শব্দ পেয়ে আয়েশা বেগমের কক্ষে ছুটে গেল কয়েকজন দাসীরা। পরমুহূর্তেই দাসীরাও চেঁচিয়ে ওঠে। কক্ষ থেকে ভেসে আসে তাদের কথোপকথন
“যুবরানী ছাড়ুন, ইয়া আল্লাহ! কি করছেন ছাড়ুন। মরে যাবে তো”
মেহরাব, জান্নাত, ইয়ামিন সকলে অবাক এহেন কান্ডে। ছুটে গেল তারাও। সকলের চক্ষু চড়কগাছ। সাহারা আয়েশা বেগমের গলা চেপে ধরেছে। কয়েকজন দাসীরা মিলেও তাকে থামাতে পারছে না। টেনে হিঁচড়েও ছাড়াতে পারছে আয়েশাকে সাহারার হাত থেকে। মেহরাবের মাথা গরম হয়ে গেল ভীষণ। ধমক দিয়ে উঠল
“কি অসভ্যতা হচ্ছে সারা? তোমার সাহস হয় কি করে আমার মায়ের গায়ে হাত তোলার? ছাড়ো বলছি”
সাহারা ছাড়ে না। আয়েশা বেগমের চোখ উল্টে আসে গলার তীব্র চাপে। মেহরাবের ধমকে সকলে হচকচিয়ে উঠলেও সাহারা নিজের রাগ আর জিদ থেকে অনড়। জান্নাতও ছাড়ানোর চেষ্টা করছে
“সারা ছাড় ওনাকে। কী করছিস? পাগল হলি নাকি?”
মেহরাবের ধৈর্য আর বাঁধ মানলো না। সাহারার বাহু ধরে এক টানে সরিয়ে এনে ছুঁড়ে মারল দেওয়ালের সাথে। আয়েশা বেগমকে বুকে জড়িয়ে নিল দ্রুত
“আম্মা! আম্মা তুমি ঠিক আছো?”
আয়েশা বেগম ছেলেকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না
“এই ডাইনিটাই সবাইকে মেরেছে বাবা। ও আমাকেও মেরে ফেলতে চাচ্ছিলো। তুই এই ডাইনিটাকে এক্ষুনি মহল ছাড়া কর বাপ”
মেহরাব রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাল সাহারার দিকে। জান্নাত কোনো রকমে সাহারাকে আটকে রেখেছে। যেন ছাড়া পেলেই আগুনে ভস্ম করে দিবে সবাইকে। মেহরাব সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করছে এমন সময় ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
“সারা এক্ষুনি আম্মার কাছে ক্ষমা চাও। চাওওওও। জলদি ক্ষমা চাও আম্মার কাছে”
সাহারার ক্রোধের আগুনে যেন ঘি এর ছিটা দিল এ কথা। আরে ক্ষেপে গিয়ে বলল
“একজন খুনির কাছে আমি কক্ষনো ক্ষমা চাইব না। কালসাপ মহিলা। আরে এ তো এর স্বামীর চেয়েও ভয়ানক কালসাপ। ভালো সাজার নাটক করে তলে তলে এই? আমার হাত থেকে তোর নিস্তার নেই আজ”
ছুটে আসতে লাগলে মেহরাব ফের তাকে থামাল। গালে সজোরে বসিয়ে দিল এক চড়। সাহারা গালে হাত দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে রইল কিছুক্ষণ। দাসীরা ছুটে বেড়িয়ে গেল কক্ষ থেকে। জান্নাতের রক্ত টগবগ করছে। এর আগেও মেহরাব সাহারার গায়ে হাত তুলেছে। ইয়ামিন তাকে চোখ দিয়ে ইশারা করল শান্ত থাকতে। মেহরাব নিজের মাথার চুল খামচে ধরে।
“সারা দেখো। তুমি কেন অ….”
মেহরাবের কথা শেষ হওয়ার আগেই সাহারাও ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিল মেহরাবের গালে। আয়েশা বেগম হা হয়ে গেছে। সাহারার দিকে তাকিয়ে মহিলার যেন আরও অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। সাহারা চেঁচিয়ে বলল
“কাপুরুষ। খুনিকে বুকে রেখে আমার গায়ে হাত তুলছিস? তোর মত কাপুরুষের মুখে থুহহহ। করলাম না তোর সংসার আমি। আজই তালাক দিবি আমায়। জিজ্ঞেস কর তোর মাকে, তারাময়ীর নুপুর তার ঘরে কেন? জিজ্ঞেস কর। তার আংটির পাথর সেই কক্ষে কি করে গেল যেখানে তারাময়ীকে রাখা হয়েছিল? জিজ্ঞেস কর কাপুরুষ তোর মাকে। কারাগারে পাহারা দেওয়া সৈন্যের কাছে তার হার কি করে গেল। তবে আমি বলছি শোন”
আয়েশা মেহরাবের দিকে তাকিয়ে বারবার মাথা দিয়ে না সূচক ইশারা করছে। সে এসব করেনি। সাহারা বলতে লাগল
“প্রহরীকে নিজের হার খুলে দিয়ে মুখ বন্ধ করেছে এই মহিলা। নয়ত বলে দিত কারাগারে এই ঢুকেছিল লোকজন নিয়ে। আর মামাবাবু কেন যায়নি বিয়েতে জানিস? কারণ এই মহিলা যে তারাময়ীকে হত্যা করতে চলেছে তা মামাবাবু জেনে গেছিল। তবে এসব কেন করেছে কী জন্য করেছে তা আমি এখনও জানতে পারিনি। কথা দিচ্ছি আমি জেনেই ছাড়ব। তুই তোর খু'নি বাবা মা কে কোলে করে বসে থাক জানোয়ার”
গোটা দিন একে অপরের মুখও দেখেনি কেউ। মহলের অবস্থা বিচ্ছিরি। এভাবে চলতে থাকলে রাজ্যও বসে পড়বে।
রাত অনেকটা গাঢ় হয়েছে। প্রাসাদের একেকটি প্রাচীর পেরিয়ে অন্ধকার যেন আরও ঘন হয়ে উঠেছে। দিনের ব্যস্ততা থেমে গেছে বহু আগেই। দূরের কোনো প্রহরীর পায়ের শব্দ মাঝে মাঝে নীরবতা ভেঙে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সাহারার চোখে ঘুম নেই। পশ্চিম দিকের ছোট্ট কক্ষটায় একা বসে আছে সে। সামনে ছড়িয়ে রাখা কয়েকটি দস্তাবেজ। কিছু চিঠি, কয়েকটি হিসাবের খাতা, কারাগারের পাহারাদারদের জবানবন্দি আর আয়েশা বেগমের সিলমোহরযুক্ত কাগজের অনুলিপি।
একটার পর একটা কাগজ উল্টে দেখছে সাহারা।
তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে আলীরাজের মুখ। মহলে মেহরাবের সবচেয়ে কাছের লোক ছিল সে। সেই মানুষটাকেই কারাগারের অন্ধকারে শেষ করে দেওয়া হলো।
তারোময়ীকেও। কয়েকটা রশিদ পেল সাহারা। আয়েশা বেগমের সিলমোহর যুক্ত। বেশ বড় অঙ্কের স্বর্ণমুদ্রা গেছে তার কাছে। একই লোকের নামে তিনবার অর্থ গেছে। কিন্তু তিনটি তারিখে তিনটি আলাদা উদ্দেশ্য দেখানো হয়েছে। সাহারার চোখ সরু হয়ে এলো।
“একজন মানুষকে তিনবার টাকা দেওয়ার দরকার হলো কেন? আর আয়েশা বেগম তো এত বোকা নয় যে এভাবে প্রমাণ রেখে দেবে”
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
“কে?”
“আমি।”
মেহরাবের কণ্ঠ। সাহারা দ্রুত কাগজগুলো গুছিয়ে ফেলল।
“আসুন।”
দরজা খুলে মেহরাব ঢুকল। তার চোখেমুখে কয়েক দিনের ক্লান্তি। মায়ের সন্দেহের বিষয়টা সামনে পর থেকে যেন এক রাতেই অনেকটা বদলে গেছে সে। সে সাহারার সামনে এসে দাঁড়াল।
“তুমি এখনো ঘুমাওনি?”
“ঘুম আসছে না।”
“এত রাতে কী করছ?”
সাহারা কাগজগুলোর দিকে তাকাল।
“তদন্ত করছি।”
মেহরাব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
“মা সব স্বীকার করেছে। বলছে এসব করেনি। তারপরও?”
“আপনার মা স্বীকার করেছে যে তিনি কিছুর সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু তিনি ছিলেন কি না, সেটা তার মুখ থেকে শুনেই চুপ হয়ে যাব? খু'নি কখনো নিজের অপরাধ স্বীকার করে?”
“তুমি কাউকে খুঁজছ?”
“হ্যাঁ।”
মেহরাব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“সাহারা, আর কত? যা হওয়ার হয়ে গেছে। আলীরাজ নেই। তারাময়ী নেই। বাবা নেই। মাকেও হয়ত পাঠাবে কারাগারে। তুমি কি সব শেষ না করে থামবে না?”
সাহারা এবার তার দিকে তাকাল।
“আপনি পারবেন থামতে?”
মেহরাব চুপ।
“আপনার মামাকে যে মানুষগুলো মেরেছে, তাদের খুঁজে বের না করে আপনি শান্তিতে থাকতে পারবেন?”
“না।”
“তাহলে আমাকে থামতে বলছেন কেন?”
মেহরাব ধীরে ধীরে তার পাশে এসে বসল।
“কারণ আমি ভয় পাচ্ছি।”
সাহারা অবাক হয়ে তাকাল।
“কিসের?”
“তোমার জন্য।”
সাহারার চোখ নরম হলো।
“আমি নিজের জন্য ভয় পাই না।”
“কিন্তু আমার ভয় হয়।”
“কেন?”
মেহরাব এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এসবের প্রভাব আমাদের সম্পর্কের ওপর না পরে”
সাহারা মৃদু হেসে বলল,
“আমি আপনার মতো না।”
“আমি কী করেছি?”
“আমার কাছে অন্যায় অন্যায়ই। আপনি তো মায়ের কথা শুনে বছরের পর বছর চোখ বন্ধ করে ছিলেন”
কথাটা শুনে মেহরাবের মুখটা শক্ত হয়ে গেল।
সাহারা বুঝতে পারল কথাটা একটু বেশি কড়া হয়ে গেছে। তবুও সে থামল না।
“আমি আপনাকে দোষ দিচ্ছি না, যুবরাজ। আপনি নিজের মাকে বিশ্বাস করেছিলেন। সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু এখন যখন সত্যটা সামনে এসেছে, তখন আমাদের থামা যাবে না। কিনৃতু তাতেও আপনি ডুব দিয়ে আছেন অন্ধবিশ্বাসে”
মেহরাব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“তুমি কী করতে চাও?”
সাহারা টেবিলের ওপর হাত রাখল। শান্ত গলায় বলল
“আপনার গোটা বংশ নির্বংশ করে দেব।”
মেহরাবের গায়ে কাটা দিয়ে উঠল সাহারার এমন শান্ত হুশিয়ারিতে। সে মুচকি হেসে বলল,
“তুমি পারবে না।”
সাহারা চোখ তুলে তাকাল।
“কেন পারব না?”
মেহরাব তার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে খুব শান্ত স্বরে বলল,
“কারণ আমার বংশের একজন তোমার পেটেও।”
সাহারার চোখ স্থির হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত যেন পুরো পৃথিবী থেমে গেল তার। তারপর সে ধীরে ধীরে নিজের পেটের ওপর হাত রাখল। মুখে বিস্ময়, চোখে জল।
“আপনি...”
মেহরাব মৃদু হেসে বলল,
“হ্যাঁ। আমি জানি।”
“কীভাবে?”
“আমার সন্তান আমি জানব না?”
সাহারা নিচু গলায় বলল,
“আমি আপনাকে বলতে চেয়েছিলাম।”
“তাহলে কেন বলোনি?”
“সময় পাইনি। একের পর এক ঘটনা... আলীরাজ মামা... মা...”
তার গলা ধরে এলো। মেহরাব তার হাত শক্ত করে ধরল।
“আমাদের সন্তান আছে, সাহারা।”
সাহারা চোখ মুছে মৃদু হাসল।
“আপনার?”
“আমাদের।”
সাহারা কিছু বলল না। মেহরাব তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
“তাই নিজের জীবন নিয়ে এতটা বেপরোয়া হবে না। তোমার ভেতরে শুধু তোমার জীবন নেই এখন।”
সাহারা চোখ বন্ধ করল। তারপর ধীরে বলল,
“তাহলে আরও একটা কারণ আছে আমার লড়াই করার।”
মেহরাব তাকাল।
“কী?”
“আমাদের সন্তান যেন এমন একটা রাজ্যে জন্মায়, যেখানে তার নিজের মানুষদের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা শত্রু থাকবে না। আর আমার সন্তানকে আমার দুর্বলতা ভাববেন না”
মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তুমি থামবে না, তাই তো?”
“না।”
“জানতাম।”
সাহারা এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তবে একটা কাজ আপনাকে করতে হবে।”
“কী?”
“আমাকে কোনো কিছুতে আটকাবেন না।”
মেহরাব একটু হেসে বলল,
“তোমাকে আটকানোর ক্ষমতা আমার আছে নাকি?”
সাহারা হেসে ফেলল।
“নেই।”
“একদম নেই।”
“ভালো।”
কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ থাকল না। সাহারা আবার কাগজগুলোর দিকে তাকাল।
“আমাকে নাসিরাবাদে সাহায্য চাইতে হবে।”
মেহরাব বলল,
“শাখার কাছে?”
“হ্যাঁ।”
“জান্নাতকে বলবে না?”
সাহারা মাথা নাড়ল।
“না।”
“কেন?”
“জান্নাত আপা আমার বড় বোন। কিন্তু এখন সে এই বাড়ির বউ। ওকে আর এই ঝামেলার মধ্যে টানতে চাই না।”
মেহরাব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“তুমি শাখার ওপর বেশি ভরসা করো?”
সাহারার ঠোঁটে হাসি ফুটল।
“শাখা আপা আমার থেকে অনেক বেশি জেদি। আর দরকার হলে আমার হয়ে তলোয়ারও তুলবে।”
“ফাইয়াজ কী বলবে?”
“তাকে সামলানোর দায়িত্ব শাখা আপার।”
দুজনেই হেসে ফেলল। তারপর সাহারা একটা সাদা কাগজ টেনে নিল। কলম হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ভেবে লিখতে শুরু করল।
নাসিরাবাদ
শাখা আপার নামে।
আপা,
তোমার কাছে এই পত্র পাঠানোর কারণটা অন্যরকম। তোমার নতুন সংসারে অশান্তি নিয়ে আসতে চাই না। জানি, তুমি আর ভাইজান কতদিন পর নিজেদের মতো করে একটা জীবন পেয়েছ। সেই জীবনে আমার এই অন্ধকারটা ঢুকিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে না।
কিন্তু তোমাকে ছাড়া আর কাউকে আমি বলতে পারছি না।
আমিরাবাদে যা ঘটেছে, তার শেষ এখনো হয়নি। মা অনেক কিছু স্বীকার করেছে। কিন্তু তাঁর স্বীকারোক্তির পেছনে আরও নিগূঢ় রহস্য আছে। আমি সেগুলো খুঁজে বের করতে চাই। জান্নাত আপাকে আমি কিছু বলতে চাই না। সে এখন এই বাড়ির বউ। তার নিজের সংসার আছে। আমার জন্য তাকে আবার বিপদের মধ্যে ফেলতে চাই না।
তুমি যদি পারো, নাসিরাবাদ থেকে কয়েকজন বিশ্বস্ত মানুষ আমাকে দিও। যারা আমার হয়ে খোঁজ করবে, কিন্তু কাউকে জানাবে না তারা কার নির্দেশে কাজ করছে।
আর একটা কথা আমি হয়তো আগের সাহারা নেই। এখন আমার ভেতরে আরেকটা প্রাণ আছে। তাই আমি বেপরোয়া হয়ে কোনো কাজ করতে চাই না। কিন্তু সত্যিটা ছেড়েও দিতে পারব না।
তুমি আমার আপা। তাই শেষবারের মতো তোমার কাছেই সাহায্য চাইছি।
-সাহারা
চিঠি শেষ করে সাহারা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর মোম গলিয়ে চিঠির মুখ বন্ধ করল। মেহরাব চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
“তুমি সত্যিই ওকে জান্নাতের কথা বলবে না?”
সাহারা মাথা নাড়ল।
“না।”
“জান্নাত জানলে কষ্ট পাবে।”
“জানি।”
“তবু?”
“ও আমার বোন। তাই ওকে এবার বোন হিসেবেই রাখতে চাই। রাজনীতির সৈনিক বানাতে চাই না।”
মেহরাব আর কিছু বলল না। সাহারা চিঠিটা এক বিশ্বস্ত দূতের হাতে দিল।
“আজ রাতেই রওনা হবে। কারও হাতে দেবে না। শুধু শাখা আপার হাতে।”
দূত মাথা নত করে চলে গেল।
****
নাসিরাবাদের সূর্যের আলো নতুন করে গড়ে ওঠা শহরের ওপর পড়েছে। পুরোনো ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদের পাশেই নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে। কোথাও শ্রমিকেরা পাথর কাটছে, কোথাও কাঠের দোকানের কাঠামো উঠছে। আর সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেও একটা ছোট্ট বাড়ি যেন আলাদা করে শান্ত। বাড়ির সামনে ছোট্ট বাগান। কয়েকটি গোলাপ গাছ। ফাইয়াজ হাতে মাটির কলসি নিয়ে গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে। তার পোশাকে এখন আর আগের সেই দস্যুর ছাপ নেই। সাধারণ রাজকীয় পোশাক। মুখে শান্তি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে শাখা তাকে দেখছিল।
“ওই গাছটায় এত পানি দিও না।”
ফাইয়াজ না তাকিয়েই বলল,
“কেন?”
“আরেহহহহ, গাছ ডুবে যাবে।”
“আমি গাছকে পানি দিচ্ছি, নদী বানাচ্ছি না।”
“তোমার হাতে কিছু দিলে সেটাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করতেই হবে?”
ফাইয়াজ এবার তাকাল।
“আচ্ছাআআআ, আর তোমাকে দিলে?”
শাখা ভ্রু তুলল।
“আমাকে নিয়ে কী করবে?”
ফাইয়াজ কলসিটা রেখে ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এল।
“তোমাকে?”
“হ্যাঁ।”
“আমি তোমাকে নিয়েও বাড়াবাড়ি করতে চাই।”
শাখা হেসে মুখ ফিরিয়ে নিল।
“অনেক কথা শিখে গেছ।”
“তোমার কাছ থেকেই তো শিখলাম।”
“আমি কী শিখিয়েছি?”
“ঝগড়া করতে।”
শাখা তার বাহুতে হালকা ধাক্কা দিল।
“বেশি কথা বলো।”
“তুমি না থাকলে এই বাড়িটা এত শান্ত লাগে কেন জানো?”
“কেন?”
“কারণ তুমি না থাকলে আমার সঙ্গে ঝগড়া করার কেউ থাকে না।”
“উমমমম, তা মহারানী? আপনার হাতে নাশতা পাওয়ার সৌভাগ্য কি হবে?”
শাখা কিছু বলার আগেই দূর থেকে ঘোড়ার শব্দ শোনা গেল। একজন দূত দ্রুত ঘোড়া থামিয়ে নামল।
“শাহজাদি!”
শাখা এগিয়ে গেল।
“কী হয়েছে?”
লোকটি মাথা নিচু করে একটি সিলমোহর করা পত্র এগিয়ে দিল।
“আমিরাবাদ থেকে।”
শাখার মুখের হাসি মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। সে সিলমোহরটা দেখেই চিনে ফেলল।
“সাহারা...”
ফাইয়াজ তার পাশে এসে দাঁড়াল।
“কী লিখেছে?”
শাখা চিঠি খুলল। একবার পড়ল। দ্বিতীয়বার পড়ল। তারপর দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বলল না।
ফাইয়াজ শান্ত গলায় বলল,
“খারাপ কিছু?”
শাখা চিঠিটা ভাঁজ করল।
“সারা সাহায্য চেয়েছে। ওর শাশুড়ি নিয়ে ঝামেলা”
“কেন?”
“সে অনেক কথা বলব পরে। আসো খেয়ে নাও আগে”
ফাইয়াজ মৃদু হেসে বলল,
“চিন্তা হচ্ছে ভীষণ? পাখি?”
শাখার চোখ ভিজে উঠল।
“সাহারা আমার ভীষণ আপন। আমার ছোট বোন।”
ওদিকে আয়েশা বেগম সাজাচ্ছে কঠিন গুটি চাল। এই চাল মোকাবিলা করতে শাখাকে ভীষণ প্রয়োজন সাহারার।