ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 138

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#সারপ্রাইজ_পর্ব [ চাঁদের হাট ]
#ইসরাত_আরা_ইতি

[ ১ম অংশ ]

“ইহান তাজওয়ার মির্জা বাবা হবে।”

সুখবরটা জানিয়ে দিয়ে প্রেরণা একটা নাজুক বাবুই পাখির মতন ইহানের বক্ষ কুঁড়েঘরে লেপ্টে থাকে পরম আশ্লেষে, উষ্ণতায়। ইহানের শক্ত দু'টো হাত তার অর্ধাঙ্গিনীর আবেগী কাঁপনকে দমিয়ে রেখেছে পিঠ আলতো চেপে ধরে। সময় গড়ায়, তবে প্রেরণার তিরতির করে কাঁপুনি থামে না,থামে না ছোট ছোট সুখময় দীর্ঘ শ্বাস।

ধীরে ধীরে ইহান ওর পিঠ থেকে হাতটা সরিয়ে আগলে ধরে দু'টো গাল। প্রেরণার মুখটা উঁচু করে তুলে ধরে স্বপ্নালু দৃষ্টিতে চেয়ে ভারি স্বর আবেগী হয়, বলে,

“ভাগ্যিস ফোনে বলেননি। ভাগ্যিস। এমন খবর ফোনে দিলে আজ খুব খারাপ হয়ে যেতো। আমার মেজাজটা গরম হয়ে যেতো।”

_তা কেন?

_আপনার কাছ থেকে এভাবে, সামনাসামনি শুনতে পেতাম না, আমি দ্বিতীয় বার বাচ্চার বাবা হতে চলেছি। এই কথাটা! এই প্রাপ্তি টুকু আমি ফোনে নিতাম? উহুম! পোষাতো না আমার প্রেরণা! আমি প্রথম নয় বরং দ্বিতীয় বারের মতো পিতৃত্ব পেতে চলেছি, ফোনে এমন খবর নিতে পারতাম না।

চোখ মুছে নেয় প্রেরণা । ওভাবেই বুকে মাথা ঠেকিয়ে বড় বড় শ্বাস ফেলে শক্ত বুকটাকে হিমশীতল করে। লাজুক হেসে ধীরস্থির বলে,“সবাই বাইরে আছে। বড় মা কি তাদের বলেছে একথা এতক্ষণে? একমাত্র তার সাথেই শেয়ার করেছি। তাকে বলতে বলেছিলাম। আমার না ভীষণ লজ্জা লাগছে! আপনি গিয়ে একটু বলবেন? বিশেষ করে আমার শাশুড়ি মাকে। আপনি গিয়ে বলবেন, আমি লুকিয়ে তার প্রতিক্রিয়া দেখবো!”

নিঃশব্দে হেসে ফেললো ইহান, ক্রমশ চওড়া হতে থাকলো সেই হাসি। প্রেরণার কন্ঠস্বর কেমন বাচ্চা বাচ্চা। ওর কোমর জড়িয়ে ধরে ইহান বলে,“কাউকে বলেননি আমরা প্ল্যান করেছি? তাইনা?”

দু'পাশে মাথা নাড়ে প্রেরণা। রক্তাভ গাল দু'টো বড্ড আদুরে দেখা যায় ঐ সময়। ইহান ওখানটাতে প্রগাঢ় এক চুমু খায় চোখ বুঁজে। তারপর বলে,“বলুন। আপনি আমার থেকে কি গিফট চান!”

_গিফট কেন? এতো ফরমালিটি কেন ইহান? বাচ্চাটা আমাদের দুজনের নয়? আমি একাই কিছু হচ্ছি?

ইহান হাসলো,
_না তো। আমি একটু বেশিই হচ্ছি। বাবা হচ্ছি। এইযে আমাকে দ্বিতীয় বারের মতো বাবা বানাচ্ছেন তাই! কি দেবো আপনাকে? প্রেরণা আপনার চাহিদা ছিল শাড়ি,চুড়ি। ওসব গিফট প্রেগন্যান্সির সাথে যায়? এই ব্যাপারে আমার নলেজ খুব কম ইউ নৌ! কাউকে জিজ্ঞেস করবো সে উপায় নেই। মজা বানিয়ে রেখে দেবে আমার বাদর ভাই-বোন গুলো। তাই সাজেশন টা আপনার থেকেই নিই! কি চান বলুন!

প্রেরণা মুখ চেপে হাসে। তার সামনে অতি লম্বা এই পুরুষ লোকটাকে কতটা সরল আর সুন্দর লাগছে এই সময়, এই পুরুষটা কি তা জানে? প্রেরণা বড্ড আপ্লুত হয়ে মিনিট খানেক চুপ থাকে, পর পর আবার ইহানের বুকে মাথা ঠেকিয়ে এক রাজ্যের আবদার নিয়ে বলতে থাকে,“কি চাই? চাই তো, একটু সময়। আমার যখন খুব বেশি শরীর খারাপ লাগবে, তখন আশেপাশে আপনাকে চাই। আমার এই অধ্যায়ের জার্নিটা আমি একাকিত্বে কাটাতে চাইনা আর। আমি চাই আমার আশ্রয় যেন আমার এই নাজুক সময়টিতে আমার মাথা থেকে তার ছায়া না সরায়। আর চাই কিছু খুচরা যত্ন। এই ধরুন, হঠাৎ হঠাৎ গা গুলিয়ে উঠলে একটু ছুটে এসে ধরবেন, রাতের বেলা ঘুম ভেঙে গেলে আমার যেন বলতে না হয়, আপনি বলার আগেই আমাকে পানি খাওয়াবেন। আমি দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠলে আমাকে সামলে আপনিও আর ঘুমাবেন না। আপনার বাচ্চা পেটে নিয়ে অসুস্থতায় আমি রাত জাগবো,আপনি আমাকে সঙ্গ দেবেন। দিনে যে কয়বার মুড সুয়িং হবে আপনি 'বান্দা হাজির' বলে সব কাজ ফেলে আমার সামনে আসবেন। ওরা সবাই আপনার এমন পাগলামি দেখে আড়ালে হাসলেও আসবেন। ন্যাকামি বলতে পারবেন না আমার এই আবদার গুলো ইহান।”

কতটা আকুল হয়ে স্বামীর কাছে আবদার করা যায়? প্রেরণা ওটাই করেছে। শুনে চুপ হয়ে আছে ইহান। কথা হারিয়ে শক্ত হাতে ধরে রেখেছে প্রেরণাকে। আর এরপর, এরপর আরো একবার ওর ঠোঁটে পরম আশ্লেষে এক লম্বা চুমু খেয়ে চুমু খায় ওর গালে লেপ্টে থাকা নোনাজলে। মৃদু স্বরে বলে,“এতকিছু চাই? কিন্তু প্রেরণা এ বছরটা তো আমি ভীষণ ব্যস্ত!”

প্রেরণা হাসলো পরপর। এতক্ষণের আহ্লাদী গৃহবধূ গলা খাঁকারি দিয়ে চোখ মুছে সহজ ভঙ্গিতে জবাব দেয়,“আরেহ ধূর,মজা করেছি তো। অসুবিধা নেই। ওসব তো এমনি বলেছি। না হলে নাই। আমি কি অবুঝ নাকি?”

ইহান একপেশে হেসে বলল,“সেক্ষেত্রে আমার পরিবার যদি আমার খামতি টুকু পুষিয়ে দেয়। আপত্তি আছে?”

প্রেরণা মাথা ঝাঁকায়। মৃদু শ্বাস ফেলে বলে,“আপত্তি নেই।”

_এবার বলুন,আর কি চাই?

_এখনি বলতে হবে? পরে বলি? মনে করে করে বলবো।

_________

“বাড়িতে নতুন অতিথি আসছে।”

দোতলার লিভিং রুম জুড়ে পারিবারিক আড্ডা চলছে তো চলছে। চায়ের কাপে গল্প ফুরাচ্ছিলো না। আপাতত সবার মনযোগ ছিলো উজ্জ্বলের বিদেশ ভ্রমণের গল্পে। ঠিক অমন মূহুর্তে আলো সুসংবাদটা দিয়ে দেয়।

কথা বলছিল তখন ইলহাম মির্জা। মুঈনের সাথে একটা জমি নিয়ে। কথাটা ইলহামের কানে ঠিকঠাকভাবে না পৌঁছালেও বাকিরা সবাই থমকাল।

এতক্ষণের হৈচৈ নিমিষেই বদলে গেল পিন পরা নিস্তব্ধতায়।

সামিন অবাক গলায় আলোকে বলে ওঠে,“অতিথি আসছে মানে? রাত এখন সাড়ে বারোটা প্রায় । এতো রাতে অতিথি আসছে মানে‌ কি? আর নতুন অতিথিটাই বা কে? সব ছেলে মেয়ে বিয়ে করিয়ে পুরনো বানিয়ে ফেলেছি।”

আলো ঠোঁট টিপে হাসে স্বামীর কথা শুনে। ছোটো সদস্যদের বোকা বোকা করে রাখা মুখগুলো ক্রমশ সহজ হয় বড় মায়ের ঐ অপূর্ব সুন্দর রহস্যময়ী হাসি দেখে। বুদ্ধিমান ওরা, বুঝে যায় অনেকটাই।

ইশমাম বলে ওঠে,“কোন অতিথি? আর কাকে দাওয়াত করেছিলে আজ? দাওয়াতের সময় না এসে এতো রাতে কি? এটা ব্যাড ম্যানার।”

আলো এবার বেশ শব্দ করে হেসে ওঠে,ইশমামকে বলে,“এই অতিথি নয়মাস পরে আসবে। আমি আগাম বার্তা দিলাম। তোমরা প্রস্তুতি নাও।”

_মানে?

