ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

44

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

সাহাবাদ মহল যেন আর মহল রইল না। চারদিক থেকে ভেসে আসছে চিৎকার।

“ডাকাত! ডাকাত!”

কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ফাইয়াজ তার দলবল নিয়ে সাহাবাদ মহলের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। প্রাসাদের এক প্রান্তে লুটপাট শুরু হয়েছে। সিন্দুক ভাঙার শব্দ, ধাতব পাত্র মেঝেতে পড়ে পড়ে বজ্রধ্বনি তুলছে, দৌড়ঝাঁপ আর আতঙ্কে মানুষের চিৎকার মিলিয়ে মহল গমগম করছে। মশালের আলোয় করিডোরগুলো অন্ধকার দেখাচ্ছিল।

এই সরু বারান্দায় অসংখ্য লোকজন চলাফেরা করত, সেখানে ছড়িয়ে পড়ল ভাঙা আসবাব পত্র। আতঙ্কিত মানুষের ছুটোছুটি তে সবাই তাল হারিয়েছে।

প্রহরীরা একে একে প্রতিরোধ গড়ে তুলল। তারা নিজেদের পুরোটা দিয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে এই ডাকাতদল প্রতিহত করার। কিন্তু ডাকাতদের সংখ্যা বেশি ছিল। আর ভাগ্য সাহাবাদ এর পক্ষে ছিল না। আজই বিরাট একটা সৈন্য দল আমিরাবাদ সম্রাটের নির্দেশে পাশের দেশে পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন পণ্য দিয়ে। এমন সৈন্য সংকটাপন্ন অবস্থায় মহলে ডাকাত পড়ল।

সংঘর্ষে কয়েকজন প্রহরী মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

বহু সৈন্য গুরুতর আহত হয়ে অস্ত্র ছেড়ে দিল। প্রাসাদের ভেতর মৃত্যুর ভয় ছড়িয়ে পড়ল।

“ডাকাত! ডাকাত!”

শব্দটা দেয়াল থেকে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছিল। মনে হচ্ছিল, পুরো মহল যেন কোনো মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। ফাইয়াজ সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। তার মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। চোখ দুটো কঠিন। হাতে তলোয়ার। পেছনে তার দলের লোকেরা সিন্দুক, অলংকার আর মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে ছুটছিল। একজন ডাকাত চিৎকার করে বলল,

“সর্দার! দক্ষিণ দিকের কক্ষগুলো খালি করে ফেলেছি!”

ফাইয়াজ মাথা নাড়ল।

“আরও ভেতরে যাও। কেউ যেন আমাদের পথ আটকাতে না পারে।”

“প্রহরীরা জড়ো হচ্ছে!”

“সবকটাকে শেষ করে দাও। সব ধন-রত্ন তুলে নিয়ে শাহ্ পরিবার এর প্রত্যেককে হ'ত্যা করবে।”

***

মহলের অন্তঃপুরের পাশের কক্ষে তখন শাখা শয়ন কৃত ছিল। মহলের এমন করুণ অবস্থায় তার ঘুম ভাঙল হচকচিয়ে। বাইরে একের পর এক চিৎকার শুনে সে আর অপেক্ষা করতে পারল না।

একজন দাসী ছুটে গেল শাখার কক্ষে। আতঙ্কিত গলায় বলল,

“শাহজাদী, বাইরে যাবেন না। ডাকাতরা মহলের ভেতরে ঢুকে গেছে।”

শাখা তলোয়ারের মুঠি শক্ত করল।

“আমি ভেতরে লুকিয়ে থাকব, আর তারা আমাদের প্রহরীদের হত্যা করবে আর মহল লুটপাট করবে?”

“কিন্তু…..”

“দরজা খোলো।”

শাখার অগ্নিচক্ষু দেখে দাসী ভয়ে দরজা খুলে দিল। শাখা বেরিয়ে আসতেই দুজন ডাকাত তার দিকে ছুটে এল। শাখা তলোয়ার বের করল।

প্রথম ডাকাতের আঘাত সে ঢাল দিয়ে ঠেকিয়ে দিল। তারপর দ্রুত পাশ কাটিয়ে তার অস্ত্রটি সরিয়ে দিল। লোকটি ভারসাম্য হারিয়ে পেছনে পড়ে গেল। অপরজন তলোয়ার চালাতেই শাখা নিচু হয়ে আঘাত এড়িয়ে গেল। তারপরে তলোয়ারের বাঁট দিয়ে লোকটির হাতে আঘাত করল। অস্ত্রটি মাটিতে পড়ে গেল। শাখা গর্জে উঠল,

“সাহাবাদ মহলে ঢুকে লুটপাট করার সাহস কোথা থেকে পেয়েছিস জানো’য়ারের দল? আজ একটাকেও জ্যান্ত ফিরতে দেব না”

ডাকাতটি পিছু হটতে হটতে বলল,

“হা রে রে রে রে রে”

আরও কয়েকজন ছুটে এল। শাখা একের পর এক আক্রমণ ঠেকাতে লাগল। তার তলোয়ারের ঝলক মশালের আলোয় ছুটে যাচ্ছিল। কয়েকজন ডাকাতকে সে পরাস্ত করে মাটিতে ফেলে দিল। কেউ পালিয়ে গেল, কেউ অস্ত্র ছেড়ে দুহাত তুলে দাঁড়াল। তার চোখে তখন আগুন।

“আর কেউ এগিয়ে আসবে? আয় তোরা কতজন আছিস”

কেউ উত্তর দিল না। দূর থেকে ফাইয়াজের দলের একজন চিৎকার করল,

“সর্দার! ওইদিকে একজন যোদ্ধা আমাদের লোকদের পরাজিত করছে!”

ফাইয়াজ ঘুরে তাকাল। কিন্তু সে তখন আরেকজন প্রহরীর সঙ্গে তলোয়ার যুদ্ধে ব্যস্ত ছিল। প্রহরীটি বয়সে বড়, অভিজ্ঞ যোদ্ধা। তার আঘাতগুলো দ্রুত আর ভারী। ফাইয়াজ একের পর এক আঘাত ঠেকাচ্ছিল, কিন্তু প্রহরী তাকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছিল। ঠিক তখনই শাখা আরও কয়েক পা এগিয়ে এল। তার সামনে ছিল ফাইয়াজের পিঠ। মাথা কালো কাপড়ে ঢাকা বলে সে পিছন থেকে ফাইয়াজকে চিনতে পারেনি। শাখা তলোয়ার তুলল। ভাবল, এই লোকটিই নিশ্চয় ডাকাতদের সর্দার। আর সর্দারকে পরাজিত করতে পারলে বাকিরা হয়তো পিছু হটবে। কিন্তু একজন ডাকাত শাখাকে দেখে ফেলল। সে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল,

“সর্দার! পেছনে শাহজাদী!”

ফাইয়াজের তলোয়ার তখনও প্রহরীর সঙ্গে লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল। চিৎকার শুনে সে আচমকা পিছনে ঘুরল। হাতে তলোয়ার, পরনে বীরের পোশাক। চোখে যুদ্ধের আগুন। তার সামনে দাঁড়িয়ে শাখা।

ফাইয়াজের হাত স্থির হয়ে গেল। দাঁড়িয়ে থাকা নারীটি কোনো সাধারণ যোদ্ধা নয়। সে শাখা। তার শাখা। তার প্রেমিকা। কলঙ্কিত জীবনের একমাত্র ভালোলাগা। তার প্রেয়সী।

তার পাষন্ড সত্ত্বাও যার জন্য কেঁদেছে। যে তাকে বিশ্বাস করেছে। যে তাকে কখনো ডাকাত, হত্যাকারী কিংবা অপরাধী হিসেবে কল্পনাও করতে পারে না। সেই মেয়েটিই তার সামনে বিরোধী পক্ষের হয়ে তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আর ফাইয়াজ? সে দাঁড়িয়ে আছে ডাকাতদের সর্দার হয়ে। শাখার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। সে শুধু মুখের কাপড়ের ফাঁক দিয়ে চোখ দুটো দেখল। সেই চোখের পরিচিতি তাকে আঘাত করল। এক পা পেছনে সরে গেল।

“আপনি…?”

ফাইয়াজের ঠোঁট নড়ল। কোনো শব্দ বের হলো না। শাখা তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে অবিশ্বাস।

“আপনি ফারিস নন?”

ফাইয়াজের হাতে ধরা তলোয়ার কেঁপে উঠল। শাখার গলা ভেঙে গেল।

“আপনি… আপনি, ডাকাত? আপনিই ডাকাত সর্দার ফাইয়াজ?”

চারপাশে তখনও সংঘর্ষ চলছিল। চারিপাশে অস্ত্রের শব্দ, প্রহরীদের চিৎকার। কিন্তু তাদের দুজনের কাছে যেন পৃথিবীর আর কোনো শব্দ পৌঁছাচ্ছিল না। ফাইয়াজ ধীরে ধীরে মুখের কালো কাপড় সরিয়ে ফেলল। তার পরিচিত মুখ মশালের আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠল। শাখার চোখ ছলছল করে উঠল।

“না…”

সে মাথা নাড়তে লাগল।

“না, এটা হতে পারে না।”

ফাইয়াজ এক পা এগিয়ে এল।

“শাখা…”

শাখা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“আপনি ডাকাত?”

ফাইয়াজের মুখে কোনো উত্তর নেই।

“আপনি আমাদের মহলে লুটপাট করতে এসেছেন?”

তার চোখ ধীরে ধীরে চারপাশে ঘুরল। ভাঙা সিন্দুক। ছড়িয়ে থাকা অলংকার। মাটিতে পড়ে থাকা প্রহরীদের অস্ত্র। রক্তা’ক্ত নিথর হয়ে থাকা কয়েকজন প্রহরী।

শাখার বুক কেঁপে উঠল।

“আপনার লোকেরা… আমাদের প্রহরীদের হত্যা করেছে? আপনি এভাবে নিরপরাধীদের প্রাণ নেন”

ফাইয়াজ চোখ নামিয়ে ফেলল। শাখার ঠোঁট কাঁপছিল।

“আপনি আমাকে এতদিন মিথ্যা বলেছেন?”

“শাখা, আমার কথা শোনো।”

“আপনি কে?”

ফাইয়াজ উত্তর দিতে চাইল।

“আমি…”

তার কণ্ঠ আটকে গেল। শাখা তলোয়ার নামিয়ে ফেলল। তার হাত কাঁপছিল।

“আপনি আমাকে….আপনি বলেছিলেন, আপনি শুধু একজন সাধারণ বণিক। আমি একজন শাহজাদী হয়েও একজন বণিক কে ভালোবেসেছি। তার প্রতিদান আপনি এভাবে দিলেন? আপনি বোধহয় প্রতিশোধ নিতে আমার সাথে ভালোবাসার নাটক করেছিলেন তাই না?”

ফাইয়াজ চোখ তুলে তাকাল। তার পৃথিবী ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে

“নাহহহ, না শাখা না, আমি তোমাকে ব্যবহার করতে চাইনি।”

শাখা কাঁদতে কাঁদতে এক পা পিছিয়ে গেল।

“তাহলে এসব করেছেন।”

ফাইয়াজ তার দিকে এগিয়ে আসতে চাইল।

“শাখা, আমি সব ব্যাখ্যা করব তোমাকে। আমি, আমি জানতাম ন…..”

“চুপ করুন। বেইমান কাপুরুষ। আমি আপনার মত কাপুরুষকে ভালোবেসেছি?”

তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।

“আপনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন ডাকাত হয়ে। আপনার লোকেরা আমার মহলে ঢুকে লুটপাট করছে। আপনি আমার পরিবারের প্রহরীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছেন। আর আমি…”

সে বাকিটা বলতে পারল না। ফাইয়াজের হাত থেকে তলোয়ার মাটিতে পড়ে গেল। ধাতব শব্দে শাখা কেঁপে উঠল। ফাইয়াজ ফাঁকা হাতে তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি তোমাকে আঘাত করতে পারি?”

শাখা চোখ মুছে বলল

“বেড়িয়ে যান, প্রাণ ভিক্ষা দিলাম যান। ভুল করে হলেও ভালো তো বেসেছিলাম। সেই খাতিরেই প্রাণ ভিক্ষা দিলাম”

ফাইয়াজ কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই তার পেছন থেকে এক ডাকাত চিৎকার করে উঠল,

“সর্দার! সাবধান!”

কিন্তু সতর্ক করার আগেই অন্ধকারের ভেতর থেকে একজন প্রহরী এগিয়ে এসে ফাইয়াজের মাথার পেছনে ভারী অস্ত্রের আঘাত করল। ফাইয়াজের শরীর দুলে উঠল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য শাখার মুখ ভেসে উঠল। কিছু বলতে চাইল।

“শা…”

শব্দটি শেষ হওয়ার আগেই তার শরীর মাটিতে পড়ে গেল। শাখা চিৎকার করে উঠল,

“ফাইয়াজ!”

সে তলোয়ার ফেলে তার দিকে ছুটে গেল। চারপাশের ডাকাত আর প্রহরীরা থমকে দাঁড়াল।

মহলের ভেতর পুরোদস্তুর নীরবতা নেমে এল। শাখা ফাইয়াজের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তার মুখ নিজের দিকে তুলল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছিল।

“চোখ খুলুন… ফাইয়াজ, চোখ খুলুন!”

কিন্তু ফাইয়াজ কোনো উত্তর দিল না। শাখা কাঁপা হাতে তার কপালের কাছে হাত রাখল।

তারপর চারদিকে তাকিয়ে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল।

“আপনি কেন আমার সাথে প্রতারণা করলেন? ও ফাউয়াজ উঠুন না। আমি ছোট থেকে বাবা মা কাওকে পাইনি। আমি নিজের বলতে এই মহল টাকেই পেয়েছি। পরিণত বয়সে এসে যেই আপনাকে পেলাম, সেই আপনি কেন এই মহলের বিপক্ষে? কেন আপনি আমায় মিথ্যা আশ্বাস দিলেন?”

ফাইয়াজ মাটিতে পড়ে যেতেই চারদিক থেকে প্রহরীরা এগিয়ে এল। কারও হাতে তলোয়ার, কারও হাতে বর্শা। এতক্ষণ ডাকাতদের সর্দার হিসেবে ঘিরে ধরতে চাইছিল তারা, তাকে এখন মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। প্রহরী অস্ত্র তুলে ফাইয়াজের দিকে এগিয়ে গেল।

“এখনই শেষ করে দাও ওকে!”

শাখা সঙ্গে সঙ্গে ফাইয়াজের মাথা নিজের কোলে থেকেই জাপটে ধরল।

“নাহহহ, না কেউ তাকে আঘাত করবেন না। সরে যাও। সরে যাও সব”

প্রহরী থেমে গেল। চারপাশের সবাই শাখার দিকে তাকিয়ে আঋে। সন্দেহপ্রবণ চোখগুলো একসঙ্গে তার ওপর এসে পড়ল। একে অপরের সাথে ফিসফিস করে বলল,

“শাহজাদী ওকে চেনেন?”

আরেকজন বলল,

“এতক্ষণ তো ওর সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন। এখন আবার বাঁচাচ্ছেন কেন?”

শাখা কোনো উত্তর দিল না। সে নিচু হয়ে ফাইয়াজের মুখের দিকে তাকাল। কালো কাপড়টি এক পাশে পড়ে আছে। পরিচিত মুখটি নিস্তব্ধ। চোখ বন্ধ। কপালের পাশে আঘাতের দাগ, শ্বাস ধীর হলেও চলছে। শাখার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। উঠে দাঁড়াল বসা থেকে। র’ক্তচক্ষু জোড়া বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল, কণ্ঠে কাঁপন

“আমি বলেছি, কেউ তাকে আঘাত করবেন না।”

প্রহরীরা একে অন্যের দিকে তাকাল। বাইজিদ শাহের কয়েকজন বিশ্বস্ত সৈন্য সামনে এগিয়ে এল। তাদের চোখেও প্রশ্ন। শাখা বুঝতে পারছিল, সবাই তাকে সন্দেহ করছে। কেউ ভাবছে, সে হয়তো এই ডাকাতের সঙ্গে যুক্ত। কেউ হয়তো ভাবছে, রাজকুমারী নিজের অজান্তেই শত্রুর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছেন। কিন্তু শাখার কাছে এই মুহূর্তে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেি।

ফাইয়াজ আহত অবস্থায় পড়ে আছে। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো তাকে আরেকবার আঘাত করতে চাইছে। শাখা ফাইয়াজের পাশে বসে তার মাথার নিচে নিজের ওড়নার ভাঁজ করে দিল।

একজন সৈন্য দ্বিধায় পড়ে বলল,

“রাজকুমারী, সে ডাকাতদের সর্দার। মহলের প্রহরীরা তার হাতে….”

“আমি জানি সে কে।”

শাখার কণ্ঠ আরও কঠিন হলো।

“তবু চিকিৎসককে ডাকুন।”

তার আদেশ অমান্য করার সাহস কারও হলো না।

একজন সৈন্য দ্রুত ভেতরের দিকে ছুটে গেল। শাখা আবার ফাইয়াজের দিকে তাকাল। তার চোখে এবার আর রাগ নেই। গভীর অপমান, বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা আর অপ্রিয় ভালোবাসা, যাকে সে আর স্বীকার করতে চায় না। ফাইয়াজ ধীরে ধীরে চোখ খুলল। দৃষ্টি অস্পষ্ট। কিছুক্ষণ সে বুঝতে পারল না কোথায় আছে। তারপর শাখার মুখ দেখতে পেল। তার ঠোঁট নড়ল।

“শাখা…”

শাখা মুখ ফিরিয়ে নিল। ফাইয়াজ দুর্বল হাতে উঠতে চাইল। পারল না।

“আমার কথা… শোনো…”

চারপাশের মানুষগুলো নীরবে তাকিয়ে আছে। ডাকাত দলের সব সদস্য অস্ত্র নামিয়েছে। খবর আলে গেছে অন্দরের সুরক্ষিত কক্ষে যেখানে জমিদার পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। বেড়িয়ে এসেছে জমিদার বাইজিদ শাহ্ সাথে তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা নূর এবং ভগ্নি সুনেহেরা জাহ্নবী। সকলের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি শাখার দিকে। মহলে আক্রমণ করা ডাকাত কে হ’ত্যা বা বন্দি না করে শাখা তাকে বাঁচিয়েছে তা মানতে নারাজ প্রত্যেকে। বাহিরে এসে সম্পূর্ণ ঘটনা শুনে তো তাদের চোখ কপালে। বিগত দশ বছর ধরে পুরো অঞ্চলের মানুষদের নানা ভাবে অত্যাচার লুটপাট আর অপহরণ করে আসা ডাকাত দলের সর্দার ফাইয়াজ আবরার এর সাথে শাখা প্রেম করেছে?

বাইজিদ গর্জে উঠলো

“হ’ত্যা করো ওই অমানুষকে। এতকাল আমার প্রজাদের নিপীড়িত করে আসা ডাকাত কে এই মহলেই শেষ করে দাও”

হাত বাড়াতেই একজন সেনা তলোয়ার তুলে দিলো বাইজিদ এর হাতে। বাইজিদ তলোয়ার নিয়ে ক্ষেপে গেল ফাইয়াজ এর দিকে। ডাকাত সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও ফাইয়াজ ভাবলেশহীন। প্রতিরোধ করল না। আঘাত কাছাকাছি আসতেই শাখা দু হাত মেলে দাঁড়িয়ে পড়ল ফাইয়াজ এর সামনে। ফাইয়াজ ছলছলে চোখে তাকিয়ে আছে শাখার দিকে। চোখ জোড়া জ্বলছে বড়। বাইজিদ গর্জে উঠল শাখার ওপর

“সামনে থেকে সরে যাও শাখা। দেশদ্রোহীতা করো না”

“না মামা। দয়া করো। মেরো মা ওকে। ও…ও আর কক্ষনো এই মহলে তো দূর এই রাজ্যের আশে-পাশেও আসবে না। এই আমি, আমি। আমি কথা দিচ্ছি তোমাকে। প্রাণ ভিক্ষা চাইছি আমি ওর হয়ে। মামা পায়ে পড়ি তোমার।”

শাখা কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ল বাইজিদের পায়ে। ফাইয়াজ পাথর হয়ে গেছে। নড়ার শক্তিটুকুও নেই যেন। ইচ্ছে করছে শাখাকে টেনে তুলে বুকে জাপ্টে ধরতে। কিন্তু নড়ছে না হাত-পা। বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এলো সুনেহেরা। শাখার হাত ধরে টেনে তুলল

“ওঠ ওঠ বলছি”

শাখা হাউমাউ করে কেঁদে জড়িয়ে ধরল সুনেহেরার পা

“ও মনি মা ছেড়ে দিতে বলো না ওকে। দেখো, দেখো ও চাইলে কিন্তু সব্বাইকে মেরে দিয়ে বেড়িয়ে যেতে পারত। ও আমার জন্য মারেনি মনি মা। ওকে যেতে দাও না মা। আমি প্রাণ ভিক্ষা চাইছি ওর হয়ে”

সুনেহেরা শাখা কে ধাক্কা মেরে সরিয়ে কষে এক চড় বসিয়ে দিল শাখার গালে

“শেষমেশ ডাকাত সর্দারের সাথে প্রেম করেছিস? মায়ের মত বিশ্বাস ঘাতকতা করবি? আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল রক্ত কার। যে নারী নিজের স্বামীর সাথে বেঈমানী করেছে স্বামীকে খুন করেছে। যাদের কাছে আশ্রয় পেয়েছিল তাদের পিঠেই ছুড়ি মেরেছে। তার কণ্যার থেকে আর কি আশা করা যায়?”

শাখা চোখ মুছল। শক্ত গলায় বলল

“এই শরীরে নেওয়াজে আবিদের রক্ত বইছে মনি মা। ঘাতকতা এই রক্তে নেই।”

ফাইয়াজের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনাকে বাঁচিয়ে প্রেমিকার ধর্ম পালন করলাম। প্রেমের যন্ত্রণা বড় খারাপ জিনিস বুঝলেন? ওহ আপনি কি করে বুঝবেন? আপনি তো আর প্রেমে পরেন নি। আপনি ডাকাত। আপনি মানুষকে লুট করেন। লুট করাই আপনার স্বভাব।।জানমাল হোক কিংবা দিল। একটা বারও ভাবলেন না আমার অনুভূতি নিয়ে খেলতে”

চোখ মুছে ফের বলল

“তবুও আপনাকে মরতে দিতে পারলাম না।”

ফাইয়াজের চোখে যন্ত্রণা ফুটে উঠল।

“শাখা…”

“কিন্তু এর পর থেকে আর নয়।”

শাখা এক পা পেছনে সরে গেল।

“আপনি আর কোনোদিন আমার সামনে আসবেন না।”

ফাইয়াজ চোখ বন্ধ করে ফেলল। শাখা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, এই কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে সে নিজের বুকের ভেতর থেকে কিছু ছিঁড়ে ফেলে দিল। তবু সে মুখ ফিরিয়ে নিল।

“ওকে চিকিৎসা দিন যদি ও নেয়। তারপর বের করে দিন মহল থেকে। কিন্তু আমার সামনে আর আনবেন না।”

প্রহরীরা এগিয়ে এসে ফাইয়াজকে তুলে ধরল।

ফাইয়াজ দুর্বলভাবে শাখার দিকে তাকিয়ে রইল।

সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শাখা আর ফিরে তাকাল না। তার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছিল।

কিন্তু সে হাঁটতে লাগল মূর্তির ন্যায় অনুভূতিহীন হয়ে। আচমকা কোথ থেকে এক তীর উড়ে এসে বিধলো শাখার কাঁধ বরাবর। চিৎকার দিয়ে উঠলো ফাইয়াজ

“শাখা…….”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 44 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন