#জায়া_ও_পতি
#পর্ব_৭
#ইসরাত_ইতি
জান্নাতুল ফেরদৌস ওরফে জান্নাতের নতুন জীবন শুরু হয়েছে। যে জীবন সম্পর্কে তার নেই কোনো অভিজ্ঞতা,নেই বিন্দু পরিমাণ ধারণা,নেই জ্ঞান। জান্নাত এই জীবনটাকে যত দেখছে তত বেশি বিস্মিত হচ্ছে, শিহরিত হচ্ছে, পুলকিত হতে শুরু করেছে।
সবকিছু তার সয়ে গিয়েছে এ কদিনে, স্বামী, শশুর বাড়ীর পরিবারের সাথে মানিয়ে নিচ্ছে একটু একটু করে। যদিও তেমন জটিল কিছু নয় এটা, তার শশুর বাড়ির লোকগুলোকে তার ভীষণ অমায়িক লাগে, আর স্বামী? জান্নাতের কাছে লোকটাকে তেমন দুর্বোধ্য মনে হয়নি এ ক'দিনে, লোকটা স্বভাব সুলভ ভীষণ রাগী, গম্ভীর,মেজাজী। জান্নাতের বড় ভয় করে মাঝে মাঝে লোকটাকে যদিও তবে জান্নাত এখনও তার মেজাজের প্রকোপে পরেনি। তবে যখন লোকটা তাকে কাছে টেনে নরম আদরে ভরিয়ে দিয়ে,নরম দু'টো কথা বলে তখন জান্নাতের ভয় চলে যায় একেবারেই। অদৃষ্ট যখন এ পর্যন্ত জান্নাতকে এনেছেই,জান্নাতও মানিয়ে নিচ্ছে, সম্মান দিয়ে স্বামীকে কাছে আসতে দিচ্ছে নির্দ্বিধায়,হয়ে উঠছে তার সংসারের প্রতি কর্তব্যপরায়ণ। একটু একটু করে অনুভূতি জমাচ্ছে স্বামী নামের লোকটার প্রতি। এটা অভ্যাস,মায়া নাকি ভালোবাসা জান্নাত এটুকুও ধরতে পারছে না। সে শুধু জানে লোকটা তার বড় আপন,তার স্বামী, সে এই লোকের জায়া।
চৌধুরী বাড়ির অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে,নানা ব্যস্ততায় জান্নাত লেখাপড়া নিয়ে ভাববার ফুরসৎ টুকু পায়নি। অবশ্য ফলাফল প্রকাশিত হয়নি বলে তার নিজেরই আগ্রহ নেই এসব নিয়ে, সে অলস হয়ে তার ছুটি কাটাচ্ছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে মাথায় ইয়া বড় ঘোমটা দিয়ে রান্নাঘরে যায়, শাশুড়ির সাথে গল্প করতে করতে সবকিছু হাতে হাতে গুছিয়ে দেয়। শামিরকে অফিসে পাঠিয়ে তারপরের সময়টুকু জায়ের সাথে গল্প করতে করতে কাটায়, রান্নাঘরে টুকটাক কাজ করে, ইদানিং তার হাতের রান্না খুব প্রশংসিত হচ্ছে শ্বশুরের কাছে, জান্নাত খুব খুশি হয়ে রান্না করে, একটা দু'টো পদ। দুপুরে শামির এলে তার এটা সেটা এগিয়ে দেয়া,বিকেলে শামিরের পাশে চুপ করে শুয়ে ভাতঘুম দেয়া, সন্ধ্যায় শামির অফিসে গেলে ননদ আর দেবরের সাথে লুডু খেলা,দাদী শাশুড়ির সেবা করা,তাকে কোরআন শরীফ পাঠ করে শোনানো, রাতে স্বামীর আবদার পূরণ করা। এগুলো হচ্ছে জান্নাতের প্রাত্যহিক রুটিন,যেটা বিয়ের দু সপ্তাহ ধরে চলছে রোজ।
জানালার পাতলা সাদা পর্দাগুলো সরিয়ে দিতেই বাইরের মিঠা কমলা রঙের রোদটা এসে ঘরের কানায় কানায় ভরে গেলো। ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুছে নিতে নিতে জান্নাত বিছানার এক পার্শ্বে বসে ভয়ে ভয়ে ডাকতে লাগল শামিরকে,“শুনছেন। আপনি বলেছিলেন খুব সকালে উঠাতে। আপনি কি উঠবেন?”
মিহি স্বরটা কানে যেতেই শামির ভ্রু কোচকালো। পর পর চোখ মেলে তাকিয়ে ঘুমঘুম চোখে দেখলো জান্নাতের ফরসা স্নিগ্ধ মুখটা, ক্ষণিকের মাথায় হ্যাঁচকা টানে ওকে ফেললো বিছানায়। জান্নাত চমকালেও সামলে নেয় নিজেকে, চার দেয়ালের মধ্যে এই লোকটা রোজ এমন করে,সে অভ্যস্ত হচ্ছে।
শামির উঠলোই না, উল্টো জান্নাতের গলায় মুখ ডুবিয়ে শুয়ে থাকলো। তির তির করে কাঁপতে থাকা জান্নাতের হাত টা আঁকড়ে ধরলো শামিরের চুল, হাতটা চুলে বুলিয়ে দিয়ে অনুরোধের সুরে বলল,“আমি যাই? আপনি উঠুন।”
চোখ মেললো শামির, মুখভঙ্গি গম্ভীর। জান্নাত চিন্তিত হলো,এই লোকটার স্বভাব হলো উনি নিজের মর্জি মাফিক চলা লোক,এই যে জান্নাত যেতে চাইছে, এটা হয়তো লোকটার পছন্দ হয়নি। এখন জেদ করে হলেও কমপক্ষে আধাঘণ্টা ধরে রাখবে, অতঃপর নিজের মর্জিতে ছাড়বে। মাঝে মাঝে লোকটার এই ব্যাপারটা খুব বিরক্ত লাগলেও জান্নাত মুখ ফুটে বলে না, উল্টো ধ'ম'ক খাওয়ার ভয়ে।
তবে আজ ছাড়লো শামির। উঠে বসে উন্মুক্ত শরীর ঢেকে নিলো টি-শার্টে,হাই তুলতে তুলতে ভারী আওয়াজে বললো,“কম্পিউটার টেবিলের ওপর একটা বক্স আছে,নিয়ে এখানে এসো জান্নাতুল।”
জান্নাত চুপচাপ বক্সটা এনে শামিরের পাশে বসলো। শামির বক্সটা খুলবার নির্দেশ দেওয়ায় বক্সটা খুলে দেখতে পেলো একটা স্মার্টফোন। শামির জান্নাতুলকে টেনে কাছে নিয়ে বললো,“পছন্দ হয়েছে গিফট?”
_এটা আমার?
বিস্মিত জান্নাতুল, এতো সুন্দর একটা ফোন পেয়ে।
জান্নাতের হাত থেকে নিয়ে ফোনটা অন করে শামির। বললো,“হ্যা। সিমকার্ড দিয়ে দিয়েছি, সবকিছু ঠিক করে দিচ্ছি। এখন থেকে এটা ব্যবহার করবে।”
জান্নাত ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে শামিরের হাতের পানে। শামির ফোনের সেটিংস চেক করে নিতে নিতে বললো,“ব্যবহার করতে পারো?”
_জি মোটামুটি। মামীর ফোনটা মাঝেমাঝে ধরতাম।
_আচ্ছা। ফেসবুক ইনস্টাগ্রাম এসব সম্পর্কে ধারণা আছে?
_শুধুমাত্র ফেসবুক সম্পর্কে আছে। তবে আমি ব্যবহার করিনি। মামীর আইডি।
শামিরের মুখভঙ্গি গম্ভীর, বললো,“ফোনটা শুধুমাত্র আমার এবং তোমার আমার কাছের মানুষদের সাথে যোগাযোগের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে। কোনো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট প্রয়োজন নেই গট ইট জান্নাতুল?”
চুপচাপ মাথা নাড়ে জান্নাতুল,সে তো এসব ব্যবহার করার কথা স্বপ্নেও ভাবে নি। বৌয়ের নমনীয়তা,সায় বড় প্রশান্তিদায়ক শামিরের কাছে,কাছে টেনে চুমুতে লাগলো হঠাৎ, জান্নাতুল নড়েচড়ে উঠতেই মিহি স্বরে বললো,“এখন যাও,চা নিয়ে এসো,চিনি দিবে একচামচ।”
রান্নাঘরে জান্নাতুলের শাশুড়ি,জা আর হেল্পিং হ্যান্ড সকালের নাস্তা বানাচ্ছে। এ বাড়িতে তিনদিন অন্তর অন্তর নাস্তার মেন্যু পরিবর্তন হয়, প্রথম দিন রুটি,সবজি,ডিম হলে দ্বিতীয় দিন সবজি খিচুড়ি নানা পদের ভর্তা,ভাজি এবং তৃতীয় দিন কোনো ওয়েস্টার্ন কুইজিন হয়। আজ রোববার তাই নিয়ম অনুযায়ী সবজি খিচুড়ি আর কুমড়া ফুল,মুশুরি ডালের বড়া,বেগুনী এসব হচ্ছে। সুঘ্রাণে রুহি শামা ঘরে টিকতে না পেরে এসে ডাইনিং টেবিলে বসলো।
শামিরকে চা দিয়ে এসে জান্নাতুল ননদদের তার মোবাইল ফোনটা দেখায়। রুহি ফোনটা লুফে নিয়ে বলে,“ওয়াও ভাবি। ভাইয়া দিলো?”
হেসে মাথা নাড়ায় জান্নাত। শামা মন খারাপ করলো,“ইশশ আমি কবে একটা পার্সোনাল ফোন পাবো!”
রান্নাঘর থেকে রিজিয়া জবাব দেয়,“গোল্ডেন এ প্লাস এনে দিলেই।”
আড্ডায় আড্ডায় জমে উঠেছে রান্নাঘর। এক ফাঁকে জান্নাত রুহিকে বললো,“রুহি আপু। আমি অত কিছু তেমন বুঝিনা, একটা ইমো অ্যাপ নামিয়ে দেবে ফোনে? বা তুমি আমাকে শিখিয়ে দাও।”
_ইমো অ্যাপ কেনো?
_মামা-মামীরা আর বান্ধবীদের সাথে ভিডিও কলে কথা বলবো।
রুহি হেসে ফেলে,বলে,“ইমো একটা থার্ড ক্লাস অ্যাপ ভাবী। ইমো মানেই স্বামী বিদেশ।”
জান্নাত চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। এই বাড়ির মেয়েগুলো বড্ড নাটকীয় কথা বলে বেড়ায় সবসময়,যার অর্থ ধরতেই জান্নাতের দিন পেরিয়ে যায়। অস্ফুটে বিড়বিড় করলো জান্নাত,“স্বামী বিদেশ মানে?”
_ঐ গ্রামের প্রবাসীদের বৌয়ের কাছে জনপ্রিয় একটি অ্যাপ,তাই আর কি।
তাচ্ছিল্যে করে জবাব দেয় রুহি।
জান্নাতের ভালো লাগে না বিষয়টি,একটা অ্যাপ নিয়েও কত শ্রেণী বিভক্তি এদের, জবাব দিলো,“তবুও তো চলে যায় আপু। উনারা উনাদের আপন লোকের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। তুমি আমাকে ঐ স্বামী বিদেশ অ্যাপটাই এনে দাও। আমার বান্ধবীরা কেউ ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে না।”
রুহি হাসতে হাসতে বলে,“আচ্ছা।”
শামা স্কুল ড্রেস পরে গপাগপ গরম গরম খিচুড়ি খেয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে যায়, বাড়ির পুরুষেরা তখনও নাস্তা খেতে এসে বসেননি। এই ফাঁকে জান্নাত রুহিকে বললো,“আপু? এখানে ইন্টারের জন্য কোন কলেজ টা বেশি ভালো হবে? তুমি কোনটাতে পড়েছো?”
ফোন টিপতে টিপতে রুহি অন্যমনস্ক হয়ে জবাব দেয়,“মহিলা কলেজে।”
পাল্টা জানতে চাইলো না রুহি জান্নাত কেন কলেজের খোজ নিচ্ছে। দূর থেকে রিজিয়া বণিক শুনে জান্নাতের দিকে চোখ তুলে তাকায় তৎক্ষণাৎ । জান্নাত কথা না বাড়িয়ে টেবিল সেট করছে। রিজিয়া বণিকের মুখটা নিমিষেই ফ্যাকাশে হয়,আহারে! মেয়েটা বুঝি কলেজে পড়তে পারবে না বিধায় সারাক্ষণ আফসোস করে। অথচ রিজিয়া বণিক জানেন না আসলে জান্নাত নিজেই এখনও জানতে পারেনি তার কপালে আর পড়ালেখা নেই।
আজ রেজাল্ট প্রকাশিত হবে। এটা জান্নাত এই মাত্র জেনেছে ফুলের কাছ থেকে। ঘরে ঢুকে দেখলো শামির গায়ে শার্ট পরে নিচ্ছে অফিসে যাবে বলে, জান্নাত এগিয়ে যায় শামিরের কাছে,হাতে ব্লেজার নিয়ে।
ওকে দেখে শামির ব্লেজার সহ ওকে কাছে টানলো, কথায় কথায় লোকটা হ্যাঁচকা টান মারে, জান্নাতের বড্ড হাঁসফাঁস লাগে, পরক্ষনেই সামলে নেয় নিজেকে।
রাশভারী আওয়াজ জান্নাতের কাছে জানতে চাইলো,“কিছু বলতে চাচ্ছো?”
_আজ আমার রেজাল্ট দেবে।
থেমে থেমে বললো জান্নাত।
শামির কয়েকপলক জান্নাতের মুখটা দেখে বলে,“ভালো কথা। শায়ন আছে বাড়িতে,ও দেখে দেবে। আমি তো লাঞ্চে আসছিই।”
লোকটা চলে যায়, জান্নাত জড়তা কাটিয়ে বলতেই পারলো না আর কোনো কথা, কি জানি কেন এখনও জান্নাত সহজ স্বাভাবিক দু'টো কথা লোকটার সাথে বলতে পারে না। হয়তো লোকটা মেজাজী তাই তার অযথা কথা বলতে বড্ড ভয় করে।
সময় কাটছে না, দুপুর বারোটায় প্রকাশিত হবে রেজাল্ট। সকাল ন'টা থেকে এগারোটা জান্নাত নিজেদের ঘরটা ঝাড়পোছ করেছে। নীল সুতি শাড়ির আঁচল কোমরে গুজে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করে ঘরের ছাটকাট পরিবর্তন করেছে, এছাড়া তার আর কাজ কি। ইদানিং জান্নাত শাড়িই পরছে , শামিরের সালোয়ার কামিজে কোনো আপত্তি নেই তবে তার শাশুড়ি আর দাদী শাশুড়ি বলেছে সবসময় শাড়ি পরতে। লোকজন দেখলে প্রথমেই প্রশ্ন করে বৌ তো একেবারে পিচ্চি, শামির এতো পিচ্চি একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে? এজন্য সবসময় শাড়ি পরার আদেশ পেয়েছে জান্নাত যাতে তাকে খানিকটা বড় বড় লাগে।
কাজ করতে করতে জান্নাত ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারের কাছে এসে পৌঁছাতেই দেখলো ড্রেসিং টেবিলের প্রথম ড্রয়ারটা হাট করে খুলে রাখা। কৌতুহলী জান্নাত এগিয়ে গিয়ে ড্রয়ারটা খুলে দেখল রাজ্যের আচার আর চকলেটের বৈয়াম। চোখ বড় বড় করে দেখতে থাকে সেগুলোকে সে। ঠিক তখনই শামিরের ফোন আসে। কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর স্বরে বলে,“জান্নাতুল একটা নীল রঙের ফাইল কম্পিউটার টেবিলের ওপর ফেলে এসেছি, ওটা আলমারিতে তুলে রাখো।”
জান্নাত ঘাড় ঘুরিয়ে ফাইলটা দেখে বললো,“জি আচ্ছা! শুনছেন, এই চকোলেট আর আচার এখানে কেন?”
কিছু একটা টাইপ করছিলো শামির,ফোন কানে চেপে রেখে গম্ভীর আওয়াজে বলে,“ওহহ, ওগুলো তোমার, সবকিছু হাইজিন মেনে বানানো, স্বস্তা আচার খেয়ে পেট নষ্ট করার চেয়ে ওগুলো খেয়ো। রাখছি আমি, ব্যস্ত!”
কিছুক্ষণ বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে জান্নাতের মুখ ছেয়ে যায় হাসিতে। মনে পরে গতকাল বিকেলে শামা রাস্তার ভ্যান থেকে চালতার আচার এনে তাকে দিয়েছিল, জান্নাতকে ওসব খেতে দেখে লোকটা এমন এক ধ'ম'ক দিয়েছিল যে জান্নাতের চোখে পানি চলে এসেছিল তৎক্ষণাৎ, কেঁদেই ফেলতো তার আগেই শামিরের ফোন আসে আর সে সামনে থেকে চলে যায়।
আজ লোকটা এতো কিছু তার জন্য এনেছে। জান্নাতের এতোটা খুশি কখনো লাগেনি, লোকটা ধমকা ধমকি করলেও জান্নাতের ছোটো ছোটো অনেক খুশির কারণ হচ্ছে লোকটা। তাই মাঝেসাঝের ধ'ম'ক জান্নাত মাফ করে দেয়,রাগ করে থাকতে পারে না। সেদিন ভোরে অফিসের ঝামেলা নিয়ে রাজনের সাথে কিঞ্চিৎ তর্কাতর্কির সময়ে জান্নাত চা নিয়ে গেলে লোকটা এমন করে চোখ রাঙিয়েছিলো, তখনও জান্নাতের কান্না পেয়েছিল, পরক্ষনে ঘরে এসে জান্নাতকে কোলে বসিয়ে জান্নাতের হাতে চা খেয়েছে, এক কাপ নয়,দুই কাপ। এটার পর জান্নাত আর রেগে থাকতে পারেনি। দাম্পত্যের টুং টাং ছন্দে এমন করেই নাচছে জান্নাত, তার কিশোরী অবলা মনও বুঝতে পারছে সে এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত,তার স্বামীর দ্বারা,তার সংসারের দ্বারা। তবে তখনও এই নিয়ন্ত্রণ তেতো লাগতে শুরু করেনি জান্নাতের কাছে।
উজ্জ্বল মুখশ্রীতে চওড়া হাসি, দু'হাতে লুফে নিলো জান্নাত আচার গুলোকে, তারপর কিছু একটা ভেবে আচার আর চকলেট গুলো চারভাগ করলো, একভাগ তার আর বাকি তিনভাগ তার জা এবং ননদদের।
বাইরে তখন শায়নের হাঁকডাক,“মেজো ভাবী! ও মেজো ভাবী! এদিকে এসো।”
আচার আর চকলেট গুলো ফেলে রেখে চিন্তিত ভঙ্গিতে জান্নাত ছুটে যায় শায়নের ঘরে, সম্পর্কে ছোটো হলেও বয়সে জান্নাতের থেকে ঢের বড় বিধায় জান্নাত ছোটো দাদা বলে ডাকে শায়নকে আর রাজনকে ডাকে বড় দাদা। দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জান্নাত বললো,“কি হয়েছে ছোটো দাদা?”
ল্যাপটপ বন্ধ করে শায়ন উঠে দাঁড়িয়ে বললো,“ফোর পয়েন্ট সিক্স এইট পেয়ে পাশ করেছো তুমি! কংগ্রাচুলেশন।”
_______
রূপাতলী হাইস্কুলের এবছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ নাম্বারধারী মেয়েটি হলো জান্নাতুল ফেরদৌস। অজপাড়া গাঁয়ের এক হাইস্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এর বেশি নাম্বার এর আগে কেউ তুলতে পারেনি,তাও শুধুমাত্র ক্লাসে পড়া বুঝে নিয়ে। জান্নাত এতে সন্তুষ্ট নয়, বরং সে ভীষণ খুশি। তার স্কুলের হেড স্যার শাহীন আকন্দের বাড়িতে এসে জান্নাতের সাথে কথা বলেছে ফোনকলে, অনুপ্রেরণা দিয়েছে জান্নাত সুযোগ সুবিধা পেলে আরো অনেক কিছু করতে পারবে,ও যেন লেখাপড়াটা চালিয়ে যায়।
দুপুরে চারদিকে মিষ্টি ছড়াছড়ি শুরু হয়েছে, জান্নাতের শশুর শারাফাত চৌধুরী ছেলের বৌ ভালো মার্কস নিয়ে পাশ করেছে শুনেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে খুব কাছের একটি বড় মিষ্টির দোকান থেকে নানা পদের মিষ্টি নিয়ে এসেছে। পাড়া প্রতিবেশীদের বিলিয়ে নিজে ছেলেমেয়ে আর ছেলের বৌদের নিয়ে খেয়েছে। এ বাড়ির মানুষগুলোর এতো আন্তরিকতায় জান্নাত ভীষণ আপ্লুত । মার্কশিট টা খুব যত্নে তার ফাইলে তুলে রেখে অপেক্ষা করছিল শামিরের।
আজ শামির এলো বড্ড দেরী করে,খুব ব্যস্ত ছিলো তাই লাঞ্চে আসা হয়ে ওঠেনি। এসেছে বিকেলে, একেবারে,সব কাজ শেষ করে।
জান্নাত সদর দরজা খুলে দিয়ে দেখলো শামিরের হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট,জান্নাতের দিকে এগিয়ে দিয়ে শামির বললো,“অভিনন্দন।”
জান্নাত লজ্জা পেয়ে সেটা নিলো, বললো,“টেবিলে খাবার দেবো?”
_তুমি খেয়েছো?
ঘরের দিকে যেতে যেতে শামির জানতে চাইলো।
_জি না। আপনি পোশাক বদলে আসুন। আমি খাবার বাড়ছি।
এমনিতে জান্নাতকে শামিরের জন্য না খেয়ে অপেক্ষা করতে হয়না। তার দাদী শাশুড়ি একটু খিটখিটে হলেও খাওয়াদাওয়ার ব্যপারে জান্নাতকে সবসময় উৎসাহ দেন, বলে,“খাইয়া লইয়া দুলদুলা থাকবি মা'গী। পুরুষ মানষের কাছে দুলদুলা বৌরা খুব পাত্তা পায়। শুঁটকি মাছ না।”
জান্নাতের যখন ইচ্ছা হয় তখনই খেতে পারে, তবে আজ জান্নাতের খুব ইচ্ছে করলো মানুষটার সাথে খেতে। একা একা ওনারও নিশ্চয়ই খেতে ইচ্ছে করবে না আজ।
খেতে বসে টেবিলে বাহারি রকমের খাবার দেখে শামির বললো,“আজ এতো পদ কেন? তুমি পাশ করেছো বলে?”
_জি। আম্মা করলেন।
সামান্য হেসে জবাব দিল জান্নাত।
খাওয়া শেষে শামির উঠে দাঁড়ায়,জান্নাত উঠে টেবিল পরিষ্কার করতে থাকে তখন শামির বললো,“এসব রেনু করবে। তুমি রুমে এসো জান্নাতুল।”
কন্ঠে সেই চিরায়ত আদেশের সুর,তবে জান্নাত লজ্জায় মরি মরি হয়, আশেপাশে ঘরের হেল্পিং হ্যান্ড ঘুরঘুর করছে, এই লোকটার রাগ খুব বেশি তবে লজ্জা খুবই কম, সবার সামনে ডেকে ওঠে,“অ্যাইই জান্নাতুল! ঘরে এসো।”
গুটি গুটি পায়ে ঘরের দরজায় পা রাখতেই ওপাশ থেকে ভারী আওয়াজ বলে,“হচ্ছে টা কি? এতো গাইগুই করছো কেন?”
ঢোক গিলে জান্নাত ঘরে ঢুকতেই শামির দরজা লাগিয়ে ওকে দেখলো, কপাল কুঁচকে আছে তার। জান্নাত ভীত হয়ে বললো,“আসছিলাম তো।”
তিন পলক জান্নাতকে দেখে পাঁজাকোলা করে তুললো শামির। জান্নাত এবার চমকায় না,এ কদিনে এসব বেশ সয়েছে সে, লোকটা ভারি অদ্ভুত। এই মনে হয় ধ'ম'ক দেবে দেবে,জান্নাতও কেঁদে ফেলবে বলে প্রস্তুত হয় তবে দিয়ে ফেলে চুমু।
জান্নাত নিজেকে সামলাতে শামিরের শার্টের কলার খামচে ধরলো, পরমুহূর্তেই নিজেকে আবিষ্কার করল বিছানার একপাশে বসা। শামির ওকে রেখে চেয়ারের ওপর রাখা ব্লেজারের পকেট থেকে একটা পেন্ডেন্ট এনে জান্নাতের পাশে বসে গলায় পরিয়ে দেয়।
অবাক হয়ে জান্নাত বললো,“এসব কেনো?”
_আজ একটা ভালো দিন তোমার,তাই। বাই দ্য ওয়ে, আমি পছন্দ করিনি এটা রুহিকে দিয়ে পছন্দ করিয়ে নিয়েছি। তোমার ডিজাইন পছন্দ না হলে বলো,চেঞ্জ করে দেয়া যাবে জান্নাতুল।
জান্নাত আবার ডিজাইনের কি বোঝে? তাও আবার স্বর্ণালঙ্কারের। সে শুধু বিস্মিত হচ্ছে,এতো ভালো মার্কস সে পায়নি,অথচ সে স্বর্ণ উপহার পেলো স্বামীর থেকে?
কিশোরীর বধূ মন বিগলিত হয়, আপ্লুত হয়। লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে থাকে, শামির ওকে কাছে টেনে জরিয়ে ধরে, আবেশে জান্নাত দু'চোখ বন্ধ করে, শামির বললো,“বাড়িতে কথা হয়েছে নাকি!”
_হ্যা।
_কি কথা হলো?
ওর ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে ঘোর লাগা কন্ঠে শামির জানতে চাইলো। জান্নাত বুঝতে পারলো জবাব শুনতে এই প্রশ্নটি করা হয়নি। জান্নাত থেমে থেমে বললো,“শুনছেন।”
_হু।
_হেড স্যারের সাথেও কথা হয়েছে।
_ভালোকথা।
জান্নাতের শাড়ির আঁচলের পিন খুলতে খুলতে জবাব দেয় শামির।
_তো উনি জানতে চেয়েছেন আমি কোন কলেজে ভর্তি হবো, আচ্ছা আমাকে কি মহিলা কলেজে ভর্তি করাবেন?
থামলো শামির, জান্নাতের শাড়ির আঁচল থেকে হাতটা সরিয়ে নিয়ে ওর মুখের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বললো,“মানে?”
_মানে কোন কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়বো আমি?
অস্ফুটে বলে ওঠে জান্নাত।
শামিরের শান্ত চোখের দৃষ্টি জান্নাতের মুখবিবরে। উঠে বসলো শামির। জান্নাতও উঠলো। শামির ওর দিকে তাকিয়ে বলে,“কোন কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়বে মানে? কিসের ইন্টারমিডিয়েট জান্নাতুল?”
ফ্যালফ্যাল করে বোকার মতো তাকিয়ে আছে জান্নাত,বললো,“আমার!”
_তুমি কেনো কলেজে ভর্তি হবে?
_মানে?
অবাক জান্নাত।
_মানে তুমি তো কলেজে ভর্তি হচ্ছো না!
এখনও বোকার মতো তাকিয়ে আছে মেয়েটা। কম্পিত স্বরে বলল,“এসব কি বলছেন? কেন?”
_কারণ আমি চাচ্ছি না!
ঠান্ডা স্বর জবাব দিলো, তক্ষুনি কান্না পেলো জান্নাতের, নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,“আপনি কেনো চাচ্ছেন না?”
_কারণ আমার বৌকে পড়াশোনা করানোর ইচ্ছে নেই জান্নাতুল।
কথাগুলো বড্ড শান্ত তবুও রুক্ষ,এবার আর নিজেকে সামলাতে পারেনি জান্নাত, ঝরঝর করে কেঁদে দিয়ে বলে,“কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন আপনি আমাকে পড়াবেন!”
চলমান.....