এবার বিরক্ত হয় আলো সামিনের ওপর ! কর্কশ গলায় বলল,“দিন দিন আপনাদের তিন ভাইয়ের বুদ্ধিজ্ঞান কমে যাচ্ছে। আরে ছেলের ঘরের নাতি আসছে আপনাদের, নতুন অতিথি।”

ঠিক সে মুহূর্তে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় ইশি,ইনু,শেহা। এক লহমায় গোটা বাতাবরণ পাল্টে যায়। সামিন, ইলহাম, ইশমাম অবাক হলেও নিজেদের সামলে নিয়ে তড়িৎ তাকায় ইরফানের দিকে।
ইরফান নিজেও ঘোরের মাঝে, ওর দিকে বাপ চাচাদের এমন দৃষ্টি দেখে ভীষণ বিব্রত সে। আচমকা খেই হারিয়ে দু'পাশে ঘনঘন মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝাতে চাইলো, সুখবরটি তার তরফ থেকে নয়। এবারো সে এমন কিছু করেনি। তার বৌটা নিতান্তই ছোটো। সে কি বিবেকহীন নাকি এতটা? আর সবচে বড় কথা বাড়ির মানুষ সব সময় সবকিছুতে প্রথম সন্দেহের তীর ইরফানের ওপরেই রাখে কেন? বাড়িতে সে ছেলে একা? কেন ঐ ইহান তাজওয়ার মির্জা বুঝি ফিডু খাওয়া বাচ্চা? কি মুশকিল!

রিতু চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে এককোণে। ইশি,ইনু আর শেহা এক সেকেন্ডও দেরী না করে ছুটতে ছুটতে যায় ইহানের ঘরে। গিয়ে বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে অনবরত।

প্রণমি অবশ্য কিছুই বুঝতে পারছে না, এতক্ষণ গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে ছিল ইরফানের পেছনে, ওর পিঠের দিকের শার্ট খামচে ধরে। হঠাৎ ক্ষীণ আওয়াজে বলল,“ছেলের ঘরের নাতি আসছে মানে? মানে বড় মা দাদানের কথা বলছে?”

ইরফান শান্ত গলায় জবাব দিল,“জি জি। আমার হলে তো সবার আগে তুমিই টের পেতে তাইনা?”

চমকে উঠলো প্রণমি, পর পর মিইয়ে গেল লজ্জায়। ইরফান এক পলক ওকে লক্ষ্য করে বাঁকা হাসে, পরপর গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,“কেউ শোনেনি কিছু। কেউ তাকিয়ে নেই। এতো লজ্জা পেতে হবে না।”

প্রণমি এবার খামচে ধরে ইরফানের হাত । পেছন থেকেই, উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে,কন্ঠে চাঁপা আনন্দ,“আপুর বেবি হবে? আবার পুচকু আসবে আমার আপুর? আমি আবার খালামনি হবো?”

ইরফান নিশ্চুপ হেসে দেখতে থাকে তা। তারপর গম্ভীর গলায় বলে,“না।”

_না মানে?

_এইবার খালামনি হবে না। এইবার আগে চাচী হবে। তুমি আমার দলে।

প্রণমি চুপ হয়ে রয় কিছু পল, তারপর বলে,“এতো গুলো সম্পর্ক? ঠিক আছে, বড় দাদান তো আমার বেয়াইও হয়। বেয়াইকে ভাই ধরে তার বাচ্চার ফুপু হয়ে আমি তবে ইনশিরাহ আপুদের দলে চলে যাই!”

_______

সামিন সুসংবাদটা হজম করে দৃষ্টি নামিয়ে ফুরফুরে মেজাজে বলে,“আলহামদুলিল্লাহ!”

ইলহাম উঠে দাঁড়ায়। খুশির সংবাদটা হজম করতে তার কিছুটা সময় লাগবে সেটা বোঝা গেলো। আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,“এতো ঢং করতে পারো তোমরা ভাবী। বলবে না আমি দাদু হবো? তখন থেকে অতিথি অতিথি করছো। আমার নাতি এ বাড়ির অতিথি? কি আশ্চর্য কথা বলো! ধূর!”

শেষের কথাটা বলতে গিয়ে ইলহামের বুক ফুলে ওঠে। মুঈন মাঝখান থেকে মস্করা করে বলে ওঠে,“জি না মেজো বাবা, মা ভীষণ অন্যায় করেছে বলে। অতিথি তো আমরা জামাইরা, বাড়ির বৌরা। আর মা,মেজোমা, ছোটো মা। তারা অবশ্য পার্মানেন্ট অতিথি আর আমরা সিজনাল। কেবল দাওয়াত করলে আসি!”

ইলহাম কপাল কুঁচকে বলে,“খুব আক্ষেপ দেখছি! অথচ দাওয়াত দিতে দিতে মুখ থেকে ফ্যানা বের হবার পরে তোমাদের এ বাড়িতে কদম পরে। অভিযোগের বেলায় তোমরা জামাইরা এক কাঠি ওপরে!”

মুঈন হাসে। পরী বলে,“হয়েছে হয়েছে এখন শ্বশুর জামাইয়ের মধ্যে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে কাজ নেই।”

ইরফান উঠে দাঁড়ায়, আনন্দে আটখানা প্রণমির হাতটা ধরে নিয়ে ইশিদের কাছে যায়। দরজা তখনো খোলেনি ইহান। এইবার ইরফান গিয়ে সজোরে দরজায় মারে চাপড়,চাপা আওয়াজে বলে,“এই দাদান বের হও! এটা তো গর্বের বিষয়, তুমি লজ্জা পাচ্ছো কেন? আজব! আমি হলে মাইক নিয়ে বেরুতাম পাড়ায়।”

প্রেরণাকে বুকের মাঝে শক্ত করে ধরে নিয়ে বসেছিল ইহান। প্রেরণা হেসে ফেলে ইরফানের কথায়। ইহান বিরক্ত গলায় বলে,“এখান থেকে যা!”

_যাবো কি? মিষ্টি খেতে টাকা দাও। আমি মুঈন ভাইয়াকে বলেছিলাম এ বাড়ির ছেলেরা কিপটে নয়।

ইহান-প্রেরণা জবাব দেয়না আর। ইরফান মিনিট খানেক অপেক্ষা করে আবার ঘুরে গিয়ে ওপাশে বড়দের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,“দাদান সম্ভবত মিষ্টি খাওয়ানোর অবস্থায় নেই। এই ছেলে একদম গুড ফর নাথিং।”

প্রিতম উঠে দাঁড়িয়ে এতক্ষণে মুখ খোলে, চঞ্চল গলায় বলে,“বোনটা আমার। তো আমি মিষ্টি আনলে সেটা অনুচিত কিছু হবে না তাইনা?”

কপাল কুঁচকে ফেলে ইরফান, তিতিবিরক্ত হয়ে বলে,“বোনটা তোর মানে? ভাইটা আমাদের! আমরা কি ফেলনা? নাকি তোর মতো সিক্স ডিজিটের স্যালারি নেই দেখে মিষ্টি কিনতে পারবো না? তোর বোনদের কিন্তু না খাইয়ে রাখিনা হ্যা?”

_তুই কি সবসময় আমার কথার নেগেটিভ মিনিং বের করে ঝগড়া করবিই? কি মজা পাস?

প্রিতম হতাশ গলায় বলে। ইরফান হাই তোলে মিছিমিছি ওর কথার জবাব না দিয়ে।

বড়রা হাসছে। রিতু তখনও ভীষণ শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে । তার হঠাৎ মনে হলো সে নিজের আনন্দ প্রকাশের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে বাকিদের,সবাই কেমন বেশ ফুরফুরে। এটা এই বংশের প্রথম ছেলের ঘরের নাতি/নাতনি! তার ইহানের! রিতু আবেগে জমে গিয়েছে।

সময় বেশি একটা গড়াতে না দিয়ে ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে দেয় প্রেরণা। অতি ফরসা মুখটা লাল হয়ে আছে, যেমনি প্রেরণার, তেমনি ইহানের। তবে ইহানের মুখভঙ্গিতে চিরায়ত সেই গম্ভীরতা লেপ্টে আছে।

সাধারণত এমন একটি খবরে সবাই গর্ভবতী মাকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানায়। তবে ওরা তিন বোন প্রেরণাকে যেন পাত্তাই দিলো না। দরজা খুলতেই এক ছুটে গিয়ে জরিয়ে ধরলো দাদানকে। ইহানের শক্তপোক্ত শরীরটাও তিন বোনের আক্রমণে নড়ে উঠলো। হাসছে ইহান নিশ্চুপ। প্রেরণা প্রথমে কিছুটা চমকালেও ভাইবোনের এমন দৃশ্য দেখতে লাগলো দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে,চোখে আরাম নিয়ে।

ইশি হাপাচ্ছে, ওরা তিন বোন খুবই আবেগী হয়েছে প্রথমবারের মতো ফুপি হবে তাই। এই অনুভূতি কেমন তা একমাত্র প্রতিটা ভাইয়ের আদরের বোন গুলো জানে।

ইহান থামতে বললেও থামেনা। ইনু চিল্লিয়ে কেঁদে ওঠে,“ইশিতা ফুপ্পির মতো না হলেও আমরা অনেক চমৎকার ফুপ্পি হবো দাদান।”

বাইরে থেকেও ইনুর কথা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ক্ষনিকের জন্য চুপ করে যায় সবাই। প্রণমি গিয়ে হাতরে বড় আপুকে ধরতেই প্রেরণা ওকে আগলে নেয়। প্রণমি আপুর পেটে হাত রেখে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,“আমি চাচী হবো আপু!”

প্রেরণা হাসে,
_আর খালামনি হবি না?

