“শাহজাদী!”
চারদিক থেকে একসঙ্গে চিৎকার উঠল। শাখা এক পা টলে গিয়ে সিঁড়ির পাশে থেমে গেল। সৈন্যরা মুহূর্তেই অস্ত্র তুলে চারদিকে তাকাল। প্রাসাদের লোকজন ভয়ে ছুটে সরে গেল। কেউ বুঝতেই পারছিল না, তীরটি কোথা থেকে এলো।
ফাইয়াজের মুখ মুহূর্তেই বিবর্ণ হয়ে গেল। তারপর তার চোখ চলে গেল প্রাসাদের বাইরের অন্ধকারে।
দূরে কয়েকটি ঘোড়া ছুটে চলেছে। ঘোড়ার পিঠে কয়েকজন অশ্বারোহী। মুখের অধিকাংশ কাপড়ে ঢাকা। তারা একবারও পেছনে তাকাচ্ছে না। ফাইয়াজ স্থির চোখে তাদের দেখল। সে চিনে ফেলেছে। চোখের দৃষ্টি কঠিন হয়ে উঠল তার।
কিন্তু মুখ দিয়ে একটি শব্দও বের হলো না। সে জানে কারা এরা। জানে, কেন এরা এখানে এসেছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা সে জানে, এই সত্য প্রকাশ করলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে। তার দলের একজনও দূরের অশ্বারোহীদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সর্দার…”
ফাইয়াজ সঙ্গে সঙ্গে তাকে থামিয়ে দিল চোখের ইশারায়। সেও কিছু বলল না। দলের সবাই চিনে ফেলেঋে ওই দল আমিরাবাদ সম্রাটের সৈন্য। শাখা টলে পড়তেই ফাইয়াজ চিৎকার করে ছুটে গেল।
“শাখা!”
শাখার শরীর ঢলে পড়ছে । ফাইয়াজ গিয়ে তাকে ধরে ফেলল। তার দুই হাত শাখার কাঁধের কাছাকাছি থেমে গেল আঘাতের জায়গায় যেন অসাবধানতাবশত হাত না পড়ে।
“কেউ চিকিৎসককে ডাকো!”
তার গলার আতঙ্কিত দেখে আশেপাশের সবাই থমকে গেল। ফাইয়াজ নিজেই তীরটির দিকে তাকাল। খুব সাবধানে তীরটি সরিয়ে নিল। টুকিটাকি অভিজ্ঞতা তার নিজের ও আছে। শাখা চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। ফাইয়াজের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। কাতর কন্ঠে ডাকল
“চোখ খুলো, শাখা…অ্যাই শাখা তাকাও না। এই ইব্রাহিম! ইব্রাহিম জলদি আয়।
ডাকাত দলের চিকিৎসক ইব্রাহিম ছুটে এলো।
লোকটি বহু অভিযানে তাদের সঙ্গে থেকেছে। ইংরেজদের কাছ থেকে পাওয়া প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ তার ছিল। দলের কেউ আহত হলে পথেই যাতে ক্ষত পরিষ্কার করা, প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া এবং কাপড় দিয়ে বাঁধার ব্যবস্থা করা যায় সেজন্য ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সবসময় তাদের সঙ্গে থাকে।
চিকিৎসক দ্রুত শাখার কাছে বসে ক্ষত পরীক্ষা করল।
ফাইয়াজ ব্যাস্ত হয়ে পড়ল।
“ওষুধ দাও। দ্রুত ওষুধ দাও”
বাইজিদ, মেহেরুন্নেসা, সুনেহেরা প্রত্যেকে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফাইয়াজ চ্যাচালো তাদের ওপর
“তামাশা দেখছেন? তামাশা দেখছেন আপনারা? আরে এ না আপনাদের মেয়ে? কাকে কি বলছি আমি। কোন কক্ষে নিব? এই সামনে যেটা পাও সেই কক্ষেই নিয়ে চিকিৎসা শুরু করো”
