শাহজাদীদের বিবাহ উপলক্ষে কারাগারে থাকা আসামীদের খাবার দেওয়া হয়েছে অনেক পদের। সাধারণত কারাগারের খাবার হয় সবচেয়ে নিম্নমানের। কিন্তু যখনই রাজ্যে কোনো অনুষ্ঠান হয়, বাইজিদ শাহ্ সবসময় কারাগারে থাকা আসামীদেরও অতিথিরা যা খায় তাই ই দেয়। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। মহলের বাইরের মাঠটাতে সকল আসামীদের সাথে হাজির হলো মুয়াজও। সকল অতিথিরা খাবার খেয়ে বিদেয় হয়ে যাবার পরে আসামীদের খাবার খেতে বের করা হয়েছে কড়া প্রহরায়। সেসম দুই কন্যার বুদায় বেলা চলে। সকলের মন খািয়ায় থাকলেও মুয়াজের দৃষ্টি ছিল মহলের পথটাতে। ইয়ামিনের হাত ধরে বের হচ্ছে বধূ বেশে ভারি পোষাকে সুসজ্জিত জান্নাত। আগের বার যখন জান্নাত বউ সেজেছিল মুয়াজ দেখেনি। কিন্তু এই প্রথম জান্নাতকে বধূ বেশে দেখে মুয়াজের দৃষ্টি স্থির হয়ে যায়। আসলে ছলের কাজ জলেই যায়। সেদিন প্রতারণা না করলে আজ জান্নাত মুয়াজের হতো। বুকের ভিতর কেমন চাপ অনুভব করে সে সময়ের কথা মনে পড়লে। বাইরে রাত না দিন তা কারাগারে থেকে বোঝার উপায় নেই। চোখে ঘুম চাপায় বুঝতে পারে হয়ত রাত নেমেছে ধরণীতে। কিন্তু বাইরে তখন বিকেল। গোধূলিলগ্নের আসন্ন মুহূর্ত।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে নবদম্পতি জান্নাত ও ইয়ামিনের গাড়ি রাজপ্রাসাদের প্রধান ফটকের কাছে এসে থামল। সাহাবাদ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় যে আনন্দ আর আবেগ নিয়ে তারা রওনা হয়েছিল, আমিরাবাদের ফটকে এসে সেই অনুভূতি মুহূর্তেই বদলে গেল। প্রাসাদের সামনে অস্বাভাবিক নীরবতা। প্রহরীদের মুখ গম্ভীর। পরিচারকদের আনাগোনা নেই বললেই চলে। কয়েকজন নারী প্রাসাদের বাইরের চত্বরে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কথা বলছে। দূরে কিছু পুরুষের ভিড় জমেছে। কারও মুখে হাসি নেই, কারও চোখে স্বাভাবিক চাঞ্চল্য নেই। ইয়ামিন গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে তাকাল।
“কী হয়েছে এখানে?”
কেউ উত্তর দিল না। জান্নাত গাড়ির ভেতর থেকেই অস্থির চোখে প্রাসাদের দিকে তাকাচ্ছিল। তার পরনে এখনো বিয়ের পোশাক। মাথার ওপর লাল ওড়না, গলায় ভারী অলংকার। নতুন বধূর সাজে এমন বিষণ্ন পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজেকে বড্ড বেমানান মনে হলো তার। এতক্ষণ তো তাকে বরণ করতে দাস-দাসীদের ভিড় থাকার কথা ফটকে। যুবরাজ, ভাবী সম্রাট বিবাহ করে এনেছে অথচ তাদের আগমনী অভ্যর্থনার কোনো আয়োজনই চোখে পড়ছে না। জান্নাত ইয়ামিনের কাছে এসে নিচু স্বরে বলল,
“ভিতরে গিয়ে দেখুন তো সব ঠিক আছে কিনা। নাকি কোনো বিপদ হয়েছে?”
ইয়ামিন উত্তর দেওয়ার আগেই ভিড়ের মধ্য থেকে একজন পরিচারক ছুটে এল।
“যুবরাজ! আপনারা ফিরে এসেছেন!”
ইয়ামিন তার বাহু ধরে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে? সবাই এমন করে দাঁড়িয়ে আছে কেন?”