প্রণমির চোখ টলটলে, ধরা গলায় বলে,“না। এবার চাচীই হবো।”

ইহান পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে ইরফানকে ডাকে। বলতে চায় মিষ্টি আনার কথা। ততক্ষণে শুনতে পায় অত রাতেই মিষ্টি আনতে বেরিয়ে পরেছে ইরফান,প্রিতম।

নিজেদের সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরোয় ওরা দুজন। ছেলের বৌকে লজ্জায় ফেলবে না তাই তার শ্বশুরেরা উঠে চলে গিয়েছে সেখান থেকে। দাঁড়িয়ে আছে প্রেরণার শাশুড়িরা। প্রেরণা ধীরে ধীরে নিজের শাশুড়ির সামনে গিয়ে তার চোখে তাকায়, রিতু তখনো বুঝে উঠতে পারছে না সে তার আনন্দ কিভাবে প্রকাশ করবে। বৌ মানুষ নিয়ে নাচানাচি সে করতে পারে না। তবে প্রেরণার দু'হাত আগলে ধরে, পরপর দুইগাল আগলে ধরে কপালে একটা চুমু খেয়ে নরম গলায় বলে,“আলহামদুলিল্লাহ। সব ব্যাপারে মাতব্বরি করো, মেনে নিই। এবার থেকে কয়েকটা মাস আমরাও একটু আধটু মাতব্বরি করবো। অসুবিধা নেই তো?”

প্রেরণার চোখে পানি আসতে চায়। শ্বাস টেনে সেটি লুকিয়ে ফেলে ঠোঁটে ঝুলায় হাসি। মাথা নেড়ে অস্ফুটে বলে,“অসুবিধা নেই মা। আমার জীবনে কখনো মাতব্বরি করার মতোও কেউ ছিল না।”

⚫

পিরিচে করে মিষ্টি নিয়ে আলো নিজেদের ঘরে ঢুকলো। ওখানে বসে আছে সামিনেরা তিন ভাই। আলোকে দেখে সামিন বলে,“আচ্ছা সবাইকে এখন ঘুমাতে যেতে বলো তুমি। কাল না ভোর ভোর বেরুবে ওরা?”

_সেটা ওদের ব্যপার। ছোটো নয় কেউ। নিন আপনারা তিন ভাই মিষ্টি খান।

_হ্যা, মিষ্টি তো খাবোই। দাও।

সামিনের কন্ঠস্বর কেমন গদগদ শোনাল। আলো পিরিচ টা দিতে গিয়েও দিল না, ভাবুক দৃষ্টিতে তিন ভাইকে কিছুক্ষণ দেখে বললো,“চলেন বাইরে গিয়ে খাবেন, ওদের সাথে।”

সামিন মাথা ঝাঁকায় দ্রুত, বলে,“মাথা খারাপ? লজ্জা পাবে মেয়েটা!”

আলো হেসে বলে,“আপনাদের সবার কান্ড কারখানা দেখে আমার নিজেরই লজ্জা লাগছে। অতি ন্যাকামি। চলুন তো।”

_যাবো বলছো?

_হ্যা অবশ্যই।

সামিন আর ইশমাম গেলেও ইলহাম দাঁড়িয়ে থাকে। রিতু এসে বলে,“আপনার আবার কি হলো?”

মুখটা কাঁচুমাচু হয়ে আছে ইলহাম মির্জার। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলে,“আমি থাকি। আমার গিয়ে কাজ নেই। ছেলেটা লজ্জা পাবে!”

রিতু কিছু পল স্বামীর মুখের দিকে আনত নয়নে চেয়ে থেকে এগিয়ে যায়। ইলহাম লাজুক হেসে মাথা চুলকে বলে,“সেদিন দেখলাম ভাইয়ার কাঁধে চড়ে সারা বাগানে ঘুরতো, আজ তাঁরও নাকি সন্তান হবে। কেমন অদ্ভুত লাগছে রিতু। সময়ের খেল বোঝা মুশকিল। ”

_______

ভোরের আলো ফোটার আগেই এই বাড়ির ব্যস্ত গিন্নিদের বিচরণ দ্যুতি ছিটিয়ে দিতে লাগলো দোতলা থেকে নিচতলার রান্নাঘর। আলো চুলার কাছে দাঁড়িয়ে। পরী কিছু টিফিন বক্সে স্যান্ডউইচ ভরছে বাচ্চাদের জার্নি পথে খাওয়ার জন্য। রিতু মাথায় ইয়া বড় ঘোমটা দিয়ে দোতলায় চা টেনে খাওয়াচ্ছে বাড়ির জামাইদের।

ব্যস্ত পায়ে সিঁড়ি ভাঙছে ইনশিরাহ। গলা উঁচিয়ে মেজো মাকে বলে,“জামাইদের এতো লাই দিয়ো না তো! চা টেনে খাওয়াতে হবে কেন? সবাই নিচে গিয়ে খাবে! আমি তো আমার জামাইদের বলবো,“বাবা মেয়ে দিয়েছি ওটাই বেশি। কিচেনে সব রাখা আছে,গিয়ে ঢেলে খাও।”

রিতু মেয়েকে চোখ পাকিয়ে চলে যায়, ইনশিরাহ রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে মাকে বলে,“মাম্মা তোমার একটা সিম্পল সেট আছে না মুক্তার? ওটা আমাকে দেবে?”

আলো মেয়েকে দেখলো। ইনশিরাহ শাড়ি পরেছে একটা। গলা খালি তাই গয়না চাইছে। মায়ের চোখ দেখে হঠাৎ বিব্রত হয়ে বললো,“এভাবে কি দেখছো? আমি একেবারে চাইনি। শুধু আজ পরবো। ও আমাকে বেশ কয়েকটা সেট দিয়েছে। তোমার থেকে এমনিতেও নিতে দেবে না! মাইন্ড খাবে।”

_জি আমি বুঝতে পেরেছি আপনার স্বামীর খুব আত্মসম্মান। বারবার শোনাতে হবে না। আপনি গিয়ে আপনার পাপার থেকে আলমারির চাবি নিয়ে নিজেই নিয়ে নিন।

ইনশিরাহ লাফাতে লাফাতে ওঠে দোতলায়। গয়না পরলো। পথিমধ্যে দেখা মুঈনের সাথে। ইচ্ছে খুশিকে কোলে নিয়ে দেয়ালের পেইন্টিংস দেখাচ্ছিল। দু'বোনের মুখ থেকে হাসি সরে না বাবার কোলে চাপলে। ওরা এখনি বেশ বোঝে,চেনে বাবাকে। মুঈন ইশিকে দেখে থমকে চেয়ে থাকলো কিছুপল। বাচ্চা হবার পরে ভীষণ মুটিয়ে যাচ্ছে। শরীর ভারী হয়েছে। ভীষণ চক্ষু শীতল করে মুঈনের। হেসে বললো,“শাড়ি তারপর গয়নাও? এতোটা উন্নতি আশা করিনি!”

ইনশিরাহ লাজুক হাসলো ‌। মুঈন বলে,“সব ঠিকঠাক। শুধু কাজল নেই তাই কি যেন নেই কি যেন নেই লাগছে।”

_উহুম ওসব সাজগোজ করতে পারবো না বাপু। শাড়ি গয়না পরেছি এই ঢের।

ইনশিরাহ মুখে বললেও ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে কাজলটা হাতে তুলে নেয়। মেয়েদের কোলে নিয়ে ইনশিরাহর পিছু পিছু ঘরে ঢুকলো মুঈন । ইনশিরাহ ব্যস্ত হয়ে মুঈনের লাগেজ চেক করে আরো একবার,“এসপি তোমার ফরমাল স্যুট কিন্তু নিইনি একটাও। মনে হয়না ওখানে দরকার পরবে। আর বাবুদের লাগেজ তুমি গোছাও। পরে তো ওখানে গেলে কিচকিচ করবে,“আমার মেয়েদের জন্য এটা নাওনি কেন! ওটা নাওনি কেন! আমি এতো কথা শুনতে পারবো না।”

মুঈন হেসে জানিয়ে দেয় মেয়েদের ব্যাগ সে রাতেই গুছিয়ে রেখেছে। ইনশিরাহ বিছানার এক পাশে বসে গালে হাত চেপে তার মেয়েদের সুদর্শন বাবাকে দেখতে থাকে। হঠাৎ মজা করে বলে,“তুমি তো ভীষণ স্বার্থপর এসপি! আমি বৌ তাই আমার কাজ তোমার লাগেজ গোছানো। গুছিয়েছি,এসব নিয়ে আমার আক্ষেপ নেই। কিন্তু তুমি ইদানীং শুধু মেয়েদের ব্যাপারটাই খুব সুন্দর বুঝে নাও। আমি নেই সেখানে। ভেরী ডিসাপয়েন্টিং। আগে হলে আমার ছোট থেকে ছোট ব্যাপারগুলো কি সুন্দর দেখে দিতে!”

মুঈন ইশির কথার জবাব না দিয়ে চোখ দিয়ে মেয়েদের সাথে দুষ্টুমি করছে,খেলছে। আরচোখে ঠোঁট ফুলিয়ে থাকা ইশিকে একঝলক দেখে ধীরে ধীরে বলে,“শাড়ি তিনটা আছে ব্যাগে। ওখানে গিয়ে কোথাও ঘুরতে গেলে যাতে পরতে পারো। ব্লাউজ ম্যাচিং নিয়েছি। সালোয়ার স্যুট পাকিস্তানি তিনটা নিয়েছি,সাদা,জলপাই আর পিংক। পার্পল আর ভেলভেট রেড নাইটি দু'টো নিয়েছি, পাজামা সেট নিইনি। তোমার চারটা টিশার্ট,চারটা পাজামা নিয়েছি। ওড়না নিয়েছি চারটা, আমি যেন দেখিনা ওড়না ছাড়া হাটা হয় ভাইদের সামনে। তুমি চমৎকার দুটি কন্যা সন্তানের মা,এটা ভুলে যেয়ো না। জুতা নিয়েছি স্লিপার তিন জোড়া। আর...তোমার ব্যাগের পাশের পকেটে..”

