ফন্ট সাইজ:
থিম:
জায়া ও পতি

পর্ব 6

লেখক: ইসরাত ইতি

#জায়া_ও_পতি
#পর্ব_৬
#ইসরাত_ইতি

বাড়ির নামটা বেশ সুন্দর,“কমলা রঙের রোদ।” এতো সুন্দর বাড়ির নাম হয়? জান্নাত এর আগে এমন নাম দেখেনি কোনো বাড়ির। সাধারণত বাড়ির নেমপ্লেটে লেখা থাকে “অমুক মঞ্জিল”,“অমুক ম্যানশন”,“তমুক ভিলা” ইত্যাদি ইত্যাদি।
গাড়ি থেকে নেমেই নামটা চোখে পরতেই জান্নাতের চোখ আটকে যায় সেখানে, শামিরদের বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়িটা রেখে তার চোখ ঘুরে ঘুরে নেমপ্লেট টা দেখছে। তামাটে-সোনালি রঙের নেমপ্লেটটা খুব ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করছে জান্নাতের।

গাড়ি থেকে মালামাল নামাচ্ছে বাড়ির দাড়োয়ান। শামির এসে জান্নাতের পাশে দাড়াতেই জান্নাত সংকোচে জড়োসড়ো হয়, পাগলকে থাপড়ানোর ঘটনার পর থেকে জান্নাত আরো কিছুটা ভয় পাচ্ছে শামির কে, এ শুধু মেজাজী লোক নয়, বেপরোয়াও বটে।

শামির ওকে দেখে বলে,“ভেতরে এসো। এটা আমার বাড়ি। এখন থেকে তোমারও।”

রুহি আর শামা দু'জনে এসে ধরলো জান্নাতকে। হলুদ জামদানি,গলায় স্বর্ণালঙ্কার,একটা লম্বা ঘোমটা, একটা টকটকে হলুদ বৌ পা রাখে তার স্বামীর ঘরে।
চোখ বড় বড় করে জান্নাত শামিরদের বাড়িটা দেখে,বাড়িটা চেয়ারম্যান চাচার বাড়ির থেকেও তিনগুণ বেশি বড়। এবং বাড়িটার রঙ কমলা, এজন্যই বোধহয় অমন নাম দেয়া হয়েছে বাড়িটার।

স্বামীর গৃহে প্রবেশের পর জান্নাত টের পেলো এই দুনিয়া সম্পূর্ণ নতুন, সম্পূর্ণ আলাদা একটি জগত হতে চলেছে তার জন্য। যে দুনিয়া একটু বেশিই চকচকে, বিলাসবহুল। এসব কিছু জান্নাতের হজম হবে তো?

বরিশাল সিটিতে চৌধুরীদের যত আত্মীয় স্বজন ছিলো,সবাই ছুটে আসছে শামির বৌ নিয়ে এসেছে শোনামাত্রই।

জান্নাতকে প্রথমে বসানো হয়েছিল ড্রয়িং রুমে, এরপর রিজিয়ার নির্দেশে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় শামিরের ঘরে, বিশাল বড় রুমটায় ঢুকে জান্নাত হা হয়ে যায় একেবারে। অক্ষিযুগল প্রশ্বস্ত করে দেখতে থাকে চারপাশ,নীড়া যা কিছু বর্ণনা করেছিল ঘরটা তার থেকেও সুন্দর,ঝা তকতকে। বিশাল বড় পালঙ্কের মতো খাট, আলমারি,আরেকটা ছোটো খাট, কম্পিউটার সবকিছু ঠাশা। বিছানার কোণে বসে এসব যখন জান্নাতুল দেখছিলো তখন রুহী জান্নাতের লাগেজ থেকে সবকিছু বের করে একটা খালি আলমারিতে রাখতে রাখতে বলে,“ভাইয়া একটু অফিসে গিয়েছে, তুমি গোসল সেরে এই শাড়িটা পরো। রাজ্যের মেহমান আসবে কিন্তু ভাবী!”

