#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৩৭ [ অন্তিম পর্ব ]
#ইসরাত_ইতি
[ ১ম অংশ ]
অকস্মাৎ কোনো এক অজানা বস্তু এসে প্রেরণার কন্ঠনালীতে আটকে বসে আছে। বস্তুটা ঠিক কি,প্রেরণা বুঝতে পারছে না। বস্তুটা প্রেরণাকে শ্বাস অবধি নিতে দিচ্ছে না।
দৃষ্টি জোড়া ক্রমশ বাষ্পাকূল হচ্ছে। ক্রমশ দৃষ্টি থেকে ঝাঁপসা হচ্ছে প্রেরণার হাত,আর হাতে রাখা সাদা রঙের কাঠিতে খয়েরী রঙের দু'টো চড়া দাগ। পাশেই জ্বলজ্বল করছে “পজিটিভ” চিহ্নিত লেখাটা।
সময় গড়ায়, ফোঁটায় ফোঁটায় গড়ায়। টুপ টুপ করে প্রেরণার চোখ থেকে ঝরা নোনাজল ওর বা হাতে মুছে নেয় আলগোছে, ঘন ঘন ছাড়ে শ্বাস। এই শ্বাসরুদ্ধকর অনুভূতির লুপ থেকে বেরুতে মরিয়া ও।
কাঁপা হাতটাতে তুলে নেয় ফোনটা। শ্বাস ফেলল নিজেকে সামলাতে। এই মুহূর্তে একমাত্র কাঙ্ক্ষিত নাম্বারটিতে ডায়াল করেই ফোনটা কানে চেপে ঘুরে দাঁড়ায় আয়নার সামনে।
ওপাশে রিং বেজে যেতে থাকে, আর প্রেরণা দেখে যেতে থাকে নিজেকে। নিজের ক্লান্ত, অবসন্ন তবে এই মুহূর্তে ভীষণ গোবেচারা মুখটাকে। ইশ লোকটা আরেকটু দেরী করে বাড়ি থেকে বেরুতে পারতেন না আজ? আরেকটু দেরীতে?
বেশ খানিকক্ষণ পর ইহান কলটা রিসিভ করতেই প্রেরণা শুনতে পায় ওপাশে হট্টগোল। কোথাও সমাবেশে গিয়েছে কি লোকটা? ধূর প্রেরণার সময়টা এতো খারাপ হলো কেন?
“প্রেরণা? কি হলো? কথা বলুন!”
ইহানের গলায় ব্যস্ত ভাব।
_আপনি বেড়িয়েছেন একঘন্টা আগে, এর মাঝে কই চলে গেলেন? শব্দ কিসের?
_মিরপুর আমি প্রেরণা। বলবেন কিছু?
প্রেরণা মুখটা খুলতে চাইলেও পারলো না হঠাৎ। ওপাশে মিছিলের গর্জন। শুনেই থেমে গেল প্রেরণা।
_আরে প্রেরণা বলুন, আমি শুনতে পাচ্ছি!
প্রেরণা বলে,“নাহ। আপনি শুনতে পাবেন না।”
_হোয়্যাট! শুনতে পাবো না মানে? কেন শুনতে পাবো না?
প্রেরণা হাসে ক্লান্তি নিয়ে ঠোঁটে,অস্ফুটে বলে,“আমি আপনাকে যেভাবে শোনাতে চাই, সেভাবে হয়তো এখন শুনবেন না। আজ কি ফিরতে দেরী হবে আপনার?”
_হ্যা, কেন? আপনারা ডিনার করে নিয়েন।
_হুম।
ভেতর থেকে মৃদু শ্বাস বেড়িয়ে আসে, শ্বাস ফেলে কল কেটে প্রেরণা হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পরলো বিছানাতে। বুজিয়ে নিলো দু'চোখ। তারপর, হাতটা ধীরে ধীরে টেনে নিল নিজের নরম পেটের ওপরে। হঠাৎ করেই সমস্ত শরীরটা ঝাকুনি দিয়ে উঠলো। এই দ্বিতীয় বারের মতন, আবার সেই শ্বাসরুদ্ধকর অনুভূতি। তার জীবনে দ্বিতীয় দফায় কত কিছুই ঘটেছে। ঠিক সেভাবে দ্বিতীয় দফায় তার জঠরে এসে দখলদারিত্ব নিয়েছে কেউ।
আলতো করে হাতটা বুলাতে লাগল সেখানটাতে, সে প্রেরণার জীবনে সম্পূর্ণ নতুন একজন। প্রেরণা সেই নতুন ব্যক্তিটিকে আদর করে দেয়, খুব মমতায়। চোখ ভিজে ওঠে প্রেরণার আদর করতে করতেই।
শুদ্ধ দরজায় দাঁড়িয়ে মাকে ওভাবে শুয়ে থাকতে দেখে অবাক চোখে। মাম্মা কি অসুস্থ? ছেলেটা এতটুকু হলেও মাম্মার ব্যাপারে খুব দায়িত্বশীল। ছুটে গিয়ে আগলে ধরে মা'কে। দু গাল ধরে জানতে চায়,“তোমার কি হয়েছে মাম্মা?”
প্রেরণা উথাল পাতাল সুখানুভূতির পেষনে চিঁড়ে চ্যাপ্টা, নিস্তেজ প্রাণ। বেলাশেষে পাওয়া এই সুখটুকু আচমকা তাকে ভীষণ দুর্বল করে ফেলেছে। এইবার ছেলেটাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে শুয়ে থাকে, শুদ্ধর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কাঁপা স্বরে বলে,“কংগ্রাচুলেশন বাবা।”
নির্বোধ শুদ্ধটা অতকিছু বোঝে? প্রেরণা বোঝাতেও যায়না। ছেলের কপালে চুমু খেয়ে কেঁদে ফেলে অঝোর ধারায়। কিছুক্ষণ কেঁদে শান্ত হয়ে বলে,“তুমি রাগ করো না কেমন? তোমার মাম্মাকে তোমার সাথে ভাগ করে নিতে আরো একজন আসছে। শুদ্ধ আরেকটু বড় হয়ে গেল। শুদ্ধর প্রমোশন হয়ে গেলো !”
__________
প্রেরণার শুকনো মুখ দেখে ইশি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পরলো। ভাবীর দুগালে হাত বুলিয়ে দেখলো গায়ে জ্বর এসেছে কিনা। ননদ গুলো প্রেরণার বড্ড আদরের। ভাবী মনিকে যেমনি সকলে ভালোবাসে,শ্রদ্ধা করে তেমনি সুযোগ পেলেই ভাবীর সেবা ওরা তিনজনই করে। যেমন করে প্রেরণা ওদের মুড়িয়ে রাখে যত্নে।
ক্লান্তি মাখা হাসি হেসে প্রেরণা বলে,“তেমন কিছুই না ইশি। ঐ যে মাথাব্যথা!”
মিথ্যাচার করে প্রেরণার মন খারাপ লাগছে। অথচ সে কল্পনায় দেখে ফেলেছে, সুসংবাদটা এ বাড়িতে দিতেই প্রত্যেকে লাফিয়ে উঠে আনন্দ মিছিল করতে শুরু করবে। উথাল পাথাল হবে বেশুমার খুশিতে। তার শ্বশুরেরা বাজারের মিষ্টির দোকান ফাঁকা করবে একদম।
এই সংবাদটা বাড়িটাকে একটা উৎসব বাড়িতে বদলে ফেলতে বড়জোর কয়েক সেকেন্ড সময় নেবে।
কিন্তু প্রেরণা এটা চায়না এখুনি, সংবাদটা আগে সেই লোকটা জানবে ,আর কেউ নয়। ভেবে দৃঢ় শ্বাস নেয় প্রেরণা।
রিতু দোতলার বারান্দাতেই শুদ্ধকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। স্বামী ভাসুরদের বৈকালিক চা দিয়ে শুদ্ধকে নিয়ে ইনডোর প্ল্যান্টস গুলোর পরিচর্যায় ব্যস্ত সে। বৌমাকে তখনো খেয়াল করেনি। তবে প্রেরণা ওকে দেখছে চুপচাপ, ঠোঁটে টেনে লাজুক হাসি। রিতুকে নিয়েও একটা কল্পনা প্রেরণা করে ফেলেছে। খবরটা পেয়েই রিতু ছুটবে রান্নাঘরে। একথালা পুষ্টিকর খাবার নিয়ে এসে বসে যাবে প্রেরণাকে নিয়ে, এবং এখান থেকেই পূর্ণ হতে শুরু করবে প্রেরণার জীবনের আরেকটা ফাঁকা অধ্যায়। কিছু না পাওয়া সুখ,আদর, পারিবারিক যত্ন। যা বিগত জীবনে প্রেরণা পায়নি।
কাঁধে হঠাৎ একটা হাত পরতেই চমকায় প্রেরণা। চকিতে ফিরতেই দেখতে পায় আলোকে। খানিকটা গুটিয়ে দাঁড়িয়ে অল্প হাসতেই আলো বলে ওঠে,“কি? খারাপ লাগছে পেটে কথা চেপে রাখতে?”
অবাক হবার স্বরে প্রেরণা বলে,“মানে বড় মা?”
হাসে আলো। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,“হুবহু এই দৃশ্যটা আমার জীবনে ঘটেছিল। তোমার বড় বাবাও সেদিন পার্টির কাজে ব্যস্ত ছিলো। আমি বাড়িতে সারাদিন উশখুশ করেছি। বাড়ির সবার সামনে গিয়ে অহেতুক ঘুরপাক খেয়েছি। কাউকে বলিনি তোমার বড় বাবা আগে জানবে তাই। অথচ ঐ দিনটাতেই তাকে অত ব্যস্ত হতে হলো।”
প্রেরণা ভীষণ অবাক চোখে তাকিয়ে রইল, আলো আরো প্রশস্ত হেসে বলল,“তখন পরীকে কল করে কিটবক্স কোথায় জানতে চেয়েছো, সেখান থেকে আন্দাজ করেছি। এমনিতে আমি কিন্তু জানিনা ঠিক আছে? আমি যাই। তুমি তোমার স্বামীকেই আগে জানিয়ো। তারপর না হয় আমরা জানবো।”
__________
রেস্তোরাঁর বাইরে বেশ খানিকসময় ধরে অপেক্ষা করছিল উজ্জ্বল- শেহা। ওদের মিটিং প্লেস ঠিক হয়েছে এই রেস্তোরাঁটি।
ইরফান প্রণমি গিয়ে পৌঁছায় পাঁচ মিনিট দেরী করে। দরজার বাইরে বাইক থামাতে অবধি পারলো না ইরফান। প্রণমি লাফিয়ে নামলো আজ। দেরী করলো না এক সেকেন্ডও।
ইরফানের ঠোঁটে লেপ্টে আছে দুষ্টু হাসি। তবে প্রকাশ্যে আর হাসে না। শান্ত ভঙ্গিতে নিজেও বাইক থেকে নেমে প্রণমির ওড়না ঠিক করে দেয়। চাঁপা রাগে ক্রমশ গুটিয়ে যাচ্ছে প্রণমি। ইরফানের হাতটা সরিয়ে নিজেই ওড়নাটা ঠিক করে নিলো।
শেহা উজ্জ্বলের পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে, ওর দৃষ্টি শুরু থেকে ছিলো প্রণমির হাতের দিকে, যে হাতটা রাগী মির্জা শক্ত করে ধরে রেখেছে। ধরে রেখেছে একেবারে পথচলার শুরু থেকে। কত আদর, আশ্বাস আর ভরসা মাখা ঐ হাত দু'টো।
বরাবরের মতন শেহা চোখ নামিয়ে নেয়, সে মনের ভুলেও ভুল করে ঐ সুন্দর মানুষ দুটোর প্রেমে বদনজর লাগিয়ে দেওয়ার মেয়ে নয়।
একটা মৃদু শ্বাস ফেলে শেহা, আচ্ছা সে ওদের প্রতি এতো মনযোগ কেন দেয়? অদ্ভুত। তার এই মুহূর্তে এই দুজনের মাঝখান থেকে বেরোনো দরকার। ওরা হাত ধরাধরি করে হাটুক, নয়তো এখানে কোমর জড়িয়ে নাচানাচি করুক তাতে কি?
কয়েকটা ফাঁকা ঢোক গিলে নিজের মুখে শেহা আন্তরিক হাসি ফিরিয়ে আনলো। হঠাৎ টের পেলো ওর কোমরে উজ্জ্বল হাত রেখেছে। কিছুটা অবাক হয়ে শেহা তাকালো উজ্জ্বলের মুখে। উজ্জ্বল যেন ওর কোমর পেঁচিয়েই টেনে নিয়ে চলেছে সামনে,বলছে,“হঠাৎ হঠাৎ যেখানে সেখানে এভাবে স্ট্যাচু হয়ে গেলে তো বিপদ শ্রাবন্তী। তা কি ভাবছিলে?”
নিজ কোমরে লোকটার হাতের দিকে চোখ দেয় শেহা। হাতটা বেশ শক্ত, তারচে বেশি শক্ত এই বাঁধন। শেহা ঠোঁটে লাজুক হাসি টেনে বলে,“কি ভাবছিলাম আপনি বলেন তো! আপনি তো সব বলতে পারেন মুখ দেখেই!”
দু'জনে হাঁটছে কদমে কদমে, একই তালে। উজ্জ্বল বললো,“ভুল বললে, আমি মুখ দেখে নয় আচরণ দেখে ধারণা করি মানুষকে। আর তোমার এখনকার আচরণ বলছে তোমার খুব খিদে পেয়েছে তাই তুমি হাঁটতে পারছো না।”
ফিক করে হেসে দিল শেহা। ওকে সঙ্গ দিতে হাসলো উজ্জ্বলও। পরপর হাসি থামিয়ে উজ্জ্বল ঠান্ডা গলায় বলে,“আমি সত্যিটা বলবো তুমি কি ভাবছিলে?”
বলার আর দরকার পরলো না, শেহা সবটা বুঝে গিয়েছে লোকটার কন্ঠের দৃঢ়তায়। লোকটা নিশ্চিত ভাবেই সব জানে। লোকটার থেকে লুকানোর সাধ্যি হয়তো ওর হয়নি।
শেহাকে জবাব দেওয়ার সময় টুকু না দিয়ে উজ্জ্বলই বলে উঠলো,“ভাবনায় আমাদের প্রত্যেকের মাথায় এমন অনেক কিছুই আসে, সেগুলো ভাবনায় রেখে দেওয়াই উচিত তাইনা? তবে হ্যা, কারো ভালোবাসার ওপর যাতে তোমার বদনজর না লাগে সেক্ষেত্রে তুমি মাশাআল্লাহ বলে দিতে পারো।”
শেহা মাথাটা নিচু করে নেয়, ভীষণ লজ্জা পেয়েছে সে। পরপর নিজেকে সামলে স্বাভাবিক হয়ে আশেপাশে তাকিয়ে উজ্জ্বলকে বললো,“কোমর ছাড়ুন। সবাই দেখছে। দেখুন নিজেরা নিজেরা কিছু একটা বলাবলিও করছে!”
উজ্জ্বল বলে,“ওরা সম্ভবত আমাদের দেখে মাশাআল্লাহ বলছে।”
শেহা নিজে থেকেই ছাড়িয়ে দিতে চায় উজ্জ্বলের হাত। উজ্জ্বল ছাড়েনা,বলে,“কেন? ইনিয়ে বিনিয়ে ঠিক বোঝাও আমি আনরোমান্টিক। এখন তবে নখরা কেন?”
_এসব বাড়িতে বসে করবেন।
_কিন্তু বৌ তো তুমি আমার এখানেও শ্রাবন্তী।
নিরেট ভারি স্বরে কথাটা বলেছে উজ্জ্বল। এবং শেহা ওখানেই থামলো। দু'জন গিয়ে দাঁড়ায় প্রণমি ইরফানের সামনে। শেহা গিয়ে প্রণমিকে জরিয়ে ধরে আলিঙ্গন করে, কুশল বিনিময় করে।
প্রণমির শুকনো মুখটা দেখে উজ্জ্বল হেঁয়ালি করে ওঠে,“কি ব্যাপার প্রণমির? হাসিখুশি মেয়েটাকে আজ এমন লাগছে কেন?”
ইরফান চোরা চোখে এক ঝলক আবার তাকায়, উত্তরটা সে-ই দেয় উজ্জ্বলকে,“ও কাঁদছে না ভাইয়া। ওর চেহারাই এমন।”
মুখ ঘুরিয়ে নেয় প্রণমি তৎক্ষণাৎ,ইরফানকে এটা বোঝাতে,তার এসব স্বস্তা ধরণের রসিকতা দিয়ে প্রণমিকে আর হাসাতে পারবে না সে।
___________
প্রিতম বৌকে নিয়ে ঠিক সন্ধ্যা নাগাদ শশুর বাড়িতে চলে এসেছে। তখন বাড়িতে উপস্থিত রাজ্যের মেহমান। ইরফান প্রণমি,আর উজ্জ্বল শেহাও চলে এসেছে ঘুরেফিরে।
এতো মেহমান দেখে ভীষণ অস্বস্তিতে পরেছে প্রিতম। হাতে তার মিষ্টির কিছু প্যাকেট। পরীর কাছে গিয়ে ওগুলো রেখে বলে,“আপু কই?”
_প্রেরণার মাথা ধরেছে খুব, আজকের কাজবাজ সব ওরই করার কথা ছিল। মেয়েটা কত উৎসাহী ছিলো,এখন শুয়ে আছে ঘরে।
_এতো মেহমান কেন?
_সব আশেপাশের বাড়ির,আন্টি হয় তোমাদের। বড় ভাবী নিমন্ত্রণ করেছে আজ পাঁচ ছেলে মেয়ে এক সাথ হয়েছে তাই, ছোটো খাটো একটা পার্টি রেখেছে ভাবী। তুমি যাও। ইনুকে নিয়ে রেস্ট নাও। দোতলায় ইশিরা আছে।
প্রিতম ইনু মাথা নেড়ে ঘুরে দাড়াতেই মুখোমুখি হয় ইশমামের। ইশমাম এতোক্ষণ ধরে চুপচাপ মেয়ে জামাইকেই দেখছিলো। প্রিতম শ্বশুরকে সালাম দেয় নিচু গলায়, ইশমাম মাথা দুলিয়ে জামাইয়ের সালামের জবাব দিয়েই ইনুকে বলে,“চেহারার কি হাল করেছো! যত্ন নাওনা নিজের?”
প্রিতম চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। এখন তার শশুরের মেয়ে নিজের যত্ন নেয়না সেই দায়টাও নিশ্চয়ই ইশমাম মির্জা তার মাথায় চাপাবে।
ইনু কিছু বলার আগেই ইশমাম দৃষ্টি রাখে প্রিতমের ডান হাতে । ওই হাতে ইনুর কিছু বই। ওগুলো চোখে পড়তেই ইশমামের ঠোঁটে আপনা আপনিই এক চিলতে প্রশান্তিময় হাসির রেখা ফুটে উঠল। গলা খাঁকারি দিয়ে গুটিয়ে নিলো মেয়ের জন্য নিজের উৎকণ্ঠা ভাব,প্রিতমের শান্ত মুখটাতে দৃষ্টি স্থির রেখে ইনুকে বলে,“সমস্যা নেই। এখন তো পড়াশোনা করার সময়, চেহারা ভাঙবে,গড়বে। ব্যাপারনা। যাও ওপরে।”
ইনু গেলেও প্রিতম শশুরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে মিনিট খানেক, ও এটা কেন করেছে নিজেও জানে না।
ইশমাম নিশ্চুপ হাসে, পর পর গম্ভীর গলায় বলে,“তা তোমার চেহারা ভাঙছে কেন?”
প্রিতম জবাব দেওয়ার আগেই ইশমাম বলে,“বেশি কাজ মানে বেশি টাকা জানি। তবে জীবনে সুন্দরভাবে বাঁচতে গেলে খুব বেশি টাকার প্রয়োজন নেই। এই বয়সে শরীর স্বাস্থ্য খারাপ করে টাকার পেছনে ছুটলে পরে ভুগবে। আমাকে দেখে শিখতে পারো, আমি একজন ছাপোষা প্রফেসর হিসেবে রয়ে গিয়েছি। তবুও জীবনটা শান্তির ছিলো।”
চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মাথা নাড়ে প্রিতম বাধ্য ছেলের মত। তবুও নড়েনা। যেন শ্বশুর না বলা অবধি সে এখান থেকে যাবে না।
ইশমাম চেয়ে চেয়ে দেখে মেয়ে জামাইকে কিছুক্ষণ, তারপর নরম গলায় বলে,“সবসময় তো ইনুকেই জিজ্ঞেস করা হয় ও কেমন আছে, তুমি ওর প্রতি কতটা কি দায়িত্ব পালন করছো। আজ তোমার কাছে জানতে চাচ্ছি, ইনু তোমার প্রতি কতটা কি দায়িত্ব পালন করে? আসলে ভেবো না আমি শুধু আমার মেয়ের স্বার্থ দেখি। আমি ছোট থেকে ওকে শাসনে রেখেছি, তাই ও কারো দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকে জ্বালাতন করলে আমি লজ্জিত হবো।”
__________
প্রেরণাকে ঘিরে বাড়ির লোকদের উদ্বিগ্নতা বাড়ছে। থেকে থেকে প্রত্যেকেই এসে দু একবার করে জানতে চাইছে কোথায় কি অসুবিধা হচ্ছে। শেষটায় আলো এসে সবাইকে প্রেরণার ঘরের সামনে থেকে তাড়িয়ে দিলো।
বিছানায় শুয়ে শাড়ির আঁচলে মুখ চেপে হাসছে প্রেরণা। দু'চোখ বুজে হঠাৎ নিলো মস্ত এক শ্বাস। মাথায় খনিক সময়ের জন্য দুষ্টু বুদ্ধি এলো, সবাইকে একটু ঘোল খাইয়ে পরে সারপ্রাইজ দিবে নাকি?
পরে নিজেই নিজেকে শাসালো। না, অসুস্থতা নিয়ে মজা করা উচিৎ না।
বিছানায় বড্ড অযত্নে পরে আছে ফোনটা। আজ যেন ওটা বড্ড অলস। তাজওয়ার মির্জা আজই এতো ব্যস্ত হলেন। অবশ্য আগামীকাল সবাই ট্রিপে বেরিয়ে পরবে তাই হাতের কিছু কাজ আজই শেষ করে রাখবে হয়তো।
ইহানের কথা ভাবতে ভাবতেই কল চলে আসলো ওর তরফ থেকে। প্রেরণা ব্যগ্রতার সহিত কলটা রিসিভ করতেই আবার শুনলো ওপাশ থেকে কেউ চেঁচামেচি করছে। এর মাঝেই ইহান ডাকলো,“প্রেরণা শুদ্ধ কোথায়?”
_আছে, বড় বাবার সাথে খেলছে, কেন?
_আমার আসতে দেরি হবে, ওকে আজ জাগিয়ে রাখবেন, সবার জন্য স্পেশাল আইসক্রিম আনবো।
প্রেরণা চুপ করে রইলো। আবারো বুকটাতে খেলে গেলো এক শীতল অনুভূতি। প্রেরণার মনে পরে গেলো ছোটো বেলায় প্রেরণার পাপাও ওদের তিন ভাইবোনের জন্য রাতে বাড়িতে ফেরার পথে এটা সেটা আনতো। যেমনটা ইহান আনেন। শুদ্ধ ঘুমিয়ে থাকলে আবার যত্ন করে শুদ্ধর মাথার কাছে রেখে দেয় চকোলেট অথবা ক্যান্ডি। লোকটা শুদ্ধর অভ্যাস টা খারাপ করে দিচ্ছে দিনকে দিন। অথচ এখন আর প্রেরণা নাক সিটকাতে পারে না। শুদ্ধ আর ওর আব্বুর সমঝোতার মাঝখানে প্রেরণা ঢুকতে পারেই না আজকাল।
আজ পার্টি ছিল নামে, আসলে বাইরে হচ্ছিলো এই এলিট পাড়ার মহিলাদের গসিপ। কার বাড়ির বৌ কত শ্রেষ্ঠ,কার বাড়ির জামাইয়ের কয়টা ইন্ডাস্ট্রি আছে এসব নিয়েই বিশদ আলোচনা।
আলো যেন আজ বিপদেই পরলো এদের নিমন্ত্রণ করে। অবশ্য তারই বা কি করার ছিলো । পাড়ার মহিলা ক্লাবে রোজ বিকেলের আড্ডায় সবাই ধরে মজার ছলে বলেছিল এক বেলা বাড়ির বৌদের হাতে খাওয়াতে হবে,
হাই তুলছে রিতু। ভাবী সম্প্রদায় যে যেভাবে পারছে নিজেদের বাড়ির জামাই বৌ নিয়ে বাড়িয়ে গপ্প এঁটে চলেছে। ওসব শুনে রিতুর ঘুম পাচ্ছে।
এর মাঝে ব্যারিস্টার শামসুল হকের স্ত্রী রোমানা হঠাৎ আলোকে বলে ওঠে,“তা শুনেছি আপনাদের বাড়ির বড় বৌয়ের গুণের শেষ নেই। তা শুনি আরো কিছু। সে আসবে না?”
_আসলে প্রেরণা সাডেন অসুস্থ হয়ে পড়েছে, তবে সে নিজে আপনাদেরকে বেড়ে খাওয়াবে।
_কি করে সে আজকাল?
আলো এবার নড়েচড়ে বসে। সবার বাড়ির বৌয়েরা কেউ ডাক্তার,কেউ ফরেইন ক্যাডার কেউ নামকরা বিউটিশিয়ান, কেউ নামকরা ইনফ্লুয়েন্সার। এর মাঝে তাদের বাড়ির ছাপোষা সাদামাটা ব্যবসায়ী বড় বৌ যে কম কিছু নয় সেসব ফলাও করে বলতে থাকে আলো।
আলো কখনোই নিজেদের সুখ বাইরের লোককে শুনিয়ে বেড়ানোর মহিলাটি নয়, তবে আজ যেন তার চোখ মুখ অন্যরকম লাগছে এসব আলোচনা করতে। তাদের ভরা সংসারে একজন জামাই এসপি, একজন উকিল, একজন নাম করা প্রোগ্রামার। জামাইদের টাকার প্রসঙ্গে আলো ভাবে না, তবে তাদের বাড়ির জামাইরা ভীষণ মেধাবী এবং যোগ্যতাসম্পন্ন এটাই আলোর কাছে গর্বের।
আর বাড়ির বৌ দু'টো? আলো জানে, এমন বাধ্য বৌ এই তল্লাটে কারো বাড়িতে নেই।
এই এলিট মহলে কার বাড়িতে কেমন উচ্ছন্নে যাওয়া বৌ আছে তার খবর এমনিতেই রাস্তায় নামলে শোনা যায়। সেখানে তাদের বাড়ির বৌয়েরা নিখাদ হীরা। যারা তাদের স্বামীর একান্ত বাধ্য।
বড় বৌয়ের গল্প আলো শেষ করতেই মিসেস নিলাশা মজার ছলে বলে ওঠে,“সব প্রশংসা বড় বৌয়ের?”
রিতু জবাব টা দিলো তৎক্ষণাৎ। কন্ঠে তার উৎফুল্ল ভাব।
“না না। আমার ছোট ছেলের বৌ? তার তো বিরাট গুণ। কত ভালো গান করে। শুনলে বুঝতে পারবেন। ঐ তো টিভিতে অডিশন অবধি দিতে যাওয়ার কথা ছিলো। পরে না বিয়ে হওয়ায় ওসব হলো না। দাঁড়ান আজ শুনে যাবেন ওর গান, ভীষণ গুণী মেয়ে।”
কিশোরীর রিনরিনে স্বরে বলে রিতু চট করে উঠে দাঁড়ায়। তার মাঝে ব্যস্ততা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তার গুণী ছোটো বৌয়ের একটা গুণ আছে, সবাইকে শোনাতে আর দেখাতে চায় সে।
চলমান.....
[ অন্তিম পর্বের ২য় অংশ আগামীকাল দিয়ে দেবো ]
কিছু কথা পাঠকদের উদ্দেশ্যে, আমার ইচ্ছে ছিল একটা পারিবারিক রিইউনিয়নের দৃশ্যের সাথে গল্পটির সমাপ্তি টানার। সেটাই করতে চলেছি।
অন্তিম পর্বের দ্বিতীয় অংশের সাথে সাথে শেষ হয়ে যাবে আমার এই বৃহৎ গল্পটি।
এর মাঝে নানা লোক নানা অভিযোগ করছেন। আচ্ছা কাহিনীর আর কিছু বাকি কি আছে?
আমার মনে হয়না কোনো জুটির সমঝোতায় , কাহিনী আটতে আমি বিন্দুমাত্র কসুর করেছি। তবুও যদি আপনারা তৃপ্তি না পান তবে দুঃখিত।
শেষটা খুব সাদামাটা ভাবেই শেষ করার ইচ্ছা ছিল আমার। যেখানে চটকদার, অহেতুক রোম্যান্স থাকবে না। থাকবে কিছু সুক্ষ্ম মিষ্টি অনুভূতি।
পাঁচ জুটির ভক্তরা অনেকেই আমার ওপর হতাশ, আমি আরেকটু কেন তাদের পছন্দের জুটি নিয়ে লিখছি না। তাদের উদ্দেশ্যে একটা কথাই বলতে চাই, গল্পটা আর এক পর্বেই সমাপ্ত থাক। এভাবে চালিয়ে নেওয়া পসিবল না। সত্যিই পসিবল না।
ভবিষ্যতে পাঁচ জুটি নিয়ে পাঁচটা বড় বড় সারপ্রাইজ পর্ব দিয়ে আপনাদের অভিযোগ দূর করার চেষ্টা করবো। যেখানে এক জুটির মাঝে দ্বিতীয় জুটি স্থান পাবে না। যদিও আমি এখনো জানিনা এতো অভিযোগ কেন! আমার মতে আমি আমার সর্বোচ্চ করেছি।
সে যাই হোক,আর একটা কথা। আমি গল্পের শেষটায় ন্যাকামি দিয়েছি, এই প্রসঙ্গে দু'টো লাইন বলবো।
স্বামী স্ত্রীর , শাশুড়ি বৌমার, বাবা মেয়ের, শশুর জামাইয়ের মধ্যে ন্যাকামি থাকা দোষের তো কিছু না। সবাই ন্যাকামি করুক। বেশি বেশি করুক। যেসব সংলাপ এবং আচরণ আপনাদের কাছে ন্যাকামি। সেসব সম্পর্কের প্রাণ। আপনাদের কারো কাছে বিষয়টা বোরিং,তবে এতে তো সমাজ নষ্ট হয়নি।
দাম্পত্যে চটকদার রোমান্সের থেকে স্বামী যদি ন্যাকামি করে এটা তো বিরক্তির কিছু না। এর মানে এই নয় যে আমি গল্প নষ্ট করেছি। সুন্দর হাসবেন্ড ওয়াইফের বাস্তবিক গল্প তো অনেকেই লেখে। আমার গল্পের হাসবেন্ড ওয়াইফ না হয় ন্যাকাই থাকুক!”#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৩৭ [ অন্তিম পর্ব ]
#ইসরাত_ইতি
[ ২য় অংশ ]
দরজায় নক করে ভেতরে উঁকি দিতেই রিতু দেখতে পেলো প্রণমি বিছানায় চুপচাপ বসে আছে। আজ এই মেয়ের ঠিক কি হয়েছে রিতু সঠিকভাবে জানে না, তবে এতো বিষন্নতার কেন্দ্রবিন্দু যে তার গুণধর ছেলে তা বলাই যায় চোখ বুজে।
রিতু এগিয়ে গিয়ে প্রণমির থুতনি উঁচু করে তুলে ধরে ভীষণ চিন্তিত হয়ে জানতে চাইলো,“বাড়িতে এতো আনন্দ আয়োজন। তোমার মুখ ভার কেন? ইরফানের সাথে ঝামেলা হয়েছে? মিটমাট করে নাও না কেন? কাল সবাই ঘুরতে যাবে।”
_কই কিছু হয়নি তো মা।
মিনমিনে জবাবে বিষয়টা অস্বীকার করে নেয় প্রণমি। সত্যি বলতে তার সাথে ইরফান মির্জার আসলেই তো কিছু হয়নি। প্রণমি শুধু ঐ লোকটার একটা আচরণে ভীষণ হতাশ। এই হতাশার কথা কাউকে বলতে ইচ্ছে করছে না। ভাইয়া আপুকেও না। সন্ধ্যায় রেস্টুরেন্ট থেকে বাড়িতে ফিরে ঘরেই এভাবে বসে আছে। বাইরে, দোতলার বারান্দার দিকটাতে সবাই বসে আড্ডা দিচ্ছে। কতদিন পর মুঈন আর উজ্জ্বল জিজু এসেছে, ভাইয়া এসেছে। প্রণমি সেখানে যাওয়ারও আগ্রহ পাচ্ছে না। মাথায় শুধু কিছুক্ষণ পর পর একটা কথা ঘুরপাক খাচ্ছে,“রিপ্পি।”
রিতু প্রণমির হাত টেনে ধরে তাড়া লাগায়,“আচ্ছা কি হয়েছে তা পরে শুনবো। এখন তুমি চলো,নিচে যেতে হবে। ঐ আন্টিদের কাছে।”
_কেন মা? কিছুক্ষণ আগেই তো কুশল বিনিময় করে এলাম।
_তা এসেছো, এখন ওরা তোমার গান শুনতে চাইছে। সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে বসে আছে।
গানের কথা শুনতেই প্রণমির কুঁচকানো কপালটা ক্রমশ স্বাভাবিক হয়। রিতু টের পেলো মেয়েটির মুখশ্রীর এই আমূল পরিবর্তন। আলতো হাতে প্রণমির হাত ধরে টেনে ঘরের বাইরে আনতেই মুখোমুখি হলো ইরফানের। ইরফান প্রণমির খোঁজে এসেছে, ওকে বললো,“প্রণো সবাই ট্রুথ অর ডেয়ার খেলবে, তোমায় ডাকছে, তুমি যাবে?”
মুখ ঘুরিয়ে নেয় প্রণমি, অস্পষ্ট ভেংচি কেটে রিতুর পেছনে লুকায়, শাশুড়ির হাতটা আঁকড়ে ধরে শক্ত গলায় বলে,“মা আমি আপনার সাথে যাবো।”
ওর প্রত্যাখ্যান সইতে না পেরে ইরফান মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে আছে, এতক্ষণে তার ভীষণ মেজাজ খারাপ হলো। কিন্তু সেসব আর প্রকাশ করেনা, আর মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যপার। রাত গড়ালেই যখন দোর আঁটবে ঘরের, তখন দেখবে তার বৌয়ের অভিমান কোথায় যায়। খুব ভালো করেই দেখবে সে।
প্রণমি এগিয়ে যায় ত্রস্ত পায়ে, রিতু পেছন ফিরে ছেলের মলিন মুখটাও দেখে, ফিসফিসিয়ে বলে,“কি নিয়ে লেগেছে তোদের?”
_এখনো তো লাগেইনি। সারাদিন পিঠ বাঁচিয়ে চললাম। কাছে যেতে ভয় করে, যদি অগ্নুৎপাত হয়।
রিতু থমথমে গলায় বলে,“যা ওদের কাছে, একটু পর ওকে দোতলায় পাঠিয়ে দেবো। মাথা পুছিয়ে বুঝিয়ে সমস্যা জানতে চাইবি। বাড়ি ভর্তি জামাইরা। খবরদার মেহমানদের সামনে কাহিনী যেন না শুনি কোনো।”
ইরফান দাঁত কপাটি বের করে মাথা চুলকে বলে,“সো সুইট অফ ইউ মাম্মা!”
রিতু এগিয়ে গিয়ে প্রণমির সাথে কদম মেলায়। সিঁড়ির কাছটাতে আসার পরেই হঠাৎ বৌমার হাতটি খপ করে টেনে ধরে রিতু দাঁড় করিয়ে দিতেই চমকায় প্রণমি। সামান্য ভয়ও পেলো, পর পর শুনলো রিতু ফিসফিস করে বলছে,“শোনো, সবচেয়ে যে গানটা ভালো করো ওটা গাইবে কেমন? মাঝপথে আবার থেমে যেয়ো না যেন। আর গলা টা ফ্যাশফেশে লাগছে কেন তোমার? একটু চা খাবে নাকি?”
নিশ্চুপ প্রণমি শাশুড়ির কথা শুনছে। রিতু এবার একা একা বিড়বিড় করে,“সব কটা চুন্নী। শুধু বাতেলা ছাড়ে।
আমার বৌমা এই, আমার বৌমা সেই।
হ্যা তোদের বৌমারাই সব উদ্ধার করছে, তবে আমার বৌমা কি ফেলনা?
প্রণো, খুব সুন্দর করে গান গাইবে কেমন? গান শুনে যেন মুখ বন্ধ হয়ে যায় সবার। সবকটা বড্ড বেশি চাপা মারে!”
প্রণমি এতক্ষণে ভীষণ অবাক তার শাশুড়ির বাচ্চাসুলভ আচরণে। পর পর উচ্চশব্দে হেঁসে ওঠে মেয়েটা। চেপে ধরে রিতুর হাত। হাসতে হাসতে শরীর ভেঙে পরার যোগার।
“হাসছো কেন? হাসির কি বললাম?”
দু'পাশে মাথা ঝাঁকায় প্রণমি। হাসি থামিয়ে এইবার বুক ভরে শ্বাস নিয়ে বলে,“আমি খুব সুন্দর করে গান গাইবো মা। গান শুনে সবার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। চলুন। এতো উত্তেজিত হবেন না।”
গান শুনে সত্যি সত্যিই কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছে সকলের। প্রণমির মুখ হাসি হাসি। তার মনে সুপ্ত ইচ্ছা জেগেছে তার শাশুড়ির বিজয়ী মুখটা দেখার। নিশ্চয়ই ভীষণ খুশি হয়েছে। তার শাশুড়ি অবচেতন মনে প্রণমিকে নিয়ে গর্ব করছে এটা বুঝতে পেরেই শান্তি পেয়েছে সে। না দেখুক দু চোখে, একজন পঁয়তাল্লিশোর্ধ ভদ্রমহিলার হাসি হাসি সরল তবে গর্বিত মুখটা প্রণমি নিজে নিজেই দৃশ্যপটে এঁকে স্বস্তির শ্বাস ছাড়ে।
রিতুর মুখটা আসলেই জিতে যাওয়ার মতন হয়েছিল, বাকি ভাবীদের কোটর থেকে বেরিয়ে আসা চোখ গুলো দেখে। নাকের ডগায় চিকচিক করছে অহংকার।
দু পাড়ার আন্টিরা একে একে কত প্রশংসা করছে প্রণমির। রিতু এতক্ষণে মুখ খুলে বুক ফুলিয়ে আবার বলে যেতে থাকে,“অডিশনেও টিকতো জানেন, যদি যেতে দিতাম আমি। আমিই দিলাম না। তবে চর্চা করুক। এসব তো আমরা পারিনা বাবা। সে যখন পারে তখন গাক। শুধু সিঙ্গার না হলেই হলো। আমার আবার সিঙ্গার বৌমা পোষাবে না। ওটা বড্ড ভারি হয়ে যাবে।”
__________
রাতের খাবারের পরেই বাড়িটা ফাঁকা হলো। অতিথি আপ্যায়নের সময়টিতে প্রেরণা একবার নেমেছিল নিচে। নিজের হাতে বেড়ে খাইয়ে আবার গিয়ে বিছানা নিয়েছে। আজ যেন শরীরের আলস্যতাই কাটছে না।
ওদিকে বাকিরা পুনরায় বারান্দায় গিয়ে বসেছে। ইচ্ছে খুশিকে ওর নানাভাই আর নানুমনির কোলে রেখে নিশ্চিন্ত ইশি। লাফাতে লাফাতে সকলকে টেনে নিয়ে বসিয়েছে ট্রুথ অর ডেয়ার খেলবে তাই।
প্রণমিকেও ছাড়েনি। বাকিদের মধ্যে বেশ উৎফুল্ল ভাব, অথচ বিষন্ন প্রণমি।
বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছে খেলার আসর। প্রথমেই মুঈন নিয়েছে ডেয়ার। সুযোগটা লুফে নিয়ে ইশি মুঈনকে টাস্ক দিলো শশুর শাশুড়ির সামনে গিয়ে মুঈনকে একটা জোকস্ বলে আসতে হবে। যদি না পারে তবে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে।
কিছুটা বিপদে অবশ্য মুঈন পরেই গিয়েছিল। শশুর শাশুড়িকে সে ভয় পায়। তাছাড়া তার পেশার একটা গাম্ভীর্যতা আছে, এভাবে হুট করে গিয়ে শশুর শাশুড়িকে জোকস্ শুনিয়ে আসবে কিভাবে?
শেহা-ইনুর জোড়া জুড়িতে তবুও উঠলো। তবে গিয়ে শশুরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে মিনিট খানেক ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল মুঈন। সামিন খুশিকে কোলে নিয়ে দোলাতে দোলাতে অবাক চোখে দেখে জামাইকে। বললো,“কিছু বলবে?”
দু'পাশে ঘনঘন মাথা নাড়ে মুঈন। তারপর বেড়িয়ে আসে কিছু না বলেই। সোজা চলে গেলো সে। এসব তার দাঁড়া হবে না। এর চে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে দেয়া ভালো।
উজ্জ্বল নিলো ট্রুথ। শুরুতেই বললো,“প্লিজ কেউ আমার ইনকাম নিয়ে কিছু জানতে চেয়ো না। এটা ব্যাড ম্যানার্স!”
হাসলো সবাই। তবে তাকে প্রশ্ন করলো ইনায়া,“ আচ্ছা ইনকাম বলতে হবে না । বিবাহিত জীবনের সত্যি ফিডব্যাক দিন।”
একটা লম্বা শ্বাস ফেলে উজ্জ্বল মজার ছলে বললো,“খুব বিপদে ফেলেছো। দিতেই হবে?”
শেহা পাশ থেকে বলে উঠলো,“হ্যা, মন্দ হলেও দিতে হবে।”
_রাগ করবে না তো?
_না।
উজ্জ্বল বাঁকা হেসে বলল,“এবছরটা কিছুই বুঝতে পারছি না। এই ফিডব্যাক টা পাঁচবছর পরে দেই?”
_জি জি। বাচ্চা কাচ্চা সমেত গুছিয়ে একটা ফিডব্যাক দিবেন জিজ।
ইনুকে চোখ রাঙানি দিলো শেহা। প্রণমি ব্যতীত বাকি সবাই হাসছে।
ইরফান চোরা চোখে বারবার বৌকেই দেখছিলো। শেষমেষ একটা কান্ড করে বসলো প্রণমি। ইরফান যখন ট্রুথ নিলো, খেলার মাঝেই সবার সামনে প্রণমি বলে উঠলো,“রিপ্পি কে?”
বিষয়টা সকলের বোধগম্য হতে কিছুটা সময় নিলো, অতঃপর পরিবেশ চুপচাপ। ঝড়ের আগে প্রকৃতি যখন শান্ত থাকে ঠিক তখনকার সময়ের মতো।
ইরফান ঠান্ডা চোখে চেয়ে আছে। প্রণমি ওর কাছে প্রশ্নটা একবার করে ক্ষান্ত হয়। পরপর ডেকে ওঠে প্রিতমকে, গমগমে স্বরে বলে,“রিপ্পি কে ভাইয়া? তোমার চেনার কথা তো! কানেকশন কি তোমাদের তিনজনের।”
পরিস্থিতি বিগড়ে যাওয়ার আগেই ইশি বলে উঠলো,“প্রণো, এখন আমরা খেলাটা কন্টিনিউ করি?”
_আমি তো খেলছিই! ঐ যে লোকটা ট্রুথ নিলো! এখন প্রশ্নের জবাব দেবে না?
ক্রমশ শক্ত হচ্ছে প্রণমির বাচনভঙ্গি, তার তরুণী মন এত অহেতুক বিষয়টি নিয়ে এত ভার হচ্ছে কেন সে নিজেও বুঝতে পারছে না। সে শুধু অনুভব করছে রিপ্পি নামের একটি মেয়ের সাথে তার পুরুষটির হয়তো প্রণয়ের সম্পর্ক ছিল, হয়তো বেশ গভীর আবেগ ছিলো। নয়তো বিয়ের এতদিন পর রিপ্পির খবর কেন তার বন্ধুরা তাকে কল করে জানাবে?
ইনু আর প্রিতম একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে সেই তখন থেকে। কারণ ওরা প্রণমিকে চেনে, রাগে উত্তেজিত হওয়ার আগে এমন করে গলা কাঁপিয়ে কথা বলে মেয়েটা।
ইনায়া উঠলো, গিয়ে ননদের পাশে বসে বলে,“চলো তুমি, তোমাকে বলছি!”
প্রিতম সাথে সাথে বলে উঠলো,“প্রণো। বিষয়টা এখানে আলোচনা করার মতো বিষয় না! তাই ইরফান বলছে না এখানে। ঘরে গিয়ে বলবে।”
_বিষয়টা এখানে আলোচনা করলে কি হবে? ঐ লোকটার এক্স ছিল,সেটা এখানে বলতে কি সমস্যা? এক্স তো থাকতেই পারে। বিষয়টা এখানে বসে কেন বলতে চায়না উনি? নিশ্চয়ই ওনার মনে দোষ আছে। নয়তো ওনার পিরিতের রিপ্পির বাচ্চা হয়েছে সেই খবর এখনো কেন রাখবেন উনি?
কাঁদো কাঁদো ভঙ্গিতে ঘর কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে উঠতেই প্রত্যেকের চোখ গোল্লা গোল্লা হয়ে গেল নিমিষেই। একযোগে ঘুরে তাকালো ইরফানের দিকে। মুঈন সাথে সাথে বলে উঠলো,“রিপ্পির বাচ্চার খোঁজ নিয়ে তুমি কি করো ইরফান?”
প্রিতমও চাঁপা রাগ নিয়ে একই প্রশ্ন করে। ইরফান ভাবলেশহীন ভাবে প্রণমির দিকে তাকিয়েই জবাব দিলো,“রিপ্পির খোঁজ নিইনা আমি। হাদা নিক্সন কল করেছে আমার সংসারে আগুন লাগাতে। অতি ফাজিল।”
একটু থেমে ঘন প্রশ্বাস ফেলে ইরফান প্রণোকে বলে ওঠে,“রিপ্পি এক্স নয় আমার। রিপ্পিকে শুধুমাত্র পছন্দ করতাম।”
প্রণমি নিশ্চুপ হয়ে শুনলো সে কথা। পর পর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতেই উঠে দাঁড়ায়। ওর পদক্ষেপ সম্পর্কে কেউ কোনো ধারণা করতে পারছিলো না। মেয়েটা মুখটা শুকনো করে গটগট করে হাঁটা ধরতেই উজ্জ্বল আপত্তি করে ওঠে,“প্রণমি। শোনো এটা তো মন খারাপ করার কোনো বিষয় নয়। ইরফানকে এক্সপ্লেইন করার সুযোগ দাও।”
প্রণমি থামলো এক সেকেন্ডের জন্য, বললো,“জানি। এটা মন খারাপের বিষয় নয়। একটু একা থাকবো আমি, এক্সকিউজ মি।”
প্রণমি চলে যাওয়ার পরেও ইরফান মিনিট দুয়েক বসে রইল চুপচাপ। ইশি এসে ওকে ঠেলে ওঠালো,“যা গিয়ে বোঝা! হাদারাম বসে আছে!”
_________
ঘরে ঢুকে দরজা চাপিয়ে ঘুরতেই ইরফান দেখলো প্রণমি বিছানায় ওপাশ ফিরে শান্ত হয়ে শুয়ে আছে। গাঁয়ে চাদর জড়িয়ে।
ইরফান গিয়ে বিছানার একপাশে বসলো। দু'জনের মধ্যে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করে বেশ খানিক সময়। পরপর প্রণমিই বলে উঠলো,“তাকে অনেক পছন্দ করতেন?”
_অনেক না, ঐ কিছুটা।
আবার হুট করে উঠে বসে প্রণমি, গলায় তেজ ঢেলে বলে,“কিছুটা পছন্দ করলে ভাইয়ার সাথে মারামারি নিশ্চয়ই করতেন না। নিশ্চয়ই অনেক পছন্দ করতেন।”
জবাব দেয়না ইরফান, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে তার বোকা বিরক্তিবতীর মুখে। প্রণমির গা কেঁপে ওঠে আবার। মেয়েটা কেমন অস্থির শ্বাস ফেলছে ঘনঘন। বুকের কাছটা জ্বলছে। মুখটা তেতো লাগছে। যা উচিত নয় প্রণমিও জানে, এগুলো নিছক বাচ্চামি প্রণমি তো তা জানেই। তবুও তার অস্থির লাগে। তার উনিশ বছরের জীবনটাতে মন্দ থেকে শুরু করে ভালোতে ঐ একটা পুরুষ ছিলো। ঐ একটাই পুরুষ,যাকে ঘিরে প্রণমি ভালোলাগা ভালোবাসা প্রেম বিরহের অনুভূতি এনেছে। এখন প্রণমি হঠাৎ যখন শুনলো সে ইরফানের প্রথম ভালোলাগা ছিলো না,বিষয়টা স্বাভাবিক হলেও প্রণমি মানতে গিয়ে হোঁচট খায়।
ইরফান চোখের পলক না ফেলে দেখছে বৌকে, প্রণমির ঠোঁট কাঁপছে। হঠাৎ কান্নার মত করে বলে,“তাকে কি ভালোবাসার কথা বলে তার পিছনে ঘুরতেন। পাগলের মতো ঘুরতেন?”
_পাগলের মতো ঘুরবো কেন? আমি সুস্থ মানুষ, সুস্থ মানুষের মতো ঘুরতাম।
ইরফানের সহজ ভঙ্গির এই মস্করায় আরো ছ্যাৎ করে ওঠে প্রণমি। হাতের কাছে ফোনটা ছিল,হুট করে তুলেই ছুঁড়ে ফেললো।
ইরফান ঠিক তখনই ওকে ধরলো, শান্ত করতে জাপটে ধরলো একেবারে। কিন্তু প্রণমির অবুঝপনার মাত্রা যেন ক্রমশ বাড়ছে, ক্রমশ অশান্ত হচ্ছে সে। একপ্রকার ধস্তাধস্তি লাগিয়ে দিয়েছে ইরফানের সাথে, কিন্তু ইরফানের শক্তির সাথে শেষটায় পেরে না উঠে মাথা ঠেকালো ইরফানের বুকে, রাগ নিয়েই হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,“ঐ মেয়ের জন্য আপনি কি গান গাইতেন ? তাকে ইমপ্রেস করার জন্য?”
ইরফান অস্পষ্ট হেসে নরম গলায় বলে,“এটা তো স্বাভাবিক প্রণমি তাই না? কাউকে আমি পছন্দ করলে তাকে ইমপ্রেস করার জন্য অবশ্যই গান গাইবো। যেহেতু গাইতে জানি। ক্যাম্পাসে ফ্রেন্ডজোনের আড্ডায় গাইতাম তাকে শুনিয়ে।”
এবার যেন প্রণমির দমটাই বন্ধ হয়ে এলো। হিংসুটে প্রণমি এই স্বাভাবিক ব্যাপার গুলোই মেনে নিতে পারছে না কোনোমতে। না চাইতেও চোখ জোড়া টলটলে হয়।
ইরফান একটু রাগ দেখায় এবার,“প্রণমি এনাফ। ভেবো না তোমার সব অযৌক্তিক বাচ্চামো গুলোও মেনে নিবো। এখন থামো, এক্ষুনি থামবে তুমি।”
যেন ইরফান দোষী, ঠিক তেমন করে ইরফানকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে প্রণমি উঠে গিয়ে খুলে ফেলল দরজা। তবে বাইরে পা আর রাখতে পারলো না, ইরফানের শান্ত স্বর থামিয়ে দিল ওকে,“সাহস থাকলে ঘরের বাইরে পা রেখে দেখো তুমি।”
প্রণমি থামলো ঐ হুমকিতে। তবে মিনিট খানেক পরে চেহারা শক্ত করে ঠিকই দরজার বাইরে এক পা রেখে তেজী গলায় বললো,“এই যে পা রাখলাম দরজার বাইরে। কি করবেন?”
মেয়েটির সাহস দেখে হতভম্ব ইরফান। অথচ সে জানতো তার নরম কোমল বৌ তাকে ভয়ডর করে। হতাশ ইরফান, চূড়ান্ত হতাশ। শ্বাস ফেলে বললো,“কি করবো সেটা তো ভেবে দেখিনি।”
প্রণমি নাক মুখ কুঁচকে নিয়ে বললো,“যাচ্ছি আমি। আর আসবেন না আমার পেছনে। কিছুক্ষণ একা থেকে আবার আসবো এ ঘরে, চিন্তা করতে হবে না!”
ঠিক তখনই ইশি চলে আসে সেখানে। ওদের দুজনের কান্ড দেখে মহাবিরক্ত হয়ে বলে,“এসব কেমন বাচ্চামি প্রণো?”
প্রণমি গুটিয়ে যায় ননদের ধমকে, কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বলে,“আমার শুধু অসহ্য লাগছে আপু। আমি শুরু থেকে ভেবেছি ওনার সব গান, ওনার সব প্রেম শুধু আমার জন্য। এটা আমার কাছে স্বপ্নের মতো ছিলো। অথচ কোথা থেকে কোন রিপ্পি অতীত থেকে উড়ে এসে আমার আনন্দকে ফ্যাকাশে করে দিল।”
ধৈর্য্য রাখে ইনশিরাহ,আর রাগে না মেয়েটাকে, নিচুগলায় বলে,“ ওর গান হয়তো তোমার আগে আরো একটি মেয়ের জন্য ছিল প্রণমি। তবে আমার ভাইয়ের জীবনের চূড়ান্ত পাগলামি গুলো তোমার জন্যই ছিলো। পাপার সাথে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে রাত বিরেতে খালি হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়াও তোমার জন্য ছিলো। এসব শুধুই তোমার জন্য ছিলো। এসবে আর কারো ভাগ ছিল না কখনো। বুঝলে?”
প্রণমি চুপ হয়ে যায় এইবার। ইশি ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,“পাগলামি করো না। দু'জনে সব মিটমাট করে এসো। দাদান আসছে, আইসক্রিম খাবো সবাই একসাথে।”
ইশি চলে গেলে ইরফান প্রণমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে আরো কিছু সময়। কিন্তু পরে প্রণমি ঠিকই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ইরফানের রাগ বাড়ে চক্রবৃদ্ধি হারে। এতোটা খামখেয়ালি বেরুবে এই মেয়ে তার কল্পনাতেও আসেনি। দাঁতে দাঁত চেপে হজম করে যাচ্ছে সব। প্রণমির পিছু পিছু যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় অতঃপর। ধস্তাধস্তি সে করবে না, তবে দেখতে চায় এই মেয়ে সর্বোচ্চ কি করতে পারে।
প্রণমি এলোমেলো পায়ে হেঁটে নিচে নামে। ভাগ্য ভালো বাড়ির সিনিয়রেরা রাতের খাবার খেয়ে পুলসাইডে গিয়ে বসেছে,নয়তো এসব দেখলে ইরফান মুখটা কোথায় রাখতো? সবার চোখে ধরা পরে যেতো, ইরফান তার এতটুকু বৌকে কন্ট্রোল করতে পারে না।
প্রণমি হাঁটছে, হাঁটছে ইরফানও। যখন গিয়ে ঘরের সদর দরজার দিকে পা বাড়ায় তখন ইরফান বলে ওঠে,“আমি রিপ্পিকে গান শোনাতাম এটা সত্যি। তবে তোমার জন্য যেসব গেয়েছি ওসবের একটাও গাইনি। বিশ্বাস করো! ”
এইবার প্রণমির মুখচোখ স্বাভাবিক লক্ষ্য করলো ইরফান। খুশিতে গদগদ হয়ে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে বললো,“রিপ্পির একটা কেন, পাঁচটা বাচ্চা হলেও আই ডোন্ট কেয়ার। আমি তো ভীষণ ব্যস্ত আমার নিজের ফ্যামিলি প্ল্যানিং নিয়ে।”
মুখ ঘুরিয়ে নেয় প্রণমি। এসব কথায় তার রাগ পরে যায় এটা ঐ লোকটা জানে। একদম সদর দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরে সে। পরিস্থিতি একটু একটু করে স্বাভাবিক হচ্ছে দেখে ইরফান স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলে,“কি যাবে না বাইরে? এখানে দাঁড়িয়ে পরলে কেন? রাগ পরে গেছে?”
প্রণমি মুখটাকে গম্ভীর করে রেখেই জবাব দেয়,“বাইরেটা তো চিনিয়ে দেননি । বিয়ের রাতে বলেছিলেন, রাগ করলে এখান থেকেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন।”
__________
এর মাঝে এক দফা ঘুমিয়ে উঠেছে প্রেরণা। রাত তখন সাড়ে দশটার কাঁটায়। শুদ্ধ এখনো পুলসাইডে তার দাদু দীদুদের সাথে রাতের আকাশের চাঁদ দেখছে, হাওয়া খাচ্ছে। ছেলেটাকে আর ডাকেনা সে। প্রেরণা স্বানন্দে মেনে নেয় শুদ্ধর ওপর এ বাড়ির সকলের অধিকার বোধ,আস্কারা।
ফোনটা চেক করে দেখলো ইহানের থেকে আর কল আসেনি। আনমনে হেসে শরীর ভর্তি আলস্য নিয়ে ঘর থেকে বেরুতেই থমকাল সে।
চোখের সামনে ইরফানকে দেখে আচমকা ধাক্কা খেয়েছে প্রেরণা, প্রণমিকে পাঁজাকোলা করে ঘরের দিকেই যাচ্ছিল ইরফান। সারাদিন পরে প্রণমির শুকনো মুখটা জুড়ে খেলা করছে লাজুক আভা। ওদের মধ্যে কি হয়েছে তা জানেনা প্রেরণা, তবে এখন যে সবটা মিটমাট হয়ে গিয়েছে তা প্রণমির রাঙাভাব দেখেই বুঝলো প্রেরণা।
এই মুহূর্তে প্রেরণা কি করবে বুঝে উঠতে না পেরে দু'চোখ বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়ায়। ভাবী মনির সামনে ইরফানও দারুণ লজ্জায় পরে গিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে ওঠে,“হোচট খেয়েছে ভাবী মনি। পায়ে ব্যথা পেয়েছে।”
প্রেরণা ওপাশ ফিরেই ইতস্তত করে বলে ওঠে,“হ্যা ঠিকাছে ঠিকাছে, নিয়ে যাও। ”
ইরফান চলে যেতেই প্রেরণা হাসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে, বুক ভরে নেয় শ্বাস। তার সেই ছোট্ট বোনটা, কখনো কি প্রেরণা ভেবেছিল এভাবে তাকে আগলে রাখার মতো কাউকে পাবে প্রেরণা?
___________
ইহান এসেছে এগারোটা নাগাদ। বাড়ির একটা প্রাণীও তখন ঘুমায়নি। এমনকি ইচ্ছে-খুশিও না। তারা নানুমনিদের কোল ঘুরে ঘুরে খেলছে।
আর বাকিরা সবাই ট্রিপের পরিকল্পনা করতে ব্যস্ত।
বাড়ির বড়রাও খোশ মেজাজে আড্ডা দিচ্ছে। পরী এসে বারবার তাদের সকলকে খুঁচিয়ে বলছে,“কতদিন পরে একসাথে হয়েছে সবাই। ওরা আমাদের জন্য মনখুলে আনন্দ করতে পারছে না হয়তো। চলেন আমরা যে যার ঘরে ঘুমাতে যাই এখন।”
সামিন পরীর কথাতে মৃদু হাসে, আবারও চোরা চোখে সবাইকে দেখে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,“দেখতে দে পরী। ভালো লাগছে। আজ কেন জানি ঘুমও আসছে না আমার।”
_ঠিক তাই। ইচ্ছে করছে ওদের সাথে গিয়েই আড্ডা দিই। চক্ষুলজ্জায় তা পারছি না।
ইশমাম নিজের মেয়ে জামাইয়ের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে গদগদ হয়ে বললো।
আলো বলে ওঠে,“আপনাদের যেতে ইচ্ছা করলে যাবেন। ছেলে মেয়েদের সাথে আড্ডা দেওয়া কি খারাপ কিছু? এতটাই কি দূরত্ব হয়েছে ওদের সাথে? যান। আমি বরং নিচে গিয়ে আইসক্রিম বেড়ে নিয়ে আসি সকলের জন্য।”
আলোর কথায় উৎসাহিত হলো সামিন, কিছুক্ষণ বসে থেকে সমস্ত জড়তা কাটিয়ে নিয়ে গিয়ে বসলো ছোটোদের আড্ডায়। সামিনের পিছু পিছু বড়রা সবাই গেলো।
ওরা প্রথমে সকলে হকচকালেও পরে বড়দের জায়গা দিলো বসতে। প্রত্যেকে ব্যস্ত হয়ে পরলো কাকে কোথায় বসাবে। জামাইয়েরা উঠে গিয়ে নিজেরা চেয়ার টেনে আনলো।
সামিন বসে বলে,“তোমাদের সঙ্গে ট্রিপে যাবো না কাল, ভাবলাম আজ রাতটা আড্ডা দিই তোমাদের সাথে। বোর হবে নাতো?”
হতভম্ব ভাব কাটিয়ে হেসে উঠলো সবাই। মাথা নেড়ে বললো,“না বোর হবো না! মোটেও হবো না।”
__________
সন্ধ্যা থেকে দফায় দফায় বক্তৃতা দিয়ে গলা বসিয়ে ফেলেছে ইহান। ক্লান্ত পায়ে ঘরে ঢুকতেই দেখলো প্রেরণা বিছানা গোছাচ্ছিল। বরাবরের মতো দু'জনের চোখাচোখি হতেই দু'জন দু'জনকে অমায়িক হাসি উপহার দিলো। এত ঘন্টার ক্লান্তি ভাব যেমন করে ইহানের চোখমুখ থেকে উধাও হলো, ঠিক তেমন করে প্রেরণার মুখটাও উজ্জ্বল হলো, গত কয়েক ঘন্টার থেকে তাকে সুস্থ দেখা যাচ্ছে। ইহান তাই কিছু ঠাহর করতে পারলো না তখনো।
প্রেরণা এগিয়ে এসে ইহানের পাঞ্জাবির বোতাম খুলতে খুলতে বলে,“আজ সম্ভবত আপনি এ বছরের সবচেয়ে বড় ব্যস্ত দিন কাটিয়েছেন।”
ইহান কিছুপল চেয়ে থাকলো তার সমুদ্রনীলার নিখুঁত মুখটাতে, পর পর ঝুঁকে প্রেরণার কানে কানে কিছু একটা বলতেই প্রেরণা দু হাতে ওকে দূরে ঠেলে দিয়ে মিছিমিছি রাগ দেখিয়ে বলে,“এসব কথা আপনার সাথে যায়?”
হতাশ, বড্ড হতাশ ইহান। গমগমে স্বরে বলে ওঠে,“কোনো কথাই যদি আমার সাথে না যায় তবে আমি এখন থেকে চুপ থাকি?”
প্রেরণা দু'পাশে নাড়িয়ে অপরাধী গলায় বলে,“আমি এভাবে বলতে চাইনি।”
ইহান মুখ বিকৃত করে বলে,“এক কাজ করি, বৌয়ের সাথে এধরণের কথা আসলেই যায়না, আমি এখন থেকে আপনার সাথে রাজনৈতিক আলাপ করবো। আচ্ছা প্রেরণা এবছরের দ্রব্য মূল্যের উর্ধ্বগতির ব্যাপারে সরকারের নির্লিপ্ততা নিয়ে আপনার মত কি?”
প্রেরণা কপাল কুঁচকে ফেলে। ইহান এগিয়ে গিয়ে ওকে এক হাতে চেপে ধরে ঘাড়ে নাক ঠেকিয়ে বলে,“তারপর শুনুন আজ নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে কি ঘোষণা এসেছে....আজ হয়েছে কি....!”
এবার লোকটার মুখটা চেপে ধরে প্রেরণা বলে,“চুপ করুন, দোহাই। ভুল হয়েছে আমার। আপনার যা খুশি তাই বলুন আমি আর নাক সিটকাবো না। শুধু এইসব পলিটিক্সের আলাপ করবেন না।”
ইহান প্রেরণাকে ছেঁড়ে দিয়ে হাসলো, বাইরে তখন হাসাহাসির চাপা গুঞ্জন।
ইহান বাইরে মনযোগ রেখে বলে,“চলুন আইসক্রিম খাবেন। শুদ্ধ কই?”
একদম প্রেরণার হাতটাই টেনে নিয়ে যায় ইহান। বাইরে গিয়ে শুদ্ধকে কোথাও না পেয়ে সবাইকে জিজ্ঞেস করতেই আলো বলে,“পাচ মিনিট আগে ঘরে ঢুকলো। ঘুম পেয়েছে হয়তো।”
ইহান গটগট করে হেঁটে ঢুকলো শুদ্ধর ঘরে। প্রায় ঘুমিয়েই পরেছিল ছেলেটা। দুই হাতে ওকে আগলে নিয়ে বড্ড আদরে একটা চুমু খেয়ে ডাকে,“বাবা। আইস্ক্রিম খাবে? তোমার ফেব্রিটটা এনেছি। এই বাবা, ওঠো!”
শুদ্ধ তলিয়ে যাচ্ছে ঘুমে। আব্বুর ডাকে সাড়া দেয়না আর।
প্রেরণা দরজায় দাঁড়িয়েই দৃশ্যটা দেখছে চুপচাপ। ঠিক তখন ইশি এসে বলে,“দাদান ও ঘুমাচ্ছে ঘুমাক, তুমি এসো, সবাই অপেক্ষা করছে একসাথে খাবে তাই।”
ঘুমন্ত শুদ্ধকে আবার আলতো করে শুইয়ে রেখে ইহান বলে,“আসছি তুই যা।”
প্রেরণা চুপচাপ দৃশ্যটা দেখতে দেখতেই হঠাৎ আবার মাথা ঘুরে ওঠে ওর। এবং আবার ছুটে গিয়ে বমি করে একদফা।
ইহান সামলে নেয় ওকে। ভীষণ চিন্তিত, উদ্বিগ্ন, অস্থির ভঙ্গিতে দু গালে হাত চেপে বলে,“এসব হচ্ছে কেন? প্রেরণা?”
কন্ঠে এক ধরণের চাপা উত্তেজনা কাজ করছে ইহানের, ওর অবচেতন মন উত্তরটা জানে। এতটা বুদ্ধিহীন তো সে নয়। তবুও প্রেরণার মুখ থেকে জীবনের এই বিরাট প্রাপ্তির সুখবরটা শুনতে চাইছে পুরুষালি মনটা।
প্রেরণা নেতিয়ে ছিলো ইহানের বুকে। ইহানের প্রশ্নে হাসলো দুর্বলের মতন। বাইরের ঘরে সবাই তখন উচ্চশব্দে হাসাহাসি করছে, তাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন জামাইরা। যে যার কর্ম জীবনের গল্প বলছে। খানিক বাদে আবার শুনতে পেলো প্রণমি গান ধরেছে সবার কথাতে।
এতো চমৎকার একটি পারিবারিক কোলাহলের মাঝেই প্রেরণা শ্বাস ফেললো, মুখটাকে ইহানের কানের কাছে নিয়ে নিচু তবে দৃঢ় স্বরে বলে উঠলো,“এই ইহান। আপনি দ্বিতীয় বারের মতন বাবা হতে চলেছেন।”
ইহানের কান ঠান্ডা হলো। তার শক্ত পোক্ত শরীরটা টের পেলো তার পা থেকে মাথা ছড়িয়ে পরেছে দুর্দমনীয় প্রশান্তি। ইহান তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যাল করে। প্রেরণা পুনরায় ক্লান্তি মাখা হাসি হেসে দুইহাতে লোকটার শক্ত শরীরটা জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে বললো,“অভিনন্দন। আপনাকে অনেক অনেক অভিনন্দন ইহান তাজওয়ার মির্জা।”
~~~~~~~সমাপ্ত~~~~~~~~~
গল্পটা নিয়ে আমি বেশি কিছু লিখবো না। আমি শুধু জানি কোনোরকম নির্দিষ্ট কাহিনী ছাড়া পাঁচমেশালি এই গল্পটির পেছনে আমি আমার সর্বোচ্চ শ্রম দিয়েছি। আমার নয় মাসের ধ্যান এই গল্পটি।
যারা এই পুরো জার্নিতে আমার সাথে ছিলেন,সদয় ছিলেন তাদের প্রতি রইল আমার কৃতজ্ঞতা।
আমি জানি সমান ভাবে আমি পাঁচ জুটির প্রেমীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছি। তবে ওদের পরিণয়, প্রণয় এবং বোঝাপড়ায় ঢেলেছি নিজের সর্বোচ্চ পরিশ্রম।
পরিবার ছিল এই গল্পটির মূল ম্যাটেরিয়াল। একটা পারিবারিক রিইউনিয়নের মাঝে গল্পটি শেষ করার ইচ্ছে ছিলো। করেছি।
আজ আমার কথা আসছে না কোনো। আপনারা ভালো থাকুন।