একটু থেমে মুঈন মুখটা বাড়িয়ে দেয় ইশির কানে। কিছু একটা বলে। শুনে ইশি লজ্জায় মুখ চেপে হাসে। মুঈন গম্ভীর গলায় বলে,“আরো ছোটো ছোটো ব্যাপার গুলো দেখেছি কাল শেষ রাতে। এর থেকেও ছোটো ব্যাপার গুলোর কথা বলবো? তোমার ব্যাগের থার্ড পকেটে আমার কিনে দেয়া সেই ব্ল্যাক.....”

ইশি মুখ চেপে ধরলো মানুষটার। দাঁত চেপে বললো,“অসভ্যর সর্দার হয়েছো।”

_আরে তুমিই না বললে তোমার ছোট ছোট ব্যাপারগুলো আমি আর আগের মতো দেখিনা। তো ব্যাগের ভেতর ছোট ছোট সবকিছুই আছে, যেগুলো আমার পছন্দের! আমি রাতে দেখে দিয়েছি। তবে বেশ ভালো করে দেখবো তুমি পরে সামনে এলে। ছোটো ছোটো ব্যাপার, আমি ভীষণ মরে যাচ্ছি দেখার জন্য ইশি!

ইশি এসব আর নিতে না পেরে দুম করে মুঈনকে একটা আদুরে কিল মেরে উঠে দাঁড়ায়। উঠে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ে নিতে নিতে দেখলো মুঈন ফাজলামি বাদ দিয়ে কিছু টাকার হিসেবে ব্যস্ত। ইশি সংকোচ নিয়ে জানতে চাইতেই মুঈন গম্ভীর গলায় বললো,“মেজো বাবার বন্ধুর একটা প্লট আছে গাজীপুরে । ওটা কিনতে চাচ্ছি। অ্যাকাউন্ট গুলো চেক করছিলাম। ঐ প্লটটা দেখবো গিয়ে।”

_হঠাৎ জমি?

মুঈন তাকালো,
_আমার পরিবার কি এভাবেই ভাসবে যেভাবে আমি বড় হয়েছি? আমি একটা চমৎকার বাড়ি করবো। তুমি কাজ করে হাঁপিয়ে গেলে, আমি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে নিলে বাচ্চাদের নিয়ে ওখানে গিয়ে উঠবো।

ইনশিরাহ চুপ করে তাকিয়ে আছে মুঈনের দিকে। মুঈন তার মেয়েদের সাথে খেলতে ব্যস্ত।

“তোমরা জানো সেই বাড়ি থেকে তোমাদের বিয়ে দেবো আমি। তারপর তোমাদের মাম্মা আর আমি থাকবো ওখানে। অবশ্য যদি সে থিতু হতে চায়। যদি সে মনে করে,নাহ এখন উপার্জন টুপার্জন ছেঁড়ে একটু ফুলটাইম গিন্নি হই। এখন একটু হাতের ল্যাপটপ সরিয়ে স্বামীর কোলে চেপে বসে থাকি সারাদিন। বুড়ো বয়সে আমাদের খুব বেশি টাকার দরকার পরবে না আই থিংক!”

ইনশিরাহ হাসছে এই চমৎকার দৃশ্যটি দেখে। আল্লাহ দেয়ার বেলায় ওকে শুধু দিয়েই চলেছে। ওর সামনে এই লোকটা আর তার হাতে খিলখিলিয়ে হাসতে থাকা দু'টো ফুলকে দেখে টের পাচ্ছে সে।

_______

প্রেরণা ছিল একটু অসুস্থ। সকাল থেকে রিতু বহুবার আপত্তি তুলেছিল এই অবস্থায় প্রেরণাকে জার্নি করতে দেবে না সে। বাড়ির বড়দের সকলের একই মত। প্রকাশ্যে না বললেও সবার এক কথা,“প্রেরণা না গেলে হয়না?”

ইহানও গাইগুই করছিলো। বারবার ছোটোদের কাছে এসে বোঝানোর চেষ্টা করলো,“দ্যাখো সে এমনিতেও নিড়িবিলি মানুষ। তোমরা গিয়ে লাফালাফি করবে,সে বসে থাকবে সুই সুতা আর তার কুশিকাটার কাজ নিয়ে। ওনার যাবার দরকার নেই অসুস্থ শরীরে।”

তবে সবার জেদের কাছে ওসব কথা আর টিকতে পারেনি। তাদের একটাই কথা,ভাবীমনিকে একটুও কষ্ট পেতে দেবে না তারা। ইনশিরাহ ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ,আচাড় থেকে শুরু করে যাবতীয় যা কিছু প্রয়োজন শেহার সাথে মিলে ঠেশেঠুশে বাক্স ভরেছে। প্রিতম সকালে গিয়েই সুপার মার্কেট থেকে প্রেরণার পছন্দের আইটেম গুলো ফ্রোজেন কিনে এনেছে, যেগুলো রেডি টু কুক।

প্রেরণা ইহানের পাঞ্জাবি ইস্ত্রি করছিল ঘরে। ইহান সবার সাথে যাবে না। তার নয়টায় একটা পথসভা শেষ করে তারপর যাবে। শুদ্ধ ইহানের কোলে বসে প্ল্যান করছে তিনদিনের ভ্যাকেশনটা কিভাবে কাটাবে।
সকাল থেকে মাম্মার আশেপাশে ঘুরঘুর করলেও সুখবরটি জানানো হয়নি তাকে। প্রেরণার বারণ,“ছোটো বাচ্চা। রাজ্যের প্রশ্ন শুরু করে দেবে। এতো জলদি জানিয়ে কাজ নেই!”

বড়দের কাছে বিদায় নিয়ে ওরা নামলো ঠিক আটটা নাগাদ। তিন ঘণ্টার জার্নি। আলো রিতু খুব করে সাবধান করছে সবাইকে,গাড়ি যাতে আস্তে চালানো হয়। সবাই একসাথে মাথা ঝাঁকিয়ে বলেছে,“যথা আজ্ঞা,যথা আজ্ঞা!”

গাড়িগুলো গেটের বাইরে যেতেই সদরদরজা আটকে দিল ওরা। ঘরে ঢুকে দেখলো সামিন লুডো কোর্ট নিয়ে বসেছে। পরী চা বানিয়ে আনলো। সামিন আলোকে দেখে বললো,“ওরা তো ওদের আনন্দে ব্যস্ত। আমরা বড়রা এই কদিন কি করবো? এসো লুডু খেলি। সেই আগেকার দিনের মতো। এখন আমাদের লুডু খেলার বয়স।”

আলো সত্যি সত্যি বসলো। তবে লুডোতে আর মন বসলো না ওদের। বাড়িটা ফাঁকা, ওদের অবচেতন মন বিষন্ন। ইশমাম বলে,“সবাই কত করে বললো ওদের সাথে যেতে। আমার ক্লাস নেই, তোমাদের অফিস নেই। গেলেই পারতাম কি বলো?”

চলমান....

[ ২য় অংশের লিংক কমেন্টে ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে
#সারপ্রাইজ_পর্ব [ ২য় অংশ ]

[ ২য় অংশ ]

গাজীপুরের এই বাগান বাড়িটা সামিনের বাবা ইমতিয়াজ মির্জার করা। কোনো ছোটখাটো জমিদার বাড়ির থেকে কম নয়। যদিও ডিজাইন পুরোটাই সাবেকিই ‌।
বাড়ির ছেলেমেয়েদের কাছে বাড়িটা ভীষণ পরিচিত হলেও বাড়ির নতুন জামাই , নতুন বৌদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি জায়গা এটা। ওরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বিস্তীর্ণ প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাসাদ সমতুল্য বাড়িটা দেখছে।

কেয়ার টেকাররা এক এক করে লাগেজ বের করছে গাড়ি থেকে। বাকিরা নেমে বিস্তীর্ণ আঙ্গিনায় হাঁটাহাঁটি করছে। ইচ্ছে-খুশি গরমে কাঁদছিল। মুঈন আর শেহা বাগানে তাদের হাওয়া খাওয়াচ্ছে কোলে নিয়ে।

প্রণমি একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে,শুদ্ধ এসে প্রণমির হাত ধরে টানলো তখন। ভীষণ উচ্ছ্বসিত সে। ডেকে উঠলো,“খালামনি খালামনি এখানে একটা ঝর্না আছে।”

ইরফান এসে খপ করে শুদ্ধর থেকে প্রণমির হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,“কিরে ব্যাটা? কি বলছিস?”

_খালামনিকে ঝর্নার কথা বলছি।

_এটা খালুর কাজ বেটা। তুই গিয়ে তোর মাকে দেখভাল কর যতক্ষণ না তোর আব্বু আসছে। যা।

শুদ্ধ ভারী অবাক হয়ে বললো,
_মাম্মার কি হয়েছে? মাম্মাকে কেন দেখবো?

প্রণমি পাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বলে,“ওকে বলবেন না এখন ‌। আপু রাগ করবে।”

ইরফান বললো না, তবে ঝুঁকে শুদ্ধকে বললো,“মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত তাই দেখবি, যা ভাগ।”

শুদ্ধ ইদানিং চাচার সাথে দুষ্টুমি করতে শিখেছে। চোখ ট্যারা করে ভেংচি কেটে চলে যায় বাচ্চাটা।

ইরফান ঘুরিয়ে নেয় প্রণমিকে,বলে,“শুদ্ধ ঝর্ণার কথা বলছিল? শোনো আমি তোমাকে বলি, ঝর্ণার রং পানি রঙের। পানি চেনো প্রণো?”

