লেখিকা: আরফা আইরিশা
### অদৃশ্য মায়াজাল
### পর্ব ২: অতীতের অচেনা ছায়া
রাতের শহরটা অদ্ভুত নীরব। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ইশরাত নওশিন রহমান বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। হাতে ধরা ফোনের স্ক্রিনে এখনো সেই অচেনা মেসেজটি জ্বলছে।
“আদ্রিয়ানের কাছ থেকে দূরে থাকুন। আপনার মায়ের মৃত্যুর পেছনের সত্য আপনি জানেন না।”
মেসেজটি পড়ার পর থেকে নওশিনের মাথায় একের পর এক প্রশ্ন ঘুরছে। তার মায়ের মৃত্যু নিয়ে এত বছর পর কেউ কেন কথা বলবে? আর আদ্রিয়ান মাহমুদের সঙ্গে তার মায়ের সম্পর্কই বা কী?
পেছন থেকে নীলার ডাক শুনে সে ঘুরে দাঁড়াল।
—আপু, কী হয়েছে? এতক্ষণ ধরে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছ কেন?
নওশিন ফোনটা লুকিয়ে বলল,
—কিছু না। একটা কাজের মেসেজ এসেছে।
নীলা সন্দেহের চোখে তাকাল।
—তোমার মুখ দেখে তো কাজের মেসেজ মনে হচ্ছে না।
নওশিন মৃদু হাসল।
—তুই এখন ঘুমাতে যা। কাল সকালে তোর কলেজ আছে।
নীলা চলে গেলেও নওশিনের চোখে ঘুম এল না।
অন্যদিকে মাহমুদ বাড়িতে আদ্রিয়ান নিজের অফিস রুমে বসে ছিল। সামনে কয়েকটি পুরোনো ফাইল খোলা। তানভীর তার পাশে দাঁড়িয়ে রিপোর্ট দিচ্ছিল।
—স্যার, মেয়েটির সম্পর্কে যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে, সব এখানে আছে।
আদ্রিয়ান ফাইলটা হাতে নিল।
—নওশিন রহমান। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে কাজ করে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পায় না। তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবদুল রহমান।
তানভীর মাথা নাড়ল।
আদ্রিয়ান ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—ওর মায়ের নাম কী?
—মেহের রহমান।
নামটা শুনেই আদ্রিয়ানের চোখ স্থির হয়ে গেল।
—আবার বলো।
—মেহের রহমান, স্যার।
আদ্রিয়ান ধীরে ফাইলটা বন্ধ করল।
—এই নামটা এত বছর পর আবার সামনে আসবে ভাবিনি।
তানভীর জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি তাকে চিনতেন?
আদ্রিয়ান উত্তর দিল না। বরং ড্রয়ার খুলে পুরোনো একটি ছবি বের করল। ছবিতে তার বাবা, মাহির চৌধুরী এবং মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী।
নারীটির মুখের দিকে তাকিয়ে আদ্রিয়ান ফিসফিস করে বলল,
—মেহের রহমান...
সকালে নওশিন বাবার সঙ্গে নাশতা করছিল। আবদুল রহমান পত্রিকা পড়ছিলেন।
নওশিন হঠাৎ বলল,
—আব্বু, আম্মুর মৃত্যুর আগের সময়টার কথা তোমার মনে আছে?
আবদুল রহমান পত্রিকা নামিয়ে তাকালেন।
—হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
—এমনিই জানতে ইচ্ছে হলো। আম্মু কি কাউকে নিয়ে চিন্তিত থাকতেন?
আবদুল রহমান কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
—তোর মা অনেক কিছু নিজের মধ্যে রাখত। তবে মৃত্যুর কয়েক দিন আগে ওকে বেশ চিন্তিত দেখেছিলাম।
—কী নিয়ে?
—সেটা কোনো দিন জানতে পারিনি।
নওশিন বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আম্মুর কোনো পুরোনো ছবি বা চিঠি আছে?
আবদুল রহমানের মুখের ভাব বদলে গেল।
—আছে। কিন্তু সেগুলো নিয়ে এখন ভাবিস না।
নওশিন আর প্রশ্ন করল না। তবে সে বুঝতে পারল, বাবা কিছু একটা জানেন।
দুপুরে একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলো আদ্রিয়ান। সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরাও ছিল।
নওশিনও তার সংগঠনের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে এসেছে।
দুজনের চোখাচোখি হতেই আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
নওশিন এগিয়ে এসে বলল,
—আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।
আদ্রিয়ান শান্ত গলায় বলল,
—বলুন।
—গতকাল আপনি আমার সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছেন কেন?
আদ্রিয়ান অবাক হওয়ার ভান করল না।
—আপনার সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা আমার প্রয়োজন ছিল।
—কী প্রয়োজন?
—সেটা এখন বলতে পারছি না।
নওশিন বিরক্ত হয়ে বলল,
—আপনারা ক্ষমতাবান মানুষরা কি সব প্রশ্নের উত্তর নিজের কাছে রেখে দেন?
আদ্রিয়ানের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।
—সব প্রশ্নের উত্তর সবার সামনে বলা যায় না।
নওশিন কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই অনুষ্ঠানের এক পাশে কয়েকজন মানুষ বিশৃঙ্খলা শুরু করল। তারা স্বেচ্ছাসেবীদের কাজ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করছিল।
নওশিন এগিয়ে গিয়ে প্রতিবাদ করল।
—আপনারা কথা বলতে পারেন, কিন্তু কাউকে অপমান করার অধিকার আপনাদের নেই।
একজন লোক রেগে বলল,
—তুমি জানো আমরা কারা?
নওশিন দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—আপনার পরিচয় দিয়ে অন্যায়কে সঠিক বানানো যাবে না।
আদ্রিয়ান দূর থেকে পুরো ঘটনা দেখছিল। সে তানভীরকে ডেকে বলল,
—ওই লোকগুলোর পরিচয় বের করো। তারা এখানে কেন এসেছে, জানতে চাই।
তানভীর মাথা নাড়ল।
অনুষ্ঠান শেষে নওশিন বাড়ি ফিরছিল। রাস্তায় হাঁটার সময় আবার ফোনে একটি মেসেজ এল।
“আপনি ভুল মানুষের কাছে উত্তর খুঁজছেন। আদ্রিয়ান মাহমুদকে বিশ্বাস করবেন না।”
নওশিন এবার আর চুপ থাকতে পারল না। সে মেসেজের উত্তর দিল,
—আপনি কে? আমার মায়ের ব্যাপারে কী জানেন?
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
“আপনার মায়ের শেষ চিঠিটা খুঁজে বের করুন।”
নওশিন থমকে গেল।
তার মা কি সত্যিই কোনো চিঠি রেখে গেছেন?
রাতে আদ্রিয়ান নিজের ঘরে বসে বাবার পুরোনো ফাইল দেখছিল। ফাইলের শেষ পাতায় একটি নাম লেখা—মাহির চৌধুরী।
ঠিক তখনই রায়ান ঘরে ঢুকল।
—ভাইয়া, আবার সেই পুরোনো ফাইল?
আদ্রিয়ান ফাইল বন্ধ করল।
—তোর এখানে আসার কারণ?
রায়ান হেসে বলল,
—নিজের বড় ভাইয়ের খোঁজ নিতে এসেছি। তাতে কি অপরাধ করেছি?
আদ্রিয়ান গম্ভীরভাবে বলল,
—আমার ঘরে আসার আগে দরজায় নক করতে হয়।
রায়ান মুচকি হেসে বলল,
—আপনার রাগ দেখে মনে হচ্ছে, আজও কারও ওপর রাগ ঝাড়ার সুযোগ পাননি।
আদ্রিয়ান উত্তর দিল না।
রায়ান চলে যাওয়ার পর তার ফোনে একটি কল এল।
অপরিচিত কণ্ঠ বলল,
—মাহির ফিরে এসেছে।
আদ্রিয়ানের চোখ কঠিন হয়ে গেল।
—কোথায়?
—আপনার কাছাকাছি।
কল কেটে গেল।
আদ্রিয়ান জানালার বাইরে তাকাল। এত বছরের পুরোনো হিসাব আবার সামনে চলে আসছে।
একই সময়ে নওশিন মায়ের পুরোনো জিনিসপত্র খুঁজছিল। আলমারির নিচের তাকে একটি কাঠের বাক্স পেল।
বাক্স খুলতেই কিছু ছবি, একটি ডায়েরি এবং ভাঁজ করা চিঠি বেরিয়ে এল।
চিঠির ওপর লেখা—
“আমার মেয়ে নওশিনের জন্য।”
নওশিন কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলল।
প্রথম লাইন পড়েই তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
“নওশিন, যদি কোনো দিন আদ্রিয়ান মাহমুদের নাম তোর সামনে আসে, তাহলে বুঝবি আমাদের অতীত আবার ফিরে এসেছে।”
নওশিনের হাত থেকে চিঠিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
তার মা আদ্রিয়ানকে চিনতেন!
কিন্তু কীভাবে?
চিঠির শেষ অংশে লেখা ছিল—
“মাহির চৌধুরীকে কখনো বিশ্বাস করিস না। আর আদ্রিয়ানকে বিচার করার আগে তার বাবার সত্যিটা জেনে নিস।”
নওশিন বিস্ময়ে চিঠির দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ হলো।
সে দ্রুত চিঠিটা লুকিয়ে ফেলল।
দরজা খুলে দেখল, তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন।
আবদুল রহমানের চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো ছবিটার দিকে।
ছবিতে নওশিনের মা দাঁড়িয়ে আছেন আদ্রিয়ানের বাবার পাশে।
আবদুল রহমানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
তিনি নিচু স্বরে বললেন,
—এই ছবিটা তুই কোথায় পেলি?
নওশিন বাবার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
—আব্বু, আদ্রিয়ান মাহমুদের পরিবারের সঙ্গে আম্মুর সম্পর্ক কী ছিল?
আবদুল রহমান কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু ছবিটা হাতে নিয়ে বললেন,
—যে সত্য এত বছর লুকিয়ে রেখেছি, সেটা জানার পর তুই হয়তো আর আগের মতো থাকতে পারবি না।
নওশিনের চোখে দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
—তবুও আমি সত্যিটা জানতে চাই।
আবদুল রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তাহলে তোকে আগে জানতে হবে, তোর মা কেন মৃত্যুর আগে আমাকে একটা কথা বলতে নিষেধ করেছিল।
চলবে...!!