দাসীরা শাখাকে ধরে কক্ষে নিলো। চিকিৎসক ওষুধ লাগিয়ে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ক্ষতস্থান বেঁধে দিল। শাখা তখনও চুপ। নড়নচড়ন নেই। চোখও খুলছে না। ফাইয়াজ তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের ভেতরের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলছে পাষাণ পুরুষটা। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। মুখ ঘুরিয়ে নিল, কিন্তু কান্না থামাতে পারল না। চোখ মুছে আবার শাখার দিকে তাকাল।
“তোমার কিচ্ছু হবে না। আমি তোমার কিছু হতেই দিব না।”
তার গলা ভেঙে আসে। মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল।
“আমাকে সংসার করার লোভ দেখিয়ে চলে যাচ্ছো শাহজাদী? তুমি যেও না। আমি মরে যাব। পাগল হয়ে যাব আমি। এই যে দেখো। দেখো না শাখা। আমার বুকের ভেতরটা কেমন করছে। তুমি যেও না শাখা। ইব্রাহিম! ইব্রাহিম দেখ না শাখা চোখ খুলছে না। ওকে চোখ খুলতে বল না ইব্রাহিম। আমি কিন্তু রেগে যাব এবার। ওকে বল আমার সাথে কথা বলতে।”
প্রাসাদের সবাই একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগেও এই মানুষটিকে তারা দেখেছে অস্ত্র হাতে প্রাসাদে ঢুকে হ’ত্যাযজ্ঞ চালাতে। কিছু সময়ের ব্যবধানে এই মানুষটিই শাখার পাশে বসে এমনভাবে কাঁদছে, যেন তার নিজের সমস্ত পৃথিবী ওই একজন মানুষের নিঃশ্বাসের সঙ্গে আটকে আছে।
সৈন্যদের চোখে সন্দেহ আরও গভীর হলো। কেউ কিছু বলল না। ফাইয়াজও কারও দিকে তাকাল না। তার চোখ শুধু শাখার দিকে। দূরের অন্ধকারে অশ্বারোহীরা ততক্ষণে অদৃশ্য হয়ে গেছে। ফাইয়াজ জানে, তারা কারা। কিন্তু সেই পরিচয় সে নিজের মধ্যেই আটকে রাখল। হিসেবটাও সময় মত সে নিজেই বুঝে নিবে।
প্রাসাদের অন্দরে অস্বস্তিকর নীরবতা। মশালের আলোয় শাখা অচেতন হয়ে পড়ে আছে। চিকিৎসক তার ক্ষত পরীক্ষা করে পাশে বসে আছে। আর তার কাছেই হাঁটু গেড়ে বসে ফাইয়াজ। ফাইয়াজের চোখে আতঙ্ক। সে বারবার শাখার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। যেন চোখের সামনে থাকা মানুষটিকে এক মুহূর্তের জন্যও হারিয়ে ফেলতে ভয় করছে। এই দৃশ্যটা দূর থেকে দেখছিল সুনেহেরা। তার বুকের ভেতরটা ভারি হয়ল উঠছে। চোখের সামনে ভাসছে চন্দ্রপ্রভার মুখ। অঙ্কুরের সাথে আজ ফাইয়াজের মুখটাও যেন বড্ড মিলছে। সে তো জানে শাখাকে।
ভালো করেই জানে, শাখা সহজে কাউকে নিজের জীবনে জায়গা দেয় না আর দিবেও না । কিন্তু একবার কাউকে বিশ্বাস করলে সেই মানুষটির জন্য নিজের সবকিছু পর্যন্ত ভুলে যেতে পারে।
আর ফাইয়াজের চোখে যে টান, সেটা সুনেহেরার চোখ এড়াল না। তার ভয়টা সেখানেই। শাখা যদি আবার এই মানুষের দিকে ফিরে যায়? যদি ফাইয়াজের ভালোবাসা, তার প্রতি শাখার পুরোনো টানকে আবার জাগিয়ে দেয়?
তাহলে শুধু শাখার জীবনই নয়, সাহাবাদের নিরাপত্তাও বিপন্ন হতে পারে। কারণ এই মানুষটি ডাকাতদলের সর্দার। এত বছর ধরে সাহাবাদ এর শান্তি নষ্ট করে ক্ষতি করে এসেছে। এ যেন অঙ্কুরেরই আরেক রুপ। আর আজ এই দল সাহাবাদের প্রাসাদ পর্যন্ত আক্রমণ করে বসেছে।
সুনেহেরা ধীরে ধীরে বাইজিদ শাহের দিকে তাকাল। কথা বলল না। শুধু চোখের ইশারায় শাখার দিকে তাকিয়ে তারপর ফাইয়াজের দিকে ইঙ্গিত করল। বাইজিদ তার ইশারা বুঝে গেলেন।
তিনি কয়েকজন সৈন্যকে চোখের ইশারা করলেন।
সৈন্যরা ফট করে ফাইয়াজকে ঘিরে এগিয়ে এলো। ফাইয়াজ তা টের পেল। সে উঠে দাঁড়াল।
একজন সৈন্য এগিয়ে এসে তাকে ধরতে চাইতেই ফাইয়াজ তার হাত সরিয়ে দিল। আরেকজন সামনে আসতেই সে এক পা পিছিয়ে গেল।
“আমাকে অস্ত্র তুলতে বাধ্য করবেন না।”
সৈন্যরা থামল না। ফাইয়াজ চারপাশে তাকাল।
তার দলের লোকেরাও অস্ত্র হাতে প্রস্তুত হয়ে উঠেছে। মুহূর্তের মধ্যে আবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল উঠোনে। বাইজিদ শাহ সামনে এগিয়ে এলেন।
“এক্ষুণি আত্মসমর্পণ করো ফাইয়াজ, তোমাকে বন্দি করা হবে। আমাদের মেয়ের কথা মত তোমাকে মাফ করে দিতাম কিন্তু তোমার দলের লোক আমাদের মেয়েকে হ’ত্যা চেষ্টা করেছে”
ফাইয়াজ তার দিকে তাকাল। কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু দৃঢ়।
“আমাকে আঘাত করতে বাধ্য করবেন না, জমিদার মশাই। আর ওই লোকটা বহিরাগত। বলতে পারেন তৃতীয় পক্ষ। আমার দলের সবাই শাখা সম্পর্কে অবগত”
কথাটা শুনে সৈন্যদের মধ্যে আবার ফিসফাস শুরু হলো। ফাইয়াজ এবার শাখার দিকে তাকাল।
“শাখার জ্ঞান ফিরলে আমি নিজে আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করব।”
বাইজিদ নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ফাইয়াজ আবার বলল,
“এখন আমাকে আটকাতে গেলে শুধু সংঘর্ষ হবে। আর এই অবস্থায় শাখার সামনে আর কোনো রক্তপাত আমি চাই না।”
কথাগুলো শুনে কয়েকজন সৈন্য একে অপরের দিকে তাকাল। সুনেহেরার মুখ আরও কঠিন হয়ে উঠল। সে এতক্ষণ নিজেকে সামলে রেখেছিল।
কিন্তু হঠাৎ তার বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়, ক্ষোভ আর হতাশা যেন একসঙ্গে বেরিয়ে এলো।
সে শাখার দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“কী করে পারলে, শাখা?”
সুনেহেরার চোখে পানি জমে উঠল।
“সাহাবাদের এত বিপদের মধ্যে… তুমি একজন ডাকাত সর্দারের সঙ্গে…”
তার গলা আটকে গেল। সে চোখ মুছে আবার বলল,
“তুমি জানতেই না সে কে? নাকি জেনেও তার পাশে দাঁড়িয়েছিলে?”
শাখা অচেতন। তার কোনো উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা নেই। সুনেহেরা যেন সেটাই সহ্য করতে পারল না।
“তুমি জানতে না, তোমার এই একটা সম্পর্ক সাহাবাদের জন্য কত বড় বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে! তোমাকে তো দেশদ্রোহী আখ্যা দিলেও কম হয়ে যাবে”
তার কণ্ঠ ক্রমেই ভারী হয়ে উঠল।
“যে মানুষ আজ সাহাবাদের প্রাসাদে হামলা করেছে, তার জন্য তুমি দাঁড়ালে! তার জন্য নিজের লোকদের বিরুদ্ধেও গেলে!”
কথা বলতে বলতে তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
“এটা কি ঘাতকতা নয়, শাখা?”
উঠোনের সবাই চুপ। সুনেহেরা দীর্ঘক্ষণ বিলাপ করতে লাগল। তার কণ্ঠে রাগের চেয়ে বেশি ছিল ভয়। একদিকে নিজেদের মেয়েকে হারানোর ভয়, অন্যদিকে সাহাবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্ক।
শেষ পর্যন্ত ফাইয়াজ মুখ খুলল
“এতে শাখার কোনো দোষ নেই।”
সুনেহেরা বিলাপ থামালো। ফাইয়াজ কিছুক্ষণ শাখার দিকে তাকিয়ে তারপর বলল,
“কারণ শাখা জানত না আমি কে। সে আমাকে ফারিস নামে চিনেছিল। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে। একজন মানুষ হিসেবে বিশ্বাস করেছিল। আমার আসল পরিচয়, আমার দলের পরিচয় কিছুই সে জানত না।”
অশ্রুসিক্ত চোখের দৃষ্টি নামিয়ে বলল।
“তাই আজকের জন্য তাকে ঘাতক বলবেন না।”
একটু থেমে ফাইয়াজ বলল,
“দোষ যদি কারও থাকে… সেটা আমার।”
কথাটা শেষ করে সে আর কিছু বলল না। অচেতন শাখার দিকে তাকিয়ে রইল। সুনেহেরাও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাইজিদ শাহের চোখে অন্য এক চিন্তার ছায়া। কারণ ফাইয়াজের কথাগুলো সত্য হোক বা না হোক, একটা বিষয় এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। শাখা আর ফাইয়াজের সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্কে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে সাহাবাদের নিরাপত্তা, রাজপরিবারের বিশ্বাস এবং তৃতীয় পক্ষের শত্রু। এদের আসল উদ্দেশ্য এখনও পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি।
কক্ষের ভেতর নিস্তব্ধতা। মাঝে মাঝে প্রদীপের শিখা কেঁপে উঠছে, আর বাইরে রাতের বাতাস জানালার পর্দা সামান্য দুলিয়ে দিচ্ছে।
শয্যার ওপর অচেতন হয়ে পড়ে আছে শাখা।
তার পাশে চিকিৎসক বসে ক্ষতটি বেধে দিল। কয়েকজন দাসী প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব এগিয়ে দিচ্ছে। কারও মুখে কোনো কথা নেই।
ফাইয়াজ কিছুদূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে শাখার দিকে।
তার মনে পড়ে গেল সেই দিনটির কথা। যেদিন সে প্রথম সাহাবাদের নগরে শাখার মুখোমুখি হয়েছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল অন্য। আক্রমণ করে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে দিল শাখা। নগরের পথ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময়ই অন্ধকার পথে হঠাৎ একজন নারীর সঙ্গে তার সংঘর্ষ হয়েছিল। চোখে ছিল এমন এক তেজ, যা ফাইয়াজ আজও ভুলতে পারেনি। সেদিন সে জানত না কে এই নারী। আজ বুঝতে পারল তার মানে সেই শাহজাদীই তার প্রিয়তমা শাখা। সেই দৃষ্টি, সেই চোখ, সেই দৃঢ়তা আজও তার চোখের সামনে ভাসছে।
ফাইয়াজ শাখার দিকে তাকাল। তার বুকটা ভারী হয়ে আসছক। যে নারীকে প্রথম দেখেছিল শত্রুপক্ষের একজন অচেনা মানুষ হিসেবে, তাকেই যে কখন নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ করে ফেলেছে, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
কক্ষের দরজা ঠেলে চিকিৎসক বের হলো।
দাসীরাও একে একে বাইরে বেরিয়ে যেতে লাগল।
ফাইয়াজ দ্রুত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে তার হাত ধরে ফেলল।
“এখন কেমন আছে?”
চিকিৎসক শান্ত স্বরে বললেন,
“আশঙ্কামুক্ত। আঘাত গুরুতর নয়। তবে এখনও জ্ঞান ফেরেনি।”
ফাইয়াজ চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মনে হলো বুকের ওপর রাখা বিশাল কোনো ভার সামান্য সরে গেল। তখনই কক্ষের বাইরে সৈন্যদের পদশব্দ শোনা গেল।
বাইজিদ শাহের নির্দেশে সৈন্যরা এগিয়ে এলো। হাতকড়া পড়ানো হলো তাদের। ফাইয়াজ কোনো প্রতিবাদ করল না। তার দলের কয়েকজন একে অপরের দিকে তাকাল। তারা ভেবেছিল সর্দার হয়তো আবার লড়াই করবে।
কিন্তু ফাইয়াজ শুধু শাখার দিকে তাকিয়ে ছলছল চোখে তাকিয়ে রইল। বাইজিদের সৈন্যরা এগিয়ে এসে তারও হাত বাঁধার প্রস্তুতি নিল। ফাইয়াজ এবারও বাধা দিল না। তার চোখে কোনো পরাজয়ের ছাপ নেই। সে জানে, এখন যদি এই প্রাসাদ থেকে তাকে বের করে দেওয়া হয়, তাহলে শাখাকে আর কখনো দেখার সুযোগ হয়তো পাবে না। আর শাখার জ্ঞান ফেরার আগ পর্যন্ত সে কোথাও যেতে চায় না। যদি বন্দিত্বই তাকে এই কক্ষের কাছাকাছি থাকার সুযোগ দেয়, তাহলে সেই বন্দিত্ব মেনে নিতেও তার আপত্তি নেই।
ফাইয়াজ চোখ ভরে শাখাকে দেখে নিল। অতঃপর চোখ নামিয়ে নিল। তারপর সৈন্যদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই।
আজ তার কাছে মুক্তির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে শাখার জ্ঞান ফেরার অপেক্ষা। হাতকড়ার দিকে তাকিয়ে ফিচেল হেসে বলল
“শাহজাদীর চোখ তো আমাকে কবেই বন্দি করেছে। তার কাছে এই লোহার শিকল কিচ্ছু না।”
******
আমিরাবাদের রাজপ্রাসাদে গিয়ে থামলো বেশ কয়েকটি ঘোড়া। গভীর রাত পেরিয়ে তখন আলো ফুটনে। প্রাসাদের দীর্ঘ করিডোরগুলো নিস্তব্ধ। প্রহরীদের পায়ের শব্দ ছাড়া কোথাও কোনো শব্দ নেই। সম্রাট হারুন ওয়াসেম নিজের কক্ষে বসে ছিলেন। সামনে খোলা কিছু নথি, পাশে জ্বলছিল কয়েকটি প্রদীপ। দরজার বাইরে তীব্র পদশব্দ শোনা গেল। হারুন ওয়াসেমের ঠোটে হাসি ফুটে। এলো বুঝি সুসংবাদ। প্রহরী দরজা খুলতেই একজন সৈনিক প্রায় ছুটে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
তার পোশাক ধুলোয় মলিন। মুখে ক্লান্তি, চোখে আতঙ্ক। সে নত হয়ে দাঁড়াল।
“সম্রাট…”
হারুন ওয়াসেম চোখ তুলে তাকালেন।
“বল।”
সৈনিকটি কয়েক মুহূর্ত দ্রুতগতিতে আলা নিঃশ্বাস সামলে নিল।
“সাহাবাদে পাঠানো অভিযান… ব্যর্থ হয়েছে।”
কক্ষের বাতাস যেন এক মুহূর্তে থেমে গেল। হারুন ধপ করে উঠে দাঁড়ালেন।
“কী বললে?”
সৈনিক মাথা নিচু করল।
“ফাইয়াজের পুরো দল এখন সাহাবাদের কারাগারে বন্দি।”
হারুনের মুখ কঠিন হয়ে গেল। পরের মুহূর্তেই তার হাতের পাশের একটি পাত্র মেঝেতে ছুড়ে পড়ল। ঝনঝন শব্দে কক্ষ কেঁপে উঠল।
“অসম্ভব!”
তিনি টেবিলের ওপর থাকা কয়েকটি নথি একে একে ছুড়ে ফেললেন।
“ওর এত বড় একটা দল! বছরের পর বছর ধরে পাহাড়, জঙ্গল আর সীমান্তে অভিযান চালিয়েছে তারা। এত অভিজ্ঞ লোক!”
কণ্ঠ ক্রমেই উঁচু হয়ে উঠল।
“তার সঙ্গে আমি আমার সৈন্য পাঠালাম। সংখ্যায় কম ছিল না তারা। অস্ত্র ছিল। পরিকল্পনা ছিল। তাহলে সাহাবাদের কাছে গিয়ে সবাই বন্দি হলো কীভাবে?”
সৈনিকটি চুপ করে রইল। হারুন তার দিকে এগিয়ে এলেন।
“বল! কী হয়েছিল?”
সৈনিক ঢোক গিলল।
“সম্রাট… প্রথমে সব পরিকল্পনামতোই চলছিল। ফাইয়াজের লোকেরা প্রাসাদের ভেতরে ঢুকেছিল।”
হারুন স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন।
“তারপর?”
“প্রাসাদের ভেতরে লড়াই শুরু হয়। ফাইয়াজের লোকেরা প্রহরীদের পরাস্ত করছিল। কিন্তু…”
সে থেমে গেল। হারুনের চোখ সরু হয়ে এল।
“কিন্তু কী?”
“শাহজাদী শাখা সামনে চলে আসেন।”
হারুনের মুখে সামান্য পরিবর্তন দেখা গেল।
“শাখা?”
সৈনিক মাথা নেড়ে বলল,
“জি।”
সে ধীরে ধীরে পুরো ঘটনাটি বলতে শুরু করল।
শাখা কীভাবে অস্ত্র হাতে সামনে এসেছিলেন। কীভাবে ফাইয়াজের সঙ্গে তার মুখোমুখি দেখা হয়ে যায়। কীভাবে ফাইয়াজ তাকে দেখে থেমে যায়। এরপর শাখা আহত হওয়া, ফাইয়াজের অস্থির হয়ে ছুটে যাওয়া সবকিছু। হারুন নিঃশব্দে শুনতে লাগলেন। সৈনিক বলল,
“ঘটনা ব্যতিক্রম বুঝে আমরা পালিয়ে এসেছি। তবে আসার সময় তীর ছুড়েছিলো অধিনদয়। লেগেছে শাহজাদী শাখার। সে আহত হওয়ার পর ফাইয়াজ নিজেই বলেছে, শাহজাদীর জ্ঞান ফিরলে সে আত্মসমর্পণ করবে।”
হারুনের চোখে এবার অন্যরকম দৃষ্টি ফুটে উঠল।
“সে নিজে বন্দি হয়েছে?”
“জি, সম্রাট।”
হারুন ঘুরে দাঁড়ালেন। মেঝেতে পড়ে থাকা কাগজগুলোর দিকে তাকালেন। বিষয়টা মাথার মধ্যে গুছিয়ে নিচ্ছেন। বুঝতে পারছেন ফাইয়াজের পরাজয়ের পেছনে শুধু সাহাবাদের প্রতিরোধ নয়, ছিল একজন নারী।
আর সেই নারীকে ঘিরে ফাইয়াজের দুর্বলতা এতটাই গভীর যে সে নিজের স্বাধীনতা পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছে।
হারুন ধীরে বললেন,
“শাখা…! তা বলি বাইজিদ শাহ্ কি মহলের মেয়েদের লেলিয়ে দিয়ে ব্যাবসা জুড়েছে। সব রাজ্যে মেয়েদের লেলিয়ে দিচ্ছে। ডাকাত সর্দার কে ওবদি ছাড়ছে না? আমার পুত্র ওই মহলের মেয়েতে ফেসেছে। আবার ফাইয়াজ ও?”
তারপর সৈনিকটির দিকে তাকালেন।
“তা সে মহা মানবী এখন কোথায়?”
“সাহাবাদেই, সম্রাট। চিকিৎসাধীন।”
হারুন আর কিছু বললেন না। তার একটা পরিকল্পনা না হয় ব্যার্থ হয়েছে। কিন্তু তিনি এমন একটি দুর্বলতার সন্ধান পেয়ে গেলেন। এবার এটাকেই ব্যাবহার করতে হবে ফাইয়াজ কে আঙুলের ইশারায় নাচাতে।