প্রণমি জোরে জোরে হাসে,“না তো। চিনিয়ে দিন।”

_জো হুকুম!

ইরফান হঠাৎ মেয়েটিকে কোলে তুলে নিয়ে এগিয়ে গেলো ঝর্নার নিচে। ভিজতে লাগল ওরা। প্রণমি চেচাবার,চমকাবার সময়টুকু পেলো না। সাদা মুখটা নিয়ে লুকিয়ে আছে ইরফানের বুকে। ধিমি আওয়াজে গজরাচ্ছে,“ছাড়ুন বলছি। বড়রা যদি দেখেছে তো খবর আছে আপনার বলে দিলাম নির্লজ্জ কোথাকার।”

_বড়রা দেখছে না। মুঈন আর উজ্জ্বল ভাইয়া ওপাশে হাঁটছে। ভাবীমনি শুদ্ধকে তেঁতুল পাতা চেনাচ্ছে। ইশি ওর মেয়ের ডায়পার চেক করে দেখছে পটি করেছে কিনা। তবে তোমার ভাইটা দেখছে। ড্যাবড্যাব চোখে। ওর আদরের বোনটি ওর শত্রুর কোলে, এখনো বুঝি ওর বুকটা ছ্যাত করে ওঠে এসব দেখলে। আহারে!

প্রণমি ভাইয়ার নাম শুনে প্রাণ লাগিয়ে দেয় কোল থেকে নামতে। এমন বেলাজ নাকি সে? কিন্তু শক্ত বাঁধনের কাছে ও নিতান্তই নাজুক। হতাশ হয়ে অস্ফুটে বলে,“ভাইয়া মাইন্ড করবে! প্লিজ নামান!”

প্রিতম মাইন্ড করলো নাকি ওর মুখ দেখে বোঝা গেলো না। ও ঝর্নার নিচে ভিজতে থাকা বোন আর ভগ্নিপতির থেকে চোখ সরিয়ে পাশে তাকিয়ে ইনুর মুখটা দেখলো। ইনুর চোখ দু'টো ভাই ভাবীর খুনসুটি দেখে চকচক করছিল খুশিতে। প্রিতম চুপচাপ কিছুক্ষণ দেখে বললো,“তুমিও ভিজতে চাও? কোলে নেবো?”

ভ্রু কুঁচকে ফেললো ইনু,নাক সিটকিয়ে বললো,“দরকার নেই এখন আমার ভাইয়ের সাথে প্রতিযোগিতা করে আমাকে ভেজাতে। ভালোবাসলে আগেই বলতে আমাকে।”

প্রিতম ঠান্ডা চোখে নাক কপাল কুঁচকে থাকা ইনুকে আরো কিছুক্ষণ দেখে খপ করে কোলে তুললো ওকে। হাঁফ ছেড়ে বাগানবাড়ির পুকুরের দিকে নিতে নিতে বলল,“চলো তবে তোমার ভাইয়ের থেকে ইউনিক কিছু করি।”

________

শেহা নিয়েছে দোতলার উত্তর পাশের ঘরটা। গাড়ি থেকে নেমে বাড়িতে ঢুকে কেয়ারটেকারের বানানো শরবত খেয়েই সর্বপ্রথম ও ওর এই প্রিয় ঘরটাতে এসে সবকিছু চেক করে নিলো। আগে থেকেই বলা ঘরটি পরিষ্কার করতে।
উজ্জ্বল আজ না চাইতেও ভারী ব্যস্ত। বারবার ফোন আসছে আজ তার। সেই জার্নিপথ থেকে একটার পর একটা আসছে। রীতিমত ক্লান্ত হয়ে ঘরে ঢুকে সে গোসলের উদ্দেশ্যে নিজের লাগেজ খুললো। পর পর শেহাকে ডেকে বলল,“শ্রাবন্তী তুমি ভুল করে আমার তোয়ালে নাওনি। তোমার কাছে এক্সট্রা তোয়ালে থাকলে আমাকে দাও প্লিজ। অথবা তোমারটাই দাও প্লিজ!”

শেহা ভীষণ অবাক চোখে মিনিটখানেক চেয়ে থেকে বললো,“প্লিইইজ?এতো ফর্মালিটিজ? এমন বিদেশি চর্চা আমার সাথে দেখাবেন না প্লিজ। মাঝেমাঝে ভীষণ রাগ ওঠে আমার, নেহাত আমি শান্ত গোছের মেয়ে দেখে টের পাননা।”

উজ্জ্বল হেসে ফেলে বসলো বিছানায়। শার্টের ওপরের বোতাম টা খুলতে খুলতে বললো,“মজা নয়। তবে ফর্মালিটিজ কিন্তু একটা সভ্য চর্চা।”

শেহা সরু চোখে মিনিট খানেক চেয়ে থেকে চপল পায়ে এগিয়ে গেলো। বললো,“সৌজন্যতা সভ্য চর্চা? স্বামী স্ত্রীর মধ্যে?”

_হু।

_আচ্ছা তবে এখন থেকে আমিও করবো। আচ্ছা আমি এখন আপনার কোলে বসতে পারি প্লিজ?

উজ্জ্বল হাসতে লাগলো শেহার রাগ দেখে, দাঁত বের করে বললো,“এটা সুন্দর ছিল। জী পারেন।”

শেহা রাগ বাড়িয়ে কোলে চেপে বসে উজ্জ্বলের গলা জড়িয়ে ধরে বললো,“আমি এখন আপনাকে একটা চুমু খেতে পারি প্লিজ?”

_জি পারেন‌।
হাসে উজ্জ্বল সশব্দে।

_চুমুটা যদি শক্ত হয় আপনি রেগে যাবেন প্লিজ?

উজ্জ্বল হাসতে হাসতে ভেঙে পরছে এইবার, শেহাকে স্বপ্নালু চোখে দেখতে দেখতে বলছে,“জি পারেন। আর হ্যা,অনেক কিউট লাগছে আপনাকে। সৌজন্যতা আসলে কিউট! করা উচিত আমাদের!

শেহা দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে আছে। উজ্জ্বল হাসি থামায়,ওর নাক টিপে দিয়ে হঠাৎ বলে,

_আপনি এখন দরজাটা একটু লাগিয়ে আসবেন প্লিজ?

শেহা চমকায়,পর পর রাগ সরিয়ে লজ্জায় লাল মুখটা ঘুরিয়ে নেয় ‌। উজ্জ্বল উঠে দাঁড়িয়ে দরজার সিটকিনি তুলে দিতে দিতে বলে,“এখন একদম গাইগুই করবেন না প্লিজ। তাহলে আমি ভীষণ কষ্ট পাবো প্লিজ। আমার মনটা ভেঙে যাবে প্লিজ। সারাদিন ব্যাথাতুর মন নিয়ে ঘুরঘুর করতে হবে প্লিজ।”

_______

টানা ঘন্টা ভিজে ইরফান প্রণমিকে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকলো। অবশ্য প্রেরণা বকা দিয়েছিল তাই। নয়তো ওরা আরো ভিজতো। প্রণমি ঠকঠক করে কাঁপছিল। এই বাগান বাড়ির হলঘরটা সুবিশাল। প্রেরণা এসেই বাবুর্চিদের কাছে গিয়ে রান্নার মেন্যু জেনে প্লেট সাজাচ্ছে ডাইনিং হলে। ইশি আর ইনু সাহায্য করছে তাকে। খিদেয় সবার অবস্থা বেহাল।

প্রণমিকে দেখে প্রেরণা আবার ধমক দিলো,“এখনো পাল্টাসনি জামা?”

_আমাকে বকছো কেন? আমি কিছু করেছি? যে করেছে তাকে বকতে পারো না?

প্রেরণা একপলক ইরফানকে দেখে। মুখখানা এমন যেন কিছুই করেনি সে‌।‌ প্রেরণা ভাবে এরা দুইভাই এতো বিপরীত কেন স্বভাবে? একজন অতি দস্যি একজন অতি ডিসেন্ট। ভাবতে ভাবতে হেসে প্রেরণা ফোন হাতে নেয়, সকাল থেকে এই নিয়ে আটবার কল দিচ্ছে ইহানকে। মানুষটা ধরছে না। এতো ব্যস্ততা এখুনি দেখালে সামনের দিনগুলো খুবই ভয়াবহ। একটু যেন মন খারাপ হলো ওর।

ইরফান প্রণমিকে নিয়ে দোতলায় উঠলো। ওদের জন্য বরাদ্দ দোতলার পুব পাশের ঘরটি। ঘরে ঢুকিয়ে ইরফান প্রণমিকে বললো,“একটু দাঁড়াও। আমার লাগেজটা দিতে ভুলে গিয়েছে সম্ভবত। ওটা নিয়ে আসি। বিছানার ওপর তোমার সালোয়ার স্যুট আছে,তুমি বরং চেঞ্জ করে ফেলো।”

প্রণমি মাথা নাড়ে। তবে ইরফান চলে যেতেই ও টের পায় একটা অসুবিধা হয়েছে, এই ঘরের সিটকিনিতে ঝামেলা। ওদিকে ইরফান আসছে না। এদিকে ওর কাঁপুনি থামছে না ভেজা কাপড়ে। হঠাৎ টের পেলো বাইরে শুদ্ধ বল নিয়ে খেলছে। ও ডাকলো,“শুদ্ধ তুমি ওখানে?”

শুদ্ধ এগিয়ে যায় বল নিয়ে,“হু খালামনি।”

প্রণমি বলে,“বাবা আমি দরজা আটকাচ্ছি,ড্রেস চেঞ্জ করবো তো। তুমি একটু বাইরে পাহারা দাও কেমন? কেউ এলে ঢুকতে দেবেনা হুট করে। বুঝেছো?”

শুদ্ধ মাথা নাড়ে,সে বুঝেছে। প্রণমি দরজা ভেজিয়ে দিল। খানিক বাদে লাগেজ নিয়ে এলো ইরফান। শুদ্ধকে দুই হাত মেলে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু উচালো,“ব্যাপার কি?”

শুদ্ধ বললো,“কেউ ঢুকতে পারবে না। আমার খালামনি ড্রেস চেঞ্জ করছে।”

ভেজা চুল খামচে ধরে ইরফান হেসে বললো,“আমি পারবো।”

_না এটা ব্যাড ম্যানার।

শুদ্ধ তার জেদে অটল। ইরফান বাচ্চাটার ঘাড় চেপে ধরে আদুরে হাতে ওপরে তুলে সরিয়ে দেয় দরজা থেকে,চিবিয়ে বলে,“ওরে ম্যানার্সের বাচ্চা। এই ম্যানার্স তোর বৌয়ের জন্য তুলে রাখ। আমাকে ডিস্টার্ব করিস না। আচ্ছা শোন, তুই তোর মামার ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ জ্বালিয়ে আয়।”

শুদ্ধ ইরফানের কোনো কথাই শুনছে না। খালামনি তাকে একটা আদেশ দিয়েছে সে জান প্রান দিয়ে হলেও সেটা পালন করবে ‌। আবার তেড়ে এসে দুই হাত মেলে দিয়ে বলে,“খালামনি বলেছে তার ঘরে ঢোকা যাবে না ‌”

_আরে আমি ঢুকতে পারবো রে বাপ। লাইসেন্স আছে। সেটা বাড়িতে ফেলে এসেছি। তুই সর,আমি ঠান্ডায় কাঁপছি।

_না।

মূহুর্তেই দু'জনের মধ্যে আদুরে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল। নিচতলা থেকে মুঈন,প্রেরণা, ইনশিরাহ ছুটে এসে অবাক হয়ে দেখতে লাগলো ওদের। শুদ্ধ তখন মাম্মাকে বলছে,“মাম্মা দেখো চাচ্চু খালামনির ঘরে জোর করে ঢুকছে,খালামনি ড্রেস চেঞ্জ করছে। বলো এটা ব্যাড ম্যানার না?”

প্রেরণা ছুটে এসে বাচ্চাটার মুখ চেপে ধরে সরিয়ে নিলো। মুঈন বহু কষ্টে হাসি চেপে রেখে মেয়েদের নিয়ে সটকে পড়ে সেখান থেকে। বাকিরাও চলে যায়।

ইরফান শ্বাস ফেলে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখলো প্রণমি দেয়ালের সাথে মিশে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা তার লাল। মেয়েটি এতক্ষণ সবটাই শুনেছে। হাসছে লজ্জায়। ইরফান ওকে দেখে আরেকটু লজ্জা পাইয়ে দিতে বলতে শুরু করল,“প্রণমি! ইয়া আল্লাহ! আমি সবকিছু দেখে ফেলেছি প্রণমি! প্রণমি ভুল করে ঢুকেছি বিশ্বাস করো! প্রণমি,শুদ্ধর খালামনি! এ আমি কি সর্বনাশ করে দিলাম তোমার? এবার কি হবে প্রণমি? এবার আমার কি শাস্তি পাওয়া উচিত? প্রণমি তুমি মামলা দেবে নাতো?”

মুখটা চেপে ধরে প্রণমি হাসছে। ওর খিলখিল হাসি ঝংকার তুলেছে চার দেয়ালে। ইরফান গিয়ে মাথা নেড়ে ভেজা চুলের পানি ছিটিয়ে দেয় মেয়েটার মুখে, ঘন স্বরে বলে,“প্রণমি আমাকে ক্ষমা করো। আমি সর্বনাশ করে দিলাম তোমার। প্রণমি! প্লিজ তোমার ইরফান মির্জাকে ক্ষমা করো।”

_______

ইহান দুপুর গড়িয়ে খেলেও সমাবেশ থেকে ফিরতে পারলো না। এই নিয়ে প্রেরণা বাদে বাকিদের খুব রাগ হলো। সবাই চেয়েছিলো লাঞ্চ সেরে বিকেলে বরশী নিয়ে বাগান বাড়ির বড় পুকুরে মাছ ধরার প্রতিযোগিতায় নামবে। ইহানের অনুপস্থিতিতে তা আর হলো না ঘটা করে। ভাত খেয়ে দুপুরে ঝিমিয়েছে কেবল সবাই। আসরের দিকে বাগানে ঘোরাঘুরি করে ফটোশুট করেছে।

সন্ধ্যার পরে সান্ধ্য নাস্তাটা প্রেরণা নিজের হাতে বানালো। শরীরে অবশ্য খুব একটা জুত নেই। ওরা অবশ্য হাতে হাতে সব এগিয়ে দিয়েছে। ঠিক রাত নয়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরে প্রেরণা এসে বললো,“সবাইকে খেতে দিয়ে দাও ইশি। তোমার দাদান সত্যিই খুব ব্যস্ত বোধ হয়। দেখলে ফোন ধরছে না।”

ইশি দাদানের ওপর মেজাজ দেখিয়ে সবাইকে খেতে বসালো। খাওয়ার পাঠ চুকিয়ে সবাই যে যার ঘরে ।‌ প্রেরণা বসে থাকলো একা। বাগান বাড়ির সদর দরজার দিকে ওর উতকন্ঠিত দৃষ্টি। এতক্ষণে ফরসা মুখটা দুশ্চিন্তায় লাল লাল হয়েছে। ও পলকহীন তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। যেন কোনো পাথুরে মূর্তি ও।

ঠিক রাত এগারোটায় সদর দরজার কড়া নড়ে উঠলো যখন, প্রেরণা লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। ছটফটিয়ে উঠে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে আনত নয়নে চেয়ে থাকলো পরিশ্রান্ত, ঘর্মাক্ত সুন্দর মুখটার দিকে। ওর বুকের ক্রমবর্ধমান উথালপাথাল উৎকণ্ঠা কমে এলো। এবার একটু সহজ হাসি দিয়ে বললো,“ওরা আপনার ওপর খুব রাগ করে ঘুমাতে গিয়েছে । ”

_আপনি রাগ করে ঘুমাতে গেলেন না কেন?

_কারণ আমার তুচ্ছ কারণে রাগ আসে না।

প্রেরণা দরজা আটকে দেয়, ইহানকে বলে মুখ হাত ধুয়ে আসতে,ওর চেহারা থেকে মলিনতা সরছেই না,ইহান তা বেশ খেয়াল করেছে।
______

ঘরের দরজা বন্ধ করেই ইনুর মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো বিছানার ওপর এক গাদা বই দেখে। প্রিতম ফোন টিপছে পায়ের ওপর পা তুলে শুয়ে। ইনু দরজা বন্ধ করে দিতেই ও শান্ত গলায় বলল,“বড় দাদান এসেছে সম্ভবত গাড়ির শব্দ পেলাম। আচ্ছা এখন আর বেরিয়ে কাজ নেই।‌ উনি বিশ্রাম নিক। তুমি এসো ইনু,একটু পড়বে।”

ইনায়া ভীষণ মেজাজ খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইল। প্রিতম ওসব পাত্তা না দিয়ে ওর চোখে চোখ রেখে বললো,“এই সময় গুলো আর পাবে না ইনু। ইট ইজ দ্য টাইম! এই সময়ে আমি বই ছাড়া কিছুই বুঝতাম না।”

ইনু চুপ করে থাকলো কিছুক্ষণ,পরপর গম্ভীর গলায় বললো,
_আর এই সময়গুলো পাবো? যে সময়গুলোতে আমাদের একটু সময় কাটানোর কথা,মজা মস্তি করার কথা। এই সময়গুলো আবার ফিরে পাবো লেখাপড়া করে সেটেলড হবার পরে? তুমি কাজ নিয়ে নিজে ব্যস্ত থাকো,আমাকে পড়াশোনা নিয়ে বিজি রাখো। এতো কেন প্রিতম?
অথচ প্রেমিক তুমিটা কত সফট বয় ছিলে। বলো, এই সময়টা পাবো আর দাম্পত্য উপভোগ করতে? এক্সেস করছো তুমি!

প্রিতম চোখের চশমা ঠিক করে অবাক হয়ে ইনুর মুখের দিকে তাকায়। অভিমান গাঢ় ইনুর। প্রিতম ধীরে ধীরে বললো,“এই সময় গুলো অবশ্যই আবার পাবো। তুমি নিজের পায়ে দাঁড়ালে,আমি আরো সফল হলে। দু'জনের একটা ওয়েল পলিশড ক্যারিয়ার হবার পরেও যদি আমার ইনুটা এমন হাবলি হয়েই থাকে তবে এই সময়গুলো বারবার আসবে আমাদের জীবনে। এইযে তোমাকে পড়াতে বসাই! আমার কতটা আদর লাগে তোমাকে পাশে বসিয়ে জানো? আমরা বলি তো থিওরির কথা, কিন্তু আমার মাথায় থাকে এক লোকের মেয়েকে আমি জেদ দেখিয়ে বিয়ে করেছি তার মুখ রাখতে হবে এই মেয়েটিকে যত্ন করে। এসো পড়তে এসো ইনু‌। সময়ের কাজ সময়ে করা উচিত। তর্কাতর্কি ভালো লাগে না।”

ইনুর রাগটা একটু থিতু হলেও অভিমান রয়ে যায়। ও নিজমনে ভেংচি কেটে বলে,আচ্ছা আসছি তবে।

প্রিতম ফোন সরিয়ে রেখে বইয়ের পাতা ওল্টাতে থাকে। সময় গড়ায়। ইনুকে উঁচু গলায় আবার ডাকতে হয় প্রিতমের। ইনু আসে, তবে একটা নাইটি পরে এসে দাঁড়ায় সামনে।

প্রিতম চোখ তুলে তাকাতেই ধাক্কার মতো খায়। নির্নিমেষ চেয়ে থেকে ঢোক গিলে বলে,“এখন আবার এসব কেন?”

ইনু কাঁধ ঝাঁকিয়ে কিছু না বোঝার ভান করে বললো,“কিসব কেন? এখন তো পড়ার সময়। সময়ের কাজ সময়ে করা উচিত। চলো পড়াও আমাকে!”

গাঁয়ে মাথা ঝিমঝিম করা মিষ্টি পারফিউমটা মেখেছে ইনু। প্রিতমের গা ঘেঁষে বসলো ও ইচ্ছে করে। মুখে পৈশাচিক হাসির ছটা। প্রিতম ঢোক গেলে। কাঁপা হাতে বইটা মেলে হাঁসফাঁস করে দুই লাইন বলতে গিয়ে পাঁচবার আটকায়।

ইনু আরেকটু ঘেঁষে বসে হাসলো নিশ্চুপে,বললো,“কি হলো? পড়াও? সময়ের কাজ সময়ে করো প্রিতম?”

প্রিতম দফায় দফায় ঢোক গিলছে। বেশিক্ষণ আর সামলে রাখতে পারলো না নিজেকে। সামনের বই গুলো দুইহাতে তুলে নিয়ে আদুরে গলায় বলল,“আচ্ছা ইনু,বই সরিয়ে এসো।”

_না আমরা পড়বো।
ইনুর গলায় তেজ।

_প্লিজ এসো। বারান্দায় যাই। গল্প করি? এতো পড়াশোনা করতে হবে না। তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে।

ইনু ধাক্কা দিয়ে সরায়,ভেতরে ভেতরে হেঁসে ফেটে যাচ্ছে ও।

_না এখন পড়ার সময়।

প্রিতম অসহায়ের মত মুখ করে তাকিয়ে আছে। ইনু কিছুক্ষণ পরে তার জেদটা আর টানতে পারলো না ঐ মুখ দেখে, আস্তে বইটা সরিয়ে,লাইট নিভিয়ে আসে। প্রিতম ওকে কাছে টেনে বলে,“আসলেই ইনু। কথাটা কিন্তু আমি সত্যি বলেছি। সময়ের কাজ সময়ে করা উচিত।”

_______

প্রণমিকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একদম বাগানের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল ইরফান। রাত্তিরে ভেতরে থেকে বাইরের আবহাওয়া চমৎকার। ইরফান মির্জার হাতের মুঠোয় প্রণমি নিজের তুলতুলে হাতটা দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে হাঁটছিল পাশাপাশি। ইরফান ওকে রাত্তির বেলা বাগানের চারপাশের বর্ণনা দিচ্ছে। হঠাৎ প্রণমিকে ঘাষের ওপর বসিয়ে ওর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরলো ইরফান। প্রণমি চুল টেনে দিতে লাগল ইরফানের। দূরে কোথাও হঠাৎ ডানা ঝাপটানোর আওয়াজে প্রণমি কিঞ্চিত চমকে উঠে বলে,“ওটা কি?”

_পেঁচা।

_পেঁচা? আমি না পেঁচা দেখিনি।

প্রণমির মন খারাপ করে বলা কথাটি শুনে ইরফান ওর হাত দু'টো ধরলো, বললো,“তো কি হয়েছে? আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।”

_কিভাবে? এখন কিভাবে?

ইরফান দুষ্টু হেসে প্রণমির হাত দু'টো নিজের মুখে ছুঁইয়ে দিতে দিতে বলে,“পেঁচা ঠিক এমন দেখতে। ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখো প্রণো।

জোরালো হাসিতে ফেটে পরে প্রণো। ইরফান চেয়ে চেয়ে কিছুক্ষণ সেই হাসি দেখে, হঠাৎ বলে ওঠে,“আমরাও বাচ্চা নেবে প্রণো?”

হাঁসি থামায় প্রণো। আচমকা মুখ থেকে ওর সমস্ত চঞ্চলতা ঢাকা পরে মলিনতার আস্তরণে। ইরফান উঠে বসে মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করে। তারপর নিচু স্বরে বলে,“কি হয়েছে প্রণো? আমি কি ভুল সময়ে চাইছি? ঠিক আছে তবে সময়..... এই আমি যাস্ট মজা করে বলেছি কিন্তু!!”

প্রণমি জবাব দিলো,
_ভুল সময় নয়। তবে....তবে শুধু আমি পেটেই ধরতে পারবো। পালতে আর পারবো না ইরফান মির্জা!

প্রণমি বলে যেতে থাকে উদাস গলায়। ইরফান ওর উদাসীনতার টুটি চেপে ধরে ওকে কোলের কাছে টেনে ছটফটিয়ে বলে,“অ্যাই! আমি আছি কেন তবে? তুমি কি আস্থা হারালে আমার ওপর থেকে?”

প্রণমি ইরফানের গাল দু'টো ছুঁয়ে নিজের মুখভঙ্গি সহজ করে পরিবেশের গুরুগম্ভীরতা কাটাতে বলে,“না না। এ কেমন কথা?"

_তবে? আমরা বুঝি বাচ্চা নেবো না কখনো?

_আরে আপু বলে,এখুনি নয়। তিন চার বছর সময় নিতে।

_কেন কেন?

_কারণ আপনার নাকি এখনো বাচ্চা পালার মতো বুদ্ধি শুদ্ধি হয়নি।

প্রণমি বলেই মুখ চেপে ধরে হাসছে। ইরফান ভ্রু কুঁচকে ফেলে তৎক্ষণাৎ,বলে,“এটা ঐ জ্ঞানী ভাবী মনি বলে?”

_হুম।

ইরফান শ্বাস ফেলে। হালকা করে ক্ষেপেছে সে, বলে,“এজন্যই বলা হয় বিয়ের পরে বৌকে তার বাপের বাড়ির লোকের সাথে মিশতে দিতে নেই। উল্টোপাল্টা ঢুকিয়ে দেয় মাথায়। অবশ্য আমি তো বৌয়ের বাপের বাড়ির লোক নিয়েই বাস করি। এই তোমার আর তোমার বোনের ধারণা আছে আমার ক্ষমতা সম্পর্কে? দেখতে চাও বাচ্চা পালার মতো বুদ্ধি হয়েছে কিনা?”

_আরে আপু নরমাল একটা কথা বলেছে,আপনি এতো ক্ষেপে যাচ্ছেন কেন? আমি দেখতে চাইনা এখন।

ইরফানের জেদ উঠে,বলে,“বাচ্চা পালা কি খুব কঠিন কিছু নাকি যে শুধু মায়েরাই পারে। বাবারা এক হাতে পারে না?’

_জি পারে। এখন থামুন।

ইরফান থামে না,হাত বাড়িয়ে খপ করে প্রণমিকে টেনে কোলে নিয়ে বলে,“এইতো এইভাবেই সারাদিন কোলে নিয়ে বসে থাকবো। মাঝেমাঝে একটু দোলদুলাবো। দেখলে ঠিক এমন!”

ইরফান সত্যি সত্যি প্রণমিকে দোলদোলায়। প্রণমি হাসে ঠোঁট চেপে। ইরফান বলে,“আর এরপর, এরপর যখন বাবুর খিদে পাবে। ও দুধ খেতে চাইবে,তখন....

_তখন?

ইরফান প্রণমিকে কোলে নিয়েই উঠে দাঁড়ায়। একটা ছুট লাগিয়ে হেসে ফেলে বলে,“তখন তাকে নিয়ে এভাবে তোমার কাছে দৌড়ে যাবো। কারণ বাবারা তো আর খাওয়াতে পারবে না!”

পাগল লোকটার পাগলামিতে দিশেহারা হয়ে হাসছে প্রণমি। হাসি থামিয়ে বল,“আর তারপর যখন বাবু পটি করবে তখন?”

ইরফান এইবার দমে গেলো। পটি? এটা তো মুশকিলের কাজ! ও কিছুক্ষণ ভেবে প্রণমিকে আবার ঘাসের ওপর ছেড়ে বলে,“তখন‌ আমি চেঁচিয়ে মাম্মা,বড় মা,ছোটো মা আর ভাবীমনিকে ডেকে নেবো!”

হাসছে প্রণমি। ওর হাসি বাধ মানছে না। ইরফান বসে আবার ওর কোলে মাথা রাখলো।

“থাক এখনি বেবি নিয়ে কাজ নেই। ইচ্ছে-খুশি ছোট,আপুরও বেবি আসছে। এমতাবস্থায় আমরা নিলে আমাদের পুচকু এত পুচকুদের ভিড়ে আদর যদি কম পায়?”

ইরফান হাসে,“ঠিক বলেছো, ভাগে আদর কম নেয়া যাবে না। পইপই করে বুঝে নিতে হবে আমাদের বাচ্চার আদর।”

হাসতে হাসতে স্বামী স্ত্রীতে বাগানে গড়াগড়ি খাচ্ছে ওদের আলোচনা সেরে।

ওদের দোতলা থেকে দেখছিলো প্রেরণা । তার ঠোঁটে হাসি ঝুলে আছে এক রাশ মুগ্ধতার। ইহান টিশার্ট চাপিয়ে এগিয়ে আসে। প্রেরণার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাতেই ইরফান প্রণমিকে দেখলো,পরপর বললো,“দুটো পাগল।”

_হুম, আপনার ভাইয়ের সাথে মিশে আমার বোন পাগল হয়েছে নাকি আমার বোনের সাথে মিশে আপনার ভাই পাগল হয়েছে সেটাই ভাবছি।

জানালা লাগিয়ে দিল ইহান। প্রেরণাকে ভেতরে টেনে বিছানার দিকে নিতে নিতে বলে,“অত ভেবে কাজ নেই। আপনাকে ঘুমাতে হবে।”

হঠাৎ পাশের ঘর থেকে ইচ্ছে খুশির কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। খানিক বাদেও যখন কমছিলো না তখন চিন্তিত ভঙ্গিতে প্রেরণা ইহান এগিয়ে যায়। দরজা হালকা ভেজানো দেখে ওরা ঘরে ঢুকতেই দেখে ইচ্ছে খুশি ঘরে একা।
দু'জন গিয়ে দু'জনকে কোলে তুলে কান্না থামাতে চায়। তখনই ঘরে হুরমুরিয়ে ঢোকে মুঈন আর ইশি। একটু ছাদে গিয়েছিল দু'জনে। দু'জনের আলুথালু বেশ। সম্বন্ধি আর তার বৌয়ের হাতে ধরা পরে ব্যাপক লজ্জায় মুঈন চোখ নামায়‌। ইশি নিজের এলোমেলো চুল ঠিক করতে ব্যস্ত,ওর ইচ্ছে করছে দাদানের সামনে মাটিতে মিশে যেতে।
ইহান চোখ নামিয়ে ইচ্ছেকে প্রেরণার কোলে দিয়ে দ্রুত চলে যায় ওখান থেকে।

ইহান যাওয়ার পরে মুঈন এগিয়ে এসে ইচ্ছে খুশিকে নিতে চাইলো। প্রেরণা দিলো না। হাসতে হাসতে বললো,“হয়েছে, ওরা আজ রাত আমাদের কাছে থাকুক।”

ইশি ঘনঘন মাথা নাড়ে,“ভাবীমনি ছাদে একটু হাঁটতে গিয়েছিলাম শুধু। দরকার নেই।”

প্রেরণা হাসছে তো হাসছেই,কথা শোনে না ইশির,উল্টো চোখ পাকিয়ে বলে,“সে ছাদে হাঁটতেই না হয় যাও। ওরা থাকুক আমাদের কাছে।”

বলেই প্রেরণা ইচ্ছে খুশিকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বেরুলো। ইশি বাচ্চাদের মতো নখ কামড়ে বলে,“দাদান কি না কি ভাবলো! কেন যে তোমার কথায় তখন ছাদে গেলাম। ধূর!”

প্রেরণার কোলে ইচ্ছে খুশিকে দেখে ইহান বলল,“আজ এখানে শোবে নাকি ওরা?”

_হ্যা, আপত্তি আছে?

_বিলকুল নেহি। আমি আমার মাম্মামদের মুতুতে মাখামাখি হয়ে ঘুমাতে পছন্দ করবো।

_আরে ডায়পার পরা ওরা। মুতুর চিন্তা নেই। বিছানার বালিশ চওড়া দিকে ঘুরিয়ে দিন, আলমারি থেকে আরেকটা বালিশ বের করুন। শুদ্ধকে ঘুরিয়ে শোয়ান।

_যথা আজ্ঞা।
ইহান সব গুছিয়ে নিচ্ছে। প্রেরণা ওকে চেয়ে দেখলো। তারপর শুদ্ধকে শুইয়ে,তার ডানপাশে ইচ্ছে খুশিকে শুইয়ে ওরা দুজন দুইপাশে শুয়ে পরলো। এভাবে খানিক সময় অতিবাহিত হতেই ইহানের যখন স্বস্তি মিলছিল না,ও উঠে বাচ্চাদের এক পাশে আলতো করে সরিয়ে রেখে নিজে মাঝে ঢুকে প্রেরণার গা ঘেষলো। প্রেরণা হেসে ইহানকে কাছে টেনে ওর চুল খামচে দিচ্ছে। ইহান আরামে চোখ বুজিয়ে নিয়ে বললো,“মুখটা আধার কেন? আমি কিন্তু লক্ষ্য করেছি আসার পর থেকে তাই মিথ্যা বলবেন না।”

প্রেরণা হাত থামিয়ে অল্প হেঁসে বলে,“ওই ক্লান্তিতে!”

ইহান তৎক্ষণাৎ ওকে ঘুরিয়ে নেয়। শক্ত হাত দু'টো ঘাড়ে রেখে মাসাজ দিতে শুরু করে বলে,“জার্নিতে এমন হয়েছে তাইনা? আপনার সয়না যে!”

_হুম।

_আচ্ছা আমি মাসাজ দিচ্ছি।

বলেই ইহান প্রেরণার পিঠে হাত বুলায়, বুলায় ওর কোমরে।‌ আদুরে গলায় বলে,“আর কোথায় লাগবে? আর কোথায়? আর কোথায়?”

বলতে বলতে ইহানের হাত চলে যায় প্রেরণার পেটে। হঠাৎ হাত থামিয়ে ও প্রেরণার পেটের কাছের শাড়ি সরিয়ে উঠে চুমু খায় সেখানটায়, অস্থির গলায় বলে,“আই যাস্ট কান্ট ওয়েট টু সি দিস পার্সন!”

এইবার আর প্রেরণা নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না। সারা সন্ধ্যার ছটফটানি নির্মোচিত হলো সামান্য খোঁচা পেয়েই। ও ইহানের গলা ধরে ফুঁপিয়ে উঠলো। ইহান হতবাক। বললো,“কি হয়েছে?”

প্রেরণা ফুপিয়েই বলে,“অতি তুচ্ছ কারণে আমার রাগ হয়না। কিন্তু অতি তুচ্ছ কারণে আমার ভয় হয়। ঘরপোড়া গোরু আমি, সিঁদুর মেঘ দেখলে আমার কলিজা কেপে ওঠে। আপনি প্লিজ সাবধানে থাকবেন। আমার কেউ নেই আপনি ছাড়া, আমাদের কেউ নেই।”

ইহান কম্পমান শরীরটা ওর প্রকাণ্ড বাহুতে লুকিয়ে ফেলে। প্রেরণা বলে যেতেই থাকে,“আপনি সাবধানে থাকবেন প্লিজ। আমি এক জীবনে দফায় দফায় মরতে চাইনা। আপনি সাবধানে থাকবেন প্লিজ।”

প্রেরণা থামছে না। ইহান শান্ত চোখে ওকে দেখতে বলে,“আমি কেন সাবধানে থাকবো? আপনি আমাকে সাবধানে রেখে দিন প্লিজ!”

বলেই ইহান মাথা রাখলো প্রেরণার বুকে। দু'জন চুপচাপ হলো। প্রেরণা চোখ মুছতেই ইহান বললো,“হায়াত আল্লাহর হাতে। আপনি শুধু দোয়া করবেন সবসময়। বাকিটা আমি, চেষ্টা করে যাবো, আমার প্রেরণা আর আমাদের বাচ্চাদের পাশে থাকার। পাগলামি করবেন না, কাঁদলে শরীর খারাপ হয়।”

ইহান উঠে পানি খাওয়ালো প্রেরণাকে। তখুনি দরজায় ধাক্কা পরলো ইনুর। দরজা খুলতেই দেখলো ফোন হাতে দাঁড়িয়ে আছে সে। ফোনের ওপাশে সামিন,বললো,“দাড়োয়ান কই? আশ্চর্য ! দরজা খোলো!”

_মানে?

_মানে আমাদের বাড়ি গেটের বাইরে।

_তোমরা না বলেছিলে আসবে না?

_এলাম।

ইহান কল কেটে গেটের চাবি নিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার আগে এক এক করে ঘুম থেকে তুলে দিয়ে যায় সবাইকে। এই বাগান বাড়িতে মাঝ রাত্তিরে চাদের হাট বসবে! প্রেরণাকে আস্তেধীরে বলে যায়,“ইশিকে ডেকে চায়ের পানি বসান সবার জন্য।”

গল্পে গল্পে চায়ের কাপের ধোঁয়া উড়বে এই মাঝ রাত্তিরে। যে গল্প গুলো কখনো ফুরাবার নয়। আরব্য রজনীর গল্প সেগুলো, এক টুকরো মির্জা পরিবারের ব্যক্তিগত গল্প।

“সমাপ্ত”

[ প্রিয় পাঠকেরা। আমার তরফ থেকে ভালোবাসা রইলো সকলের প্রতি।

আপনারা বুঝতে চেষ্টা করবেন,একসাথে এতগুলো জুটি নিয়ে গল্প গেঁথে সময় ব্যপ্তি ঠিক রেখে গল্প এগিয়ে নেয়া দুরূহ ব্যাপার। তাই এই অধ্যায়ের জার্নি এখানেই শেষ হলো।

এরপর কখনো কখনো আমি প্রতিটা জুটি নিয়ে খুচরা খুচরা কিছু লিখে আপনাদের দেয়ার চেষ্টা করবো। কিন্তু মির্জা পরিবারের সাথে আজ আপনাদের শেষ দিন। এভাবে আর একসাথে পাবেন না তাদের,পাবেন না তাদের পারিবারিক আমেজ। তবে অদূর ভবিষ্যতে আমি পুরো গল্পটা ধীরে ধীরে বসে সম্পাদনা করার পরিকল্পনা করেছি। গল্পের চরিত্রদের নিয়ে আপনাদের যার যা অভিযোগ ছিল সেগুলো হয়তো কমাবো।

ভালোবাসা নেবেন। কিছু গল্পের সমাপ্তি দেয়া যায়না। এটা ঠিক অমন। লিখলে শুধু লিখতেই হয়, লিখতেই হয়,লিখতেই হয়।

ইদ মোবারক সবাইকে।🖤]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 138 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন