রাতের শেষ প্রহর। আমিরাবাদ প্রাসাদের প্রধান ফটকের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে রাজকীয় ঘোড়ার গাড়ি, অশ্বারোহী সৈন্য আর বণিকদের কাফেলা। পূর্ব সীমান্তের রাজ্যে নতুন বাণিজ্যিক চুক্তির উদ্দেশ্যে রওনা হবেন যুবরাজ মেহরাব। সম্রাট হারুন ওয়াসেম নিজে ছেলেকে বিদায় জানাতে এসেছেন। আয়েশা বেগম বারবার ছেলের জামার কলার ঠিক করে দিচ্ছেন।
"ঠিকমতো খাবে। সময়মতো বিশ্রাম নেবে।"
মেহরাব হেসে মায়ের হাত দুটো ধরে বলল
"আম্মা, আমি এখন ছোট নেই বুঝল"
আয়েশা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন
"তুই কাছে এখনও ছোটই।"
মায়ের কপালে চুমু খেয়ে ঘোড়ার গাড়িতে উঠে বসল মেহরাব। তার ব্যক্তিগত অশ্বটিকেও সঙ্গে নেওয়া হয়েছে বটে, তবে দীর্ঘ বাণিজ্যিক সফরে অধিকাংশ পথ তাকে রাজকীয় শকটেই চলতে হবে। শিঙ্গা বাজল। ধীরে ধীরে যাত্রা শুরু করল বিশাল কাফেলা।
****
আমিরাবাদের সীমানা পেরোতেই প্রকৃতির রূপ যেন বদলে যেতে লাগল। প্রশস্ত রাজপথের দু'ধারে সোনালি ধানের ক্ষেত বাতাসে ঢেউ তুলছে। রাস্তার পাশে খেজুরগাছের সারি। বিশাল সরিষাক্ষেত, যেন হলুদ ফুলের সমুদ্র। ছোট ছোট গ্রাম পেরিয়ে যাচ্ছে কাফেলা। শিশুরা পথের ধারে দাঁড়িয়ে রাজকীয় পতাকা দেখে হাত নাড়ছে।
বৃদ্ধরা সালাম জানাচ্ছেন। দূরে নদীর বুকে পাল তুলে ভেসে চলেছে নৌকা। পাহাড়ি অঞ্চল শুরু হতেই দৃশ্য আবার বদলে গেল। সর্পিল পথ, এক পাশে গভীর খাদ অন্য পাশে আকাশছোঁয়া পাথুরে পাহাড়। মাঝে মাঝে পাহাড় কেটে নেমে এসেছে সরু ঝর্ণা। শীতল বাতাসে বুনো ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। মেহরাব জানালার পর্দা সরিয়ে মুগ্ধ চোখে চারপাশ দেখছিল। ভ্রমণ তার সবসময়ই প্রিয়। নতুন পথ, নতুন মানুষ, নতুন ভূখণ্ড এসবের মধ্যে সে এক অদ্ভুত আনন্দ খুঁজে পায়।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে। কাফেলা তখন এক বিস্তৃত অরণ্যের পাশ দিয়ে এগোচ্ছে।
হঠাৎ মেহরাবের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দূরে স্থির হয়ে গেল।
রাজপথ থেকে কিছুটা দূরে ধুলোর ঝড় তুলে ছুটে যাচ্ছে একটি কালো ঘোড়া। আর তার পিঠে কালো পোশাকে মোড়া এক অশ্বারোহী। বাতাসে উড়ছে তার ঝলমলে সোনালি চুল। মেহরাবের বুক কেঁপে উঠল।
“ও এখানেও?”
সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়াল। চোখ আর সরাতে পারছে না। এক নিমিষে সেই অশ্বারোহী ঘোড়ার গতি আরও বাড়িয়ে গভীর অরণ্যের ভেতরের সরু পথে ঢুকে পড়ল। মেহরাব আর এক মুহূর্তও দেরি করতে চাইল না। সে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে তাকাল। তার নিজের অশ্বটি কাফেলার অনেক পেছনে সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে আসা হচ্ছে। এখনই নামলেও ঘোড়া হাতে পেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। আর ততক্ষণে সেই রহস্যময়ী অনেক দূরে চলে যাবে। মেহরাব অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল।
কালো ঘোড়াটি ঘন বৃক্ষের আড়ালে মিলিয়ে গেল।
সোনালি চুলের শেষ ঝলকটুকুও অদৃশ্য হয়ে গেল অরণ্যের অন্ধকারে। মেহরাব ধীরে ধীরে বসে পড়ল। নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলল,
"তুমি কি বন্য বেড়াল? তোমাকে তো ধরতেই হবে”
কেন যেন তার মনে হলো এই মেয়েটি ইচ্ছে করেই সবসময় দেখা দেয় তারপর অধরা হয়ে যায়। যেন তাকে পাওয়ার জন্য আরও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। কয়েকদিনের দীর্ঘ যাত্রা শেষে কাফেলা পৌঁছাল পূর্ব সীমান্তের সমৃদ্ধ রাজ্যে।
সুদৃঢ় পাথরের প্রাচীর ঘেরা নগর, উঁচু মিনার রঙিন কাঁচে সাজানো প্রাসাদ। বিশাল বাজারে দূরদেশের মসলা, রেশম, সুগন্ধি আর মূল্যবান পাথরের কেনাবেচা চলছে।
রাজকীয় অতিথিদের জন্য আগে থেকেই বিশেষ আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রহরীরা সশ্রদ্ধ সালাম জানিয়ে কাফেলাকে ভেতরে নিয়ে গেল।
সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল বাণিজ্যিক বৈঠকের প্রস্তুতিতে। মেহরাবের মাথায় এখনো ঘুরছে সেই অরণ্যে দেখা সোনালি চুলের মেয়েটি। ক্ষণিকের জন্য দেখা দিয়েও আবার হারিয়ে গেল সেই রহস্যময় অশ্বারোহী।
*****
পেরিয়ে গেছে কয়কেকটা দিন। জান্নাত উদাস হয়ে বসে আছে জানালার ধারে। তার সামনে খোলা একটি পুরোনো বই। খোলা থাকলেও বইয়ের একটি লাইনও পড়া হচ্ছে না। আঙুলের ফাঁকে বারবার ঘুরে ফিরে আসছে সেই ভাঁজ করা চিঠিটি। দরজায় মৃদু শব্দ।
"আসব, মা?"
মেহেরুন্নেসার কণ্ঠ। জান্নাত দ্রুত চমকে উঠল।
এক মুহূর্তেই চিঠিটা বইয়ের ভেতর গুঁজে রেখে উঠে দাঁড়াল।
“এসো, আম্মা। তুমিও না। বলার কি আছে?"
মেহেরুন্নেসা কক্ষে ঢুকে মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। আজকাল জান্নাতকে যেন একটু অন্যরকম লাগছে। উদাস থাকে বেশির ভাগ সময়। অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে কেমন যেন। মেহেরুন্নেসা এসে পাশে বসলো। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে বললেন,
"একটা কথা জিজ্ঞেস করব?"
"জি, আম্মা।"
"সাহারা বলল, কয়েকদিন আগে তুমি একটা চিঠি পেয়েছো? কই আমায় তো কিছু বলোনি সে ব্যাপারে। কিসের চিঠি সেটা?”
জান্নাতের বুক ধক করে উঠল। তবু মুখে শান্ত ভাব রেখেই বলল,
"কোন চিঠি?"
"যেটা অতিথিশালা থেকল এনেছিলে।"
জান্নাত একটু থেমে নরম স্বরে বলল,
"ওটা... অতিথিদের ফেলে যাওয়া একটা কাগজ ছিল। তেমন কিছু না।"
মেহেরুন্নেসা স্থির দৃষ্টিতে মেয়ের মুখ দেখলেন।
মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই মিথ্যা বলতে পারে না।
আজও হয়তো পুরো সত্যটা বলছে না। তবে তিনি আর জোর করলেন না। শুধু মৃদু হেসে বললেন,
"আচ্ছা।"
কথাটা সেখানেই শেষ হলো, কিন্তু মায়ের মন থামল না। কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে তিনি মনে মনে ভাবলেন
"আমার মেয়ে কি তবে কাউকে পছন্দ করেছে?"
ভাবনাটা অস্বস্তিরও, আবার অদ্ভুত এক স্বস্তিরও।
জান্নাত বড় হয়েছে। তার মনেও তো একদিন না একদিন ভালোবাসা আসবেই। মানুষটা কেবল সঠিক হলেই হয়।
সন্ধ্যায় নিজের কক্ষে বসে ছিলেন জমিদার বাইজিদ শাহ। মেহেরুন্নেসা এসে পাশে বসলেন।
বাইজিদ স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
"কিছু বলবে?"
মেহেরুন্নেসা একটু ইতস্তত করে বললেন,
"জান্নাতকে নিয়ে ভাবছি।"
"কী হয়েছে ওর?"
"মনে হচ্ছে,ওর মনে হয়তো কারও জন্য অনুভূতি জন্মেছে। মানে ভালো টালো বাসছে আরকি”
বাইজিদ বিস্মিত হলেন।
"কাউকে বলেছে?"
"না।"
"তাহলে বুঝলে কীভাবে?"
মেহেরুন্নেসা মৃদু হেসে বললেন,
"মায়েরা মেয়েদের চোখ পড়তে পারে। আমার মনে হয়, এবার ওর বিয়ের কথা ভাবা উচিত।"
বাইজিদ মাথা নাড়ল। সত্যিই তো, সময় হয়ে গেছে বিয়ের। এবার দেওয়াই যায়। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন
"ভালো, দ্বীনদার আর চরিত্রবান কোনো পাত্রের সন্ধান শুরু করতে হবে।"
দু'জনের এই কথোপকথনের শেষ অংশ দরজার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় শুনে ফেলল জান্নাত।
দাঁড়াল সেখানে। মুখে কোনো কথা নেই। কোনো প্রতিবাদও নেই। বুকের ভেতরটা কেমন যেন শূন্য হয়ে গেল। মেহরাবের লেখা চিঠিটার কথা মনে পড়তেই তার চোখ নিচু হয়ে এল। নিজ কক্ষে ফিরে চুপচাপ বসে রইল জান্নাত। শাখা আর সাহারা ঢুকল। সাহারা ঢুকেই বলল,
"আপা, মুখটা এমন শুকনো লাগছে কেন?"
ফের শাখা শান্ত স্বরে বলল
"কিছু হয়েছে?"
জান্নাত একটু ইতস্তত করে সব কথা খুলে বলল।
মা-বাবা তার বিয়ের কথা ভাবছেন। কথা শেষ হতেই সাহারা যেন লাফিয়ে উঠল।
“এটা আবার কেমন কথা!"
শাখাও ভ্রু কুঁচকাল।:সাহারা দুই হাত নেড়ে বলতে লাগল
"চেনা নেই, জানা নেই... বাবা-মা বলল আর বিয়ে করে ফেলতে হবে? মানুষকে না জেনে কীভাবে সারাজীবন একসঙ্গে থাকা যায়?"
শাখা এবার একটু রেগে বলল
“বিয়ে শুধু দুই পরিবারের সম্পর্ক নয়, দুই মানুষেরও সম্পর্ক।"
সে জান্নাতের পাশে বসে তার হাত ধরল।
"তোমার মতামতও গুরুত্বপূর্ণ।"
সাহারা মাথা নেড়ে বলল,
"আমি হলে আগে ভালো করে কথা বলতাম। মানুষটা কেমন, কী ভাবে, কেমন ব্যবহার সব জেনে তারপর সিদ্ধান্ত নিতাম। হুহহ কী সব বলছি। আমি তো বিয়েই করব না”
জান্নাত আর শাখা হাসল। সাহারা গম্ভীর মুখ করে বলল
"না আপা, সত্যি বলছি। বিয়ে টিয়ে তে আমি নেই বাবা। আর যদি কাওকে পছন্দ হয়েই যায়। সোজা গিয়ে আম্মা কে বলব।”
শাখা জান্নাতের চুল অল্প টেনে দিয়ে বলল
“হয়েছে। আর পাকনামো করতে হবে না। শল তুই। আপা তুমি বিশ্রাম নাও
*****
আমিরাবাদ প্রাসাদ বেশির ভাগ সম নিরিবিলিই থাকে। যুবরাজ মেহরাব বাণিজ্যিক সফরে অন্য রাজ্যে গেছেন তিন দিন হলো। কিন্তু একজনের যেন এতে মোটেও শান্তি নেই। তিনি জাহিদা।
সকালের পর থেকে অকারণেই বারবার যুবরাজের মহলের দিকটায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
অযথাই উকি ঝুকি মারে। জানে না মেহরাব মহলেই নেই। চাপানো দরজা আস্তে করে ঠেলে ভিতরে উঁকি মারতেই পেছন থেকে ভেসে এল পরিচিত কণ্ঠ।
"উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে লাভ নেই।"
জাহিদা ঘুরে তাকাতেই দেখল, আলীরাজ দুই হাত পেছনে রেখে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে। মুখে দুষ্টু হাসি।
জাহিদা চোখ সরু করে বলল,
"আপনি?"
আলী গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
"কবিরাজ ঘরে নেই।"
জাহিদা ভ্রু কুঁচকাল।
“কবিরাজ?"
"হ্যাঁ।"
"কে আবার কবিরাজ?"
আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"আহা! আমাদের যুবরাজ। দিনে যুবরাজ, রাতে সে কবিরাজ। এখন তিনি অন্য রোগীর মোহাব্বত সারাতে বিদেশে গেছেন।"
জাহিদা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল। এই "অন্য রোগী" বলতে আলীরাজ কাকে ইঙ্গিত করছে। তার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
"আপনি আমাকে খোঁচা মারছেন মামা?"
আলী ভান করে অবাক হলো।
"আমি? আরে কি বলো না বলো। ভুলে যেও না আমি তোমার মামা শশুড় হই। বুঝে শুনে কথা বলো”
"আপনি না, খুব বাড়াবাড়ি করছেন।"
"আমি তো কত কিছুই করি। তবে একটা কথা, তুমি এ ঘরের সামনে এত ঘুরঘুর করো কেন? ওওওওওও অসুস্থ? কবিরাজ লাগবে?”
জাহিদা এবার বিরক্ত হলো।
"আপনার কথা শুনতে আমার মোটেও ভালো লাগে না মামা। যান তোওও।"
আলী মাথা নেড়ে বলল,
"আসলে আমার কথায় সমস্যা নেই। সমস্যা সত্যিটায়।"
জাহিদা রাগে ফুঁসতে লাগল
"আপনার সঙ্গে আর একবার যদি আমি কথা বলু, আমার জিভ কাটা পড়ুক”
"আলহামদুলিল্লাহ! আহাআআআআ, এত খুশির দিন কবে আসবে বউ মা?”
জাহিদা ক্ষোভে ওড়না ঠিক করতে করতে সেখান থেকে দ্রুত চলে গেল। আলী হেসে বলল,
“ আমার মত একটা কচি মামাশ্বশুর পেয়েছো তেমার সাত কপালে ভাগ্য বুঝলা”
বলে ঘুরতেই সামনেই এক দাসীর সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খেল। দাসীর হাতে থাকা থালা কাত হয়ে কয়েকটা আপেল মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল। আলী তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে আপেলগুলো কুড়িয়ে দিয়ে বলল,
"আহা! আমি দোষী। শাস্তি হিসেবে একটা আপেল খেতে পারি?"
দাসী মুখ চেপে হেসে ফেলল।
"না, হুজুর।"
"দেখলে? অপরাধ করেও কিছুই পেলাম না।"
দাসী লজ্জা পেয়ে দ্রুত সরে গেল। আলী মাথা চুলকে আবার নিজের পথ ধরল। জাহিদা রাগে গজগজ করতে করতে প্রাসাদের পেছনের দিকের নির্জন পথে চলে এসেছে। এই দিকটায় লোকজন খুব একটা আসে না। পুরোনো ইটের দেয়াল।
আগাছায় ভরা পথ। ভাঙা কারুকাজ। ভীষণ নিস্তব্ধ চারিদিক। আলীরাজ কে গালাগাল করতে করতে যাচ্ছে। হঠাৎ ধুম করে কি একটদ শব্দ হলো। জাহিদা থমকে দাঁড়াল। শব্দটা কোথা থেকে এল? চারদিকে তাকাল। আবারও সেই শদ এবার স্পষ্ট বোঝা গেল। প্রাসাদের একেবারে শেষ প্রান্তে বহু বছরের পুরোনো কাঠের একটি দরজা।
দরজার গায়ে মোটা লোহার তালা ঝুলছে। চারপাশে ধুলোর আস্তরণ। মনে হয় বহু বছর কেউ এ পথে আসেনি। কিন্তু দরজাটা যেন ভেতর দিক থেকে কেঁপে উঠল। ঠাস করে আবার একটা ধাক্কা। তালাবদ্ধ দরজাটা অল্প করে নড়ে উঠল।
জাহিদার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল সেদিকে। ভেতরে কেউ আছে নাকি? নাকি কেবলই তার ভুল শোনা? দ্রুত স্থান ত্যাগ করলো জাহিদা।
রাত অনেক গড়িয়ে গেছে। পূর্ব সীমান্তের রাজ্যের রাজকীয় অতিথিশালায় মেহরাব বসে। দূরের প্রহরীদের পদধ্বনি আর মাঝে মাঝে রাতজাগা পাখির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। মেহরাবের কক্ষে আলো জ্বলছে। দিনভর বাণিজ্যিক বৈঠক শেষ করে বিশ্রাম নেওয়ার বদলে সে বসে আছে বড় কাঠের টেবিলের সামনে। টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে চামড়ার ওপর আঁকা বিভিন্ন মানচিত্র। কিছু বর্তমান কিছু বহু পুরোনো। হারুন ওয়াসেম সবসময়ই ছেলেকে শুধু অস্ত্র চালনার সাথে সাথল, ভূগোল, বাণিজ্য আর সীমান্ত সম্পর্কেও দক্ষ করে তুলেছেন।
তাই নতুন চুক্তির আগে আশপাশের রাজ্যগুলোর অবস্থান নিজেই ভালো করে বুঝে নিতে চাইছে মেহরাব।
একটা একটা করে মানচিত্র খুলে মিলিয়ে দেখছে।
নদীর গতিপথ, জঙ্গলের বিস্তৃতি,বাণিজ্যপথ, পাহাড়ি গিরিপথ। সবকিছু খুঁটিয়ে দেখছে সে। সাহাবাদের পশ্চিম-উত্তর দিকের কাটাগিরির বিশাল জঙ্গলের ওপর আঁকা একটি অদ্ভুত চিহ্ন চোখে পড়ল। সে আরও কাছে ঝুঁকে এল। একটি পুরোনো বৃত্তাকার নগরীর প্রতীক। চারদিকে ভাঙা প্রাচীরের চিহ্ন। মাঝখানে রাজপ্রাসাদের প্রতীক আঁকা। কিন্তু বর্তমান মানচিত্রে সেখানে কেবল ঘন অরণ্য দেখানো হয়েছে। মেহরাব দ্রুত আরেকটি মানচিত্র খুলল। তারপর আরেকটি। একটার সঙ্গে আরেকটা মিলিয়ে দেখতে লাগল। অনেকক্ষণ তুলনা করার পর ধীরে ধীরে বিষয়টা পরিষ্কার হতে শুরু করল।
বর্তমান সাহাবাদের জঙ্গল একসময় আসলে একটি জনবসতিপূর্ণ নগরী ছিল। মেহরাব আঙুল রেখে নিচের বিবর্ণ লেখাটা পড়ল। "নাসিরাবাদ।"
শব্দটা খুব আস্তে উচ্চারণ করল সে।
"নাসিরাবাদ..."
সাহাবাদে অবস্থানকালে কেউ কখনো এই নাম উচ্চারণও করেনি। বাইজিদ শাহও না। সুনেহেরাও না। প্রজারাও না। এমনকি রাজ্যের নথিতেও সে এই নগরীর উল্লেখ দেখেনি। তাহলে? একটি সম্পূর্ণ নগরী কোথায় হারিয়ে গেল? কেন তার অস্তিত্ব মুছে ফেলা হলো? সে আবার পুরোনো মানচিত্রে চোখ বুলাল। সেখানে স্পষ্ট লেখা "নাসিরাবাদ, উত্তর সীমান্তের দুর্গনগর।"
মেহরাবের তীক্ষ্ণ চোখে কৌতূহলের ঝিলিক ফুটে উঠল। তার মনে পড়ে গেল সেই রহস্যময় ভূতুড়ে প্রাসাদের কথা। জানালার পাশে গিয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বলল,
"রাজ্যে ফিরে প্রথম সুযোগেই নাসিরাবাদে যাব। যে নগরীকে ইতিহাস লুকিয়ে রেখেছে, তার রহস্য আমি জানবই।"
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের নিস্তব্ধ বাগানের দিকে তাকিয়ে আছে মেহরাব। চাঁদের রুপালি আলোয় ফুলের বাগান যেন স্বপ্নের মতো লাগছে।
ঠিক তখনই তার তীক্ষ্ণ চোখ হঠাৎ স্থির হয়ে গেল সামনে। প্রাসাদের উঁচু পাথরের পাঁচিলের ওপর একটা ছায়া ভেসে উঠেছে। পরমুহূর্তেই ছায়াটা অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় পাঁচিল টপকে ভেতরে নেমে এলো। মেহরাব চোখ সরু করল। কালো পোশাক।
বাতাসে ঢেউ খেলল সেই পরিচিত সোনালি চুল।
তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
"ও কি আমার পিছে ছায়ার মত লেগে আছে নাকি?”
মেয়েটি চারদিকে একবার তাকিয়ে নিল। মুখে দুষ্টু হাসি। মনে হচ্ছে জায়গাটা তার বেশ চেনা।
হালকা পায়ে সে সোজা ফুলের বাগানের দিকে এগিয়ে গেল। মেহরাব আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। দরজা খুলে দ্রুত করিডোরে বেরিয়ে এল। তার পায়ের শব্দ পর্যন্ত শোনা গেল না।
বহু বছরের শিকারি অভ্যাসে সে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। মনে মনে বলল
"আজ আর তোমাকে হারাতে দেব না বন বিড়াল।"
বাগানের দিকে এগোতেই শীতল বাতাস মুখে এসে লাগে। গোলাপ, বেলি আর রজনীগন্ধার মিষ্টি সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে আছে। কালো পোশাকের অবয়বটা এক ঝলক দেখা গেল। মেয়েটি একটি গোলাপগাছের পাশে দাঁড়িয়ে ফুলের পাপড়িতে হাত বুলিয়ে আবার এগিয়ে গেল। মেহরাব গাছের আড়াল ধরে ধীরে ধীরে তার পিছু নিল। আস্তে আস্তে দুজনের মাঝের দূরত্ব কমতে লাগল।
এতদিন ধরে যে রহস্যময়ী তার চোখের সামনে এসে মিলিয়ে যেত, আজ সে মাত্র কয়েক কদম দূরে। মেহরাবের ঠোঁটে আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটে উঠল।
"আজ দেখব, তুমি কে।"
মেয়েটি যেন হঠাৎ কিছু টের পেল। একবার কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাতে উদ্যত হতেই মেহরাব দ্রুত পাশের বিশাল অশ্বত্থ গাছের আড়ালে সরে দাঁড়াল। শিকারি আর অধরা রহস্যের শিকার মুখোমুখি হতে চলেছে।