পরিচারক কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। তার চোখ ছলছল করছে।
“মহলে আসুন, যুবরাজ। সবকিছু ভেতরে গিয়ে দেখবেন।”
ইয়ামিনের বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা জমল। সে জান্নাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই আসো তো আমার সাথে। বোধহয় হয়েঋে কিছু।”
তারপর দুজন দ্রুত প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করল। প্রাসাদের প্রধান হলঘরে ঢুকতেই মানুষের ভিড় চোখে পড়ল। রাজপরিবারের সদস্য, প্রহরী, পরিচারক সবাই সেখানে উপস্থিত। কেউ দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে, কেউ মেঝেতে বসে। মাঝখানে কিছুটা জায়গা ফাঁকা রাখা হয়েছে।
সেই ফাঁকা জায়গার ওপর শুয়ে আছে একটি দেহ। সাদা কাপড়ে সম্পূর্ণ ঢাকা। ইয়ামিনের পা থেমে গেল। লাশের মাথার কাছে বসে আছে মেহরাব। তার পরনে কালো পোশাক, মুখ পাথরের মতো স্থির। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে, কিন্তু সেখানে কোনো অশ্রু নেই। যেন এতক্ষণে সমস্ত কান্না শুকিয়ে গিয়ে কেবল শূন্যতা জমেছে।
তার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদছেন আয়েশা বেগম। এক হাতে ছেলের বাহু আঁকড়ে ধরে আছেন, অন্য হাতটি বারবার সাদা কাপড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইয়ামিন কয়েক পা এগিয়ে গেল।
“মেহরাব!”
মেহরাব ধীরে মুখ তুলল। দুই ভাইয়ের চোখাচোখি হলো। কিন্তু মেহরাব কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি আবার নেমে গেল সাদা কাপড়ে ঢাকা দেহটির দিকে। ইয়ামিনের কণ্ঠ এবার কেঁপে উঠল।
“এএএ…এটা কার লাশ?”
মেহরাব ঠোঁট নাড়ল। শব্দ বের হলো না। আয়েশা বেগম ছেলের কাঁধ থেকে মাথা তুলে ইয়ামিনের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ ভেজা, মুখ বিবর্ণ।
“আলী…আ…আমার আলী”
ইয়ামিনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
“মানে?”
জান্নাত ধীরে ধীরে ইয়ামিনের পেছন থেকে সামনে এগিয়ে এল। তার চোখ স্থির হয়ে আছে সাদা কাপড়ের দিকে। মেহরাব এবার নিজেই কাপড়ের একাংশ সরিয়ে দিল। সাদা কাপড়ের নিচে শান্ত মুখে শুয়ে আছেন আলীরাজ। যে মানুষটির কণ্ঠে সারাক্ষণ হাসি লেগে থাকত, যে মানুষটি কঠিন মুহূর্তেও ঠাট্টা করত, আজ তার মুখে কোনো কথা নেই। চোখ বন্ধ। ঠোঁট নিশ্চুপ। জান্নাতের হাত থেকে ওড়নার প্রান্ত খসে পড়ল।
“মামাবাবু…?
বহুত জোরাজুরি করেও আলীরাজকে সাথে নিতে পারেনি ইয়ামিন আর মেহরাব। পরে তাকে ছাড়াই গেছে বরযাত্রী। আয়েশা বেগমের শরীর খারাপ থাকায় সাহারাও থেকেছে মহলে। সাহাবাদে তাদের আপ্যায়ন চলছে এমন সময় মহল থেকে খবর যায় মেহরাবকে দ্রুত ফিরতে হবে। ইয়ামিনকে রেখেই ফিরে আসে মেহরাব। ইয়ামিন কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে মেহরাবের পাশে বসে পড়ল।
“ভাই, কী হয়েছে?”
“আমি বিয়ের আসর ছেড়ে ফিরে এখানে এসে দেখি এই অবস্থা। কারাগারের ভেতরে আলীরাজ আর তারাময়ীকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। দুজনকে একই কারাকক্ষের ভেতরে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়। প্রহরীরা পরে তাদের নামিয়ে এখানে নিয়ে এসেছে।”
আয়েশা বেগম হঠাৎ মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলেন।
“আমার ভাই… আমার আলীরাজ… কেন এমন হলো?”
মেহরাব মায়ের হাত নিজের হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে রইল। ইয়ামিনের চোখে অবিশ্বাস।
“মামা কি করে কারাগারে ঢুকল? প্রহরীদের তো বলাই ছিল সারা আর মেহরাব ব্যতিত কারও প্রবেশ নিষেধ”
মেহরাব ধীরে উত্তর দিল,
“তারাময়ীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক রাখা হয়েছিল। মামা নিজেই তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তারপর…”
সে আর বাকিটা বলতে পারল না। জান্নাত চারপাশে তাকাল। এত মানুষের ভিড়ের মধ্যে একটি মুখ তার চোখে পড়ছে না।
“সাহারা কোথায়?”
উপায় না পেয়ে জান্নাত নিজেই জিজ্ঞেস করল,
“সাহারা কোথায়? সে কি এখানে নেই?”
মেহরাব হলঘরের অন্য প্রান্তের দিকে ইশারা করল।
“ওদিকে।
জান্নাত ধীরে ধীরে হলঘরের ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল। প্রাসাদের পাশের দীর্ঘ বারান্দা পেরিয়ে একটি প্রশস্ত কক্ষে পৌঁছাতেই সে আবার থমকে দাঁড়াল। সেখানে আরও একটি দেহ সাদা কাপড়ে ঢাকা। চারপাশে নারীদের ভিড়। কয়েকজন পরিচারিকা কান্না করছে, কেউ আবার একপাশে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে দোয়া পড়ছে। সাদা কাপড়ের পাশেই পাথরের একটি স্তম্ভে হেলান দিয়ে বসে আছে সাহারা। তার পরনে দামি পোশাক। মহলে বিয়ে বলে কথা। চুল কিছুটা এলোমেলো। মুখে কোনো কান্না-কাটির চিহ্ন নেই। তার দুই চোখে তীব্র ক্রোধ জমে আছে, যেন আগুনের শিখা জ্বলছে। জান্নাত দ্রুত তার কাছে গেল।
“সাহারা”
সাহারা মুখ তুলল। কিছুক্ষণ বোনের বিয়ের সাজের দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর আবার চোখ নামিয়ে নিল। জান্নাত তার পাশে বসে হাত ধরল। জান্নাতের চোখ এবার সাদা কাপড়ের দিকে গেল।
“এটাই কি… তারাময়ী?”
সাহারা ধীরে মাথা নাড়ল। জান্নাতের বুক কেঁপে উঠল। সে সাদা কাপড়ের প্রান্ত সরিয়ে মুখটি দেখল। যে নারীকে ঘিরে এত রহস্য, এত অস্থিরতা, এত প্রশ্ন জমে ছিল, আজ সে-ও নিথর হয়ে পড়ে আছে। জান্নাত কাপড়টি আবার মুখের ওপর টেনে দিল।
“সারা, কীভাবে এসব হলো?”
সাহারা মুখ তুলল। তার চোখে জমে থাকা আগুন আরও স্পষ্ট হলো।
“আমি জানি না, আপা। শুধু জানি, যারা এই কাজ করেছে, তারা আমার মামাবাবুকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।”
“তুই কি যুবরাজকে কিছু বলেছিস?”
“কী বলব? যে মানুষটা নিজের মামাকে বন্ধুর মতো ভালোবাসত, সে এখন কথা বলার অবস্থায় আছে?”
সাহারার কণ্ঠে তীব্রতা ছিল, কিন্তু শেষ শব্দটুকুতে কাঁপন লুকানো গেল না।
বোনকে বুকে জড়িয়ে নিল জান্নাত।
“শান্ত হ সারা। আমি এসে গেছি। আমি আছি তোর পাশে লক্ষী আমার”
“তারাময়ীকে আমি বিশ্বাস করতাম না। তার অপরাধের বিচার হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কারাগারের ভেতরে এভাবে দুজনের মৃত্যু? কি এমন হলো যে মামাবাবুও গলা দড়ি দিল”
সাহারার মনে পড়ল আলীরাজের বিয়ের প্রস্তাবের কথা। মানুষটি নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে কত দৃঢ় ছিলেন! কিছুক্ষণ পর ইয়ামিনও সেখানে এসে পৌঁছাল। জান্নাতকে সাহারার পাশে বসে থাকতে দেখে সে এগিয়ে গেল।
“সারা, মেহরাব তোমাকে খুঁজছিল।”
সাহারা ধীরে উঠে দাঁড়াল।
“জি। আসছি?”
“নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করো। মামার মৃত্যুর ধাক্কা মেহরাবের পক্ষে সহ্য করা কঠিন হবে। ওকে তোমায় ঠিক রাখতে হবে বোন আমার।”
সাহারা চোখ নামিয়ে বলল,
“আমি যাচ্ছি।”
জান্নাত তার হাত ছাড়ল না।
“চল আমিও যাচ্ছি , তুই একা যাস না।”
সাহারা বোনের দিকে তাকিয়ে মৃদু মাথা নাড়ল। তিনজন আবার হলঘরে ফিরে এল। মেহরাব তখনো আলীরাজের মাথার কাছে বসে আছে। তার হাত মামার হাতের ওপর রাখা। ইয়ামিন কাছে গিয়ে পাশে বসল।
“ভাই, উঠে দাঁড়া।”
মেহরাব তার দিকে তাকাল না।
“কোথায় যাব?”
“ওকে তো শেষ বিদায় জানাতে হবে।”
মেহরাবের চোখে অশ্রু জমে। বাচ্চাদের মত ডাকতে থাকে আলীরাজকে।
“আমার বন্ধু! এই আলী? মামা? ওঠ না। আলী? শুনছিস? তোর মেহু একা কি করে শিকারে যাবে তোকে ছাড়া? বাঘে খেয়ে নেবে না? এই আলী ওঠ না”
ইয়ামিন চুপ করে শুনছে
“তুই যাস না আমায় ছেড়ে। আমি না বাবা হারাইছি কদিন আগে। তুই তো জানিস আমি সেই শোকই কাটিয়ে উঠতে পারিনি এখনও। এমন করে না লক্ষীটি। ওঠ না বাপ। তুই না বিলেত যাবি বলেছিলি? কিরে? কথা না রেখে চলে যাচ্ছিস? আমি যে একা হয়ে যাব রে বন্ধু। এই আলী ওঠ না”
ইয়ামিন তার কাঁধে হাত রাখল।
“তুই একা নস, ভাই। আমি আছি তোর সাথে। আল্লাহ ওকে নিয়ে গেছে। ওর জন্য দোয়া কর”
মেহরাব এবার মাথা তুলে তার দিকে তাকাল।
“আমি শুধু জানতে চাই, কে করেছে? কার এত সাহস হলো যে আমিরাবাদের কারাগারের ভেতর দুজন মানুষকে এভাবে মেরে ফেলল?”
ইয়ামিনের মুখও কঠিন হয়ে উঠল।
“সত্য সামনে আসবে। কিন্তু এখন মামার শেষ বিদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।”
রাত গভীর হওয়ার আগেই রাজপরিবারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, মরদেহ দুটি যথাযথ সম্মানের সঙ্গে গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা করে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে। প্রাসাদের নির্ধারিত স্থানে গোসলের ব্যবস্থা করা হলো। পুরুষদের জন্য আলাদা স্থান, নারীদের জন্য আলাদা স্থান। পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থেকে সবকিছু শরিয়াহসম্মতভাবে সম্পন্ন করার নির্দেশ দিলেন।
আলীরাজের গোসলের সময় মেহরাব বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পাশে ইয়ামিন। আয়েশা বেগমকে পরিচারিকারা ধরে রেখেছে। বারবার তিনি ভাইয়ের নাম ধরে কেঁদে উঠছেন।
“আলীরাজ, তুই আমাকে একা রেখে চলে গেলি কেন? বাবা মা হারিয়ে তোকে বুকে করে বেঁচে ছিলাম। ভাই আমার ফিরে আয়। তোর আপার কাছে আয়”
মেহরাব মায়ের কাছে গিয়ে তাঁর হাত ধরল।
“আম্মা, নিজেকে সামলাও। মামার জন্য দোয়া করো।”
আয়েশা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“তোর মামা তোকে কত ভালোবাসত, মেহরাব। তুই ওর কাছে তুই ভাগ্নে ছিলি না, বন্ধু ছিলি রে বন্ধু। হ্যা রে মেহু? ও এত বড় একটা কাজ করল ও তোকে বলেনি? ও আ'ত্মহ*ত্যা করল তুই কিচ্ছু জানলি না?”
শোকেও মেহরাব একটু অবাক হলো
“এটা যে আ*ত্ম*হ*ত্যা তুমি জানলে কীভাবে?”
আয়েশা বেগমের কান্নার তোপ একটু কমলো
“ইয়ে….হ্যা এটা তো আ*ত্ম*হ*ত্যা ই। নয়তো ফা*সি নিলো কি করে?”
“অন্য কেউ ও দিয়ে দিতে পারে”
ইয়ামিন ঘটনাটা থামাল। এমন মুহূর্তে এসব আলাপ বেমানান। নারীদের নির্ধারিত স্থানে তারাময়ীর গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা সম্পন্ন হলো। সাহারা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখের দৃষ্টি বারবার সাদা কাফনে ঢাকা দেহটির দিকে ফিরে যাচ্ছিল। জান্নাত পাশে এসে দাঁড়াল।
বাইরে ভোরের আলো ফুটে গেছে। আমিরাবাদের প্রাসাদের প্রধান ফটক খুলে দেওয়া হলো। আকাশ তখনও পুরোপুরি আলোকিত হয়নি। পূর্ব দিগন্তে হালকা সোনালি রেখা ফুটে উঠেছে। মরুভূমির ওপর রাতের শীতলতা রয়ে গেছে। বালুর ওপর দিয়ে সকালের বাতাস বয়ে যাচ্ছে।
দুটি মরদেহ কাফনে মোড়ানো অবস্থায় পৃথক খাটিয়ায় রাখা হলো। প্রাসাদের প্রহরীরা শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে। রাজপরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনেরা জানাজার উদ্দেশে একত্রিত হয়েছেন। মেহরাব নিজে আলীরাজের খাটিয়ার পাশে দাঁড়াল। ইয়ামিন তার অন্য পাশে। দুজনের মুখেই গভীর শোক। আয়েশা বেগম কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে বারবার চোখ মুছছিলেন। সাহারা জান্নাতের পাশে। তার চোখে রাতভর জেগে থাকার ক্লান্তি, তবু মুখের কঠোরতা কমেনি।
জানাজা সম্পন্ন হলো। সবাই আল্লাহর কাছে দুই মৃতের মাগফিরাত কামনা করল। এরপর খাটিয়াগুলো কবরস্থানের উদ্দেশে এগিয়ে চলল।
প্রাসাদ ছাড়িয়ে পথটি মরুভূমির বুকের ওপর দিয়ে চলে গেছে। দুই পাশে যতদূর চোখ যায়, বালুর ঢেউ। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে তীব্র হচ্ছে। বাতাসে উড়ে আসা বালুকণা খাটিয়ার পাশে হাঁটা মানুষগুলোর পোশাকে লেগে যাচ্ছে। মেহরাব হাঁটতে হাঁটতে একবার ইয়ামিনের দিকে তাকাল।
পেছনে জান্নাত সাহারার হাত ধরে এগোচ্ছিল। সাহারা একবারও পেছনে তাকাচ্ছিল না। তার চোখ সামনে, মুখে জমাট ক্রোধ।
কবরস্থানের কাছে পৌঁছানোর পর খাটিয়াগুলো নামানো হলো। দুই কবর পাশাপাশি প্রস্তুত করা হয়েছে। চারপাশে নীরবতা। মেহরাব আলীরাজের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বলল,
“তুই আমাকে সব সময় সাহসী হতে বলতি না? দেখ আমায় আলী। আজ তোর সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগছে।”
সে চোখ বন্ধ করে দোয়া করল। মরুভূমির বাতাস বয়ে গেল বালু উড়িয়ে। দুটি কবরের ওপর মাটি পড়তে শুরু করল। একসময় সাদা কাফন আর দেখা গেল না। শুধু পাশাপাশি দুটি নতুন কবর পড়ে রইল।
আমিরাবাদের আকাশে পূর্ণ সকালের আলো। রাজপ্রাসাদের মানুষের জীবনে দীর্ঘ অন্ধকার নেমে এসেছে। সবারই একই প্রশ্ন আর উত্তর কারোরই জানা নেই। কারাগারের ভেতরে আসলে কী এমন ঘটেছিল? আলীরাজ ও তারাময়ীর মৃত্যু কি কেবল একটি হত্যা*কাণ্ড, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো ষড়যন্ত্র? সাহারা জানে, উত্তর খুঁজে বের না করা পর্যন্ত তার ক্রোধ শান্ত হবে না। আচমকা আয়েশা বেগমের কক্ষ থেকে ভারি কিছু পড়ার শব্দ হলো। চমকে উঠল সবাই।