জান্নাত মাথা নাড়ায়, শামির এসে পাঁচ মিনিটও থাকেনি বাড়িতে। পোশাক না পাল্টেই চলে গিয়েছে। জান্নাত এতে খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাসই ফেললো।
মায়মুনা পাড়ার মহিলাদের সাথে গল্প করছে,“চান্দের নাহান বৌ হইচে মোর শামিরের। চান্দের নাহান।”

জান্নাতুল তখন শাড়ি-ব্লাউজ নিয়ে ওয়াশ রুমে ঢুকলো, নানা রকমের আর্টিফিশিয়াল প্ল্যান্টস দিয়ে সাজানো একটা কলঘর। বিশালাকার কলঘরটা চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ, জান্নাতের মনে ধরেছে খুব কলঘরটা, সে যেন গহীন অরণ্যে এসেছে গোসল সারতে।

একটা লাল জামদানি শাড়ি,যার পাড় কালো। জান্নাত জড়িয়ে নিল গাঁয়ে, ওর ননদরা অবাক হয় এতটুকু মেয়ে কি সুন্দর করে শাড়ি পরে।
শামির ফিরেছে কিছুক্ষণ পরেই,একটা হিসেব মিলিয়ে চলে এসেছে, বাড়িতে মেহমান আসতে শুরু করেছে, এখানে তার থাকা প্রয়োজন তাই।
ঘরে ঢুকতেই দেখলো তার বিছানায় চুপচাপ বসে আছে জান্নাত, শামিরকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে মাথায় ঘোমটা টানলো।

শামির ব্লেজার খুলে রেখে শার্টের টপ বোতাম দু'টো খুলে বেশ আয়েশ করে বসলো বিছানায়, জান্নাতকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললো,“দাড়িয়ে আছো কেন? বসো! এটা তোমারও বিছানা।”

জান্নাত চুপচাপ বসলো,জড়তা কাটিয়ে। শামির ওকে দেখছে, সদ্য গোসল সেরেছে বলে ফরসা মুখটা আরো বেশি স্নিগ্ধ লাগছে। শামির বললো,“ও বাড়ির জন্য মন খারাপ?”

জান্নাত দু'পাশে মাথা নাড়ে,যদিও তার মন খারাপ। শামির পুনরায় বলে ওঠে,“সবাই আসবে আজ বাদে কাল অনুষ্ঠানে।”

লোকটা যা-ই বলে কেমন গম্ভীর হয়ে বলে, জান্নাত শুধু মাথা নেড়ে জবাব দেয়। হঠাৎ শামির বলে,“এদিকে এসো জান্নাতুল! তোমার নাকে কি হয়েছে?”

জান্নাত নাকে হাত রেখে চোখ তুলে তাকায়, শামিরের কন্ঠে আদেশ ছিলো, তবে সে কাছে না গিয়ে বললো,“আপনাদের দেয়া নাকফুলের ডাটা টা ঢোকাতে গিয়ে কাল ব্যাথা পেয়েছি, এজন্য লাল হয়েছে।”

জান্নাতের কথার জবাব না দিয়ে শামির ভারি স্বরে বললো,“আমি আমার কাছে আসতে বলেছি।”

এইবার জান্নাত চুপচাপ এগিয়ে যায়। এগিয়ে গিয়েও মাঝখানে কিছুটা যায়গা নিয়ে বসে,তবে শামির একটানে ওকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে দেখতে থাকে জান্নাতের নাক।

ঘটনার আকস্মিকতায় ঘাবড়ে যাওয়া জান্নাত চোখমুখ খিচিয়ে নেয়। ঢোক গেলে বারংবার।

শামির একহাতে জান্নাতকে ধরে রেখে আরেক হাত ছোঁয়ায় জান্নাতের নাকে,বলে,“ইশশ খুব খারাপ অবস্থা হয়েছে দেখছি। এটা পরে থাকতে কষ্ট হচ্ছে?”

জান্নাত আড়ষ্ট হয়ে ছিলো স্বামীর সাথে মিশে, হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে গিয়েছে টের পেলো, অনেকটা ভয়ে তবে কিঞ্চিত লজ্জাও ছিলো। জান্নাত বুঝতে পারছে না তার এই লোকের উপর রাগ হচ্ছে না কেন, সে শুধু পাচ্ছে লজ্জা, পাচ্ছে ভয়।

শামির আবারও গম্ভীর হয়ে জানতে চাইলো,“খুলে দেবো?”

_আম্মা খুলতে বারণ করেছে।
দম আটকে থাকা জান্নাত অস্ফুটে বললো কোন মতে, সে কাঁপছে, শামির আলতো আঙ্গুল বুলিয়ে ওর নাকের লাল হওয়া স্থান ছুঁয়ে দিলো,চোখ বুজে থাকা জান্নাত,তার গাঁয়ের মিষ্টি ঘ্রাণ,এক নিস্তব্ধ দুপুর, শামির বৌ আর পরিবেশের নিস্তব্ধতায় লাই পেয়ে হুট করে জান্নাতের নাকে,গালে চু'মু খেতে লাগল।

আচানক অজানা পরম স্পর্শে জমে গেলো জান্নাত,কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ বড়বড় করে ফেললেও চোখ বুজে নিল আবারও, খামচে ধরলো বিছানার চাদর, শুধু অস্ফুটে বললো,“আমি যাই? আম্মা যেতে বলেছেন।”

থামলো শামির, নিঃশ্বাস ফেলছে ঘন,জান্নাতের মুখের দিকে কিছু পল তাকিয়ে থেকে নিজেকে সামলে নিলো। তবে ছাড়লো না জান্নাতকে। এমন শক্ত বাঁধনে জান্নাতের অস্বস্তি হচ্ছিল তবুও ছাড়লো না, এক হাতে ফোনটা তুলে নিয়ে শামির ফোন করলো রুহিকে,বললো,“শিগগির মায়ের জুয়েলারি বক্স থেকে একটা সিম্পল নাকফুল নিয়ে আয় আমার ঘরে, একেবারে হালকা,ডাটা যেন খুবই সরু হয়।”

ফোন কেটে শামির জান্নাতকে ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। জান্নাত নিজের ঘোমটা সামলে নিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। খানিক বাদে সুহানাই এলো,সাথে একটা ছোট বক্স হাতে।
শামিরকে দেখে বললো,“আমি তখনই শান্তাকে বলেছিলাম এতো ভারি কিছু না নিতে। ব্যাথা করছে জান্নাত?”

জান্নাত মাথা নেড়ে বলে,“জি।”

সুহানা বক্স থেকে অতি ক্ষুদ্রাকার একটা নাকফুল বের করে জান্নাতের নাক থেকে নাকফুলটা খুলে ওটা পরিয়ে দিতে দিতে বলে,“কি জাদু করলে গো জান্নাতুল। এক রাত পেরোতেই কত যত্ন করতে শুরু করেছে দেবর আমার,বাব্বাহ!”

কথাটি শুনে জান্নাতের গাল দুটো তার অজান্তেই লাল হয়, ভালোবাসা অনুভূতি এসবের সাথে এই কিশোরী মেয়েটি পরিচিত নয়, একজন পুরুষের প্রতি নারীর অনুভূতি কিভাবে আসে, কেন তাদের মধ্যে ভালোবাসা তৈরি হয়, এসব কিছুই জান্নাত জানেনা। সে জানে,মামী চাচী বিবাহিতা বান্ধবীরা সবসময় বলেছে স্বামীকে ভালো বাসতেই হবে, এমনটাই নাকি নির্দেশ আছে নারীদের জন্যে।
তাই কিছুক্ষণ আগে যা হলো, জান্নাতের খারাপ লাগেনি মোটেই। কিছুসময়ের জন্য স্বামী নামের মানুষটার জন্য জান্নাতের বুকের মধ্যে অন্যরকম এক অনুভূতি এসে জড়ো হয়,যেমনটা ওর বান্ধবীদেরও হতো। এই অনুভূতি আর যাই হোক বিতৃষ্ণা নয় । জান্নাত হাত দিয়ে নিজের গাল ছোঁয়, ঐ লোকটা তার গাল চুমেছে তাই লজ্জায় কান দু'টো গরম হয়েছে তার। এসব কি তাকে রোজ সহ্য করতে হবে? ঐ মেজাজী লোকটার থেকে! সুহানার কথাবার্তা কিছুই জান্নাতের কানে ঢুকছে না, সে আড়চোখে শামিরকে দেখে,যে কানে ফোন চেপে কথা বলছে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। জান্নাত নির্নিমেষ দেখছে লোকটাকে, কিশোরীর মনে স্বামী সম্বোধনের মানুষটার জন্য সমীহ এলো, কিছুক্ষণ আগে জান্নাতের নাক ছুঁয়ে দরদ নিয়ে জান্নাতের ব্যাথা দেখতে চেয়েছে বলে কিশোরী দেহের মধ্যে লুক্কায়িত এক অবলা নারী মন এতটুকুতেই বিগলিত হয়েছে। সে মন অনুভূতির ব্যাখ্যা খোজে না, ভালোবাসা নামের এই জটিল শব্দটা সম্পর্কে কোনো ধারণাও রাখে না, শুধু জেনেছে তার স্বামী তাকে আদর করেছে,যার সাথে সৃষ্টিকর্তা জান্নাতের কপাল বেঁধেছে,যাকে সমীহ না করলে তিনি পাপ দেবেন।

