ফন্ট সাইজ:
থিম:
কালারব্লাইন্ড

পর্ব 2

লেখক: সোফিয়া সাফা

“ধ`র্ষিতার তকমা নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে পা রাখার ভাগ্য আদৌ কারো হয় কি না, তা আমার জানা নেই। কিন্তু আমার হয়েছে। চোখের সামনে প্রাসাদসম বাড়িটাই আমার শ্বশুরবাড়ি। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন আমার শ্বশুরমশাই, যার বদৌলতেই আজ আমি এখানে। শ্বশুরবাড়িতে আসতে পারাটা আমার জন্য সৌভাগের হলেও, তা আমার স্বামী নামক পুরুষটির জন্য ছিল চরম দুর্ভাগ্যের। আমি দেখেছি নিজের বাবার সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে তাকে প্রস্থান করতে। হয়তো-বা তার বাবা বিয়ের আগে তাকে পুরো ঘটনাটা খুলে বলেননি। না, না আমি তাদের কথা শুনতে পাইনি। শুধু দেখেছি আমার শ্বশুরমশাইকে তার গায়ে হাত তুলতে।

‘বউমা, তোমার নামটা যেন কী?’ হঠাৎ আমার শ্বশুরমশাই প্রশ্নটা করলেন।

উত্তর দিতে গিয়ে বুঝতে পারলাম আমার গলাটা শুকিয়ে কাঠ। তক্ষুণি আমার হাতে থাকা খাঁচাটা থেকে ভেসে এলো মিষ্টি কণ্ঠ, ‘জুবা! জুবা!’

তিনি থমকে গেলেন। ভ্রূ কুঁচকে আওড়ালেন, ‘জুবা?’

আমি তৎক্ষণাৎ ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়লাম। বুকের সাথে চেপে ধরে রাখা খাঁচাটা একটু আলগা করতেই আমার দস্যি জুবাটা ডানা ঝাপটে উঠল। এত লম্বা সময় ধরে দু’হাতে জাপটে ধরে রাখার কারণে আমার শাড়ির আড়ালে ঢেকে ছিল খাঁচাটা।

প্রাসাদের চারপাশ তখন লাইটের কড়া আলোয় দিনের মতো ঝকঝকে-তকতকে। খাঁচার মধ্যে থাকা আমার বুনো টিয়া পাখিটিকে দেখে শ্বশুরমশাই একটু অবাক হলেন বোধ করি।

‘এই প্যারোটটা শুরু থেকেই খাঁচাটার মধ্যে ছিল?’

আমি ওপর-নিচ মাথা নাড়লাম।

‘তোমার পোষা পাখি বুঝি?’

আমি আবারও মাথা নাড়লাম। শ্বশুরমশাই আর কোনো প্রশ্ন করলেন না; হাঁটা ধরলেন। আমিও তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম। কয়েক কদম এগিয়েই তিনি আগের প্রশ্নে ফিরে গেলেন, ‘তোমার নামটা কিন্তু বললে না। যদিও আমি নামটা শুনেছিলাম, কিন্তু এখন ঠিক মনে পড়ছে না। আমি তোমাকে বউমা বলেই অবশ্য ডাকতে পারব। কিন্তু বাকিদের সাথে পরিচয় করিয়ে তো দিতে হবে।’

আমি মুখ খোলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পাজি জুবাটা এবারও মাঝপথে চেঁচিয়ে উঠল, ‘জুবা! জুবা!’

বুঝতে পারলাম জুবার ক্ষুধা লেগেছে। নইলে ও সহসা আমার কথার অবাধ্য হয় না। ওকে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগেই বলেছিলাম; আমি যতক্ষণ না বলব, ততক্ষণ একদম চুপটি করে ঘাপটি মেরে থাকতে। ও আমার সব কথা শোনে, যতক্ষণ ওর পেট ভরা থাকে ততক্ষণ।

শ্বশুরমশাই থমকে দাঁড়ালেন, সাথে আমিও। লম্বা ঘোমটার আড়াল থেকে তিনি হাসলেন কি না স্পষ্ট বুঝতে পারলাম না, তবে তার গলার স্বরে হাসির রেশ লেগে ছিল, ‘বুঝলাম তো তোমার নাম জুবা। কিন্তু আমি তোমার মালিকের নাম জানতে চেয়েছি। তুমি কি আমাকে তোমার মালিকের নামটা বলতে পারবে? সে হয়তো তার ফাদার-ইন-ল-এর সাথে কথা বলতে চাইছে না।’

‘জুবআআআ!’ জুবার চিৎকারে আমি কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও শ্বশুরমশাই প্রভাবিত হলেন না।

জুবা আরও বেয়াদবি করার আগেই আমি পরিস্থিতি সামলাতে মুখ খুললাম, ‘আ—মার নাম আ—লতা।’”

আরিজ মাহতাবির আলতার কণ্ঠ শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। সত্যি বলতে, তিনি মেয়েটার নাম ভুলে যাননি। শুধু নিশ্চিত হতে চেয়েছেন পুত্রবধূ তার বোবা নয়।

“মানতাশা রেহবার আলতা! বাবার নাম মাহমুদ রেহবার আর মায়ের নাম ইছাপূর্ণা। ঠিক তো?”

ওপর-নিচ মাথা দোলায় আলতা। আরিজ মাহতাবির তাকে নিয়ে এসে পৌঁছান বাড়ির সদর দরজার সামনে। দরজাটা বিশাল বড়। অসংখ্য নিপুণ কারুকাজে সজ্জিত।

একজন মাঝবয়সী দেখতে লোক এসে দরজা খুলে দিয়ে বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে দাঁড়ালেন, “ওয়েলকাম হোম স্যার।”

আরিজ মাহতাবির মাথা নেড়ে ভেতরে পা রাখতেই একজন গৃহকর্মী এগিয়ে এসে তার হাত থেকে ব্রিফকেস আর ব্লেজারটা সামলে নিল।

আলতা গুটিগুটি পায়ে আরিজ মাহতাবিরের পাশে এসে দাঁড়াতেই আচমকা কেউ বলে উঠল, “ভাইয়া, আপনি দেখছি সত্যি সত্যিই ছেলেকে বিয়ে করিয়ে পুত্রবধূ নিয়ে ফিরেছেন!”

আরিজ মাহতাবির গম্ভীর গলায় বললেন, “আরজুকে তো ফোনে সবটা বুঝিয়ে বলেছিলাম। ও তোমাদেরকে কিছুই বলেনি?”

“বলেছে, কিন্তু আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। বাড়ির বড় ছেলে গুঞ্জনকে বিয়ে না করিয়ে আপনি রঞ্জককে বিয়ে করিয়ে এক্কেবারে পুত্রবধূ নিয়ে ফিরলেন? তাও আবার এমন তাড়াহুড়ো করে? আমরা মেয়ে দেখতে গেলাম না, তারাও ছেলে দেখতে এলো না। সবকিছু কেমন যেন একটা হয়ে গেল না?”

আরিজ মাহতাবির উত্তর দিলেন না; শুধু শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন। মাঝবয়সী মহিলাটি তৎক্ষণাৎ ঢোক গিললেন। আমতা-আমতা করে বললেন, “আরজু আপা পুরো ঘটনাটা খুলে বলেছে। আসলে তারপরও আমি ঠিকমতো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।”

“পুরোটা বুঝতেই হবে—এমন কোনো কথা নেই, মালেকা। তুমি যেটুকু শুনেছ, সেটুকু জেনেই খুশি থাকো। তারচেয়ে ভালো হয়, তোমরা বউমার সাথে দ্রুত পরিচিত হয়ে ওকে ওর ঘরটা দেখিয়ে দাও।”

মালেকা বেগম কেমন যেন দমে গেলেন। শ্বশুরের এমন ভারিক্কি কণ্ঠ শুনে আলতা ঘোমটার আড়াল থেকেই পাশ ফিরে তাকাল। কিছুক্ষণ আগেই লোকটা তার সাথে কত নরম গলায় কথা বলেছে! অথচ এখন মনে হচ্ছে; এই ব্যক্তিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কেউ।

সুবিস্তীর্ণ লিভিং রুমজুড়ে নীরবতা নেমে এলেও তা খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। আচমকা ভেসে এলো আরেকটি নারীকণ্ঠ, “রঞ্জু কোথায়? ওকে দেখছি না কেন?”

আরিজ মাহতাবির প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বললেন, “তোমরা হয়তো বউমার ক্লান্তির কথা ভেবে কেউ পরিচিত হতে চাইছ না। আমিও ভেবে দেখলাম, তড়িঘড়ি করে পরিচয় হওয়ার দরকারই বা কী? তোমরা বরং পরে পরিচিত হয়ে নিও। ধারা!”

“জি চাচ্চু, বলো।”

“রঞ্জকের বউকে ঘরে নিয়ে যাও।”

ধারা নামের তরুণীটি এগিয়ে গেল আলতার দিকে। সে আলতো করে কাঁধে হাত রাখতেই আলতার শরীরটা মারাত্মকভাবে কেঁপে উঠল।

ধারা তার অস্বস্তি টের পেয়ে মৃদু হেসে কানের কাছে মুখ এনে বলল, “আমি হলাম গিয়ে তোমার ননদিনী, বারিধারা। আমার ছোঁয়াতেই যদি এভাবে কেঁপে ওঠো, তাহলে আরএম যখন চেপে ধরবে তখন কী করবে, হুম?”

কথাগুলো ফিসফাস করে বলেই মুখ টিপে হেসে ফেলল ধারা। আলতার শরীরটা এবার ভয়ে শক্ত হয়ে এলো। ঠিক তখনই জুবা কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “জুবআ! জুবআ!”

ধারার হাসি থেমে গেল। ভ্রূ কুঁচকে তাকাল বুনো পাখিটার দিকে। কেমন যেন রাগী চোখে তাকিয়ে আছে পাখিটা তার দিকে! মনে হচ্ছে খাঁচা ভেঙে এক্ষুণি বেরিয়ে এসে তার ওপর আক্রমণ করে বসবে। ধারা নিজের এই অহেতুক ভাবনাকে সরিয়ে দিল। হয়তো তার কোথাও ভুল হচ্ছে; একটা পাখি অকারণেই বা কেন তার ওপর ক্ষুব্ধ হতে যাবে?

তার ভাবনার মাঝেই হঠাৎ আরেকটি তরুণী এগিয়ে এলো। ধারার উদ্দেশ্যে বলল, “দেখি, সর, সর। আগে মেজো ভাইয়ার বউকে আনবক্সিং করি, তারপর ঘরে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা দেখছি।”

মেয়েটার দাপুটে চালচলনে ধারা একটু সরে যেতে বাধ্য হলো বটে। কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, “তুই কি শুনতে পাসনি, তাঁরা? চাচ্চু বলেছে পরে পরিচিত হতে।”

তাঁরা নামের মেয়েটি নিজের টপসের হাতা গুটিয়ে নিতে নিতে বলল, “চাচ্চুর কথা তুই-ই ঠিকমতো বুঝতে পারিসনি আপু। সে বলেছে পরিচিত হতে ‘না’ চাইলে ওকে ঘরে রেখে আসতে। তার মানে কী দাঁড়ায়? পরিচিত হতে চাইলে এখনই হতে পারি। কী চাচ্চু, পারি না?”

আরিজ মাহতাবির কিছুই বললেন না। তাঁরা কেমন যেন একটা অদ্ভুত চাউনি নিক্ষেপ করল ধারার দিকে। তারপর এক ঝটকায় আলতার ওড়নাটা কেবল মুখের ওপর থেকেই নয়, মাথার ওপর থেকেও টেনে নিচে ফেলে দিল।

ওড়নাটা সরে যাওয়ার সাথে সাথেই আলতা যেন মাটির সাথে মিশে যেতে চাইল। মাথা নিচু করে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল সে, যেন একটু নড়লেই সবাই তাকে আরও গভীরভাবে দেখে ফেলবে। দু’হাতের আঙুল দিয়ে এত শক্ত করে খাঁচাটা আঁকড়ে ধরল যে তার আঙুলের গিঁটগুলো একদম সাদা হয়ে উঠেছে।

মাথা নিচু করে থাকায় কেউই তার মুখটা ভালো করে দেখতে পেল না। তার ওপর কপাল বেয়ে নেমে আসা লালচে চুলের কয়েকটি এলোমেলো গোছা মুখের অনেকটা ঢেকে রেখেছিল।

“তাঁরা!” আকস্মিক ডাকে তাঁরা আলতার ওপর থেকে চোখ সরিয়ে আরিজ মাহতাবের দিকে তাকাল।

তার চাচা কেমন যেন ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। তাঁরা আবারও আলতার দিকে চোখ ফেরায়। মেয়েটার লালচে চুলগুলো আলগাভাবে খোঁপা করা। গলায় কোনো গয়না না থাকায় ধবধবে ফর্সা ঘাড় ও গলা একদম উন্মুক্ত হয়ে গেছে।

“তুমি কি জানো বাড়ির বউকে অসম্মান করার শাস্তি কতটা ভয়াবহ হতে পারে?” আরিজ মাহতাবির কথাটা বলা মাত্রই তাঁরা একটা শুকনো ঢোক গিলে মেঝেতে পড়ে থাকা ওড়নাটা চটজলদি তুলে নিল।

শ্বশুরমশাইয়ের কথা শুনে আলতা চোখ তুলে তাকাতেই উপস্থিত সবাই পুরোপুরি দেখতে পেল কাঙ্ক্ষিত মুখটা। ছিমছাম গড়নের ফর্সা আলতার চেহারায় সবচাইতে আকর্ষণীয় ছিল তার চোখ দুটো। স্বচ্ছ সবুজ চোখজোড়ায় যেন অব্যক্ত এক মায়া খেলা করছে।

ঠিক তখনই সামনে থেকে আরেকটি নারী অবয়ব এগিয়ে এলো আলতার দিকে। আলতা একনজর শ্বশুরকে দেখে নিয়ে আবারও মাথা নিচু করে ফেলেছিল। সেই নারীটি এসে তার থুতনিতে তর্জনী ঠেকিয়ে মুখটা ওপরে তুললেন। অভূতপূর্ব মিষ্টি কণ্ঠে হেসে বললেন, “এ তো দেখছি আমাদের ছন্নছাড়া ছেলেটার জন্য সাক্ষাৎ হুর খুঁজে নিয়ে এসেছে ভাইয়া!”

মালেকা বেগমও কাছে এগিয়ে এলেন। বড় বড় চোখে চেয়ে রইলেন আলতার দিকে। তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির তোপে পড়ে আলতার শুকিয়ে যাওয়া গলাটা এবার চিনচিন করে উঠল। বহুক্ষণ আগেই তার তৃষ্ণা পেয়েছিল, কিন্তু কাউকে বলে উঠতে পারেনি। এবার মনে হচ্ছে গলাটা ফেটেই যাবে।

“ওর নাম আলতা। জলদি নিজেদের পরিচয় দিয়ে দাও। ও খুব ক্লান্ত, এতক্ষণ আটকে রাখা ঠিক হবে না।” তাড়া দিলেন আরিজ মাহতাবির।

সেই নারীটি তাঁরার হাত থেকে ওড়নাটা নিয়ে আলতার মাথায় পরিয়ে দিতে দিতে নিজের পরিচয় দিলেন, “আমি তোমার বড় চাচিশাশুড়ি, সালিহা খাতুন।”

ধারা পাশ থেকে বলল, “আমি ওনার মেয়ে। নাম তো একবার বলেইছি, যাক আবারও বলছি—আমার নাম বারিধারা। তুমি জানো, আমার মেয়েটা তোমার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ঘণ্টাখানেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে? নতুন বউ দেখবে বলে কী যে খুশি ছিল! ওর সাথে আগামীকাল আলাপ করিয়ে দেব।”

মালেকা বেগম আলতার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলেন, যেন নিজের চোখকেই তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না।

সালিহা খাতুন নিজ উদ্যোগে মালেকা বেগমের পরিচয় দিলেন, “উনি তোমার ছোট চাচিশাশুড়ি, মালেকা।”

এবার তিনি তাঁরার দিকে ইশারা করলেন, “ও হচ্ছে মালেকার মেয়ে শুকতাঁরা।”

আলতা কারো দিকে তাকাল পর্যন্ত না। তার এমন নিস্তরঙ্গ অভিব্যক্তি দেখে মালেকা বেগম মুখ বাঁকালেন, “তুমি তো কাউকে দেখছই না ভালো করে!”

সালিহা খাতুন আলতার মাথায় স্নেহের হাত রাখলেন, “নতুন জায়গায় এসেছে তো, তাই একটু জড়তা কাজ করছে। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

এরপর তিনি আঙুল দিয়ে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুজনকে দেখিয়ে বললেন, “ও আমার ছেলে ফারিশ, আর পাশের জন ধারার স্বামী কৌশিক।”

ফারিশ নামের তরুণ ছেলেটি হাত নেড়ে আলতার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল, কিন্তু আলতা তার দিকে তাকালই না। ফলে ফারিশ মুখটা ভার করে ফেলল।

সালিহা খাতুন এবার আরজু বেগমকে দেখিয়ে বললেন, “উনি হলেন গিয়ে তোমার ফুফুশাশুড়ি। ওনার একটি ছেলে আছে।”

সালিহা খাতুন চারপাশে তাকালেন, কিন্তু ছেলেটিকে দেখতে পেলেন না, “ইভান কোথায়, আরজু?”

“ও ঘুমিয়ে গেছে, ভাবি।” পাশ থেকে মালেকা বেগম উত্তর দিলেন।

আরজু বেগমের দৃষ্টি তখনও আলতার ওপর স্থির। আরিজ মাহতাবির বিষয়টা খেয়াল করলেন। তার মনে একটি প্রশ্ন উঁকি দিল, ‘রঞ্জক কি ইতোমধ্যেই ওর ফুপিকে সব জানিয়ে দিয়েছে? নাকি...’ পরমুহূর্তেই ভাবলেন, ‘না, যদি জানিয়েই দিত, তবে রঞ্জক কোথায় আছে তা আমাকে জিজ্ঞেস করত না। হয়তো এখনো জানায়নি।’

“পরিচয় তো হয়েই গেল। ধারা, এবার ওকে ঘরে রেখে এসো।” চাচার কথায় ধারা মাথা নেড়ে আলতার দুই কাঁধ পিছন থেকে আলতো করে ধরে পা বাড়াল লিফটের দিকে।

তাকে সেদিকে যেতে দেখে আরিজ মাহতাবির চোখের পলকে বললেন, “ওকে দোতলার সেই ঘরটা দেখিয়ে দাও, যেখানে তোমার দাদি ছিলেন।”

ধারা চমকে তাকাল চাচার দিকে। উপস্থিত বাকিরাও তার কথাটা বুঝতে পারল না। আরজু বেগম মুখ খুললেন, “ধারা, ওকে চারতলায় নিয়ে যাও।”

“আমি বলেছি দোতলায় নিয়ে যেতে।”

“কেন বলেছ? ও রঞ্জুর বিয়ে করা বউ হয়েও কেন আলাদা ঘরে থাকবে?”

“আলাদা থাকবে, কারণ আমি বলেছি তাই।”

“তুমিই বা কেন বলছ? বউ থাকার পরও রঞ্জক কেন একা থাকবে?”

“আমাকে কি এখন তোমার কাছে জবাবদিহি করতে হবে, আরজু?”

“হবে না ভাইয়া। শুধু হাতজোড় করে বলছি, ছেলেটার সাথে আর অবিচার কোরো না।”

“তুমি বুঝতে পারছ না।”

“আমি সব বুঝতে পারছি ভাইয়া। তুমিও এবার একটু বোঝার চেষ্টা করো। এমনিতেই অনেক বড় অবিচার করে ফেলেছ তুমি। এখানেই থেমে যাও।”

আরিজ মাহতাবির তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন, “কোন অবিচারের কথা বলছ তুমি?”

আরজু বেগম চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর চোখ মেলে দ্রুত পায়ে হেঁটে গেলেন আলতার সামনে। নববধূর মুখটা দু'হাতে চেপে ধরে সূক্ষ্ম নজর বুলিয়ে তিক্ত গলায় বললেন, “রঞ্জুর সম্পর্কে যদি তোমার যথাযথ ধারণা থাকত ভাইয়া, তাহলে এই মেয়েটাকে তুমি কোনোদিনও ওর বউ বানিয়ে আনতে না।”

আরিজ মাহতাবির বিরক্ত হলেন, “তুমি ঠিক কী বলতে চাইছ, পরিষ্কার করে বলবে?”

“আমি এটাই বলতে চাইছি, তুমি যার হাতে এই মেয়েটাকে তুলে দিলে, সেই ছেলেটা জন্ম থেকেই প্রোটানোপিয়ায় আক্রান্ত, ভাইয়া। যাকে বলে—কালার ব্লাইন্ড। রঞ্জুর চোখে দেখা পৃথিবীতে লাল-সবুজ নামে কোনো রঙের অস্তিত্বই নেই!”

আরিজ মাহতাবির চমকে তাকালেন বোনের দিকে। কথাটা তিনি জানতেন, কিন্তু মনে ছিল না। মনে থাকবেই বা কীভাবে? অনেক বছর আগে এই ব্যাপারে জানতে পেরেছিলেন তিনি। বিষয়টা ততটা গুরুতর মনে না হওয়ায় স্মৃতির পাতা থেকে মুছে গিয়েছিল।

আরজু বেগম বললেন, “যা করার তা তো করেই ফেলেছ। এবার অন্তত আমার কথাটা শোনো।”

আরিজ মাহতাবিরের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। তবুও জানতে চাইলেন, “কী করতে চাইছ?”

“এমনিতেই ওর সৌন্দর্যের সবচেয়ে নজরকাড়া দিকটাই রঞ্জক দেখতে পাবে না। তার ওপর আলাদা রাখলে রঞ্জুর মনে ওর প্রতি টান তৈরি হবে কীভাবে?”

আরিজ মাহতাবির কোনো এক অজানা কারণে মনে মনে বেশ ক্ষুব্ধ হলেন। এই ক্ষোভ কি ছেলের ত্রুটির জন্য, নাকি নিজের প্রতিই তৈরি হলো—তা ঠিক বোঝা গেল না। তিনি আর কোনো কথা বাড়ালেন না; আচমকা হনহন করে হেঁটে চলে গেলেন।

তার প্রস্থানে উপস্থিত সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও আলতা অজানা কোনো এক আশঙ্কায় ভয় পেতে শুরু করল। তার অস্থিরতা টের পেয়ে জুবা আবারও ডানা ঝাপটে চেঁচিয়ে উঠল; যাতে আশপাশের অনেকেই বিরক্ত হলো। আরজু বেগম ধারাকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই আলতাকে নিয়ে রওনা হলেন চারতলার উদ্দেশ্যে।

আলতার শরীরটা সামনে যেতে চাইল না। ইচ্ছে করল যেকোনো একদিকে ছুটে পালিয়ে যেতে, কিন্তু এখন আর সেই উপায়ই বা কোথায়?

#কালারব্লাইন্ড — ০১ (বর্ধিতাংশ)
#সোফিয়া_সাফা

(যারা গল্পটি পড়ছেন তারা রেসপন্স করুন প্রিয়। আপনাদের প্রতিক্রিয়াই ঠিক করবে এই গল্পের ভবিষ্যত।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 2 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন