ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

6

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

তারপর আলীরাজের দিকেও তাকিয়ে আন্তরিকভাবে কুশল বিনিময় করলেন।

"আলীরাজ, আপনাকেও স্বাগতম।"

আলী মুচকি হেসে বলল,

“সে না বললেও চলতো হে হে"

বাইজিদ হেসে উঠলেন।

“মেহরাব, ভিতরে এসো বাবা”

সকলে বৈঠকখানায় বসতেই নানা রকম ফল, শরবত আর নাস্তার আয়োজন করা হলো। সম্রাটপুত্র অকারণে তো আসার মানুষ না। কোনো ঝামেলা হয়েছে কিনা এই চিন্তা বাইজিদ কে তাড়া দিচ্ছে। কুশল বিনিময়ের পর বাইজিদ শাহ্ গম্ভীর হয়ে বললেন,

"তা বাবা আজ হঠাৎ আবার আসার কারণ? কোনো সংবাদ আছে নাকি?”

মেহরাব আর সময় নষ্ট করল না। জঙ্গলে যা যা ঘটেছে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব খুলে বলল।

অদৃশ্য তীরন্দাজ, ধনুকে আঘাত করা তীর, অদেখা আক্রমণকারী আর ঝর্ণার সামনে দেখা সেই কালো পোশাকের সোনালি চুলের রহস্যময়ী যুবতী।

সব শুনে বাইজিদ শাহ্ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। মনে না না ভাবনার উকি দিচ্ছে। এ রাজ্যে সোনালি চুলের দুজন নারী আছে। এক তার বোন সুনেহেরা। আরেক তার ছোট কন্যা সাহারা। বললেন,

"অদ্ভুত ব্যাপার।"

তিনি চিন্তিত মুখে যোগ করলেন,

"আমাদের কোনো সৈন্যকে আমি এমন নির্দেশ দিইনি। তবু বিষয়টি আমি গুরুত্বসহকারে দেখব।"

মেহরাব মাথা নাড়ল।

"আমারও মনে হচ্ছে বিষয়টা সেরকম নয়। সন্দেহ করছি ডাকাত দলের সংযোগ আছে কিনা এর সাথে"

বাইজিদ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,

“সে দেখা যাবে। অনেক ধকল গেছে। আগে বিশ্রাম নাও”

****

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সাহারার মনে হলো এবার নিচে গিয়ে দেখে আসা যাক বাবা ফিরেছেন কি না। চুপিচুপি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।

ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। কয়েক সিড়ি নামতেই হঠাৎ নিচের বৈঠকখানার দিকে চোখ পড়তেই তার বুক ধড়াস করে উঠল। নিচে বসে আছে সেই দুই শিকারি! যদিও পেছন থেকে দেখা যাচ্ছে শুধু। তবুও সাহারা চিনে ফেলল। সকালের জঙ্গলের ঘটনা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই সাহারার চোখ কপালে উঠে গেল।

"ইয়া আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমাকে চিনে ফেলেছে। বাবার কাছে বিচার দিতে এসেছে!"

সে আর এক মূহূর্তও দাঁড়াল না যে গতিতে নিচে নামছিল, তার চেয়েও দ্রুত এক লাফে ঘুরে আবার ওপরের দিকে দৌড় দিল।

"আজ তো আমি শেষ!"

এদিকে মেহরাব একবারও তার মুখ দেখার সুযোগ পায়নি। দেখলে এতক্ষণে ওর খবর ছিল। প্রাণ হাতে নিয়ে ছুটে গেল ওপরে। দরজা বন্ধ করে দিলো ঘরে ঢুকেই।

“এই আপদ দুটো এখানে কেন? হায় আল্লাহ। এবারের মত বাঁচিয়ে নাও। পরের বার থেকে এমন ভাবে বেরোবো কেউ চেনা তো দূর, ভূত পেত্নি ভেবে পালিয়ে যাবে। আল্লাহ বাচিয়ে নাও।”

ঘরের মধ্যেই পায়চারি করতে লাগলো। বাবা মা এসেছে কতদিন পর দেখা করতেও যেতে পারছে না।

রাত গভীর হতে শুরু করেছে। সাহাবাদ প্রাসাদের অতিথিশালার ভিতর, দিনভর জঙ্গলে ঘোরাঘুরি আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ক্লান্তিতে মেহরাব ও আলীরাজ বিশ্রাম নিচ্ছিল। আলী বিছানায় আধশোয়া হয়ে এক থালা ফল সামনে রেখে একটার পর একটা আঙুর মুখে ফেলছে। মেহরাব জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।

তার চোখে ঘুম নেই।

আলী আঙুর চিবোতে চিবোতে বলল,

"মেহু, তুই প্রেমে পড়েছিস নাকি?"

মেহরাব ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

"কিসের প্রেম?"

“তোর ভিতরে প্রেমে পড়ার লক্ষণ গুলো টের পাচ্ছি বে”

মেহরাব বিরক্ত স্বরে বলল

“একটু কি কাজের কথা বলতে পারো না? সব সময় এত ফাও কথা পাও কই বলোতো”

আলী হেসে ফেলল। দরজায় মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ হলো। মেহরাব দরজার দিকে তাকাল।

"ভিতরে আসুন।"

দরজাটা আস্তে করে খুলল। ভেতরে প্রবেশ করল জান্নাত। আজ তার পরনে খয়েরী রঙের সালোয়ার-কামিজ। মাথায় সুন্দর করে জড়ানো ওড়না। চোখ দুটি নিচের দিকে নত। দু'হাতে সে একটি ছোট কাপড়ে মোড়ানো জিনিস ধরে আছে। ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল। দু'জন পুরুষের সামনে আসতে তার স্পষ্ট জড়তা কাজ করছে।

মৃদু স্বরে বলল,

"বিরক্ত করার জন্য অত্যন্ত দুঃখীত”

মেহরাবের চোখ অজান্তেই স্থির হয়ে গেল তার মুখের দিকে। কী অদ্ভুত শান্ত এই মেয়েটা!

কথা বলার ভঙ্গিটাও কত কোমল। সে শান্ত কণ্ঠে বলল

"আরে না না, বসুন বসুন।"

জান্নাত মাথা নাড়ল।

"না, দাঁড়িয়েই বলছি।"

কাপড়টা খুলে সামনে ধরল। সবুজ পান্না বসানো লকেটটি মশালের আলোয় ঝিলমিল করে উঠল।

মেহরাবের চোখ সরু হয়ে এলো। জান্নাত নরম গলায় বলল,

“সেদিন আপনারা যাওয়ার পর অতিথিশালার বিছানার ওপর পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম হয়তো আপনাদের কারও।"

আলী সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে উঠে এসে বলল,

"এই তো! আমি বলেছিলাম না, পালিয়ে যায়নি।"

তারপর দুষ্টুমি ভরা চোখে জান্নাতের দিকে তাকিয়ে বলল,

"আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো... লকেট ফেরত দিতে এসেছেন, নাকি আমাদের দেখতে?"

জান্নাত এক মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে গেল।

"জি... না... মানে..."

কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে। কি লোক রে বাবা। আলী হেসে বলল,

"আরে খারাপ ভাববেন না। আমি খুব ভালো মানুষ।"

মেহরাব কড়া চোখে তাকাল।

"মামা”

জান্নাত লকেটটা এগিয়ে দিল। মেহরাব হাত বাড়িয়ে লকেটটি নিল। দু'জনের আঙুল এক মুহূর্তের জন্য ছুঁয়ে গেল। জান্নাত দ্রুত হাত সরিয়ে নিল। মাথাটা আরও নিচু হয়ে গেল। মেহরাব কিছুক্ষণ লকেটের দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু স্বরে বলল

"ধন্যবাদ। এটা আমার খুব প্রিয়।"

জান্নাত ছোট্ট করে মাথা নাড়ল। মেহরাবের দৃষ্টি আবারও স্থির হলো তার মুখে। কত সাধারণ পোশাক। কোনো রাজকীয় অলংকার নেই।

তবু যেন তার ভেতর এক অদ্ভুত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। মায়া আছে,লাজ আছে,শান্তি আছে।

আলী আবার কাশি দিয়ে উঠল।

"উহু... আমি কি বাইরে চলে যাব? তোমরা নিশ্চিন্তে লকেট নিয়ে আলোচনা করো?"

মেহরাব এবার সত্যিই বিরক্ত হয়ে বলল,

"তুমি কি একটু চুপ থাকতে পারো না?"

আলী দুই হাত তুলে হেসে বলল,

"আচ্ছা, চুপ। তবে একটা কথা এই লকেটটা হারানোই ভালো হয়েছিল। না হারালে আবার ফেরত পাওয়ার এমন সুন্দর অজুহাতও তো মিলত না!"

কথাটা শুনে জান্নাতের গাল আরও রাঙা হয়ে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। আস্তে করে সালাম জানিয়ে দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।

সূর্য উঠার পরপর ই তৈরি হয়ে নিয়েছে মেহরাব আর আলীরাজ। অতিথিশালার সামনে দুইটি তেজী অশ্ব প্রস্তুত। মেহরাব ও আলীরাজ ফিরে যাবে আমিরাবাদে। বাইজিদ শাহ্ নিজে এসে তাদের বিদায় জানালেন। সৌজন্য বিনিময়ের পর মেহরাব ঘোড়ায় আরোহণ করল। বিদায়ের আগে একবার অজান্তেই তার দৃষ্টি ঘুরে গেল প্রাসাদের বারান্দাগুলোর দিকে। হয়তো আর একবার দেখা মিলবে।কিন্তু আজ কোথাও দেখা গেল না সেই শান্ত মুখটি। মনে বিশাল এক শূন্যতা নিয়ে লাগাম টেনে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল সে।

কাটাগিরির জঙ্গল পেরোতেই আবার শুরু হলো আলীরাজের অবিরাম বকবক।

"মেহু।"

"হুঁ?"

"সাহাবাদে কী আছে বলতো।"

"কেন?"

"যাওয়ার সময় তুই ছিলি যুবরাজ। ফিরছিস কবিরাজ হয়ে।"

মেহরাব বিরক্তি নিয়ে বলল

“ও জঙ্গল টা বুঝি পেরিয়েছি না? এখন খুব বুলি ফুটেছে? এতক্ষণ তো ভয়ে হির হির করে কাপছিলে। আরেকটা ফালতু কথা বললে তোমায় আমার ঘোড়ার সাথে বেধে নিয়ে গিয়ে কাটাগিরির নদীর ধারে ফেলে আসবো বলে দিলাম”

“এই মরেছে। শান্ত হ বাপ। আমি যা বলেছি আগে শুনবি তো। বালিশের তলায় বোধহয় তাবিজ রাখলি যাতে জা….”

মেহরাব ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আলী হেসে ফেলল।

"ঠিক আছে, নাম বলব না।"

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,

"তবে একটা কথা, সাহাবাদ এর আরও এক কন্যা আছে। তুখর তীরন্দাজ আর যুদ্ধে পটু। নামটাও তেমন, শাখা নেওয়াজ।”

মেহরাব এমন বর্ননা শুনে চকিতে তাকালো। আলী বলল

“অত খুশি হোস না। তার চুল মোটেও সোনালি না। আর আমাদের আক্রমণ করা তার ব্যক্তিত্তের সাথে যায় ই না।”

মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

"তুমি না থাকলে পৃথিবী অনেক বিরক্তিকর লাগতো”

দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে বিকেলের দিকে তারা আমিরাবাদে পৌঁছাল। রাজপ্রাসাদের প্রধান ফটক পেরোতেই প্রহরীরা সালাম জানাল। মেহরাব সোজা নিজের কক্ষে যাওয়ার আগেই এক প্রহরী এসে মাথা নত করল।

“যুবরাজ, সম্রাট আপনাকে এখনই ডেকেছেন। আদেশ আছে আপনি ফিরলেই যেন তার কাছে পাঠাই"

মেহরাব অবাক হলেও সঙ্গে সঙ্গে বাবার দরবারে গেল। হারুন ওয়াসেম কিছু নথিপত্র দেখছিলেন।

ছেলেকে দেখে মৃদু হাসলেন।

"এসো।"

মেহরাব সম্মানের সঙ্গে বসতেই সম্রাট বললেন,

"শোনো ওয়াসেম, একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আছে তোমার"

"আদেশ করুন।"

"পূর্ব সীমান্তের রাজ্যের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি হবে।"

তিনি টেবিলের ওপর রাখা মানচিত্রে আঙুল রাখলেন।

"সেখানে আমার বদলে তুমি যাবে। তুমি তো জানোই এই মাসে আমাদের রাজ্যে বাৎসরিক উৎসব। এসব ফেলে আমি যেতে পারবো না।”

মেহরাব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। হারুন ওয়াসেম বললেন,

"যাত্রা আজ রাতেই বাবা। দেরি করার কিন্তু সুযোগ নেই।"

কথাটা শুনেই মেহরাবের বুকের ভেতরটা যেন হালকা কেঁপে উঠল। সে ভেবেছিল আজ বাড়ি ফিরে মায়ের সঙ্গে কথা বলবে। তারপর আব্বুর কাছেও বলবে। সাহাবাদের জমিদার বাইজিদ শাহের কাছে তাঁর কন্যার জন্য আনুষ্ঠানিক বিবাহের প্রস্তাব পাঠানোর কথা জানাবে। কিন্তু সব পরিকল্পনা মুহূর্তেই ভেস্তে গেল। হারুন ওয়াসেম ছেলের মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করলেন।

"কী হলো?"

মেহরাব সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিল।

"কিছু না, আব্বু। প্রস্তুতি নিয়ে নিচ্ছি।"

নিজ কক্ষে ফিরে দরজা বন্ধ করতেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। চোখের সামনে ভেসে উঠল জান্নাতের শান্ত মুখটা। নিচু করে রাখা দুটি চোখ।

লাজুক হাসি। মেহরাব ভ্রমণের পোশাক গুছাতে লাগল। তরবারি, ধনুক। প্রয়োজনীয় নথিপত্র।

সবকিছু ঠিকঠাক থলি রাখলেও মনটা কোথাও স্থির হচ্ছে না। কিচ্ছু ভালো লাগছে না। হাসফাস লাগছে। হঠাৎ তার চোখ পড়ল তূণীরের দিকে।

এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে মৃদু হাসল সে। আসলে সাহাবাদ থেকে ফেরার আগে সে একটি কাজ ইচ্ছে করেই করে এসেছে।

অতিথিশালার বালিশের নিচে রেখে এসেছে নিজের হাতে লেখা একটি ছোট্ট চিঠি। আর নিজের অতি মূল্যবান তূণীরের একটি অলংকৃত অংশও সেখানে ফেলে এসেছে ইচ্ছাকৃতভাবে।

যেন সেটি ফেরত পাঠানোর একটি গ্রহণযোগ্য অজুহাত থাকে। আর যদি যদি সেই চিঠিটি জান্নাতের হাতে পৌঁছায় তবে সে চাইলে ওই তূণীরের অংশ ফেরত পাঠানোর সঙ্গে নিজের উত্তরও পাঠাতে পারবে। ভাবনাটা মনে আসতেই মেহরাবের ঠোঁটে অদৃশ্য এক হাসি ফুটে উঠল।

দূরের পথ তাকে আজ রাতেই ডেকে নিয়ে যাবে।

প্রিয়সীর অপেক্ষায় কাটবে প্রতি মূহুর্ত। ফিরে এসে যেন তার গৃহে তাকে নিজের করে নেওয়ার আবদার করতে পারে। শিকারে ঝোক থাকা মেহরাব কেমন প্রেমে পড়ে গেলো। মাথায় সব সময় প্রেয়সীর চিন্তাই ঘুরে।

****

সাহাবাদ প্রাসাদের দাস-দাসীরা অতিথিশালা গুছিয়ে নিচ্ছে। যুবরাজ মেহরাব ও আলীরাজ ভোরেই আমিরাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছেন। অতিথিশালা এখন আবার নিরিবিলি।

এদিকে সাহারা সারা প্রাসাদ মাথায় করে ঘুরছে।

“তুলতুল? এই তুলতুল?”

তার সাদা তুলতুলে খরগোশটার নামই তুলতুল।

সকাল থেকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। এক দাসী এসে বলল,

"ছোট মালকিন, মনে হয় অতিথিশালার দিকেই ঢুকেছিল।"

কথা শেষ হতেই সাহারা দৌড় দিল। অতিথিশালার দরজা আধখোলা। ভেতরে ঢুকেই চারদিকে খুঁজতে লাগল

"তুলতুল? আরে এই হনুমান। কোথায় গেলি?"

এসব এর দ্বারাই সম্ভব। খরগোশ কে বলছে হনুমান। বিরক্ত হয় ধপাস করে পালঙ্কে বসতেই

বিছানার নিচ থেকে দুটো লম্বা কান বেরিয়ে এল।

"আহা! এখানে লুকিয়েছিস!"

খরগোশটাকে কোলে তুলে নিতেই তার চোখ পড়ল বালিশের নিচে উঁকি দেওয়া ভাঁজ করা একখানা কাগজে। কৌতূহলী হয়ে কাগজটা টেনে বের করল।

"এটা আবার কী?"

ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে জান্নাতের কণ্ঠ ভেসে এল।

"সারা?"

জান্নাত ভেতরে ঢুকেই সাহারার হাতে কাগজটা দেখে থমকে গেল।

"ওটা কোথায় পেলি?"

সাহারা সরল গলায় বলল,

"বালিশের নিচে ছিল। মনে হয় কেউ ভুলে রেখে গেছে। দেখি তো কী লেখা…."

সে কাগজটা খুলতে যাবে, তার আগেই জান্নাত দ্রুত এগিয়ে এসে কাগজটি আলতো করে নিয়ে নিল।

"অন্যের লেখা অনুমতি ছাড়া পড়তে নেই।"

সাহারা নির্বিকার হয়ে বলল

“ধুর পড়তে যাচ্ছে কে। আমি তো এই চামচিক্কি টাকে খুঁজতে এসেছিলাম”

চামচিকার কথা শুনে জান্নাত লাফ দিয়ে উঠলো

“এই এই কোথায় চামচিকা?”

সাহারা ফিক করে হেসে ফেলল

“আরে আমি তো ওর কথা বলছি”

কোলের খরগোশ টা দেখালো। জান্নাত কপালে হালকা টোকা দিয়ে মৃদু ধমক দিল।

"খরগোশটা পেয়েছিস, এবার নিজের কক্ষে যা।"

"আচ্ছা... যাচ্ছি।"

খরগোশটাকে বুকে জড়িয়ে সাহারা বেরিয়ে গেল।

যেতে যেতেও বিড়বিড় করল,

"সবাই আমাকে বাচ্চা ভাবে! আর তুই? ও ঘরে কি করতে গেছিলি? জানের মায়া নেই? দু দুটো বাদড়মুখো শিকারী ও ঘরে সারা রাত ছিল। যদি তোকে খেয়ে নিতো"

সাহারা চলে যেতেই জান্নাত দরজাটা ভেজিয়ে দিল। তারপর হাতের ভাঁজ করা কাগজটির দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। কার লেখা?

মনে মনে উত্তরটা সে যেন আগেই জানত। আস্তে করে কাগজটা খুলল। সুন্দর, দৃঢ় হাতের লেখায় লেখা

"আসসালামু আলাইকুম।

আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় খুব অল্প সময়ের। হয়তো এটুকু সময় কাউকে জানার জন্য যথেষ্ট নয়। তবু সত্যিটা লুকিয়ে রাখতে পারলাম না।

আপনার শান্ত স্বভাব, লাজুক দৃষ্টি আর বিনয় আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছে।

আমি জানি না আপনার মনে আমার জন্য কোনো অনুভূতি আছে কি না। যদি না-ও থাকে, তবু আপনার প্রতি আমার সম্মান অটুট থাকবে।

অতিথিশালায় ইচ্ছে করেই আমার তূণীরের একটি অংশ রেখে গেলাম। যদি কখনো সেটি ফেরত পাঠাতে চান, আর আপনার মনে আমার জন্য একটুও স্থান থাকে... তবে তার সঙ্গে একটি ছোট্ট উত্তর পাঠিয়ে দেবেন।

মেহরাব।"

চিঠি পড়ে জান্নাতের হাত কেঁপে উঠল। কাগজটা বুকের কাছে চেপে ধরল। তার গাল লাল হয়ে উঠেছে। এতক্ষণ যে অনুভূতিটাকে সে নিজের কাছেও স্বীকার করতে পারেনি, সেটাই যেন আজ শব্দ পেয়ে গেল। সে কি সত্যিই যুবরাজের কথা ভেবেছে? হ্যাঁ। সেদিন অতিথিশালায় মিষ্টি পরিবেশন করার সময় যে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার ওপর স্থির হয়েছিল সেই দৃষ্টি সে ভুলতে পারেনি। অনেক পুরুষের চোখেই সে কৌতূহল দেখেছে।

বেশির ভাগই ছিল রুপের আকর্ষণ। কিন্তু মেহরাবের চোখে ছিল সম্মান, মুগ্ধতা আর আন্তরিকতা। সেই চোখ দুটো অজান্তেই তার মনেও দাগ কেটে গিয়েছিল। জান্নাত জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দূরে আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল

"যুবরাজ..."

বুকের ভেতর আজ নতুন এক অনুভূতির জন্ম হলো। সম্ভবত ভালোবাসার।

চিঠিটা যত্ন করে ভাঁজ করে নিজের ওড়নার আঁচলের ভেতর রেখে দিল জান্নাত। হয়তো একদিন সেই চিঠির উত্তরও লিখবে যত্ন নিয়ে।

***

দীর্ঘ নয় মাস পর সাহাবাদ প্রাসাদ যেন আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। জমিদার বাইজিদ শাহ্ ফিরেছেন। ফিরেছেন তাঁর সহধর্মিণী মেহেরুন্নেসা নূরও। একসময় তিনি ছিলেন এক বিশাল সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী। সময়ের পালাবদলে আজ তিনি সাহাবাদের গৃহিণী। তাঁর ব্যক্তিত্বে এখনো রাজকীয় সৌন্দর্যের ছাপ স্পষ্ট। দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে শরীর কিছুটা দুর্বল হলেও এখন তিনি অনেকটাই সুস্থ। সকালে ফজরের নামাজের পর থেকেই তাঁর দিনের শুরু। পরিপাটি পোশাক, পরিমিত অলংকার, সুচারু হিজাব সবকিছুতেই এক অপূর্ব শালীনতা।

বয়স খুব বেশি নয়, কিন্তু তাঁর মুখের সৌন্দর্য এমন যে তাকালে দ্বিতীয়বার না দেখে থাকা যায় না। অনেকেই বলে জান্নাত যেন মায়েরই প্রতিচ্ছবি। শান্ত স্বভাব, নরম কণ্ঠ, লাজুক দৃষ্টি, ধৈর্য আর মায়া সবই যেন মেহেরুন্নেসার কাছ থেকেই পেয়েছে সে। মা-মেয়েকে পাশাপাশি দাঁড় করালে মনে হয়, যেন একই ফুলের দুটি ভিন্ন ঋতুর রূপ। শাখা ও কম গুণবতী নয়। বিচক্ষণ, সংযত এবং ভদ্র। যে দায়িত্বই দেওয়া হোক, নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে। তাকে নিয়ে মেহেরুন্নেসার মনে তেমন কোনো দুশ্চিন্তা নেই।

কিন্তু তাঁর সমস্ত উদ্বেগের একটাই নাম, সাহারা।

সকালবেলা কন্যাদের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলেন, জান্নাত রান্নাঘরে সাহায্য করছে। শাখা হিসাবরক্ষকের সঙ্গে জমিদারির নথিপত্র দেখছে।

আর সাহারার কক্ষ ফাঁকা। মেহেরুন্নেসা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

"আবার কোথায় গেল মেয়েটা?"

ঠিক তখনই জানালার বাইরে অদ্ভুত এক শব্দ ভেসে এলো। তিনি বারান্দায় এসে নিচে তাকাতেই দৃশ্য দেখে কপালে হাত ঠেকালেন। সাহারা হাসতে হাসতে দৌড়াচ্ছে। তার পেছনে লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটছে সাদা খরগোশ। এক কাঁধে বসে আছে রঙিন এক বুনো পাখি। আর তার হাতের ওপর নিশ্চিন্তে বসে আছে ছোট্ট এক বিরল প্রজাতির গিরগিটি। দাসীরা দূরে দাঁড়িয়েও ভয় পাচ্ছে। সাহারা নির্বিকার। যেন এটাই খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য। মেহেরুন্নেসা প্রহরী কে বলল

“ও এসব পশু-প্রাণী পায় কোথ থেকে? কে এনে দেয় এসব?”

প্রহরী নতশিরে বলল

“কেউ এনে দেয় না সম্রাজ্ঞী। উনি নিজেই জঙ্গল থেকে ধরে আনেন”

মেহেরুন্নেসার তো মাথায় হাত। এটা এমন বিগড়ে গেল কী করে? কিছুক্ষণ পর সাহারা আনন্দে গুনগুন করতে করতে ওপরে উঠল। মাকে দেখেই দাঁত বের করে হাসল।

"আম্মা! জানো আমি একটা ঈগলের ছানা পেয়েছি”

মেহেরুন্নেসা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন

“তোমার এমন স্বভাবে কিন্তু আমি চিন্তিত সাহারা”

সাহারা হা করে তাকিয়ে বলল

“আমি আবার কি করলাম?”

"তুমি আর ছোট নেই, মা।"

তিনি ধীরে ধীরে সাহারার এলোমেলো সোনালি চুলগুলো কানের পাশে গুছিয়ে দিলেন।

"আল্লাহ তোমাকে অপূর্ব সৌন্দর্য দিয়েছেন। এই সৌন্দর্য তাঁরই আমানত। সেটার হেফাজত করাও দায়িত্ব।"

সাহারা ঠোঁট বাঁকাল। মেহেরুন্নেসা মৃদু হেসে বললেন,

" জঙ্গলে,পাহাড়ে, নদীর ধারে সারাক্ষণ ছুটে বেড়াও। তোমাকে খুঁজতে খুঁজতেই সবার অর্ধেক সময় চলে যায়।"

সাহারা মাথা নিচু করল। মা এবার তার দুই গাল আলতো করে ছুঁয়ে বললেন

“আমি চাই তুমি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে ঘুরে বেড়িও না। পর্দার গুরুত্ব বোঝো। নিজের নিরাপত্তার কথাও ভাবো।"

সাহারা ছোট্ট স্বরে বলল

“আমার ঘরে থাকতে ভাল্লাগে না আম্মা”

মেহেরুন্নেসার চোখে ভেসে উঠলো সুনেহেরার যুবতী বয়সের চিত্র। এমন ছন্নছাড়া বাউন্ডুলে মেয়েটি এক পাষাণ প্রেমিক কে ভালোবেসে গোটা জীবন অপেক্ষায় কাটালো।

সাহারা সেই বাউন্ডুলে স্বভাব পেয়েছে। এই মেয়ের মনটা খোলা আকাশের মতো। বাঁধা মানতে শেখানো সহজ হবে না। তবু তিনি আশা ছাড়েন না। দুষ্টুমির আড়ালে সাহারার হৃদয়টা খুবই নির্মল। শুধু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাকে একটু স্থির হতে শিখতে হবে। সাহারা বাচ্চাদের মতো দু হাতে জামা ধরে সিড়ি উঠতে উঠতে বলল

“আম্মা জানো অতিথি শালায় আপা একটা চিঠি পেয়েছে। না না আপা পায় নি আমি পেয়েছি, তারপর আপা নিয়ে নিয়েছে”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 6 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন