তোর কারণে বেঁচে আছি
ধরন: রোমান্টিক থ্রিলার, রহস্য, বন্ধুত্ব ও আবেগ
পর্ব ৬— অপহৃত বাবা ও জিহাদের জীবনের শেষ রাত!
রাত তখন প্রায় বারোটা। চারদিকে নিস্তব্ধতা, শুধু দূরে কোথাও কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। বাবার ফোন কেটে যাওয়ার পর থেকে নওশিনের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিচ্ছে।
— বাবা! বাবা, তুমি কোথায়?
বারবার ফোন করেও কোনো উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
জিহাদ নওশিনের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
জিহাদ: নওশিন, নিজেকে সামলাও। আমরা তোমার বাবাকে খুঁজে বের করব।
নওশিন: কিন্তু জিহাদ, বাবা যদি সত্যিই বিপদে থাকে? উনি তো আমাকে বলতে চেয়েছিলেন কে গাড়িটা চালাচ্ছিল!
ওভি: ভয় পেও না। লোকগুলো নিশ্চয়ই বাবাকে কোথাও নিয়ে গেছে। আমাদের হাতে এখনো একটা সূত্র আছে।
জিহাদ: কী সূত্র?
ওভি নিজের ফোন বের করে দেখাল। কিছুক্ষণ আগে অচেনা নম্বর থেকে তার কাছে একটি ছবি এসেছে। ছবিতে নওশিনের বাবাকে একটি পুরোনো গুদামঘরের চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তাঁর হাত বাঁধা, কপালে রক্তের দাগ।
ছবির নিচে লেখা—
“সত্য জানতে চাইলে একা এসো। সঙ্গে জিহাদ থাকলে তোমার বাবার লাশ পাবে।”
ছবিটা দেখে নওশিনের চোখে পানি চলে এল।
নওশিন: আমি যাব। আমার বাবাকে বাঁচাতে হবে।
জিহাদ: তুমি একা কোথাও যাবে না। ওরা তোমাকে ফাঁদে ফেলতে চাইছে।
নওশিন: তাহলে কী করব? চুপ করে বসে থাকব?
জিহাদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
জিহাদ: আমরা যাব। কিন্তু ওদের নিয়মে নয়, আমাদের পরিকল্পনায়।
অন্যদিকে — ইমু ও ওভি
ইমু খবরটা শুনে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
ইমু: তোমরা এত রাতে ওখানে যাবে? যদি তোমাদের কিছু হয়?
ওভি: আমার কিছু হবে না, পাগলি। তুমি শুধু নওশিনের পাশে থেকো।
ইমু: সবসময় মজা করো কেন? একবারও কি বুঝতে পারো, তোমার কিছু হলে আমার কেমন লাগবে?
ওভি অবাক হয়ে ইমুর দিকে তাকাল।
ওভি: তাহলে কি আমাকে নিয়ে একটু বেশিই ভাবো?
ইমু চোখ নামিয়ে বলল,
ইমু: এখন এসব বলার সময় না।
ওভি মুচকি হেসে বলল,
ওভি: ঠিক আছে। ফিরে এসে আবার জিজ্ঞেস করব।
ইমু এবার ওভির হাত ধরে ফেলল।
ইমু: ফিরে আসতেই হবে। কথা দাও।
ওভি: কথা দিলাম।
পুরোনো গুদামঘর
রাত একটা। শহরের এক নির্জন প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো একটি গুদামঘর। চারদিকে অন্ধকার। ভাঙা জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকছে।
জিহাদ, নওশিন ও ওভি কিছুটা দূরে গাড়ি থামাল।
জিহাদ: নওশিন, তুমি গাড়ির কাছেই থাকবে।
নওশিন: না। বাবাকে না দেখে আমি কোথাও থাকব না।
ওভি: জিহাদ, ওকে আটকানো যাবে না। তবে সাবধানে থাকতে হবে।
তিনজন ধীরে ধীরে গুদামঘরের ভেতরে ঢুকল। ভেতরে একটি ম্লান বাতি জ্বলছে। মাঝখানে চেয়ারে বসে আছেন নওশিনের বাবা।
নওশিন: বাবা!
নওশিন দৌড়ে যেতে চাইলে জিহাদ তাকে আটকে দিল।
হঠাৎ চারদিক থেকে কয়েকজন কালো পোশাকের লোক বেরিয়ে এল। তাদের একজনের হাতে বন্দুক।
অচেনা লোক: এত সহজে বাবাকে নিয়ে যাবে ভেবেছ?
জিহাদ নওশিনকে নিজের পেছনে সরিয়ে দাঁড়াল।
জিহাদ: তোমাদের যা বলার আমাকে বলো। ওদের ছেড়ে দাও।
লোকটি হেসে উঠল।
অচেনা লোক: বাহ! প্রেমিকার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত! কিন্তু নিজের অতীতের কথা জানো তো?
জিহাদের চোখে রাগ ফুটে উঠল।
জিহাদ: কী বলতে চাইছ?
লোকটি পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করে মেঝেতে ছুড়ে দিল। ছবিতে জিহাদ, মেহের এবং নওশিনের বাবা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।
নওশিন ছবিটা তুলে নিল।
নওশিন: এই ছবিতে তোমরা তিনজন একসঙ্গে কেন? বাবা, তুমি তো বলেছিলে মেহেরের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক ভালো ছিল না!
বাবা মাথা নিচু করে বললেন,
বাবা: নওশিন, আমি সব বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সময় পাইনি।
অচেনা লোক: সময় তো এখনো আছে। আজ সব সত্যি সামনে আসবে।
লোকটি জিহাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
অচেনা লোক: তিন বছর আগে মেহেরকে যে গাড়ি ধাক্কা দিয়েছিল, গাড়িটা তোমার বাবার ছিল না। গাড়িটা চালাচ্ছিল...
ঠিক তখনই গুদামঘরের বাইরে বিকট শব্দ হলো। সবাই এক মুহূর্তের জন্য সেদিকে তাকাল। ওভি সুযোগ বুঝে একজনের হাত থেকে বন্দুক ফেলে দিল। শুরু হলো ধস্তাধস্তি।
জিহাদ নওশিনকে আড়াল করে বাবার কাছে পৌঁছাল। কিন্তু বন্দুকধারী লোকটি আবার উঠে দাঁড়িয়ে জিহাদের দিকে অস্ত্র তাক করল।
নওশিন: জিহাদ! সাবধান!
একটি গুলির শব্দে পুরো গুদামঘর কেঁপে উঠল।
নওশিন চিৎকার করে জিহাদের দিকে ছুটে গেল। জিহাদ মেঝেতে পড়ে আছে, তার কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছে।
নওশিন: জিহাদ! চোখ খোলো! প্লিজ, আমার দিকে তাকাও!
জিহাদ কষ্ট করে চোখ খুলল।
জিহাদ: কেঁদো না... তোমার চোখে পানি আমি সহ্য করতে পারি না।
নওশিন: তুমি চুপ করো! তোমার কিছু হতে দেব না আমি।
ওদিকে ওভি লোকটিকে ধরে ফেলেছে। কিন্তু লোকটি হঠাৎ হেসে বলল,
অচেনা লোক: আমাকে ধরে লাভ নেই। আসল খেলোয়াড় তো তোমাদের কাছেই আছে!
সবাই থমকে গেল।
নওশিন: আমাদের কাছেই মানে?
লোকটি নওশিনের বাবার দিকে আঙুল তুলল।
অচেনা লোক: তোমার বাবা সব জানে। এমনকি মেহেরের মৃত্যুর রাতেও সে একা ছিল না!
নওশিন বাবার দিকে তাকাল। বাবা চোখ বন্ধ করে ফেললেন।
নওশিন: বাবা, তুমি কী লুকাচ্ছ?
বাবা কাঁপা গলায় বললেন,
বাবা: মেহেরের মৃত্যুর রাতে গাড়িটা চালাচ্ছিল তোমার নিজের...
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই গুদামঘরের আলো নিভে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর আলো জ্বলতেই দেখা গেল, নওশিনের বাবা আর সেখানে নেই। শুধু মেঝেতে পড়ে আছে একটি রক্তমাখা চিঠি।
নওশিন কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলল।
চিঠিতে লেখা—
“মেহেরের হত্যাকারীকে খুঁজতে গিয়ে নিজের রক্তের সম্পর্ককে হারাতে প্রস্তুত থেকো। কারণ পরের সত্যটা তোমার পুরো জীবন বদলে দেবে।”
নওশিন ধীরে ধীরে জিহাদের দিকে তাকাল। জিহাদ তখনো রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে।
নওশিন: জিহাদ, তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?
জিহাদ দুর্বল হাতে নওশিনের হাত ধরল।
জিহাদ: তোমার কারণে বেঁচে আছি, নওশিন... তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য নয়।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ওভির ফোনে হঠাৎ একটি মেসেজ এল।
“জিহাদকে বাঁচাতে চাইলে নওশিনকে সত্যিটা জানিও না। কারণ মেহেরের মৃত্যুর সঙ্গে নওশিনেরও একটা সম্পর্ক আছে!”
ওভি মেসেজটা পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।
চলবে...
পর্ব ৭- নওশিনের জীবনের অজানা সত্য ও মেহেরের মৃত্যুর ভয়ংকর রহস্য!