাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে ফেললো। ও তো কৌতুহল থেকে একটা প্রশ্ন করেছিলো শুধু। এতে যে এতো কিছু ঘটে যাবে সেটা তুবার কল্পনাতেও ছিলো না। তুবা কাঁদতে কাঁদতে একবার সবার দিকে তাকালো। এরপর আস্তে ধীরে উঠে সেখান থেকে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। কিন্তু বিধিবাম! টাইলসের ফ্লোরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পানিতে পা দিয়ে স্লিপ করে দেহের ভারসাম্য হারালো তুবা। আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে তাওহীদ সাহেব ছুটে এলেন মেয়েকে ধরতে। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। তার আগেই ভারি পেট নিয়ে তুবা শব্দ করে পড়ে গেলো ফ্লোরে। প্লেটের ভাঙা চোরা কাচের কিছু খন্ড গেঁথে গেলো নরম দেহে। তীব্র ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো তুবা। হঠাৎ এহেন কান্ডে হতভম্ব সবাই। জামাল সাহেব মাথায় হাত দিয়ে আহাজারি করে উঠলেন। তাওহীদ সাহেব ছুটে আসলেন মেয়েকে তুলতে। চাচাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো নীরব। দুজনে মিলে ধরাধরি করে তুবাকে বসার ঘরে নিয়ে আসলো। কিন্তু অবস্থা গুরুতর। ইতিমধ্যে তুবা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। মা চাচি দের কান্নায় মুহুর্তেই থমথমে হয়ে উঠলো পরিবেশ। জামাল সাহেব আর্তনাদ করে চেঁচিয়ে উঠলেন,
"হায় হায় হায়! আমার কি সর্বনাশ হলো। ওরে নীরব, তাড়াতাড়ি গাড়ি বের করে। ওকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।"
চাচার হুকুমে নীরব ছুটলো গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করতে। বেরোতে বেরোতে কৌশিককে একটা ম্যাসেজও পাঠকলো। তবে ফোন করে কথা বলার মতো ধৈর্য্য নেই। বোনের জ্ঞানহীন দেহ দেখে ছেলেটার শরীর কাঁপছে। বাচ্চা সহ মেয়েটা সুস্থ থাকলেই হয়।
-
-
প্রায় আধাঘন্টার রাস্তা পারি দিয়ে অবশেষে সবাই পৌঁছালো হসপিটালে। এর মাঝে তুবার একবারও জ্ঞান ফেরেনি। চিন্তিত পরিবার চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে অপারেশন থিয়েটারের দিকে। মাত্রই তুবাকে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ঠিক এমন সময় উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে আসলো কৌশিক। কেমন যেনো ছন্নছাড়া, এলোমেলো অবস্থা ছেলেটার। ব্যাস্ত পায়ে ছুটে এসে বিচলিত কন্ঠে বললো,
"তুবা! তুবা কোথায়? আমার তুবা কোথায়?"
বলতে বলতেই আচমকা কষে থাপ্পড় পড়লো কৌশিকের গালে। উপস্থিত সবাই হতভম্ব। কনকচাঁপা বেগম ছুটে এসে স্বামীর হাত ধরলেন। মৌমিতা এগিয়ে এসে কৌশিকের পাশে দাঁড়ালো। যেনো ভাইয়ের গায়ে দ্বিতীয়বার হাত তুলতে দেবে না সে। কনকচাঁপা বেগম এদিকে ওদিক একবার দেখে নিয়ে বললেন,
"পাগল হয়ে গেছো তুমি? এতো বড় ছেলেকে কেউ মারে?"
"বেশ করেছি মেরেছি। তোমার ছেলের সাহস কি করে হলো আমার মেয়েকে কষ্ট দেওয়ার? আজ ওর জন্য আমার মেয়েটা অপারেশন থিয়েটারে আছে। কতই না কষ্ট সহ্য করছে বাচ্চাটা। বিশ্বাস করে ওর হাতে মেয়েটাকে তুলে দিয়েছিলাম। আমার বিশ্বাসের এই মর্যাদা দিলো তোমার ছেলে?"
বলতে বলতে আগুন লাল চোখে তাকালেন নিজের ছেলের দিকে। কৌশিক কোনো প্রতিবাদ করলো না। বরং শক্তি হীনের মতো ধপ করে বসে পড়লো মেঝেতে। বুকের ভেতর হাহাকার করছে। নিজের কৃতকর্মের জন্য নিজেকেই শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে। ভেতরে ভেতরে একটাই আফসোস বারেবারে মুচড়ে উঠছে। কেনো তখন তুবার ওপর রাগ দেখাতে গেলো? রাগের বশে কেনো গায়ে হাত তুললো? রাগটা একটু সামাল দিলে আজ এই দিন দেখতে হতো না। ভেতরের অপরাধ বোধ শক্ত করে গলা চেপে ধরেছে কৌশিকের। নিরুপায় ভঙ্গিতে কৌশিক আচমকা জামাল সাহেবের পা জড়িয়ে ধরলো। আহত কন্ঠে বললো,
"আমি ভুল করে ফেলেছি বাবা। না, না ভুল না। আমি অপরাধ করেছি। ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধের কি শাস্তি প্রাপ্য আমার? মরে যাবো বাবা? বলো না? আমি মরে গেলে তোমার মেয়ে সুস্থ হয়ে যাবে? ওর মাথার ওপর থেকে সব বিপদ কেটে যাবে? তুমি একবার বলো। ওর খুশির জন্য আমি মরতেও রাজি।"
ছেলের আহাজারি শুনে আঁচলে মুখ চেপে কেঁদে ফেললেন কনকচাঁপা বেগম। জামাল সাহেবের পাহাড় সমান রাগেও ভাঁটা পড়লো। ছেলেটা ভেতর থেকে বিধ্বস্ত হয়ে আছে, বুঝতে পেরে তিনি নিজের রাগটা দমন করে নিলেন। আর রেগেই বা কি করবেন? ওনার ছেলে যে তুবাকে ঠিক কতটা ভালোবাসে সেটা সবাই এই নয় মাসে বেশ ভালো করেই বুঝে গেছে। কৌশিক, তুবা অন্ত প্রাণ। এটুকু ভুঁইয়া পরিবার বেশ ভালো করেই জানে। তাই রাগ অভিমান এক পাশে রেখে নিজের ছেলেকে শান্ত করতে লেগে পড়লেন।
বিপদের সময় যেনো একই জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই যেমন কৌশিকের কাছে মনে হচ্ছে সময় থমকে আছে। দুই হাতে ধাক্কা দিয়েও সময়কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। লোমহর্ষক মুহুর্ত গুলো এতো কঠিন কেনো? বিচলিত পায়ে পায়চারি করতে করতে কেটে গেলো প্রায় দেড় ঘন্টা। অবশেষে অপারেশন থিয়েটারের দড়জা খুললো। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো মাস্ক পরিহিত রাতুল। কোলে তার সাদা তোয়ালে দিয়ে মোড়ানো একটা তাজা প্রাণ। তবে কৌশিকের নজর সেই ছোট্ট প্রাণের দিকে গেলো না। তার অস্থির নজর দড়জা ভেদ করে কক্ষের ভেতরে বিচরণ করলো। বিচলিত কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
"তু..তুবা?"
"চিন্তা করো না। তুবা ভালো আছে।"
এর বেশি কিছু শোনার ধৈর্য্য হলো না কৌশিকের। সে উপস্থিত সবাইকে উপেক্ষা করে ছুট লাগালো কক্ষের ভেতরে। পরিবারের সবাই ব্যাস্ত হয়ে পড়লো ছোট্ট প্রাণটাকে নিয়ে। মেয়েকে এক নজর দেখার জন্য মনটা আনচান করলেও সেই চাওয়াটাকে প্রশ্রয় দিলেন না তাওহীদ সাহেব। ছেলে মেয়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। আগে ওরা নিজেদের মধ্যে সবকিছু মিটিয়ে নিক।
-
-
কক্ষের ভেতরে ঢুকতেই কৌশিকের ব্যাকুল নজর পতিত হলো তুবার ওপর। হসপিটালের শুভ্র রঙা ছোট্ট বেডে অচেতনের মতো শুয়ে আছে তুবা। চোখ দুটো বন্ধ রাখার দরুন, জেগে আছে নাকি ঘুমিয়ে আছে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। কৌশিক এতোকিছু ভাবার মতো অবস্থাতেও নেই। তুবাকে চোখে পড়া মাত্রই তড়িৎ ছুটে গেলো সেদিকে। কাছাকাছি গিয়েই একপ্রকার ঝাপিয়ে পড়লো তুবার ওপর। পিঠের নিচে দুই হাত গলিয়ে দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরলো নিজের সাথে। মুখটা গুঁজলো তুবার ঘাড়ে। আচমকা এহেন কান্ডে চোখ মেলে চাইলো তুবা। শোনা গেলো কৌশিকের ব্যাকুল কন্ঠ,
"স্যরি জান। খুব খুব স্যরি! আমার দ্বারা তুই আহত হবি সেটা আমার কল্পনাতেও ছিলো না। আমি এই অপরাধ বোধ নিয়ে কিভাবে বাঁচবো বল?"
তুবা কোনো জবাব দিলো না। মাত্রই সি-সেকশন হয়েছে তার। এই মুহুর্তে কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে। তাই নিঃশব্দে কৌশিকের চুলে হাত রাখলো। টেনে টুনে কোনো মতে মৃদু আওয়াজ বের করলো,
"আমি ঠিক আছি।"
কৌশিক ঘাড় থেকে মাথা তুলে চাইলো। পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো নিজের স্ত্রী নামক প্রিয় মানুষটার দিকে। তুবার ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মুখ কৌশিকের বুকে ঝড় তুলে দিলো। তুবার মুখটা দুই হাতে আগলে ধরলো কৌশিক। পাগলের মতো চুমু খেলো পুরো মুখ জুড়ে। এক ইঞ্চি জায়গাও বাদ রাখেনি যেখানে ওই পুরু ঠোঁটের ছোঁয়া দেয়নি। কৌশিকের পাগলামি দেখে তুবা ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো। ঠিক এমন সময় পেছন থেকে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ কানে ভেসে এলো দুজনার। এই পর্যায়ে দুজনের মনে পড়লো নিজেদের সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া সন্তানের কথা। এক হাতে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে অপর হাতে কৌশিকের কান টেনে ধরলো মৌমিতা। দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
"হারামি! ছলচাতুরী স্বভাব এখনও গেলো না। বাচ্চাটাকে পেট থেকে বের করেই আমার ঘাড়ে গছিয়ে দিয়েছিস। অথচ তোর ছেলে বাপ মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য ফুপুর চুল টেনে ছিঁড়ছে। পেট থেকেই আমাকে নির্যাতন করা শিখিয়েছিস তাই না? নে ধর তোর ছেলে।"
বলতে বলতে সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া ছোট্ট প্রাণটা এগিয়ে দিলো কৌশিকের দিকে। মৌমিতার কথা আজ কৌশিকের ওপর তেমন কোনো প্রভাব ফেললো না। বরং বোনের কথা সম্পুর্ণ উপেক্ষা করে কৌশিক পলক ফেলে তাকালো নিজের অংশের দিকে। একদম রক্তের দলার মতো ছোট্ট একটা দেহ। সরু নাক। চিকন চিকন আঙ্গুল। মুখের গঠন পুরোটাই কৌশিকের মতো। ছোট্ট ছোট্ট ঠোঁট দুটো ছড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদছে। কৌশিক কাঁপা কাঁপা হাতে ছেলেকে কোলে তুলে নিলো। বাবার ছোঁয়া পেতেই আচমকা কান্না থামিয়ে দিলো বাচ্চাটা। শান্ত নদীর মতো চুপ হয়ে গেলো একদম। নিজের অংশকে ছুঁতেই বুকটা কেঁপে উঠলো কৌশিকের। প্রথম বাবা হওয়ার অনুভুতি একদম ভিন্ন। এই অনুভুতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অত্যাধিক খুশিতে কৌশিকের চোখ ছাপিয়ে অশ্রু কণা ঝড়ে পড়লো। তড়িৎ তুবার দিকে ঘুরে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
"জান দেখ! একদম আমার ফটোকপি তাই না? এ যেনো জুনিয়র কৌশিক।"
কৌশিকের ঠোঁটের কোণে প্রাপ্তির হাসি। ওর দেহ কাঁপছে। মাথাটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। শরীরটা ভারশূন্য মনে হচ্ছে। তুবা শোয়া থেকেই একবার উঁকি দিয়ে দেখে নিলো ছেলেকে। হাতের ইশারায় কৌশিককে কাছে ডাকলো। ওর ইশারা বুঝতে পেরে এগিয়ে গেলো কৌশিক। তুবার একদম গা ঘেঁষে বসে ছেলেকে তুবার কাছে শুইয়ে দিলো। সন্তানের মুখ চোখের সামনে স্পষ্ট হতেই শীতলতায় বুকটা ঠান্ডা হয়ে এলো তুবার। অত্যাধিক আবেগে চোখ ছাপিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। তুবা এক হাতে ছেলের আঙ্গুল টেনে ধরলো। হাসি কান্নার সংমিশ্রণে কণ্ঠনালী হতে একটা অদ্ভুত আওয়াজ বের হলো,
"ও জুনিয়র কৌশিক নয়। ও হলো "তুশিক মেহরাব কুশান"। আমাদের ছেলে কুশান।"
কৌশিক হাসলো। আলতো করে চুমু খেলো তুবার কপালে। এরপর চুমু খেলো ছেলের মুখ জুড়ে। আজ নিজেকে পরিপূর্ণ অনুভব করছে কৌশিক। একটা ছেলের জীবনে পূর্ণতা কি? তার পরিবার, স্ত্রী এবং সন্তান। কৌশিকের তো সব আছে। দড়জার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে তার পুরো পরিবার। পাশেই তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রী। কমতি ছিলো শুধু সন্তানের। আজ সেই কমতিও পূরণ হলো। দুজনের কোল আলো করে চলে এলো কৌশিক তুবার জীবনের পূর্ণতা। তুশিককে পেয়ে আজ কৌশিক তুবা পরিপূর্ণ।
সমাপ্ত!