শামির ফোনে কথা বলছে একটানা, জান্নাত শুধু লোকটাকেই দেখছে। লম্বা একটা লোক। কোন পুরুষকে সুদর্শন বলতে হয় অত জটিল জ্ঞানও নেই জান্নাতের, শুধু বুঝতে পারলো তার গ্রামের সব মেয়েদের স্বামীর চেয়ে তার স্বামী দেখতে ভালো, রঙটা একটু চাপা, তবুও একেবারে নিখুঁত,একটা হিন্দি সিনেমার নায়কের মতো,নায়কটার নাম মনে পরছে না জান্নাতের।

একা একা মিটিমিটি হাসছে জান্নাত, সুহানা বললো,“চলো এবার, প্রতিবেশী চাচীরা এসেছে তোমায় দেখতে।”

লাল টুকটুকে শাড়ি পরা চৌধুরী বাড়ির মেজো বৌকে উপস্থাপন করা হলো প্রতিবেশী চাচীদের সামনে। চৌধুরীদের আত্মীয় মেহমানরা এখনও এসে পৌঁছায়নি।

জান্নাতকে দেখেই প্রতিবেশী চাচীরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে পরলেন জান্নাতের রূপ নিয়ে, কেউ কেউ জান্নাতের মুখের সামনেই বলে উঠলো,“আগের বৌটার থেকে ঢের ভালো। শামির এবার জিতেছে।”

ওসব শুনে জান্নাতের মোটেও ভালো লাগেনি, তবুও চুপচাপ বসে রইলো। হঠাৎ আরেকটা কথা তার মাথায় এলো, লোকটার সাথে কেন তার আগের বৌয়ের বনিবনা হলো না? তাদের গ্রামে এমন পাঁচ ছয় বাড়িতে দেখেছে,বিয়ের দুই মাসের মাথায় তালাক। কারণ ছিলো বৌয়ের বাপের বাড়ী থেকে টাকা চাওয়া, সেখান থেকে শুরু হতো দ্বন্দ্ব। মারজিয়া ভাবীকে তো জাহিদ ভাই পিঁড়ি দিয়ে পিটিয়েওছিলো, তারপর হলো তালাক। লোকটা কি এমন কিছু করতো?

জান্নাত নিজেকে শুধরে নেয়। না না। এই বাড়ির সবাই কমবেশি খুব ভালো মনে হচ্ছে, যৌতুকের জন্য ডিভোর্স হলে লোকটা তো আর পরে জান্নাতকে বিয়ে করতো না, জান্নাত তো গরীব!

বিকেলটা জান্নাতের কেটেছে ভয়াবহ ব্যস্ততায়, চৌধুরীদের আত্মীয় স্বজনে ঘর ভরে গিয়েছে,জান্নাতকে সাজিয়ে গুছিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছিল পুতুলের মতন তাদের সামনে। মুখ দেখে কত মুরব্বি মহিলারা এটা সেটা উপহার দিলো, জান্নাতের হাঁফ ধরে গেলো এসবে।

সন্ধ্যাটা খানিকটা ছাড় পেয়েছিল জান্নাত। পুরো বাড়িটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলো তার ননদ রুহি। শামির গিয়েছে তার বন্ধুদের গেট থেকে রিসিভ করতে, জান্নাতকে দেখতে আসবে আজ শামিরের বন্ধু এবং বন্ধু পত্নীরা।

বাড়ির সবগুলো ঘর ঘুরে ঘুরে দেখা শেষ জান্নাতের, দোতলায় সবথেকে দক্ষিণে তাদের ঘর। দুটো কামরা পরেই রুহির ঘর। বড়লোক মেয়েদের ঘর, ঘরভর্তি গোলাপী রঙের টেডি পুতুল,ঘরে যা কিছু আছে সবকিছু গোলাপী রঙের।

জান্নাত বিস্মিত হয়ে সবকিছু দেখছিলো ঘুরে ঘুরে,রুহি হেসে বললো,“এই পুতুল দাদীর চোখে পরলে খবর আছে। সব পুড়িয়ে দেওয়ার অর্ডার করে দেবে। তুমি বসো ভাবী, তুমি বলো, তোমার খারাপ লাগছে?”

জান্নাত চুপচাপ মাথা নাড়ে, সবকিছু নতুন, সে শুধু বিস্মিত হচ্ছে,তবে খারাপ লাগছে না। এর মাঝে সুহানার ফোন থেকে বাড়ির লোকের সাথেও একবার কথা বলে নিয়েছে। তার বান্ধবী ফুল আগ্রহ নিয়ে জানতে চেয়েছে,“ওখানে কোন কলেজ টাতে ভর্তি হবি রে জান্নাত?”

_জানিনারে, এখনও তো রেজাল্ট দিলো না, দেখি উনারা কি বলেন।

এশার নামাজের পরে জান্নাত শামিরের রূমেই চুপচাপ বসে ছিলো, শামির ত্রস্ত পায়ে ঘরে ঢুকতেই সে উঠে দাঁড়ায়,শামিরের পেছন পেছন তার বন্ধু পত্নীরা ঢুকলো, যাদের সাথে কিছুক্ষণ আগে আলাপ করিয়ে দিয়েছে শামির নিচে ডেকে নিয়ে। মেয়েগুলো জান্নাতের থেকেও বয়সে অনেক বড়, গায়ের পোশাক অনেক দামী, এবং অনেক সাজগোজ। শামির জান্নাতকে বললো,“জান্নাতুল। ওনাদের সাথে গল্প করো।”

জান্নাত চুপচাপ মাথা নাড়ায়। মেয়েগুলো জান্নাতের আশেপাশে গোল হয়ে বসে জান্নাতকেই দেখছে, জান্নাতকেই কেনো শামির চৌধুরী বিয়ে করলেন শেষে এই নিয়ে তাদের কৌতুহলের অন্ত নেই, যোগ্যতা বিচারে এই মেয়ের রূপ এবং অল্পবয়সী কুমারী ব্যাতীত অন্য কোনো যোগ্যতা তারা পেলো না, অবশ্য পুরুষের কাছে এগুলোই তো নারীর বিরাট বড় যোগ্যতা। খুঁতখুঁতে শামির চৌধুরীও হয়তো এখানেই গলেছে ডিভোর্সের পরে এইবার।

◻️

শামির জ্বলন্ত সিগারেট টা কেবলই ঠোঁটে চেপে ধরছিল, তার বন্ধু সিয়াম এক ঝটকায় সিগারেট টা তার হাত থেকে ফেললো। শামির বিরক্ত মুখে তাকায় বন্ধুর দিকে। বাড়ির পেছনের আঙ্গিনায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলো সে। সিয়াম ঠাট্টা করে বললো,“এখন সিগারেট খাস না দোস্ত, একটু পর বৌয়ের কাছে যাবি। বাচ্চা মানুষ, সিগারেটের গন্ধে কাশি উঠে যাবে।”

হো হো করে হেসে ওঠে বন্ধুরা। শামির রাগী চোখে সিয়ামকে দেখে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে বলে,“পার্সোনাল বিষয় নিয়ে মজা পছন্দ করি না আমি।”

সিয়াম চুপ হয়ে যায়, বন্ধুদের মধ্যে শামির আগাগোড়াই অন্যরকম, বন্ধুরাও ওকে রয়ে সমঝে চলে। তানভীর বলে উঠলো,“আচ্ছা দোস্ত ফান বাদ, এখন একটা সিরিয়াস টপিকে তোর সাথে আলোচনা করি। ভাবী সাহেবাকে বড্ড ভালো লেগেছে সবার, তোর পছন্দ টপ ক্লাস! এখন একটা সাজেশন দিই বন্ধু হিসেবে, ছোটো মানুষ তো,ওর সাথে তোর ইগো কম কম দেখাস, ও তো বুঝতেই পারবে না তোকে, একটু বন্ধুর মতো থাকিস, তেমন আচরণ করিস।”

সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে শামির তানভীরের দিকে চায়,একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মুখটাকে চির গম্ভীর করে বলে,“স্বামী স্ত্রী হতে হবে বন্ধুর মতো, তোদের এই অতি আহ্লাদের কথাটা স্বামী স্ত্রীর অ্যাকচুয়াল সংজ্ঞাটাকে মিটিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটা প্রভাবিত হচ্ছে ভুল টার্মে। স্বামী স্ত্রী,স্বামী স্ত্রীই হয়! এরা কখনো বন্ধু হয় না। স্ত্রীকে বন্ধু ভাবা নিজের স্বামীত্বের মান কমানো ছাড়া কিছুই না। বর্তমানে আশেপাশে চোখ বোলালেই দেখবি স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের ব্যালেন্স নষ্ট হয় এই বন্ধু হতে গিয়ে। স্ত্রী একজন পুরুষের অধিনস্ত,এটা অস্বীকার করে পুরুষ নিজের মান কমাচ্ছে এটা পুরুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে, আর এইসব নারীবাদী পুরুষ যারা স্ত্রীকে বন্ধু বানানোর মন্ত্র আওড়ায়,এরা নারীদের অ্যাটেনশন চায় শুধু। আমি সত্যি কথা বলি, আমার স্ত্রী আমার অধীন,আমার দায়িত্ব এক জন্মের। তাকে আমার অধীনস্থতা স্বীকার করতেই হবে। আদর,শাসন সবকিছু স্ত্রীর মতো পাবে, কোনো বন্ধুর মতো নয়। এবং শামির চৌধুরী বর্তমানে শিখে গিয়েছে বৌকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখে সংসার করতে হয়। ডোন্ট ওরি! তোরা চাপ নিস না!”

মেজাজ পাশে সরিয়ে রেখে শামির কথাগুলো বলেছে একেবারে শান্ত গলায়। ওর বন্ধুরা চেয়ে চেয়ে দেখেছে শুধু। ফারিনের সাথে দেড়মাসের সংসারের পরে বনিবনা হয়নি বলে ডিভোর্স নিয়েছে ফারিন। ওটাও অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ ছিলো। অবশ্য ফারিনের মতো ডাক্তার মেয়ে শামিরের এই একরোখা আচরণ মানবে না। তাই আগে ভাগেই কেটে পরেছে বুদ্ধিমতী মেয়ে ফারিন। কিন্তু শামিরের বর্তমান স্ত্রীর জন্য চিন্তা হচ্ছে ওর বন্ধুদের। শামিরকে কিভাবে সামাল দেবে এই বাচ্চা মেয়ে কে জানে!

◻️

শহরের রাতগুলো গ্রামের রাতের মতো নয় জান্নাত বুঝতে পারলো, রাত তখন এগারোটা প্রায়, কিন্তু মনে হচ্ছে এই সন্ধ্যা রাত,অথচ গ্রামে আটটা নাগাদই ঘুম চলে আসে চোখে। সারাদিনের ধকল শেষে জান্নাত একটু জিড়োতে পারছে এখন, একঘন্টা হলো ছাড়া পেয়েছে সে, মেহমান চলে গিয়েছেন কিছু সংখ্যক,বাকিরা রয়ে গিয়েছেন, একেবারে বড় অনুষ্ঠান শেষ করে যাবেন।

রাতের খাবার খাইয়ে জান্নাতকে ঘরে পাঠিয়েছে তার জা আর শাশুড়ি, হাতে দু'টো আইস্ক্রিম কাপ ধরিয়ে দিয়েছে,শামিরকে নিয়ে খেতে বলেছে। জান্নাত ঘরে ঢুকে শামিরকে কোথাও পেলো না,আজ তাদের বিয়ের দ্বিতীয় রাত, রাত যত বাড়ছে আবারও উৎকণ্ঠায় জড়োসড়ো হচ্ছে জান্নাত, কি জানি কেমন হবে তার নতুন জীবনের অভিজ্ঞতা, যে জীবন সে না চাইতেও বড়রা বুঝে শুনে গড়ে দিলো, আইসক্রিম কাপ দুটো গলে গিয়েছে পুরো, শামির এখনও আসেনি। বাবা ভাইয়ের সাথে ব্যবসা সংক্রান্ত আলোচনা করছে নিচতলায়। এবাড়ির পুরুষ গুলোর কন্ঠ তো নয় যেন মাইক, জান্নাত খেয়াল করেছে। বড্ড জোরে কথা বলেন ওনারা, তার মধ্যে জান্নাতের স্বামীর কথা তো বলতেই নেই।

শামির ঘরে ঢুকলো রাত ঠিক সাড়ে এগারোটার সময়। ওর পায়ের শব্দ শুনেই জান্নাত শোয়া থেকে উঠে বসলো, জড়োসড়ো হয়ে।

বিছানার এক কোণে শামির ফোনটা রেখে জান্নাতের দিকে তাকিয়ে বলে,“ঘুমাচ্ছিলে নাকি জান্নাতুল।”

বলেছে স্বাভাবিক ভাবেই কথাটা, জান্নাত জবাবে দু পাশে মাথা নাড়ে। মাথায় টানে ঘোমটা।

শামির ফ্রেশ হয়ে এসে বারান্দার বাতি নিভিয়ে,ঘরের বাতি নিভিয়ে টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে বিছানায় বসলো । জান্নাতের দিকে তাকালো আড়চোখে। জান্নাত জড়তা নিয়ে বসে আছে মাথা নিচু করে। শামির ওর হাত ধরে কাছে টেনে বললো,“আজও কি অসুস্থ বোধ করছো জান্নাতুল?”

দু'পাশে মাথা নাড়ে জান্নাত। শামির ওর দুগালে হাত রেখে তাপমাত্রা চেক করে, জান্নাত নড়েচড়ে ওঠে, আবারও মাথা নিচু করে নেয়।

জান্নাতের নির্লিপ্ততা বড্ড প্রশান্তিদায়ক শামিরের কাছে, ভীষণ ভদ্র মেয়েটি, শামির ওকে মুগ্ধতা নিয়ে দেখে এক হাতে থুতনি কিছুটা উঁচু করে ধরে কিছুক্ষণ দেখে, আবারও এত কাছে লোকটা, জান্নাত ভয় পাচ্ছে,লজ্জাও পাচ্ছে কিন্তু নিজেকে ছাড়াতে পারছে না।
শামিরের কন্ঠস্বর অত্যধিক ঠান্ডা, মেজাজ শান্ত তাই। বললো,“তুমি ভীষণ সুন্দর জান্নাতুল।”

জান্নাত মাথাটা আরও নুইয়ে নেয়,বুঝতে পারছে তার স্বামী কথা এগোতে চাইছে, কিন্তু সে কি বলবে?
শামির এবার আরেকটু কাছে এগিয়ে বসে জান্নাতের, কন্ঠে এবার দরদ নিয়ে বলে,“এগুলো এখনও পরে আছো কেন? র্যাশ উঠবে তো গায়ে।”

বলেই শামির জান্নাতের গলা থেকে স্বর্ণের হারটা টেনে টেনে খুলতে লাগল, আবারও বললো,“ইশশ লাল হয়েছে দেখছি গলার কাছটা। এখনো পরে আছো কেন?”

_আম্মা খুলতে বারণ করেছিলেন।
নিচুগলায় জবাব দেয় জান্নাত।

_সে তো মেহমান ছিলেন বলে, ঘুমানোর সময় এসব পরে থাকতে হবে না।

একটা একটা করে গয়না খুলে ফেলে শামির, জান্নাত সকালের মেজাজী লোকটার সাথে এই লোকটাকে মেলাতে পারছে না। সে আড়চোখে বারকয়েক লোকটাকে দেখে দৃষ্টি নত করে নিয়ে বসে থাকে।
সব গয়না খুলে শামির সাইড টেবিলে রেখে জান্নাতের ঘোমটা সরিয়ে দিয়ে ওকে আবারও কাছে টানে,নম্র কন্ঠে বলে,“শুধুই জান্নাতুল ফেরদৌস? আর কোন নাম নেই?”

_জি না।
ছোটো খাটো শরীরটা শামিরের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে মৃদু কাঁপছে। কমলা আলোয় শামির চেয়ে চেয়ে দেখছে শুধু ওকে।

ঘনিষ্টতার প্রথম চুমু মাখিয়ে দেওয়ার পরে জান্নাতের খানিকটা হাশফাশ লাগতে শুরু করেছে, কিন্তু নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে পরক্ষনেই। একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছে।
শামির খানিক বাদে ওকে দেখে নম্রকন্ঠে বললো,“জান্নাতুল!”

_জি।
ক্ষীণ আওয়াজে জবাব দেয়।

_ভয় লাগছে?

জান্নাত কিছুপল চুপ থেকে মাথা নেড়ে হ্যা বোধক জবাব দেয়। তার ভয় লাগছে। শামির এবার মুখ থেকে কাঠিন্যতা সরিয়ে জান্নাতকে শুইয়ে ওর কপালে চুমু খায়। আর পাঁচজন স্বাভাবিক পুরুষ হয়তো সেই পরিস্থিতিতে বলতেন,“ভয়ের কিছু নেই। আমি তোমার স্বামী।”

কিন্তু শামির চৌধুরী স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,“ভালো! স্বামীকে ভয় পাওয়া উচিত জান্নাতুল।”

জান্নাত অবাক হয়ে লোকটাকে দেখলো, শামির চোখ সরিয়ে নিয়ে হাসলো সামান্য, জান্নাত এই প্রথম দেখলো লোকটার হাসি। ভীষণ সুন্দর লোকটার হাসি, অথচ হাসেনা সে।
কিছুক্ষণ বাদে জান্নাতের কানের কাছে মুখ নিয়ে শামির বললো,“তবে ভয় পেলে আমাকে ধরতে পারো জান্নাতুল। স্বামীকে ভয় পেলে স্বামীকেই ধরতে হয়।”

এইবার জান্নাত লজ্জা পায়। সে নির্জীব হয়ে পরে থাকে পুরো, বাকিটা সময় দু'চোখ বন্ধ করে থাকে, সে দেখতেও চাইলো না তার সাথে কি হচ্ছে, শুধু টের পেয়েছে বান্ধবীদের কাছ থেকে যেমনটা শুনেছে তেমন ভয়ংকর কিছু তার সাথে হয়নি, লোকটা ভীষণ নমনীয়তার সহিত আগলেছে তাকে। শুধু অনুভব করেছে নিজের নতুন জীবনকে,ভয়ে কুঁকড়ে গেলেও লোকটার বুকে ঠাঁই পেয়েছে। লোকটা আর মেজাজী ছিলো না ঐ সময়টুকুতে, ভীষণ কোমল ছিলো জান্নাতের প্রতি। ঐ সময়টিতে জান্নাতের মনে হয়েছে তার স্বামী বোধহয় তার শোনা ভয়ংকর স্বামীদের মতো নয়।

চলমান.....

[ আবার কবে গল্প পাচ্ছেন জানি না। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 6 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন