ফন্ট সাইজ:
থিম:
কালারব্লাইন্ড

পর্ব 1

লেখক: সোফিয়া সাফা

“আমার সদ্য বিয়ে করা বউ ধ`র্ষিতা— কথাটা শোনামাত্রই যেন আমার পুরো দুনিয়াটা ওলট-পালট হয়ে গেল। ভুল শুনেছি ভেবে মৃদু হাসলাম। নিজের জন্মদাতার ওপর হঠাৎ এক অচেনা বিশ্বাস জেঁকে বসলো।

নিজেকেই সান্ত্বনা দিলাম— না, এ হতে পারে না। তিনি আমার সঙ্গে এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন না। মানলাম, তিনি আমাকে পছন্দ করেন না। তাই বলে একটা ধ`র্ষিতা মেয়েকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়ার মতো বেঈমানী করবেন না।

আমার ভাবনার জাল ছিঁড়ে ভদ্রমহিলা আবারও বলে উঠলেন, ‘আমগো মাইয়ার কপাল আছে মানতে অইবো। নাইলে নয় নয়ডা বেডার লগে শুইয়া আইয়াও এমন সুন্দর সোয়ামি জোটে? সোনার টুকরা জামাই পাইছি গো আমরা। এক্কেরে খাঁটি সোনা।’

পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তবু মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া ফুটতে দিলাম না। এরই মধ্যে আমার শাশুড়ি তড়িঘড়ি করে এক প্লেট মিষ্টি এনে ভদ্রমহিলার হাতে ধরিয়ে দিলেন।

ভদ্রমহিলা সম্পর্কে আমার কাকি শাশুড়ি। বিয়ের পরপরই তাদের সাথে পরিচয়। তিনি চওড়া হেসে আমার মুখের সামনে একচামচ মিষ্টি এগিয়ে ধরলেন।

আমি জানি না আমার কী হলো। বোধশক্তি হারিয়ে মিষ্টিটুকু মুখে নিলাম— এটা জেনেও যে আমি তা গিলতে পারব না। হলোও তাই। মিষ্টিটা যেন গলায় আটকে দড়ির মতো চেপে বসলো।”

“রঞ্জক!”

হঠাৎ বাবার ডাকে ঘোর কাটল রঞ্জকের। তার বাবা, আরিজ মাহতাবির, পাশে এসে দাঁড়ালেন। জরুরি একটা ফোনালাপ সারতে তিনি একটু বাইরে গিয়েছিলেন।

রঞ্জক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই তিনি তাড়া দিলেন, “রাত হয়ে গেছে। আর দেরি করা ঠিক হবে না। বেরোতে হবে।”

রঞ্জক উঠে দাঁড়াল। মুখের মিষ্টিটুকু কোনোমতে গলাধঃকরণ করে থমথমে গলায় বলল, “একটু বাইরে চলো, কথা আছে।”

ছেলের গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনেই আরিজ মাহতাবির কিছু একটা আঁচ করলেন। তাই হয়তো বললেন, “আমরা বউমাকে নিয়ে একেবারেই বের হব।”

রঞ্জক প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই তিনি কনের মাকে বললেন, “এবার আমার বউমাকে আমাদের বুঝিয়ে দিন। অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে তো বুঝতেই পারছেন।”

কনের মা মাথা নেড়ে অন্দরমহলের দিকে চলে গেলেন। কনের কাকি তখনও পান চিবোতে চিবোতে রঞ্জকের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। হয়তো বা তিনি তার মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছেন।

এদিকে রঞ্জকের সহ্যশক্তি ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে। সে বারবার কপাল আর ঘাড় চুলকে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর কনের মা লাল টকটকে শাড়ি পরা কনেকে নিয়ে ফিরে এলেন। মেয়েটার মুখ লম্বা ঘোমটার আড়ালে ঢাকা থাকায় চেহারাটা কারও দৃষ্টিগোচর হলো না।

রঞ্জকের দৃষ্টি গিয়ে থামল ছোটোখাটো গড়নের মেয়েটার ওপর। মুহূর্তেই তার ধূসর চোখে ধরা পড়ল মেয়েটার অস্বাভাবিক তটস্থতা। যেন মলিন কাপড়ে মোড়া এক কাঠের পুতুলকে এনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে তার সামনে। দু'হাতে আঁকড়ে ধরা গোলাকৃতি খাঁচাটাও চোখ এড়াল না তার। খাঁচাটা বুকের সঙ্গে এমনভাবে চেপে ধরে রেখেছে মেয়েটা, যেন কেউ কেড়ে নেওয়ার জন্য ওত পেতে আছে।

“যাওয়া যাক।”

আরিজ মাহতাবির হাঁটা ধরতেই কনের মা কনেকে নিয়ে তার পিছু নিলেন।

রঞ্জকও বেরিয়ে এল তাদের সঙ্গে। কনের মা স্বভাবতই স্বল্পভাষী, নাকি পরিস্থিতির চাপে চুপচাপ আছেন— রঞ্জক তা বুঝতে পারল না। উঠানের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল গাড়ি পর্যন্ত মেয়েকে এগিয়ে দিয়ে তিনি নিঃশব্দে ফিরে গেলেন।

সারাদিনের ঝুপঝুপ বৃষ্টির পর বাতাসে এখনো ভেজা মাটির গন্ধ। ক্ষণে ক্ষণে শীতল হাওয়া এসে গায়ে লাগছে। সন্ধ্যার শেষ আলো নিভে গেছে কিছুক্ষণ আগেই। আকাশে ঝুলে থাকা অর্ধচন্দ্র চারপাশে ফিকে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।

আরিজ মাহতাবির খেয়াল করলেন তার ছেলের শান্ত চাউনি এখন তার ওপরেই স্থির। তিনি সেই চাউনি অগ্রাহ্য করে গাড়ির ফ্রন্ট সিটের দরজাটা খুলে দিলেন। তারপর নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা নিজের পুত্রবধূর উদ্দেশ্যে বললেন, “বউমা, গাড়িতে উঠে বসো।’’

আরিজ মাহতাবিরের গম্ভীর কণ্ঠে যেন সম্বিত ফিরল মেয়েটার। বুকের সঙ্গে খাঁচাটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে সে কোনোমতে গাড়িতে উঠে বসল। তিনি দরজাটা লাগিয়ে রঞ্জকের দিকে ফিরলেন।

“চলো ঐদিকে গিয়ে কথা বলি।”

আরিজ মাহতাবির গাড়ি থেকে খানিকটা দূরে যাওয়ার তাগিদে পা বাড়ালেন কিন্তু খুব একটা দূরে যাওয়ার সুযোগ হয়ে উঠল না। তার আগেই ক্ষোভে কেঁপে উঠল রঞ্জকের কণ্ঠস্বর, “মেয়েটা কি সত্যিই ধ`র্ষিতা?”

আরিজ মাহতাবিরের পায়ের গতি থমকে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন ছেলের পানে। এড়িয়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র প্রয়াস করলেন না তিনি। সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ।”

অজান্তেই দুপা পিছিয়ে গেল রঞ্জক। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন চারপাশের বাতাসে অক্সিজেনই ফুরিয়ে গেল। তীব্র অবিশ্বাসে তার ঠোঁট নড়ল, “তুমি আমার সাথে এমন করতে পারো না।”

“আমি তোমার সঙ্গে এমনটাই করেছি।”

রঞ্জকের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল— তাতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল শুধু নিদারুণ যন্ত্রণা। হাসির আড়ালেই তার ধূসর চোখজোড়া টলমল করে উঠল। একহাতে স্বচ্ছ সরু ফ্রেমের চশমাটা খুলে, অন্য হাতের কনুইয়ের ভাঁজে কপালের ঘাম মোছার বাহানায় আলগোছে চোখ মুছে নিল সে।

“কেন করলে? কেন করলে আমার সাথে এমন?”

“কারণ ওরা মেয়েটাকে ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধের সাথে বিয়ে দিতে চেয়েছিল।”

“তো? দিয়ে দিতো। আমাকে কেন এসবে জড়ালে? কী হয় মেয়েটা তোমার? যার জন্য তুমি নিজের ছেলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলে?”

আরিজ মাহতাবিরের গম্ভীর মুখে আচমকা একচিলতে ভীতির রেখা ফুটে উঠল। তিনি রঞ্জকের প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে গলার টাই আলগা করতে করতে শান্ত গলায় বললেন, “ভুলে যেও না তুমি এমনি এমনি বিয়েতে রাজি হওনি। আমাদের মাঝে চুক্তি হয়েছে। তাই নিজের বিহেভিয়ার ঠিক করো। নইলে কিন্তু তোমাকেই খেসারত দিতে হবে।”

“খেসারত? আমাকে এত বড় ধোঁকায় ফেলে জীবনটা ধ্বংস করে দেওয়ার পরেও তোমার মনে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই? আমার জীবনের বিনিময়ে তুমি চুক্তি করেছ, তাও আবার আমারই সঙ্গে?”

“ও আচ্ছা! তাহলে এতক্ষণে তোমার মনে হচ্ছে তুমি ঠকে গেছ? তার আগে মনে হয়নি?”

“আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম। দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি তুমি এভাবে ঠকাবে আমায়।”

“তুমি আদৌ ধ`র্ষণের মানে জানো তো রঞ্জক?”

“তুমি এখন আমাকে ধ`র্ষণের ডেফিনেশন শেখাবে? তোমার ধারণা, এটার মিনিং বুঝিয়ে দিলেই আমাদের মধ্যকার চুক্তিটা ফেয়ার হয়ে যাবে?”

“ধ`র্ষণ একজন নারীর মর্যাদা কেড়ে নিতে পারে না, রঞ্জক। অপরাধীর অপরাধকে ভুক্তভোগীর পরিচয় বানিও না। আমি শুধু এটুকুই জানি মেয়েটা এখন তোমার স্ত্রী। তার সম্মান রক্ষা করা তোমার দায়িত্ব। তাই বারবার ওকে অপমান ক…”

“রক্ষা করার মতো সম্মানটুকু আদৌ অবশিষ্ট আছে কি ওর?” কথাটা শেষ হতেই আরিজ মাহতাবিরের হাত সপাটে এসে পড়ল রঞ্জকের গালে। রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ঠাস করে শব্দ হলো।

আচমকা থাপ্পড় খেয়ে রঞ্জকের ভেতরের ক্ষোভ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। গালে হাত চেপে ঠোঁটের কোণে আবারও সেই বিষাক্ত হাসি ফুটিয়ে তুলল সে।

“তোমাকে বিশ্বাস করার অপরাধে আরও কয়েকটা থাপ্পড় মারো। পারলে এমন একটা ক্ষত বানিয়ে দাও, যা আমাকে প্রতিটা মুহূর্তে মনে করিয়ে দেবে— তোমাকে বিশ্বাস করাটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।”

“মেয়েটার ওপর দিয়ে যে নারকীয় ঝড় বয়ে গেছে, তার পুরো দায় ওর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক?”

“তাই বলে আমার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়াটা তোমার যৌক্তিক মনে হলো?”

“আমার সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।”

“অপশন ছিল না বলেই কি আমাকে ডাস্টবিন বানালে?”

ছেলের ধারালো কথাগুলো শুনে আরিজ মাহতাবিরের চোখে গভীর ক্লান্তি নেমে এল।

রঞ্জক আবারও গলা দিয়ে বিষ উগড়ে দিল, “অন্য কোনো ক্ষেত্রে তো তুমি অপশন হিসেবে আমাকে কখনো বেছে নাও না। সবসময় গুঞ্জনই তোমার প্রথম পছন্দ। তাহলে এই ক্ষেত্রে কেন আমিই তোমার একমাত্র অপশন হলাম?”

“কারণ তোমার বড় ভাই এইসময় ভ্যালেনিয়াতে নেই।”

“নাইস এক্সকিউজ। ও দেশে থাকলেই বুঝি তুমি একটা ধ`র্ষিতা মেয়েকে ওর গলায় ঝুলিয়ে দিতে পারতে?”

আরিজ মাহতাবির উত্তর দিলেন না। রঞ্জক নিজেই যোগ করল, “কোনোদিনও পারতে না। এই একটা ক্ষেত্রেই তুমি অপশন হিসেবে আমাকে বেছে নিয়েছো কারণ তুমি আমাকে ঘৃণা করো।”

কথার বাণে বাবাকে বিদ্ধ করে এক মুহূর্তও দাঁড়াল না রঞ্জক। আরও অনেক প্রশ্ন, আরও অনেক অভিযোগ গলা পর্যন্ত উঠে এসেছিল তার। কিন্তু একইসাথে ভেতরটা ধীরে ধীরে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সেই ভাঙনের শব্দ বাবাকে শুনতে দিতে রাজি নয় সে।

রঞ্জক কিছুটা দূর এগিয়ে যাওয়ার পর আরিজ মাহতাবির পিছু ডাকলেন, “রঞ্জক! তুমি এভাবে চলে যেতে পারো না। রঞ্জক! রঞ্জক!”

লাভ হলো না। মুহূর্তেই বাইকের গর্জনে রাতের নীরবতা ছিন্নভিন্ন করে সেখান থেকে চলে গেল রঞ্জক।

চলবে…..

#কালারব্লাইন্ড — ০১
#সোফিয়া_সাফা

নোট: চরিত্রদের সংলাপ ও দৃষ্টিভঙ্গি গল্পের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছে; এগুলো কোনোভাবেই লেখকের ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন নয়।

পড়ে কেমন লাগল, মন্তব্যে জানাবেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন